যেটা দেখে স্বপ্নের শুরু : হার্ডওয়্যার স্টোরের একটা করাত।
স্বপ্নের বিষয়বস্তু : দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বাবা-মা।
হার্ডওয়্যার স্টোরে স্কুলের জন্যে একটা কম্পাস কিনতে যাই আমি। বিশাল দোকানটার ভেতরে অফিস সাপ্লাই সেকশন খুঁজতে খুঁজতে নিজেকে আবিষ্কার করি কনস্ট্রাকশন যন্ত্রপাতির সেকশনে।
সেখানেই একটা তাকে গোল একটা করাত রাখা। সেটা দেখা মাত্র আমার বাঁ চোখ গরম হতে শুরু করে। থেমে, করাতটার প্রতি মনোযোগ দেই আমি।
কারো স্পর্শ ব্যতিরেকেই ঘুরতে শুরু করে করাতটা। আমার ডান চোখে দেখা করাতটা আর বাম চোখে দেখা করাত দু’টোর সমাপতন ঘটায় এমনটা মনে হচ্ছে। স্বপ্নটা শুরু হচ্ছে। চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
স্বপ্নে দেখলাম করাতটার আঘাতে কাঠের গুঁড়ি ছিটছে চারদিকে। সুন্দর করে দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে বড় বড় হোয়াইট বোর্ড। বাবার সাথে কাঠের মিলে এসেছি আমি আবার।
বরাবরের মতনই এই স্বপ্নটাও কেবলই ছবি। কিন্তু ছবিগুলো এতটাই বাস্তব যে মনে হচ্ছে কান পাতলেই শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাবো। সদ্য কাটা কাঠের গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিল।
সাধারণত বৈদ্যুতিক করাতের সাহায্যে কাঠ কাটে মিলের কর্মীরা। একটা কুঁড়ের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কাজ দেখছি আমি। বড় বড় ট্রাকে করে বিশাল কাঠের গুঁড়িগুলো গাদাগাদি করে আনা হয়। ওগুলো নামানোর জন্যে আলাদা জায়গা আছে। আমার দৃষ্টিকোণের উচ্চতা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে কাজুয়ার বয়স বেশ কম এই স্বপ্নে।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম আমার বাবা-মা একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। মা প্রায়ই বাবার সাথে মিলে দেখা করার সময় আমাকে সাথে করে নিয়ে আসে।
একটা বড় ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে বাবা-মা। ট্রাকটার পেছনে বিশাল বিশাল সব গুঁড়ি দড়ি দিয়ে বাঁধা। আমার উদ্দেশ্যে একবার হাত নাড়লো বাবা। তাদের দিকে হাঁটা শুরু করলাম আমি।
এমন সময় কোন প্রকার সতর্কবার্তা ছাড়াই একটা গাছের গুঁড়ি ট্রাক থেকে গড়িয়ে মা-বাবার ওপর পড়ে গেল।
হার্ডওয়্যার স্টোরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই চিৎকার করে উঠলাম। স্বপ্নটা থামিয়ে দিতে চাইছি, কিন্তু এগুলোর ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই আমার। চোখ কয়েকবার খুললাম আর বন্ধ করলাম। কিন্তু লাভ হলো না, আমার চোখের সামনেই মঞ্চায়িত হয়ে চলেছে দৃশ্যটা।
