কাজুয়াকে ধাক্কা দিয়েছে গাড়িটা। কত জোরে ধাক্কা দিয়েছে, সেটা ছবিগুলো দেখে বলা সম্ভব না। কিন্তু এ মুহূর্তে নিথর ভঙ্গিতে রাস্তায় পড়ে আছে সে। একটুও নড়ছে না। দৃষ্টি আকাশের দিকে।
চোখের উত্তাপ কমে এলো এসময়। ধীরে ধীরে স্বপ্নটা মিলিয়ে গেল। কিন্তু সংঘর্ষের ঠিক পরমুহূর্তে গাড়িটার পেছন দিকে গাছের আড়ালে কাউকে লুকিয়ে থাকতে দেখেছে কাজুয়া, এটা নিশ্চিত।
স্বপ্নটা শেষ হয়েছে অবশেষে। দু’চোখ দিয়ে পানি ঝরছে আমার। নিশ্চয়ই ধাক্কা লাগার পরমুহূর্তেই মারা যায় কাজুয়া। একটা গাড়ির সাথে সংঘর্ষে মৃত্য হয় তার। কিন্তু এটা সাধারণ কোন দুর্ঘটনা না।
হিতামিকে দেখেছিল কাজুয়া। আমার যদি ভুল না হয়, তাহলে হাত পা কেটে ফেলা হয়েছে মেয়েটার। কিন্তু টিভিতে যে ছবিটা দেখিয়েছে সেখানে একদম স্বাভাবিক ছিল সে।
কাজুয়া দেখেছে কোথায় আটকে রাখা হয়েছে মেয়েটাকে। তাকে বাঁচানোর চেষ্টাও করে, কিন্তু অপহরণকারীর কাছে ধরা পড়ে যায়।
নিষ্ফল এক ক্রোধে ফুঁসতে লাগলাম আমি। যে লোকটা হিতোমিকে অপহরণ করেছে, সে-ই এক প্রকার খুন করেছে কাজুয়াকে। কিন্তু সবাই নিশ্চয়ই ধরে নিয়েছে যে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে সে। এই ভাবনাটা রীতিমত অসহ্য ঠেকছে আমার কাছে।
সাওরির কি অবস্থা হয়েছিল খবরটা শোনার পর? কতগুলো স্বপ্নের অকালমৃত্যু ঘটেছে কাজুয়ার মৃত্যুর সাথে?
স্থানুর মত দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। স্বপ্নটা শেষ হবার পর আমার বাঁ চোখের দৃষ্টি আবার স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। এখন আমার শরীরেরই একটা অংশ ওটা। মনে হচ্ছে যেন কিছুক্ষণ আগে চোখটার গরম হয়ে ওঠা আমার কল্পনা বৈ কিছু নয়।
আমাকে যেতেই হবে জায়গাটায়। হিতোমি আইজাওয়াকে যেখানে বন্দি করে রাখা হয়েছে সেই বাড়িটা খুঁজে বের করতে হবে।
২. রূপকথার গল্পকার
দ্বিতীয় খণ্ড
রূপকথার গল্পকার
মিকি স্বপ্নে দেখলো যে আকাশ থেকে বৃষ্টির মতন মানুষ ঝরে পড়ছে।
একটা বড় বিল্ডিংয়ের ছাদে দাঁড়িয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে সে। ঝরে পড়া মানুষগুলোকে একদম স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
প্রত্যেকের পরনে কালো স্যুট। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই একই পোশাক পরে আছে। আকাশ থেকে অনবরত পড়েই চলেছে একের পর এক। মেঘমুক্ত বেগুনি আকাশে ছোট ছোট তারার মত দেখাচ্ছে মানুষগুলোকে। ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তবে কারো চোখে কোন ভয় নেই।
নিচের শহরের দিকে তাকালো মিকি। অসংখ্য দেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে চারদিকে। লাল রঙ্গে রাঙিয়ে দিয়েছে গোটা শহর। আশপাশের সবগুলো ছাদ ভরে উঠেছে দুমড়ে যাওয়া শরীরে। কিন্তু মিকি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে একটা দেহও পড়েনি।
ঘুম ভেঙে গেল মিকির। উপন্যাসটার খসড়া সম্পাদনা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কয়েকটা প্রিন্ট দেয়া কাগজ পড়ে আছে মাটিতে। ওগুলো তুলে নিল সে।
