সিটি লাইব্রেরিতে গত তিন বছরের খবরের কাগজ জমিয়ে রাখা হয়। কিন্তু সেই পাতাগুলোয় ঠিক কি খুঁজবো তা তো জানি না। তাই বিশাল শেলফটার সামনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কবে মারা গেছে কাজুয়া? ভাবতে লাগলাম।
কেউ যদি চক্ষুদান ফরমে সই করে যায়, তবে তার মৃত্যুর পরপরই মৃতদেহ থেকে চোখজোড়া তুলে নেয়া হয়। আর সেই চোখগুলোর নতুন মালিক পেতেও খুব বেশি সময় লাগে না। সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতিস্থাপিত করা হয়। তাই ঠিক করলাম যে আমার চোখের অপারেশনের আগের খবরের কাগজ থেকে দেখা শুরু করবো। কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস আগের খবর দেখলেই হবে।
অপারেশন হয় ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে। তার আগের দিন থেকে সাবধানে পাতা উলটে দেখে যেতে লাগলাম।
সড়ক দুর্ঘটনায় মৃতদের নাম এবং শোক সংবাদের কলামে যাদের নাম ছাপা হয়েছে ওগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। সবক্ষেত্রেই নামের পাশে একটা সংখ্যা দেয়া, মৃতের বয়স।
কাজুয়া যখন মারা যায় তখন তার বয়স কত হয়েছে তা ভাবার চেষ্টা করলাম। স্মৃতিগুলোতে সাওরির মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়তে দেখিনি কখনো, অর্থাৎ চোখটা তাকে বৃদ্ধ অবস্থায় দেখেনি। এমনকি সাওরিকে মাঝবয়সীও মনে হয়নি কোন স্মৃতিতে। এ থেকে ধারণা করা যায় তুলনামূলক কম বয়সেই মারা গেছে কাজুয়া।
স্মৃতিগুলোতে সাওরিকে সবচেয়ে বয়স্ক অবস্থায় যখন দেখেছি, তখনও তার বয়স খুব জোর পঁচিশের আশেপাশে হবে বলে মনে হয়েছে। আমার হিসেব ঠিক হলে কাজুয়া মারা গেছে বিশের কোঠায়।
দু’ঘণ্টা ধরে লাইব্রেরির খবরের কাগজগুলো ঘেটে চললাম। আমার চোখের ওপর চাপ পড়ছে একটানা ছোট ছোট লেখার কলামগুলো দেখার জন্যে। কিছুক্ষণের জন্যে বিরতি নিলাম একটু পর। একভাবে চিন্তা করলে আমি আমার বাম চোখটাকে নিজের মৃত্যুর খবর খুঁজতে বাধ্য করছি। আপাতদৃষ্টিতে নিষ্ঠুর একটা কাজ।
পাতা উল্টেই চললাম একের পর এক। কিন্তু কাজুয়া ফুইয়ুতসুকির নাম খুঁজে পেলাম না। এমনটাও হতে পারে যে ইতোমধ্যে যে খবরের কাগজগুলো দেখে ফেলেছি সেগুলোর কোনটায় তার নাম আছে, তবে সে সম্ভাবনা নিতান্তই কম। কাজুয়ার বসবাস ভিন্ন অঞ্চলে, সুতরাং এখানকার স্থানীয় পত্রিকায় তার নাম হয়তো ছাপাই হয়নি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাল ছেড়ে দিলাম এক পর্যায়ে।
খবরের কাগজগুলো নিয়ে বুক শেলফে নির্ধারিত স্থানে গুছিয়ে রাখার জন্যে উঠলাম। একটা নির্দিষ্ট ক্রমানুযায়ী রাখা হয় ওগুলো, তাই জায়গাটা খুঁজে বের করতে হলে আগে।
এমন সময় চোখে পড়লো ছবিটা। শেলফে গাট্টি করে রাখা একটা খবরের কাগজের বান্ডিলে দৃষ্টি আটকে গেল। গত বছরের কাগজ এগুলো।
একটা হারানো বিজ্ঞপ্তি। পাশে নিখোঁজ মেয়েটার ছবি। প্রতিবেদনটা অবশ্য পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে না। নেহায়েত ভাগ্যের জোরে ছবিটা চোখে পড়েছে। খবরের কাগজটা বের করে আনলাম বান্ডিল থেকে বড় বড় অক্ষরে ‘চৌদ্দ বছরের কিশোরী নিখোঁজ’ লেখা। এর নিচে প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে- গতকাল, হিতোমি আইজাওয়া বান্ধবীর বাড়ি থেকে বের হয়ে আর বাসায় ফেরেনি…’
ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছে স্কুল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। কোথায় যেন দেখেছি আগে।
হঠাৎই গরম হয়ে উঠলো আমার বাম চোখ। দপদপ করছে। যেন যে কোন মুহূর্তে ফেটে পড়বে।
কিছুদিন আগে মা’র সাথে টিভি দেখার সময়ে একই অনুভূতি হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানেও নিখোঁজ ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে কথা বলছিল সঞ্চালক।
আরে তাই তো! এই মেয়েটার ছবিই দেখেছিলাম টিভিতে। খবরের কাগজের ছবিটা থেকে চোখ সরাতে পারছি না কেন যেন।
বাম চোখের দপদপানি আরো বেড়েছে। মনে হচ্ছে যেন চোখের শিরার রক্তগুলো উল্টোদিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
এই স্মৃতিটার সাথে ভয়ঙ্কর কোন কিছুর সম্পর্ক আছে। কি আবোল তাবোল ভাবছি। চোখ সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না।
একদম বাচ্চা বাচ্চা একটা চেহারা।
চোখ দুটো নড়ে উঠলো এ সময়।
স্বপ্নটা শুরু হয়েছে। স্মৃতির বাক্স খুলে একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠতে শুরু করেছে মনে। এক্ষেত্রে হিতমির ছবিটা ট্রিগার হিসেবে কাজ করেছে। সবসময়ের মতোই, পুরো দৃশ্যটা দেখতে হবে আমাকে।
চোখ বন্ধ করে নিলাম। কাজুয়ার দেখা দৃশ্যগুলো আরো পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠলো।
একটা মেয়ের চেহারা দেখা যাচ্ছে কাজুয়া থেকে কিছুটা দূরে। হিতেমি। জানালার অপর পাশে মেঝেতে শুয়ে আছে সে। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। একবার চোখের পলক পড়লো মেয়েটার।
আশপাশে একবার তাকালো কাজুয়া। ঘন বনের ভেতরে একটা বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে। পশ্চিমা নকশার বাড়িটা নীল ইটে তৈরি। কাজুয়া হয় কোন এক পাশে অথবা বাড়িটার পেছন দিকে দাঁড়ানো।
আবারো হিতোমি আইজাওয়ার দিকে দৃষ্টি ফেরালো সে। জানালাটা তার পায়ের কাছে, নিচের দিকে। নিশ্চয়ই কোন তলকুঠুরির জানালা। চারকোনা, ময়লা লেগে আছে চারপাশে। ঘরটা বেশ অন্ধকার হওয়াতে খুব বেশি কিছু দেখা যাচ্ছে না। কেবল বাইরের আলোতে মেয়েটার চেহারা কিছুটা আলোকিত হয়ে আছে।
মনে অবিশ্বাস নিয়ে স্বপ্নটা দেখে চলেছি আমি। নিখোঁজ মেয়েটা এরকম একটা তলকুঠুরিতে কি করছে? কাজুয়া তার দিকে তাকিয়ে আছে কেন?
