“ক্যাফে বন্ধ হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে সমস্যা হবে?”
মাথা ঝাঁকালাম। কোন সমস্যা নেই। তাছাড়া খুব বেশি খদ্দের নেই, তাই আমার সাথে গল্প করেই সময় কাটাচ্ছে সে।
আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে জলজ্যান্ত সাওরি আমার চোখের সামনে বসে আছে। তার চেহারার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। মনে হচ্ছে হারিয়ে যাওয়া বোনের দেখা পেয়েছি অনেক বছর বাদে। সম্পূর্ণ অতীত বিহীন আমার জন্যে সে-ই সবচেয়ে কাছের আত্মীয়। তার সাথে যত স্মৃতি আছে, মা-বাবার সাথে তার ছিটেফোঁটাও নেই। অবশ্য স্মৃতিগুলো সব কাজুয়ার।
কিন্তু তার কাছে আমি সম্পূর্ণ অচেনা একজন ব্যক্তি। এ কথাটা ভুলে গেলে চলবে না।
কিয়োকো তার বিল মিটিয়ে চলে যাবার পর কিমুরা ঘোষণা করলো, “আজকের মত ক্যাফে বন্ধ করে দেই। আর কেউ আসবে বলে মনে হয় না। মেয়েটাকে নিয়ে বাড়ি চলে যাও তুমি। সে যেহেতু কাজুয়ার বন্ধু…”
তার কণ্ঠে সাওরির জন্যে উদ্বেগ টের পেলাম। কাজুয়ার মৃত্যু আসলেও অনেক কিছু ওলট পালট করে দিয়েছে তাদের জীবনে।
সাওরির সাথে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এলাম কিছুক্ষণ পর। বাস্তবে এই প্রথম তার পাশাপাশি হাঁটছি, যদিও কাজুয়ার স্মৃতিতে এই কাজ অনেকবার করেছি। তাই খুব বেশি অপরিচিত ঠেকছে না দৃশ্যটা।
বাইরে বেশ ঠান্ডা। ক্যাফের আরামদায়ক উষ্ণতা পেছনে ফেলে আসায় এখন মনে হচ্ছে রীতিমত জমে যাবো। গাল লাল হয়ে গেছে, দেখে মনে হতে পারে কেউ সজোরে থাপ্পড় কষিয়েছে। ক্যাফের সাইনটা দেখে মনে হচ্ছে হাওয়ায় ভাসছে। একটা সিডার বনের মধ্যে দিয়ে সামনে এগিয়েছে রাস্তাটা।
“আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেটা আসলে আমার মামার বাড়ি,” নাক টেনে বললো সাওরি।
বাবা মা মারা যাবার পর সাওরি আর কাজুয়া প্রতিবেশী এক লোকের বাসায় গিয়ে ওঠে। স্বপ্নে তাদের মধ্যকার সম্পর্কটা বুঝতে পারিনি।
“এখন আমি আর মামা একসাথেই থাকি।”
“আপনার মামী?”
“কাজুয়ার দুর্ঘটনার কিছুদিন আগে নিউমোনিয়ায় মারা যান তিনি।
এই স্মৃতিটা দেখিনি বাম চোখে। আসলে এখনও কাজুয়ার ব্যাপারে অনেক কিছু জানি না। বলা যায় তার পুরো জীবনের অভিজ্ঞতার খণ্ড খণ্ড চিত্র দেখেছি মাত্র।
চারিদিক চুপচাপ। বাড়িঘরের সংখ্যাও হাতে গোনা। সাওরি বলেছিল যে ক্যাফে থেকে বাড়িতে পৌঁছুতে পনেরো মিনিটের মত সময় লাগবে। ঠান্ডায় দাঁত ঠকঠক করছে আমার। রাস্তার দু’পাশে লম্বা লম্বা গাছ। কতগুলো পরিত্যক্ত গাড়ি চোখে পড়লো, মরিচার কারণে এখন আর আসল রঙ বোঝা যাচ্ছে না। অন্ধকারে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
একটা পাখির ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ কানে এলো। অন্ধকারের জন্যে বুঝতে পারলাম না যে কি পাখি। তবে অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে একটা কাক। দেবদারু গাছগুলোর ওপর দিয়ে উড়ছে।
মেলানকলি গ্রোভে সাওরির সাথে হওয়া আমার প্রথম কথোপকথনের কথা ভাবলাম।
“কাজুয়া নেই এখানে,” বলে সে। এক মুহূর্তের জন্যে বড় অদ্ভুত লাগে কথাটা। তার কণ্ঠস্বর শুনে মনে হয় যেন কোন কাজে একটু আগে বাইরে গেছে কাজুয়া। তবে প্রচ্ছন্ন বেদনার সুরটা কান এড়ায় না।
“দুর্ঘটনার কথাটা জানি আমি।”
“ওহ…” বলে মাথা নিচু করে ফেলে সাওরি।
“ও মারা যাবার পর কি হয়েছে সেটা বলবেন, প্লিজ?”
