এম্পায়ার অভ দ্য মোগল ব্রাদার্স অ্যাট ওয়ার

 

১.১ ভ্রাতৃপ্রতিম প্রেম – প্রথম পর্ব

অ্যাম্পেয়ার অব দ্য মোগল – ব্রাদার্স অ্যাট ওয়ার
মূল : অ্যালেক্স রাদারফোর্ড
অনুবাদ 
সাদেকুল আহসান কল্লোল

‘ভ্রাতৃসম আবেগ বিসর্জন দাও,
যদি তুমি সম্রাট হিসাবে অভিষিক্ত হওয়ার আকাঙ্খা পোষণ কর…
কেউ কারো ভাই নয়!
ওরা সবাই তোমার সাম্রাজ্যের শত্রু!’
—-হুমায়ুনের সৎ-বোন গুলবদন লিখিত হুমায়ুননামা থেকে সংকলিত

প্রধান চরিত্রসমূহ

হমায়ুনের পরিবারবর্গ :

বাবর, হুমায়ুনের আব্বাজান এবং প্রথম মোগল সম্রাট

মাহাম, হুমায়ুনের আম্মিজান এবং বাবরের প্রিয়তমা স্ত্রী

খানজাদা, হুমায়ুনের ফুপিজান এবং বাবরের ভগিনী

বাইসানগার, হুমায়ুনের নানাজান

কামরান, হুমায়ুনের সৎভাইদের ভিতরে বয়োজ্যেষ্ঠ

আসকারি, হুমায়ুনের সৎ-ভাইদের ভিতরে মধ্যম এবং কামরানের আপন ভাই

হিন্দাল, হুমায়ুনের সৎ-ভাইদের ভিতরে কনিষ্ঠতম

গুলবদন, হুমায়ুনের সৎ-বোন এবং হিন্দালের আপন ভগিনী

আকবর, হুমায়ুনের প্রাণপ্রিয় পুত্র

হমায়ুনের বিশ্বস্ত পারিষদবর্গ :

কাশিম, হুমায়ুনের বিশ্বস্ত উজির

জওহর, হুমায়ুনের ব্যক্তিগত পরিচারক এবং পরবর্তীতে তার রাজপ্রাসাদের খরচের নিয়ন্ত্রক

বাবা ইয়াসভালো, হুমায়ুনের অশ্বশালার প্রধান

আহমেদ খান, হুমায়ুনের গুপ্তদূতদের প্রধান এবং পরবর্তীতে আগ্রার শাসনকর্তা

শারাফ, হুমায়ুনের জ্যোতিষী

জাহিদ বেগ, একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতি

সালিমা, হুমায়ুনের প্রিয়তম উপপত্নী

সুলেয়মান মির্জা, হুমায়ুনের আত্মীয় সম্পর্কিত ভাই এবং তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি

মাহাম আগা, আকবরের দুধ-মা

আধম খান, আকবরের দুধ-ভাই

নাদিম খাজা, হুমায়ুনের অন্যতম সেনাপতি এবং মাহাম আগার স্বামী

অন্যান্য :

গুলরুখ, বাবরের স্ত্রী এবং কামরান আর আসকারির আম্মিজান

দিলদার, বাবরের স্ত্রী এবং হিন্দাল এবং গুলবদনের আম্মিজান

নিজাম, একজন ভিস্তিঅলা

জয়নব, হামিদার প্রধান পরিচারিকা

সুলতানা, রাজা মালদেবের মোগল উপপত্নী

ওয়াজিম পাঠান, একজন অবসরপ্রাপ্ত সৈন্য সাহসিকতার জন্য হুমায়ুন যাকে পুরস্কৃত করেছিল

শেখ আলি আকবর, হিন্দালের উজির এবং হামিদার আব্বাজান

দারয়া, নাসিরের পুত্র, কাবুলে হুমায়ুনের সেনাছাউনির আধিকারিক

মুস্তাফা আরগুন, তূর্কী অশ্বারোহী যোদ্ধা

হিন্দুস্তান :

সুলতান বাহাদুর শাহ, গুজরাতের শাসনকর্তা

তার্তার খান, হুমায়ুনের আব্বাজান বাবরের কাছে পরাস্ত হওয়া পূর্ববর্তী শাসক বংশ, লোধিদের, একজন সদস্য এবং হিন্দুস্তানের তখতের একজন দাবীদার

শেরশাহ, ছোটজাতে জন্ম নেয়া বাংলার এক উচ্চাভিলাষী শাসক

ইসলাম খান, শেরশাহের পুত্র

মির্জা হুসেন, সিন্ধের সুলতান

রাজা মালদেব, মারওয়ারের শাসক

তারিক খান, ফিরোজপুরের শাসক এবং শেরশাহের অনুগত জায়গিরদার

আদিল শাহ, ইসলাম শাহের ভগ্নিপতি এবং হিন্দুস্তানের তখতের একজন দাবীদার সেকুন্দার শাহ, ইসলাম শাহের আত্মীয় সম্পর্কিত ভাই এবং হিন্দুস্তানের তখতের একজন দাবীদার

পারস্য :

শাহ তামান্স

রুস্তম বেগ, বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতি এবং শাহ তামাস্পের আত্মীয় সম্পর্কিত ভাই

বৈরাম খান, অভিজাত ব্যক্তি, দক্ষ সেনাপতি এবং পরবর্তীতে হুমায়ুনের খান-ই-খানান, প্রধান সেনাপতি

হমায়ুনের পূর্ব-পুরুষ :

চেঙ্গিস খান

তৈমূর পশ্চিমে যাকে তৈমূর লঙ বলা হয়

উলুঘ বেগ, তৈমূরের প্রপৌত্র এবং একজন খ্যাতনামা জ্যোতিষী

.

প্রথম পর্ব – ভ্রাতৃপ্রতিম প্রেম

০১. বাঘের পিঠে সওয়ারী

কয়েকদিন ধরেই বাতাসে প্রচণ্ড হিমের প্রকোপ। হুমায়ুন যদি চোখ বন্ধ করে তাহলে অনায়াসে আগ্রার এই দূর্গ প্রকারের পরিবর্তে নিজেকে শৈশবের সঙ্গী কাবুলের পাহাড় আর তৃণভূমির প্রেক্ষাপটে কল্পনা করতে পারে। কিন্তু সংক্ষিপ্ত শীতকাল শেষ হয়ে আসছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের ভিতরেই হিন্দুস্তানের সমভূমি আবারও ধূলিকণা আর উষ্ণতায় দগ্ধ হবে।

পশমের পরত দেয়া লাল রঙের আলখাল্লাটায় নিজেকে ভালো করে মুড়ে নিয়ে, মন্থর পায়ে দেয়ালের উপরে পায়চারি করে হুমায়ুন। তার দেহরক্ষীদের আদেশ দিয়েছে তাঁকে একা থাকতে দিতে কারণ একাকী নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকতে চায় সে। মাথা উঁচু করে, তারার ফুলঝুরি নিয়ে জ্বলজ্বল করতে থাকা পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। তাদের তীব্র, রত্ন-তুল্য উজ্জ্বলতা সবসময়েই মোহিত করে তাকে। এটা প্রায়শই তার মনে হয় যে সেখানে সবকিছু লেখা রয়েছে, কেবল তোমাকে জানতে হবে সেটা কোথায় আর কিভাবেই বা সেই লিখনের পাঠোদ্ধার করতে…।

পেছনে কোথাও থেকে একটা লঘু, সাবলীল পায়ের শব্দ ভেসে এসে ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটায় তার। হুমায়ুন ক্রু কুচতে ঘুরে তাকায়, ভাবে কোনো অমাত্য বা প্রহরী এতটাই হঠকারী যে নির্জনতার জন্য সম্রাটের অভিপ্রায়ের প্রত্যক্ষ আদেশ অমান্য করার স্পর্ধা দেখাতে পারে। বেগুনী আলখাল্লায় মোড়া একটা লম্বা, ক্ষীণদর্শন অবয়বের উপরে ক্রুদ্ধ নজর আপতিত হয় তার, মুখের নিম্নাংশ একটা মিহি পর্দার অবগুণ্ঠনে ঢাকা, এর উপরে তাঁর ফুপু খানজাদার কিশমিশ রঙের চোখ জ্বলজ্বল করছে। হুমায়ুনের ক্রুদ্ধ অভিব্যক্তি নিমেষে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে একটা হাসি ফুটে উঠে।

‘জেনানা মহলে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি আমরা। তুমি বলেছিলে আজ রাতের খাবারটা আমাদের সাথেই খাবে। তোমার মা অভিযোগ করছিল আজকাল বড্ড বেশী একাকী থাকছো তুমি, আমিও তার সাথে একমত।’

খানজাদা অবগুণ্ঠন সরিয়ে দেয়। দেয়ালে ঝোলান জ্বলন্ত মশাল থেকে তামাটে বর্ণের আলো এসে একটা কাটা কাটা মুখাবয়বের উপরে পড়ে যা এখন আর তার যৌবনকালের মতো তত সুন্দর নেই দেখতে কিন্তু এমন একটা মুখ যা হুমায়ুন তার তেইশ বছরের জীবনের পুরোটা সময় ভালোবেসেছে আর বিশ্বাস করেছে। খানজাদা আরেকটু কাছে এগিয়ে আসতে চন্দনকাঠের হালকা সৌরভ টের পায় সে যা জেনানা মহলে কারুকার্যখচিত সোনার তশতরিতে ক্রমাগত জ্বলছে।

‘আমাকে অনেক কিছু বিবেচনা করতে হচ্ছে। আমার এখনও পুরোপুরি মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে যে আমার বাবা ইন্তেকাল করেছেন।’

‘হুমায়ুন, সেটা আমি বুঝি। আমিও তাকে ভীষণ ভালোবাসতাম। বাবর তোমার বাবা ছিল বটে কিন্তু ভুলে যেও না আমার আদরের ছোট ভাইও ছিল সে। সে আর আমি একসাথে অনেক ঝড় ঝাপটা সহ্য করেছি, এবং কখনও চিন্তা করিনি এতো শীঘিই আমরা তাকে হারাব…কিন্তু সেটাই আল্লাহর ইচ্ছা।’

হুমায়ুন দৃষ্টি সরিয়ে নেয়, প্রথম মুঘল সম্রাট, তার বাবাকে সে আর কখনও দেখতে পাবে না এই ভাবনায় যে তার চোখের কোণে অশ্রুবিন্দু চিকচিক করছে সেটা সে এমনকি খানজাদাকেও দেখাতে অনিচ্ছুক। শক্তিশালী, পোড় খাওয়া এক যোদ্ধা, যে তার যাযাবর ঘোড়সওয়ার বাহিনীকে কাবুল থেকে পাহাড়ের গিরিপথের ভিতর দিয়ে নীচে নেমে এসে, একটা সাম্রাজ্যের খোঁজে সিন্ধু নদ অতিক্রম করেছিল, আজ মৃত, এই ভাবনাটাই কেমন অসম্ভব মনে হয়। এমনকি এই ভাবনাটা আরও বেশী অবাস্তব মনে হয় যে মাত্র তিনমাস আগে কোমরে ঈগলের মস্তক শোভিত হাতলযুক্ত তাঁর পিতার তরবারি আলমগীর আর আঙ্গুলে তাঁর পূর্ব পুরুষ তৈমুরের অঙ্গুরীয় ধারণ করে নিজেই নিজেকে মোগল সম্রাট বলে বিঘোষিত করেছে সে।

‘সবকিছু এতো বিচিত্র… অনেকটা একটা অলীক কল্পনার মতো যা থেকে প্রতিনিয়ত আশা করছি জেগে উঠব আমি।’

‘এটাই বাস্তব দুনিয়া আর তোমার উচিত একে মেনে নেয়া। বাবর যা চেয়েছিল, যার জন্য জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছিল সে, সবকিছুর কেবল একটাই উদ্দেশ্য ছিল- একটা সাম্রাজ্য হাসিল করা এবং রাজবংশের পরম্পরার পত্তন। আমি যেমন এটা জানি তুমিও জানো- মোগলদের জন্য হিন্দুস্তান হাসিল করতে পানিপথের যুদ্ধে যখন সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাস্থ করেছিল সে তুমি কি তোমার পিতার পাশে সেদিন লড়াই করনি?’

হুমায়ুন নিশ্চুপ থাকে। কোনো কথা না বলে আরেকবার আকাশের দিকে তাকায় সে। যখন সে আকাশের দিকে তাকায়, স্বর্গের বুক থেকে একটা উল্কা খসে পড়ে মিলিয়ে যেতে দেখে, এর জ্বলন্ত পুচ্ছের বিন্দুমাত্র চিহ্নও থাকে না। আড়চোখে খানজাদার দিকে তাকালে দেখে যে তিনিও উল্কাপাতটা লক্ষ্য করেছেন।

‘উল্কাপাত সম্ভবত কোনো একটা কিছুর পূর্বলক্ষণ। এটা সম্ভবত ইঙ্গিত করছে লজ্জাকরভাবে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে আমার রাজত্ব…আমার কথা কেউ মনে রাখবে না…’।

‘তোমার বাবা যদি এখন এখানে থাকতেন তাহলে নিজের প্রতি এই ধরনের সন্দেহ আর চলচিত্ততা তাকে কুদ্ধ করতো। তোমার নিয়তিকে তুমি বরণ করে নাও বরং এটাই চাইতেন তিনি। নিজের উত্তরাধিকারী হিসাবে তোমার বাকি তিন সৎ-ভাইদের ভিতর থেকে একজনকে পছন্দ করতে পারতেন তিনি কিন্তু তোমাকে মনোনীত করেছেন। তুমি সবার ভিতরে বড় এটাই কারণ না- আমাদের গোত্রের লোকেরা বিষয়টা কখনও এভাবে বিবেচনা করে না। তিনি তোমাকে সবচেয়ে যোগ্য আর গুণী ভেবেছিলেন সেজন্য। হিন্দুস্তানের উপরে আমাদের আধিপত্য এখনও অনিশ্চিত- মাত্র পাঁচ বছর আগে আমরা এদেশে এসেছি এবং চারপাশ থেকে বিপদের আশঙ্কা এখনও রয়ে গেছে। বাবর তোমাকে নির্বাচন করেছিলেন কারণ তিনি কেবল তোমার সাহসিকতায়, যা তুমি ইতিমধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রমাণ করেছে, আস্থাশীল ছিলেন না বরং সেইসাথে তোমার আত্মবিশ্বাস, আর তোমার আত্মার শক্তি, আমাদের পরিবারের শাসন করার অধিকার সম্বন্ধে তোমার বিবেচনা বোধ, যা এখানে এই নতুন ভূখণ্ডে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে আর সমৃদ্ধি লাভ করতে আমাদের রাজবংশে অবশ্যই থাকতে হবে।’ খানজাদা দম নেবার জন্য থামেন।

হুমায়ুন যখন কোনো উত্তর দেয় না, তিনি মশালের আলোয় নিজের মুখ তুলে ধরেন এবং তাঁর ডান ভ্র থেকে প্রায় চিবুক পর্যন্ত নেমে আসা একটা সরু সাদা ক্ষতচিহ্নে আলতো করে নিজের আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করেন। আমি মুখে এটা কিভাবে এসেছে, আমি যখন তরুণী ছিলাম আর উজবেকদের হাতে তোমার বাবাকে সমরকন্দ তুলে দিতে হয়েছিল তখন কিভাবে তাদের গোত্রপতি সাইবানি খান আমাকে অপহরণ করেছিল আর তার ইচ্ছার কাছে আমাকে নতজানু হতে বাধ্য করেছিল। সে আমাদের মতো, যাদের ধমনীতে তৈমূরের রক্ত বইছে, তাদের সবাইকে ঘৃণা করতো। আমাদের বংশের কোনো যুবরাজকে অবমানিত আর তার মর্যাদাহানি তাঁকে পৈশাচিক আনন্দ দিত। আমি কৃতজ্ঞ যে তাঁর হারেমে বন্দিনী অবস্থায় পুরোটা সময় আমি কখনও হতাশ হইনি… কখনও ভুলে যাইনি আমি কে বা এটা আমার দায়িত্ব যে আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। মনে রেখে যে আরেকটা মেয়ে যখন অতর্কিতে আক্রমণ করে আমার সৌন্দর্যের কিছুটা চুরি করেছিল, আমি এই ক্ষতচিহ্ন সম্মানের স্মারক হিসাবে ধারণ করেছিলাম- সবাইকে দেখাতে চেয়েছিলাম যে আমি এখনও বেঁচে আছি এবং নিশ্চয়ই একদিন আবারও মুক্ত হব। সেই দিনটা এসেছিল সুদীর্ঘ দশ বছর পরে। আমার ভাইয়ের সাথে আমি পুনরায়– মিলিত হই আর আমার প্রত্যাবর্তন উপলক্ষ্যে সাইবানি খানের করোটি দিয়ে নির্মিত একটা পানপাত্র থেকে তাঁকে পান করতে দেখে সেদিন আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছিলাম আমি। হুমায়ুন আমার যেমন ছিল, তোমাকেও সেই একইরকম আত্মবিশ্বাসে আর চারিত্রিক দৃঢ়তায় বলীয়ান হতে হবে।

‘সাহসিকতায় আপনার সমকক্ষ হওয়া খুব কঠিন, কিন্তু কথা দিচ্ছি আমার বাবার ইচ্ছা বা আমাদের বংশের কোনো অমর্যাদা আমি হতে দেব না।’

‘তাহলে কি নিয়ে এতো চিন্তা করছো? তুমি বয়সে নবীন, উচ্চাকাঙ্খী… তোমার বাবা অসুস্থ হবার বহু পূর্বেই মসনদের প্রতি আগ্রহী ছিলে তুমি; সে আমার সাথে বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করেছিল।’

‘তাঁর মৃত্যু যখন হয় তখন বিষয়টা খুবই আকষ্মিক ছিল। আমি অনেক কথাই তাকে বলতে পারিনি। সম্রাটের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আমি এখনও নিজেকে প্রস্তুত বলে মনে করি না…নিদেন পক্ষে এত দ্রুত বা এভাবে নয়।’

হুমায়ুন তাঁর মাথা ঝুঁকে পড়তে দেয়। কথাটা সত্যি। তাঁর বাবার অন্তিম মুহূর্তগুলো তাঁকে এখনও তাড়িয়ে নিয়ে ফিরে। বাবর নিজের শেষবিন্দু শক্তি একত্রিত করে, তার ব্যক্তিগত পরিচারকদের আদেশ দিয়েছিলেন রাজকীয় আলখাল্লায় সজ্জিত করে তার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতে তাঁকে এবং তাঁর অমাত্যদের তাঁর সামনে হাজির হতে। পরিপূর্ণ রাজদরবারের সামনে, দূর্বল কণ্ঠে কিন্তু নিজের সংকল্পে অবিচল, বাবর তার আঙ্গুল থেকে ক্রুদ্ধ গর্জনরত বাঘের মস্তক খোদিত তৈমূরের ভারী সোনার অঙ্গুরীয় খুলে নেয়ার জন্য হৃমায়ুনকে আদেশ দেন এবং বলেন, এটা গর্বের সাথে ধারণ করবে এবং এটা তোমার উপরে যে দায়িত্ব অর্পন করছে সেটা কখনও বিস্মৃত হবে না…’ কিন্তু বাবরের তখন মাত্র সাতচল্লিশ বছর বয়স, তখনও নিজের শ্রেষ্ঠ সময়ের তুঙ্গে এবং নিজের বিকাশমান সাম্রাজ্যের দায়িত্ব আরেকজনের হাতে তুলে দেয়ার জন্য বড্ড অল্প বয়স।

‘কোনো মানুষ, এমনকি একজন সম্রাটের পক্ষেও জানা সম্ভব না কখন আর কিভাবে তার কাছে বেহেশতের ডাক এসে পৌঁছাবে। আমাদের কারো পক্ষেই নিজেদের জীবনের গতিপথ পুরোপুরি অনুমান বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। নশ্বরতার চরম অনিশ্চয়তা আর সেই সাথে ভাগ্যের নানা উত্থানপতন মেনে নিয়ে বাঁচতে শেখাই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে বেড়ে উঠার অংশ।’

‘মানছি। কিন্তু আমি প্রায়শই চিন্তা করি আমাদের জীবনের অন্তরালে মূলগত নকশা অনুধাবনে আমাদের অনেক কিছুই করণীয় রয়েছে। ঘটনা পরম্পরা যা আপাত দৃষ্টিতে এলোমেলো মনে হয় হয়ত তেমনটা নয়। খালাজান, আপনি এইমাত্র যেমন বললেন যে আমার আব্বাজানের মৃত্যু ছিল পরম করুণাময়ের কাম্য, কিন্তু আপনি ভুল করেছেন। সেটা ছিল আদতে আমার আব্বাজানেরই অভিপ্রায়। আমার জন্য তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।’

খানজাদা চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকে। তুমি কি বলতে চাইছো?

আমাকে বলা আব্বাজানের শেষ কথাগুলো কখনও কারো কাছে প্রকাশ করিনি আমি। তিনি মারা যাবার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ফিসফিস করে বলেছিলেন যে কয়েক মাস পূর্বে আমি যখন কঠিন জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলাম, আমার জ্যোতিষী শারাফ তাঁকে বলেছিল সে গ্রহ নক্ষত্র বিবেচনা করে জেনেছে আব্বাজান যদি আমাকে জীবিত দেখতে চান তাহলে তাঁর কাছে যা সবচেয়ে মূল্যবান সেটা অবশ্যই উৎসর্গ করতে হবে তাকে। আর তাই সেজদায় নতজানু হয়ে আমার জন্য আল্লাহর কাছে নিজের জীবন অর্পণ করেছিলেন।

তাহলে এটা বাস্তবিকই আল্লাহর অভিপ্রায়-পরম করুণাময় তার ত্যাগস্বীকার গ্রহণ করেছেন।

না! শারাফ আমাকে বলেছে, সে আসলে বলতে চেয়েছিল যে আমার আব্বাজানের উচিত কোহ-ই-নূর হীরকখণ্ডটা নিবেদন করা তাঁর নিজের জীবন নয়। কিন্তু আমার আব্বাজান তার কথার ভুল ব্যাখ্যা করেছিল…এটা আপাতদৃষ্টিতে আপুতকর যে আমার আব্বাজান আমাকে এতো ভালোবাসতেন, আমাদের সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতের জন্য আমাকে এতো গুরুত্বের চোখে দেখতেন যে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমার প্রতি এতোটা বিশ্বাসের যোগ্য আমি কিভাবে হয়ে উঠব? আমার মনে হয় একদা যে মসনদের জন্য এত উদগ্রীব ছিলাম আমি বোধহয় তার উপযুক্ত নই। আমার ভয় হয় যে এভাবে সূচিত হওয়া রাজত্বকালের ললাটে কলঙ্কের তিলক জুটবে…

এসব ভাবনা অবান্তর। কার্য আর কারণের পেছনের ছক খুঁজতে তুমি বড্ড পরিশ্রম করছে। অনিশ্চয়তা আর ব্যর্থতার ভিতর দিয়ে অনেক রাজত্বেরই সূচনা হয়েছে। তোমার রাজত্বের সমাপ্তি সেরকম হবে না সেটা তোমার নিজের কর্মোদ্যোগের দ্বারা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তোমার উপরেই বর্তায়। বাবর কোনো ত্যাগস্বীকার করে থাকলে তোমার জন্য তাঁর ভালোবাসা আর তোমার প্রতি তাঁর বিশ্বাস থেকেই সেটা করেছে। এটাও মনে রেখো সে কিন্তু সাথে সাথে মৃত্যুবরণ করেনি- তুমি সুস্থ হয়ে উঠার পরেও সে আরো আট মাস সময় জীবিত ছিল। সেই সময়ে তাঁর মৃত্যু হলে সেটা একটা নিছকই কাকতালীয় ব্যাপার হত। খানজাদা দম ফিরে পেতে কথার মাঝে একটু বিরতি দেয়। সে কি তার শেষ সময়ে তোমাকে অন্য আর কিছু বলেছিল?

তিনি আমাকে দুঃখ করতে নিষেধ করেছিলেন…চলে যেতে হচ্ছে বলে তাঁর মন মোটেই ভারাক্রান্ত ছিল না। তিনি অবশ্য আমার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছেন- আমার সৎ-ভাইদের বিরুদ্ধে কিছু না করতে, যতই সেটা তাদের প্রাপ্য হয়ে থাকুক।

খানজাদার মুখে বিদ্রূপ খেলা করে। হুমায়ুন এক মুহূর্তের জন্য ভাবে তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে সে বোধহয় কোনো মন্তব্য করবে, কিন্তু সেটা না করে, সে নিজের ছোট কিন্তু অভিজাত মাথাটা কেবল আন্দোলিত করে, আপাতদৃষ্টিতে সে কোনো মন্তব্য না করাই শ্রেয় মনে করেছে।

এবার চল। এসব চিন্তাভাবনা অনেক হয়েছে। হারেমে চাদর বিছানো হয়ে গিয়েছে। তোমার আম্মিজান আর অন্যান্য মহিলাদের তুমি নিশ্চয়ই অপেক্ষা করিয়ে রাখবে না। কিন্তু হুমায়ুন…একটা শেষ অভিপ্রায়। ভুলে যেও না যে তোমার নামের মানে ভাগ্যবান। সৌভাগ্য তোমার পায়ে এসে লুটিয়ে পড়বে যদি শারীরিক আর মানসিকভাবে তুমি শক্তিশালী হও আর সুযোগের সদ্ব্যবহার কর। নিজের প্রতি তোমার এসব অর্থহীন সন্দেহ পরিত্যাগ কর। অন্তবীক্ষণ একজন কবি বা সুফিসাধকের জীবনে হয়ত গুরুত্ব বহন করতে পারে কিন্তু একজন ম্রাটের জীবনে এর কোনো স্থান নেই। তোমার আব্বাজান- আর নিয়তি তোমাকে যা দান করেছে দুহাতে সেটা গ্রহণ কর।

শেষবারের মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে সে দেখে চাঁদ মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে, হুমায়ুন ধীর পায়ে তার খালাজানকে অনুসরণ করে পাথরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় যেটা জেনানা মহলের দিকে নেমে গিয়েছে।

*

কয়েক সপ্তাহ পরের কথা- সম্রাটের ব্যক্তিগত কামরায় হুমায়ুনের সামনে তাঁর অশ্বশালার নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সচরাচর উফুল্ল, আর কিঞ্চিৎ স্কুলবুদ্ধির বাবা ইয়াসভালো নিজেকে ভূম্যবলুণ্ঠিত করে, কোনো বিচিত্র কারণে সে সন্ত্রস্ত। লোকটা আনত অবস্থা থেকে পুনরায় যখন উঠে দাঁড়ায় এবং মুখ তুলে তাঁর দিকে তাকায়, হুমায়ুন লক্ষ্য করে যে লোকটার চোখের নিম্নাংশের চওড়া হাড়ের উপরে তার ত্বক যেন অস্বাভাবিকভাবে টানটান হয়ে প্রসারিত হয়ে রয়েছে এবং তার কপালের পাশে একটা শিরা দপদপ করছে।

সুলতান, আমাকে একাকী যদি আপনার সাথে কথা বলার অনুমতি দিতেন? বাবা ইয়াসভালো রৌপ্য নির্মিত হুমায়ুনের নীচু বসবার আসনের দুপাশে দণ্ডায়মান প্রহরীদের দিকে চকিত দৃষ্টিতে তাকায়। একটা অস্বাভাবিক অনুরোধ। নিরাপত্তার খাতিরে সম্রাট কদাচিৎ একাকী অবস্থান করেন। এমনকি তিনি যখন হারেমে অবস্থান করেন তখনও ঘাতকের তরবারির আঘাত নাকচ করতে সতর্ক প্রহরীর দল সবসময়ে তার আশেপাশেই অবস্থান করে। কিন্তু বাবা ইয়াসভালো, যে হুমায়ুনের মৃত আব্বাজানের অধীনে বিশ্বস্ততার সাথে যুদ্ধ করেছে, তাকে বিশ্বাস করা যায়।

হুমায়ুন প্রহরীদের কামরা ত্যাগ করতে আদেশ দেয় আর ইঙ্গিতে বাবা ইয়াসভালোকে কাছে আসতে বলে। লোকটা সামনে এগিয়ে আসে বটে কিন্তু কথা বলতে ইতস্তত করে, সে তার মাথার খোঁচা খোঁচা চুল চুলকায়, যা তাঁকে তাঁর গোত্রের সনাতন পদ্ধতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, হিন্দুস্তানে আসবার পরে সে মাথা কামান শুরু করলেও, ধুসর রুক্ষ চুলের একটা গোছা সে রেখে দিয়েছে যা একটা টাসেলের মতো দোল খায়।

বাবা ইয়াসভালো, বলল। তুমি আমাকে কি বলতে চাও?

খারাপ খবর…সুলতান, ভয়াবহ খবর… বাবা ইয়াসভালের মুখ দিয়ে প্রায় আর্তনাদের মতো একটা দীর্ঘশ্বাস নির্গত হয়। আপনার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্র দানা বেধেছে।

ষড়যন্ত্র? সহজাত প্রবৃত্তির বশে হুমায়ুনের হাত তার হলুদ পরিকরের ভাঁজে গোঁজা রত্নখচিত দুধারি খঞ্জর স্পর্শ করে এবং কিছু বুঝে উঠার আগেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে। কার এতো বড় দুঃসাহস…?

