হাত উঠিয়ে মাঝপথেই থামিয়ে দিলাম তাকে। “আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো আমি।” দেয়ালে ঝোলানো একটা পেইন্টিংয়ের দিকে ইশারা করলাম। কালো বনের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা একটা হ্রদ দেখা যাচ্ছে ছবিটায়। অবাক হয়ে গেল কিমুরা। ঠিক উত্তরটাই দিয়েছি আমি।
ক্যাফের একদম পেছনে বসে থাকা লোকটা উঠে দাঁড়ালো এসময়। চেহারা বেশ সুন্দর তার, অন্ধকারে বসে থাকায় আগে বুঝতে পারিনি। লম্বা চুলগুলো কপাল অবধি নেমে এসেছে, চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। এমন ভাবে হাঁটছে যে কোন শব্দই শুনতে পাচ্ছি না। কাউন্টারের সামনে এসে বিল মেটানোর জন্যে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলো সে।
কিমুরা সাহেবের চক্ষু ছানাবড়া। বেচারা কল্পনাও করতে পারেনি যে আমি আসলেও ঠিকঠাক জবাবটা দিয়ে দিব। সুন্দরমত চেহারার লোকটার কাছ থেকে বিলের টাকা সংগ্রহ করার সময়েও বিড়বিড় করে কিসব বলতে লাগলো।
ক্যাফে ছেড়ে বেরিয়ে যাবার সময় আমার দিকে এক ঝলক তাকালো লোকটা। সে-ও হয়তো আমাদের কথোপকথন শুনছিল।
“যেই লোকটা মাত্র বের হয়ে গেল,” কিমুরা বললো। “সে-ই এঁকেছে ছবিটা। শিওজাকির নাম শুনেছেন?”
মাথা ঝাঁকালাম।
“তার সম্পর্কে কিছু মনে নেই?”
আমার যে কোন কিছু সম্পর্কেই মনে নেই, এটা বলতে গিয়েও বললাম না।
“থাকার জন্যে এরকম একটা জায়গা হঠাৎ কেন বেছে নিল সে, কে জানে। যাইহোক, আপনি এখানে কোন কাজে এসেছেন?”
কি বলবো ভাবতে লাগলাম। সত্যিটা বলে দেব? স্বপ্নে দেখেছি একটা মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে। হয়তো তার সাহায্যও পাবো।
কিন্তু আমার কথা কেন বিশ্বাস করবে? আমাকে তো চেনেও না ঠিকমতোবাম চোখ প্রতিস্থাপনের পর সেই চোখের পুরনো স্মৃতিগুলো থেকে এসব জেনেছি, এই কথাটা যে কারো কানে অদ্ভুত শোনাতে বাধ্য। বলা যায় না, হেসেও উঠতে পারে।
“একজনকে খুঁজছি আমি,” শেষমেষ বললাম। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যাও না। সাওরি আর হিতোমি আইজাওয়া। এই দু’জনকে খুঁজছি। সেই সাথে খুনীকেও। “এখানে পার্টটাইম চাকরি করেন না একজন?”
“আপনিও সাওরির খোঁজে এসেছেন?” হাসি ফুটলো কিমুরার মুখে।
থমকে গেলাম তার উত্তর শুনে। এই প্রথম কেউ সাওরির নাম উচ্চারণ করলো আমার সামনে।
“আমিও খুঁজছি… মানে?”
