প্রথমে বুঝে উঠতে পারলাম না যে কি ঘটছে। তবে দ্রুত একটা ভাবনা ভর করলো মাথায়। হয়তো হিতোমিকে অপহরণ করে তলকুঠুরিতে আটকে রেখেছে কেউ। আর সেটা যদি সত্যি হয়, তাহলে কাজুয়া ভয়ংকর একটা ব্যাপারের প্রত্যক্ষদর্শী।
নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলাম লাইব্রেরিতে। নড়তেও পারছি না। এখন জানালার দিক থেকে চোখ সরিয়ে আশপাশের ঝোপঝাড়ে নজর রাখছে। কাজুয়া। মনে হচ্ছে যেন ওর নিঃশ্বাসের শব্দও শুনতে পাচ্ছি। সে নিশ্চয়ই ভয়ে ভয়ে আছে যে বাড়ির মালিকের চোখে পড়ে যাবে।
এই বাড়িটা যার, সে-ই কি হিতোমিকে বন্দী করে রেখেছে ভেতরে?
ঝোপগুলো থেকে বাড়ি অবধি সরু একটা নুড়ি বেছানো পথ। বাড়িটা দোতলা। চারদিকের গাছগুলোয় পাতার সমারোহ বেশ কম। অর্থাৎ শীতকাল।
কোন এক পর্যায়ে কাজুয়া পকেট থেকে একটা স্ক্রু ড্রাইভার বের করে এনেছে। হয়তো এতক্ষণ লুকিয়ে রেখেছিল ওটা। হাঁটুগেড়ে বসে জানালার চৌকাঠ পরীক্ষা করতে শুরু করলো সে।
মেয়েটাকে এখান থেকে উদ্ধার করতে এসেছে সে।
কিন্তু জানালাটা একটা দেয়ালের সাথে শক্ত করে আটকানো। খোলার মত স্কু নেই। আরেকবার সাবধানী চোখে আশপাশে নজর বুলিয়ে জানালা আর দেয়ালের মাঝে যে সরু জায়গাটা আছে সেখানে ক্রু ড্রাইভারটা প্রবেশ করালো সে। মনে হচ্ছে চাপ প্রয়োগ করে খোলার চেষ্টা করবে।
হঠাই থমকে গেল সে। কিছু একটা নজরে এসেছে। এক সেকেন্ড পর আমিও খেয়াল করলাম ব্যাপারটা।
হিতোমি আইজাওয়া মেঝে থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তবে তার চেহারার এক পাশ দেখা যাচ্ছে এখন কেবল। অন্য পাশটা ঠেস দিয়ে আছে মেঝের সাথে। তার পোশাকগুলোও অদ্ভুত। আসলে সেটাকে পোশাক বললেও ভুল হবে, বরং বস্তা বলা ভালো। এমনভাবে একটা বস্তায় ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে তাকে যে শুধুমাত্র চেহারাটাই দেখা যাচ্ছে। গলার কাছটায় বস্তাটা একটা দড়ি দিয়ে বাঁধা।
কিন্তু বস্তার আকৃতিটা কেমন যেন। হঠাই ভয়ঙ্কর একটা চিন্তা খেলে গেল আমার মাথায়। এতটাই ভয়ঙ্কর যে সেটা বাস্তব কিনা তা ভাবতেও আঁতকে উঠছি। অন্ধকারের কারণে প্রথম দিকে হিতোমির পুরো শরীর দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি যে বস্তাটায় একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে কোনভাবেই আটানো সম্ভব না। একবার মনে হলো পা দুটো ভাঁজ করে বুকের কাছে চেপে রেখেছে সে, কিন্তু সেটাও অসম্ভব। কারণ তেমনটা হলে ফুলে থাকতো বস্তাটা। আমার বাঁ চোখ দিয়ে যে মেয়েটাকে দেখছি তার, কেবল শরীরের ঊর্ধ্বাংশটুকুই আছে। এটা কিভাবে সম্ভব? চিন্তাটা প্রচণ্ড অস্বস্তিদায়ক।
একমাত্র তার হাত পা কেটে ফেলা হলেই এভাবে বস্তায় ঢুকিয়ে রাখা সম্ভব। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলাম।
