সাওরি আমার, মানে কাজুয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অভয় দেয়ার ভঙ্গিতে হাসে একবার। তার নিজের বয়সও কম ছিল তখন। মনে মনে নিশ্চয়ই উৎকণ্ঠিত ছিল সে-ও। তবুও ভাইকে ঠিকই সাহস যোগাচ্ছিল।
ইশিনোদের সাথে তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরুটা অবশ্য খারাপ ছিল না। বাচ্চাদের প্রতি সবসময় উদাসীন দৃষ্টিতে তাকাতেন মিঃ ইশিনো। বেশ কয়েকবার তাকে ট্রাক চালাতে দেখে ধরে নেই যে সেটাই তার পেশা। কাজুয়ার চোখের স্মৃতিগুলোয় কখনো হেসে কথা বলতে দেখিনি তাকে। মিসেস ইশিনোই খেয়াল রাখতেন সাওরি আর কাজুয়ার।
“এটাই আমার মামার বাড়ি,” সাওরি বললো। “কাজুয়াও এখানেই থাকতো।”
আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে ভেতরে প্রবেশ করলো সে। হয়তো মিঃ ইশিনোর সাথে কথা বলবে।
অপেক্ষা করতে সমস্যা হচ্ছে না কোনও প্রবেশপথের কাছে গিয়ে বাড়িটার আশপাশে তাকালাম। ভেতরে ভেতরে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। সেই একই মেইল বক্স, খবরের কাগজের স্ট্যান্ড, ছোট একটা গেট। খুবই সাধারণ একটা বাড়ি।
অপারেশনের পর যখন প্রথম নিজের বাড়িতে যাই, তখন এরকম কোন অনুভূতি কাজ করেনি ভেতরে। মনে হয়েছে সম্পূর্ণ অচেনা একটা জায়গায় যাচ্ছি। কিন্তু কাজুয়া আর সাওরির মামার বাসাকে সে তুলনায় আপন ঠেকছে।
এই বাড়ির অনেক স্মৃতি আছে আমার, মানে কাজুয়ার। তার চোখেই সব দেখা।
তার বাবা-মা বেঁচে থাকার সময়েও এই বাড়ির সামনে দিয়ে স্কুলে যেত। আবার হাইস্কুলে পড়ার সময় আর্কেডে ভিডিও গেইম খেলে দেরি করে যখন বাসায় ফিরতো, সাওরি বাইরে দাঁড়িয়ে রাগত ভঙ্গিতে অপেক্ষা করতো তার জন্যে।
“নামি, ভেতরে এসো,” দরজা থেকে বললো সাওরি। কোমড়ে হাত দিয়ে এই অবস্থান থেকেই কতবার ছোটভাইকে বকুনি দিতে দেখেছি
তাকে। “হাসছো কেন?” জানতে চাইলো সে।
মাথা ঝাঁকালাম কেবল জবাবে। ভেবেছিলাম অপরিচিত একটা বাসায় এসে খুব বিচলিত অনুভব করবো মনে মনে, কিন্তু সেরকম কিছু হলো না। সরু করিডোরটা পেরিয়ে একটা মোটামুটি সাইজের হলঘরে পৌঁছুলাম। হলঘরের পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলায়। বাঁ চোখের স্মৃতিগুলো থেকে জানি যে সিঁড়িটা বেশ খাড়া।
লিভিংরুমটা জাপানি ঐতিহ্যে সাজানো। মেঝেতে তাতামি ম্যাট বিছানো। কোতসু টেবিলটা ঘরের একদম মাঝখানে। ওটার আশপাশে কতগুলো খবরের কাগজ আর পত্রিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা।
ট্র্যাকস্যুট পরিহিত ধূসর চুলের একজন লোক আমাকে দেখে বাউ করলো। “হ্যালো,” বললো সে। যা ভেবেছিলাম, তার চাইতে চড়া তার গলার স্বর। সামনা সামনি দেখার আগে এতদিন ভেবে এসেছি, তাকে দেখেই হয়তো ভয় পাবো। স্মৃতিগুলোতে সবময় স্ত্রীর সাথে উচ্চবাচ্য করতে দেখে এসেছি।
কিন্তু আমার সামনে এ মুহূর্তে যাকে দেখতে পাচ্ছি, তাকে সম্পূর্ণ অন্যরকম ঠেকছে। খুব একটা লম্বাও নয়। মুখে দুর্বল একটা হাসি শোভা পাচ্ছে। আমার বাম চোখের স্মৃতিগুলোতে তার বয়স কত ছিল? সাওরি আর কাজুয়ার মামি মারা যাবার পর বদলে গেছেন? বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাঁচার ইচ্ছেটাও চলে গেছে মনে হচ্ছে।
তবে এখনও নিয়মিত কাজ করেন আর সাওরির দেখাশোনা করেন তিনি-এটা শুনেছি সাওরির কাছ থেকে। এমনকি রান্নাও করেন দু’জনের জন্যে।
“এরকম অগোছালো অবস্থার জন্যে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তোমার কাছ থেকে। তুমি করেই বললাম। খাওনি বোধহয় এখনও?”
