এর আগে সে জায়গায় একটা গর্ত ছিল কেবল। চোখটা প্রতিস্থাপনের পর আবারো পুরনো নামির চেহারা ফিরে পাই আমি। কিন্তু মিল বলতে ওটুকুই। আর কোন পরিবর্তন আসে না আমার ভেতরে। মা এখনো আগের মতনই হতাশ।
অপারেশনের পর সে বলেছিল, “এই তো আমার নামির আগের চেহারা।” একবার গালও টিপে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় রীতিমত চমকে উঠি। খুশিও হই ভেতরে ভেতরে। মা’কে এরকম হাসিখুশিই তো দেখতে চাই সবসময়।
কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় আমাদের সম্পর্ক। যখনই কোন ভুল করে বসি, যেটা আগের নামি হলে করতো না, মা’র মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। এখন যেহেতু আমার চেহারা পুরনো নামির মত, তার হতাশার মাত্রা আরো বেড়েছে।
হাতের কাজ শেষ করে কাগজগুলো একপাশে সুন্দরমত গুছিয়ে রাখলেন ডাক্তার। আমাকে পরীক্ষা করা শুরু করবেন শিঘ্রই।
আয়নার দিকে তাকাতেই আবারো গরম হতে শুরু করলো আমার বাম। চোখ, আসন্ন স্বপ্নের ইঙ্গিত। আয়নার প্রতিবিম্বটা স্বপ্নের বাক্সের চাবি হিসেবে কাজ করছে এক্ষেত্রে। অপেক্ষা করতে লাগলাম, কিন্তু স্বপ্নের দেখা নেই। সাওরি বা কাজুয়ার সহপাঠীদের চেহারা ভেসে উঠলো না বামচোখে। এখনও সাদা সিলিংই দেখছি।
না! দ্রুত হয়ে উঠলো আমার স্পন্দন। কি যেন একটা ঠিক নেই। এরপরই বুঝলাম কিরকম অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখছি। আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকলেও, আয়নায় আমার প্রতিবিম্বটা তাকিয়ে আছে ছাদের দিকে। নিজেকে আয়নায় এভাবে দেখার অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতন না।
আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়লো। বাঁ চোখের দৃষ্টিটা কিছুটা ঘোলাটে ঠেকছে। যেন পানির মধ্যে দিয়ে তাকিয়ে আছি কোথাও।
হঠাৎই পরিষ্কার হয়ে গেল সবকিছু। আসলে এক্সামিনেশন রুম না, অপারেশন থিয়েটারটা দেখছি আমি বাম চোখে। আর ওটা অপারেশনের আগমুহূর্তে অপারেটিং টেবিলে শুয়ে থাকা আমি।
বিভ্রান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে নিলাম। এবারে আরো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি সবকিছু। এই দৃশ্যটা স্বপ্নের মত দেখছি কেন আমি? এটা তো কাজুয়ার দেখা কোন দৃশ্য নয়।
অপারেশনের আগের মুহূর্তে কি ঘটেছে তা মনে করার চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, আসলেই তো! একটা কাঁচের জারের ভেতরে তরলে ভাসছিল চোখটা। তরলের কারণেই ঘোলাটে দেখাচ্ছে সবকিছু।
এগুলো কোন স্বপ্ন নয়, এগুলো হচ্ছে চোখটার স্মৃতি। আমি আজ অবধি যে দৃশ্যগুলো দেখেছি সেগুলো কোন স্বপ্ন বা ভ্রম নয়। চোখটার স্মৃতি সবকিছু। রেটিনায় চিরদিনের জন্যে জমা হয়ে আছে স্মৃতিগুলো।
“তোমাকে এতক্ষণ অপেক্ষা করানোর জন্যে দুঃখিত। শুরু করি তাহলে?”
আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার। মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে বসলাম আমি। বাঁ চোখে এখনও নিজেকে শুয়ে থাকতে দেখছি অপারেটিং টেবিলে। এতক্ষণ চেহারার ডানপাশটা দেখতে পাচ্ছিলাম কেবল, এখন বামদিকটাও পরিষ্কার। আর বাম চোখের জায়গায় একটা গর্ত।
.