এসময় ভীষণভাবে নড়ে উঠলো কাজুয়ার দেহ। হঠাৎই জানালাটার কাছ থেকে দৌড়ে পালালো সে। বাড়িটার এক পাশে গিয়ে আত্মগোপন করলো। নীল দেয়ালের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছে যেন। এসময় একটা ছায়া দেখতে পেলাম দেয়ালের অন্যপাশটায়। কেউ একজন আসছে।
নিঃশ্বাস নেয়ার শক্তিও যেন হারিয়ে ফেলেছি।
ধীরে ধীরে পেছনে এগোতে লাগলো কাজুয়া। হাতের ক্রু ড্রাইভারটা পকেটে ঢোকানোর জন্যে নিচের দিকে তাকাল একবার। এসময় দুর্ভাগ্যের সম্মুখীন হতে হলো তাকে। হাত থেকে ছুটে গেল জিনিসটা।
একটা কংক্রিটের তৈরি ড্রেনের ওপরে দাঁড়িয়ে ছিল সে। ড্রেনের ঢাকনাটা ভোলা, ভেতরে শুকনো পাতার ছড়াছড়ি। ক্রু ড্রাইভারটা যদি পাতাগুলোর ওপর পড়তো তাহলে কোন শব্দ হতো না। কিন্তু ভেতরে পড়ার আগে ওপরে কংক্রিটে একবার তো খেল ধাতব অংশটা। স্বপ্নগুলোয় কোন শব্দ শুনতে পাই না, বলেছি আগেই। তবুও আমার মাথায় যেন তারস্বরে বেজে উঠলো সাইরেন।
এবার ঝেরে দৌড় লাগাল কাজুয়া। পেছনের গাছ গাছালির জঙ্গল ফেলে ঢাল বেয়ে নামতে লাগলো। চারিদিকে শুকনো পাতা পড়ে আছে। সেগুলো মাড়িয়ে শব্দের তোয়াক্কা না করেই ছুটে চলেছে সে।
একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে দেখে নিল। এক ঝলকের সেই দৃষ্টিতে মনে হলো কেউ একজন পেছন পেছন ছুটছে। তার চেহারা বা উচ্চতা অবশ্য বোধগম্য হলো না। কিন্তু ধাওয়া করছে, সেটা নিশ্চিত।
শরীর রীতিমত কাঁপছে আমার এখন। শেলফটা ধরে ভারসাম্য রক্ষা করলাম।
গাছের ফাঁক ফোকর দিয়ে তীরবেগে ছুটছে কাজুয়া। মাটি থেকে বেরিয়ে থাকা শেকড়গুলো সাবধানে এড়িয়ে যাচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্যেও থামার জো নেই। বনটা যেন শেষই হচ্ছে না। একটা গাছ পেরুলেই, আরেকটা সামনে এসে পড়ছে। চিরকাল এরকমই চলবে মনে হলো।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর দৃশ্যপট বদলে যেতে লাগলো। ছোট পাতাহীন গাছের বদলে এখন লম্বা লম্বা চিরহরিৎ গাছ চোখে পড়ছে। সেগুলোর ফাঁক দিয়ে দৌড়ে চললো সে।
এ সময় হঠাৎই বাম চোখের দৃষ্টিটা একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল। খাড়া ঢালে নিশ্চয়ই পা হড়কে গেছে কাজুয়ার। গড়িয়ে নিচে পড়তে লাগলো সে। চারদিকে পাতা আর ধুলোর ঝড় উঠেছে রীতিমত। হঠাই বন থেকে খালি জায়গায় বেরিয়ে এলো গড়তে গড়তে। উঠে দাঁড়ালো হাচড়ে পাঁচড়ে। পায়ের নিচে পিচঢালা রাস্তা এখন। সামনে তাকাতেই জমে গেল একদম। একটা সাদা গাড়ি এগিয়ে আসছে ভয়ানক গতিতে। সরে যাবার সময় নেই।
লাইব্রেরিতে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। বাম চোখের দপদপানি বেড়ে গিয়েছে আবারো।
