মুরাদ কেন তার ভারী অস্ত্র নিয়ে আসছে না? প্রায় একমাস হতে চলল অবরোধের কিন্তু কতটা উন্নতি করেছে সে? একটুও না!
আমিও একমত এ ব্যাপারে। যদি মুরাদ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হত তাহলে পুরো সামর্থ্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিন্তু সম্ভবত এমন করবে না। হয়ত দুর্গে ঢোকার আসলেই কোন ইচ্ছে নেই তার।
তাহলে আমাদের উপর বোমাবর্ষণই বা করছে কেন?
আমার ধারণা নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে সতর্ক করে দিতে চায় যেন দুর্গ থেকে তাদের উপর আক্রমণের চেষ্টা না করা হয়। জানে যে এভাবে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারলে বিদ্রোহীদের সত্যিকারের রূপ প্রকাশ করে সমর্থক জোগাড় করতে পারব না আমরা। একই সাথে অবশিষ্ট বিশ্বস্ত সৈন্যদেরকেও ব্যবহার করতে পারব না। প্রদেশ জুড়ে শুধু তাদের অংশই প্রচারিত হবে আর কর্মচারিরা যদি তাদের কথা বিশ্বাসও করে, দোষ দেব না আমি–অন্তত এ ব্যাপারে কিছু জানতেও চাইব না। কেননা যুদ্ধের ফলাফল যেখানে এখনো অনিশ্চিত।
হতে পারে দুর্গের সৈন্যদের মনোবল ভেঙে দিয়ে আমাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করতে চায়।
হতে, কিন্তু যাই হোক না কেন আমি পরোয়া করি না। আমাদের কাছে যথেষ্ট খাবার, পানি আর সৈন্য, গোলাবারুদও আছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ছাড়াও শত্রুর উপর আঘাত হানতে পারব আমি। নিজের সৈন্যদের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছি প্রতি একটি বিদ্রোহী কামান নিপ করার । জন্য পাঁচশ রুপি করে উপহার পাবে।
হয়ত তুমি যা ভাবছ মুরাদের লক্ষ্য সেটা না। হতে পারে যা কিছু ঘটে গেছে তার জন্য অনুতপ্ত হয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে আছে। তোমার যেন কোন ক্ষতি না হয়ে যায়… অথবা ওর বোনেদের। হয়ত সে নিজেও সমঝোতার কথা চিন্তা করছে…
মুরাদ অবশ্যই জানে যে সে এতটা এগিয়ে গেছে যে চাইলেও আর আমার ক্ষমা লাভ করতে পারবে না। সে আর আওরঙ্গজেব মিলে ময়দানে আমার সৈন্যদেরকে হত্যা করেছে, বাধ্য করেছে আমার নির্বাচিত উত্তরাধিকারী, তাদের নিজ ভাইকে পালিয়ে যেতে। দারার নাম শুনতেই জাহানারার বিমর্ষভাব খেয়াল করলেন শাহজাহান।
আমি জানি তোমার জন্য কতটা কঠিন এটা। আরো একটু মোলায়েম স্বরে বলে উঠলেন, গত কয়েক সপ্তাহ আমাদের সকলের জন্যই কঠিন সময় যাচ্ছে। প্রতিটি দিনই, তোমার মত আমিও আশা করছি যে দারার সংবাদ পাব।
কিছু জানতে না পারাটাই বেশি কঠিন। এই দুর্গের মাঝে বন্দি হয়ে বাইরের পৃথিবীতে কী ঘটছে কিছুই জানতে পারছি না আমরা। আর একমাত্র যে সংবাদ পেয়েছি সেটাও দুঃসংবাদ…
শাহজাহান ভালো করেই জানেন কী বলতে চাইছে জাহানারা দিল্লির সুবাদারের কাছ থেকে বার্তাবাহকের নিয়ে আসা পত্র, তিন সপ্তাহ আগে যাকে আসতে অনুমতি দিয়েছিল মুরাদ, যেটিতে দারাকে শহরে প্রবেশ করতে দিতে সুবাদারের অস্বীকৃতি লেখা ছিল। সুবাদারের দাবি ছিল, আওরঙ্গজেব তাকে নিশ্চয়তা দিয়েছে যে সম্রাট এতটাই অসুস্থ; ফলে শহর আর এর রাজকোষ দারার হাতে তুলে দেবার মত কোন পত্র লেখারও ক্ষমতা নেই…