বাবা ইয়াসভালো নিজের মাথা নত করে। সুলতান, আপনার সৎ-ভাইয়েরা।

আমার ভাইয়েরা…? মাত্র দুমাস আগে সে আর তার ভাইয়েরা আগ্রা দূর্গের প্রাঙ্গণে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল যখন বারোটা কালো ষাড় জোতা গিল্টি করা গাড়িটা তাঁদের মরহুম আব্বাজানের রূপার শবাধার নিয়ে কাবুলের পথে দীর্ঘ যাত্রায় রওয়ানা হয়, বাবর সেখানেই তাকে সমাধিস্থ করার অনুরোধ করেছিলেন। তার নিজের মতো তার সৎ-ভাইদের চোখে মুখেও শোকের একটা স্পষ্ট ছাপ ফুটেছিল এবং সেই শোকাবহ মুহূর্তগুলোতে তাঁদের প্রতি স্নেহ আর মমত্ববোধের একটা আকষ্মিক বেগ তাঁকে আপুত করে তুলে এবং আস্থার জন্ম দেয় যে তাঁদের মরহুম আব্বাজানের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে তাঁরা তাঁকে সাহায্য করবে: হিন্দুস্তানে মোগলদের আধিপত্যকে অনাক্রম্য করতে।

বাবা ইয়াসভালো হুমায়ুনের চোখে মুখে অবিশ্বাস আর সংক্ষোভ ঠিকই পড়তে পারে। সুলতান, আমি সত্যি কথাই বলছি, যদিও আমাদের সবার স্বার্থে আমাকে এটা বলতে না হলেই আমি খুশী হতাম… বাবা ইয়াসভালো এখন যখন বলতে শুরু করেছে, সে সাহস সঞ্চয় করছে বলে মনে হয়, পুনরায় পানিপথে মোগলদের হয়ে লড়াই করা সেই পোড় খাওয়া যোদ্ধার সত্তা তার ভিতরে ফিরে আসতে থাকে। তার মাথা এখন আর নত না এবং সে হুমায়ুনের চোখের দিকে নিঃশঙ্কভাবে তাকিয়ে রয়। আপনি আমাকে সন্দেহ করবেন না যখন আমি আপনাকে বলবো যে আমি এই তথ্য আমার ছোট ছেলের কাছ থেকে জানতে পেরেছি…সে ষড়যন্ত্রকারীদেরই একজন। সে মাত্র ঘন্টাখানেক আগে আমার কাছে এসে সবকিছু স্বীকার করেছে।

সে এটা কেন করেছে? হুমায়ুনের চোখ সরু হয়ে আসে।

কারণ নিজের জীবনের জন্য সে ভীত…কারণ সে বুঝতে পেরেছে সে চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে…কারণ সে জানে তার কর্মকাণ্ড আমাদের গোত্রের জন্য কেবল অসম্মান আর ধ্বংসই ডেকে আনবে। এই শেষের শব্দগুলো যখন সে বলছে, বাবা ইয়াসভালোকে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ পরিশ্রম করতে হয় বলে তাঁর চোখমুখ কুচকে যায়।

আমার কাছে এসে সবকিছু খুলে বলে তুমি ভালোই করেছে। আমাকে সবকিছু বলো।

মহামান্য সুলতান, আপনার মরহুম আব্বাজানের শবাধার কাবুলের পথে রওয়ানা হওয়ার বড়জোর এক পক্ষকাল পরেই, যুবরাজ কামরান, আসকারি আর হিন্দাল এখান থেকে ঘোড়ায় চড়ে যেতে দুদিন লাগে এমন দূরত্বে অবস্থিত একটা দূর্গে মিলিত হয়। আপনি হয়ত অবগত আছেন যে আমার ছেলে কামরানের অনুগত, সে ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়ার জন্য তাঁকে প্রচুর পারিতোষিকের লোভ দেখায়। মাথা-গরম অল্পবয়সী নির্বোধ যা সে আসলেও, সে তাদের সাথে যোগ দিতে সম্মত হয়, আর তাই সবকিছু দেখে আর শোনে।

আমার ভাইয়েরা কি পরিকল্পনা করছে?

আপনাকে বন্দি করবে আর তারপরে আপনাকে বাধ্য করবে সাম্রাজ্য ভাগ করতে আর তাঁদের কাছে আপনার কিছু এলাকা সমর্পন করতে। সুলতান তারা সনাতন প্রথায় ফিরে যেতে চায়, যখন প্রত্যেক সন্তানই তাদের বাবার ভূখণ্ডের একটা অংশের অধিকার লাভ করতো।

একটা নিষ্প্রাণ হাসি হুমায়ুনের চেহারায় ভেসে উঠে। আর তারপরে কি হবে? তারা কি এতেই সন্তুষ্ট থাকবে? অবশ্যই না। তারা অচিরেই একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে আর সেই সুযোগে শত্রুরা আমাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরবে।

সুলতান, আপনি ঠিকই বলেছেন। তারা এমনকি এখনই নিজেদের ভিতরে একমত হতে পারছে না। কামরান হল আসল উস্কানিদাতা। পুরো ষড়যন্ত্রটাই তার মস্তিষ্কপ্রসুত আর তার সাথে যোগ দিতে সেই সবাইকে প্ররোচিত করেছে, কিন্তু তারপরেই আসকারি আর তার ভিতরে রীতিমতো হাতাহাতি শুরু হয়েছে সমৃদ্ধ প্রদেশগুলো তাদের ভিতরে কে নেবে সেটা নিয়ে। তাদের অনুগত লোকেরা কোনোমতে তাঁদের হাতাহাতি থেকে বিরত করেছে।

হুমায়ুন কোনো কথা না বলে পুনরায় বসে পড়ে। বাবা ইয়াসভালের কথা তার কাছে সত্যিই মনে হয়। তার চেয়ে কেবল পাঁচ মাসের ছোট, তার সৎ-ভাই কামরানকে যখন কাবুল শাসনের জন্য সেখানের রাজপ্রতিভূ হিসাবে রেখে আসা হয় তখন সে নিজের অসন্তোষ গোপনের কোনো চেষ্টাই করেনি। হিন্দুস্তানের অভিযানে হুমায়ুন তাদের আব্বাজানের সঙ্গী হয়। কামরানের আপন ভাই, পনের বছরের আসকারিকে, তাঁদের সাথে যোগ দেবার জন্য খুব বেশী একটা কষ্ট করতে হয়নি। কামরান যেখানে যেত সেখানেই একনিষ্ঠ ভক্তের মতো সে সবসময়ে তাঁকে অনুসরণ করতে যদিও কামরান তাকে কখনও দূর্বল পেয়ে নিপীড়ন করতো আবার কখনওবা তাঁকে প্রশ্রয় দিত। কিন্তু বাবা ইয়াসভালের বক্তব্য যদি সঠিক হয়, এখন তাহলে আসকারি প্রায় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হয়ে উঠেছে বড় ভাইকে দ্বৈরথে আহ্বান জানাতে সে মোটেই ভীত নয়। সম্ভবত তাঁদের দুজনকেই তাদের কঠোর মনোভাবসম্পন্ন মা গুলরুখ উসকে দিয়েছে।

কিন্তু তাঁর সৎ-ভাইদের ভিতরে কনিষ্ঠতমের এসবের সাথে কি সম্পর্ক? হিন্দাল কেন এসবের ভিতরে নিজেকে জড়াতে গেল? তার এখন মাত্র বার বছর বয়স আর হুমায়ুনের আপন মা, মাহামের স্নেহ ছায়ায় সে বড় হয়েছে। বহু বছর আগে হুমায়ুনের পরে আর কোনো সন্তানের জন্ম দিতে ব্যর্থ হয়ে নিজের অপারগতায় বিপর্যস্ত মাহাম বাবরের কাছে মিনতি করে তার অন্য স্ত্রী, দিলদারের সন্তানকে চেয়ে নেয়। হিন্দাল যদিও তখনও মাতৃগর্ভে, বাবর- তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর অনুরোধ ফেলতে পারে না- সদ্যোজাত সন্তান তাঁকে উপহার দিবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু হিন্দালের এই প্রতারণায় সে অবশ্য খুব একটা অবাক হয় না। বাবরের নিজের যখন মাত্র বার বছর বয়স তখন প্রথম তিনি রাজা হন। উচ্চাকাঙ্খার আগুন এমনকি কনিষ্ঠতম যুবরাজের ভিতরেও জ্বলে উঠতে পারে।

সুলতান, বাবা ইয়াসভালের ব্যগ্র, আন্তরিক কণ্ঠস্বর হুমায়ুনকে বর্তমানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আমার ছেলের বিশ্বাস যুবরাজরা নিজেদের ভিতরে একমত হতে পারেনি বলেই ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা বাতিল হয়েছে। কিন্তু গতরাতে এখানে এই আগ্রা দূর্গে, তারা পুনরায় মিলিত হয়। আপনাকে তাদের কজায় না আনা পর্যন্ত তারা নিজেদের ভিতরের মতপার্থক্য ভুলে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা তাদের ভাষায় আপনার নির্জনতার জন্য সম্রাটের পক্ষে বেমানান আকাঙ্খার সুযোগ নেবে বলে ফন্দি এঁটেছে এবং পরেরবার আপনি যখন ঘোড়া নিয়ে একাকী বের হবেন তখনই তারা আপনাকে আক্রমণ করবে। কামরান আপনাকে এমনকি হত্যা করার কথাও বলেছে এবং পুরো ব্যাপারটাই যেন একটা দূর্ঘটনার মতো দেখায়। আমার ছেলের তখন বোধোদয় ঘটে। মহামান্য সুলতান আপনার আসন্ন বিপদের কথা অনুধাবন করতে পেরে, সে আমাকে সবকিছু খুলে বলে যা কয়েক সপ্তাহ আগেই তার কবুল করা উচিত ছিল।

বাবা ইয়াসভালো, এভাবে সরাসরি আমার কাছে আসার কারণে, আপনার সাহসিকতা আর আনুগত্যের জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আপনি ঠিকই বলেছেন। পুরো ব্যাপারটার ব্যাপ্তি ভয়ঙ্কর বিশেষ করে যখন আমার সৎ-ভাইয়েরা আমারই বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, আর তারচেয়েও বড় কথা আমাদের আব্বাজানের ইন্তেকালের পরে এতো শীঘই। আপনি কি এ বিষয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করেছেন?

না, সুলতান।

ভালো করেছেন। বিষয়টা নিয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করা থেকে আপনি আপাতত বিরত থাকবেন। আমাকে এখন একটু একা থাকতে দেন। কর্তব্য করণীয় নিয়ে আমি একটু ভাবতে চাই।

বাবা ইয়াসভালো একটু ইতস্তত করে, তারপরে কক্ষ ত্যাগ না করে সে সরাসরি হুমায়ুনের পায়ের কাছে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে মেঝে থেকে অশ্রুসিক্ত চোখে মুখ তুলে তাঁর দিকে তাকায়। সুলতান, আমার ছেলে, আমার আহাম্মক ছেলেটা…তাকে এবারের মতো মার্জনা করুন…সে সত্যিই নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত। সে ভালো করেই জানে এবং আমিও জানি আপনার ক্রোধ স্বাভাবিক আর মৃত্যুদণ্ডই তার প্রাপ্য, কিন্তু আমি আপনার কাছে তাঁর প্রাণ ভিক্ষা চাইছি, তার প্রতি একটু করুণা প্রদর্শন দেখান…

বাবা ইয়াসভালো। এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র সম্বন্ধে আমাকে অবহিত করার জন্যই শুধু আপনার অতীত আনুগত্যের কথা স্মরণে রেখে আমার কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ আমি আপনার ছেলেকে কোনো শাস্তি দেব না। তার কর্মকাণ্ডকে অল্প বয়সের অবৈচক্ষণ্য হিসাবে আমি এবারের মতো বিবেচনা করবো। কিন্তু এই ঝামেলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আশা করবো আপনি তাকে নিরাপদ কোনো স্থানে আটকে রাখবেন।

বাবা ইয়াসভালের দেহের ভিতর দিয়ে যেন একটা কম্পনের রেশ বয়ে যায় এবং এক মুহূর্তের জন্য লোকটা কৃতজ্ঞতায় চোখ বন্ধ করে। তারপরে সে উঠে দাঁড়ায় এবং মুণ্ডিত মস্তক নুইয়ে, ধীরে ধীরে পিছনের দিকে সরে যায়।

হুমায়ুন, নিঃসঙ্গ হওয়া মাত্র, দ্রুত নিজের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় এবং কারুকার্যখচিত একটা পানপাত্র আকড়ে ধরে রাজকীয় কক্ষের ভিতর দিয়ে দৌড়ে যায়। নির্বোধের দল! যত্তসব আহাম্মক! তার ভাইয়েরা যদি নিজেদের পথ নিজেরাই বেছে নিতে শুরু করে তাহলে অচিরেই মোগলরা মামুলি গোত্রগত যুদ্ধেরত যাযাবর জীবনে ফিরে যাবে এবং তাদের এতো কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত সাম্রাজ্য হাতছাড়া হবে। তাদের আব্বাজানের কাছে তাঁরা যে ঋণী সেই বোধটা তাঁদের কোথায় গেল, কোথায় গেল নিয়তি সম্পর্কে তাদের চেতনা?

মাত্র পাঁচ বছর আগের কথা হুমায়ুন বাবরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খাইবার গিরিপথ দিয়ে নীচের সমভূমির দিকে ধেয়ে এসেছিল গৌরবের বিজয়তিলক ছিনিয়ে নিতে। যুদ্ধের সেই রক্ত আর গর্জন, তার ঘোড়ার ঘামের তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে নাসারন্ধ্র ভরে যাওয়া, সুলতান ইব্রাহিম লোদীর রণহস্তীর বৃংহন, মোগল কামানের হুঙ্কার আর তাদের মাস্কেটের গর্জন যখন এইসব নতুন অস্ত্র কাতারের পর কাতার শত্রু সেনার প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিয়েছিল সেইসব স্মৃতির কথা মনে পড়তে আজও তাঁর নাড়ীর বেগ দ্রুততর হয়ে উঠে। বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ সে আজও স্পষ্ট স্মরণ করতে পারে যখন- রক্তরঞ্জিত তরবারি হাতে- পানিপথের ধূলোয় ধুসরিত সমভূমি জরিপ করে সে উপলব্ধি করেছিল হিন্দুস্তান মোগলদের করায়ত্ত হয়েছে। আজ তাঁদের সব অর্জন হুমকির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।

মধ্য এশিয়ায় আমাদের লোকেরা যখন শাসন করতো তখন তারা যেমন বলতো তখত বা তক্তা সিংহাসন বা শবাধার- আমার এসবের কোনো প্রয়োজন নেই। হুমায়ুন ভাবে, আমরা একটা নতুন দেশে এসেছি এবং অবশ্যই নতুন রীতি গ্রহণ করতে হবে নতুবা আমরা সবকিছু হারাব। সে তার গলায় একটা সুক্ষ সোনার হারের সাথে ঝোলান চাবির খোঁজে তাঁর পরিধানের আলখাল্লার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে, উঠে দাঁড়ায় এবং কক্ষের একপ্রান্তে অবস্থিত গম্বুজাকৃতি বাক্সটার দিকে এগিয়ে যায়। সে বাক্সটার তালা খুলে, ঢাকনিটা পেছনের দিকে সরিয়ে দেয় এবং সে যা খুঁজছিলো সেটা দ্রুত খুঁজে বের করে ফুলের নক্সার একটা রেশমের থলে যেটার মুখ সোনার সুতো দিয়ে ভালো করে পেঁচিয়ে বাঁধা। সে খুব ধীরে, প্রায় শ্রদ্ধার সাথে থলের মুখটা খোলে, এবং ভেতরে রক্ষিত সামগ্রী বের করে আনে একটা অতিকায় হীরকখণ্ড যতবারই সে এটা দেখে এর আলোকপ্রবাহী তীব্র ঔজ্জ্বল্যে তার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে। আমার কোহ-ই-নূর, আমার আলোর পর্বত পাথরটার দীপ্তিময় উপরিতলে আলতো করে নিজের আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে সে ফিসফিস করে বলে। পানিপথের যুদ্ধের পরে এক ভারতীয় রাজকুমারী যার পরিবারকে সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে রক্ষা করেছিল তাঁকে এটা উপহার হিসাবে দিয়েছিল সে, পাথরটার এমন একটা নিখুঁত সৌন্দর্য আছে যা দেখে তাঁর সবসময়েই মনে হয় ভারতবর্ষে মোগলরা যা খুঁজতে এসেছে- গৌরব আর জাঁকজমকপূর্ণ সমৃদ্ধি যাঁর পাশে পারস্যের শাহকেও ম্লান মনে হবে-তার সবকিছুই এর মাঝে প্রতিভাত হয়ে আছে।

পাথরটা হাতে ধরা অবস্থাতেই, হুমায়ুন চিন্তিত ভঙ্গিতে তাঁর চেয়ারের কাছে ফিরে আসে। সে একাকী আর বিষণ্ণ ভঙ্গিতে সেখানেই বসে থাকে যতক্ষণ না। নিচের প্রাঙ্গনে দরবারের সময়রক্ষক ঘড়িয়ালী নিজের প্রহরের তার প্রহরার সমাপ্তি ঘোষণা করতে তাঁর পিতলের চাকতিতে আঘাতের শব্দ ভেসে আসে- তাঁকে মনে করিয়ে দেয় যে রাত শেষ হয়ে এল।

সে অনুধাবন করে যে এটা তাঁর প্রথম গুরুতর পরীক্ষা আর সে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করতে বদ্ধপরিকর। তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি যাই হোক- এই মুহূর্তে তার ইচ্ছে করছে সবগুলো সৎ ভাইয়ের গলা পর্যায়ক্রমে টিপে সব কটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেয়- সে অবশ্যই হঠকারী কোনো পদক্ষেপ নেবে না, সর্বোপরি এমন কিছু করবে না যার ফলে বোঝা যায় যে ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস হয়ে গিয়েছে। নিভৃতে দেখা করার জন্য বাবা ইয়াসভালের অনুরোধ কেউ হয়তো খেয়াল করে থাকবে। তার দাদাজান বাইসানগার, বা তার উজির করিম, যে তার মরহুম আব্বাজানের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরামর্শদাতাদের অন্যতম, যদি এখন কেবল এখানে উপস্থিত থাকতো। কিন্তু দুই বয়োজ্যেষ্ঠ লোকই বাবরের শবাধার বহনকারী কাফেলার সাথে কাবুলের পথে রয়েছে সেখানে তাঁকে সমাধিস্থ করার বিষয়টা তারা তদারকি করবে। আগামী কয়েক মাসের ভিতরে তাঁদের ফিরে আসবার কোনো সম্ভাবনা নেই। রাজত্বের গুরুভার, এর সাথে বিদ্যমান একাকীত্ব সম্পর্কে, তার সাথে একবার তার মরহুম আব্বাজান আলোচনা করেছিল। সে খুব ভালো করেই জানে, তাঁকে নিজেকে এবং একমাত্র তাঁকে নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে করণীয় সম্বন্ধে কিন্তু তার আগে তাঁকে অবশ্যই তার মনোভাব গোপন রাখতে হবে।

হুমায়ুন নিজের ক্রোধকে প্রশমিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, সে সিদ্ধান্ত নেয় রাতটা সে তার প্রিয়তমা রক্ষিতার সাথে কাটাবে- কাবুলের উত্তরের পাহাড়ী অঞ্চল থেকে আগত গোলকার মুখাবয়ব, ধুসর চোখের এক সুনন্যা তরুণী। সালিমা তার রেশমের মতো ত্বক আর কচি ডালিমের মতো স্তনযুগল ব্যবহার করে খুব ভালো করেই জানে কিভাবে তাঁর দেহকে আত্মহারা করে তুলতে হবে এবং পুরো বিষয়টা সে স্পষ্টতই উপভোগ করে। সালিমার প্রণয়স্পর্শ সম্ভবত আজ রাতে তাঁকে মন পরিষ্কার করতে আর তার ভাবনাগুলোকে বিন্যস্ত করতে সাহায্যই করবে এবং তাহলে হয়তো অনাগত ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা একটু হাল্কা হবে যা সম্ভবত সহসাই আর অলুক্ষণে ভঙ্গিতে কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করেছে।

তিন ঘন্টার পরে, হারেমে সালিমার কক্ষে রেশম-আবৃত একটা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় হুমায়ুন শুয়ে থাকে। তার পেষল শরীর, পোড় খাওয়া পরীক্ষিত একজন যোদ্ধর পক্ষে মানানসই ক্ষতচিহ্নে অলঙ্কত, বাদাম তেলে সিক্ত হয়ে দীপ্তি ছড়ায় মেয়েটা তার ত্বকে চটুল ভঙ্গিতে সেটা মালিশ করেছে যতক্ষণ না এক মুহূর্তও অপেক্ষা করাটা অসহ্য হয়ে উঠে, হুমায়ুন তাকে বুকে টেনে নেয়। সালিমার ধুসর হলুদ বর্ণের মসলিনের স্বচ্ছ আলখাল্লা- হুমায়ুনের সদ্য অধিকৃত ভূখণ্ডের একটা সামগ্রী, যেখানের তাঁতিরা এতো সূক্ষ আর কমনীয় কাপড় বয়ন করে তারা যার নাম রাখে বায়ুর হৃৎস্পন্দন বা ভোরের শিশির- ফুলের নক্সা ভোলা কার্পেটের উপরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে। সালিমা যদিও তাঁকে পরিতৃপ্ত করেছে এবং তাঁর প্রতি মেয়েটার সাড়া বরাবরের মতোই প্রবল আর হুমায়ুনের উত্তেজনা শিথিল হয়েছে, তার মনে তখনও বাবা ইয়াসভালের ফাঁস করা কথাগুলোই ফিরে ফিরে আসে, তাঁর ক্রোধ আর হতাশাকে পুনরায় জাগরিত করে।

সালিমা, কষ্ট করে আমাকে পান করার জন্য একটু গোলাপজল এনে দেবে।

সে নিমেষের ভিতরেই রূপার পানপাত্র যাতে মূল্যবান পাথর দিয়ে গোলাপের বৃত্তাকার প্যানেল প্রণিহিত করা রয়েছে নিয়ে ফিরে আসে। পাত্রের পানির উটের কাফেলায় করে উত্তরের পাহাড় থেকে অতিকায় চাইয়ের আকৃতিতে কেটে আনা বরফ দিয়ে শীতল করা গন্ধটা মুখরোচক। বিছানার পাশে রাখা একটা ছোট কাঠের বাক্স থেকে, হুমায়ুন কয়েকটা আফিমের গুলি বের করে এবং সেগুলো পাত্রের ভিতরে ছেড়ে দেয়, গুলিগুলো পানিতে একটা দুধালো ঘূর্ণি সৃষ্টি করে মিলিয়ে যায়।

পান কর। সে পানপাত্রটা সালিমার ঠোঁটের কাছে তুলে ধরে এবং তাকে ঢোক গিলতে দেখে। তার আনন্দে তাঁকে অংশীদার করাই তার অভিপ্রায়, কিন্তু সে কিছুটা লজ্জিতও বটে তার এমন আচরণের পেছনে আরো একটা অন্য উদ্দেশ্যও রয়েছে। তার আব্বাজান প্রায় প্রাণ হারাতে বসেছিলেন যখন বুয়া- পরাজিত শত্রু সুলতান ইবরাহিম লোদির মা তার ছেলের মৃত্যুর জন্য প্রতিশোধ নিতে তাঁকে বিষ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিল। সেই সময় থেকে, অন্য কেউ আগে পরীক্ষা করেনি এমন যে কোনো খাদ্যদ্রব্য সম্বন্ধে হুমায়ুন সবসময়ে সর্তক থাকে…।

আমার প্রভু, নিন। সালিমা, গোলাপজলে আকর্ষণীয়ভাবে সিক্ত ঠোঁটে, সে তাকে চুমু খায় আর পানপাত্রটা হাতে তুলে দেয়। সে পানপাত্রে গভীর চুমুক দেয়, কামনা করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আফিম যেভাবে তার শোকাবেগ ভোতা করে দিয়েছে আর তার উদ্বেগ হ্রাস করেছে সেভাবে কাজ শুরু করুক, তার মানসপটে আলতো করে কুণ্ডলীমুক্ত হয়ে তাঁকে প্রীতিপ্রদ বিস্মরণের মাঝে নিয়ে যাক।

কিন্তু আজ রাতে সে বোধহয় মাত্রা অতিক্রম করেছে বা এর প্রশমন ক্ষমতার কাছে অনেক বেশী কিছু প্রত্যাশা করছে। সে তাকিয়ায় দেহ এলিয়ে দিতে, তার মনের অলিন্দে অশুভ লক্ষণযুক্ত নানা অবয়বের সৃষ্টি হতে থাকে। তার সামনে দীপ্তিময় নীল গম্বুজ আর সরু মিনারযুক্ত একটা অপূর্বসুন্দর শহর ভেসে উঠে। যদিও সেখানে তার সংক্ষিপ্ত অবস্থান মনে রাখার পক্ষে তাঁর বয়সটা খুবই অল্প ছিল, তবুও সে বুঝতে পারে শহরটা সমরকন্দ, তাঁর মহান পূর্বপুরুষ তৈমূরের রাজধানী আর সেই শহর যা তার বাবা দখল করেছিলেন, হারিয়েছিলেন আর সারাটা জীবন সে জন্য আকুল হয়ে থেকেছেন। বাবরের রেখে যাওয়া প্রাঞ্জল বর্ণনা পড়া থাকার কারণে হুমায়ুন বুঝতে পারে সে শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত রেগিস্তান চত্বরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার চোখের সামনে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া তোরণদ্বারের উপরে স্থাপিত গুটিসুটি দিয়ে থাকা কমলা রঙের বাঘটা জীবন্ত হয়ে উঠে, তার কান দুটো মাথার সাথে লেপটে রয়েছে, তীক্ষ্ণ দাঁতের উপরে ঠোঁট টানটান, অবজ্ঞা প্রকাশের জন্য থুতু ফেলতে প্রস্তুত। বাঘটার চোখ দুটো কামরানের চোখের মতো সবুজ।

সহসা, হুমায়ুন নিজেকে বাঘের পিঠের উপরে আবিষ্কার করে, নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে ওটার সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি করছে, টের পায় বাঘটার পেষল শরীর তার নীচে মোচড় খাচ্ছে। সে নিজের উরু দিয়ে তাঁকে শক্ত করে আকড়ে ধরে, প্রাণীটার তপ্ত নিঃশ্বাসের গন্ধ পায় যখন জন্তুটা নিজের দেহ বাকিয়ে, মাথা এপাশ ওপাশ দোলাতে থাকে, তাঁকে ছিটকে ফেলে দেয়ার জন্য বেচারা প্রাণপণ লড়াই করে। হুমায়ুন জটাকে তার দুপা দিয়ে আরও শক্ত করে আটকে ধরে আর টের পায় এর পাঁজর ব্যথায় মোচড়াচ্ছে আর নতুন করে দাপাদাপি শুরু হয়। সে কোনভাবেই ছিটকে যাবে না। সে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে, জটার দেহের নীচে নিজের হাত দুটো পিছলে যেতে দেয়। তার হাতের আঙ্গুলগুলো মাংসপেশী অনুভব করে যা নরম আর মসৃণ এবং তার ভেতরে রয়েছে একটা উষ্ণ, ছন্দোবদ্ধ নাড়ীর স্পন্দন, জটার প্রাণশক্তির উৎস। সে তার মুষ্ঠি শক্ত করার উদ্দেশ্যে চাপ বাড়াতে আর প্রবলভাবে ধাক্কা দিতে থাকলে আচমকা জন্তুটার শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ কর্কশ হয়ে উঠে আর খিচুনী শুরু হয়।

সম্রাট…দয়া করেন…

আরেকটা দুর্বল কণ্ঠস্বর কোথাও থেকে তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে চায়। কণ্ঠস্বরটা নিঃশ্বাস নেবার জন্য হাঁসফাঁস করছে। সে চোখ খুলে তাকায় এবং নিজের প্রসারিত তারারন্ধ্রের ভিতর দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে, হুমায়ুন হিংস্র কোনো বাঘের বদলে সালিমাকে দেখতে পায়। সালিমার দেহ, তার নিজের দেহের মতোই ঘামে চুপচুপে হয়ে ভেজা যেন চুড়ান্ত মুহূর্ত নিকটেই উপস্থিত। কিন্তু যদিও সে আসলেই তাঁর মালিক, হুমায়ুনের পেশল হাতের তালু সালিমার পেলব স্তন প্রচণ্ড জোরে আকড়ে রেখেছে যেন সালিমাই সেই হিংস্র জন্তু যাকে পরাভূত করতে সে লড়াই করছিল। সে তার হাতের মুঠি শীথিল করে কিন্তু রমণের বেগ বাড়িয়ে দেয় যতক্ষণ না তারা দুজনেই সুখানুভূতির শীর্ষে পৌঁছে এবং অবসাদে ভেঙে পড়ে।

সালিমা, আমি দুঃখিত। তোমার উপরে এভাবে হামলে পড়া আমার মোটেই উচিত হয়নি। আমার কেবল মনে হচ্ছিল তোমার জন্য আমার কামনার সাথে প্রভুত্ব স্থাপনের ভাবনাগুলো কেমন এক হয়ে মিশে যাচ্ছে।

দুঃখিত হবার মতো কিছু হয়নি- আপনার প্রেমিক-সুলভ আচরণ আমাকে ভোগসুখে উদ্বেল করে তোলে। আপনি অন্য এক জগতে ছিলেন আর আমি এখানে যেমন করে থাকি আমি সেখানেও নির্দ্বিধায় আপনার সেবায় রত ছিলাম। আমি খুব ভালো করেই জানি আপনি কখনও ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে কষ্ট দেবেন না। এখন এসব ফালতু আলোচনা বাদ দিয়ে আমাকে আরেকবার সঙ্গসুখের তুঙ্গে নিয়ে যান, এইবার একটু কোমলতা আমি আপনার কাছে আশা করতেই পারি।

হুমায়ুন সানন্দে তার প্রত্যাশা পূরণ করে। কামনার ঝড় স্তিমিত হয়ে এলে, সে যখন ক্লান্ত হয়ে শুয়ে থাকে এবং তখনও আফিমের ঘোর পুরোপুরি কাটেনি, হারেমের পরিচারিকার দল সুগন্ধি মেশান শীতল পানি নিয়ে এসে তার গা মুছিয়ে দেয়। অবশেষে সালিমার বাহুডোরে নিজেকে সপে দিয়ে সে নিন্দ্রাদেবীর বরাভয় লাভ করে। এইবার ঘুমের ভেতর কোনো দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করে না, হারেমের সেই কক্ষের জাফরি-কাটা জানালা দিয়ে যখন দিনের প্রথম আলোর কোমল আভা তীর্যক ভঙ্গিতে প্রবেশ করে তখনই কেবল তার সুপ্তির ঘোর কাটে। সে শুয়ে শুয়ে তার মাথার উপরের বেলেপাথরের নক্সা করা ছাদের নীচের অংশে খেলা করতে থাকা আলোক রশ্মির তীব্রতা বৃদ্ধির দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকার সময়েই সে জানে তাকে কি করতে হবে। বাঘের সাথে তার ইচ্ছা শক্তির লড়াই তাকে সে কথা বলে দিয়েছে। সে হল একজন শাসক। সে অবশ্যই সবসময়ে অমায়িক থাকতে পারে না। কখন কঠোর হতে হবে সেটা জানা থাকলেই কেবল কেউ সম্মান অর্জন করতে পারে।

*

মহামান্য সুলতান। আপনার আদেশ পালিত হয়েছে।

দর্শনার্থী কক্ষ-দরবার হলের মর্মরের বেদীতে স্থাপিত তার সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থা থেকে হুমায়ুন তাঁর দেহরক্ষী দলের প্রধানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তাঁর অমাত্য আর সেনাপতিরা কঠোর অগ্রগণ্যতার বিন্যাস বজায় রেখে তার চারপাশে নিজ নিজ স্থানে অবস্থান করছে। সে ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছে আদতেই কি ঘটেছে মধ্যরাত্রি অতিক্রান্ত হবার সামান্য পরেই দেহরক্ষী দলের আধিকারিক তার সাথে নিভৃতে দেখা করতে এসেছিল। কিন্তু সেই সাথে এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে দরবারের সবাই বিষয়টা শ্রবণ করেছে এবং আসন্ন ঘটনাবলী প্রত্যক্ষ করেছে।

তুমি দারুণভাবে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। কি ঘটেছিল সেটা দরবারের সামনে খুলে বল।

মহামান্য সম্রাট যেমন আদেশ করেছিলেন, আমি আর বাছাই করা দেহরক্ষীদের একটা ছোট দল সম্রাটের সম্ভাইদের গত রাতে গ্রেফতার করেছি যখন তারা শাহজাদা কামরানের প্রাসাদে পানাহারে মত্ত ছিল।

হুমায়ুন তার চারপাশে সশব্দে একটা শ্বাসটানার আওয়াজ হতে, অতিকষ্টে নিজের হাসি চেপে রাখে। সে সময়টা ভালোই নির্বাচন করেছিল। বাবা ইয়াসভালো তাঁকে সতর্ক করে দেবার পর থেকে পুরো সময়টা নিরাপত্তার খাতিরে সে নিজেকে দূর্গের অভ্যন্তরে অন্তরীণ রেখেছে। তারপরে সপ্তাহখানেক আগের কথা, কাবুলের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট, উচ্চণ্ড আর দামী, লাল সুরার একটা চালান গজনী থেকে খচ্চরের কাফিলায় করে এসে পৌঁছে- বাইসানগার, তাঁর নানাজানের কাছ থেকে আগত একটা সময়োচিত উপহার। সুরার প্রতি কামরানের দুর্বলতার কথা জানা থাকার কারণে, হুমায়ুন চালানের একটা অংশ তাঁকে উপহার দেয়। সে যেমনটা আশা করেছিল যে কামরান বাকি ভাইদের তার সাথে পানাহারে যোগ দেবার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে, তাকে খুব বেশী একটা সময় অপেক্ষা করতে হয় না। হুমায়ুন যথোচিত সৌজন্যের সাথে আমন্ত্রণ গ্রহণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে কিন্তু আসকারি আর অল্পবয়সী হিন্দাল, যে এখনও সুরাপান উপভোগ করার মতো বয়সে পৌঁছায়নি, কিন্তু নিশ্চিতভাবেই যারা সেটা উপভোগ করে তাদের সাহচর্যে থাকতে শ্লাঘাবোধ করে, দ্বিতীয় কিছু না ভেবেই ব্যগ্রতার সাথে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে। ষড়যন্ত্রের তিন কুশীলব একসাথে, সর্বোপরি অপ্রস্তুত, নিশ্চায়ক হামলার জন্য উপযুক্ত সুযোগ।

আমার ভাইয়েরা কি প্রতিরোধের চেষ্টা করেছিল?

