স্বপ্নে দেখা দৃশ্যগুলোর খুঁটিনাটি টুকে রাখি। ভালো লাগে কাজটা করতে।
প্রায়ই বাবা-মা’র কোলে নিজেকে আবিষ্কার করি। এত ভালো লাগে তখন! উষ্ণতায় মন ছেয়ে যায়। সেই সাথে একরকম অপরাধবোধও কাজ করে। আমার নিজের বাবা-মা’র জন্যে কখনো এই অনুভূতিগুলো খেলা করেনি। তাদের ছেড়ে অন্য একজনের বাবা-মা’র প্রতি এই আন্তরিকতার প্রদর্শনী বিবেকের কাছে ঠিক মনে হয় না।
স্কুলে বা বাসায়, সবসময় একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি কাজ করে ভেতরে ভেতরে। কিন্তু স্বপ্নগুলো সেই অস্বস্তির হাত থেকে রেহাই দেয় আমাকে। যখন মনে হয় যে বাস্তবের চেয়ে স্বপ্নের দুনিয়াটাই বেশি টানে আমাকে, এক অচেনা বেদনায় ভরে ওঠে মন।
যখনই মা বা আমার কোন বন্ধু পুরনো নামির ব্যাপারে কথা বলে, খুবই খারাপ লাগে ভেতরে ভেতরে। মিঃ ইওয়াতা বা পূর্ব পরিচিত কেউ আমার সাথে কথা বলতে আসলে তাদের চোখের দিকে তাকাতে পারি না। তারাও যে আমার প্রতি হতাশ, এ কথা মনে হবার সাথে সাথে পা কাঁপতে শুরু করে। মনে হয় যেন ছুটে পালাই।
“নামি, আজকে ব্ল্যাকবোর্ড মোছার পালা তোমার।”
হ্যাঁ, মুছছি।
কোন সহপাঠীর সাথে এটুকু কথোপকথনেই হাঁপিয়ে উঠি। দিনের প্রতিটা মুহূর্ত কাটে ভয় আর উৎকণ্ঠায়। ঠিকমত কথা বলছি তো? হাসিটা ঠিক ছিল তো? ওদের অসন্তুষ্ট করার মত কিছু করিনি তো? যখনই পিয়ানোর দিকে তাকাই, পরিবারের অন্য সবার সামনে কিছুদিন আগের সেই ব্যর্থতার কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয় চিৎকার করে কাঁদি। ছোটখাটো যে কোন কাজে ভয় লাগে।
জানি, এমনটা ভাবা ঠিক যুক্তিসঙ্গত না। তবুও এরকম ভাবনা এসেই যায় মনে। ইচ্ছে করে চিরদিনের জন্যে কাজুয়ার জগতে চলে যেতে।
আমার পক্ষে আর আগের নামি হওয়া সম্ভব নয়। যতই চেষ্টা করি না কেন, পিয়ানো বাজাতে বা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে পারবো না। জোর করে টিচারদের পছন্দের পাত্রও হওয়া সম্ভব না।
একটা পর্যায়ে হালই ছেড়ে দিয়েছি।
শুধু এটাই না। দুর্ঘটনার পরে জ্ঞান ফিরে নিজেকে যে অবস্থায় আবিষ্কার করেছিলাম, তার চাইতে এখনকার আমির অনেক তফাৎ। শূন্য স্মৃতি নিয়ে পুনরায় জীবন শুরু করা কারো পক্ষে এই অল্প ক’দিনে এতগুলো স্মৃতি বহন করা সম্ভব নয়। উপরন্তু স্মৃতিগুলো এমন একজনের যে কিনা বড় হয়েছে পাহাড়ি অঞ্চলে। আর আমি যে এই শহরের বাইরে আগেও খুব একটা যাইনি এ কথা হলফ করে বলতে পারি।
কুকুর ভয় লাগে আমার। কামড় দেবে এই ভয়ে দূরে দূরে থাকি সবসময়। প্রথম প্রথম বুঝতাম না কেন এমনটা করি।
একদিন মা বলে, “আগে কুকুর কত পছন্দ করতে…”
