“পুরনো নামি সবার সাথে মজার মজার কথা বলতে, সবাইকে হাসাতো। তোমার মত মুখ গোমড়া করে বসে থাকতো না।”
আসলেও কি এরকমটা করতাম আমি?
“হ্যাঁ, তোমার থেকে পুরো অন্যরকম ছিল সে। অন্য সবকিছুতেও ভালো ছিল। তোমার জন্যে ভলিবল ম্যাচে হেরে গেছি আমরা। পুরনো নামি হলে চাপ দিয়ে প্রতিপক্ষ দলের বারোটা বাজিয়ে দিত।”
ভলিবল কোর্টে চারপাশে অন্যান্য মেয়েরা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে একা মনে হচ্ছিল। এতবার ভুল করি যে কেউ আমার হাতে বলই দিতে চাচ্ছিলো না। চোখে বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল বারবার। যেন আমি কোর্ট থেকে বের হয়ে গেলেই বাঁচে।
দুই ক্লাসের মাঝে বিরতি চলছে এখন। চারিদিকে হইচই। নিজের ডেস্কে চুপচাপ বসে পরবর্তী ক্লাসের জন্যে অপেক্ষা করছি। এই বিরতিগুলোয় নিজেকে বড় বেশি একা লাগে। নিজের জন্যে নিজেরই করুণা হয়।
চোখ বন্ধ করে হাসপাতালের দেখা সেই মেয়েটার কথা কল্পনা করলাম। আমার উদ্দেশ্যে তার দেয়া উষ্ণ হাসিটা এখনও কিছুটা মানসিক শান্তি জোগায় মনে। তাকে যেন অনুভব করতে পারি। ওরকম অন্ধকার জগতে একদম একা, ভাবতেই বুকের বাঁ পাশটা মোচড় দিয়ে উঠলো। একাকী লাগলেই স্বপ্নটার কথা ভাবি, কিছুটা প্রশান্তি ভর করে চিত্তে।
মেয়েটা কে ছিল আসলে? আসলেও কি কোন স্বপ্ন দেখছিলাম। সেদিনের পর থেকে আজ অবধি আর কোন স্বপ্ন দেখিনি। যদি আমার ভুলে যাওয়া স্মৃতিগুলোর কিছুটা জড়ো হয়ে আমাকে স্বপ্নটা দেখায়, তাহলে বলতে হবে মেয়েটাকে আমি চিনি। নতুবা স্মৃতিতে সে আসবে কি করে?
মাকে তাই জিজ্ঞেস করলাম, লম্বা চুলের ছোট একটা মেয়ের ব্যাপারে কিছু জানো তুমি? বনের পাশে একটা পার্কে দোলনায় বসে থাকে।
“না,” মাখা ঝাঁকিয়ে বলে মা।
এই উত্তর আশা করিনি। স্মৃতিগুলো যদি আসলেও ফিরে আসতে শুরু করে তাহলে এই দুর্দশা থেকে মুক্তি পাবো। পুরনো নামি, যাকে সবাই ভালোবাসে, সে আবার ফিরে আসবে।
*
স্কুল থেকে বাসার ফেরার পথে ট্রেন স্টেশনে দ্বিতীয় দিবাস্বপ্নটা দেখলাম। আসলে এটাকে ঠিক দিবাস্বপ্ন বলা যাবে কিনা, নিশ্চিত নই। কারণ স্বপ্নটা দেখার সময় ঘুমোচ্ছিলাম না আমি, পুরোপুরি সজাগ ছিলাম।
প্লাটফর্মের ধারে হলুদ রঙের কিছুটা স্টিকার লাগানো থাকে। এই স্টিকারগুলোর অন্যপাশে যাওয়া নিষেধ। সেরকমই একটা স্টিকার জুতো দিয়ে খোটাচ্ছিলাম। আমার চারপাশে শত শত স্কুল ছাত্রী। প্রত্যেকেই বাড়ি ফেরার ট্রেনের অপেক্ষা করছে। হাইস্কুলের ছেলেমেয়েরা একসাথে জড়ো হয়ে আড্ডা দিচ্ছে, মাঝে মাঝে হেসে উঠছে উচ্চস্বরে। বারবার মনে হচ্ছে যেন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছে তারা।
ট্রেন আসতে এখনও কিছুটা সময় বাকি।
