বিড়ালটা বুঝতেও পারেনি যে মিকি তাকে দু’ভাগ করে ফেলেছে। কিছুক্ষণ পর পেছনে পা চাটতে গিয়ে অসঙ্গতিটা চোখে পড়ে তার। খুব বেশি রক্তও ঝরেনি। ক্ষুধা আর তৃষ্ণার অনুভূতি বহাল তবিয়তে আছে। যে খাবারগুলো খায় সেগুলো একটু পরেই কাটা পেট দিয়ে বেরিয়ে আসে। তবে পরবর্তী এক সপ্তাহে তার শারীরিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে আসে এবং এক পর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
আরেকটা বিড়াল নিয়ে এসে পরীক্ষা করে মিকি। তবে এই বিড়ালটা বাঁচে দুই সপ্তাহ, কোন প্রকার খাবার বা পানীয় ছাড়াই।
বান্ধবীকে নিজের এই আবিষ্কারের কথা জানানোর জন্যে উদগ্রীব হয়ে ওঠে মিকি। হাসপাতাল থেকে চলে গিয়েছে সে কিছুদিন আগে। তবে বাসা খুব বেশি দূরে নয়। সাইকেলে করে যেতে আধঘণ্টার মত লাগে।
তার বাসার সামনে সাইকেলটা রেখে দরজায় কড়া নাড়লো মিকি। দরজা খুলে দেয় মেয়েটার মা। একরম নিস্পৃহ কণ্ঠেই পরবর্তী কথাগুলো বলেন তিনি। “গত পরশু দিন মারা গেছে ও। সিঁড়ির রেলিং বেয়ে নিচে নামতো সবসময়। কিন্তু আগে হাত ঠিক ছিল তাই ভারসাম্য রক্ষা করতে সমস্যা হতো না। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পরে ও প্রায়ই ভুলে যেত যে কনুইয়ের নিচ থেকে হাত দুটো আর নেই। তাই এবারে রেলিং বেয়ে নামতে শুরু করার পর হয়তো ভুলটা বুঝতে পারে…কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে যায়।
*
হাই স্কুলের তৃতীয় বর্ষে থাকার সময় প্রথম খুন করে মিকি।
বেশ ঠান্ডা পড়েছিল সেদিন। নিজের মোটর সাইকেলে চড়ে হাওয়া খেতে বেরিয়েছিল মিকি। কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না মনে। প্রায়ই এরকম উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াতো সে।
একটা পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠছিল ঘুরে ঘুরে। এমন সময় রাস্তার পাশে বেশ চওড়া একটা খালি জায়গা চোখে পড়ে। দুটো গাড়ি পার্ক করা যাবে সেখানে। এমনকি দু’টা ভেন্ডিং মেশিনও ছিল।
সেখানে মোটর সাইকেল থামালো মিকি। আর কেউ ছিল না আশেপাশে। রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালে নিচের চমৎকার দৃশ্য মন ভরে উপভোগ করা যায়। তবে একটু সামনে এগোলেই মোটামুটি গভীর একটা খাদ। একটা সিঁড়ি নেমে গেছে দুই রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে।
কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে নিচের দৃশ্য দেখলো সে। ছাইরঙা মেঘগুলোর প্রভাবে আশপাশের সবকিছুর মধ্যেই এক ধরনের ধূসরতার ছাপ। হেমন্তের সবুজও কিছুটা মলিন হয়ে গেছে। এসময় একটা গাড়ি এসে থামলো সেখানে। ড্রাইভিং সিট থেকে এক তরুণী বের হয়ে এসে রেলিংয়ের ধারে দাঁড়ালো। একাই এসেছে সে। পরনে বিজনেস স্যুট, হাতে মাঝারি সাইজের একটা ম্যাপ।