আমার স্বপ্ন সত্তা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিলের এক কোণে। আশপাশ থেকে কয়েকজন মিল কর্মি এসে আমাকে পেছনে সরিয়ে নিল। বিশাল গুঁড়িটার নিচে আটকে পড়া বাবা-মাকে দেখতে পাচ্ছি তখনও। দ্রুত গুঁড়িটা সরিয়ে নেয়া হলো, কিন্তু তাদের কেউই নড়াচড়া করছে না। নিথর পড়ে আছে প্রাণহীন পুতুলের মতন। এজন্যেই কাজুয়ার তুলনামূলক বয়স্ক সত্তার চোখ দিয়ে যে স্বপ্নগুলো দেখি, সেখানে তাদের কোন অস্তিত্ব নেই।
বাবার মাথা থেকে রক্ত ঝড়ছে। পা দু’টো বেঁকে গেছে অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
স্বপ্নটা শেষ হয়ে গেল। আবারো স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে পেলাম বাঁ চোখে। হার্ডওয়্যার স্টোরটার মেঝেতে পড়ে আছি আমি। দোকানের এক কর্মী ছুটে আসছে আমার দিকে। চিৎকার শুনতে পেয়েছে সে।
*
মার্চের শেষদিকে ফলো-আপ টেস্টের জন্যে ছোট হাসপাতালটায় ফিরে এলাম আমি। এর আগেও বেশ কয়েকবার এসেছি কিন্তু মার্চ মাসে আজকেই প্রথম। আমি যেহেতু রাস্তাটা চিনে গিয়েছি তাই একা একাই বাসে চড়ে এসেছি। বাবা মা দুইজনই অবশ্য গাড়ি করে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল।
হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে একবার চারপাশে তাকালাম। শহরতলীর বাইরে ছোট্ট একটা হাসপাতাল। আগে কখনো ব্যাপারটা নিয়ে ভাবিনি, কিন্তু কি যেন একটা কিলো আমার কাছে। একে তো বাইরে কোন সাইনবোর্ড নেই। দ্বিতীয়ত, প্রবেশপথের কাছে ঘন গাছগাছালির কারণে গেইটটা দেখাই যায় না। কেউ যদি আগে থেকে না জানে যে এখানে একটা হাসপাতাল আছে, তাহলে চোখেই পড়বে না।
ভেতরে প্রবেশ করে জুতো বদলে হাসপাতালের সবুজ স্লিপার পরে নিলাম। ছিঁড়ে যায়নি বা গর্তবিহীন একটা জোড়া খুঁজলাম কিছুক্ষণ, কিন্তু লাভ হলো না। সবগুলো একই। আমি বাদে ফলো-আপের জন্যে কেউ আসেনি। রিসিপশন ডেস্কে পাথরের মত মুখ করে বসে আছে এক নার্স। বয়স আন্দাজ করা সম্ভব না। শুধু ওয়েটিং রুমটাই না, পুরো হাসপাতালই নিভু নিভু আলোয় আলোকিত।
দোতলার কেবিনটায় থাকাকালীন সময়ে চোখে পড়েনি, কিন্তু এবারে সবকিছু অন্যরকম ঠেকছে। হয়তো আমার পরিবর্তনের ফলাফল এটা।
ডেস্কে বসে থাকা নার্স এক্সামিনেশন রুমে যাওয়ার ইশারা করলো আমাকে। একটা চেঞ্জিং স্ক্রিন, এক্সামিনেশন টেবিল, ডেস্ক আর চেয়ার রাখা রুমটায়।
গোঁফওয়ালা ডাক্তার ডেস্কের পেছনে বসে কিছু কাগজপত্র ঠিকঠাক করেছে। তার উদ্দেশ্যে বাউ করলাম একবার।
একবার আমাকে দেখে আবার হাতের কাগজটার দিকে দৃষ্টি ফিরে গেল তার।
“টেবিলটায় উঠে পড়ো,” বললো সে।
তার কথা অনুযায়ী টেবিলটায় শুয়ে পড়লাম। দৃষ্টি সিলিং বরাবর। ডান পাশে তাকাতেই দেয়ালে ঝোলানো একটা আয়না চোখে পড়লো। সেখানে আমার প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।
অপারেশনের দিনের কথা ভাবলাম। এরকমই একটা টেবিলে শুয়ে ছিলাম আমি অপারেশন থিয়েটারে। সেখানেই প্রথম চোখটাকে দেখি, যেটা এখন শোভা পাচ্ছে আমার বাম অক্ষিকোটরে।