শাহজাদা কামরান নিজের খঞ্জন বের করেছিলেন আর আমার একজন লোককে তার কানের লতি দ্বিখণ্ডিত করে তাঁকে আহত করেছে, কিন্তু তার এই প্রয়াস ছিল ক্ষণস্থায়ী। অন্যেরা লড়াই করার কোনো আগ্রহই প্রকাশ করেনি।

হুমায়ুনের চাহনী তাঁর সামনে দাঁড়ানো লোকগুলোর উপর দিয়ে ভেসে বেড়ায়। কয়েকদিন আগে, আমি আমার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারি। আমার সৎ-ভাইয়েরা আমাকে অপহরণের এবং বলপ্রয়োগ করে আমার সাম্রাজ্যের কিছুটা আদায়ের পরিকল্পনা করেছে- সম্ভবত তারা আমাকে হত্যাই করতে চেয়েছিল। তার অমাত্যদের আদতেই বিক্ষুব্ধ দেখায়। হুমায়ুন ভাবে, তাদের ভিতরে কতজন অভিনয় করছে। কয়েকজন, অবশ্যই, ষড়যন্ত্রের কথা আগে থেকেই জানতো, এমনকি নিরব সমর্থন দিয়েছে। উপজাতীয় গোত্রপতিদের কয়েকজন যারা হিন্দুস্তান বিজয়ের অভিযানে বাবরের সাথে ছিল কখনই তাদের নতুন বাসস্থানের সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি। এই নতুন ভূখন্ত্রে বৈচিত্র্যহীন, আপাতদৃষ্টিতে শেষ না হওয়া সমভূমি, এখানকার বাতাসের উষ্ণতা আর তার সাথে প্রবাহিত বালুকণা এবং অঝোর ধারায় সিক্ত করা বর্ষাকাল তারা অপছন্দ করতো। তারা গোপনে অন্তরে লালন করতো, বরফাবৃত পাহাড় এবং খাইবার গিরিপথ আর তার ওপারে তাদের মাতৃভূমির শীতল স্রোতস্বিনীর জন্য তাদের ভেতরে একটা আকুতি ছিল। তাদের ভিতরে অনেকেই হয়তো ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে গোপনে সহযোগিতা করার এই সুযোগকে স্বাগতই জানিয়েছিল যার ফলে তারা হয়তো বেশ ভালো রকমের ধনসম্পদ নিয়ে দেশে ফিরে যেতে পারবে। বেশ, এখন ব্যাটারা উৎকণ্ঠায় একটু ঘামলে মন্দ কি…

আমার গুণধর ভাইদের আমার সামনে এনে হাজির কর যাতে করে তাদের সহযোগিদের বিষয়ে আমি তাদের প্রশ্ন করতে পারি।

হুমায়ুন আর তার অমাত্যের দল যখন অপেক্ষা করে চারপাশে সমাধি গর্ভের পরম নিরবতা বিরাজ করতে থাকে। অবশেষে, দরবার কক্ষের বাইরের আঙিনায় পাথরের মেঝেতে ধাতব শেকলের ঘষা খাবার শব্দে এই অস্বস্তিকর নিরবতার সমাপ্তি ঘটে। হুমায়ুন মুখ তুলে তাকিয়ে দেখে প্রহরীদের দ্বারা প্রায় ছেড়ে নিয়ে আসার ভঙ্গিতে টলতে টলতে তার ভাইয়েরা সারিবদ্ধভাবে প্রবেশ করছে। প্রথমেই রয়েছে কামরান, তার পাতলা ঠোঁট আর বাজপাখির মতো নাক বিশিষ্ট মুখাবয়বে পরিষ্কার তাচ্ছিল্য ফুটে আছে। তার পায়ে হয়ত শেকল পরান হয়েছে কিন্তু তার স্পর্ধিত মস্তক বহনকারী দেহটার ভঙ্গিমায় স্পষ্ট বোঝা কোনো প্রকারের ক্ষমা প্রার্থনার অভিপ্রায় তার নেই। আসকারির, খর্বকায় আর হাল্কাপাতলা, ব্যাপারটা আবার একেবারেই ভিন্ন। তাঁর দাড়ি না কামানো মুখের ভাঁজে ভাঁজে আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং তার কালো র নীচের ছোট ছোট চোখ দুটো সকাতরে হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। হিন্দাল, তার বড় দুভাইয়ের পেছনে প্রথমে প্রায় ঢাকা পড়ে ছিল, মাথা ভর্তি একরাশ জটপাকান কালো চুলের নীচে তার কিশোর মুখাবয়বে ভয়ের চেয়ে কেমন বোধহীন শূন্য একটা অভিব্যক্তি যেন যা কিছু ঘটতে চলেছে সবকিছুই তার বোধগম্যতার বাইরে।

তাদের কাছ থেকে প্রহরীরা সরে যেতে, আসকারি আর হিন্দাল, প্রথাগত অভিবাদন কুর্নিশ এর রীতি অনুসারে নিজেদের হুমায়ুনের সামনে প্রণিপাতের ভঙ্গিতে আনত করে। আসকারি বেশ কিছুটা সময় ইতস্তত করার পরে, মুখে একটা ঔদ্ধত্যপূর্ণ হাসি ফুটিয়ে তুলে একই কাজ করে।

উঠে দাঁড়াও।

তিনজনের প্রত্যেকের উঠে দাঁড়াবার জন্য প্রাণান্তকর প্রয়াস শেষ না হওয়া পর্যন্ত হুমায়ুন চুপ করে থাকে। এখন সে আরও ভালোও করে খুটিয়ে তাঁদের অভিব্যক্তি যাচাই করতে পারে সে দেখে যে কামরানের মুখের একপাশে একটা কালশিটের দাগ রয়েছে।

নিজেদের কার্যকলাপের জন্য তোমরা কি সাফাই দেবে? তোমরা প্রত্যেকে আমার সৎ-ভাই। আমার বিরুদ্ধে কেন তোমরা ষড়যন্ত্র করতে গেলে?

আমরা কিছুই করিনি…এটা মোটেই সত্যি নয়… উদ্বিগ্ন আর কর্কশ, আসকারির কণ্ঠস্বর মোটেই প্রত্যয়দীপ্ত নয়।

তুমি মিথ্যাচার করছে। তোমার চোখে মুখে সেটা স্পষ্ট ফুটে আছে। তুমি আবারও সে চেষ্টা কর, আমি বাধ্য হব তোমাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে। কামরান, এদের ভিতরে যেহেতু তুমিই সবার বড়, আমার প্রশ্নের উত্তর তুমিই দাও। আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা কেন করতে গেলে?

কামরানের চোখ- তাদের মরহুম আব্বাজান বাবরের চোখের মতোই সবুজাভ দীপ্তিময় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হুমায়ুনের দিকে সে যখন মুখ তুলে তাকায়, কুচকে সরু হয়ে যায়। ষড়যন্ত্রের ধারণাটা আমার মস্তিষ্কপ্রসুত শাস্তি দিতে হলে আমাকে দাও, ওদের নয়। আমাদের প্রতি যে অবিচার করা হয়েছে সেটা সংশোধন করার এটাই একমাত্র পথ। তুমি নিজেই বলেছে যে আমরা সবাই বাবরের সন্তান। আমাদের সবার ধমনীতেই কি তৈমূরের রক্ত বইছে না? আর সেই সাথে আমাদের নানীজান খুতলাঘ নিগারের কারণে চেঙ্গিস খানের রক্ত? অথচ দেখো তোমার চামচা করে আমাদের রাখা হয়েছে, তোমার মর্জিমাফিক এদিক সেদিক বিনাবাক্যব্যয়ে ছোটার জন্য। শাহজাদা নয়, ক্রীতদাসের মতো তুমি আমাদের সাথে আচরণ কর।

আর তোমরা তোমাদের সবাই, কেবল কামরান একা না- ভাইয়ের মতো না, বরং ছিঁচকে অপরাধীর মতো আচরণ করেছে। আমার প্রতি নয় নাই থাকলো, কিন্তু আমাদের রাজবংশের প্রতিও কোনো আনুগত্যবোধ তোমাদের ভিতরে নেই? তার সিংহাসনের ডানপাশের দেয়ালের অনেক উঁচুতে স্থাপিত কাঠের সূক্ষ কারুকাজ করা জাফরির দিকে হুমায়ুন আড়চোখে তাকালে, নিমেষের জন্য একজোড়া কালো চোখ সে দেখতে পায়। নিঃসন্দেহে খানজাদা, আর সম্ভবত তার আম্মিজান মাহাম জাফরির পেছনে অবস্থিত ছোট্ট অলিন্দ থেকে, যেখানে রাজঅন্তঃপুরের রমণীরা নিজেদের লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখে, দরবারের কার্যক্রম দেখতে আর শুনতে পারেন, তাকে পর্যবেক্ষণ করছে। গুলরুখ আর দিলদারও সম্ভবত সেখানে রয়েছে, শিহরিত শঙ্কায় প্রতীক্ষা করছে তাদের সন্তানের প্রতি সে কি শাস্তির বিধান ঘোষণা করে।

কিন্তু এখন যখন সেই মুহূর্ত প্রায় সমাগত, হুমায়ুন এক বিচিত্র অনীহা নিজের ভিতরে অনুভব করে। সে কি করবে সে বিষয়ে মাত্র আধঘন্টা আগেও সে ভীষণভাবে নিশ্চিত ছিল- তৈমূরসম নির্মমতায়, সে কোনো প্রকার কালক্ষেপন না করে কামরান আর আসকারির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেবে, আর হিন্দালকে প্রত্যন্ত কোনো দূর্গে আজীবনের জন্য নির্বাসনে পাঠাবে। কিন্তু তাঁদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে অবাধ্য আর উদ্ধত কামরান, আসকারি আর কিশোর হিন্দাল আক্ষরিক অর্থেই আতঙ্কিত- হুমায়ুন বুঝতে পারে তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হচ্ছে। মাত্র কয়েক মাস আগেই তাদের আব্বাজান ইন্তেকাল করেছে, আর তাছাড়া সে কিভাবে বাবরের অন্তিম ইচ্ছার কথা উপেক্ষা করবে? তোমার ভাইদের বিরুদ্ধে কখনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যেও না, সেটা তাঁদের প্রাপ্য বলে তোমার যতই মনে হোক। প্রেমিকসুলভ আচরণের ক্ষেত্রে আমরা যেমন করে থাকি, কখনও এমন সময় আসবে যখন কঠোর হতে হবে, আর কখনও হতে হবে সহৃদয়।

হুমায়ুন তার সিংহাসন থেকে নীচে নেমে এসে, ধীরে ধীরে তার শিকলাবদ্ধ ভাইদের দিকে হেঁটে যায়, এবং তাঁদের আলিঙ্গন করে, কামরানকে বাহুবন্দি করা দিয়ে বিষয়টা শুরু হয়। তাঁর সামনে মৃদু টলতে থাকা ত্রিমূর্তির চোখে মুখে বিভ্রান্ত অভিব্যক্তি, তার এহেন আচরণের মানে খুঁজতে তারা তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমরা ভাইয়েরা নিজেদের ভিতরে লড়াই করবো এটা ঠিক আমাদের শোভা দেয় না। আমাদের এই নতুন ভূখণ্ডের মাটিতে আমারই হাতে আমাদের বংশের কারো রক্ত ঝরুক এটা আমার কাম্য নয়। আমাদের রাজবংশের জন্য সেটা একটা অশুভ লক্ষণ বলে বিবেচিত হবে। আমার প্রতি তোমরা আনুগত্যের শপথ নাও আর তোমরা তাহলে প্রাণে বেঁচে যাবে। শাসন করার জন্য আমি তোমাদের প্রদেশও প্রদান করবো যা যদিও এই সাম্রাজ্যেরই অংশ, কিন্তু আমার কাছে জবাবদিহি করা ছাড়া, তোমরা স্বাধীনভাবেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে পারবে।

হুমায়ুন তার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অমাত্যবর্গ আর সেনাপতিদের ভেতরে প্রথমে একটা বিস্ময়ের ধ্বনি শুনতে পায় এবং ধীরে ধীরে সেটা সম্মতির ব্যঞ্জনা লাভ করে, এবং গর্বে তার বুকটা ভরে উঠে। চুড়ান্ত মহত্ত্ব একেই বলে। এটাই একজন সত্যিকারের সম্রাটের আচরণ- শক্তহাতে সব মতপার্থক্যের বিনষ্টিসাধন কিন্তু তারপরেই মহানুভবতা প্রদর্শন করা। সে দ্বিতীয়বারের মতো যখন তাঁর ভাইদের আবার আলিঙ্গন করে, আসকারি আর হিন্দালের চোখে তখন কৃতজ্ঞতার অশ্রু চিকচিক করে। কিন্তু কামরানের সবুজাভ চোখ শুকনো থাকে, আর মুখাবয়বে বিষণ্ণ আর দুর্বোধ্য একটা অভিব্যক্তি।

১.২ এক নিলাজ দুশমন

০২. এক নিলাজ দুশমন

লাল বেলেপাথরে নির্মিত আগ্রা দূর্গের প্রাকার বেষ্টিত প্রাঙ্গনে অবস্থিত জলবুদ্বুদ নিঃসরণরত কৃত্রিম প্রস্রবনের পাশ দিয়ে উঁচু বলভিযুক্ত দরবার হলের দিকে যাবার পথে হুমায়ুনের আগে আগে হেঁটে যাওয়া লম্বা আর সাদা পাগড়ি পরিহিত দুই দেহরক্ষীর বুকের বর্মে সকালের সূর্যের আলো সোনার দ্যোতনা তুলে চিকচিক করে। স্তম্ভযুক্ত দরবার কক্ষের, শীতল বাতাসের অবারিত প্রবাহের জন্য যার তিন দিকই উন্মুক্ত, ভিতর দিয়ে আর সমবেত উপদেষ্টামণ্ডলীর কাতারের মাঝে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে, যারা তার অগ্রসর হবার সাথে সাথে প্রথাগত অভিবাদন জানাবার রীতিতে নিজেদের আনত করে, হুমায়ুন কক্ষের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মার্বেলের বেদীতে আরোহণ করে। সেখানে, পরণের সবুজ রেশমের আলখাল্লাটা সামলে নিয়ে সে তার সোনার পাত দিয়ে গিলটি করা, উঁচু পৃষ্ঠদেশযুক্ত সিংহাসনে নিজেকে উপবিষ্ট করে। তার সাথে আগত দুই দেহরক্ষী তরবারির বাটে হাত রেখে সিংহাসনের ঠিক পেছনে, দুই পাশে অবস্থান গ্রহণ করে।

হুমায়ুন ইঙ্গিতে তার উপদেষ্টাদের এবার উঠে দাঁড়াতে বলে। তোমরা জান কেন আজ আমি তোমাদের একসাথে এখানে ডেকে এনেছি- সুলতান বাহাদুর শাহের প্রভৃষ্ট ঠাট-ঠমকের বিষয়ে আলোচনা করতে। আমাদের রাজ্যের দক্ষিণপশ্চিমে গুজরাটের সমৃদ্ধ অঞ্চল নিয়ে সে সন্তুষ্ট থাকতে পারছে না, দিল্লীর পরাভূত সুলতান, ইব্রাহিম লোদি যাকে আমি আর আমার মরহুম আব্বাজান তোমাদের চমকপ্রদ সহায়তার দ্বারা সিংহাসনচ্যুত করেছিলাম, তার সন্তানদের সে। শরণ দিয়েছে। তাঁদের সাথে নিজের পারিবারিক বন্ধনের কথা ঘোষণা করে, নিজের চারপাশে মিত্র সংগ্রহ শুরু করেছে সে। রাজপুত আর আফগান গোত্রগুলিকে তার দূতেরা সুকৌশলে বোঝাতে চাইছে যে আমাদের সাম্রাজ্যের ভিত্তি বাস্তবের চাইতে কল্পনার মানসপটে বেশী প্রোথিত। আমাদের সাম্রাজ্য মাত্র দুইশ মাইল প্রশস্ত হবার কারণে সে বিষয়টা নিয়ে ঠাট্টা উপহাস করছে যদিও খাইবার গিরিপথ থেকে এটা হাজার মাইলের বেশী প্রসারিত। বর্বর হানাদার তকমা দিয়ে তারা আমাদের একেবারে খারিজ করে দিতে চাইছে ভোরের শিশিরের মতো সহজেই যাদের শাসনক্ষমতা থেকে উৎখাত করা যাবে।

আমরা তাদের এই মনোভাব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল এবং আমাদের ঘৃণারও অযোগ্য বলে বিবেচনা করি কিন্তু আজ সকালে এক বার্তাবাহক- সারারাত ঘোড়া দাবড়ে আসবার কারণে পরিশ্রান্ত- খবর নিয়ে এসেছে যে বাহাদুর শাহের একদল সৈন্য, যার নেতৃত্বে ছিল লোদি রাজ্যাভিযোগী তার্তার খান, আমাদের ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে হামলা করেছে। আগ্রা থেকে মাত্র আশি মাইল পশ্চিমে, আমাদের অনুগত এক রাজপুত জায়গিরদারের প্রেরিত উপহারসামগ্রী বহনকারী কাফেলা তারা দখল করেছে। আমি নিশ্চিতভাবে এখন কেবল এটুকুই বলতে পারছি। আমরা কদাপি এমন অসম্মান সহ্য করবো না। আমাদের উচিত এবং অবশ্যই আমরা সুলতানকে এজন্য সমুচিত শিক্ষা দেব। আমাদের উচিত তাঁকে পরাস্ত করা কিনা সে বিষয়ে আলোচনার জন্য আমি আজ তোমাদের এখানে আসতে বলিনি, আমি তোমাদের ডেকেছি কিভাবে সেটা সবচেয়ে ভালোভাবে করা যায় সেটা নিয়ে আলোচনা করতে। হুমায়ুন দম নেয়ার জন্য কথা বন্ধ করে এবং পুনরায় শুরু করার আগে চারপাশে নিজের উপদেষ্টাদের দিকে ভালো করে তাকায়।

হুমায়ুনের আত্মীয়-সম্পর্কিত এক ভাই, এবং তার অশ্বারোহী বাহিনীর সেনাপতি, সুলেইমান মির্জা প্রথম নিজের মতামত প্রকাশ করে। বাহাদুর শাহকে মত দেয়াটা খুব একটা সহজ হবে না। সেটা করতে যাবার আগে নিজেদের শক্তি সামর্থ্যের বিষয়টা একটু বিবেচনা করা উচিত। আপনার মরহুম আব্বাজান যখন দিল্লী জয় করেছিলেন তখনকার কথা আলাদা ছিল, এখন আমাদের শত্রুর চেয়ে আমাদের সৈন্য সংখ্যা, আর যুদ্ধোপযোগী রণহস্তি আর ঘোড়ার সংখ্যা অনেকবেশী। সবগুলো প্রাণীই বেশ ভালোভাবেই প্রশিক্ষিত আর সৈন্যরা বিশ্বস্ত। বাহাদুর শাহের উপচে পড়া রাজকোষ থেকে লুণ্ঠিত দ্রব্যের সম্ভাবনা যুদ্ধের জন্য তাদের আগ্রহকে জোরদার করবে। কিন্তু হিন্দুস্তানে মোগলদের প্রথমবার আগমন আর এখনকার বাস্তবতার মাঝে একটা পার্থক্য রয়েছে। এইবার, কেবল আমরাই না- উভয়পক্ষের কাছেই কামান আর ম্যাচলক গাদাবন্দুক রয়েছে। সুলতান মক্কায় হজ্জ পালন করতে যেসব হজ্জযাত্রী খোলা সমুদ্র অতিক্রম করে সেখানে যায় আর দূরদুরান্ত থেকে আগত বণিককের দল যারা ক্যাম্বে আর সুরাটে অবস্থিত তার সমুদ্রবন্দরে আশেপাশে ভীড় করে উপরে আরোপিত কর থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ অসংখ্য কামান আর বন্দুক কেনার জন্য ব্যয় করেছে এবং অভিজ্ঞ অটোমান অস্ত্রনির্মাতাদের রাজি করিয়েছে তার ঢালাইখানায় কাজ করতে। প্রতিটা যুদ্ধে আমাদের পক্ষে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে আমাদের গোলন্দাজ বাহিনীর উপস্থিতিই যথেষ্ট এমন আত্মশ্লাঘা আমরা আর করতে পারি না। তাদের উপস্থিতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তার আগে আরো একবার আমাদের কৌশল পরিবর্তন করার সময় হয়েছে।

হ্যাঁ, তোমার বক্তব্য বিষয় সহজেই বোধগম্য হয়েছে, কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতায় এটা কিভাবে অর্থবহ হয়ে উঠবে? মাথার টিকি ধরে টানার অবসরে বাবা ইয়াসভালো জানতে চায়।

মহামান্য সম্রাটের আব্বাজান সম্রাট বাবর তাঁর জীবনের শেষ লড়াইগুলোতে যে কৌশল ব্যবহার করেছিলেন এর সাথে তার যৌবনে অনুসৃত কৌশলের সংমিশ্রণ ঘটাতে হবে, সুলেইমান মির্জা উত্তর দেয়। অশ্বারোহী তীরন্দাজদের নিয়ে গঠিত হামলাকারী বাহিনীকে প্রথমে গুজরাটে পাঠান যেতে পারে বাহাদুর শাহের বাহিনীকে তাঁরা যেখানেই দেখতে পাবে সেখানেই তাঁদের আক্রমণ করবে এবং বাহাদুর শাহ তাঁদের বিরুদ্ধে নিজের সৈন্যদের সন্নিবেশিত করার অনেক আগেই তারা বাতাসে মিলিয়ে যাবে। আমাদের মূলবাহিনী কোথা থেকে আক্রমণ করবে সে বিষয়ে তাঁকে একটা বিভ্রান্তির ভিতরে ফেলে দিতে হবে এবং এই পুরোটা সময়ে আমরা রণহস্তি আর গোলন্দাজদের সমন্বয়ে গঠিত আমাদের মূল বাহিনী নিয়ে তাঁর ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে নিশ্চিত নির্ভরতার সাথে এগিয়ে যাব।

হুমায়ুনের অধিকাংশ উপদেষ্টাই যদিও মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করে, কিন্তু বাবা ইয়াসভালো প্রশ্ন করেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাদের মূল বাহিনীর নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু কি হওয়া উচিত?

গুজরাটের গহীন জঙ্গলে অবস্থিত চম্পনির দূর্গ লক্ষ্যবস্তু হলে কেমন হয়? হুমায়ুন প্রস্তাব করেন। বাহাদুরের রাজকোষের একটা বিপুল অংশ এখানে রক্ষিত আছে। আমরা যদি এটা কুক্ষিগত করতে পারি সে বিষয়টা মেনে নিতে পারবে বলে মনে হয় না। আমাদের অবরোধকারী বাহিনীর কাছ থেকে একে মুক্ত করতে সে। বাধ্য হবে আক্রমণ করতে।

সেতো বুঝলাম, কিন্তু আমরা আমাদের অবরোধকারী বাহিনীর পেছনের হুমকি কিভাবে মোকাবেলা করবো? সুলেমান মির্জা জানতে চায়।

বাবা ইয়াসভালো এবার তার প্রশ্নের উত্তর দেয়, আসন্ন যুদ্ধের ভাবনায় তাঁর চোখ চকচক করছে। সময়ের বরাভয় আমাদের পক্ষে থাকবে। আমরা আমাদের কামানগুলো মাটি খুড়ে এমনভাবে স্থাপণ করতে পারি যাতে তাঁরা দূর্গ আর পেছন থেকে আগুয়ান বাহিনীর উপর একই সাথে গুলিবর্ষণ করতে পারে, এবং আমরা আমাদের সেনাবাহিনীকে এমনভাবে বিন্যস্ত করবো যাতে তাঁরা দুপাশেই যুদ্ধ করতে পারে। বাহাদুর শাহ যদি অবরোধ ভাঙা চেষ্টা করে তাহলে সে বিপজ্জনক এক চমকের সম্মুখীন হবে।

আপনার বক্তব্যের মাঝে কোনো খুঁত নেই, হুমায়ুন বলে। গুজরাতের সীমানা অতিক্রমকারী প্রথম হানাদার বাহিনীর নেতৃত্বে আমি নিজে থাকব। বাহাদুর শাহ যখন শুনবে- কথাটা নিশ্চয়ই তার কানে পৌঁছাবে- যে আমি নিজে লড়াইয়ের ময়দানে উপস্থিত আছি, আমাদের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে এটা তাকে আরও বেশী বিভ্রান্তির ভিতরে ফেলে দেবে। সুলেমান মির্জা, আমি বাবা ইয়াসভালো আর আপনার উপরে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য সম্পূর্ণ নির্ভর করছি। আলোচনা আজ এই পর্যন্তই মূলতবী থাকল।

কথাটা বলেই হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং তাঁর দুই দেহরক্ষী আরও একবার তার সামনে অবস্থান নিয়ে আঙ্গিনার অপর প্রান্তে তার খাস কামরার দিকে ধীরে ধীরে তাঁকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। সেখানে পৌঁছাবার পরে সে জওহরকে, তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরিচারক আর রাজ-অনুচর লম্বা, সুদর্শন চেহারার এক তরুণ যার বাবা বাবরের দেহরক্ষী বাহিনীর একজন অধিনায়ক ছিলেন পাঠায় তার ব্যক্তিগত জ্যোতিষীকে একঘন্টার ভিতরে তাঁর সামনে উপস্থিত হবার আদেশ দিয়ে যাতে তাঁর এই অভিযান শুরু করার সবচেয়ে মাঙ্গলিক সময় গণনা করা যায়। তাঁর যুদ্ধ পরিকল্পনা খুব দ্রুতই নির্ধারিত হয়। তাঁর আক্রমণ শুরু করার সময়ের প্রতি জ্যোতিষীর রাশিফল আর গণনার বরাভয় রয়েছে এই দৃঢ় আশ্বাস সম্রাট হিসাবে সে যখন তাঁর প্রথম অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে তখন তাঁর নিজের আত্মবিশ্বাস আর সেই সাথে তার বাহিনীর মনোবলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইত্যবসরে সে তার অভিযানের জন্য নির্বাচিত তার পছন্দের সেনাপতিদের বিষয়ে তাঁর ফুপু খানজাদার বিজ্ঞ পরামর্শের জন্য তাঁর সাথে ঘন ঘন সাক্ষাৎ করে এবং এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ অন্য আরেকটা বিষয়ে সে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর সাথে আলোচনা করতে চায়। সে অভিযান পরিচালনা করতে যখন দূরদেশে যাবে তখন তাঁর সৎ-ভাইদের তাদের আপন আপন প্রদেশে স্বাধীনভাবে রেখে যাওয়াটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে- কামরান রয়েছে উত্তরপশ্চিম দিকে পাঞ্জাবে, আসকারি পূর্বদিকে জুনাপুরে আর হিন্দাল রয়েছে পশ্চিম দিকে আলওয়ারে? তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার এই সুযোগের কি তাঁরা সদ্ব্যবহার করবে? তাঁর কি উচিত তাঁর সেনাবাহিনীতে তাদের সেনাপতির দায়িত্ব দেয়া এবং সাথে করে গুজরাতে নিয়ে যাওয়া যাতে সে তাদের উপরে লক্ষ্য রাখতে পারে?