আমাকে কোতসুর পাশে বসার অনুরোধ করলেন তিনি।
সাধারণত কোথাও গেলে নিজেকে বাড়তি ঝামেলা মনে হয় আমার; বড্ড অনুশোচনা হয় ভেতরে ভেতরে। হয়তো আগের নামির চাইতে নিজেকে ছোট করে দেখি সবসময়-একারণেই। কিন্তু এখানে সেরকম লাগছে না। আশপাশের সবকিছুই আগে দেখেছি। প্রতিবার যখন পরিচিত একটা দৃশ্য দেখি, বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
সাওরির জোরাজুরিতে ওদের সাথেই রাতের খাবার সারতে রাজি হতে হলো। সে রান্না করতে গেলে মামার সাথে কথা বলে সময় কাটালাম।
“কাজুয়ার কবর দেখতে এসেছো?” জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
“জ্বি… জানি অনেক দেরি করে ফেলেছি…।”
এখানে আসার পথে কারণ হিসেবে এই কথাটা বলবো বলে ঠিক করেছি।
“সাওরি তোমাকে নিয়ে যাবে সেখানে।”
রান্নাঘর থেকে সাওরির বাসন নাড়াচাড়ার শব্দ ভেসে এলো। একটা স্লাইডিং দরজা লিভিংরুম থেকে পৃথক করে রেখেছে রান্নাঘরটা।
“সাওরি আর কাজুয়ার কাছে আপনার ব্যাপারে অনেক শুনেছি, বললাম।
“তাই? কাজুয়া কিন্তু তোমার ব্যাপারে আমাদের কিছু বলেনি কখনো।”
“আসলে, সেটা…”
“তুমি এসেছো দেখে খুব খুশি হয়েছি,” মাথা নিচু করে বললেন তিনি। তার ব্যবহার একদম ভিন্ন ঠেকছে এখন। চোখের স্মৃতিতে যা দেখেছিলাম, সেগুলো মিলছে না। কাজুয়ার উদ্দেশ্যে কখনো হাসেননি। কিন্তু এখন যা বলছেন, সেগুলো মন থেকেই বলছেন বলে মনে হচ্ছে।
সাওরি আর তার মামার সাথে এক টেবিলে বসে খাবো, এটা কিছুদিন আগেও কল্পনাতে ছিল না। মিশ্র একটা অনুভূতি কাজ করছে ভেতরে ভেতরে।
আমাকে নিয়ে কি চলছে তাদের মনে? এভাবে হঠাৎ করে উদয় হওয়াতে বিরক্ত হয়েছে?
বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করছে না। খুব বেশি কথা হলো না রাতের খাবারের সময় মনে হচ্ছে টেবিলের মানুষগুলো একে অন্যের অস্তিত্বের কথা ভুলেই গেছে। তাই অন্য দু’জনের উপস্থিতি সত্ত্বেও একাকী লাগছে ভীষণ।
