মিকির মনে আছে, তলকুঠুরিতে প্রথমবার মেয়েটার চোখে বাঁধা কাপড়টা সরানোর পর সে বলে উঠেছিল, “ওগুলো ম্যানেকুইনের হাত পা না?”
অবশ্য তার নিজের হাত পাগুলোও যে যথাস্থানে নেই, সেটা খেয়াল করতে খুব বেশি দেরি হয়নি।
“ওগুলো…আমার?”
হাত আর পা দুটো শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে করাত ব্যবহার করেছে মিকি। কোন প্রকার চেতনানাশক ব্যবহার করেনি। তা সত্ত্বেও মেয়েটা টু শব্দ করেনি। এমনকি কাঁটার পর কোন ব্যান্ডেজও বাঁধতে হয়নি। খুব বেশি রক্ত ঝরেনি যে। তবে ক্ষতস্থানগুলো একদম তাজা ছিল তখন অবধি, টকটকে লাল।
হিতোমির পক্ষে আর স্বাভাবিক জামা-কাপড় পরা সম্ভব না। সেজন্যে একটা বস্তার ভেতরে তার গলা অবধি ঢুকিয়ে দিয়েছে মিকি। আরো বেশ কয়েকটা বস্তা বানিয়েছে সে। কোনটায় ফুলের নকশা আবার কোনটা ডোরাকাটা। তবে সেগুলো খুব একটা পছন্দ নয় হিতোমির।
“গলার কাছটায় খচখচ করে,” বলেছিল সে।
শেষে নীল রঙের কাপড় দিয়ে বানানো বস্তাটা বেছে নেয় হিতেমি। গলার কাছটায় বেশ প্রশস্ত ওটার, তাই অসুবিধে হয় না।
ঘুমন্ত কিশোরীকে নিচে নিয়ে এলো মিকি। বুকের কাছটায় ভেজা তার। মাঝে মাঝে মা-বাবার কথা মনে পড়লে কাঁদে মেয়েটা।
সিঁড়ির পেছনদিকে তলকুঠুরিতে যাবার প্রবেশপথ। দেয়ালের রঙ আর দরজার রঙ একই হওয়ায় আলাদা করা বেশ কষ্ট। এই পশ্চিমা নকশার বাড়িটা ভাড়া করার অন্যতম প্রধান কারণ নিচের তলকুঠুরিটা।
লাইটের সুইচ জ্বালিয়ে দিল মিকি। তলকুঠুরির দেয়ালগুলোয় প্লাস্টার
থাকায় লাল ইট দেখা যায়। প্রচণ্ড ঠান্ডা। রীতিমত বাষ্প বেরোয় নাক মুখ থেকে। আর ছাদ বেশ নিচু। তবে মাথা উঁচু করে হাঁটতে সমস্যা হয় না।
চারকোনা একটা জায়গা। টিমটিমে বাটার আলোয় অন্ধকার দূর তো হয়ই না, বরং আরো জমাট বাঁধে কোনার দিকগুলোতে। বেশ কয়েকটা শেলফ সারি সারি দাঁড় করানো। আগের ভাড়াটিয়া রেখে গেছে। সেগুলোতে এখন নানারকম যন্ত্রপাতি আর পুরনো জামা-কাপড় ঠাসা।
শেলফগুলোর একপাশে হিতোমির বিছানা। তাকে সন্তর্পণে সেখানে নামিয়ে রাখলো মিকি।
এসময় পেছনের শেলফ থেকে শিনিচি হিসামোতোর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “শুনছো…।”
মুখ তুলে তাকালো মিকি। শেলফে দুটো বাক্সের মধ্যখানে শিনিচির চোখ দেখা যাচ্ছে। হিতামির দিকে তাকিয়ে আছে সে।
শেলফের অন্য পাশ থেকে বিশাল একটা দেহের নড়াচড়ার শব্দ কানে এলো। শিনিচির চোখ উধাও গেল ফাঁকটা থেকে। এখন ইউকি মোচিনাগার চোখ দেখা যাচ্ছে সেখানে।
“বুড়োটার কি যেন হয়েছে,” বলে সে। “একটু দেখো তো।”
তলকুঠুরির এক অধিবাসীর ডাকনাম ‘বুড়ো’। তার আসল নাম অবশ্য দাশি কানেদা। মাথা নাড়লো মিকি। ইউকির চোখও উধাও হয়ে গেল ফাঁকা জায়গাটা থেকে। একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কানে এলো তার।
“ফাঁকা জায়গাটা অবধি চোখ নিয়ে যেতেও হাঁপিয়ে উঠি,” শেলফগুলোর পেছনের অন্ধকার থেকে বলে উঠলো ইউকি।
