নতুন কারো সাথে দেখা হলে তারা আমার সম্পর্কে কিছু জানবে না। সেজন্যেই মাথায় যা আসবে সেটাই বানিয়ে বলবো ভেবে রেখেছি। কিন্তু বিভ্রান্তি আর দুশ্চিন্তার দরুণ মুখ খুললে এ মুহূর্তে না তোতলিয়ে কিছু বলতে পারবো না, তাই আপাতত কেবল মাথা নাড়ছি।
স্কুলে বসন্তের ছুটি এখন। অবশ্য পড়াশোনা নিয়ে ভাবনা চিন্তা আরো আগেই ছেড়ে দিয়েছি। গত শিক্ষাবর্ষ শেষ হবার পর একদিনও ক্লাসে যাইনি। তবে সেজন্যে মনে অপরাধবোধ কাজ করে ঠিকই।
তাই যে দিনগুলোতে আসলেই স্কুল বন্ধ থাকে, একটু ভারমুক্ত অনুভব করি ভেতরে ভেতরে। বাড়ি থেকে পালানোর সময় নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিয়েছি যে, নতুন কোথাও গেলে কেউ অন্তত আমার দিকে চোখে। রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে তাকাবে না।
বাবা মার উদ্দেশ্যে একটা চিঠি রেখে এসেছি। সেখানে লেখা যে কয়েকদিন বাড়ির বাইরে থাকবো, প্রতিদিন একবার ফোন দিয়ে নিজের খোঁজখবর জানাবো।
কিছুদিন আগে নামির সঞ্চয়ের সব টাকা তুলে নিয়েছি ব্যাঙ্ক থেকে। নিজের নাম লেখা চেকটা নিয়ে গিয়েছিলাম ব্যাঙ্কে। আমার ডেস্ক ড্রয়ারের পেছনে লুকোনো ছিল ওটা। স্মৃতি হারাবার পূর্বে নিয়মিত টাকা জমাতাম আমি।
কিন্তু পিন নম্বরটা ভুলে গিয়েছিলাম। অন্যদের পিন নম্বর ভোলার সাথে আমার পিন নম্বর ভোলার কারণের অবশ্য বেজায় ফারাক। একবার ভাবলাম ব্যাঙ্কের কোন কর্মকর্তাকে আমার পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলবো। সাথে তো স্কুলের পরিচয়পত্র আছেই। কোন ঝামেলা হবার কথা না।
কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছিল যে আগের নামির টাকাগুলো আমার নিজের নয়। সুতরাং অন্য কারো টাকা নিয়ে ব্যাঙ্কের কারো সাথে কথা বলতে গেলে অনর্থক বাজে পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে। যদিও চিন্তাটা পুরোপুরি অমূলক, তবুও মন থেকে ঝেরে ফেলতে পারলাম না।
শেষমেষ সিদ্ধান্ত নেই যে এটিএম বুথ থেকে টাকা তোলার চেষ্টা করবো। পিন হিসেবে প্রথমে জন্মদিনের তারিখ পাঞ্চ করি। বাবার কাছ থেকে তারিখটা শুনে নিয়েছি আগেই।
১০২১।
কাজ হলো না। সিকিউরটি গার্ড চোর সন্দেহে পাকড়াও করবে আমাকে, এই ভয় কাজ করছিল মনে মনে।
মা’র জন্ম তারিখ পাঞ্চ করে দেখলাম এরপর।
০৭২৬।
ভাগ্য নেহায়েত ভালো বলতে হবে। কাজ করলো পিন কোডটা। মনে মনে প্রবল অপরাধবোধ নিয়েই নামির অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা তুলে। নিলাম। এগুলো আমার নিজেরই টাকা, তবুও মনে হচ্ছে যেন চুরি করেছি।
বেরিয়ে পড়লাম কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে। সাথের ম্যাপ দেখে বোঝার চেষ্টা করলাম কোন রুট দিয়ে গেলে সবচেয়ে সুবিধা হবে। কাজুয়া যে শহরে থাকে সেটার নাম কায়েদি। খুব বেশি লোক থাকে বলে মনে হয় না। ম্যাপে এত ছোট করে জায়গাটার নাম লেখা যে প্রথমে চোখেই পড়েনি।
যাত্রার প্রস্তুতি নেয়ার দিনগুলোতেও একটার পর একটা স্বপ্ন দেখতেই থাকি। তবে সবগুলো স্বপ্নই কাজুয়ার ছেলেবেলা সম্পর্কিত। সেদিনের সেই ঘটনার মত আর কিছু দেখিনি। প্রতিবার তার চোখ দিয়ে সাওরি বা অন্য কাউকে দেখার পর কাঁদতে ইচ্ছে গলা ছেড়ে। স্বপ্নটা যতই আনন্দের হোক না কেন। কাজুয়া মৃত, কথাটা ভাবলে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আসে গলার কাছটায়।
“এই ছোট্ট শহরটায় গিয়ে কি করবে?” ড্রাইভার জানতে চাইলে আগ্রহী কণ্ঠে।
“একজনের সাথে দেখা করতে হবে,” দ্বিধান্বিত কণ্ঠে বললাম।
“তুমি না বললে কায়েদির কাউকে চেনো না?”