– “ঘুম ভেঙেছে তাহলে?” কাউচ থেকে মাথা বাঁকিয়ে বললো কিশোরী মেয়েটা। “প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ঘুমিয়েছেন। বোর হচ্ছিলাম।”
কাগজগুলো টেবিলের ওপর গুছিয়ে রাখলো মিকি। টেবিলটা একটা অ্যান্টিক। অনেক বয়স, জটিল নকশা ভোলা গায়ে। গত ভাড়াটিয়ার রেখে যাওয়া জিনিস।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো সে। সূর্যাস্তের বেশি দেরি নেই। রক্তিম আকাশের নিচে সবুজ গাছগুলোকে কালো দেখাচ্ছে এখন। পর্দা টেনে দিল মিকি। এগুলোও তার নিজের নয়, আগের কারো। পর্দাগুলো পুরু হওয়াতে আলো প্রবেশের সুযোগই পায়না ফাঁক গলে।
“একটা গল্প বলুন না, কাউচে একবার নড়ে উঠে বললো মেয়েটা।
“ঐ কাক আর মেয়েটার গল্প না কিন্তু। চোখ উপড়ে নেয়ার কাহিনি শুনতে শুনতে বিরক্তি ধরে গেছে। অন্য কিছু বলুন।”
কিছুদিন আগে প্রকাশিত ‘চোখের স্মৃতি’ গল্পটার কথা বলছে মেয়েটা। অবসর সময়ে এটা তাকে পড়ে শোনায় মিকি।
“আপনার ছেলেবেলার কাহিনি বলুন না,” মেয়েটা কথা বলে উঠলো আবারো। “চমৎকার বুদ্ধি দিয়েছি না? আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন অনেক দিন হতে চললো। কিন্তু এখনও আপনার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না।” একটা মৃদু হাসি ফুটলো তার চেহারায়। “শান মিকি কি আপনার আসল নাম?”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিল সে। মিকি হচ্ছে তার ছদ্মনাম।
কাউচে বসে মেয়েটার মাথায় হাত রাখলো সে। তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল স্নেহের ভঙ্গিতে। এরপর অতীত রোমন্থন শুরু করলো।
*
ওর বাবা ছিল একজন ডাক্তার। বড় হাসপাতালের সার্জন। তাই ছেলেবেলার বেশির ভাগ সময় হাসপাতালেই কেটেছে। ওটাই ছিল তাদের বাড়ি।
ছেলেবেলার কথা বলতেই তাই প্রথমে তার বাড়িতে থাকা রোগীদের কথা মনে পড়ে যায় মিকির। হাসপাতালের করিডোরগুলোতে খেলনা গাড়ি আর প্লেন নিয়ে দৌড়ে বেড়াতে সে। কেবিনে শুয়ে কোকাতে থাকা নানা বয়সী লোকজন ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। কারো হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ করা আবার কারো পা প্লাস্টার করে স্ট্যান্ডের সাথে ঝোলানো। তাকে দেখলে সবসময় শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো রোগীরা।
গ্রেড স্কুলে থাকতে প্রতিবেশী কিছু ছেলের সাথে পোকামাকড় ধরতে যেত মিকি। তাদের বাড়ির পাশেই ছিল পরিত্যক্ত একটা জমি। সেটার মালিক কিছু না করেই দিনের পর দিন ফেলে রেখেছিল জায়গাটা। তাই আগাছাও জন্মেছিল মনের সুখে। সন্ধ্যাবেলা ঝিঁঝি পোকার ডাকে কান পাতা দায়। এছাড়াও গুবড়ে পোকা বা ঘাস ফড়িংয়ের কোন অভাব ছিল না। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকতে তার এক বন্ধু নতুন খেলা আবিষ্কার করে। ঘাসফড়িং ধরে সেগুলোকে সুঁই দিয়ে গুতিয়ে গুতিয়ে হত্যা করা। একটা কাঠের বোর্ডে পোকাগুলোকে গেঁথে মিকিকে দেখায় তার বন্ধু। কিছুক্ষণ আগেই গাঁথা পোকাগুলোকে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে নিথর হয়ে যায়।