তাদের নিজ নিজ প্রদেশ থেকে যে সংবাদ তার কাছে এসেছে তাতে এখনই উদ্বিগ্ন। হবার মতো কোনো কারণ নেই, বিশেষ করে হিন্দাল আর আসকারির ক্ষেত্রে তারা তাঁদের প্রশাসনিক বিষয়ের সবকিছু খুটিনাটি তাকে নিয়মিত লিখে পাঠায় এবং তাদের প্রদেয় কর পুরোপুরি প্রদান করে কখনও সময়ের আগেই। কামরানও তাঁর প্রদেশের রাজস্বের ন্যায্য হিস্যা ঠিকমতোই প্রদান করে যদিও তার প্রেরিত দাপ্তরিক বিবরণী অনিয়মিত আর সংক্ষিপ্ত। কখনও কখনও হুমায়ুনের দরবারের কোনো অসন্তুষ্ট কর্মকর্তা কামরানের প্রদেশে যায় সেখানে নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে। আবার কখনও গুজব শোনা যায় যে কামরান তার প্রাদেশিক প্রয়োজনের তুলনায় বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটাচ্ছে, কিন্তু এসবই শেষ পর্যন্ত ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয় বা আঞ্চলিক বিদ্রোহ দমন বা অন্য কোনো কারণের দ্বারা সৈন্য সমাবেশের বিষয়টার ন্যায্যতা প্রতিপাদিত হয়।

কিন্তু কামরান তার উচ্চাকাঙ্খ পরিত্যাগ করার বান্দা না আর সে কেবল কালক্ষেপন করছে আর প্রস্তুত হচ্ছে হুমায়ুনের কোনো দুর্ভাগ্যকে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহারের জন্য এই অনুভূতি থেকে হুমায়ুন কিছুতেই নিজেকে মুক্ত করতে পারে না। তবে তাই হোক। কামরান কোনো কারণে যেন এমন কোনো সুযোগ না পায় সেটা সে নিশ্চিত করবে। সে যাই হোক, এমনও হতে পারে কামরানের, আর সেই সাথে আসকারি আর হিন্দাল, তাঁদের যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে এবং তারা হুমায়ুনের মহানুভবতার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ যেমনটা তাঁদের কাছ থেকে কাম্য, তার এই বিচার ভুল হয়েছে। সে আশা করে তাঁর প্রথম ধারণাটাই সঠিক। যদি কোনো কারণে ব্যাপারটা এমন না হয়, তাঁর নানাজান আগ্রা থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত সে বাহাদুর শাহর বিপক্ষে কোনো ধরনের অভিযান শুরু করবে না। তিনি এবং হুমায়ুনের উজির কাশিম কাবুল থেকে ফিরে আসবার কয়েকদিন পরেই দিল্লীতে শাহী খাজানা পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে গিয়েছেন, আশা করা যায় কয়েক দিনের ভিতরেই তারা ফিরে আসবেন। হুমায়ুন তখন তার অনুপস্থিতিতে বাইসানগারকে রাজপ্রতিভূ নির্বাচিত করবে। সে তার নানাজানকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতে পারে- সেই সাথে কাশিম আর খানজাদাকেও তারা তাঁর কলহপ্রিয় সৎ-ভাইদের উপরে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে।

তাঁরা তাঁর আম্মিজানকেও দেখে রাখবে। বাবরের অসময়োচিত মৃত্যুর পরে পার্থিব বিষয়ে মাহামের যে সামান্য আগ্রহ ছিল সেটাও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। নিজের সন্তান সম্রাট হবার কারণে সে যদিও গর্বিত কিন্তু সে কখনও তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্বন্ধে কোনো প্রশ্ন করে না বা খানজাদার মতো তাকে কোনো পরামর্শও দিতে আসে না। হুমায়ুন তাঁর সাথে যেটুকু সময় কাটায় সে তখন আকুল হয়ে কেবলই অতীতের কথা রোমন্থন করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে হয়তো বুঝতে পারবে যে ভবিষ্যতের ব্যাপারে ব্যাপৃত থাকাই এখন হুমায়ুনের জন্য বাঞ্ছনীয়।

*

একটা বেলেপাথরের পাহাড়ী ঢালের উপর থেকে হুমায়ুন বাহাদুর শাহের সৈন্যদের লম্বা সারির দিকে তাকিয়ে থাকে, যারা তাঁর উপস্থিতি সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন, চারশো ফিট নীচে নদীর তীর দিয়ে এঁকেবেঁকে এগোবার সময়ে পায়ের আঘাতে ধূলোর মেঘ সৃষ্টি করছে। বছরের এই সময়ে- মার্চ মাসের গোড়ার দিকে, সে আগ্রা ছেড়ে আসবার পরে ইতিমধ্যে দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে- নদীর বেশীর ভাগ অংশই শুকিয়ে গিয়েছে কেবল নদীগর্ভের গভীর অংশে কয়েকটা বিক্ষিপ্ত জলাশয় বিরাজ করছে। নদীর তীরে একটা বেমানান তালগাছ সবুজের স্পর্শ হয়ে বিরাজ করছে। হুমায়ুন সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত পদাতিক সেনাদলের সামনে পিছনে অশ্বারোহীবাহিনীর ছোট দল দেখতে পায় এবং এসব আয়োজনের ঠিক মধ্যে একটা মালবাহী গাড়ির একটা বিশাল সারি।

সাফল্যের হাসি লুকিয়ে রাখতে অপারগ, হুমায়ুন তার পর্যাণের উপরে ঘুরে বসে জওহরের সাথে কথা বলার অভিপ্রায়ে, এই অভিযানে তাঁর অনুচর- কর্চি হিসাবে সে তার সাথে এসেছে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমাদের প্রেরিত রেকিদল ভালোই কাজ দেখিয়েছে আর আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে। আমাদের উপস্থিতি সম্বন্ধে গুজরাতিদের কোনো ধারণাই নেই। এখন দ্রুত ঘোড়া দাবড়ে পেছনে যার যেখানে আমরা আমাদের বাকি সঙ্গীসাথীদের রেখে এসেছি। তাদের বলবে আমার আদেশ পাহাড়ী ঢাল বরাবর তাঁরা এগিয়ে আসবে, কিনারা থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে যেন নীচে থেকে তাদের কেউ দেখতে না পায় যতক্ষণ না তারা মাইলখানেক বা আরো কিছুটা সামনে যেখানে ঢালটার নতি অনেকটা সহনীয় হয়ে এসেছে আমাদের শত্রুর উপরে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ করে দিতে। তাদের বলবে আমি আমার দেহরক্ষীবাহিনী নিয়ে সেখানে তাদের সাথে যোগ দিব।

জওহর মাথা নাড়ে এবং ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে রওয়ানা দেয়। হুমায়ুন যখন তাঁর দেহরক্ষীদের নিয়ে পাহাড়ের ঢালের কিনারা থেকে সরে এসে পূর্ব নির্ধারিত মিলনস্থলের দিকে এগিয়ে যাবার প্রস্তুতি নেয়, সে নিজের ভিতরে আশঙ্কা আর উত্তেজনার একটা মিশ্র অনুভূতি নিজের ভিতরে অনুভব করে যুদ্ধের আগে সব সময়ে তার এমনই অনুভূত হয়, কিন্তু পূর্বের চেয়ে এবার দায়িত্ববোধের একটা বাড়তি বোঝা সে নিজের উপরে অনুভব করে। পূর্বে, তার মরহুম আব্বাজান, তিনি যদি সমূহ যুদ্ধক্ষেত্রে নিজে উপস্থিত নাও থাকতেন, পুরো অভিযানের সামগ্রিক পরিকল্পনা অনুমোদন করতেন আর সিংহাসন তাঁর আব্বাজানের এক্তিয়ারভুক্ত- তার নিজস্ব নয়- যা ছিল হুমকির মুখে। ভাবটা মাথায় আসতেই হুমায়ুনের মেরুদণ্ড দিয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে যায় এবং সে তার সাথের লোকদের কিছুক্ষণের জন্য যাত্রাবিরতি করতে আদেশ দেয়। সে কি নিশ্চিত- যতটা নিশ্চিত তার পক্ষে হওয়া সম্ভব- যে তার পরিকল্পনা কার্যকরী হবে- সে কি অভিযানের প্রতিটা অনুষঙ্গ যথেষ্ট সময় নিয়ে যাচাই করেছে যাতে ভাগ্যের উপরে যতটা কম সম্ভব নির্ভর করতে হয়? সে যখন এসব ভাবনায় বিপর্যস্ত তখন সে দুটো খয়েরী রঙের অতিকায় বাজপাখিকে পাহাড়ী ঢলের আড়াল থেকে অনায়াস স্পর্ধায় উপরের মেঘহীন নীল আকাশের দিকে উড়ে যেতে দেখে প্রসারিত ডানায় উষ্ণ বাতাসের বরাভয় তাদের ঊর্ধ্বমুখী উড়ান নিশ্চিত করেছে। সহসা তাঁর মনে পড়ে যায় পানিপথের যুদ্ধের সময় দেখা সেই ঈগলদের কথা যা একটা শুভ লক্ষণ বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এই পাখিগুলোও নিশ্চিতভাবেই সেটাই আবারও প্রমাণিত করবে যখন সে তার গুজরাত অভিযানের প্রথম আঘাত হানতে চলেছে।

নিজের সন্দেহ আর অনিশ্চয়তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, হুমায়ুন তার অবশিষ্ট বাহিনীর সাথে মিলিত হবার জন্য নির্ধারিত মিলনস্থলে পৌঁছে। পুরো বাহিনী রণসাজে বিন্যস্ত হওয়া মাত্র, হুমায়ুন দ্রুত আক্রমণের আদেশ দেয় যা দুটো উপর্যুপরি ঢেউয়ের মতো পরিচালিত হবে। খাড়া উত্রাই বেয়ে বল্পিতবেগে নীচের দিকে ঘোড়া নিয়ে ধেয়ে আসা আক্রমণের প্রথম স্রোত, শত্রুর সেনাসারির পেছনের দিকটা সম্পূর্ণভাবে মোকাবেলা করবে। আক্রমণের পরের স্রোতটা সেনাসারির সামনের যোদ্ধাদের পুরোপুরি ঘিরে ফেলবে যখন তারা থমকে থেমে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করবে তখন তাদের মাঝে সৃষ্ট বিভ্রান্তি কাজে লাগিয়ে আক্রান্ত পেছনের যোদ্ধাদের সহায়তা করতে সম্মুখের যযাদ্ধারা এহেন আচরণ করতে বাধ্য। হুমায়ুন ময়ান থেকে তার আব্বাজানের প্রিয় তরবারি আলমগীর বের করে এর রত্নখচিত বাটে চুমু খায় এবং তার লোকদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে, তোমাদের মনে নিয়ে এসো যোদ্ধার তেজস্বিতা আর কণ্ঠে বীরের দম। আমাদের সদ্য জয় করা ভূখণ্ড রক্ষার জন্য আমরা লড়াই করছি। এসব অহঙ্কারী ভূঁইফোড়দের কাছে আমরা প্রমাণ করবো যে সাহসিকতার জন্য আমাদের সনাতন খ্যাতি আমরা হারিয়ে ফেলিনি। তারপরে মাথার উপরে উত্তোলিত তরবারি আন্দোলিত করে হুমায়ুন আক্রমণের ইঙ্গিত করে এবং কাছাকাছি অবস্থানরত দেহরক্ষীদের সাথে নিয়ে তাঁর বিশাল কালো স্ট্যালিয়নের পাঁজরে খোঁচা দিয়ে ঢাল বেয়ে আক্রমণের জন্য ধেয়ে যায়।

পাহাড়ের গা বেয়ে তারা যখন নীচের দিকে ধেয়ে আসে, পাথরকুচি আর লাল ধূলো তাদের চারপাশে উড়তে থাকে, এরই ভিতরে সে তার সামনে গুজরাতি সেনাদলকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে যখন লোকগুলো তাঁর দিকে ঘুরে তাকায় কিসের এতো শোরগোল সেটা দেখতে। পুরোপুরি অপ্রস্তুত গুজরাতিরা প্রথমে ইতস্তত করে এবং তারপরে তাদের জন্য সময় যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে এমন শ্লথ ভঙ্গিতে তাঁরা তাঁদের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে শুরু করে, তাদের যুদ্ধাস্ত্রের জন্য হাতড়াতে থাকে এবং চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে চারপাশে তাকাতে থাকে তাদের আধিকারিকদের খোঁজে দেখতে চায় তাদের কি আদেশ। কালো শুশ্রুমণ্ডিত এক লোক বাকিদের চেয়ে অনেক দ্রুত, লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নামে এবং তার পর্যাণের সাথে মোটা কাপড়ের ব্যাগের সাথে বাঁধা মাস্কেট টেনে বের করতে চেষ্টা করে।

হুমায়ুন তার ঘোড়ার মুখ বন্দুকধারীর দিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং ডানহাতে নিজের তরবারি আকড়ে ধরে সে যখন তার ঘোড়ার গলার কাছে নুয়ে এসে তার বাহনকে বিড়বিড় করে সামনে ধেয়ে যেতে বলে, নিয়তি আর নেতৃত্বের সব ভাবনা তার মন থেকে তিরোহিত হয়ে সেখানে ভর করে মারা, মরা, বেঁচে থাকার আন্ত্রিক প্রবৃত্তি। নিমেষের ভিতরে সে লোকটার কাছে পৌঁছে যায়, যে তখনও তার মাস্কেটে বারুদ ভরার জন্য কসরত করে চলেছে। হুমায়ুন তার শশ্রুমণ্ডিত মুখ বরাবর তরবারি চালায় এবং লোকটার ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসলে সে মাটিতে আক্রমণকারী অশ্বারোহী বাহিনীর খুরের নীচে পরে যায়। হুমায়ুন ততক্ষণে শত্ৰুসারির অনেক ভেতরে প্রবেশ করেছে, অশ্বারূঢ় হয়ে সামনে এগিয়ে যাবার সময়ে সে দুপাশে পাগলের মতো তরবারি চালাতে থাকে। অকস্মাৎ ভীড়ের মাঝ থেকে বের হয়ে আসতে সে তার হাঁপাতে থাকা, উত্তেজনায় নাক টানতে থাকা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তার বাকি লোকেরা অচিরেই তার চারপাশে এসে জড়ো হয়।

অবিলম্বে যথেষ্ট লোক তাঁর সাথে সমবেত হলে, হুমায়ুন দ্বিতীয়বারের মতো শত্রুর সেনাসারির দিকে ফিরতি আক্রমণ শানায়। এক ঢ্যাঙা গুজরাতি তার হাতের বাঁকান তরবারি দিয়ে তাঁকে আঘাত করলে সেটা বুকের বর্মে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং হুমায়ুনকে তাঁর পর্যাণে ছিটকে ফেলে। হুমায়ুন যখন তার পিছু হটতে থাকা ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ করতে প্রাণান্ত হচ্ছে, সেই সুযোগে গুজরাতি সেনাটা এবার তার দিকে ঘোড়া নিয়ে ধেয়ে আসে এবং নিজের প্রতিপক্ষকে খতম করার অতি-উৎসাহে, হুমায়ুনের মস্তক বরাবর সে তার আন্দোলিত তরবারির নিশানা স্থির করে। সহজাত প্রবৃত্তির বশে হুমায়ুন তরবারির আগ্রাসী ফলার নীচে ঝুঁকে যায় যা তাঁর শিরস্ত্রাণের সামান্য উপর দিয়ে বাতাস কেটে বের হয়ে যায়। গুজরাতি নিজের ভারসাম্য ফিরে পাবার আগেই, হুমায়ুন দ্রুত আলমগীরের ফলা এক ধাক্কায় তাঁর উদরের গভীরে ঢুকিয়ে দেয়। লোকটা তরবারি ফেলে নিজের ক্ষতস্থান চেপে ধরতে, হুমায়ুন ঠাণ্ডা মাথায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিপক্ষের গলার পেছনে আঘাত করে, কাঁধ থেকে তাঁর মাথা প্রায় আলাদা করে ফেলে।

নিজের চারপাশে তাকিয়ে, আন্দোলিত লাল ধূলোর ভিতর দিয়ে হুমায়ুন দেখে যে গুজরাতি সেনাসারি ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছে। অশ্বারোহী বাহিনীর কিছু সৈন্য আতঙ্কে ঘোড়া দাবড়ে পালাচ্ছে। সেনাসারির মাঝে অবস্থানরত অন্যেরা অবশ্য দুর্দান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলে, মালবাহী গাড়িগুলো রক্ষা করছে যেগুলোতে সম্ভবত কামান আর মালপত্র আছে। হুমায়ুন ভালো করেই জানে সে যদি তাদের বন্দি করতেও সক্ষম হয় তবুও সে কোনো কামান বয়ে নিয়ে যেতে পারবে না কারণ সেগুলো তার বাহিনীর অগ্রসর হবার গতি মন্থর করে দেবে যাদের মূল লক্ষ্যই হল দ্রুত এগিয়ে যাওয়া। অবশ্য কামানগুলো সে অকেজো করে দিতে পারে। নিজের ধমনীতে টগবগ করতে থাকা যুদ্ধের উন্মাদনার সাথে এবং তাকে অনুসরণ করার আদেশ ঘোষিত করার জন্য তাঁর তূর্যবাদককে চিৎকার করে আদেশ দিয়ে, হুমায়ুন ঝড়ের বেগে কোনো সময় নষ্ট না করে মালবাহী গাড়িগুলোর দিকে ছুটে যায়।

অকস্মাৎ একটা মাস্কেটের গুলিবর্ষণের শব্দ তার কানে ভেসে আসে- তারপরে আরেকটা মাস্কেটের। গুজরাতি বন্দুকবাজদের কয়েকজন অবশেষে নিজেদের মাস্কেট কার্যক্ষম করতে সক্ষম হয়েছে এবং মালবাহী গাড়িগুলোকে আড়াল হিসাবে ব্যবহার করে তারা গুলিবর্ষণ করছে। হুমায়ুনের কাছ থেকে দশ গজ দূরে ছুটন্ত ঘোড়াগুলোর একটা আঘাতপ্রাপ্ত হয় এবং ধূলোর ভিতরে মুখ থুবড়ে পড়ে এবং পিঠের আরোহীকে মাটিতে ছিটকে ফেলে, তাকে অনুসরণরত সহযোদ্ধাদের ঘোড়াগুলো তাঁকে নিজেদের খুরের তলায় পিষে ফেলার আগে সে মাটিতে শুয়ে এক মুহূর্তের জন্য ছটফট করে, তার দেহে প্রাণের শেষ স্পন্দটুকুও শেষ হয়ে যায়।

হুমায়ুন ভালো করেই জানে বন্দুকধারীরা তাদের বন্দুকে পুনরায় বারুদ ভরার আগেই তাকে মালবাহী গাড়িগুলোর কাছে পৌঁছাতে হবে। আরো একবার আলমগীর আন্দোলিত করে, সে নিজের ঘোড়ার পাজরে গুতো দেয় এবং প্রায় সাথে সাথে গাড়িগুলোর মাঝে গিয়ে উপস্থিত হয়। এক বন্দুকবাজকে লক্ষ্য করে সে তরবার চালনা করে যে কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে তাঁর মাস্কেটের লম্বা নলে ধাতব বলটা একটা ইস্পাতের শলাকার সাহায্যে প্রবিষ্ট করার প্রচেষ্টায় রত। লোকটার মুখে তরবারির ফলা আঘাত হানতে, হাতের অস্ত্র ফেলে দিয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। শত্রুপক্ষ মাল বোঝাই গাড়িগুলোকে টেনে এনে কোনো ধরনের রক্ষণাত্মক বিন্যাস তৈরী করার অবকাশ পায়নি আর তাই হুমায়ুনের লোকেরা, যারা তার পেছন পেছন এসে হাজির হয়, অনায়াসে তাঁদের ঘিরে ফেলে এবং প্রতিটা আলাদা আলাদা গাড়ীর রক্ষীদের পরাভূত করে। গুজরাতি অশ্বারোহী বাহিনীর আরও সেনাসদস্য ঘোড়া দাবড়ে পালায় এবং পদাতিক বাহিনীর সেনা আর সেনাবাহিনীর সাথে আগত অন্যান্য লোকেরা এরপরে কে কত দ্রুত পালাতে পারে যেন তারই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

প্রতিরোধ শেষ- নিদেনপক্ষে এখনকার মতো। হুমায়ুন অবশ্য ভালো করেই জানে যে তাঁর সাথে যে লোক রয়েছে তাদের সংখ্যা বাড়াবাড়ি ধরনের কম আর এই বিষয়টা যখন গুজরাতি বাহিনীর আধিকারিকেরা লক্ষ্য করবে তখন তারা চেষ্টা করবে দলবদ্ধ হয়ে তাঁকে আক্রমণ করতে। আর তাই নষ্ট করার মতো সময় তাঁদের হাতে নেই। হুমায়ুন তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর একটা ক্ষুদে দলকে আদেশ দেয় পলাতকদের পিছু ধাওয়া করতে আর তাঁদের নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ করার নির্দেশ দেয় কিন্তু কয়েক মাইলের বেশী ধাওয়া করতে নিষেধ করে এরপরে ফিরে এসে একটা চলনসই রক্ষণাত্মক ব্যুহ তৈরীর আদেশ দেয়। সে অন্য লোকদের মালবাহী গাড়িতে কি রয়েছে সেটা দেখতে বলে। তারা সাগ্রহে আদেশ পালন করতে এগিয়ে যায় এবং চটের ভারী আচ্ছাদন সরিয়ে ফেলতে ভেতরে ছয়টা মাঝারি মাপের কামান, প্রয়োজনীয় বারুদ, কামানের গোলা আর সেই সাথে নতুন তৈরী করা বর্শার একটা গোছা আর পাঁচ বাক্স মাস্কেট দেখতে পায়।

আমরা মাস্কেটগুলো সব নেব। বাক্সগুলো খালি কর। আমাদের সাথে বাড়তি ঘোড়ার পর্যাণে মাস্কেটগুলো গোছা করে বেঁধে দাও। কামানের নলে যতগুলো বারুদ ভর্তি কাপড়ের ব্যাগ প্রবেশ করান যায়, প্রবেশ করাও আর তারপরে মাটিতে বারুদের একটা রেখা তৈরী করে ওখানে ঐ পাথরের পেছনে নিয়ে যাও। পাথরের পেছন থেকে আমরা বারুদে অগ্নি সংযোগ করবো, হুমায়ুন বলে।

সোয়া এক ঘন্টা পরে সব কাজ শেষ হয়। হুমায়ুন তাঁর বেশীর ভাগ লোককে নিরাপদ দূরত্বে পাঠিয়ে দেয় কিন্তু ধ্বংসযজ্ঞ তদারকি করতে নিজে কয়েকজন দেহরক্ষী নিয়ে পেছনে থেকে যায়। বারুদে অগ্নি সংযোগের সম্মান সে দীর্ঘদেহী এক তরুণ বাদশানীর উপরে অর্পণ করে বেচারা চকমকি পাথরের বাক্স নিয়ে উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে স্ফুলিঙ্গ তৈরীর জন্য কসরত করতে থাকে। সে শেষপর্যন্ত যখন সফল হয়, বারুদের জ্বলন্ত শিখা মাটির উপর দিয়ে ক্রমান্বয়ে থুতু ফেলার মতো একটা শব্দের জন্ম দিয়ে এগিয়ে যায়। একটা ছোট পাথরের সাথে প্রান্ত ঘেঁষে যাবার সময় এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় শিখাটা বুঝি নিভে যাবে কিন্তু পরমুহূর্তেই সেটা আবার সামনে এগিয়ে যেতে আরম্ভ করে। প্রায় সাথে সাথে এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসে আরও পাঁচটা বিস্ফোরণের শব্দ এর পরপরই শোনা যায়। প্রতিটা কামানের নলের ভিতরে বারুদের বিস্ফোরণ ঘটেছে।

ধূলো আর উৎক্ষিপ্ত ধ্বংসাবশেষের টুকরো থিতিয়ে আসতে হুমায়ুন, বিস্ফোরণের বিকট শব্দে তখনও কানে তালা লেগে রয়েছে, দেখতে পায় যে চারটা নল লম্বালম্বিভাবে ফেটে গিয়ে পেছনের দিকে বেঁকে এসেছে ঠিক অনেকটা কলার খোসা ছাড়াবার মতো। আরেকটা আক্ষরিক অর্থেই টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছে। ষষ্ঠ কামানের নলে কেবল ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে- হুমায়ুন ভাবে, কামানটাকে অকেজো করতে এটাই যথেষ্ট। তাঁর লোকেরা এবার দ্রুত ফিরে আসে এবং অবশিষ্ট মালবাহী গাড়িগুলোতে মূল্যবান দ্রব্যের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কেউ একজন কিছু রেশমের কাপড় খুঁজে পায়, অন্য আরেকজন একটা সিন্দুকের তালার ভিতরে তাঁর খঞ্জরের অগ্রভাগ প্রবিষ্ট করিয়ে সিন্দুকটা জোরপূর্বক খুলতে চায় ভেতরে মূল্যবান কোনো পাথর আছে কিনা দেখতে।

হুমায়ুন এর ভেতরেই তার অশ্বারোহী বাহিনীর একজন সদস্যকে যাদের উপরে সে রক্ষণাত্মক ব্যুহ তৈরীর আদেশ দিয়েছিল ঘোড়া দাবড়ে তাঁর দিকে ছুটে আসতে দেখে। সুলতান, গুজরাতিরা পুনরায় একত্রিত হয়েছে। আক্রমণের জন্য তাঁরা প্রস্তুত হচ্ছে, আমরা সংখ্যায় কত অল্প সেটা এখন তাদের চোখে পড়েছে।

আমরা অবশ্যই ফিরে যাব। তূর্যবাদক পশ্চাদপসারণের-সঙ্কেত ধ্বনিত কর। আমরা পাহাড়ের ঢালের উপরে গিয়ে অবস্থান নেব। তারা আমাদের অনুসরণ করার মতো মূর্খতা দেখাবে না। তারা ভালো করেই জানে যে উপরে উঠার প্রয়াসরত অবস্থায় তারা যদি আমাদের আক্রমণের সুযোগ দেয় তবে তার মানে সাক্ষাৎ মৃত্যু।

বিশ মিনিট পরে, বেলেপাথরের সেই ঢালের উপর থেকে নীচের দিকে সেনাসারির ধ্বংসযজ্ঞের দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন গুজরাতিদের সেখানে জটলা করতে দেখে। কয়েকজন অতিলোভী নির্বোধ ছাড়া, যারা লুটের সম্ভাবনায় আবিষ্ট হয়ে মালবাহী গাড়ির দ্রব্যসামগ্রী তল্লাশি করতে অনর্থক দেরী করেছিল, তার বাকি লোকেরা নিরাপদেই ফিরে এসেছে। তাদের ভিতরে, হুমায়ুন বিষণ্ণ মনে ভাবে, সেই তরুণ বাদশানীও রয়েছে, পাহাড়ী ঢালের উদ্দেশ্যে অনেক দেরীতে ঘোড়া ছোটালে পিঠে তীরবিদ্ধ হয়ে বেচারা মাটিতে আছড়ে পড়েছে। তার পর্যাণের সাথে নকশি করা গোলাপি রেশমের চোঙের মতো গোল করে পাকানো রোলের পাক খুলে গিয়ে তার সওয়ারীবিহীন ঘোড়ার পেছনে অবাধে মাটিতে লুটাচ্ছে।

*

চোখের সামনে ওখানে রয়েছে- লম্বা তালগাছের সারি এবং কমলালেবুর ধুসর খোসার মতো বালির পরেই দীপ্তিময় সমুদ্রে মধ্যাহ্নের সূর্যের আলো এমন তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয় যে হুমায়ুন বাধ্য হয় হাত দিয়ে চোখের উপরে একটা আড়াল তৈরী করতে। শক্রর সৈন্যসারির উপরে সাফল্যের সাথে ঝটিকা আক্রমণ পরিচালনা করার পরে হুমায়ুন তাঁর সাথের তিন হাজার সৈন্যের বহরের অর্ধেক সৈন্য তাঁর মূল বাহিনীর সাথে যোগ দেবার জন্য পাঠিয়ে দেয়, যা এই মুহূর্তে অবরোধের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আর অনুষঙ্গ নিয়ে মোগল ভূখণ্ড থেকে চম্পনীর জঙ্গলবেষ্টিত দূর্গের অভিমুখে খুব ধীরে অগ্রসর হতে শুরু করেছে।

হুমায়ুন বাছাই করা দেড় হাজার অশ্বারোহীর একটা চৌকষ বাহিনী নিয়ে নিজে গুজরাতের আরও অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, যেখানেই শত্রুসেনার কোনো বাহিনীকে খুঁজে পায় সেখানেই তাঁদের পরাস্ত আর বিপর্যস্ত করে তুলে। সে নিশ্চিত, তার মূল বাহিনী কোথায় আসল আঘাত হানবে সে বিষয়ে গুজরাতিদের বিভ্রান্ত আর অনিশ্চিত করে তুলতে সে সফল হয়েছে; ঠিক যেমন সে পরিকল্পনা করে এসেছিল। ঝটিকা আক্রমণের সময়ে ধৃত গুজরাতিদের মুখে সামরিক উপকরণ আর বাণিজ্যিক পণ্য বহনকারী একটা কাফেলা কাম্বের সমুদ্র বন্দরের অভিমুখে রওয়ানা হয়েছে জানতে পেরে সেটার পশ্চাদ্ধাবন করে সে সমুদ্রের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে। হুমায়ুন ভাগ্যের কাছে কৃতজ্ঞতা জানায় যে সে কাফেলাটাকে খুঁজতে চেষ্টা করেছিল। সে জওহরকে তার পাশে ডাকে। আমার আদেশ জানিয়ে দাও যে মধ্যাহ্নের খরতাপে আমরা তালগাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেব আর নিজেদের সতেজ করে নেব আর সেই সময়ে আমাদের অনুসন্ধানী দূত কাফেলাটার খোঁজ করবে। সেটার এখন আর খুব একটা বেশী দূরে অবস্থান করার কথা না। বস্তুতপক্ষে, আমরা যা জানতে পেরেছি সেটা সত্যি হলে কাম্বে বন্দরের দূরত্ব এখান থেকে দশ মাইলের বেশী হবার কথা না, সমুদ্রের উপকূলের উত্তরপশ্চিমে কোথায় সেটা রয়েছে। প্রহরী আর প্রতিহারী মোতায়েনেরও আদেশ জানিয়ে দাও যাতে করে কেউ আমাদের যেন চমকে দিতে না পারে।

সম্রাটের অভিপ্রায় জেনে নিয়ে জওহর যখন ঘুরে দাঁড়ায়, হুমায়ুন তার বিশাল কালো ঘোড়াটার পাঁজরে আলতো করে গুতো দিতে সেটা তাল গাছের নীচে দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, তালগাছের গাঢ় সবুজ রঙের লম্বা, তীক্ষাগ্র পাতাগুলো সমুদ্র থেকে আগত এবং নরম বালির উপর দিয়ে প্রবাহিত বাতাসে আন্দোলিত হয়ে মরমর শব্দ করছে। হুমায়ুন এখানে লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসে। দাঁড়িয়ে পায়ের জুতো জোড়া খুলে ফেলে সে সোজা সমুদ্রের দিকে হেঁটে যায়, সে খুব ভালো করেই জানে যে এমনটা করার ব্যাপারে তাদের পরিবারের ভিতরে সেই প্রথম। পায়ের ডিসের নীচের অংশে এসে আছড়ে পড়া পানি শ্রান্তিহর শীতল। পুনরায় নিজের চোখে উপরে হাত দিয়ে একটা আড়াল তৈরী করে সে সোনারমতো চকচক করতে থাকা, দীপ্তিময় দিগন্তের দিকে তাকায়। সে ভাবে সেখানে সে হয়তো একটা জাহাজের অবয়ব দেখতে পেয়েছে–সম্ভবত কাম্বের সাথে বানিজ্য করে তাদেরই কোনো একটা জাহাজ হবে। তাঁরা কি ধরনের মাল বহন করে? তারা কি ধরনের লোক? দিগন্তের ওপাশে কি আছে, এমনকি আরব এবং পবিত্র নগরীদ্বয়ের ওপাশে? সেখানে কি নতুন জ্ঞান আহরণে পর্ব চলছে? সেখানে নতুন শত্রুরা ওঁত পেতে রয়েছে নাকি কেবলই ধুধু বিরান প্রান্তর নাকি অনন্ত সমুদ্র?