কিছুদিন পর বুঝতে পারলাম যে বাম চোখে দেখা একটা স্বপ্নের কারণে কুকুর ভয় পাই আমি। আমার বাইরে একটা স্বপ্নের বর্ণনা অনেকটা এরকমঃ
স্বপ্ন দেখার তারিখ : ফেব্রুয়ারি ২৬
স্বপ্নে যাদের দেখা গেছে : একটা বড় কুকুর।
যেটা দেখে স্বপ্নের শুরু : স্কুল থেকে আসার পথে দেখি একটা কুকুরকে হাটাতে বের হয়েছে তার মনিব।
স্বপ্নের বিষয়বস্তু : একটা বড় কুকুর ধাওয়া করে আমাকে। ওটা আমার পায়ে কামড় বসাতে যাবে, এমন সময় স্বপ্নটা মিলিয়ে যায়।
*
তখন থেকেই কুকুরভীতি কাজ করা শুরু করে আমার ভেতরে কাজুয়ার ঘটনাগুলো আমার জীবনকেও প্রভাবিত করতে শুরু করেছে।
ক্লাসের মাঝে ইউরি আমাকে বলে, “মনে হয় যেন একদম অন্য কাউকে দেখছি। তুমি আর তুমি নেই। স্মৃতিশক্তি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করো দ্রুত, নাহলে সবার পেছনে পড়ে যাবে।”
মাথা নাড়ি আমি। আসলেও সবকিছুতে পিছিয়ে পড়ছি। প্রতিটা মুহূর্তে আগের নামির সাথে এমনভাবে তুলনা করা হয় যে মরে যেতে ইচ্ছে করে। আমার পক্ষে তার প্রতিচ্ছবি হওয়া সম্ভব নয় কোনমতেই।
স্মৃতিশক্তি থাকাকালীন সময়ের একটা ভিডিও আমাকে দেখালো মা। অর্থাৎ পুরনো নামির একটা ভিডিও। তার ধারণা ছিল ভিডিওটা দেখে আমার ভেতরে সুপ্ত স্মৃতিগুলো জেগে উঠবে। বলা বাহুল্য, কাজ করেনি পদ্ধতিটা।
ভিডিওর শুরুতে খুব সুন্দর একটা ড্রেস পরে স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে নামিকে। দর্শকদের উদ্দেশ্যে একবার বাউ করে পিয়ানোর সামনে নিপুণ ভঙ্গিতে বসে পড়লো সে। কিছুক্ষণের মধ্যে সুরের মূর্ঘনায় ভরে উঠলো গোটা অডিটোরিয়াম। খুবই সুন্দর একটা সুর। চোখ বন্ধ করে নিলাম। আমার কানের পর্দায় এসে সজোরে বাড়ি খাচ্ছে সুরের তরঙ্গগুলো। নামি আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে পিয়ানো বাজিয়েই চলেছে। অপূর্ব একটা দৃশ্য।
আরেকটা ভিডিওতে দেখা গেল নিজের জন্মদিনের পার্টিতে বন্ধুবান্ধব দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে সে। পার্টিটা আমাদের লিভিং রুমে। অনবরত একে অপরের সাথে কথা বলেছে তারা। গত এক সপ্তাহে আমি যা বলেছি, দশ মিনিটের মধ্যে সে তার থেকে বেশি কথা বলে ফেললো। কথা বলে, গালে টোল ফেলে মুচকি মুচকি হাসে আর কিছুক্ষণ পরপর আশপাশের সবার উদ্দেশ্যে বাউ করে।
আনন্দের এক অদৃশ্য বলয় যেন ঘিরে রেখেছে তাকে। ভিডিওর মেয়েটার চেহারা অবিকল আমার মতন হতে পারে হয়তো, কিন্তু সে একদম ভিন্ন একজন মানুষ। নিজেকে নিকষ অন্ধকারে বন্দী মনে হলো আমার।
*
স্বপ্ন দেখার তারিখ : মার্চ ২১
স্বপ্নে যাদের দেখা গেছে। আমার বাবা মা। কাঠের মিলে কাজ করছে।