৪
বাম চোখ দিয়ে এতদিন আসলে কি দেখছিলাম সেটা পরিষ্কার হয়ে যাবার পর একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম যেন। ডাক্তার সাহেব বোধহয় কিছু প্রশ্ন করলেন আমাকে, কিন্তু কিভাবে সেগুলোর জবাব দিয়েছি জানি না। কিছুক্ষণ পর চেকআপ শেষে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলাম।
আসার পথে একটা বইয়ের দোকানে থেমে হাইস্কুল এন্ট্রান্স পরীক্ষার কয়েকটা বই খুঁজলাম। অবশেষে একটা বই পেলাম যেখানে দেশের সবগুলো স্কুলের নাম আছে। কাজুয়ার পরীক্ষার খাতায় লেখা স্কুলের নামটা খুঁজতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে পেয়ে গেলাম যা খুঁজছি। কাজুয়ার স্কুলটার অস্তিত্ব আসলেও আছে।
বাম চোখে স্বপ্নটা দেখার আগে কখনো জানতাম না যে এই নামের কোন স্কুলের অস্তিত্ব আছে। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে দৃশ্যগুলো সব কল্পনা, অন্য কোন জগতের স্বপ্ন কেবল। কিন্তু এই স্কুলটার অস্তিত্ব আসলেও আছে, আমার নিজের জগতেই।
আমার বাম চোখে দেখা সবগুলো দৃশ্য যদি কল্পনাই হয়ে থাকে, তাহলে এটার ব্যাখ্যা কি? কোথাও কি স্কুলটার নাম শুনেছিলাম, এরপর অবচেতন মনে সেটা নিয়ে ভাবার কারণে স্বপ্নেও দেখেছি? না, এটা বোধহয় সম্ভব না। বরং এতে আরো প্রমাণিত হয় যে বাম চোখে যা দেখেছি সেগুলো পুরোপুরি বাস্তব।
আমার বাম অক্ষিকোটরে প্রতিস্থাপিত হবার আগে চোখটা অন্য কারো ছিল। আমি যে দৃশ্যগুলো দেখেছি, সেগুলো আদতে কাজুয়ার নিজের অভিজ্ঞতা। “স্বপ্নের জার্নাল” নামটা আসলে ভুল দিয়েছি। বরং বাস্তব অভিজ্ঞতার জার্নাল’ নাম দিলেই বেশি মানাতো।
সত্যিটা জানার পর একইসাথে কয়েক ধরনের অনুভূতি কাজ করছে আমার ভেতরে। তবে সবচেয়ে বেশি কাজ করছে বিভ্রান্তি।
আমি এতদিন ভেবে এসেছি স্বপ্নে দেখা জগতটার কোন অস্তিত্ব নেই। ভাবতাম স্বপ্নের জগতে প্রবেশ করা মাত্র এক কাল্পনিক চরিত্রের রূপ নেই আমি-কাজুয়া ফুইয়ুতসুকি। স্বপ্নগুলোকে নিজের স্মৃতিতে যত্ন করে সংরক্ষণ করেছি। আর আমার স্মৃতির কুঠুরিগুলো একদম খালি হওয়াতে, এই স্মৃতিগুলোই আঁকড়ে ধরে রেখেছি প্রাণপণে। মনে হয় যেন সবগুলো আমার নিজের অভিজ্ঞতা। নিজেকে নামি কম কাজুয়া ভাবতাম বেশি।
কিন্তু কাজুয়া তো কাল্পনিক কেউ নয়। সাওরি কিংবা বাম চোখে দেখা অন্যান্য দৃশ্যগুলোরও বাস্তব অস্তিত্ব আছে নিশ্চয়ই। এ কারণেই বিভ্রান্তি জেঁকে বসেছে আমার চিত্তে। হঠাৎই ভীষণ ভয় লাগছে। যতক্ষণ এগুলোকে স্বপ্ন ভাবছিলাম, সাওরিকে সিনেমায় দেখা কোন চরিত্র মনে হচ্ছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, এসব হচ্ছে অতীতে ঘটে যাওয়া বাস্তব ঘটনা। বাম চোখটা সেই ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী।
