তার সাথে দেখা করতে চাই আমি। জানি না যে দেখা হলে কি বলবো, কিন্তু সামনা সামনি তার চেহারাটা তো দেখতে পাবো। ভাবনাটা জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে রইলো আমার বুকের ওপর।
বাম চোখে যা দেখছি সেগুলো স্বপ্ন নয়, স্মৃতি-এটা জানার পরেও দৃশ্যগুলো নিয়মিত দেখতে থাকলাম বাম চোখে। একদিনে পাঁচটাও দেখেছি একবার। প্রতিবারই আমার বামচোখটা গরম হয়ে ওঠে আর সিনেমার চাকাটা ঘুরতে শুরু করে। একজনের সাধারণ মানুষের জীবনকাহিনি দেখতে থাকি আমি।
তবে একই দৃশ্য দু’বার কখনো দেখিনি। খুবই মনোযোগ দিতে হয় এজন্যে। নতুবা খুঁটিনাটি অনেক তথ্য দৃষ্টি এড়িয়ে যাবে। সবকিছু যথাসম্ভব মগজে গেঁথে নেই।
স্বপ্নগুলো (এতদূর যখন স্বপ্ন বলেছি, তাই স্বপ্নই বলবো ওগুলোকে) কখনো ক্লান্ত করে না আমাকে। বরং তেষ্টা আরো বাড়িয়ে দেয়। যা যা সম্ভব জানার চেষ্টা করি ওগুলো থেকে। আর প্রতিটা স্বপ্নের সাথে কাজুয়া ও সাওরির প্রতি আমার ভালোলাগার মাত্রাটাও বাড়তে থাকে।
সেই সাথে বাবা-মা আর স্কুলের সহপাঠীদের সাথে দূরত্বটাও বেড়ে চলে প্রতিনিয়ত।
একদিন মা আমাকে জিজ্ঞেস করে, “সমস্যা কি তোমার? স্কুল থেকে ফোন দিয়েছিল। তুমি নাকি গত কয়েকদিন ধরে অনুপস্থিত।”
এই সময়গুলোতে কফিশপে বসে বই পড়ি আমি। মাঝে মাঝে লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে থাকি। একদিন সারা বিকেল পার্কের পুকুরে হাঁসগুলোকে খাবার খাইয়ে কাটিয়েছি।
ভীষণ অপরাধবোধ হয় আমার। কিন্তু স্কুলে যেতে বড় বেশি ভয় কাজ করে। তা সত্ত্বেও স্কুলে চলে গিয়েছিলাম একদিন, কিন্তু গেটের কাছে যাওয়া মাত্র পা যেন একশো মণ ওজনের হয়ে যায়। এক পা-ও সামনে এগোতে পারি না।
আমি নিশ্চিত যে নামি কখনো এরকম কোন সমস্যাঁতেই পড়েনি। এক দৌড়ে ক্লাসরুমে ঢুকে গিয়ে সহপাঠীদের সাথে হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠতো সে। কিন্তু সেই ক্লাসরুমে আমার কোন জায়গা নেই। আমার কোনখানেই কোন জায়গা নেই।
“স্কুলে যাও না কেন তুমি?” মা জানতে চাইলো কড়া সুরে। “আগে না স্কুলে যেতে কত পছন্দ করতে?”
কথাগুলো শুনে ভেতরে ভেতরে মুষড়ে পড়লাম। মনে হচ্ছে যেন তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছি, ব্যাপারটা পীড়া দিচ্ছে আমাকে।
মা নামিকে ভোলেনি। আমাকে সহ্যই হয় না তার। সে বোধহয় ভাবে যে বর্তমান আমিকে যদি আপন করে নেয়া হয়, তাহলে আগের নামির অস্তিত্ব চিরতরে মুছে যাবে।
“তোমার কি স্কুল ভালো লাগে না? আমার দিকে তাকিয়ে উত্তর দাও!”