হঠাৎই খেয়াল করলাম আমার বাম চোখটা গরম হয়ে উঠছে। প্রথমে ভাবলাম মনের ভুল, কিন্তু না, আসলেও গরম হচ্ছে। চোখের শিরাগুলো রীতিমত দপদপ করছে, যেন হৃৎপিণ্ডটা কেউ চোখে বসিয়ে দিয়েছে আমার।
নিজেকে শান্ত করে যা দেখছি সেটার দিকে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করলাম। এখনও রেললাইনের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ আগে যে রেললাইনটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম সেটা ছিল চকচকে। কিন্তু এখন যেটা দেখছি, যেটা বাদামি মরিচায় জীর্ণ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন একটা স্বপ্ন দেখতে শুরু করবো। চোখ বন্ধ করে নিলাম, হাসপাতালের অভিজ্ঞতা থেকে জানি এতে আরো পরিষ্কার দেখতে পাবো স্বপ্নটা।
রেললাইনটা বেঁকে গেছে মনে হলো। যেন ঘাড় কাত করে নিয়েছি আমি। আমার চোখের সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা প্লাটফর্ম এখন। আকাশ দেখে বোঝা যাচ্ছে সন্ধ্যা নামবে কিছুক্ষণের মধ্যে। একটা বনের মাঝে আমি, চারদিকে কেবল সবুজ আর সবুজ।
নিচে সবুজ, ডানে সবুজ, বামে সবুজ, সামনে সবুজ, পেছনে সবুজ। ট্রেনের একটা জীর্ণ বগি নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে বনের মাঝে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিত্যক্ত, এটা স্পষ্ট। একটা জানালাতেও কাঁচ নেই। ছাদে ঘাস জন্মেছে। ধীরে ধীরে বনটার অংশ হয়ে যাচ্ছে ট্রেনটা। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় চকচক করছে গাছের পাতাগুলো। গ্রীষ্মকাল বোধহয়।
দৃশ্যটা এত সুন্দর যে দম আটকে গেল এক মুহূর্তের জন্যে। এরকম গভীর কোন বনের স্মৃতি নেই আমার। সীমাহীন দিগন্তেরও কোন স্মৃতি নেই। গত সতের বছরে এরকম কিছু দেখেছি বলে মনে হয় না। সবকিছু একদম নতুন আমার জন্যে। মনের খালি পাতায় চিরদিনের জন্যে আঁকা হয়ে গেল গোটা দৃশ্যটা।
এই স্বপ্নটাও আগের স্বপ্নটার মতনই। আধ-স্বচ্ছ। কেবল বাম চোখ দেখতে পাচ্ছে। ডান চোখ এখনও আগের প্লাটফর্মটাই দেখছে। যেরকমটা ভেবেছিলাম, আমি বাদে আর কারো চোখে পড়ছে না পুরনো বগিটা। ডান চোখ দিয়ে দেখলাম এক ব্যবসায়ী ভদ্রলোক নিবিষ্ট মনে খবর কাগজে পড়ছেন।
বাম চোখের দৃষ্টির সাথে সাথে ট্রেনটাও নড়ছে। পরীক্ষার জন্যে ডানে বামে, উপরে তাকিয়ে দেখলাম। মনে হচ্ছে যেন আমার বাম চোখ এক জায়গায় আর ডান চোখ আরেক জায়গায়।
এসময় হঠাই বগিটার জানালায় কয়েকটা বাচ্চা ছেলেমেয়ের মুখ দেখতে পেলাম। এরা কি বগিটা খেলার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করে? হাতে লাঠি নিয়ে বগিটার গায়ে সমানে বাড়ি দিচ্ছে তারা। তবে কোন শব্দ শুনতে পেলাম না আমি। শুধু দৃশ্যটুকুই। তবুও মনে হচ্ছে যেন আশপাশের বনের পাতার মর্মর ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, ঝিঁঝি পোকার ডাক কানে আসছে।