হিতোমির শরীরে একটা কম্বল টেনে দিল মিকি। যাদের সে কাটাছেঁড়া করে, তারা যে উত্তাপ বা শৈত্য অনুভব করে না, এটা জানা আছে তার। তবুও কাজটা করলো সে।
অনুভব যেমন করে না, অতিরিক্ত তাপ বা শীত তাদের দেহের ওপর কোন প্রভাব ফেলে না। ঠান্ডায় কখনো জমে যাবে না তাদের শরীর। ঠিক সেরকমই ক্ষুধা বা অসুখ-বিসুখ থেকেও সদা মুক্ত তারা। যাদের সে আহত করেছে, মৃত্যু তাদের ওপর করাল থাবা বসাতে পারে না সহজে। কোন অদৃশ্য ক্ষমতা দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়। মিকির ক্ষমতা।
অন্ধকারে গান গাইতে শুরু করলো ইউকি। ইংরেজি ভাষার একটা গান, সুরটা বেদনার। ইংরেজির টিচার ছিল সে, চমৎকার উচ্চারণ। তলকুঠুরিতে ভেসে বেড়াচ্ছে অপূর্ব সেই সুর।
ঘুমের মধ্যেই একবার গুঙিয়ে উঠলো হিতোমি। কি যেন বিড়বিড় করছে। তার মুখের কাছে কান নিয়ে গেল মিকি! দুটো শব্দ বাদে আর কিছু বুঝলো না।
“দাঁড়কাকটা উড়ছে…”
.
২
রিয়ারভিউ মিররের সাথে লাগানো চাবির রিংটা। তাই গাড়িটার প্রতিটা নাড়াচাড়ায় একই তালে নড়ছে।
“এখানে থাকে এমন কাউকে চেনো?” ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা তরুণ জিজ্ঞেস করলো।
বিচলিত ভঙ্গিতে মাথা কঁকালাম আমি। অচেনা একজনের গাড়িতে উঠে বসতে এমনিতেও অনেক সাহসের দরকার হয়েছে। কিন্তু আমার গন্তব্য যেখানে, সেখানে প্রতিদিন মাত্র দুটো বাস যায়। দুর্ভাগ্যবশত কায়েদি শহরের উদ্দেশ্যে দিনের দ্বিতীয় বাসটাও রওনা হয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। তাই অন্য কারো গাড়িতে লিফট নেয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
চাবির রিংটা থেকে চোখ ঘুরিয়ে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকালাম। পাহাড় খুব কাছেই, পেঁচিয়ে উপরে উঠে গেছে রাস্তা। মৃত ঘাসে ছাওয়া ঢালগুলো দেখে মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠলো।
সিডার গাছে ভর্তি একটা জায়গায় থামলাম আমরা। সামনে হলুদ সাদা ক্রসিং গেইট। রেলগাড়ি যাবে।
আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে লোকটা অনেকক্ষণ ধরে, কিন্তু ভয় পাচ্ছি। অপরিচিত কারো সাথে কিভাবে স্বাভাবিক হতে হয়, জানি না। .
সে যেহেতু আমাকে তার গাড়িতে করে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে, তাই এভাবে চুপ করে থাকাটাও ভদ্রতার মধ্যে পড়ে না। কি নিয়ে কথা বলবো ভাবতে লাগলাম। আমার তো বলার মত কোন গল্প নেই। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেছে, তাই অতীতের কিছু যে বলবো তা সম্ভব নয়। আর গত কয়দিনে এমন কিছু ঘটেনি যেটা নিয়ে অপরিচিত কারো সাথে আলাপ করা যাবে। এখন সে যদি অতীত নিয়ে বেকায়দা কিছু জিজ্ঞেস করে বসে, জবাব দিতে পারবো না। তাছাড়া নেহায়েত দরকার না পড়লে কাউকে আমি দুর্ঘটনার কথাটা বলি না।
