তবে ভয় ছাড়াও আরেক ধরনের অনুভূতির অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। আকাঙ্ক্ষা। ভেতরে ভেতরে আসলে আমিও চাইছি যাতে দৃশ্যগুলো বাস্তব হয়।
এতদিন স্বপ্নে যাদের দেখে এসেছি, তারা পরোক্ষভাবে আমাকে উৎসাহ যুগিয়েছে। আমার নিজের যেহেতু কোন স্মৃতি ছিল না, হতাশার মুহূর্তগুলোতে এই স্মৃতিগুলোর আশ্রয় নিয়েছি।
কিছুটা উত্তেজনা কাজ করছে ভেতরে ভেতরে।
আমি যে পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে আছি, সাওরিও সেই একই পৃথিবীতে চলাফেরা করে। অথচ এতদিন কাল্পনিক মনে হতো সবকিছু। আমার মাথার ওপরে যে আকাশ, সাওরিও মাথা উঁচু করলে সেই আকাশই দেখতে পায়। হয়তো এ মুহূর্তে আমি যেদিকটায় তাকিয়ে আছি, সে-ও একই দিকে তাকিয়ে আছে।
বাম চোখে আমি কাজুয়ার জীবনের খণ্ড খণ্ড দৃশ্য দেখেছি। স্কুল, ট্রেন স্টেশন, কয়েক জায়গার নাম; আর স্বপ্নগুলোর যাবতীয় খুঁটিনাটি জার্নালে লিখে রেখেছি।
চেক-আপের পরদিন জার্নালটার সবকিছু আবারো মনোযোগ দিয়ে পড়লাম একে একে। কাজুয়া আর সাওরি দেশের কোন প্রান্তে থাকে, সেটা খুঁজে বের করতে খুব বেশি সময় লাগলো না।
আমার শহর থেকে বুলেট ট্রেনে চেপে যেতে আধ দিন সময় লাগবে। একটা অ্যাটলাসে জায়গাটার নাম খুঁজতে লাগলাম। একদম ছোট অক্ষরে লেখা নামটা প্রথমে এড়িয়ে গেলেও, একসময় ঠিকই পেয়ে গেলাম। সমুদ্র থেকে অনেকটা ভেতরে, পাহাড়ি একটা অঞ্চল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম পাতাটার দিকে।
কাজুয়ার বাম চোখ ঐ হাসপাতালে কি করে এলো সেটা জানতে হবে আমাকে। একমাত্র নানার কাছেই আসে সে উত্তর।
কর্ডলেস ফোনটা আমার ঘরে নিয়ে এলাম। কিন্তু কয়েকবার চেষ্টা করেও পুরো নম্বর ডায়াল করতে পারলাম না। সাহসে কুলোচ্ছে না আসলে। এর আগে কেবল একবার নানার সাথে একাকী কথা হয়েছে আমার। কি নিয়ে কথা বলেছিলাম, সেটাও ভুলে গেছি। তার প্রশ্নের উত্তর ঠিকমতো দিতে পারছিলাম না দেখে মনে মনে যে ভীষণ লজ্জিত বোধ করছিলাম-এটা মনে আছে শুধু।
অবশেষে সাহস করে ফোন দিয়েই দিলাম তাকে। কয়েকবার রিং হবার পর নানার কণ্ঠস্বর শোনা গেল অপর পাশ থেকে। আমার ফোন পেয়ে খুশিই মনে হলো তাকে। “তোমার চোখের কি অবস্থা? স্মৃতি ফিরে পেয়েছে নাকি?” তার প্রফুল্ল কণ্ঠস্বর কিছুটা শান্ত করলো আমাকে।
না, স্মৃতি ফিরে পাইনি। কিন্তু চোখ ঠিকঠাক।
কিছুক্ষণ এটাসেটা ব্যাপারে আলাপ করার পর আসলে প্রশ্নটা করলাম।
“চোখটা কোথা থেকে জোগাড় করেছি, সেটা জানতে চাও?” সাবধানী স্বরে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। “নামি, এটা তোমার না জানলেও চলবে…”
নানা পরিষ্কার করে না বললেও এটা বুঝতে সমস্যা হলো না যে চোখটা ঠিক বৈধভাবে জোগাড় করা হয়নি।