“মেয়েটার শুভাকাক্ষীর সংখ্যা কম না। আপনাকে যে এখানে পৌঁছে দিল, সে প্রায়ই আসে তার সাথে দেখা করতে। একটু আগে যখন বললাম ঠান্ডার কারণে আজ আসতে পারেনি, সুরসুর করে বেরিয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে প্রথমে কিছু একটা অর্ডার তো করতে পারতো।” একটা গালি দিল কিমুরা।
সাওরি আজকে আসেনি শুনে হতাশও হলাম আবার কিছুটা স্বস্তিও পেলাম। হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে কি বলতাম সেটা জানিনা, এখনও সে ব্যাপারে কিছু ভাবিনি।
তবে মেলানকলি গ্রোভেই কাজ করে সে, এটা এখন একদম নিশ্চিত। কাজুয়ার মৃত্যুর পর চাকরি ছেড়ে দেয়নি।
ক্যাফের ভেতরে মৃদু একটা সুর বাজছে স্পিকারে। এতটাই আস্তে যে মনে হয় অবচেতন মনে কিছু শুনছি। সামনে রাখা কাপটা তুলে নিয়ে কফিতে চুমুক দিলাম। কাজুয়া এখানে বসে এই কাপেই চুমুক দিয়েছিল কিনা কে জানে!
কাউন্টারের মাঝামাঝি সে যে সিটটায় বসততা সেটায় হাত বুলালাম।
উঠে দাঁড়িয়ে আরেকবার ভালোমতো মাথায় গেঁথে নিলাম ক্যাফের ভেতরকার সবকিছু। কেন যেন এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে বাস্তবেও দেখছি সবকিছু। কিমুরা আর কিয়োকো কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তবে তাদের দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে সিটে বসে আবারো চুমুক দিলাম কফিতে।
ক্যাফের পেছনের দরজা দিয়ে এসময় ভেতরে প্রবেশ করলো এক যুবতী। “ময়লা ফেলে দিয়েছি,” কিমুরার উদ্দেশ্যে বললো সে। সোয়েটারে একবার হাত মুছে আমার দিকে তাকালো। চুলগুলো পনিটেইল স্টাইলে বাঁধা। ঠান্ডার মধ্যে বাইরে থাকার কারণেই হয়তো তার গাল আর নাক কিছুটা লাল হয়ে আছে।
“ঐ লোকটাকে মিথ্যে বলেছিলাম আমি,” কিমুরা আমার দিকে তাকিয়ে বললো।
সদ্য ভেতরে প্রবেশ করা যুবতী কাউন্টারের পেছনে রাখা টিস্যু বক্স থেকে একটা টিস্যু বের করে নিয়ে সশব্দে নাক ঝরলো। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছুটা লজ্জা পেলো মনে হয়। কিছু মনে করবেন না, ছোটবেলা থেকেই ঠান্ডার সমস্যা আমার।”
“সাওরি ফুইয়ুতসুকি…।”
ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকালো সে। যেন জিজ্ঞেস করতে চাইছে আমি কিভাবে তার নাম জানলাম।
“… আপনার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগছে,” বললাম। “আমি কাজুয়ার বন্ধু, আপনা আপনি কথাটা বেরিয়ে গেল মুখ দিয়ে।
কাজুয়ার নাম শোনার পর পুরো বদলে গেছে কিমুরা আর সাওরির মুখভঙ্গি।
সত্যিটা হচ্ছে, এর আগেও বহুবার দেখা হয়েছে আমাদের। আপনাকে অনেক দিন ধরে চিনি। মনে হয় যেন একদম ছোট থেকে একসাথে আছি।
বাইরে স্বাভাবিক থাকলাম। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কাঁদছি।
.
৩
“আমার বাসায় চলো তুমি,” সাওরি বললো আমার উদ্দেশ্যে। আমি কাজুয়ার বন্ধু এটা শোনার পর থেকেই ব্যবহার অন্যরকম হয়ে গেছে তার। তাকে খুলে বলেছি যে এখানে কোথাও থাকবো সেটা জানি না। হোটেল ভাড়া করার মত টাকা আছে আমার, কিন্তু কায়েদিতে হোটেল বলতে সেরকম কিছু নেই। তাই একরকম বাধ্য হয়েই সাওরির কথা মেনে নিতে হলো। সত্যি কথা বলতে, আমার ভেতরের একটা অংশ চাচ্ছিলো যাতে সে এরকম প্রস্তাব দেয়। কারণ বাসাটা নিজের চোখে দেখার খুব ইচ্ছে।
