যতই দিন যাচ্ছে, স্বপ্নের সংখ্যাও বাড়ছে।
একদিন ক্লাসে আমার ডেস্কে বসে একমনে তাকিয়ে ছিলাম রাবারের দিকে। এ সময় গরম হতে শুরু করলো বাঁ চোখটা। আসন্ন স্বপ্নের উত্তেজনায় বুক ধড়ফড় করছে। হয়তো অদ্ভুত শোনাবে, কিন্তু স্বপ্নগুলোর দেখার অপেক্ষায় থাকি আমি। মনে হয় যেন পুরনো কোন পারিবারিক ছবির অ্যালবামের সন্ধান পেয়েছি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বপ্নটা দেখা শুরু করলাম বাঁ চোখে। চোখ বন্ধ করে নিলাম, যাতে পরিষ্কার দেখতে পাই। স্বপ্নে একটা ক্লাসরুমে বসে আছি। আশপাশে যে বাচ্চারা বসে আছে তাদের দেখে আন্দাজ করলাম এই স্বপ্নে আমার বয়স বারো-তেরো। প্রতিটা স্বপ্নেই বিভিন্ন বয়সে আবিষ্কার করেছি নিজেকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পরীক্ষা শুরু। টিচার সবার ডেস্কে খাতা আর প্রশ্ন বিলি করছেন। স্বপ্নে একটা কাঠের পেন্সিল ধরে আছি আমি। একটা ছেলের হাত এটা, ইউনিফর্ম দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। নিজের নাম লিখলাম পরীক্ষার খাতায়। কাজুয়া ফুইয়ুতসুকি। এরপাশে হাইস্কুলের নাম।
পাশের বিশাল জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকালাম একবার। মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে। তবে জানালার কাঁচে প্রতিফলিত ছেলেটার চেহারা মোটামুটি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। এর আগে কখনো এই চেহারাটা দেখিনি, তবে বুঝতে অসুবিধে হলো না যে স্বপ্নে আমি এই ছেলেটার বাম চোখ দিয়েই সবকিছু দেখি।
এরপরেই মিলিয়ে গেল স্বপ্নটা।
কাজুয়া। নামটা আমার নোটবুকে টুকে নিলাম যাতে না ভুলে যাই। পরীক্ষার খাতায় লেখা হাইস্কুলটার নাম আর আজকের তারিখও লিখলাম। কাগজটা বাইন্ডারে ঢুকিয়ে দিলাম অবশেষে।
সেই রাতে টিভি দেখতে দেখতে বাঁ চোখে স্বপ্নগুলোর কথা ভাবতে লাগলাম।
বাবা এখনও ফেরেনি অফিস থেকে। মার আর আমি একা বাসায়। আমাদের মাঝে ঘনিষ্ঠতা কমছে দিনদিন। মাঝে মাঝে এমন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় যেন অচেনা কাউকে দেখছে। কথা বলার সামনে নাম ধরেও ডাকে না। শুধু ‘তুমি-তুমি’ করে। সেদিক থেকেও আমাকে আগের নামির থেকে পৃথক করে রেখেছে সে।
রাতের খাবারের পর মনে হলো যে রুমে চলে চাই, কিন্তু মা’র সাথে লিভিং রুমে থেকে গেলাম। রাগ করতে পারে বেচারি। হয়তো আগের নামি’ হতে কখনোই পারবো না, কিন্তু তাকে সঙ্গ দিতে তো দোষ নেই।
টিভিতে হারানো ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটা বিশেষ অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। ডিসপ্লের নিচের দিকে ফ্লোটিং প্যানেলে একটা ফোন নম্বর ঘুরছে কিছুক্ষণ পরপর। কারো কাছে যদি কোন তথ্য থাকে, তাহলে সেই নম্বরে ফোন করে জানানো যাবে।
