মিকি নিজেও খেলাটার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে। একটা ঘাসফড়িং ধরে এনে বাসা থেকে নিয়ে পুঁইগুলো সেটার পেটে গেঁথে দেয়। কিন্তু ঘাসফড়িংটা মরে না।
ব্যাপারটা স্বাভাবিক ভাবেই নেয় সে। ধরে নেয় যে ভাগ্যবশত সুঁই কোন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ভেদ না করেই ভেতরে ঢুকে গেছে। তাই পোকাটার গায়ে আরো তিনটা সুঁই ফোঁটায় সে।
একটা মাথায়, একটা গলায় আর একটা পেটে। তবুও নড়তেই থাকে ঘাসফড়িংটা। ছয়টা পা-ই এমনভাবে নাড়াচাড়া করছে যেন কিছুই হয়নি। মাথার ওপরের অ্যান্টেনা দুটোও নড়ছে ক্রমাগত-এদিকে শরীরের ভেতর থেকে থকথকে তরল বেরিয়ে এসেছে আগেই।
বারোতম পিনটা ফোঁটানোর পরে অবশেষে মারা গেল ঘাসফড়িংটা। তবে পুঁই আর পিনের ভিড়ে সেটাকে দেখা দায় এখন।
অন্য পোকাগুলোর ক্ষেত্রেও একই ফলাফল পেলো মিকি। একটা গুবড়ে পোকাকে দেয়ালে কয়েক বার ছুঁড়ে মারার পরেও মারা গেল না সেটা। পুরো শরীর ফেটে গেলেও মাথার শিং দু’টো ঠিকই নড়ছিল।
মিকি ধরে নেয় যে সব পোকামাকড় এরকমই হয়। একবার কেচি দিয়ে একটা ঘুঘুরে পোকাকে দু’ভাগ করে দিয়েছিল, আবার আরেকটা গুবড়ে পোকার মাথা ধড় থেকে আলাদা করে দেয়। কিন্তু প্রতিক্ষেত্রেই কিছুক্ষণ হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করে পোকাগুলো। মরতেই চায় না। সব গোঁয়ারের দল, ভাবে সে।
কিন্তু এক পর্যায়ে মিকি বুঝতে পারে যে ব্যাপারটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। অন্যান্য বাচ্চারা খুব সহজেই পোকাগুলোকে মেরে ফেলে। হয়তো আমি এমন পোকাগুলোকে ধরেছি যেগুলোর জীবনীশক্তি অন্যগুলোর চাইতে বেশি, নিজেকে প্রবোধ দেয় সে। কিন্তু তার হাতের দিকে তাকানো পরে মনে হয় কি যেন একটা ঠিক নেই।
আমার ভেতরে অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে।
একবার মিকির বয়সী একটা মেয়ে ভর্তি হয়েছিল হাসপাতালে। খেলতে খেলতে তার ঘরে একদিন ভুল করে ঢুকে পড়ে সে। বন্ধুত্ব হয়ে যায় দু’জনের। প্রায়ই তার সাথে দেখা করতে আসততা মিকি।
ঘনিষ্ঠ বন্ধু খুব বেশি ছিল না মিকির। এমনকি তার সাথে পোকা ধরতে যারা, তারাও নতুন বন্ধু খুঁজে নিয়েছে। তাই প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে মেয়েটার সাথে কথা বলতে যেত সে।
মিকিকে দেখামাত্র উজ্জ্বল হয়ে উঠতো মেয়েটার চোখমুখ। নিজের ব্যান্ডেজ করা হাত দুটো মিকির উদ্দেশ্যে নাড়ে সে। অবশ্য তার দু’হাতই কনুইয়ের কাছে এসে শেষ হয়ে গেছে। রেললাইনের পাশে খেলতে গিয়ে ও দু’টো খোয়াতে হয়েছে তাকে।
“আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম যে হাতের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে গেলে কি হয়,” নিরাবেগ কণ্ঠে মিকিকে বলে মেয়েটা। “কিন্তু ওমা! ট্রেনের চাকা হাতের ওপর ওঠার পরেই অর্ধেকটুকু আলাদা হয়ে গেল!”