“আসলে… ব্যাপারটা…” কি বলবো খুঁজে পেলাম না।
গাড়ি যতই সামনে এগোচ্ছে, আশপাশের পরিবেশের সাথে বাম চোখে দেখা জায়গাটার পরিবেশের মিল খুঁজে পাচ্ছি। কাজুয়া আর সাওরির বাসস্থানেই যাচ্ছি। এ বিষয়ে আর কোন সন্দেহ নেই।
রাস্তার পাশের দেবদারু গাছ আর ট্রান্সমিশন টাওয়ারগুলো আগেও দেখেছি। কাজুয়ার চোখ দিয়ে। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। এখন বসন্ত চলছে। কিন্তু আশপাশের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে শীত। গাছগুলোর বেশির ভাগেরই পাতা নেই। গাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ভেতরে ঢাকায় শরীর কেঁপে উঠছে কিছুক্ষণ পরপর। এই ঠান্ডায় বরফ পড়লেও অবাক হবো না।
একটা সিগন্যালে কিছুক্ষণের জন্যে থামলো গাড়ি। আশপাশে অবশ্য অন্য কোন গাড়ি নেই। বামপাশে পরিত্যক্ত কয়েকটা সাদা ট্রেইলার পড়ে আছে। ওগুলোর পেছনে ঘন বন। পরের সিগন্যালটায় বড় একটা সাইন চোখে পড়লো।
বাম চোখটা গরম হতে শুরু করেছে। এটা তো…
“গাড়িটা একটু থামাবেন?” মনে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করলাম।
একটা সন্দেহ ভর করলো তরুণ ভদ্রলোকের চেহারায়। সবুজ বাতি জ্বলে উঠেছে কিছুক্ষণ আগে।
“কি হয়েছে?” জিজ্ঞেস করলো ড্রাইভার। “অ্যালার্জি?”
বাম চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। অনেকেই আগে এই একই প্রশ্ন করেছে আমাকে। চোখের পানি মুছে মাথা ঝাঁকালাম। “একটু বাইরে যেতে পারি?” জিজ্ঞেস করলাম। “এক্ষুনি ফিরবো।”
তার অনুমতির অপেক্ষা না করেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বাইরের বাতাস খুব বেশি ঠান্ডা। সেটাই স্বাভাবিক, এখানে তো আর হিটার নেই।
বিশাল সাইন বোর্ডটার নিচে এসে দাঁড়ালাম। দু’টো খুটির ওপর ঝোলানো ওটা। সাইনবোর্ডে খুব সুন্দর একটা ছবি। হয়তো কোন কোম্পানির পক্ষ থেকে এখানে লাগানো হয়েছিল, এখন অবশ্য কোম্পানির নামটা মুছে গেছে। কিছুক্ষণ ওটার নিচে হাঁটাচলা করলাম। কয়েকবার আঙুল দিয়ে টোকা দিলাম ধাতব খুটিগুলোয়। মুখে হাসি ফুটেছে কখন যেন।
