ড্রাইভার লোকটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার সময় নষ্ট করা উচিৎ হচ্ছে না ভেবে আবারো ফিরে এলাম গাড়িতে।
“আমার পরিচিত একজন অনেক আগে খেলতে এখানটায়। তখন অবশ্য কেবল ঝোলানো হচ্ছে সাইনবোর্ডটা…”
বাম চোখের স্বপ্নে একজন লোককে সাইনবোর্ডের ছবিটা আঁকতে দেখেছিলাম। খেলতে খেলতে নীল রঙের কৌটাটা উল্টে দিয়েছিল কাজুয়া। চোখের উচ্চতা থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে বয়স খুব একটা কমও না তখন তার। কিন্তু কৌটা উল্টে যাবার সাথে সাথে ঝেরে পালায় সেখান থেকে।
দৃশ্যটা মনের পর্দায় ভেসে ওঠায় না হেসে পারলাম না। একই সাথে দুঃখে ভারি হয়ে উঠলো হৃদয়টা।
গাড়ি চলতে শুরু করেছে আবার। ব্যাকপ্যাক থেকে বাইন্ডারটা বের করে স্বপ্নটা টুকে নিলাম। ভেতরে ভেতরে আনন্দ দানা বাধছে। সাইনবোর্ডটার সামনে দাঁড়ানোর পর থেকে কাজুয়ার জীবনকে অনেক বেশি বাস্তব মনে হচ্ছে এখন। আমি আর কাজুয়া যে সম্পূর্ণ ভিন্ন দু’টো সত্তা, এটা ভুলে যাই মাঝে মাঝে।
“কায়েদি পৌঁছে গেছি আমরা,” ড্রাইভার বললো।
গাড়ির জানালা দিয়ে যে দৃশ্যটা দেখতে পাচ্ছি, তাতে মন ভরে গেছে।
“তবে একটা জায়গায় একটু কাজ আছে আমার,” বললো সে। “সেখানে যদি আগে যাই, কোন সমস্যা হবে?”
“না,” ছোট করে বললাম। কায়েদিতে কোথায় যাবো, সেটা আসলে আমি নিজেও জানি না এখন পর্যন্ত। সাওরি আর কাজুয়ার শহরে যেতে হবে–এ কথাটাই মাথায় ঘুরছিল কেবল। এর বেশি এখনও কিছু ভাবিনি।
একটা থাকার জায়গা খুঁজে বের করতে হবে। সেখান থেকে সাওরির খোঁজ করবো। এখনও নিশ্চয়ই বেঁচে আছে সে। কাজুয়া খুব সম্ভবত দুই কি তিন মাস আগে মারা গেছে। সাওরি এখনও এখানেই থাকার কথা। এরপর খুঁজতে হবে নীল ইটের বাড়িটা।
অবশেষে কাজুয়ার শহরটা চোখে পড়লো আমার। ওটার মাঝ দিয়ে ধমনীর মত একেবেকে বেরিয়ে গেছে হাইওয়েটা। খুব বেশি যানবাহন চোখে পড়লো না। চারদিক মোটামুটি নিশ্চুপ।
জানালা দিয়ে কোন উঁচু দালান দেখতে পেলাম না। ছড়ানো ছিটানো কয়েকটা দোতলা বাড়ি আর দোকানপাট। ফাঁকা জায়গাগুলোতে মৃত ঘাস। ডাস্টবিনে ময়লা গুঁকছে একটা নেড়ি কুকুর।
সদ্য কাটা দেবদারু গাছ ভর্তি একটা ট্রাক চলে গেল উল্টো পাশের রাস্তা দিয়ে। ড্রাইভার লোকটার কাছে শুনলাম একটা আপেল খামার আছে পাহাড়ের ওপরে। সেটাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে শহরটা। অ্যালার্জি আছে এরকম কারো থাকার পক্ষে জায়গাটা সুবিধাজনক কিনা ভাবলাম মনে মনে। সাওরির হয়তো এই অ্যালার্জির কারণেই সবসময় নাক থেকে পানি ঝরে।
একটা সুপারমার্কেট চোখে পড়লো। ওখানে পর্যাপ্ত ক্রেতা সমাগম হয় কিনা কে জানে। এমনকি সামনের সাইনবোর্ডটাও মলিন। গলায় ভোয়ালে পেঁচিয়ে বয়স্ক এক লোক ছোট মিট্রিাক থেকে অ্যালকোহলের কেস নামিয়ে। যাচ্ছে।
প্রাণহীন শহরটার বাতাস আমার শহরের তুলনায় কিছুটা পাতলা। উচ্চতার কারণে এমন লাগছে বোধহয়। রাস্তার মার্কিংগুলো উঠে গেছে জায়গায় জায়গায়। কে বলবে যে এখান থেকে মাত্র বিশ মিনিটের দূরত্বে একটা রেল স্টেশন আছে?