তার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে মিকির। বাবা আর মা’র লেকচার থেকে বিভিন্ন গল্প বানিয়ে তাকে বলতো সে।
*
একদিন জরুরি বিভাগের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল ওরা দু’জন, এমন সময় সংকটাপন্ন এক রোগীকে ভর্তি করা হয় সেখানে। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করে দু’জনই। লোকটা কতটা ব্যথা পেয়েছে, সেটা দেখাই উদ্দেশ্যে।
মিকির বাবা আর কয়েকজন নার্স তাড়াহুড়ো করে প্রস্তুতি নিয়ে প্রবেশ করে ভেতরে। সেসময় এক ফাঁকে রোগীকে দেখার সুযোগ পায় মিকি। কম বয়সী এক তরুণ, সারা শরীরে দৃশ্যমান কোন ক্ষত নেই।
কিন্তু অপারেশন চলাকালীন সময়ে মারা যায় সে।
“খুব খারাপ একটা জায়গায় ব্যথা পেয়েছিল, মিকির বাবা বলেন পরবর্তী সময়ে। সাইকেল থেকে পড়ে গিয়েছিল ছেলেটা।
“খারাপ জায়গা আবার কোনটা?” মিকির বান্ধবী জিজ্ঞেস করে। সেই জায়গাটা ঠিক থাকলে সবাই বেঁচে থাকবে?”
“কারো কি এমন ক্ষমতা থাকতে পারে যে সে কাউকে আহত করার সময় অবচেতন ভাবেই ঐ খারাপ জায়গাগুলো এড়িয়ে যায়?”
“কি জানি ভাই,” মেয়েটা হাত ভাঁজ করার ভঙ্গি করে জবাব দেয়। তবে তার হাত দুটো কনুইয়ের কাছাকাছি এসে শেষ হয়ে যাওয়ায় সে আর পুরোপুরি হাত ভাজ করতে পারবে না কখনোই।
*
এরপর মিকি ঘাসফড়িং ধরে এমনভাবে সেগুলোকে আহত করার চেষ্টা করে যাতে ওগুলো মারা যায়। প্রথমদিকে ধরা পোকাগুলো বেশ তাড়াতাড়ি মারা যেতে লাগলো। এই যেমন তাদের শরীরে বারো-চৌদ্দটা পিন ফুটালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। কিন্তু পরবর্তীতে ধরা পোকাগুলো আরো বেশি সময় ধরে বেঁচে থাকলো।
তার ধরা একদল গুবড়ে পোকার নিচের অর্ধেকটুকু শরীর থেকে আলাদা করে দেয়ার কয়েক সপ্তাহ পরেও সেগুলো দিব্যি বেঁচে রইলো। এরপর ধুকে ধুকে মারা গেল কিছুদিনের মধ্যে। কিন্তু মাথা পিষে ফেললে বা কেটে ফেললে সাথে সাথেই মারা যায়।
একটা ব্যাঙ ব্যবচ্ছেদ করলো মিকি, একটা মাছ কেটে ভেতর থেকে সব কিছু বের করে পানিতে ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ এমন ভঙ্গিতে সাঁতার কাটলো ওগুলো যেন কিছুই হয়নি। ব্যাঙটার ক্ষতস্থান থেকে অবশ্য নাড়িভুড়ি বেরিয়ে এসে পানিতে ভাসছে লম্বা সুতোর মতন।
চারপেয়ে জন্তুদের ওপরেও পরীক্ষা করলো মিকি। একটা বিড়ালকে ফাঁদ পেতে ধরলো সে। এরপর হাসপাতালের পেছনে খালি জায়গাটায় নিয়ে মাঝামাঝি ছুরি দিয়ে কেটে অর্ধেক করে ফেললো। কিন্তু বিড়ালটা মরলো না। নিজের সম্পর্কে আরেকটা অদ্ভুত তথ্য আবিষ্কার করলো মিকি। সে যেসকল প্রাণীর অঙ্গহানি করে, তারা কোন প্রকার ব্যথা বা কষ্ট অনুভব করে না।
