তার সামনে ম্যাপটা খুলে শহরে পৌঁছবার দ্রুততম পথটা দেখিয়ে দিল মিকি। এরপর জিজ্ঞেস করলো কেবল এই উত্তরটাই জানার ছিল কিনা তার। দু’বার চোখের পলক পড়লো।
মেয়েটাকে বিদায় জানিয়ে উঠে পড়লো মিকি। ঘুরতে যাবে এসময় প্রবলভাবে কেঁপে উঠলো মেয়েটার চোখজোড়া। যেন তাকে জিজ্ঞেস করতে চাইছে, এখন কি হবে আমার?
মিকি আমলে নিল না প্রশ্নটা। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে মোটর সাইকেলে চেপে বসলো। মেয়েটার গাড়ির ইঞ্জিন এখনও চালু। প্যাসেঞ্জার সিটের জানালা দিয়ে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল সে। এরপর যা যা
স্পর্শ করেছে সবখান থেকে নিজের হাতের ছাপ মুছে ফেললো।
পরদিন আবারো জায়গাটায় এলো সে। গাড়িটা এখনও আগের মতনই আছে। নিচে মেয়েটাকে দেখতে গেল সে।
এখনও বেঁচে আছে তরুণী। মিকিকে দেখে স্বস্তির একটা হাসি ফুটলো তার মুখে।
মিকি জিজ্ঞেস করলো যে ঠিক আছে কিনা।
দুবার চোখের পলক পড়লো। ঠিক আছে।
তার বুকের গর্তের দিকে তাকালো মিকি। হৃৎপিণ্ডটা এখনও ধুকপুক করছে। ক্ষতস্থান দিয়ে রক্তপাত হয়নি বলতে গেলে।
একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলো মিকি। এখনও সেভাবে জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েনি, কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এখন তাপমাত্রা সবচেয়ে কম। কিন্তু মেয়েটা সেই ঠান্ডা অনুভবের কোন লক্ষণই দেখাচ্ছে না। তার চেহারা আর ঠোঁট ফ্যাকাসে হয়ে এসেছে কেবল, কিন্তু ফ্রস্টবাইটের অন্য কোন লক্ষণ নেই।
মিকি জিজ্ঞেস করলো যে তার ঠান্ডা লাগছে কিনা। কিছুক্ষণ ভেবে একবার চোখের পলক ফেললো মেয়েটা।
তার পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে নাম ঠিকানা জেনে নিল মিকি।
পরবর্তী তিনদিন সেখানে এসে মেয়েটার সাথে কথা বলে সে। প্রতিবারই চলে যাবার সময় একাকী একটা দৃষ্টি ভর করে মেয়েটার চেহারায় চতুর্থ দিন এসে গাড়িটাকে আর পেলো না মিকি।
সেদিন মিকিকে দেখে দীর্ঘ একটা সময় তাকিয়ে থাকলো মেয়েটা, যেন কিছু বলতে চায়। এরপর চোখ দিয়ে বুকের দিকে ইশারা করলো। কাছাকাছি গিয়ে উঁকি দিয়েই পেছনে সরে এলো মিকি। একটা সাপ আশ্রয় নিয়েছে মেয়েটার বুকের গর্তে। ওকে দেখে লাল জিহ্বা বের করে হিস হিস করলো কয়েকবার। এখনও নিশ্চয়ই উষ্ণ মেয়েটার দেহ। সেজন্যেই তার হৃৎপিণ্ডের ওপরে শীতনিদ্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে সাপটা।
সরীসৃপটাকে ভেতর থেকে বের করে আনলো মিকি। এরপর একটা ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে ফুটো করে দিল হৃৎপিণ্ডটা। যেন ঘুমে ঢলে পড়ছে, এমন ভঙ্গিতে বুজে আসলো মেয়েটার চোখ। শ্বাস নেয়া বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েকদিন পর মেয়েটার মৃতদেহ আবিষ্কারের খবর ছাপা হলো স্থানীয় খবরের কাগজে।