“আমি শহরে যেতে চাইছি যত দ্রুত সম্ভব,” মিকির উদ্দেশ্যে বললো সে। “আপনি কি একটু পথ দেখিয়ে দিতে পারবেন?” এরপর মোটর সাইকেলটা দেখে মিকিকে জবাব দেয়ার সুযোগ না দিয়েই বলে ওঠে, “আপনার বাইকটা দারুণ। কিন্তু এরকম আবহাওয়ায় বাইক চালাতে অসুবিধে হয় না? ঠান্ডা একদমই ভালো লাগে না আমার,” একবার রেলিংয়ের ঠান্ডা হাতল ধরেই পিছিয়ে গেল সে।
কিন্তু বেশিদূর পেছাতে পারলো না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জোরে ধাক্কা দিয়ে তাকে নিচে ফেলে দিল মিকি। রেলিংটা বেশ নিচু হওয়াতে, চেষ্টা করেও সেটা আঁকড়ে ধরতে পারলো না তরুণী। ধাক্কা দেয়ার পর আশপাশে তাকিয়ে মিকি লক্ষ্য করলো যে কোন প্রত্যক্ষদর্শী আছে কিনা।
এরপর নিচে তাকিয়ে দেখলো কোথায় পড়েছে মেয়েটা। প্রথমে চোখে পড়লো না। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর খেয়াল করলো যে একটা বড় গাছের ছায়ায় পাথুরে পাহাড়টা থেকে কিছুটা দূরে নিথর পড়ে আছে তরুণীর দেহ। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলো সে।
এত ওপর থেকে নিচে পড়ার পরেও বেঁচে আছে মেয়েটা। হাত পাগুলো অবশ্য বিপজ্জনক ভঙ্গিতে বেঁকে আছে। চোখ আর মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। হতভম্ব ভঙ্গিতে মিকিকে দেখছে সে। ম্যাপটা পড়ে আছে পাশেই। মিকি তুলে নিল সেটা।
একবার পেছনে তাকিয়ে ঢালটা দেখলো মিকি। নিচে একটা বেশ লম্বা পাথর। সেটাতেই নিশ্চয়ই মাথা ঠুকে গেছে মেয়েটার। অনেক ওপরে রুপালি রেলিংটা দেখা যাচ্ছে। চকচক করছে ক্ষীণ আলোতেও।
মেয়েটাকে টেনে বনের আরো ভেতরে নিয়ে এলো মিকি, যাতে ওপর থেকে কেউ কিছু দেখতে না পায়। তার ঠোঁট নড়ছিল গোটা সময়, কিন্তু কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না; গাছের একটা বড় ডাল এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছে তার বুক, সে কারণেই বোধহয়। ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে রক্তাক্ত ফুসফুস দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। একটা মোটামুটি সাইজের গর্ত সেখানে এখন। স্পন্দনরত হৃৎপিণ্ডটাও দেখতে পেল মিকি।
অবশ্য তরুণীকে দেখে মনে হচ্ছে না যে সে কোন প্রকার শারীরিক কষ্ট অনুভব করছে। বরং একটা শূন্য দৃষ্টি তার চোখজোড়ায়। এত ওপর থেকে পড়ায় শরীরের সবগুলো হাড়ি ভেঙে যাবার কথা। তাই শুধু মুখ আর চোখই নাড়াতে পারছে কোনরকমে।
সম্মতি প্রকাশের জন্যে দু’বার আর অসম্মতি প্রকাশের জন্যে একবার চোখের পাতার নাড়াবার নির্দেশ দিল তাকে মিকি।
“বুঝতে পারছেন কি বলছি?”
দু’বার নড়লো চোখের পাতা। অর্থাৎ তার কানও কাজ করছে।
এরপর সে জিজ্ঞেস করলো যে কোন প্রকার ব্যথা অনুভব করছে কিনা।
একবার চোখের পলক পড়লো। করছে না।
সে ভয় পেয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলো মিকি। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটা। এরপর ম্যাপটার দিকে ইশারা করলো চোখ দিয়ে।
