এসময় নড়ে উঠলো গোটা দৃশ্যটা। নিয়মিত তালে দুলতে লাগলো ট্রেনটা। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম যে আসলে স্বপ্নের মধ্যে হেঁটে চলেছি বগিটার দিকে। বাস্তবে কিন্তু দাঁড়িয়েই আছি প্লাটফর্মের ওপর। সাবধান থাকতে হচ্ছে, নতুবা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাবো নিচে।
ধীরে ধীরে বগিটা বড় হচ্ছে চোখের সামনে। বাচ্চাগুলো এখন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। মাটি থেকে আমার চোখের যে অবস্থান, স্বপ্নে আমার বয়সও নিশ্চয়ই অনেক কম। হয়তো বাচ্চাগুলোর সমান।
বগিটার কাছে এসে একটা জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দেয়ার চেষ্টা করলাম পা উঁচু করে। একটা বাচ্চার চোখে স্বাভাবিকভাবেই বিশাল ঠেকছে ট্রেনটা। মরিচার ফাঁক দিয়ে কিছু জায়গায় এখনও রঙ দেখা যাচ্ছে।
এসময় রাগী রাগী চেহারার একটা ছেলে চোখ বড় করে ভেতর থেকে তাকালো আমার দিকে। একটা ছোট্ট হাত উপরে উঠে এলো, আমার নিজের হাত। মানে স্বপ্নে যে বাচ্চাটা ট্রেনের দিকে এগিয়ে গেছে তার হাত আর কি।
হাত বাড়িয়ে জানালাটা ধরার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পারলাম না। অনেক বেশি উঁচুতে। জানালা দিয়ে যে ছেলেটার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম, সে উধাও হয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্যে। যখন ফিরলো তার হাতে ছোট একটা পাথর। সজোরে সেটা ছুঁড়ে দিল আমার দিকে। শব্দ করে চমকে উঠলাম আমি। আমার পাশে দাঁড়ানো লোকটাও চমকে গেল।
স্বপ্নে যে ছেলেটা একটা লাঠি দিয়ে ট্রেনটার গায়ে বাড়ি দিচ্ছিল, সে লাঠিটা ছুঁড়ে মারলো আমার দিকে। আপনা-আপনিই হাত উঠে এলো নিজেকে বাঁচানোর জন্যে।
প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করলাম, বাস্তবেও হাত উঠিয়েছি আমি।
এসময় একটা ট্রেন এসে থামলো সামনে। স্বপ্ন দেখা শেষ। পুরোপুরি বাস্তবে ফিরে এসেছি আবার।
*
বাড়ি ফিরে একটা খালি পাতায় স্বপ্নে যা যা দেখেছি তার বিস্তারিত বর্ণনা লিখে ফেলাম। কয়েকটা ছবিও এঁকে রাখলাম। সেই সাথে স্বপ্নটা দেখার সময় এবং স্থান টুকে নিলাম একপাশে।
আমার সন্দেহ, সামনে এরকম স্বপ্ন আরো দেখতে হবে আমাকে।
প্রথমে দোলনায় ঐ মেয়েটাকে দেখলাম। দ্বিতীয় স্বপ্নে পরিত্যক্ত ট্রেনের বগিটা দেখলাম। পরেরবার কি দেখবো কে জানে। হয়তো এগুলো আমার স্মৃতিশক্তি হারাবার পূর্বের অভিজ্ঞতা। কিংবা আগে দেখা কোন সিনেমার দৃশ্যও হতে পারে।
তবে স্বপ্নগুলোর কিছু অদ্ভুত নিয়ম আছে। যেমন, দু’টো স্বপ্নই নির্দিষ্ট একটা দৃশ্যের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বাস্তবে রূপ নিয়েছে। দু’বারই আমার চোখের সামনে যা ছিল, স্বপ্নেও সেরকম একটা কিছু ছিল। যেমন প্রথম স্বপ্নে দোলনাটা আর দ্বিতীয় স্বপ্নে রেললাইন। স্বপ্ন আর বাস্তবের দৃশ্যের সমাপতন ঘটা মাত্র বাঁ চোখে চলতে শুরু করে স্মৃতিটা। যেন কেউ রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে সিনেমা চালিয়ে দিয়েছে।