সেদিন কেন মেয়েটাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিয়েছিল সেটা নিয়ে খুব বেশি ভাবেনি মিকি। পোকাগুলোর শরীরে যে কারণে পিন ফোঁটাতে, সেই কারণেই ধাক্কা দিয়েছিল হয়তো। সে ক্ষমতা আছে তার।
তাছাড়া ধাক্কা দেয়ার পর কি হয় সেটা জানার কৌতূহলও একটা ভূমিকা পালন করেছে।
*
মিকির কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েটা।
স্টাডিরুমের ডেস্কে রাখা ফোনটা বেজে উঠলো এসময়। উঠে গিয়ে রিসিভারটা কানে দিতেই ওপাশ থেকে তার সম্পাদকের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
“আপনার পরবর্তী গল্পের জন্যে অপেক্ষা করছি।”
মিকির কাছে মনে হলো আসলে গল্প চাওয়ার জন্যে নয়, বরং সে বেঁচে আছে কিনা তা জানার জন্যে ফোন দিয়েছে লোকটা। এমন না যে ও কয়েকদিন পরপর গল্প দেয়। লেখালেখি তার মূল পেশা নয়, বরং শখের ঘোরেই রূপকথা লেখে। সম্পাদকের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করে তা-ও নয়। কোন গল্প লেখা শেষ হলে তখনই যোগাযোগ করে মাত্র।
দ্বাদশ শ্রেণিতে থাকার সময় তার লেখা একটা রূপকথা বেশ বড়সড় পুরষ্কার পায়। ছোটবেলায় তার বান্ধবীকে বলা গল্পগুলোর একটারই লিখিত রূপ ছিল সেটা।
তার লেখা প্রথম গল্পটা ছিল একটা কাক আর এক অন্ধ মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটার জন্যে শহর থেকে চোখ যোগাড় করে আনতে কাকটা।
দ্বিতীয় গল্পটা এক ডাক্তারকে নিয়ে, যে রোগীদের পিঠে জিপার লাগিয়ে দেয় অপারেশনের সুবিধার্থে। এতে প্রতিবার কাটাছেঁড়া করতে হয় না। কিন্তু একবার ভুলবশত এক নার্স জিপারটা বন্ধ করতে ভুলে যায়, ফলে সেই রোগীর ভেতরের সবকিছু বাইরে বেরিয়ে আসে।
তার তৃতীয় কাজটার নাম ‘দ্য কালেক্টেড ব্ল্যাক ফেয়ারি টেইলস’। পাঠকমহলে বেশ ভালো সাড়া ফেলে বইটা। লেখক হবার ইচ্ছে কখনোই ছিল না তার। ভেবেছিল কয়েকটা গল্প লেখার পরই আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, কিন্তু গল্পগুলো একের পর এক আসতেই থাকে।
“আমরা কি দেখা করে কথা বলতে পারি এবারে?”
জবাবে চুপ করে থাকলো মিকি। প্রকাশকদের সাথে খুব সহজে দেখা করে না সে। কোন সাক্ষাৎকার বা সাহিত্য আলোচনাতেও যায় না। রূপকথার গল্প লেখে সেগুলো যথাস্থানে পাঠিয়ে দেয়। খুব বেশি কাঁটাছেঁড়া ছাড়াই প্রকাশিত হয়ে যায়, বদলে প্রাপ্য সম্মানী পায় সে। এটুকুই।
অনেকেই বলাবলি করে যে শান মিকি নামে আসলে কোন লেখকের অস্তি ত্বই এই। এসবে তার কিছু যায় আসে না।
রিসিভার নামিয়ে রাখলো সে। কাউচের মেয়েটাকে কোলে তুলে নিয়ে স্টাডি থেকে বেরিয়ে গেল। ওজন খুব বেশি না মেয়েটার, বড়জোর দশ কেজি। প্রথমবার শহরে তার সাথে দেখা হয়েছিল মিকির। বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। নাম হিতামি আইজাওয়া।