হুমায়ুনের নিঃসঙ্গ ভাবনার স্রোত জওহরের চিৎকারের ফলে বিঘ্নিত হয়। সুলতান, আপনার আধিকারিকেরা আপনার সাথে পরামর্শ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। আপনি কি অনুগ্রহ করে তাঁদের সাথে আহার করবেন? আপনি অনেকক্ষণ ধরেই নিবিষ্ট মনে সাগরের দিকে তাকিয়ে আছেন এবং আপনার চারধারে পানি বাড়ছে। কথাটা সত্যি। সেই ছোট ঢেউগুলো এখন ফিরে যাবার আগে হুমায়ুনের হাঁটু ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অনিচ্ছাসত্তেও সে বিমূর্ত ভাবনার জগৎ থেকে, যা সবসময়ে তাকে আনন্দ দান করে থাকে, বর্তমানের বাস্তবতায় নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে এবং আধিকারিকেরা তালগাছের নীচে টকটকে লাল চাঁদোয়ার তলায় আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে যেখানে প্রতীক্ষা করেছে সেদিকের উদ্দেশ্যে হাঁটতে আরম্ভ করে।

দশ মিনিট পরে, আহমেদ খান, তাঁর প্রধান অনুসন্ধানী দূত, কাবুলের দক্ষিণে, গজনীর পাহাড়ী এলাকা থেকে আগত পাগড়ি পরিহিত পাকান শরীরের ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবককে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, তাঁর কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে গাল বেয়ে নেমে এসে তার পাতলা খয়েরী দাড়ি ভিজিয়ে দিচ্ছে। উপকূলের প্রান্তে তালগাছের চওড়া সারির ঠাস বুনোটের অন্যপাশে সমুদ্র থেকে সোয়া মাইলের মতো ভিতরে অবস্থিত একটা রাস্তা দিয়ে কাফেলাটা এগিয়ে আসছে, এই মুহূর্তে সেটা পাঁচ মাইলেরও কম দূরত্বে অবস্থান করছে। কাম্বে শহর থেকে সেটা চার মাইল মতো দূরে রয়েছে, যা ওখানে অবস্থিত ঐ নীচু শৈলান্তরীপের কারণে আমাদের দৃষ্টির আড়ালে রয়েছে।

আমরা সমুদ্র সৈকতের উপর দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে তালগাছের সারির অন্যপাশে যাব এবং তারা কাম্বে পৌঁছান মাত্র অতর্কিতে তাঁদের আক্রমণ করবো। আল্লাহতালা আমাদের সহায় থাকলে, আমরা হয়ত এমনকি বলপ্রয়োগের দ্বারা বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য নিজেদের পথ করে নিতে পারবো যদি কেবল কাফেলাটাকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়ার জন্য তোরণদ্বার খোলা থাকে।

মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই, হুমায়ুনের ঘোড়া বালুর প্রান্ত বরাবর আস্কন্দিত বেগে ছুটতে থাকে তার চারপাশে, তাঁর দেহরক্ষীর দল খুব কাছ থেকে তাঁকে ঘিরে রেখেছে। এক ঘন্টারও কম সময়ের ভিতরে তাঁরা পাথুরে শৈলান্তরীপ অতিক্রম করে এবং তালগাছের নিরবিচ্ছিন্ন আড়ালে অবস্থান করে। হুমায়ুন কাম্বে বন্দরে স্থির হয়ে ভেসে থাকা বা বন্দরের বাইরে নোঙ্গরবদ্ধ অবস্থায় থাকা সব জাহাজের মাস্তুল আর পাল দেখতে পায়। কাফেলাটা, যার ভিতরে রয়েছে মালের ভারে টলমল করতে থাকা উট, ভারবাহী হাতি আর তার সাথে খচ্চর আর গাধার পাল, অবসন্ন ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে বন্দরের ক্ষুদ্র বসতিকে ঘিরে থাকা মাটির দেয়ালে অবস্থিত এখন হাট করে খোলা অবস্থায় রয়েছে এগিয়ে যায়। দেয়ালটা দেখেও খুব একটা উঁচু মনে হয় না–সম্ভবত কেবল দুই মানুষ পরিমাণ উঁচু। কাফেলার রক্ষীদল, সব মিলিয়ে যাঁর জনবল প্রায় চারশোর কাছাকাছি, অশ্বারূঢ় হয়ে এর দুইপাশ দিয়ে এগিয়ে চলেছে কিন্তু তাদের দেখে ক্লান্ত মনে হয়, মধ্যাহ্নের খরতাপে মাথা নোয়ানো সেইসাথে তাদের প্রত্যেকের তরবারি কোষবদ্ধ আর ঢাল তাদের পিঠের সাথে আটকানো।

ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তার লোকদের মূল দলের কাছে ফিরে এসে হুমায়ুন, চেঁচিয়ে বলে, এখনই আক্রমণ করতে হবে। আমরা তাদের ভড়কে দেব। উট আর হাতির দলটাকে আতঙ্কিত করতে চেষ্টা করবে। তাহলে তাঁরাই গুজরাতি রক্ষীবাহিনীর বারোটা বাজিয়ে দেবে। হুমায়ুন এসব কথা বলার মাঝেই নিজের বিশাল কালো ঘোড়াটার পাঁজরে গুতো দেয়, যার পুরো দেহটা ইতিমধ্যেই বিন্দু বিন্দু তেলতেলে ঘামে ভিজে গিয়েছে এবং অচিরেই তাল গাছের ভিতর দিয়ে নিজের লোকদের সাথে নিয়ে সে, বন্দরের তোরণদ্বার আর কাফেলা থেকে তাঁকে পৃথককারী, আধ মাইল বিস্তৃত পাথুরে, বালু ঢাকা পটভূমির উপর দিয়ে ঝড়ের বেগে ঘোড়া হাকায়। তার আদেশ পাওয়া মাত্র, তার সবচেয়ে অভিজ্ঞ তীরন্দাজদের কয়েকজন দাঁত দিয়ে ঘোড়ার লাগাম কামড়ে ধরে রেকাবের উপর দাঁড়িয়ে পড়ে কাফেলার অবস্থান লক্ষ্য করে এক পশলা তীর ছুঁড়ে দেয় ঠিক যখন এর রক্ষীবাহিনী বুঝতে পেরেছে যে তাঁদের উপরে আক্রমণ করা হয়েছে। কয়েকটা তীর একটা হাতিকে আহত করলে বেচারা তাঁর দেহের মোটা চামড়া ভেদ করে প্রবিষ্ট শরযষ্টিসহ ঘুরে গিয়ে, ব্যাথায় আর্তনাদ করতে করতে তাঁকে অনুসরণরত কয়েকজনকে মাড়িয়ে ছুটে গেলে, তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

ব্যাথায় চাপা আর্তনাদ করে একটা উট ভূমিশয্যা নেয়, ব্যাথায় ছটফট করতে করতে বেচারা বালিতে আছড়ে পড়লে অবোধ জটার পিঠে বাঁধা মালপত্র চারদিখে ছড়িয়ে পড়ে, উটটার বিশাল, তুলতুলে মাংসল পা বাতাসে বৃথাই আন্দোলিত হয়। আরেকটা উট, কালো পালকযুক্ত একটা তীরে এফোড়-ওফোড় হয়ে যাওয়া লম্বা গলা নিয়ে, দুলকি চালে সাগরের দিকে ছুটে যায়। প্রায় সাথে সাথেই হুমায়ুন এবং তার লোকেরা রক্ষীবাহিনীর দুর্বল সারির ভিতরে ঘোড়া নিয়ে প্রবেশ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার সময়ে দুপাশে উন্মত্তের মতো তরবারি চালাতে থাকে। কিছু গুজরাতি আক্রমণের প্রথম ধাক্কা সামলাতে না পেরে আক্ষরিক অর্থেই ভূপাতিত হয়। সামান্য যে কয়েকজন নিজেদের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে, ঘুরে দাঁড়িয়ে অপ্রত্যাশিত আক্রমণের মুখোমুখি হবার চেষ্টা করেছিল তাদের স্রেফ কচুকাটা করা হয়। বেশীরভাগই অবশ্য এতসব ঝামেলায় না গিয়ে নিজেদের ঘোড়ার গলা বরাবর ঝুঁকে নীচু হয়ে তখনও ভোলা থাকা কাম্বের প্রধান তোরণ-দ্বারের অভ্যন্তরে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছোটার জন্য জন্তুগুলোকে মিনতি করে।

হুমায়ুন আর তার দেহরক্ষীর দল তাদের পিছু ধাওয়া করে। বেশভূষায় আধিকারিকের মতো দেখতে একজনকে তার অধীনস্ত দুজন লোকের সাথে পালিয়ে যেতে দেখে হুমায়ুন যত জোরে সম্ভব ঘোড়া দাবড়ায়। ঘাড়ের উপরে হুমায়ুনের উপস্থিতি টের পেয়ে, পলায়নপর আধিকারিক ঘুরে তাকিয়ে নিজের সমূহ বিপদ বুঝতে পেরে নিজেকে বাঁচাবার জন্য নিজের পিঠের সাথে বাঁধা ঢালটা আকড়ে ধরতে চেষ্টা করে। ঢালটা সে ঠিকমতো আকড়ে ধরার আগেই, হুমায়ুনের তরবারির ধারালো ফলা বেচারার ধাতব শৃঙ্খলে নির্মিত বর্মের ঠিক উপরে লোকটার মোটা আর পেষল গলায় একটা গভীর ক্ষতস্থানের জন্ম দিলে, সে ঘোড়া থেকে আছড়ে পড়ে গিয়ে বেশ কয়েকবার গড়াগড়ি করে এবং একটা সময়ে স্থির হয়ে যায়।

চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে হুমায়ুন কাম্বের তোরণ-দ্বারের নীচে পৌঁছে যায়। উল্টে থাকা একটা টেবিল এড়াতে সে প্রাণপনে টেনে ঘোড়াটা ঘুরিয়ে নেয়, নিশ্চিতভাবেই বলে দেয়া যায় যে শুল্ক বা কর আদায়ে নিয়োজিত আধিকারিকেরা কিছুক্ষণ আগেই এখান থেকে আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে গেছে, মূল ফটকের পাশে অবস্থিত বাড়িটার পেছনে একটা ছোট চত্বরে সে শীঘ্রই এসে পৌঁছে। সেখানে বোধহয় পূর্ণোদ্যমে একটা বাজার বসেছিল। সেখানের সামনের দিকে উন্মুক্ত ছোট ছোট দোকানগুলোয় যারা ছিল বোঝাই যায় তাঁরা ব্যস্ততার সাথে সেখান থেকে চলে গিয়েছে, আতঙ্কে উজ্জ্বল বর্ণের মশলা ভর্তি ব্যাগগুলো ধূলোয় ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে, মাটিতে শস্যকণা পড়ে রয়েছে সেখানে উল্টে যাওয়া একটা জালা থেকে গড়িয়ে আসা দুধ আর কমলা রঙের মসুর ডালের সাথে এখন দারুণ সখ্যতা তার। সৈন্যদের টিকিটাও কোথাও দেখা যায় না। কাফেলার রক্ষীবাহিনীর মতোই, কাম্বের প্রতিরক্ষায় যারা নিয়োজিত ছিল তাঁরা বোধহয় লড়াই করার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। গুটিকয়েক দোকানমালিক যারা পালিয়ে যেতে পারেনি। বেশীর ভাগই শুভ্র শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ বা প্রায় কালো পোষাকে সজ্জিত মহিলা- সবাই তাদের আক্রমণকারীদের সামনে বালিতে মুখ গুঁজে বশ্যতা প্রকাশের ভঙ্গিতে নিজেদের প্রণত করে। সৈন্যদের বসবাসের ব্যারাকটা কোথায় খুঁজে বের কর। সেখানে যদি কোনো সৈনিককে দেখতে পাও তাকে সাথে সাথে বন্দি করবে। বন্দরে অবস্থানরত জাহাজ আর গুদামঘর থেকে তোমাদের যা ইচ্ছে নিতে পার। বাকিটা পুড়িয়ে দেবে। কেবল লক্ষ্য রাখবে তোমাদের মালপত্রের ভার যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়। সূর্যাস্তের আগেই আমরা এখান থেকে চলে যাব। কাম্বে বন্দরে আমাদের হামলার খবর যখন গুজরাতিদের কানে যাবে, তারা আমাদের অবস্থান সম্পর্কে এতটাই শঙ্কিত আর অনিশ্চিত হয়ে পড়বে যে যখন তাঁরা চম্পনীর হুমকির সম্মুখীন জানতে পারবে তখন তাঁদের মূলবাহিনী কোথায় মোতায়েন করবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সেই দূর্গ আক্রমণকারী আমাদের মূলবাহিনীর সাথে পুনরায় মিলিত হবার জন্য আমাদের দ্রুত এখান থেকে ফিরে যেতে হবে। আমরা সেখানেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করবো যার ফলে গুজরাত আমাদের করায়ত্ত হবে।

১.৩ লুট করা সমৃদ্ধি

০৩. লুট করা সমৃদ্ধি

জওহর, আমার জন্য লেবুর রস দেয়া সেই পানিটা নিয়ে এসো- হিন্দুরা এটাকে কি বলে? লিম্বু পানি? এই গরমে সেটা বেশ সতেজ করে তুলে। হুমায়ুন চম্পনীর দূর্গের বাইরে তাঁর সুরক্ষিত সৈন্য শিবিরের ঠিক মাঝে তার লাল রঙের বিশাল তাবুতে দাঁড়িয়ে যেখান থেকেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তাবুর গুটিয়ে রাখা নিম্নপ্রান্তের ভিতর দিয়ে, সে দুই-মাইল-দীর্ঘ পাথুরে শিলাস্তরের এক প্রান্তে দূৰ্গটার পাথরের তৈরী অতিকায় অবয়ব দেখতে পায় যা জঙ্গলের করকটে গাছগাছালির মাথার উপরে ভেসে রয়েছে গ্রীষ্মের দাবদাহে সবগুলো গাছের পাতা শুকিয়ে বাদামী আর সোনালী বর্ণ ধারণ করেছে।

আজ থেকে ছয় সপ্তাহ পূর্বে হুমায়ুন অবরোধ-যজ্ঞে এসে শামিল হয়েছে। নিজের পরিষদমণ্ডলীর সাথে সে প্রথমে যেমন আলোচনা করেছিল, তার আধিকারিকেরা নিজেদের অবস্থান অবরোধক আর উভয়পার্শ্বে কামান স্থাপন করে সুরক্ষিত করেছে যাতে করে তারা অবরুদ্ধদের দ্বারা অবরোধকারীদের উপরে পরিচালিত যে কোনো আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে আর সেই সাথে অবরুদ্ধদের স্বস্তি দিতে আগত বাহিনীকে সাফল্যের সাথে প্রতিহত করতে পারবে তারা এই বাহিনীর আগমনের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত। সেই বাহিনী এখনও এসে পৌঁছায়নি আর গুপ্তদূতেরা তাঁদের আগমনের কোনো লক্ষণ এখনও পর্যন্ত বিবরণীতে উল্লেখ করেনি। শোনা যায় যে বাহাদুর শাহ তাঁর ভূখণ্ডের দক্ষিণের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত উচ্চভূমিতে অবস্থান করছেন। তিনি সম্ভবত দূর্গের শক্তিমত্তায় বিশ্বাস করেন, এবং এখানে অবস্থিত সৈন্যদের ব্যারাক হুমায়ুন আর তাঁর দলবলকে বিদায় জানাবার জন্য যথেষ্ট।

হুমায়ুন তন্ময় হয়ে ভাবে, যদি সেটা হয়ে থাকে তবে এখনও পর্যন্ত তার ধারণাই সঠিক বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। সে আর তার ঝানু পোড় খাওয়া সেনাপতিরা সম্ভাব্য সব উপায়ে চেষ্টা করে দেখেছে কিন্তু সাফল্য তাঁদের ধরা দেয়নি। দূর্গের চওড়া পাথরের দেয়ালে তাঁদের কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে, কিন্তু গোলন্দাজ বাহিনীর অনেক সদস্য দূর্গের প্রকারবেষ্টিত সমতল ছাদ থেকে নিক্ষিপ্ত গুলির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে যখন তাঁরা কামানগুলোকে কার্যকর রাখতে প্রযত্ন হয়েছে। গোলন্দাজেরা একবার যখন দূর্গের দেয়ালের একটা ক্ষুদ্র অংশ ভেঙে ফেলতে সফল হয় তখন হুমায়ুনের লোকেরা যখন পাথরে ভাঙা টুকরো টপকে এবং তার ভিতর দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করলে, গুজরাতিরা তাদের মাস্কেট দিয়ে হুমায়ুনের লোকদের দিকে গুলি করে পাখির মতো তাদের ধরাশায়ী করেছে। তাঁর লোকদের ভেতরে যারা প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল, তারা পরবর্তীতে নিজেদের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছে দূর্গ অভ্যন্তরে আরেকটা দেয়াল রয়েছে, গুজরাতিরা যার আড়াল ব্যবহার করে তাঁদের উপরে বুলেট আর তীর নিক্ষেপ করেছে এবং সাফল্যের সাথে তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করেছে। অন্য আরেকবার, পাথরের দূর্গ প্রাচীরের উন্মুক্ত পরিসরে খুব ভালোভাবে সুরক্ষিত গুজরাতি কামানগুলো, সামনাসামনি আক্রমণের একটা ধাক্কা ছত্রভঙ্গ করে দিতে সক্ষম হয় মোগলরা তখনও তাদের দেয়াল বেয়ে উঠবার মইগুলো স্থাপণ করার জন্য দূর্গ প্রাচীরের কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি।

মৃত মোগল যযাদ্ধাদের কালো হয়ে যাওয়া এবং পচে ফুলে উঠা দেহগুলো দূর্গ প্রাচীরের সামনে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অবস্থায় পড়ে থেকে পচনক্রিয়া শুরু হতে গা-গুলিয়ে উঠা মিষ্টি একটা গন্ধে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠে এবং সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে কালচে-বেগুনী রঙের ডুমো মাছির ঝাঁক এসে উপস্থিত হয় যার সংখ্যা এখন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাঁর পুরো শিবিরে এখন ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে বেড়াচ্ছে। আহত সহযোদ্ধাদের উদ্ধার করতে বা মৃতদের লাশগুলো ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে গিয়ে এতো বেশী লোক প্রাণ হারায় যে রাতের আঁধার ব্যাতীত এমন প্রয়াসের প্রতি হুমায়ুন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয় এবং তারপরেও হতাহতের সংখ্যা প্রচুর।

জওহর তাঁর প্রিয় পানীয় নিয়ে পুনরায় হাজির হলে ভাবনায় তখনকার মতো ছেদ পড়ে হুমায়ুনের। সে যখন শীতল উপভোগ্য তরল পান করছে তখন আরেকবার বাইরের দিকে তাকায় এবং মধ্যাহ্নের আকাশে কালো মেঘ জমতে দেখে। মেঘের রঙ আরো কালো হবে এবং আসন্ন বর্ষাকালের কারণে এখন আরো ঘন ঘন এমন বৃষ্টি হবে। বৃষ্টির কারণে দূর্গের অভ্যন্তরে অবস্থানরত প্রতিরোধকারীদের পানীয় জলের সমস্যা আপাতত মিটে যাবে আর হুমায়ুনের আক্রমণ প্রয়াসকে আরো বেশী কঠিন করে তুলবে। বর্ষাকাল তাঁর শিবিরে রোগের প্রাদুর্ভাব বয়ে আনতে পারে।

জওহর, স্থানীয় লোকেরা কি বলে আশেপাশের এলাকায় কখন বৃষ্টি হয়?

সুলতান, জুলাই মাসের মাঝামাঝি।

হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়, সে মনঃস্থির করে ফেলেছে। আমাদের অবশ্যই তার আগে এখানে আসবার উদ্দেশ্য হাসিল করতে হবে। আমাদের সামনাসামনি আক্রমণ একেবারেই ফলপ্রসু হচ্ছে না। আমাদের বিকল্প কিছু একটা খুঁজে বের করতে হবে এবং সেটা অচিরেই করতে হবে। আগামীকাল আমি নিজে আমাদের গুপ্তদূত সর্দারদের সাথে বের হব দেখতে যে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থায় গুজরাতিদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছে এমন কোনো দুর্বলতা আমরা যদি সনাক্ত করতে পারি।

*

উন্মুক্ত পাথুরে শিলাস্তর, যার একেবারে পূর্বপ্রান্তে আপাতদৃষ্টিতে দুর্ভেদ্য চম্পনীর দূর্গ দাঁড়িয়ে আছে, দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে সে যখন তাঁর ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে চলেছে তখন হুমায়ুন তাঁর ধাতব শৃঙ্খল নির্মিত বর্মের নীচে কুলকুল করে ঘামতে থাকে। হতাশার একটা তীব্র অনুভূতি তার শারীরিক অস্বস্তিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সে এবং তার গুপ্তদূতের দল শিলাস্তরের উত্তর দিকে এক নিষ্ফল তথ্যানুসন্ধান অভিযানে ইতিমধ্যে পাঁচটি উষ্ণ ঘন্টা অতিবাহিত করছে এবং দক্ষিণদিকের অর্ধেকটা ইতিমধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছে তারা। সে নিজে বা তার কোনো গুপ্তদূত যখনই ভেবেছে তারা একটা অরক্ষিত স্থান সনাক্ত করতে পেরেছে, যেখান দিয়ে তাঁর লোকেরা হয়ত উপরে উঠবার প্রয়াস পাবে, প্রতিবারই আরোহনকারী সৈনিকের পক্ষে দুরুত্তর কোনো ঝুলে থাকা পাথরে আছড়ে পড়ে সেই সম্ভাবনার সমাপ্তি ঘটেছে। একবার এক গুপ্তদূত বাহুদ্বয় শস্য মাড়ানোর কস্তনীর মতো আন্দোলিত করে, পেছনের দিকে আছড়ে পড়ার আগে পাথুরে দেয়ালের একটা ফাটল দিয়ে উপরের দিকে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পথ বেয়ে উঠে গেলে, মাস্কেটের একটা গুলির শব্দে যখন চারপাশের স্তব্ধতা খানখান হয়ে যায়, তখন সবাই বাস্তবিকই বুঝতে পারে যে পাহাড়ের কিনারে কোনো একটা বলির আড়ালে একটা গুপ্ত প্রতিরক্ষামূলক ফাঁড়ি রয়েছে।

জওহর, আমাকে একটু পানি দাও, একটা সুতির কাপড় দিয়ে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে হুমায়ুন আদেশ দেয়। বাছা জলদি করো, জওহর তাঁর পর্যানের দুপাশে ঝোলান থলির ভিতরে পানির খোঁজে হাতড়াতে থাকলে সে গলা চড়ায়।

মার্জনা করবেন, সুলতান, দড়িগুলো সব জড়িয়ে গিয়েছে।

বেশ তাহলে যত দ্রুত তোমার পক্ষে সম্ভব, হুমায়ুন এবার আগের চেয়ে অনেক মোলায়েম কণ্ঠে বলে, সে বুঝতে পারে বালকের আনাড়িপনা তাঁর ক্রোধের কারণ না, আক্রমণের পথ চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁর নিজের হতাশাই তাকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে। আমরা ওখানে ঐ ছোট্ট টিলার উপরে গাছের ছায়ায় ঘোড়া থেকে নেমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেব।

হুমায়ুন ক্লান্ত ভঙ্গিতে পাঁচশ গজ দূরে অবস্থিত গাছপালাবেষ্টিত ক্ষুদ্র এলাকাটার দিকে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এসে ঘোড়া থেকে নামতে নামতে সে টের পায় যে পাহাড়ের উচ্চতা আর নতুন দিক থেকে অবলোকন একেবারে ভিন্ন একটা দৃষ্টিরূপ সৃষ্টি করেছে। সে দেখতে পায় গাছপালার উপরে পাথরের গায়ে একটা গভীর ফাটল রয়েছে যা একেবারে উপর পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্ষার মৌসুমে সম্ভবত এর ভিতর দিয়ে একটা জলপ্রপাত প্রবাহিত হয় কিন্তু এই মুহূর্তে সেটা শুকনো দেখাচ্ছে। নিমেষে তৃষ্ণা আর হতাশা ভুলে গিয়ে হুমায়ুন গুপ্তদূত প্রধান আহমেন খানকে ডেকে পাঠায় তার কাছে।

তুমি কি ওখানে ঐ ফাটলটা দেখতে পাচ্ছ? তোমার কি মনে হয়? ওটা দিয়ে কি উপরে বেয়ে ওঠা সম্ভব?