টেলিভিশন বা কোন অনুষ্ঠান সংক্রান্ত আমার সব স্মৃতি হারিয়ে গেছে। কয়েক মাস হারিয়ে যাওয়া একটা ছেলের ছবি দেখানো হচ্ছে টিভিতে। ক্লাসরুমের স্বপ্নটায় দেখা আমার স্বপ্ন সত্তার ছবিটা ভেসে উঠলো মনের পর্দায়।
স্বপ্নে আমি কাজুয়া নামের একটা ছেলে। তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই সবকিছু দেখি। কোন শব্দ শুনতে পাই না, কেবল ছবি। প্রতিটা স্বপ্নেই কাজুয়া যা দেখেছে বা করেছে, সেগুলো অনুভব করেছি। নির্দিষ্ট বিরতিতে অন্ধকার নেমে আসে দৃশ্যগুলোয়। অর্থাৎ চোখের পলক ফেলি তখন।
এমনটা কিন্তু নয় তৃতীয় কারো দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুরো ঘটনাটা দেখছি। ঘটনা ঘটার সময়ে সেখানে উপস্থিত থাকি।
হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল। কয়েকটা স্বপ্নে আশপাশের লোকজনের সাথে কথা বলি আমি, কিন্তু কিছু শুনতে পাই না। সুতরাং তারা কি নামে ডাকে আমাকে, সেটাও বোঝা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এখন যেহেতু কাজুয়া নামটা জানি, স্বপ্নগুলো আরো বেশি বাস্তব মনে হয়।
“টেবিল পরিষ্কার করে ফেলি, তুমি আরো দেখবে?” মা উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো এ সময়।
না।
একটা মেয়ের ছবি দেখাচ্ছে এখন টিভিতে। গ্রেড স্কুল বা মিডল স্কুলের ছাত্রী হতে পারে সে। ছবিতে বেশ কয়েকজন মেয়ের সাথে রান্না করতে দেখা যাচ্ছে তাকে। নিশ্চয়ই কোন সামার ক্যাম্পে। অন্যদের চেহারা অবশ্য ঝাপসা করে দেয়া হয়েছে।
হঠাই প্রচণ্ড গরম হয়ে উঠলো আমার বাঁ চোখ। প্রতিবার স্বপ্ন দেখার আগে এরকমটা হয়। তবে এবার উত্তাপের পরিমাণ অনেক বেশ। দপদপ করছে চোখটা।
এতটাই হতচকিত হয়ে পড়লাম যে কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না। চোখ বন্ধও করতে পারছি না। স্থানুর মত তাকিয়ে রইলাম টিভির মেয়েটার দিকে। আমার বাঁ চোখের টিভিটা চালু হয়ে গেল এসময়। দরদর করে ঘাম ছুটছে সারা শরীরে। মনে হচ্ছে খুব অশুভ কিছু একটা ঘটতে চলেছে। এবারে যা দেখবো, সেটা নিশ্চয়ই স্বপ্ন নয়। দুঃস্বপ্ন।
হঠাৎই টিভি স্ক্রিনটা কালো হয়ে গেল। মেয়েটার ছবিও নেই হয়ে গেল সেই সাথে। চোখ স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে এলো মুহূর্তে। কাঁপতে কাঁপতে মার দিকে তাকালাম। রিমোট কন্ট্রোল তার হাতে।
“টিভি চালু করে রাখবো?”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিলাম।
.
৩
সাওরি আর ক্যাফের মালিক কথা বলছে। আমি-মানে কাজুয়া কাউন্টারে
হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। কাউন্টারের পাশে একটা ফুলদানিতে কয়েকটা সাদা ফুল। সাওরি আমার দিকে ঘোরার সময় তার হাত লেগে ফুলদানিটা উলটে গেল। ভেতরের পানিতে ভেসে যাচ্ছে কাউন্টার।
স্বপ্নটা এখানেই শেষ। চোখ খুলে হাতের পত্রিকাটা বন্ধ করে রাখলাম। ব্যাগ থেকে একটা নোটবুকের পাতা বের করে স্বপ্নটা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখতে শুরু করলাম।