মনে হচ্ছে কেউ যেন দু’হাতে চেপে ধরেছে আমার হৃদয়। তা সত্ত্বেও মনে সাহস জোগাড় করে মার চোখে চোখ রেখে বললাম, “আমি দুঃখিত যে স্কুলে না যাওয়ার ব্যাপারে আগে কিছু বলিনি।”
আমি ঠিকঠাকমতো পড়াশোনার চেষ্টা করেছি। পিয়ানো বাজানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনটাই আর আগের মতন পারি না। এমনকি হাসার চেষ্টাও করেছি। যা-ই করি না কেন, সবকিছুতেই মনে হয় যেন ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি। জানি সবাই আমাকে নিয়ে হতাশ। নিজেকে অপদার্থ মনে হয় থেকে থেকে।
কিন্তু ঘরের কাজে তোমাকে যতটা সম্ভব সাহায্য করি। তোমাকে ভালোবাসি আমি, মা। আশা করি তুমিও আমাকে আবার ভালোবাসবে।
কথাগুলো শুনে শীতল চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো মা। এরপর একটা কথাও না বলে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। আমাদের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে তা কখনো খুঁচবার নয়।
*
পরদিন নিজের ঘরটা গোছালাম আমি। ভেতরের আসবাবপত্রগুলোর জায়গা বদলালাম। টিভি আর বিছানা জানালার পাশে নিয়ে আসলাম; এমনকি নতুন পর্দাও কিনেছি। দেয়ালে যে পোস্টারগুলো ঝোলানো ছিল, সব নামিয়ে ফেললাম। আগের নামির সব চিহ্ন মুছে গেল ধীরে ধীরে।
হুটোপুটির শব্দ শুনে ভেতরে উঁকি দিল বাবা। বইয়ের শেলফের একটা খালি জায়গা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “ইয়োকিবোর কি হলো?”
ইয়োকিররা হচ্ছে একটা টেডি বিয়ার।
“ওটা আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছি।”
“আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না! কখনো ভাবিনি যে এই দিন দেখতে হবে,” মাথা ঝাঁকিয়ে বললো সে। “এসব ভালো লাগছে না আমার।”
একবার মনে হলো যে ভুল করে ফেলেছি। পুরনো নামির মত করে আবার ঘরটা গুছিয়ে দেব নাকি সে চিন্তাও করতে লাগলাম।
আমতা আমতা করে জবাব দেয়ার চেষ্টা করছি এসময় বাবা আমার ডেস্ক থেকে বাইন্ডারটা উঠিয়ে নিল। পাতা উল্টিয়ে বললো, “এটা কি?”
ঐ বাইন্ডারটার ভেতরেই কাজুয়ার জীবনের বিস্তারিত লিখেছি আমি।
ভেতরে ভেতরে আঁতকে উঠলেও মুখটা স্বাভাবিক রেখে বললাম, “এটা হোমওয়ার্ক।”
সাথে সাথে আগ্রহ হারিয়ে বাইন্ডারটা আমাকে ফিরিয়ে দিল বাবা। ওটা হাতে পেয়ে কিছুটা সাহস পেলাম। স্মৃতিগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে মাথা উঁচু করে বললাম, “বাবা, এই ঘরটা আমি নতুন করে সাজাতে চাই। পুরনো নামির কোন জিনিসটা ভালো লাগতো, সেসব নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই।”
কিছুক্ষণ আমার বলা কথাগুলো নিয়ে ভাবলো বাবা। এরপর মাথা নেড়ে বললো, “সেটাই ভালো হবে বোধহয়।”
*
সেদিন বিকেলে লাইব্রেরিতে গেলাম কাজুয়ার মৃত্যুর ব্যাপারে কোন খবরের কাগজে কিছু ছাপা হয়েছে কিনা সেটা দেখতে।
সে কিভাবে মারা গেছে তা জানি না। এটাও জানি না যে কবে মারা গেছে। তাই অন্ধের মত খবরের কাগজ উল্টে কিছুই পেলাম না।