সুলতান, আমি ঠিক বলতে পারছি না, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে সম্ভব। আমি নিজে গিয়ে ফাটলটা পর্যবেক্ষণ করছি।

তুমি যাবার আগে আমাদের বাকি লোকেরা যেন গাছপালার আড়ালে থাকে সেটা নিশ্চিত কর। আমরা চাইনা কেউ তাদের দেখতে পাক…এবং আল্লাহ্ ভরসা।

শুকরিয়া, সুলতান আহমেদ খান তার পর্যান থেকে একজোড়া চামড়ার জুতো বের করে। পাথরের গায়ে ভালো করে আকড়ে ধরার জন্য জুতোর তলিতে চামড়ার অতিরিক্ত পটি সেলাই করা হয়েছে। জুতো জোড়া পরিধান করে আধ মাইল বা তার কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থিত উঁচু খাড়া পাহাড়ের দিকে রওয়ানা দেয় সে। পাঁচ কি দশ মিনিট পরেই করকটে ঝোপঝাড় আর বিক্ষিপ্ত গাছপালার আড়ালে দৃশ্যপটের অন্তরালে চলে যায় সে। হুমায়ুন তারপরে উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে একটা অবয়বকে উপরে উঠে যেতে দেখে। অবয়বটা কখনও হারিয়ে যায় কিন্তু পুনরায় দৃশ্যমান হতে মনে হয় অনেকটা যেন উপরে উঠে গিয়েছে। তারপরে অবয়বটা কিছুক্ষণের জন্য একেবারেই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। হুমায়ুন তার গুপ্তদূতকে এর পরে যখন দেখতে পায় তখন সে অনেকটা নীচে নেমে এসেছে। হুমায়ুন পায়চারি করে, তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, আশঙ্কিত যে শেষ কয়েক গজ হয়তো অনতিক্রম্য প্রমাণিত হয়েছে কিন্তু আশা করে যে তার ধারণা হয়তো ভুল। আধঘন্টা পরে আহমেদ খানকে গাছপালাবেষ্টিত সেই পাহাড়ের চূড়ায় দেখা যায়। তার হাত বেশ কয়েক স্থানে ঘষা খেয়ে ছড়ে গিয়েছে এবং পরনের ঢোলা প্যান্টটা হাঁটুর কাছে ছিঁড়ে গিয়েছে। বন্ধুর পথে সে হেঁটেছিল বলে বাম পায়ের জুতোর তলি অনেকটাই খয়ে গিয়েছে কিন্তু তাঁর মুখে কান পর্যন্ত বিস্তৃত একটা হাসি।

সেখানে কোনো প্রতিরক্ষাকারীকে দেখা যায়নি। চূড়ো থেকে চল্লিশ ফিট নীচ পর্যন্ত বেয়ে উঠতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় না কিন্তু পা রাখবার জায়গা খুব কম থাকার জন্য শেষের ফিটগুলো বেয়ে উঠা বেশ কষ্টকর। আমার মতো পাহাড়ী লোকদের পক্ষে সংকীর্ণ ফাটলের কোনো একটার দেয়ালে পিঠ দিয়ে আর অন্য দেয়ালে পা দিয়ে উপরে উঠে যাওয়া সম্ভব। অনেকের পক্ষেই সেটা অসম্ভব প্রতিপন্ন হবে বিশেষ করে যখন অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে হবে। অবশ্য এবং সে পুনরায় হাসতে শুরু করে- পাথরে ফাটল রয়েছে এবং বেশ নমনীয়ও বটে, যারা প্রথমে বেয়ে উঠবে তারা সহজেই ধাতব কিল পাথরের গায়ে গেথে দিতে পারবে ফলে কম দক্ষদের বেয়ে উঠবার ক্ষেত্রে এক ধরনের মই তৈরী হয়ে যাবে।

আমি আল্লাহতালার কাছে শুকরিয়া আদায় করছি আর তোমার সাহসিকতা আর দক্ষতার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। পাঁচশো বাছাই করা লোক নিয়ে আগামীকাল রাতে আমরা ফিরে আসবো। আমাদের মূল বাহিনী যখন সামনে থেকে আক্রমণ করে দূর্গ প্রতিরক্ষায় নিয়োজিতদের ব্যস্ত রাখবে তখন দেয়াল বেয়ে উঠে পেছন থেকে দূর্গে প্রবেশ করবো আমরা।

*

চাঁদের ধুসর আলোয়, আহমেদ খানকে পাশে নিয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গাছগুলোর ভিতর দিয়ে পাহাড়ের সেই ফাটলটার দিকে বেয়ে উঠতে থাকে হুমায়ুন। তাঁদের পায়ের নীচে মসৃণ আর আলগা নুড়ি পাথর নিশ্চিত করে যে এটা একটা শুকিয়ে যাওয়া জলস্রোত এবং বর্ষার সময় বাস্তবিকই উপর থেকে পতিত একটা জলপ্রপাত এখান দিয়ে প্রবাহিত হয়।

যুদ্ধের কেন্দ্রে অবস্থানের জন্য বরাবরের মতোই অসহিষ্ণু হুমায়ুন, বাবা ইয়াসভালের পরামর্শ, যে তার কেন্দ্রে অবস্থান করা উচিত আক্রমণ পরিচালনার স্বার্থে, এবং পাথরের গায়ে কীলক স্থাপনের অভিযানে আহমেদ খান আর তার দেহরক্ষীদের ভিতরে দশজন সেরা পর্বতারোহীদের সাথে থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে জানে তাঁদের মতো সেও ক্ষিপ্র, চটপটে এবং প্রথম দলের সাথে গমন করলে সে তার পাঁচশ লোকের বাকিদের মনোবল বৃদ্ধি করতে পারবে। তাদের সম্রাট নিজেই ইতিমধ্যে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে গিয়েছেন এটা জানতে পারলে নিজেদের সম্মানের খাতিরে তারা অনুসরণ করতে ব্যর্থ হবে না।

সবকিছু এখন পর্যন্ত ভালোই চলছে। তাঁরা তাঁদের ঘোড়াগুলোকে বেশ খানিকটা দূরে বেঁধে রেখে এসেছে এবং কারো চোখে ধরা না পড়ে এই পর্যন্ত আসতে তাই চাঁদ প্রতিবার মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়তে এবং সেই সময়ে সামান্যতম আড়াল ব্যবহারের সুযোগ তাঁরা নিয়েছে। তাঁদের মাথার উপরে ঝুলে থাকা ডালপালার ভিতর দিয়ে, ঠিক সামনেই হুমায়ুন শুল্ক স্রোতস্বিনীর শুরুটা দেখতে পায়, ঠিক তার উপর থেকে পাহাড়ের কালো দেয়াল উঠে গিয়েছে। আহমেদ খান আর যে দশজন তার সাথে পাহাড় বেয়ে উপরে উঠবে তাঁদের তাঁর চারপাশে জড়ো হতে ইঙ্গিত করে সে।

আমার নিয়তি এবং সেই সাথে সাম্রাজ্য আর আমাদের সবার জীবন এই প্রয়াসের কারণে ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। মারাত্মক বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু আমরা যদি সফল হই তাহলে পুরষ্কারের সম্ভাবনাও ব্যাপক, আল্লাহতালা আমাদের সহায় আছেন, আমরা সফল হবই। এখন, সবাই শেষবারের মতো দেখে নাও যে তোমাদের থলেতে তোমাদের উপকরণসমূহ নিরাপদে রয়েছে আর তোমাদের পছন্দসই যে কোনো অস্ত্র বহনের নিমিত্তে ভালোমতো গোঁজা রয়েছে। আমরা চাই না যে কিছু পড়ে গিয়ে আমাদের অবস্থান প্রকাশ হয়ে যায় বা পেছনে যারা অনুসরণ করছে তাদের কোনো ক্ষতি হোক।

হুমায়ুন তাঁর তরবারি আলমগীর জওহরের কাছে রেখে এসেছে, যে বাহিনীর বাকি সদস্য সাথে তাঁকে অনুসরণ করবে। সে তার বাকি লোকদের মতোই সাধারণ কালো কাপড় পরিধান করেছে কেবল তৈমূরের অঙ্গুরীয় একটা সরু চামড়ার ফালি দিয়ে তার গলায় বাঁধা রয়েছে। পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে শুরু করবার ঠিক আগে সেটা বের করে এবং তাতে চুমু খায় সে। তারপরে তাঁরা উঠতে আরম্ভ করে, আহমেদ খান সামনে আগের দিন হাত এবং পা রাখার জন্য যেসব স্থান ব্যবহার করেছিল তাদের খুঁজতে খুঁজতে এবং ইশারায় ঠিক তার পেছনেই অবস্থানরত হুমায়ুনকে অনুসরণ করতে বলে। কয়েকটা ছোট পাথর মাঝে মাঝে যদিও তাদের কারণে স্থানচ্যুত হয়ে, নীচে মাটির দিকে সেগুলো ঠোকর খেতে খেতে গড়িয়ে গেলে, হুমায়ুন আশা করে তাদের গড়িয়ে যাবার শব্দ বিস্ফোরণের ফলে চাপা পড়ে যাবে যা তাঁর সেনাছাউনির দিক থেকে ভেসে আসছে শত্রুদের মনোযোগ আকৃষ্ট করার জন্য তার কামানগুলো সম্মুখ আক্রমণের বারতা ঘোষণা করছে।

বিশ মিনিটের ভিতরে, শেষ ফাটলের পাদদেশে পৌঁছে যায় দুজনে। হুমায়ুন উপরের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এই অংশটা বেয়ে উঠা কতটা কষ্টসাধ্য বলে প্রতিপন্ন হবে। জলপ্রপাতের প্রাথমিক তোড়ের কারণে এই অংশের পাথর একেবারে মসৃণ দেখায় এবং একপাশের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে আর অন্যপাশের দেয়ালে পা দিয়ে স্বচ্ছন্দে উপরে বেয়ে উঠে যাবার জন্য যথেষ্ট চওড়া ফাটলটা। আহমেদ খান যে কীলকগুলো- পাহাড়ের গা থেকে বের হয়ে থাকা দুফিট চওড়া একটা পার্শ্বদেশের উপরে অবস্থান করে তার দেহের সাথে আড়াআড়িভাবে ঝোলান একটা বগলি থেকে বের করে দরকার হবে বলে তার কোমরের চারপাশে জড়ান একটা কালো পরিকর গুঁজে রাখে। হুমায়ুনও তাঁর নিজের হাতুড়ি কোমর থেকে খুলে হাতে নেয়।

সুলতান, গতকাল প্রথম দশ ফিটই সবচেয়ে মসৃণ বলে মনে হয়েছিল। আমি নিজেকে ফাটলের ভিতরে আটকে রাখবো আর আপনি আমার দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে সিঁড়ির মতো ব্যবহার করে প্রথম কীলকটা দেয়ালে স্থাপনের মতো স্থানে পৌঁছাবেন।

হুমায়ুন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে আহমেদ খান পাথুরে ফাটলের ভেতরে নিজেকে আটকে ফেলে। আহমেদ খানের টানটান হয়ে থাকা উরুতে হুমায়ুন তখন এক পা রাখে এবং নিজেকে ঠেলে উপরের দিকে তুলতে থাকে যতক্ষণ না সে আহমেদ খানের কাঁধে চড়ে বসে। মাথার উপরে হাত দিয়ে সে এবার পাথরের উপরিতলে অনুসন্ধান করতে থাকে যতক্ষণ না একটা ছোট্ট ফাটল খুঁজে পায় সে। হাতুড়ি বের করে এবং পরিকর থেকে একটা ফুটখানেক লম্বা কীলক বের করে, পাথরের ভিতরে কীলকটা ঢুকিয়ে দেয়, হাতুড়ির প্রতিটা ধাতব শব্দ উদ্বিগ্ন, ঘামতে থাকা হুমায়ুনের কাছে মনে হয় ফাটলের ভিতরে ভয়ঙ্কর প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করছে। অবশ্য, উপর থেকে কোনো নড়াচড়া চোখে পড়ে না এবং শীঘই কীলকটা যথাস্থানে ঢুকে যায়। হুমায়ুন কীলকটা টেনে পরীক্ষা করে এবং সেটাকে দৃঢ়ভাবে প্রবিষ্ট দেখে সেটায় ভর দিয়ে পরবর্তী কীলক প্রবিষ্ট করাবার স্থান নির্বাচন করতে আহমেদ খানের কাঁধ থেকে আধাআধি উপরে উঠে।

এটাও দেয়ালের গায়ে ভালোমতোই প্রবিষ্ট হয় এবং কীলকের উপরেই নিজেকে মূলত স্থাপিত করে আর মাঝে মধ্যে পিঠের সাহায্যে পাথরের গায়ে নিজেকে ঠেসে ধরে, পা রাখবার আরেকটা জায়গার খোঁজে হুমায়ুন উপরে উঠতে থাকে। এবং এভাবেই পুরো বিষয়টা এগিয়ে চলে, ঘামতে ঘামতে এবং জোরে শ্বাস নিতে নিতে, দুজনে শীর্ষদেশের দশ ফিটের ভিতরে পৌঁছে যায় যেখানে একটা পাথুরে শিলাস্তর তাদের আতঙ্কের উদ্রেক করে পথ আটকে রয়েছে। অবশ্য আহমেদ খান, হুমায়ুনের আলখাল্লার প্রান্তদেশ ধরে আধো-অন্ধকারের ভিতরে দেয়ালের শীর্ষদেশ থেকে ঝুলে থাকা পাহাড়ী লতাগুল্মের একটা মোটা ঝাড়ের দিকে ইঙ্গিত করে, সেটা এমন এক দিকে যেদিকে স্বাভাবিক অবস্থায় সে লক্ষ্যই করতো না এবং সেটা তাদের ডানদিকে ছয়ফিট দূরে ঝুলছে।

সুলতান, আমার মনে হয় আমি ওটা ধরতে পারবো এবং শেষ দূরত্বটুকু ওটা ব্যবহার করে বেয়ে উঠে যাব আর ওঠার সময়ে আমি কীলক গাঁথতে গাঁথতে যাব, আর আপনার চেয়ে আমার ওজন কম বলে আমাকেই চেষ্টাটা করতে হবে, এবং আমাকে মার্জনা করবেন, সুলতান- সেটা করতে হলে আমার সিঁড়ি হিসাবে আপনাকে আমার সাহায্য করতে হবে।

হুমায়ুন মাথা নাড়ে এবং শেষ কীলকগুলো ধরে নিজের দেহকে ডানপাশে কাত করে। সে অচিরেই আহমেদ খানের পায়ের ওজন নিজের বাম কাঁধে অনুভব করে, তারপরে তার গলার পাশে সেটা যন্ত্রণাদায়ক ভঙ্গিতে একবার পিছলে যায় এবং হঠাৎ ভরটা গায়েব হয়ে যায়। আহমেদ খান লতাগুল্মের ঝাড় ধরে ঝুলতে ঝুলতে, পাথরের গায়ে সজোরে কীলক ঢুকিয়ে দিচ্ছে ঝুলে থাকা শিলাস্তর ঘুরে উপরে পৌঁছাবার একটা রাস্তা তৈরী করতে। তারপরে সে ফাটলের শীর্ষে পৌঁছে যায়, হুমায়ুনের দিকে হাত নেড়ে সে যেভাবে এসেছে সেটা অনুসরণ করতে বলে, সে ঝুলে থাকা বাধা ঘুরে এবং দড়াবাজের ভঙ্গিমায় উপরে ওঠার সময়ে বহু কষ্টে চোখ বন্ধ করে রাখার প্রবণতা দমন করে। তারপরে সে হঠাৎ নিজেকে উপরে আবিষ্কার করে। জোরে জোরে হাঁফাতে থাকার কারণে সে ঠিকমতো কথাই বলতে পারে না, হুমায়ুন কোনোমতে ফিসফিস করে বলে, আহমেদ খান, তোমাকে ধন্যবাদ। তোমার সাহসিকতা আমার মনে থাকবে।

পরবর্তী আধঘন্টার ভিতরে যথেষ্ট সংখ্যক লোক ফাটলের দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে আসে, আসবার সময়ে তারা আরও বেশী সংখ্যক কীলক দেয়ালে প্রবিষ্ট করায় এবং দড়ির সাহায্যে চলনসই মই তৈরী করে, দূর্গ অভিমুখে অগ্রসর হবার জন্য অগ্রগামী দল গঠন করতে যারা পরবর্তীতে অনুসরণ করবে, তাদের জন্য উপরে ওঠাটা সহজ করতে। হুমায়ুন তাঁর পাশে সমবেত হওয়া প্রথম একশ জনের মতো লোকের উদ্দেশ্যে একটা ভাষণ দেয়। মনে রাখবে আমরা কোনো প্রকার শব্দ করবো না, এবং সেজন্য আমাদের পুরাতন নিরব আয়ুধের উপরে নির্ভর করবো তীর, ধনুক আর তরবারি- কোনো শত্রুকে খুঁজে পেলে খালি হাতে আমরা তাদের বধ করবো। একবার ভেতরে প্রবেশ করলে, তোমাদের ভিতরে যাঁরা তূর্য আর ঢাক বহন করছে, তাঁদের চারজনকে বাইরে থেকে আক্রমণরত আমাদের বাহিনীকে সতর্ক করতে পূর্বনির্ধারিত সংকেত ধ্বনি করতে আমি নির্দেশ দেব যার অর্থ আমরা ভেতরে প্রবেশ করেছি আর তাই এবার তারা তাদের আক্রমণ উদ্যোগ দ্বিগুন করতে পারে। আর এখন আমরা সবাই সামনে অগ্রসর হব।

ঝোপঝাড়ের আড়ালে অগ্রসর হয়ে, আঁধারের গা বেয়ে উঠে আসা লোকগুলো সন্তপনে আরও আধ মাইল এগিয়ে যাবার পরে ঝোপঝাড়ের আড়াল হাল্কা হয়ে আসে এবং সম্মুখে প্রায় এক হাজার গজ দূরত্বে দূর্গের পেছনের দেয়ালের দিকে তাদের অগ্রসর হতে আর কোনো বাধা থাকে না। সামনের আর পাশের দেয়ালের চেয়ে পেছনের দেয়ালটা অনেকটাই নীচু আর প্রহরীর কোনো চিহ্ন দৃশ্যমান হয় না। নীচু হয়ে বসে এবং অবশিষ্ট গুটিকয়েক ঝোপঝাড়ের আড়ালের সুযোগ নিয়ে আর চাঁদকে ঢেকে দিয়ে উড়ে যাওয়া মেঘের ফলে সৃষ্ট অন্ধকারে, আগন্তুক লোকগুলো মধ্যবর্তী খালি জমি দৌড়ে অতিক্রম করে নিজেদের দূর্গের দেয়ালের সাথে মিশিয়ে দেয়, তাঁদের নড়াচড়ার ফলে যদি কোনো শব্দ হয়েও থাকে তবে দূর্গের সামনের অংশ থেকে আগত যুদ্ধের হৈ-হট্টগোলে সেটা চাপা পড়ে যায়। আগন্তুক লোকগুলোর অনেকেই সাথে করে দড়ি নিয়ে এসেছে, এবং হুমায়ুনের একটা আদেশে, আহমেদ খান একটা দড়ির গোছা আকড়ে ধরে আর এক কোণে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করে যেখানে ভূমির বাক বরাবর দেয়ালটা প্রায় সমকোণে বেঁকে গিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের ভিতরে, ফাটলের ভিতরে অনুসৃত কৌশল ব্যবহার করে সে দেয়ালের শীর্ষে পৌঁছে যায় এবং অন্যদের অনুসরণের জন্য নিজের হাতের দড়িটা নীচের দিকে ছুঁড়ে ফেলে। অচিরেই আরও কয়েকজন দড়ি নিয়ে উপরে উঠে আসে আর আরও বেশী সংখ্যক দড়ি ঝুলতে দেখা যায়।

হুমায়ুন নিজে দ্রুত সমতল দূর্গপ্রাকারে উঠে আসে এবং অন্যদের সাথে উঁকি দিয়ে দেখে পেছনে প্রহরীদের কোনো চৌকি আছে কিনা। হ্যাঁ, প্রহরীদের একটা চৌকি দেখা যায়- প্রায় একশ গজ দূরে অবস্থিত। সহসা সেটার দরজা খুলে যায় এবং মশাল হাতে সেখানে ছয়জন লোকের আবির্ভাব ঘটে- সম্ভবত ন্যূনতম সংখ্যক প্রহরী পেছনে রেখে বাকিরা সামনের দেয়ালে যোদ্ধার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে ছুটে গিয়েছে। হৈচৈ আর উত্তেজনার শব্দ শুনে বলা যায় যে সেখানে পূর্ণোদমে আক্রমণ করা হয়েছে। প্রহরীর দল নীচের দিকে দেখার জন্য দেয়ালের দিকে এগিয়ে আসে এবং, তারা যখন এগিয়ে আসছে হুমায়ুন তখন তাঁর তীরন্দাজদের আদেশ দেয় প্রহরীরা কোনো ধরনের হুশিয়ারী উচ্চারণ করার পূর্বেই যত দ্রুত সম্ভব তীর ছুঁড়তে। ফলায় মৃত্যুর শীষ বাজিয়ে প্রায় সাথে সাথে তীরের ঝাক বাতাসে ভাসে এবং হতভাগ্য ছয় প্রহরীকে বিদ্ধ করে, যে দেয়ালের উপর দিয়ে তাঁরা তাকিয়েছিল দুজন সেখান থেকে মাথা নীচের দিকে দিয়ে শূন্যে ভাসে, প্রাকারবেষ্টিত দূর্গের সমতল পাথরের ছাদে আরেকজনের পা যন্ত্রণায় মৃত্যুর বোল তুলে আছড়াতে থাকে, বাকি তিনজন কিছু বুঝে উঠার আগেই নিথর হয়ে যায়।

প্রহরীচৌকির দিকে হুমায়ুন আক্রমণ পরিচালনা করে। সে যখন সেখানে পৌঁছে, ভিতরে লুকিয়ে থাকা আরেক গুজরাতি ছিটকে বের হয়ে এসে মাত্র দশ গজ দূরে ছাদ দেয়া একটা সিঁড়ির দিকে দৌড়ে যায় যেটা নীচের আঙ্গিনার দিকে নেমে গিয়েছে। সে সিঁড়িটার এতত নিকটে যে তীর নিক্ষেপের আগেই সে এর রক্ষাকারী ছাদের নীচের নির্ভরতায় পৌঁছে যাবে। হুমায়ুন তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে লোকটার পিছু ধাওয়া করে, তার হাত পা দপদপ করতে থাকে, এবং প্রথম ধাপের কাছে পৌঁছে দেখে প্রহরীটা সিঁড়ির বিশটা বা কিছু কম বেশী হতে পারে- পাথুরে ধাপের বেশীরভাগই অতিক্রম করে নীচে নেমে গিয়েছে। চিন্তা করার জন্য সময় ক্ষেপন না করে, হুমায়ুন উপরের ধাপ থেকে প্রহরীকে লক্ষ্য করে লাফ দেয়, আর তাকে নীচের চাতালে আছড়ে ফেলে। পতনের কারণে দুজনেরই ফুসফুসের সব বাতাস বের হয়ে যায় কিন্তু প্রহরী লোকটাই প্রথমে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায় আর পালাবার পায়তারা করে। হুমায়ুন শোয়া অবস্থা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে তাঁকে ধরতে যায় এবং পায়ের গোড়ালি ধরে তাকে আবারও মাটিতে পেড়ে ফেলে। কুস্তিগীর হিসাবে নিজের সমস্ত নৈপুণ্য প্রয়োগ করে সে পাগলের মতো হাত-পা ছুঁড়তে থাকা লোকটাকে নিজের নীচে এমন করে আটকায় যাতে বেচারা নড়তে না পারে, হুমায়ুন এবার লোকটার গলা আঙ্গুল দিয়ে আকড়ে ধরতে সমর্থ হয় এবং তার দেহ থেকে প্রাণবায়ু নিংড়ে বের করতে শুরু করে যতক্ষণ না সে লোকটার নিঃশ্বাস তার গলার কাছে এসে ঘড়ঘড় করতে না শোনে এবং তারপর অসাড় দেহটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। হুমায়ুনের লোকেরা পুনরায় তাকে ঘিরে অবস্থান গ্রহণ করে।

আমাদের সাথে এখন কম করে হলেও চারশ লোক রয়েছে, আহমেদ খান হাঁপাতে হাঁপাতে বলে। এখন কি করবো?

আমাদের কেউ দেখে ফেলার আগে আমরা চেষ্টা করবো যতটা সম্ভব দূর্গের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে।

লোকগুলো সামনে কামানের ঝলসানি দেখতে পায় এবং তাঁদের বুম শব্দ আর মাস্কেটের কড়াৎ আওয়াজের সাথে সাথে যুদ্ধের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ আর চিৎকারও তাঁদের কানে আসে। আঙ্গিনাটার উপর দিয়ে ধোয়া ভেসে যায় বিশেষ করে বিপরীত দিকে দেয়ালে অবস্থিত একটা বিশাল তোরণদ্বার দিয়ে ধোয়া প্রবেশ করছে। হুমায়ুন ভাবে এর মানে এই যে এই তোরণটা দিয়ে সরাসরি দূর্গের মূল অংশে প্রবেশ করা সম্ভব যেখানে দূর্গের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত সৈন্যরা সমবেত হয়েছে। আমাদের লোকদের দুভাগে বিভক্ত হয়ে তোরণটার দুপাশে দাঁড়াতে বল এবং তারপরে শত্রুকে পেছন থেকে আক্রমণ করার পূর্বে আমরা তূর্যনিনাদ আর ঢাকের বোলে দূর্গের সামনের দেয়াল আক্রমণকারী আমাদের সাথী যোদ্ধাদের হুশিয়ার করে দেব, সে আদেশ দেয়। তার আদেশ দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া হয় এবং হুমায়ুন সংকেত দিতে তার লোকেরা তোরণদ্বারের দিকে ধেয়ে যায়। তোরণের এক কোণ থেকে চারপাশে উঁকি দিয়ে, হুমায়ুন ধোয়ার কুণ্ডলীর ভিতরেও সামনের দেয়ালে অবস্থিত কামানের অবস্থান দেখতে পায় এবং প্রতিরোধকারীরা সেই সাথে গুলিবর্ষণ করছে এবং ফুটন্ত আলকাতরা এবং তেল নীচে আক্রমণরত তার লোকদের উপরে ঢালছে।

তূর্যবাদক আর ঢাকির দল, সংকেত দিতে শুরু কর এবং আমি আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত দিতে থাকো। তোমাদের ভেতর বাকীরা, আমাকে অনুসরণ কর! বাদ্যযন্ত্র থেকে সংকেত প্রদান শুরু হবার সাথে সাথে হুমায়ুন তোরণ অতিক্রম করে ভেতরের দিকে ধেয়ে যায়। ভেতরে প্রবেশের সাথে সাথে, তাঁর তীরন্দাজদের বর্ষিত প্রথম পশলা তীর বেশীরভাগ গুজরাতির পিঠে বিদ্ধ হয়, একটা কামানের সব গোলন্দাজ একসাথে ভূপাতিত হয়। বিস্ময় আর বিভ্রান্তি নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ প্রত্যাঘাতের চেষ্টা করে। অন্যদের দেখে মনে হয় তারা মনোবল হারিয়ে ফেলেছে এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে আশ্রয়ের জন্য ভবনের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে শুরু করে।

মূল তোরণদ্বারের দিকে এগিয়ে চল। প্রতিরোধকারীদের হত্যা করে সেটা আমাদের সৈন্যদের জন্য খুলে দাও।

হুমায়ুনের লোকেরা তাঁর আদেশ পালন করতে ধেয়ে যায়, তাদের সামনে থাকে তার এক তূর্যবাদক, তখনও সে তাঁর আদেশ বাজিয়ে চলেছে। অবশ্য নিজের মৃত সাথীদের লাশের স্তূপের আড়াল থেকে এক গুজরাতি তীর নিক্ষেপ করলে সেটা তূর্যবাদকের কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হয় এবং সে মাটিতে পড়ে গেলে তাঁর শেষ নিঃশ্বাসের সাথে রক্তের বুদ্বুদ মিশে গিয়ে তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র থেকে এক বিকট আর্তনাদ বের হয়ে আসে। সে যাই হোক, হুমায়ুন সাথে আহমেদ খান এবং কমপক্ষে পঞ্চাশজন লোক নিয়ে তোরণদ্বারে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠে বা এর প্রতিরোধকারীদের পলায়নপর মনোবৃত্তিকে চাঙ্গা করে তুলে। তারা শীঘ্রই কপিকলের সাহায্যে মূল তোরণ খুলে দেয়। তোরণ-দ্বারের সিকি অংশ খোলা হতেই স্রোতের মতো মোগল সেনারা ভিতরে প্রবেশ করতে শুরু করে। মোগলদের প্রবেশ করতে দেখে অবশিষ্ট প্রতিরোধকারীরা হাতের অস্ত্র ছুঁড়ে ফেলে পালাতে শুরু করে কিন্তু কয়েকজন দূর্গের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিয়ে হুমায়ুনের লোকদের উপরে নিয়মিত বিরতিতে গুলিবর্ষণ করতে থাকে, তাঁদের অনেকেই মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

আমাদের লোকদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে এসো। আমাদের আর প্রাণহানির ঝুঁকি নেয়ার প্রয়োজন নেই। দূর্গ এখন আমাদের দখলে। আমাদের হাতে ধৃত সবচেয়ে বরিষ্ঠ গুজরাতিকে আমার সামনে এনে হাজির কর।

অচিরেই, দীর্ঘদেহী, বিরলকেশ এক আধিকারিককে, যার হাত এবং পা থেকে তরবারির আঘাতজনিত ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে, টানতে টানতে হুমায়ুনের সামনে হাজির করে জোর করে নতজানু করা হয়। আমি বর্বর নই, হুমায়ুন তাঁকে বলে। আমি অনর্থক রক্তপাত করবো না। দূর্গের ভিতরে যারা অবস্থান করছে আপনি তাঁদের কাছে গিয়ে বলবেন তাঁদের এই প্রতিরোধ মূল্যহীন। তারা যদি এই মুহূর্তে আত্মসমর্থন করে তবে আমি পবিত্র কোরআন শরীফের নামে শপথ করে বলছি তাঁদের আমি প্রাণ ভিক্ষা দেব। যদি তাঁরা বাঁধা দেয়, সবাই মারা পড়বে, সেই সাথে আমি ইতিমধ্যে যাদের বন্দি করেছি তারাও বেঘোরো প্রাণ হারাবে।

হুমায়ুন বৃদ্ধ লোকটার চোখে একসাথে ভয় আর আশঙ্কা খেলা করতে দেখে। সে তাঁর কথা বিশ্বাস করেছে এবং তার অনুসারীদের বোঝাতে চেষ্টা করবে।

আপনি এবার যেতে পারেন। আপনাকে দশ মিনিট সময় দিলাম এর ভিতরে আপনাকে একটা উত্তর আনতে হবে।

হুমায়ুন তার লোকদের গুলিবর্ষণ বন্ধ করতে বলে যখন বৃদ্ধ আধিকারিক খোঁড়াতে খোঁড়াতে প্রতিরোধকারীদের সুরক্ষিত অবস্থানের দিকে গমন করে। আধিকারিককে চিনতে পেরে, প্রতিরোধকারীরা ঘুন্টি শোভিত ওক কাঠের ভারী দরজাটা খুলে দেয় এবং সে ভিতরে হারিয়ে যায়। পাঁচ মিনিট পরে সে পুনরায় দরজার কাছে হাজির হয় এবং স্থান পরিবর্তন করে হুমায়ুনের অবস্থানের দিকে আসে। তারা আত্মসমর্পন করতে রাজি আছে যদি তাদের ব্যক্তিগত অস্ত্র সাথে রাখতে দেয়া হয়।

ঠিক আছে, হুমায়ুন বলে এবং সাথে সাথে স্বস্তির একটা জোয়ার তাঁকে আপুত করে ফেলে। সম্রাট হিসাবে সে তাঁর প্রথম অভিযানে বিজয়ী হয়েছে। আমরা একটা দারুণ বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। আমাদের আহত যোদ্ধাদের যথাযথ শুশ্রূষার বন্দোবস্ত করা হোক। তারপরে রাজকোষের সিন্দুকগুলো খোঁজা শুরু কর।

*

সুলতান, রাজকোষের ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডারের প্রবেশ পথ আমরা এখনও খুঁজে পাইনি, ছত্রিশ ঘন্টা পরে হুমায়ুনের এক আধিকারিক তাঁকে জানায়। আমরা কি যারা বাকি ছিল সেইসব বন্দি গুজরাতিদের কাউকে নির্যাতন করে দেখবো?

