“এখনই অর্ডার করবেন?” জিজ্ঞেস করলো ক্যাফে মালিক।
দ্রুত মেনু খুলে প্রথম যেটা চোখে পড়লো সেটার নামই উচ্চারণ করলাম। “ক্যারামেল কফি, প্লিজ।”
ক্যাফের পেছনের দরজা দিয়ে আমাকে যে লোকটা এতদূর অবধি লিফট দিয়েছে সে প্রবেশ করলো এসময়। বড় বেশি কাকতালীয় ব্যাপারটা। মেলানকলি গ্রোভেই আসছিলো সে! মালিককে আগে থেকেই চেনে। হেসে হেসে কথা বলছে এখন। হয়তো শহরে আসার পথে তাকে কিছু মালপত্র নিয়ে আসার অনুরোধ করেছিল ক্যাফে মালিক। আশপাশে বারবার উঁকি দিচ্ছে ড্রাইভার লোকটা। বোধহয় কাউকে খুঁজছে।
দু’জন খদ্দের আছে ক্যাফেতে এ মুহূর্তে। ধূসর চুলের বয়স্ক এক মহিলা। বয়স ষাটের আশেপাশে। জানালার ধারে বসে আছে সামনে একটা বই আর কফির কাপ নিয়ে। দুর্বল হাতে একটা পৃষ্ঠা ওল্টালেন মহিলা। পরনের পোশাকগুলো বেশ দামি। কাছেপিঠেই থাকেন কিনা কে জানে। দেখে মনে হচ্ছে এখানে নিয়মিত আসেন।
আরেকজন খদ্দের বসে আছে একদম পেছনের দিকে। প্রথমে তাকে খেয়ালই করিনি ঠিকমতন। ওদিকটায় আলো কিছুটা কম। লোকটার পরনের পোশাক কালো হওয়ায় অন্ধকারে মিশে গেছেন প্রায়।
একটু পর ড্রাইভার লোকটা আমার কাছে এসে বললো যে কাজ শেষ তার।
“এখানেই থেকে যাবো আমি। লিফটের জন্যে ধন্যবাদ,” একটু ভেবে জবাব দিলাম।
বিদায় জানিয়ে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল সে। আমার জন্যে তার চোখের দুশ্চিন্তাটুকু অবশ্য নজর এড়ালো না। বোধহয় ভাবছে এরকম একটা জায়গায় একা একা কি করব। দৃষ্টিটা আগেও দেখেছি বলে মনে হলো। হয়তো কোন একটা স্বপ্নে, এই ক্যাফেতেই। জার্নালটা এত মোটা যে সবগুলো ঘটনার কথা মনে না থাকাই স্বাভাবিক।
আমার ক্যারামেল কফি নিয়ে ফিরে এল ক্যাফে মালিক। “এই নিন মিস, কাপটা আমার সামনে নামিয়ে রেখে বললো সে।
আবারো চোখে কৌতূহল নিয়ে তাকালাম তার দিকে। এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে সে আমার সামনেই আছে।
কাজুয়া প্রায় সময়েই আসততা এই ক্যাফেতে। সাওরি এখানে কাজ করে, সেজন্যেই বোধহয়। এমনকি ক্যাফেটা প্রথম যখন খোলে, সেদিনও এখানে এসেছিল। তখন বোধহয় মিডল স্কুলে পড়তো সে। মালিক অবশ্য অন্য একজন ছিল তখন। কিছুটা বয়স্ক এক লোক।
বাসায় কফির কাপের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় একদিন বাঁ চোখটা গরম হয়ে উঠেছিল। সেদিন দেখেছিলাম দৃশ্যটা। সবকিছু একদম ঝ চকচকে ছিল তখন ক্যাফেটার। স্কুল বাদ দিয়ে এসেছিল কাজুয়া, ইউনিফর্ম পরেই। পেছনে বসে দেখছিল উদ্বোধনী দিনের ব্যস্ততা। ধূসরচুলো লোকটার চেহারা তখনই তার চোখে লম্বা সময়ের জন্যে অঙ্কিত হয়ে যায়।
সবকিছুরই অতীত আছে, ভাবলাম আমি। এই ক্যাফেটারও। হয়তো এখানে আমিই একমাত্র ব্যক্তি, যার কোন অতীত নেই।
খুব অদ্ভুত লাগছে। আমার ব্যাকপ্যাকে যে বাইন্ডারটা আছে সেখানে এই শহর আর শহরের লোকদের বিশদ বর্ণণা। কিন্তু বাস্তবে তাদের সম্পর্কে কিছুই জানি না। “এক্সকিউজ মি…” ক্যাফে মালিকের উদ্দেশ্যে এটুকু বলে চুপ করে গেলাম। বলার মত কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। তাকে আমি আগে অনেকবার দেখেছি, কিন্তু সে তো আমাকে কোনদিন দেখিনি।
“কিছু বলবেন?” বয়সে তার চেয়ে আমি অনেক ছোট। তবুও আপনি করে বলছে লোকটা।
“এভাবে হঠাৎ জিজ্ঞেস করাটা হয়তো উচিৎ হচ্ছে না…” অনেকক্ষণ ধরেই একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আমার মাথায়। “আপনার নামটা জানতে পারি কি?”