তখন জানতে পারি যে কিভাবে ভাইয়ের মৃত্যুর সাথে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে সাওরি।
দু’মাস আগে রাস্তায় কাজুয়াকে ধাক্কা দেয় একটা গাড়ি। ড্রাইভার অ্যাম্বুলেন্সের জন্যে ফোন দেয়। কিন্তু কোন সাহায্য আসার আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। সাওরি হাসপাতালে গিয়ে মৃতদেহ সনাক্ত করে। সে মুহূর্তে তার মনে কি চলছিল তা ভাবতেও খারাপ লাগে আমার। বাবা-মা’র মৃত্যুর পর কাজুয়াই ছিল তার সবকিছু।
দুর্ঘটনার তারিখটা জিজ্ঞেস করলাম সাওরিকে। আমার অপারেশনের ঠিক আগ দিয়েই। কায়েদি থেকে দশ মিনিটের দূরত্বে একটা পাহাড়ি রাস্তায় মারা যায় কাজুয়া।
নীল দেয়ালের বাড়িটা কাজুয়ার দুর্ঘটনাস্থল থেকে খুব বেশি দূরে হবার কথা না। পরোক্ষভাবে হিতোমির অপহরণকারীই খুন করেছে কাজুয়াকে।
তাকে খুঁজে বের করবো আমি। দুর্ঘটনার যেহেতু দু’মাস হয়েছে মাত্র, হিতোমি হয়তো বেঁচে আছে এখনো। স্থানীয় পত্রিকার খবর অনুযায়ী এক বছর আগে অপহরণ করা হয় তাকে। কিন্তু কাজুয়া তাকে দেখতে পায় দু মাস আগে। তার মৃত্যুর তারিখ শুনে নিশ্চিত হলাম ব্যপারটা। দশ মাসে যেহেতু মেয়েটাকে হত্যা করেনি অপহরণকারী, তার এখনও বেঁচে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
হুটহাট সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু করা যাবে না। হিতোমিকে বাঁচাতে হলে আগে বাড়িটা খুঁজে বের করতে হবে। প্রমাণ যোগাড় করে পুলিশে খবর দিতে হবে এরপর।
সাওরির পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম যে পরদিনই অপহরণকারীর খোঁজে বের হবো। ভয় লাগছে ভীষণ। কাজটা কি করতে পারবো আমি?
সাওরির বাড়িটার সামনে চলে এলাম।
বাঁ চোখের স্বপ্নে সাওরি আর কাজুয়া প্রথম যেদিন এই বাড়িতে এসেছিল সেদিনকার ঘটনা দেখেছি আম। দরজার পাশে নামফলকে “ইশিনো’ লেখা মোটা হরফে। ওদের মা’র পরিবারের পদবি।
কাজুয়ার বয়স বেশ কম ছিল সেসময়। সাওরির হাত ধরে বাড়িটায় উপস্থিত হয় সে। তার অস্থিরতা স্বপ্নের মধ্যেও স্পর্শ করেছিল আমাকে। শক্ত করে বোনের হাত ধরে বাড়িটার দিকে তাকিয়েছিল অনেকক্ষণ।