গাড়ির মধ্যে কয়েকবার কথা বলে উঠতে গিয়েও চুপ করে গেলাম। বাঁ চোখের স্বপ্নে দেখা দোকানপাট, রাস্তা আর দৃশ্যপাট পেছনে ফেলে যাচ্ছি। এই শহরটাতেই থাকতো কাজুয়া। পরিচিত কিছু চোখে পড়লেই ড্রাইভার লোকটাকে গাড়ি থামাতে বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তাতে সে বিরক্ত হবে ভেবে করছি না। বরং জানালায় কপাল ঠেকিয়ে প্রাণভরে দেখে নিচ্ছি সবকিছু।
“শহর থেকে একটু বাইরে জায়গাটা,” লোকটা বললো এসময়। “একটা জিনিস পৌঁছে দেব।”
কিছুক্ষণের মধ্যে হাইওয়ে থেকে একটা পার্শ্বরাস্তায় নেমে গেল গাড়িটা। আশপাশে বাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কম এখন। এখানকার দৃশ্য আগের মত পরিচিত ঠেকছে না দেখে কিছুটা হতাশ হলাম। বিষণ্ণতা ভালো করে জেঁকে বসার আগেই গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলো লোকটা।
পেছনের সিট থেকে একটা বাক্স বের করে বললো, “কাজ শেষ করেই তোমাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেব।”
কিন্তু সেটার আর দরকার হবে না। গাড়ি থেকে বেরিয়ে সে যে বাড়িটায় প্রবেশ করেছে সেটার দিকে তাকালাম।
আসলে বাড়ি না বলে ক্যাফে বলাটাই বোধহয় ঠিক হবে। মাউন্টেইন লজের মত দেখতে। অনেকবার দেখেছি আগে।
মেলানকলি গ্রোভ।
সাওরি কাজ করে এখানে।
*
কাঠের দরজাটা খুলে ভেতরে পা রাখলাম। হিটারের আরামদায়ক উষ্ণতা সাদর আমন্ত্রণ জানালো। প্রবেশপথের বামদিকে কাউন্টার আর ডান দিকে কয়েকটা টেবিল। এসব আগেই দেখা আমার। কাঠের মেঝেতে নিজের প্রতিটা পদশব্দ কানে মধুর মত বাজছে যেন। কাউন্টারের সামনে পাতা টুলগুলোর একটায় বসলাম।
পেছন থেকে মালিক বের হয়ে এসে বললো, “স্বাগতম।
পালস দ্রুত হয়ে গেল আমার। এনাকে আগে বেশ কয়েকবার দেখেছি আমি। গাট্টাগোট্টা শরীর, নাকের নিচে পুরু গোঁফ। স্বপ্নে যেরকম বড়সড় দেখাত, বাস্তবেও সেরকমই দেখাচ্ছে। এরকম বিশাল শরীর নিয়ে কাউন্টারের পেছনে ছোট্ট জায়গাটায় কিভাবে সারাদিন বসে থাকে কে জানে।
“কোন সমস্যা?” আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো সে।
“না। মাফ করবেন,” বলে চোখ নামিয়েনিলাম।
ক্যাফের পরিচিত দশ্যে একবার নজর বুলালাম। সেই একই ফুলদানি, একই ফুল আর একই টেবিল চেয়ার। সোডিয়াম বাতির হলদেটে আলো। বাম চোখে এমনটাই দেখেছিলাম।