শুধু বাঁ চোখেই স্বপ্নগুলো দেখি। চোখটাকে রীতিমত গুপ্তধনের বাক্সের মত মনে হতে থাকে আমার সোনাদানার পরিবর্তে এই বাক্স ভর্তি উষ্ণ, আন্তরিক সব স্মৃতি দিয়ে। বেশিরভাগ সময়েই অবশ্য বাক্সটা বন্ধ থাকে। ডান চোখের মতই স্বাভাবিক কাজ করে সেটা তখন। কিন্তু এমন কোন দৃশ্য যদি চোখে পড়ে যেটা চাবি হিসেবে কাজ করবে বাক্সটার জন্যে, অমনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করি।
একটা বাইন্ডারে স্বপ্নগুলোর বিবরণ রাখতে শুরু করলাম।
যে স্বত্তার রূপ ধরে স্বপ্নগুলো দেখি, তার বয়স খুব কম। বগির ছেলেটা পাথর ছুঁড়ে মেরেছিল তার দিকে। এই দৃশ্যের অর্থ বের করতে শার্লক হোমস হতে হবে না। অন্যেরা খেলায় নিতে চাচ্ছিল না বাচ্চাটাকে।
দৃশ্যটা প্রভাবিত করলো আমাকে। সচরাচর স্বপ্ন দেখার কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু এই স্বপ্নটা স্মৃতির মতো জমাট বেঁধে আছে আমার মস্তিষ্কের এক কোণে। স্বপ্নটার কথা ভাবলেই উদাস হয়ে যাই। বাস্তবে ঐ পরিত্যক্ত বগিটা কখনো দেখেছি বলে মনে হয় না। অবশ্য আমার নিজের যেহেতু কোন স্মৃতি নেই, সব কিছুই নতুন ঠেকে।
স্মৃতির অভাব বোধ করি সারাক্ষণ। দুর্ঘটনায় জেগে ওঠার পর থেকে খুব বেশি স্মৃতি জমা হয়নি মস্তিষ্কের কোষগুলোতে। নিউরনগুলো যেন শুষ্ক মরুভূমি, খাঁ খাঁ করছে। স্মৃতি এমন একটা জিনিস যেটা মানুষকে নিজের অবস্থান বারবার মনে করিয়ে দেয়। আর সেই স্মৃতিই যদি না থাকে তাহলে নিজেকে ছিন্নমূল প্রতীয়মান হয় বারে বারে।
কিন্তু এই অদ্ভুত স্বপ্নগুলো সেই বিরান প্রান্তর থেকে উদ্ধার করেছে আমাকে। হৃদয়ে স্থান করে নিয়ে প্রশান্তির পরশ দিচ্ছে।
*
ট্রেন স্টেশনের স্বপ্নটা দেখেছি এক সপ্তাহ হতে চললো। আমার স্মৃতির জার্নাল ইতোমধ্যে বিশ পাতা ছাড়িয়ে গেছে। যেমনটা ধারণা করেছিলাম, আসলেও একটার পর একটা স্বপ্ন দেখে চলেছি।
বাক্স আর চাবির যে উপমাটা দিয়েছিলাম, সেটাও ঠিক প্রমাণিত হয়েছে। আমি যা দেখি সেগুলো থেকেই কোন কোন জিনিস চাবি হিসেবে কাজ করে। এমনকি টিভি বা খবরের কাগজের ছবিগুলো থেকেও স্বপ্ন দেখতে শুরু করি মাঝে মাঝে।
যে কোন কিছু বাঁ চোখের স্বপ্নের চাবি হতে পারে–একটা দুধের কার্টন কিংবা ছোট্ট কোন বিড়ালছানার চমকে যাওয়া মুখ। প্রতিবার যখন নির্দিষ্ট দৃশ্যটা দেখি, বাঁ চোখ গরম হতে শুরু করে। আমার নিজের ইচ্ছের ওপর কিছু নির্ভর করে না। যে কোন জায়গায়, যে কোন সময় শুরু হয়ে যেতে পারে। তবে দৃশ্যগুলো ছাড়া ছাড়া। একটায় হয়তো ভাঙা কাঁচের ওপর দাঁড়িয়ে আছি একা একা, অন্যটায় কোন কুকুর তাড়া করেছে আমাকে। আবার আরেক জায়গায় স্কুল মাঠে খেলছি। এরকম।