‘শাহজাদা আওরঙ্গজেব আমাকে জানিয়েছে যে শাহজাদা দারা সিংহাসন দখলের জন্য নিজের কার্য সিদ্ধি করার উদ্দেশ্যে জাহাপনার কাছ থেকে যে নির্দেশপত্র এনেছে তা সম্পূর্ণ ষড়যন্ত্র। আর তাই তাকে অস্বীকার করে সাম্রাজ্য আর সম্রাটের প্রতি আমার দায়িত্ব পালন করেছি আমি। এর পরিবর্তে দিল্লির তত্ত্বাবধানের ভার তুলে দিচ্ছি শাহজাদা আওরঙ্গজেবের উপর। যে কিনা আমার মতে একজন অনুগত পুত্র হিসেবে মহান জাহাপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে। পরম করুনাময় আল্লাহ দ্রুত আপনার আরোগ্য লাভে সহায়তা করুন।‘
আশা করি কোন একদিন দারা আর আমি একসাথে হয়ে সুবাদারকে তার প্রতারণা আর ভণ্ডামির জন্য শাস্তি প্রদান করতে পারব। জল্লাদের হাতের নিচে দিতে পারলেই বেশি খুশি হব। একটা প্রতিউত্তরও পাঠাতে পরিনি তাকে অভিযুক্ত করে। সাম্রাজ্যের উপর আমার ইচ্ছে চাপিয়ে দেয়ার পক্ষে আমি এতটাই অলস হয়ে পড়েছি।
তোমার কি মনে হয় আওরঙ্গজেব এখনো দারার পিছু নিচ্ছে?
হ্যাঁ। দারাই তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। আমার মনে হয় না আগ্রা আর দিল্লি থেকে দারাকে বহুদূরে না পাঠিয়ে দেয়া পর্যন্ত সুস্থির হবে আওরঙ্গজেব। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি পারে এখানেও ফিরে আসতে চাইবে সে। বেশি সময়ের জন্য মুরাদের হাতে পুরো দায়িত্ব ছেড়ে রাখারও ঝুঁকি নিতে চাইবে না। নিশ্চয় গোপনে তার মনে এ ভয়ও থাকবে যে যদি মুরাদ একাকী পুরো সাম্রাজ্য দখল করে নিতে চায়–যেমনটা সে নিজে করেছে। আশা করছি যে শীঘি তাদের দুজনের মাঝেই ঝগড়া বেধে যাবে। যদি এমনটা হয় তাহলে দারা আরেকটা সুযোগ পেয়ে যাবে। বিশেষ করে যদি পূর্বদিক থেকে সৈন্য নিয়ে ফিরে আসতে পারে সুলাইমান। এই যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি…
খানিকক্ষণের জন্য চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পিতা-কন্যা। গত কয়েকটা দিন ধরেই প্রায় এরকম ঘটছে, ভাবল জাহানারা। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় কথা বলার আর কিইবা আছে?
সারাক্ষণ বিভিন্ন কিছু কল্পনা করা বেদনাদায়ক। নিত্য নতুন দুশ্চিন্তা এসে যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দেয়। প্রতিটি দিন অনুভব করছে নিজের ভেতরে আরো বেশি করে ডুবে যাচ্ছেন পিতা, যেমনটা সে নিজে। মাঝে মাঝে মনে হয় নিকোলাসের কথা। তার চারপাশের দুনিয়া–একদা পূর্ণ ছিল নিশ্চয়তায় হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত। জানে যে নিকোলাসের উপর এখনো বিশ্বাস করতে পারে সে ভুলে যায়নি বিক্ষত মুখে নিকোলাসের নম্র ছোঁয়া। সেই মুহূর্তে কী মনে হয়েছিল তার? বিস্ময় বা চমক নয়, কিন্তু… খানিকটা সময় লেগেছে এটা উপলব্ধি করতে.. এরকম দুঃসময়ে কৃতজ্ঞতা। যদি রোশনারা এটা দেখতে পেত, কোন সন্দেহ নেই যে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিত পুরো ব্যাপারটার।