স্বপ্নগুলোয় যেহেতু কোন শব্দ নেই, ভদ্রলোকের নামটাও কখনো জানা হয়ে ওঠেনি। সেজন্যেই প্রশ্নটা করা।
স্বাভাবিক ভাবেই অবাক হয়ে গেল লোকটা। “কিমুরা… কিন্তু কেন…”
“ধ-ধন্যবাদ,” কোনমতে বললাম। গাল লাল হয়ে উঠছে আমার। অবশ্য মনে মনে কিছুটা ভালোও লাগছে। লোকটার নাম তাহলে কিমুরা।
কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ভালো করে তাকালো কিমুরা। গতানুগতিক জাপানিজদের তুলনায় একটু বেশিই লম্বা সে। অনেকটা ভালুকের মতন। একটা হাসি ফুটেছে তার চেহারায়। সেই হাসি দেখে আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হবার যোগাড় হলো আমার। “আমার নাম কেন জানতে চাইছেন?”
এই প্রশ্নের যথাযথ কোন জবাব নেই আমার কাছে।
“না, মানে… এখানে আগেরবার যখন এসেছিলাম, তখন কেউ একজন আপনার নাম ধরে ডেকেছিল। সেটাই মনে করে চেষ্টা করছিলাম,.. তাই…” বাক্যটা শেষ করতে পারলাম না।
“এখানে আগে এসেছেন আপনি? কতদিন আগে?”
“দু’বছর,” এ মুহূর্ত দ্বিধার পর বললাম। বানোয়াট একটা কথা।
বুকের ওপর হাত ভাঁজ করে রেখে সন্দিহান চোখে আমার দিকে তাকালো কিমুরা। “মিথ্যে বলবেন না। সব কাস্টমারের চেহারা মনে থাকে আমার।”
“মিথ্যা বলছি না,” আতঙ্ক চেপে বললাম।
“তাই নাকি…” বলে কিছুক্ষণ ভাবলো কিমুরা। “এখানে একটা জিনিস অল্প কিছুদিন ধরে আনা হয়েছে। বলুন তো সেটা কি? অন্য সবকিছু দু’বছর আগে যেরকম ছিল, সেরকমই আছে।”
জানালার ধরে বসে থাকা বয়স্ক মহিলাটা উঠে দাঁড়ালো এসময়। “আহ… কিমুরা, থামো তো। আমিও তো এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবো না।”
তিনি যে আমাদের কথা শুনছেন, তা আগে খেয়াল করিনি।
“আমাদের কথা শুনছিলেন আপনি, কিয়োকো?”
হাতের বইটা বন্ধ করে কড়া চোখে কিমুরার দিকে তাকালেন কিয়োকো।
“কিয়োকো ঠিকই বলেছেন। প্রশ্নটা বেশি কঠিন হয়ে…” কিমুরা বলতে শুরু করলো।