না, পবিত্র কোরআন শরীফের নামে আমি শপথ করেছি কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন না হয়ে নিরাপদে তাঁরা প্রস্থান করতে পারবে। রাজকোষ নিরাপদ করা আমাদের দরকার। কিন্তু নির্যাতন ছাড়া মানুষের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের আরও অনেক পথ আছে। বাবা ইয়াসভালোকে বল বন্দি বলিষ্ঠ গুজরাতি আধিকারিকদের জন্য একটা ভোজসভার আয়োজন করতে যার উদ্দেশ্য হবে তাদের সাহসিকতাকে সম্মান জানান। তারপরে যখন অসংখ্য শুভকামনায় পানপাত্র উজাড় হবে এবং সুরা তাঁদের জীহ্বার জড়তা আলগা করবে তখন আলোচনার বিষয়বস্তু ঘুরিয়ে রাজকোষে নিয়ে এসো আর তখন দেখো এভাবে তাঁদের কাছ থেকে তুমি কি জানতে পার।

সেদিনই মধ্যরাত্রি নাগাদ, হুমায়ুনের অস্থায়ী বাসস্থানের দরজায় টলতে টলতে বাবা ইয়াসভালো এসে উপস্থিত হয়। তাঁর হাঁটায় যদিও জড়তা রয়েছে এবং চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে, একটা চওড়া হাসি তার এক কান থেকে আরেক কান পর্যন্ত লেপ্টে রয়েছে। মহামান্য সুলতানের সাথে আমি কি কথা বলতে পারি?

কয়েক মুহূর্ত পরে তাঁকে হুমায়ুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। সুলতান আমি নিশ্চিত আমি উত্তরটা জানি। আজ রাতের বেশীর ভাগ সময় আমি আঙ্গিনায় গুজরাতি আধিকারিকদের সাথে আহার আর সুরাপানে অতিবাহিত করেছি। তাঁদের একজন- আলুম খান তার নাম- গজনীর উত্তম লাল মদিরা আকণ্ঠ পান করতে তার দেহমন প্রশমিত হয় এবং সে আরও বেশী বাঁচাল হয়ে উঠে, গুজরাতি রাজপরিবার এবং তাঁর সাথী আধিকারিকদের সম্বন্ধে প্রচলিত রটন্তির রসালো অংশ বলতে শুরু করে। আমার যখন মনে হয় যে সময় হয়েছে তখন আমি রাজকোষ সম্পর্কে একটা প্রশ্ন আলতো করে উপস্থাপন করি। সে চমকে উঠে, রাজকোষের অবস্থান কথায় প্রকাশ করে সে বিশ্বাসভঙ্গের কাজ করেনি কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য মার্বেলের জলাধারের একটার দিকে স্থির তাকিয়ে ছিল এবং সে বিচলিত বোধ করতে থাকে।

সহজাত প্রবৃত্তির বশে আমি বুঝতে পারি যে জলাশয়ের রাজকোষের সাথে একটা সম্পর্ক না থেকেই যায় না তাই আমি তাকে এ বিষয়ে আরও প্রশ্ন করতে আরম্ভ করি। আপনি বুঝতেই পারছেন- জলাশয়টা কতদিনের পুরাতন, এর গভীরতা কত, এর নির্মাণশৈলী, কতদিন পর পর একে জলশূন্য করে পুনরায় জলপূর্ণ করা হয়। প্রতিটা প্রশ্নের সাথে সাথে সে উত্তরোত্তর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে সেই সাথে সে অপ্রত্যয়জনকভাবে তোতলাতে থাকে এবং পরস্পরবিরোধী উত্তর দেয়। আমি নিশ্চিত রাজকোষে প্রবেশের পথ জলাশয়ের নীচে লুকান রয়েছে। বাবা ইয়াসভালো কথা শেষ করে, তার ব্যাপক পানাহারের পরে এতো প্রাঞ্জলভাবে কথা বলতে নিজেকে বাধ্য করার প্রয়াস তাঁকে আপাতদৃষ্টিতে ক্লান্ত করে দিয়েছে।

আপনি আপনার যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। দিনের আলো ফোঁটার সাথে সাথে আমরা জলাশয়ের পানি নিষ্কাশন করে এর তলদেশ খনন করবো। এখন যান এবং পড়ে যাবার আগে একটু বিশ্রাম করে নিন।

পরের দিন খুব সকালে, দূর্গের চারপাশের জঙ্গল থেকে সবুজ তোতাপাখির পাখির কর্কশ ডাকের মাঝে, হুমায়ুন কিছুটা বিপর্যস্ত আর নোংরা বাবা ইয়াসভালোকে পাশে নিয়ে, তাকিয়ে দেখে কেবল সাদা নেংটি পরিহিত মজুরদের একটা দল তাদের চামড়ার থলে নিয়ে জলাশয় পানিশূন্য করতে একটা মানবশেকল তৈরী করেছে। তারপরে জলাশয় পানিশূন্য হতে তাঁরা হামাগুড়ি দিয়ে তলদেশে নেমে এর তলদেশের আস্তরণ গঠনকারী মার্বেলের টুকরো একটা একটা করে চাপ দিয়ে খুলতে শুরু করে। সেগুলো জলাশয়ের পাশেই স্তূপাকারে রাখতে থাকে যেখান থেকে অন্যেরা সেগুলো যত্নের সাথে আঙ্গিনায় নিয়ে গিয়ে সতর্কতার সাথে একটার উপরে একটা সাজিয়ে রাখে।

প্রথম পাথরের খণ্ডগুলো সরিয়ে নেয়ার পরে, বাবা ইয়াসভালো নিশ্চিতভাবেই বিমর্ষ হয়ে পড়ে, নীচে লালচে রঙের বেলেমাটি দেখে। তারপরে, হুমায়ুন যখন অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে জলাশয়ের পাশে পায়চারি করছে, বাবা ইয়াসভালো আচমকা চেঁচিয়ে উঠে, সুলতান, দেখেন! মাঝের ঐ চারটে খণ্ডে খাঁজ রয়েছে এবং তাঁদের চারপাশে পাথরের কুচি পড়ে রয়েছে। পাথরের টুকরোগুলো আগেও ওঠান হয়েছে।

আপনি ঠিক বলেছেন, হুমায়ুন জবাব দেয়। টুকরোগুলো সরাবার ব্যবস্থা করেন।

বাঁকা প্রান্তবিশিষ্ট লৌহদণ্ড পাথরের খণ্ডগুলোর নীচে প্রবিষ্ট করাবার সাথে সাথে সেগুলো দ্রুত উঠে আসে এবং দরদর করে ঘামতে থাকা মজুরদের দল সেগুলো তুলতে, হুমায়ুন কাঠের একজোড়া ঝুলন্ত দরজার একাংশ তাঁদের নীচ থেকে বের হতে দেখে।

পাওয়া গেছে! বাবা ইয়াসভালো আপনার সহজাত প্রবৃত্তি আপনার সাথে প্রতারণা করেনি, আমি নিশ্চিত। আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না আপনার এই মাথা ব্যাথার জন্য আমি আপনাকে কি পুরষ্কার দেব।

লাফিয়ে জলাশয়ের তলদেশে নেমে, হুমায়ুন নিজে ঝুলন্ত দরজা ধরে টানতে শুরু করে। দরজাটার পাল্লা সহজেই উঠে আসলে এর নীচে চেটালো সিঁড়ির বেশ কয়েকটা ধাপ দেখা যায় যা একটা নীচু, লোহার গজালশোভিত দরজার কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে একটা বিশাল ধাতব তালা দিয়ে দরজাটা বন্ধ করা।

আমাকে একটা বাঁকান প্রান্তযুক্ত লৌহদণ্ড দিন, সে আদেশ করে। দণ্ডটা নিয়ে সে এর প্রান্তদেশ তালার ভিতরে প্রবেশ করিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে দ্বিখণ্ডিত করে। ধাক্কা দিয়ে দরজার পাল্লা খুলে সে মাথা নীচু করে ভিতরে প্রবেশ করে। আধো আলোতে সোনার জ্বলজ্বলে আভা তার চোখে ধরা দেয়। তার চোখ আলোতে সয়ে আসতে সে দেখে যে মেঝেতে পুরু সোনার পিণ্ড সাজিয়ে রাখা আছে এবং খোলা সিন্দুক দেখে মনে হয় রত্নপাথরে ভর্তি। প্রথম কক্ষের ন্যায় আলো বিকিরণকারী আরো কয়েকটা প্রকোষ্ঠ আছে বলে মনে হয়। হুমায়ুন চেঁচিয়ে মশাল নিয়ে আসতে বলে এবং ভৃত্যের দল মশাল আনতে সে দেখে যে সিন্দুকে আসলেই পান্না, রুবি, পোখরাজ আর অন্যান্য দীপ্তিময় পাথর রয়েছে এবং অন্য প্রকোষ্ঠগুলোতে আরও ধনসম্পদ রয়েছে যার ভিতরে আছে রূপার বাসনকোসন আর পানপাত্র এবং কারুকার্যখচিত অস্ত্রশস্ত্র আর বর্ম। তাঁর বিশ্বস্ত আর সাহসী যোদ্ধাদের পুরস্কৃত করার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সে এখানে পেয়েছে।

সব স্বর্ণপিণ্ড, রত্নপাথর আর অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য সরিয়ে নাও। সেগুলো ভালো করে পাহারার ব্যবস্থা কর আর সবকিছু নথীভুক্ত কর। আজ রাতে আমরা উৎসব পালন করবো এবং লুটের মাল ভাগ করে নেব।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে, পরিচারক আর সৈন্যরা একসাথে কঠোর পরিশ্রম করে। তাঁদের প্রথম কাজ দূর্গ প্রাঙ্গণের কেন্দ্রে একটা নীচু কাঠের পাটাতন নির্মাণ করা যেখান থেকে হুমায়ুন তার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে পারবে এবং লুটের মালে তাঁদের প্রত্যেকের অংশ বিতরণ করবে যা পাটাতনের পেছনে প্রহরাধীন অবস্থায় স্তূপীকৃত করে রাখা হয়েছে। এরপরে দূর্গপ্রাঙ্গণে তারা যেখানে যে কাপড় খুঁজে পেয়েছে, হোক সেটা পশমের, সুতার বা কেবল পাটের তৈরী, হোক সেটা উজ্জ্বল লাল বা বেগুনী রঙের বা কেবল ধুসর পিঙ্গল এবং সবুজ বর্ণের, সুন্দর কারুকার্যখচিত কিংবা সাদামাটা, সব ব্যবহার করে অতিরিক্ত চাদোয়া লাগাতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। চাঁদোয়ার নীচে তারা কোনোমতে নীচু কাঠের টেবিল পাতে এবং তার চারপাশে ভোজসভায় আগত অতিথিদের হেলান দেবার জন্য যেখানে যা গদি, তোষক বা তাকিয়া খুঁজে পায় সব এনে বিছিয়ে রাখে। মশালের জন্য তারা কোনমতে মশালদানি তৈরী করে এবং সেগুলো এমন জায়গায় স্থাপন করে যেসব জায়গায়, ভোজসভার আনন্দ আয়োজন বুনো উদ্দামতায় রূপান্তরিত হলে যা অভ্যাগতরা নিশ্চিতভাবেই পরিণত হবে, সুগুলোর উল্টে পরার সম্ভাবনা কম।

তারা যখন তাদের কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে, তখন কাছাকাছি মাঠে স্থাপিত রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা খাবারের গন্ধে তাঁদের রসনা তীব্র হয়ে উঠে। লম্বা সরু ধাতব শলাকায় বিধিয়ে আস্ত ভেড়া ঝলসানো হচ্ছে, ভোজসভা উপলক্ষ্যে রাধুনির দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকে বিশাল তামার পাত্রে ফুটন্ত সজির ভিতরে মশলা দিয়ে নাড়ছে, বেশী অভিজ্ঞ রাধুনির দল ছোট ছোট তামার পাত্রে মিষ্টি তৈরী করতে দই, চিনি, গোলাপজল আর নানা পদের মশলা মিশাচ্ছে। অনেক সৈনিকরা মনে, হুমায়ুন এবং তাঁর বেশীর ভাগ অমাত্যদের মতোই, ভালো মুসলমান কিন্তু সুরাপান একেবারে নিষিদ্ধ এই বিষয়টা পুরোপুরি মেনে নিতে অপারগ, দূর্গ থেকে প্রাপ্ত এবং হুমায়ুনের নিজস্ব ভাড়ার থেকে যোগান দেয়া সুরার- যার ভিতরে গজনীর লাল মদিরাও রয়েছে যা আলুম খানের বেঁফাস কথাবার্তার জন্য দায়ী ভাগ নিতে যেখানে যে পাত্র পেয়েছে সেটা নিয়ে সমবেত হয়েছে, সম্ভবত তাঁদের কাছে পানের মোহ বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

সূর্যাস্তের একঘন্টা পরে, বাদুরের দল যখন উষ্ণ নিকষ অন্ধকারের মাঝে বিচরণ করতে আরম্ভ করেছে এবং ঝি ঝি পোকার ডাক সপ্তমে পৌঁছেছে, হুমায়ুনের দুই খাস তূর্যবাদক ছয়-ফুট-লম্বা পিতলের বাদ্যযন্ত্রে নিজেদের ঠোঁট স্থাপন করে। তাঁদের বাজনার প্রতিধ্বনি শুনে যখন সেনাপতি আর সাধারণ সৈনিকের গলার স্বর একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায় তখন সোনালী রঙের কাপড়ে তৈরী চোগা ও আচকান পরিহিত উপরে রাজকোষের গোপন ভাণ্ডারে প্রাপ্ত একটা সোনার শৃঙ্খলে নির্মিত বর্ম পরিধান করে হুমায়ুন দূর্গের মূল তোরণ-দ্বারে এসে দাঁড়ায়। সূর্যের অবিরাম আওয়াজ এবং উপরে দূর্গপ্রাকারে স্থাপিত যুদ্ধের দামামার গম্ভীর ধ্বনির মাঝে হুমায়ুন তাঁর সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিকদের ভিতর দিয়ে নীচু পাটাতনের দিকে এগিয়ে গিয়ে সেটায় আরোহন করে, তার সবচেয়ে বলিষ্ঠ আধিকারিকেরা তাকে অনুসরণ করে এবং স্তূপীকৃত ধনরাশির সামনে দাঁড়ায়। তূর্যবাদক আর ঢালিদের ইঙ্গিতে থামতে বলে সে তার লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়।

আজ রাতে আমরা গুজরাতে আমাদের অভিযানের সাফল্য উদযাপন করতে সমবেত হয়েছি। আমাদের শত্রুরা যেখানেই আমাদের মুখোমুখি হবার সাহস দেখিয়েছে সেখানেই আমরা তাদের পরাস্ত করেছি। সুলতান বাহাদুর শাহ এমনকি সে সাহসটুকুও না দেখিয়ে, ভীরু ইঁদুরেব মতো আদতেই তিনি যা তাঁর রাজ্যের দুর্গম প্রান্তে গিয়ে লুকিয়েছেন। আমরা তাঁর ভূখণ্ড দখল করেছি এবং আমার পেছনে তোমরা যে ধনরাশির স্তূপ দেখছো সেটা আমরা আমাদের করে নিয়েছি। আমাদের এই বিজয়ের জন্য এসে প্রথমে আমরা আল্লাহ্তালাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

আল্লাহু আকবর, আল্লাহ্ মহান, সমবেত কাতার থেকে সাথে সাথে প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

ভোজসভা শুরু করার আগে এই সম্পদের কিছু অংশ আমি তোমাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই। আজকের এই সমাবেশে প্রত্যেক বরিষ্ঠ আধিকারিককে তাঁর ঢাল নিয়ে আসতে বলা হয়েছে। কেন সেটা তোমরা শীঘ্রই দেখতে পাবে। আকষ্মিক আক্রমণের ভয়ে সেটা বলা হয়নি। আমাদের শত্রুরা হতোদ্যম আর ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছে। বলা হয়েছে নিজের এবং তার লোকদের জন্য উপহার বহনের উদ্দেশ্যে। আধিকারিকেরা নিজ বর্ম নিয়ে সামনে এগিয়ে এসো। বাবা ইয়াসভালো, প্রথমে আপনি!

মুণ্ডিত-মস্তক বাবা ইয়াসভালো সামনে এগিয়ে যায় এবং হুমায়ুনের সামনে নতজানু হয়।

পিঠ থেকে আপনার বর্মটা নামিয়ে সেটা উল্টো করে মাটিতে রাখুন।

বাবা ইয়াসভালো আদেশ পালন করে।

পরিচারকের দল। সোনা আর রূপার পিণ্ড ঢালের উপরে স্তূপ করে সেটার উপরে মূল্যবান পাথর স্থাপন কর।

পরিচারকের দল মশালের আলোয় দীপ্তিময় আর ঝলমল করতে থাকা মূল্যবান ধাতবপিণ্ড আর রত্নপাথর নিয়ে এসে সেগুলো বর্মের উপরে স্তূপ করে রাখে। বাবা ইয়াসভালো আমার আন্তরিক শুভেচ্ছার সাথে এবার বর্মটা নিয়ে যান এবং গতরাতের সুরাপানের কারণে যদি আপনি এখনও দুর্বল বোধ করেন তাহলে আপনার লোকদের ডাকে সাহায্য করতে।

যুবক কিংবা বৃদ্ধ, খোয়ারি আক্রান্ত হোক বা না হোক, যেকোনো মানুষের বহনের পক্ষে বোঝাটা অনেক বেশী, এবং মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বাবা ইয়াসভালো আবারও মাথা নত করে, একহাত মুষ্ঠিবদ্ধ অবস্থায় নিজের হৃৎপিণ্ডের উপরে স্থাপিত এবং নিজের লোকদের ইশারায় সাহায্য করতে বলে। তারা তাদের অর্জিত ধনরাশি একত্রে বয়ে নিয়ে যেতে, হুমায়ুন পরবর্তী আধিকারিক, দীর্ঘদেহী, ক্লান্ত এক আফগানিকে ইঙ্গিত করে পাটাতনে উঠতে এবং পুরো প্রক্রিয়াটা পুনরাবৃত্তি করে। পুরোটা সময় আমাদের সুলতান, আমাদের পাদিশাহ, হুমায়ুন মহান, এই রব শনৈ শনৈ বৃদ্ধি পেতে থাকে। দুহাত মাথার উপরে তুলে, হাসিমুখে তাঁদের এই ধ্বনিকে স্বাগত জানায় হুমায়ুন। সম্রাট হিসাবে নিজের প্রথম অভিযানে সফল হয়েছে সে। তার পূর্বে তার মরহুম আব্বাজানের মতো তাঁর নিজের এবং লোকদের জন্য গৌরব আর ধনরাশি অর্জন করেছে সে। জীবন বেশ মধুময়- সৌভাগ্যের এই ধারা দীর্ঘস্থায়ী হোক।

১.৪ অনিশ্চিত ভারসাম্য

০৪. অনিশ্চিত ভারসাম্য

বর্ষায় মুষলধারে বৃষ্টি হতে আগ্রা দূর্গের ভিতরের আঙ্গিনা পানিতে থৈ থৈ করছে। বৃষ্টির ভারী ফোঁটা পাথরের আস্তরণে ঠিকরে যাচ্ছে এবং পানির প্রস্রবনগুলো যা থেকে জলের বুদ্বুদ বের হবার কথা সেগুলো জলমগ্ন করে তুলেছে। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ার জন্য কাপড়ে ক্ষয়কারী ছত্রাক জন্মাতে শুরু করেছে এবং রাজকীয় পাঠাগারে উদ্বিগ্ন পণ্ডিতেরা হিন্দুস্তানে যেসব পাণ্ডুলিপি নিয়ে এসেছিলেন বাবর সেগুলোকে আর্দ্র আবহাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে তাদের বাৎসরিক প্রয়াসে ব্যস্ত। পাণ্ডুলিপিগুলোর ভিতরে বাবরের রোজনামচাও রয়েছে, যেগুলোকে আর্দ্র আবহাওয়া আর কীটপতঙ্গের ঝাঁকের হাত থেকে বাঁচাতে ভিতরের দিকে সীসার আস্তরণযুক্ত বিশেষভাবে তৈরী ধাতব বাক্সে সংরক্ষণের জন্য তাঁর গ্রন্থাগারিকদের আদেশ দিয়েছে হুমায়ুন। বাক্সটা যে কক্ষে রাখা হয়েছে সেখানের বাতাস শুষ্ক করতে বর্ষা মৌসুমে অবিরত কর্পূর কাঠ জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে।

গতকাল গভীর রাতে, মুষলধারে হতে থাকা বৃষ্টি সম্পর্কে উদাসীন হুমায়ুন তাঁর গুজরাত অভিযান শেষে বিজয়ীর বেশে আগ্রায় ফিরে এসেছে। তার লোকদের পুরস্কৃত করার পরেও সোনা, রূপা আর মূল্যবান রত্নপাথরের বেঁচে যাওয়া অবশিষ্টাংশ ইতিমধ্যে রাজকীয় কোষাগারে স্তূপীকৃত করা হয়েছে। কয়েকটা স্মারক ব্যাতীত- মুক্তাখচিত রূপার একটা পরিকর সালিমার নমনীয় কটিদেশে যা দারুণ মানাবে, তার মা মাহামের জন্য একটা সবুজ জেড পাথরের তৈরী পানপাত্র এবং খানজাদার জন্য রুবী আর আকাটা পান্না খচিত সোনার তৈরী একটা দুই-লহর বিশিষ্ট হার যা বংশ পরম্পরায় গুজরাতের রাজবংশের মহিলাদের কণ্ঠে সুনামের সাথে শোভা পেয়েছে। একটা কলাই করা সিন্দুক খুলে সে হারটা বের করে, গাঢ় সবুজ পান্নার সাথে আগ্নেয় প্রভায় বিন্যস্ত রুবীর দিকে আরও একবার মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

হুমায়ুন যখন তাঁর ফুপুজানের বাসস্থানের দিকে হেঁটে চলে, তখনও হারটা তাঁর হাতে ধরা। হুমায়ুন জানে অভিযানের খুঁটিনাটি বর্ণনা তাঁকে আগ্রহী করে তুলবে কিন্তু সেই সাথে ফুপুজানের পরামর্শও তার প্রয়োজন। ফুপুজানের কক্ষে প্রবেশ করতে, সে দেখে যে খানজাদা কিছু একটা পাঠ করছে এবং তাঁর পাশে বইয়ের ভিতরে মাথা গুঁজে বসে রয়েছে তার এগার বছর বয়সী সৎ-বোন গুলবদন। মেয়েটা তার মা দিলদার এবং ভাই হিন্দালের মতো গাঢ় তামাটে বর্ণের উজ্জ্বল আর কৌতূহলী চোখ তুলে তাঁর দিকে তাকায়।

খানজাদা সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায় এবং তাঁর দুই কাঁধ চেপে ধরে তাঁর দুগালে পরম মমতায় চুম্বন করে। হুমায়ুন, তোমাকে স্বাগতম। তুমি বিজয়ী হয়েছে যেমনটা আমি জানতাম তুমি হবে…তোমার অগ্রগতির প্রতিটা বিবরণী আমাকে গর্বিত করেছে।

আমি আপনার জন্য একটা উপহার নিয়ে এসেছি, হুমায়ুন তার হাতের মুঠি খুলে এবং তার আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে রুবী আর পান্নার হারটার সৌন্দৰ্য ক্ষরিত হতে দেয়। ভালো করে দেখার জন্য গুলবদন সামনে এগিয়ে আসে, কিন্তু রত্নখচিত হারটা গ্রহণ করে সেটাকে আলোতে ধরার আগে খানজাদা সম্ভবত একটু ইতস্তত করেন। দারুণ সুন্দর কিন্তু আমার জন্য বোধহয় একটু বেশীই মনোরম… এটা। এখন আর আমায় মানাবে না। তুমি যখন বিয়ে করবে তখন তোমার বৌকে আমার হয়ে এটা দিয়ো। হুমায়ুন কিছু বলার আগেই খানজাদা হারটা হুমায়ুনের তালুতে রেখে তার আঙ্গুলগুলো বন্ধ করে সেটাকে তালুবন্দি করে দেয় এবং ইঙ্গিতে তাঁকে পাশে বসতে বলে। গুলবদন- এখন তুমি যাও। আগামীকাল তুমি অবশ্যই আসবে- একটা ফার্সী কবিতা আছে যা আমি তোমাকে দেখাতে চাই।

মেয়েটা বই বন্ধ করে ধীর পায়ে হেঁটে যেতে খানজাদা পেছন থেকে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। গতবছর তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই আমার ভেতরে মেয়েটার প্রতি একটা মমতুবোধ জন্ম নিয়েছে দারুণ বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে এবং চারপাশে কি ঘটছে সবকিছু লক্ষ্য করে।

তার বয়সে আপনি যেমন ছিলেন? আমার আব্বাজান আমাকে প্রায়ই বলতেন কিছুই আপনার দৃষ্টি এড়ায় না।

সে আমার তোষামদ করতো।

আমার সেটা মনে হয় না, এবং সেই কারণেই আমি আরো একবার আপনার কাছে পরামর্শের জন্য এসেছি। বাহাদুর শাহের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমার বিজয় প্রমাণ করেছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে আমাকে অনুসরণ করার জন্য মানুষদের অনুপ্রাণিত করতে পারি এবং নিশ্চিত হয়েছি যে আমি একজন ভালো যোদ্ধা।…আমাকে জীবনে আরও অনেক যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে এবং আমি সেজন্য ভীত নই- বস্তুতপক্ষে আমি তাঁদের মুখোমুখি হবার জন্য মুখিয়ে আছি যদি তারা আমার সাম্রাজ্য আরও নিরাপদ করতে আমাকে সাহায্য করে…

তুমি ঠিকই বলেছে। প্রমাণ করেছে যে তুমি একজন জাত নেতা। সেই সাথে নির্ভীক। তাহলে তোমার এই উদ্বেগ কিসের জন্য?

আমি যখন অভিযান শেষে আগ্রায় ফিরে আসছিলাম, যুদ্ধের উদ্বেগ আর উত্তেজনা থিতিয়ে আসতে প্রায়ই নিজের মনেই চিন্তা করেছি, এবার কি? আমি জানি কিভাবে যোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় কিন্তু আমি কি সত্যিই জানি কিভাবে একটা সাম্রাজ্য শাসন করতে হয় এবং টিকিয়ে রাখতে হয়? সোনার কারুকাজ করা সিংহাসনে যখন উপবেশন করি, আমাকে চারপাশ থেকে ঘিরে থাকে উপদেষ্টা, মোসাহেব আর শরণার্থীর দল, সবাই নিজ নিজ সমস্যা বা অনুরোধের প্রতি আমার মনোযোগ আকর্ষনে ব্যস্ত, তখন আমার কেমন আচরণ করা উচিত? মাঝে মাঝে আমার মনে হয় এদের সবাইকে বিতাড়িত করি এবং সালিমা বা আমার অন্য কোনো রক্ষিতার সাথে সময় কাটাই কিংবা শিকারে বেড়িয়ে পড়ি।

একজন প্রাণবন্ত যুবকের জন্য সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু তোমাকে এমন প্রলোভন দমন করতে হবে। একজন শাসককে তাঁর চারপাশে কি ঘটছে সে বিষয়ে অবশ্যই সজাগ থাকবে এবং অসন্তোষ ঘনিয়ে উঠে বিদ্রোহের রূপ নেবার আগেই সেটা আঁচ করার মতো সংবেদনশীল হতে হবে। তোমার আব্বাজান যেমন শিখেছিলেন তুমিও তেমনি শিখে নিবে। তার জন্য বিষয়টা মোটেই সহজ ছিল না। আল্লাহতালা যখন তাকে সিংহাসনের অধিকারী করেছিল তখন তোমার চেয়েও তার বয়স অল্প ছিল কিন্তু তিনি একজন মহান শাসকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর রোজনামচাগুলো পড়–তুমি যা সন্ধান করছে সেখানের পাতায় তুমি তা খুঁজে পাবে, কঠিন অভিজ্ঞতা আর রক্ত থেকে সৃষ্ট… খানজাদা দম নেবার জন্য থামেন, তারপরে খানিকটা বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হেসে উঠেন। বাবর যদি এখন এই মুহূর্তে আমাদের মাঝে উপস্থিত থাকতেন, দরবারে তুমি যাদের তোমার নিকটে অবস্থান করতে দাও তাঁদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে তিনি হয়ত তোমায় বলতেন… যাকে তুমি ক্ষমতা প্রদান করছে তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখবে, সবাইকে বিশ্বাস করবে না। সবসময়ে নিজেকে প্রশ্ন করবে কেন- কেন এই লোকটা আমাকে এই পরামর্শ দিচ্ছে? আমি যদি সম্মতি দেই তাহলে তার কি লাভ? আমি যদি সম্মতি না দেই তাহলে তার কি ক্ষতি? তাকে যা দেয়া হয়েছে সেজন্য কি সে কৃতজ্ঞ থাকবে নাকি সে চিন্তা করবে অধিকার বলেই এটা তাঁর প্রাপ্য?

আমার মনে হয় এসব অনেকটাই এখন বুঝতে পারি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন যেন সন্দেহপরায়নতাই একজন শাসকের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। সঙ্গত কারণেই বিষয়টা আমাকে পীড়িত করে, আমার সৎ-ভাইদের বিদ্রোহ মানুষের উপরে কম আস্থা আরোপ এবং বেশী মাত্রায় সতর্ক হবার শিক্ষা আমাকে দিয়েছে, এমনকি পরিবারের সেইসব ঘনিষ্ঠ সদস্যদের ক্ষেত্রেও যাদের আমি অকৃত্রিম মিত্র হিসাবে বিবেচনা করতাম। কিন্তু সাধারণ মানুষ, আমার প্রজারা, যাদের কেবল আমার শরণার্থী হিসাবে দেখি কিংবা রাষ্ট্রীয় ভ্রমণের সময়ে যাদের আনুগত্য আমার প্রয়োজন তাঁদের ক্ষেত্রে আমি কি করবো?