মরণোত্তর চক্ষুদান কর্মসূচির আওতায় চক্ষুদাতা তার চোখ দুটো দান করে দেয়। একটা প্রতিষ্ঠান আছে যারা এসব চোখ সংরক্ষণ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করে।
আমার নানা তার প্রভাব খাঁটিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের একজনের মাধ্যমে চোখটার ব্যবস্থা করেছেন। দুর্ঘটনায় চোখ হারানো ব্যক্তির তালিকা অনেক লম্বা। অনেক সময় কয়েক বছর লেগে যায়। উপরন্তু যারা দু’চোখই হারিয়েছে, তাদের প্রাধান্য দেয়া হয়। নানা যদি বিশেষ ব্যবস্থা না নিতেন তাহলে এত তাড়াতাড়ি চোখটা পেতাম না আমি।
এই চোখটা আসলে অন্য একজনের জন্যে বরাদ্দ ছিল। ভীষণ অপরাধবোধ হলো আমার। মনে হচ্ছে যেন একজনের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছি।
“তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছো?” নানাভাই জিজ্ঞেস করলেন।
নাহ… তবে এরকম একটা কাজ না করলেই ভালো হতো। চোখটার সাথে কাজুয়ার স্মৃতিগুলোেও পেয়েছি। সেদিক দিয়ে চিন্তা করলে আমি সৌভাগ্যবান। তবুও… এটা অন্যায়।
হঠাৎই একটা বুদ্ধি মাথায় এলো এসময়। কর্ডলেসটা কানে চেপে বললাম, “একটা অনুরোধ আছে আমার…”
“তোমার জন্যে দুনিয়া হাজির। বলো শুধু…”
আমার নিজের কাছে আইডিয়াটা ভালোই মনে হচ্ছে। কিন্তু নানাভাই করে দিতে পারেন।
“মারা যাবার পর আমি আমার চোখ জোড়া দান করে দিতে চাই।”
কয়েক সেকেন্ড কিছু বললেন না নানাভাই। নিজেরই আফসোস হচ্ছিল আমার কথাটা এভাবে বলে ফেলায়।
কিন্তু পরমুহূর্তেই তার হাসি শুনতে পেলাম ফোনের ওপাশ থেকে।
“নিশ্চয়ই! আমি ব্যবস্থা নেব।”
রক্তিম হয়ে উঠলো আমার দুই গাল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে।
ফোন রেখে দেয়ার পরেও আনন্দের অনুভূতিটা চলে গেল না। মনে মনে নানাভাইকে ধন্যবাদ দিতে লাগলাম বারবার।
*
কাজুয়া মারা গেছে। এটা শতভাগ সত্য কথা। নিশ্চয়ই মরণোত্তর চক্ষুদান ফর্মে সই করে গিয়েছিল সে। এজন্যেই তার মৃত্যুর পর চোখটা আমি পেয়েছি।
সেই চোখের মাধ্যমেই তার ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো দেখেছি। সুখস্মৃতি, দুঃস্মৃতি-সব। তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা এমন ভাবে অনুভব করেছি যেন ওগুলো আমার নিজের অভিজ্ঞতা। এমনকি তার আবেগগুলোও মাঝে মাঝে ভর করেছে আমার ওপরে।
এটা ঠিক যে স্বপ্নগুলোয় কোন শব্দ থাকে না। শুধু ছবি। তবুও তার অনুভূতিগুলো ঠিকই আমার অংশ হয়ে গেছে। কাজুয়াকে ভীষণ পছন্দ আমার। তার চোখ দিয়ে পৃথিবীটাকে দেখতে ভালো লাগে। তাই যখন বুঝতে পারলাম যে সে মারা গেছে, খুবই মন খারাপ হলো।
বাবা-মা আর ছোট ভাইকে হারিয়ে সাওরির এখন কি অবস্থা? অ্যাটলাসটা খুলে যে পাতাটায় চিহ্ন একে রেখেছিলাম সেটা দেখতে লাগলাম। এর আগেও এই একই কাজ করেছি বহুবার। আর প্রতিবারই সময়ের খেই হারিয়ে ফেলেছি।