তাদের কাছে তুমি সবসময়ে অন্তরঙ্গতাবর্জিত একজন হিসাবে অবস্থান করবে। তুমি কেমন তারচেয়ে তারা তোমাকে কিভাবে প্রত্যক্ষ করে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। তোমার পক্ষে যখনই সম্ভব হবে তুমি তাদের সামনে উপস্থিত হবে এবং যখন দর্শন দেবে তাঁদের কাছে সেটা যেন সূর্যের মতো মনে হয়, দৃষ্টি আরোপের ক্ষেত্রে বড় বেশী দীপ্রময়। তাঁদের সুরক্ষিত রাখতে তোমার ক্ষমতার প্রতি যেন তারা বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে…এবং কেউ তোমার বিরুদ্ধাচারণ করলে তোমার শাস্তি দেয়ার ক্ষমতায়। আমাদের পূর্বপুরুষ তৈমূর তার প্রজাদের কেবল নিজের বিজয় না, সেই সাথে তাঁর ব্যক্তিত্বের ঝলকে কিভাবে বিমোহিত করতেন সেটা স্মরণ কর। সমরকন্দে যেসব প্রাসাদ আর মসজিদ তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তিনি যে অভাবিত সম্পদ প্রদর্শন আর দান করেছেন, সেসব তার প্রতিটা বিজয়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, পৃথিবীর বুকে তাঁর পদচিহ্ন চিরস্থায়ী করতে।

হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং ধীরে জানালার দিকে হেঁটে যায়। বৃষ্টি থেমে এসেছে। এবং বিপ্ন আকাশের ধুসর বুক চিরে সূর্যালোকের কয়েকটা ম্লান রশ্মি নীচে নেমে আসে। তার ফুপুজান ঠিকই বলেছে- দরবারের রাজনীতি অনুধাবনে যে প্রয়াস আর সময় সে ব্যয় করেছে সেজন্য অসন্তষ্ট হওয়া তার উচিত হবে না। কেবল বিজয় না, সে তার লোকদের জন্য জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী আর বিনোদনের ব্যবস্থা করবে…একজন নশ্বর মানুষ হিসাবে না তাঁরা তাঁকে ক্ষমতা আর উত্তর্ষের প্রতীক হিসাবে বিবেচনা করবে।

হুমায়ুন- এটা একবার দেখো…

ঘুরে তাকিয়ে সে দেখে খানজাদা একটা ঢাউস বইয়ের হাতির দাঁতের তৈরী মলাটের সাথে যুক্ত দুটো রূপার ক্ষুদ্রাকৃতি কজা খুলছে যা তার এক পরিচারিকা তার কাছে নিয়ে এসেছে। বইটা চন্দন কাঠের তৈরী একটা রেহেলের উপরে রেখে সে পাতা উল্টাতে আরম্ভ করে, লাইনের পর লাইন চোখ বুলিয়ে যাবার সময় তাঁর ভ্র কুচকে থাকে, সে যা খুঁজছিলো সেটা পাবার পরেই কেবল সন্তুষ্টির সাথে সে মাথা নাড়ে।

তুমি যখন এখানে ছিলে না, আমি সুলতান ইব্রাহিমের ঘরোয়া নথীপত্র আমাদের ভাষায় অনুবাদের আদেশ দিয়েছিলাম। হিন্দুস্তানের শাসকদের দরবারের রীতিনীতি আমাদের দৃষ্টিতে কেমন অদ্ভুত মনে হয় খানিকটা উদ্ভটও- সেগুলো যত্নের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন ধরো, এখানে লেখা রয়েছে যে প্রতিবছর তাঁর সিংহাসনে আরোহণের দিনটিতে একটা সর্বজনীন উৎসবের আয়োজন করে সুলতান ইব্রাহিমের ওজন নেয়া হত এবং ওজনের সমপরিমাণ রূপা, খাদ্যবস্তু আর উৎকৃষ্ট কাপড় তাঁর অমাত্য আর প্রজাদের মাঝে তাদের যোগ্যতা আর পদমর্যাদা অনুযায়ী বিলিয়ে দেয়া হত। তুমিও এমন কিছু একটা করতে পার? প্রজাদের কাছে নিজের ক্ষমতা আর সম্পদ-এবং তোমার উদারতা প্রদর্শন করে তুমি তোমার ধনী আর দরিদ্র প্রজাদের আনুগত্যের বন্ধনে আবদ্ধ করতে পার। দেখ- অনুষ্ঠানটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এখানে দেয়া হয়েছে…।

খানজাদার কাছে এসে হুমায়ুন তাঁর কাঁধের উপর দিয়ে লেখাটা পড়ে। প্রথমে, ওজন নেবার অনুষ্ঠানে পালনীয় আচারের বিশদ বর্ণনা পড়ে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। বিস্মিত হবার কোনো কারণ নেই মোগলরা পানিপথে সুলতান ইব্রাহিমের বাহিনীকে সহজেই পরাস্ত করেছিল যদি সুলতান এসব বিষয় প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। কঠিন যুদ্ধ আর রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে যে সম্পদ অর্জিত হয়নি সেটা অপুরুষোচিত, দুর্বলচিত্তের পরিচায়ক। সে তুলনায় বিজয়ের অব্যবহিত পরেই তাঁর যোদ্ধাদের ঢালে লুষ্ঠিত সম্পদ স্তূপীকৃত করাটা বরং অনেক উত্তম…

সে অবজ্ঞায় ঠোঁট বাঁকায়। হিন্দুস্তানের অতীতের নৃপতিরা যেভাবে শাসন করেছে সেভাবে শাসন করার জন্য মোগলরা হিন্দুস্তানের উপরে প্রভুত্ব স্থাপন করেনি। কিন্তু খানজাদা আগ্রহী চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকলে সে নিজের ভাবনার রাশ সংযত করে এবং সে যখন সংযত হয় তার নিশ্চয়তায় ফাটল ধরে। তাঁর প্রতিক্রিয়া এখনও সম্ভবত মধ্য এশিয়ার বিশুষ্ক তৃণপ্রধান প্রান্তর থেকে আগত সেইসব যাযাবর যোদ্ধাদের মতোই রয়েছে…কিন্তু সে এখন হিন্দুস্তানে রয়েছে এবং অবশ্যই পরিবর্তিত হওয়া শিখতে হবে। খানজাদা সম্ভবত ঠিকই বলেছেন। একজন নৃপতির যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভের সাথে সাথে তার পুরস্কৃত করার এবং সম্ভ্রম উদ্রেকের সামর্থ্যের দ্বারাই ক্ষমতার অধিকারী হয়। এইসব পুরাতন আনুষ্ঠানিকতার মাঝে নিশ্চয়ই কিছু একটা রয়েছে। সুলতান ইব্রাহিমের কিছু কিছু রীতি বোধহয় তার গ্রহণ করা উচিত কিন্তু সেগুলোকে নতুন জৌলুসে… জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনী হিসাবে গড়ে তুলতে হবে…

হুমায়ুন খানজাদার কাঁধে হাত রাখে। আরও একবার আমার কর্তব্য করণীয় সম্পর্কে আপনি আমাকে পথ দেখালেন…

*

জওহরের ধরে থাকা ঘষা-মাজা করা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে হুমায়ুন তাকিয়ে থাকে। তার পরনে ধুসর নীল বুটিদার রেশমের উপরে সোনার কারুকাজ করা আলখাল্লা এবং তাঁর আঙ্গুলে আর গলার চারপাশে মূল্যবান সব পাথর ঝলমল করছে। নিজের আঁকালো পোষাক আর অলঙ্কারে মুগ্ধ, নিজের উপস্থাপিত অবয়ব দেখে প্রীত হয়ে হাসে সে। বস্তুত পক্ষে, তাঁর কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ যে অলঙ্কারটা সেটা হল কোহ-ঈ-নূর হীরক খণ্ড, তাঁর আলোর পর্বত, যা স্বর্ণখচিত অবস্থায় তার বুকে শোভা পাচ্ছে, এবং– এমনকি এর চেয়েও বেশী। ডান হাতের মধ্যমায় পরিহিত তৈমুরের স্বর্ণ অঙ্গুরীয়। আংটিটা হুমায়ুনের সৌভাগ্যে কবচ- এর পৌরুষত্ব, বস্তুগত দৃঢ়তা তাঁর কাছে সবার প্রত্যাশার মাত্রা অবিরত তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়, তাকে এখনও কত কিছু অর্জন করতে হবে…

হুমায়ুন ইশারায় জানায় যে আগ্রা দূর্গের বিশাল দর্শনার্থী কক্ষের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হবার জন্য সে প্রস্তুত। ব্রোঞ্জের তৈরী দুটো লম্বা সূর্যের তূর্যনাদ আর পাদিশাহ্ সালামাত, সম্রাটের জয় হোক, সে বহু-স্তম্ভ বিশিষ্ট দরবার হলে প্রবেশ করে যেখানে তার নেতৃস্থানীয় প্রজাবৃন্দ- তাঁর রাষ্ট্রীয় আধিকারিকেরা, তাঁর সেনাপতিরা, তাঁর অমাত্যবৃন্দ এবং তাঁর বশ্যতা স্বীকার করে নেয়া হিন্দুস্তানী রাজারা অপেক্ষা করছে। তারা অধোমুখে প্রণত হতে, তাঁদের কপাল মাটি স্পর্শ করে, উজ্জ্বল আলখাল্লা পরিহিত অবস্থায় তাদের তীব্র বাতাসের ঝাপটায় নুয়ে পড়া ফুলের বাগিচার মতো দেখায়।

আপনারা উঠে দাঁড়াতে পারেন।

দরবার হলের দূরবর্তী প্রান্তে পদ্মপাতার আকৃতির একটা মার্বেলের জলাধারের মাঝে সারিযুক্ত ফোয়ারায় জলপ্রপাতের মতো প্রবাহিত গোলাপজলের সুগন্ধ, চারটা সুরু পদযুক্ত সারসের মতো দেখতে, যাদের চোখের বদলে রুবী বসান রয়েছে, লম্বা সোনালী দাহকে পুড়তে থাকা ধূপের ঝাঁঝালো গন্ধের সাথে এসে মিশে। হুমায়ুনের পায়ের নীচে পাথরের মেঝের উপরে বিছান লাল এবং নীল রঙের কার্পেট, সে যখন ধীরে ধীরে সোনালী ঝালর দেয়া সবুজ মখমলের শামিয়ানার নীচে স্থাপিত উঁচু বেদীর দিকে এগিয়ে যায়, নরম লাগে এবং পা ডুবে যায়, বেদীর উপরে সোনালী রঙের একটা অতিকায় দাড়িপাল্লা দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা শক্ত কাঠের আড়া থেকে সোনার শেকলের সাহায্যে দুটো অতিকায় তশতরি ঝুলান হয়েছে, তাঁদের প্রান্তের ধুসর গোলাপী বর্ণের খনিজ পাথরের হীরকাকার খণ্ডের কিনারা মুক্তাখচিত।

দাড়িপাল্লার ঠিক বিপরীত দিকে সাজান রয়েছে দান সামগ্রী যা তার বিপরীতে ওজন করা হবে- কারুকার্যখচিত হাতির দাঁতের বাক্স ভর্তি আকাটা রত্নপাথর, স্বর্ণ আর রৌপ্য মুদ্রা ভর্তি সোনার গিল্টি করা কাঠের গুঁড়ি যার প্রতিটা কক্ষে বয়ে আনতে আটজন করে লোকের দরকার হয়েছে, পশমিনা ছাগলের পশমী কাপড়ের গাঁট যা এতটাই নমনীয় আর কোমল যে একটা ছোট আংটির ভিতর দিয়ে ছয় ফিট চওড়া কাপড়ের বিস্তার অনায়াসে পার হয়ে যেতে পারে, রংধনু রঙের বেলনাকারে পাকানো রেশম কাপড় এবং পিতলের ট্রে যার উপরে মশলা স্তূপ করে রাখা।

বেদীর সামনে এবং দুপাশে দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শণার্থীদের হুমায়ুন জরিপ করে, যাদের ভিতরে তাঁর নানাজান বাইসানগার এবং তাঁর শুভ্র শুশ্রুমণ্ডিত উজির কাশেমও রয়েছে। দুই প্রবীণ ব্যক্তি সমর্থনের দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং এক মুহূর্তের জন্য হুমায়ুন বাবরের কথা ভাবে যার শাসনামলের শুরুর দিকে তাঁরাই তাঁকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছিল…কিন্তু এটা শোক বা আক্ষেপের মুহূর্ত না বরং আড়ম্বর আর আনুষ্ঠানিকতার সময়। সে আজ একটা রাজকীয় বিবৃতি দেবে।

নয় বছর পূর্বে পানিপথের যুদ্ধে আমি আমার বাবার পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিলাম। আল্লাহতালা আমাদের একটা মহান বিজয় এবং একটা নতুন রাজ্য দান করেছিলেন। এটাও আল্লাহ্তালার ইচ্ছা যে আমার আব্বাজান তিনি যা জয় করেছিলেন সেটা উপভোগের জন্য বেশীদিন জীবিত থাকেননি। হিন্দুস্তানের মোগল সম্রাট হিসাবে আমাকে ঘোষণা করে খুতবা পাঠের আজ তৃতীয় বার্ষিকী। আমার সাম্রাজ্য এখনও নবীন কিন্তু এর আয়তন বৃদ্ধি পাবে…বস্তুতপক্ষে অটোমান সুলতান বা পারস্যের শাহদের স্নান করে দিয়ে এই সাম্রাজ্য ক্ষমতাধর হয়ে উঠবে। মধ্যাহ্নের সূর্যের ন্যায় মোগলদের জৌলুস দ্যুতি ছড়াবে, যারাই এর চোখের দিকে তাকাবার সাহস দেখাবে অন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের সীমান্তে যারা হুমকির কারণ হয়ে উঠেছিল আমি ইতিমধ্যে তাদের পরাজিত করে আমার ক্ষমতা প্রমাণ করেছি। বাহাদুর শাহ এবং লোদি রাজ্যাভিযোগী তার্তার খান অসৎ উদ্দেশ্যে পাহাড়ে লুকিয়ে রয়েছে এবং তাঁদের একদা যে বিপুল ধনসম্পদ ছিল এখন আমার কোষাগারে গচ্ছিত রয়েছে। কিন্তু তোমরা যারা আমার এবং আমার বংশের প্রতি বিশ্বস্ত তাঁরা আজ থেকে শুরু হওয়া গৌরব আর প্রাচুর্যের অংশীদার হবে।

তারা ঠিক যেমন যত্নের সাথে পূর্বে মহড়া দিয়েছিল, কাশেম তূর্যবাদকদের ইশারা করতে তারা আরেকদফা দীর্ঘ তূর্যনাদ অনুকীর্তন করে, যা কক্ষের চারপাশে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। হুমায়ুন দাঁড়িপাল্লার দিকে এগিয়ে যায়। সোনালী তশতরীর একটাতে উঠে দাঁড়াতে সে টের পায়, তার ওজনে সেটা মাটির দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কাশেম হাততালি দিতে, পরিচারকের দল বাক্সের পর বাক্স মূল্যবান পাথর অপর তশতরীতে স্তূপীকৃত করতে শুরু করে যতক্ষণ না, ঢাকের সুললিত ধ্বনির সাথে হুমায়ুন ধীরে ধীরে জমিন থেকে উপরে উঠে আসতে থাকে। অবশেষে, পাল্লা যখন ভারসাম্যে আসে তখন আরেকবার তূর্যধ্বনি শোনা যায়।

লাল চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা একটা বই খুলে কাশিম পাঠ আরম্ভ করে। মহামান্য সুলতান, হুমায়ুন, তাঁর অসীম উদারতার বশবর্তী হয়ে ঘোষণা করছেন যে এইসব মূল্যবান রত্নপাথর তাঁর অমাত্য এবং অনুগত প্ৰজাসকল যাদের নাম এখানে রয়েছে তাদের ভিতরে ভাগ করে দেয়া হবে। সে ধীরে কিন্তু সুললিত কণ্ঠে সুর করে একের পর এক নাম পড়তে থাকে। হুমায়ুনের হাসিতে কৃতজ্ঞতা ফুটতে দেখে- এমনকি লোভও।

এবং এভাবেই ব্যাপারটা চলতে থাকে। হুমায়ুনকে এরপরে থলে ভর্তি সোনা আর রূপার বিপরীতে ওজন করা হয় যা তাঁর সেনাপতিদের ভিতরে বাড়তি পুরষ্কার হিসাবে বিতড়িত হবে এবং এরপরে রেশমের থান, মশলা আর কিংখাবের বিপরীতে তাঁকে ওজন করা হয় যা অন্যান্য শহর আর প্রদেশের শীর্ষ আধিকারিক আর প্রজাদের জন্য পাঠান হয়। অবশেষে সে দরিদ্রদের মাঝে খাদ্যশস্য আর রুটি বিতরণের আদেশ দেয় স্মরণ করিয়ে দিতে যে সম্রাট কেবল তাঁর ধনী এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রজাদের কথাই না বরং সবার কথাই ভাবেন।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে এবং শুকরিয়া আর সমর্থনের চিৎকারের রেশ মিলিয়ে আসতে হুমায়ুনের মাথা ব্যাথা আরম্ভ হয়। দরবারের আনুষ্ঠানিকতা- সেখান থেকে প্রচারিত বক্তব্য- রাজবংশের জন্য গুরুতুবহ। সে এখন সেটা বোঝে এবং নিজের প্রজাদের মাঝে সম্ভ্রম জাগ্রত করতে তাকে অবশ্যই আরো উপায় খুঁজে বের করতে হবে কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের কক্ষে ফিরে আসতে পেরে সে স্বস্তি পায় এবং পরণের ভারী আলখাল্লাটা ছুঁড়ে ফেলে। তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারকেরা তাঁকে যখন আরামদায়ক চোগা আর আচকানে সজ্জিত করে তখন জওহর তার অলঙ্কারগুলো নিয়ে সিন্দুকে তুলে রাখে, সে বুঝতে পারে তার একটু একা থাকা প্রয়োজন, চিন্তা করার জন্য সময় দরকার। যমুনার তীর থেকে সে ঘোড়া নিয়ে ঘুরে আসতে পারে যেখানের বাতাস এখানের এই দূর্গের দমবন্ধ করা পরিবেশের চেয়ে নিশ্চয়ই শীতল হবে। সেখান থেকে ফিরে এসে সে সম্ভবত মিষ্টি-গন্ধযুক্ত হারেম এবং সেখানে বসবাসরত তার কোনো এক সুন্দরী তরুণী রক্ষিতাকে দর্শন দিতে পারে।

সুলতান, মহামান্য গুলরুখ আপনার সাথে কথা বলার অনুমতি প্রার্থনা করছেন। একটা কোমল, অদ্ভুত বাচনভঙ্গি বিশিষ্ট কণ্ঠস্বর তার ভাবনায় বিঘ্ন ঘটায়। ঘুরে দাঁড়িয়ে, হুমায়ুন কালো চোখের এক যুবককে দেখে যার মাথা ভর্তি কালো ঝাকড়া চুল কাঁধ পর্যন্ত নেমে এসেছে। হুমায়ুন তাঁকে আগে কখনও দেখেছে বলে মনে করতে পারে না। নমনীয় এবং পেলব দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী ছেলেটাকে দেখে কোনো মতেই বিশ বছরের বেশী বয়সী বলে মনে হয় না। তাঁর বাহুদ্বয় পরণের লাল কারুকার্যখচিত আস্তিনহীন পোষাকের কারণে নগ্ন সাবলীলভাবে পেশীবহুল।

তোমার নাম কি?

মেহমুদ, সুলতান।

এবং তুমি আমার সৎ মায়ের খিদমত কর।

মেহমুদের চোখের মণি ঝিলিক দিয়ে উঠে। হ্যাঁ, সুলতান।

তোমার দেশ কোথায়?

ইস্তাম্বুলের অটোম্যান দরবার। আমি আমার মশলা ব্যবসায়ী প্রভুর সাথে আগ্রা এসেছিলাম কিন্তু তিনি যখন দেশে ফিরে যান ভাগ্যান্বেষণের জন্য এখানেই থেকে যাই। আমি ভাগ্যবান রাজমহিষীর কৃপা দৃষ্টি আমি লাভ করেছি।

গুলরুখ কি চায়? সে কদাচিৎ তাঁকে বিব্রত করে। বস্তুতপক্ষে তাঁর আব্বাজানের ইন্তেকাল এবং তার সৎ ভাইদের চক্রান্তের পরে গুলরুখের সাথে তার কদাচিৎ দেখা হয়েছে। তিনি আগে কখনও তাঁর সাথে দেখা করতে চাননি। গুলরুখের অনুরোধ তাঁকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের ভিতরে ফেলে দেয়। অনিচ্ছাসত্তেও হুমায়ুন তার বেড়াতে যাবার সিদ্ধান্ত বাতিল করে। তাঁর সাথে এখন দেখা করতে গেলে সেটা ভদ্রতার পরিচায়ক হবে এবং সে যত তাড়াতাড়ি যাবে তত তাড়াতাড়ি জানতে পারবে পুরো বিষয়টা কি নিয়ে। বেশ, আমাকে তোমার গৃহকত্রীর কাছে নিয়ে চল।

হুমায়ুন মেহমুদকে অনুসরণ করে নিজের কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে, ভিতরের প্রাঙ্গণ অতিক্রম করে এবং সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসে, যা নীচের ফুলের বাগান দেখা যায় এমন কতগুলো কক্ষের দিকে চলে গিয়েছে যেখানে রাজপরিবারের বয়স্ক মহিলাদের খানজাদা ব্যতীত, যিনি দূর্গের অন্য অংশে থাকতেই পছন্দ করেন- কক্ষ রয়েছে। বাবরের দ্বিতীয় স্ত্রী এবং তাঁর দুই সন্তান, আসকারি এবং কামরানের মা হিসাবে গুলরুখের মর্যাদার সাথে তাঁর বাসস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। রূপার কারুকার্যখচিত উঁত কাঠের তৈরী দরজার দরজার সামনে তারা যখন পৌঁছায়, পরিচারকের দল দরজার পাল্লা খুলে দিতে হুমায়ুন কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে।

তুমি হৃদয়বান তাই এতো দ্রুত এসেছো, গুলরুখ তাঁর উষ্ণ, ভারী কণ্ঠে বলে- যা অনায়াসে তাঁর সবচেয়ে আকর্ষণীয় গুণ- তাঁর দিকে এগিয়ে আসে। এতোটা সম্মান আমি আশা করিনি।

তার আপন মায়ের চেয়ে দুই বছরের বড়, গুলরুখের বয়স চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে, কিন্তু মসৃণ, ঢলঢলে দেহসৌষ্ঠবের কারণে তাকে অনেক অল্পবয়সী মনে হয়। কামরান- পাহাড়ী মার্জারের মতো প্রাণশক্তির অধিকারী যার চোখগুলো সরু আর সবুজ- হুমায়ুন ভাবে, দেখতে বাবরের মতো হয়েছে, মায়ের চেহারা পায়নি। কিন্তু গুলরুখের খুদে কালো চোখ- আগ্রহের সাথে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে- একেবারে আসকারির মতো।

তুমি কি অনুগ্রহ করে একটু বসবে না? সে লাল রেশমের একটা তাকিয়ার দিকে ইঙ্গিত করতে হুমায়ুন সেটায় হেলান দিয়ে বসে।

আমি বিষয়টা নিয়ে কখনও তোমার সাথে আলাপ করিনি কারণ আমি লজ্জিত, কিন্তু আমার ছেলেরা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে যে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিয়েছে সেটা আমার যথেষ্ট মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে। তোমার আব্বাজান আল্লাহ্তালা তাঁর আত্মাকে বেহেশত নসীব করুন- তোমাকে তার উত্তরাধিকার নির্বাচিত করেছেন এবং এর বিরুদ্ধাচারণ করা কারও উচিত নয়। আমাকে বিশ্বাস কর আমি তাদের হঠকারী আর ছেলেমানুষী পরিকল্পনার বিষয়ে কিছুই জানতাম না। তারা কি করেছে আমি যখন শুনতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম তুমি তাদের প্রাণদণ্ডের আদেশ দেবে। যখন তাদের প্রাণভিক্ষা চাইতে তোমার কাছে আসব বলে ঠিক করেছি তখনই আমি তোমার উদারতার কথা শুনতে পাই কিভাবে তুমি তাদের বুকে টেনে নিয়েছে এবং তাদের মার্জনা করেছে আর সমৃদ্ধ প্রদেশের শাসক হিসাবে তাঁদের মনোনীত করেছো…আমার বহুদিনের ইচ্ছা এই বিষয়ে তোমার সাথে আলাপ করি কারণ একজন মা হিসাবে আমি তোমাকে ধন্যবাদ দিতে চাই। আমি আজকের দিনটা বেছে নিয়েছি কারণ আজ তোমার রাজত্ব আরম্ভ হবার তৃতীয় বার্ষিকী। আমি বিষয়টাকে মাঙ্গলিক হিসাবে বিবেচনা করছি আর আমি তোমাকে অভিনন্দনও জানাতে চাই। তুমি খুব বেশী দিন হয়নি যে সম্রাট হয়েছে কিন্তু এরই ভিতরে তোমার অর্জন প্রচুর।

আমি বিশ্বাস করি আমার ভাইয়েরা তাদের কৃতকর্মের শিক্ষা পেয়েছে এবং তাঁরা এখন জীবনের পূর্ণতা খুঁজে পাবে… তাকিয়ার উপরে হুমায়ুন অস্বস্তি নিয়ে নড়েচড়ে উঠে, বিব্রতবোধ করে এবং চলে যাবার জন্য রীতিমতো উৎকণ্ঠায় ভুগতে আরম্ভ করে। কিন্তু, তাঁর সন্দেহ হয়, গুলরুখের আরও কিছু বলবার আছে। গুলরুখ তাঁর মেহেদী রঞ্জিত আঙ্গুল বুকের উপরে চেপে ধরে আরও কাছে। এগিয়ে আসে।

আমি তোমার কাছে একটা অনুগ্রহ আশা করি যদিও আমার ঠিক সাহস হয় না…

কামরান আর আসকারিকে দরবারে ডেকে পাঠাবার অনুরোধ কি গুলরুখ করতে চাইছে? তার কথা শেষ করার জন্য অপেক্ষা করতে করতে হুমায়ুন নিজের ভিতরে বিরক্তির একটা ঝলক অনুভব করে।

তুমি যদি আমার ইচ্ছাটা রাখো তাহলে সেটা আমাকে ভীষণ প্রীত করবে। হুমায়ুনের নিরবতা আপাতভাবে গুলরুখকে স্পর্শ করে না। তোমার গুজরাত বিজয় উদযাপন করতে, আমি তোমার সম্মানে একটা ভোজসভার আয়োজন করতে চাই। তোমার আম্মিজান আর ফুপু এবং রাজপরিবারের অন্যান্য মহিলারাও আমার অতিথি হবে। তোমার খাতিরে আমাকে এটুকু অন্তত করতে দাও, আমি তাহলে জানব যে তুমি সত্যিই আমার ছেলেদের ক্ষমা করেছে এবং বাবরের পরিবারে সম্প্রীতি ফিরে এসেছে।

হুমায়ুন নিজের ভিতরে স্বস্তির একটা আমেজ অনুভব করে। সে তাহলে এটা চায়- এটা তার ছেলেদের আগ্রায় ফিরিয়ে আনবার জন্য কোনো অশ্রুসিক্ত আবেদন নয়… কেবলই তার বিজয় উদযাপন। গুলরুখের অনুরোধের প্রতি নিজের সম্মতি প্রকাশ করতে সে তার মাথা নাড়ে, এবং শেষবারের মতো মাধুর্যপূর্ণ সৌজন্যতা প্রকাশ করে সে তার কাছ থেকে বিদায় নেয়।

ঘোড়সওয়াড়ীর ধারণা বাদ দিয়ে, সে এর বদলে মায়ের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয়। মাহামের বাসকক্ষের দিকে অগ্রসর হবার সময়ে সে দিলদারের কক্ষের পাশ দিয়ে যায়। খুব অল্প বয়সে- দশ কি বারো দিন হবে- যখন বাবর হিন্দালকে মাহামের হাতে তুলে দিয়েছিল। তাঁর কেবল মনে আছে তার মা তাঁকে ডেকে এনে নিজের কোলের শিশুটিকে তাঁকে দেখিয়েছিল। দেখো, তোমার একজন নতুন ভাই এসেছে, মা বলেছিলেন। বিভ্রান্ত হুমায়ুন জোরে চিৎকার করে কাঁদতে থাকা শিশুটির দিকে তাকায় সে ভালো করেই জানে তার মা নয় অন্য মহিলার…

সেই মুহূর্তে ভাবনাটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলে সে। কাবুলে বড় হয়ে উঠার দিনগুলোতে তরবারি নিয়ে যুদ্ধের কৌশল আয়ত্ত্ব করা, মিনিটে ত্রিশটা তীর নিক্ষেপে পারদর্শিতা অর্জন আর পোলো খেলাটা ছিল অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরে সে বুঝতে পেরেছিল মাহামের হাতে হিন্দালকে তুলে দেয়াটা ছিল আব্বাজানের জীবনে দুর্বলতার পরিচায়ক নগণ্য কয়েকটা কাজের অন্যতম- যদিও নিখাদ ভালোবাসা থেকে তিনি কাজটা করেছিলেন।

বিষয়টা থেকে কার মঙ্গল হয়েছে? মাহামের শোকের প্রকোপ হয়ত এরফলে প্রশমিত হয়েছে কিন্তু এর ফলে পরিবারের ভিতরে মতানৈক্য পুষ্ট হয়েছে। প্রথম দিকের বছরগুলোতে সে হিন্দালকে দিলদারের কাছ থেকে আলাদা রাখতে সবসময়ে পাহারা দিত। কিন্তু হিন্দালের বয়স হলে এবং তার আসল মা কে সেটা সে জানতে পারলে, সঙ্গত কারণেই মাহামের কাছ থেকে সে দূরে সরে যায়। সম্ভবত এটাই কারণ, সবচেয়ে ছোট হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কামরান আর আসকারির চক্রান্তে হিন্দাল যোগ দিয়েছিল। সম্ভবত সেদিনের জন্য এটা ছিল তাঁর প্রতিশোধ যেদিন দিলদারের কোল থেকে তাঁকে পৃথক করা হয়েছিল।

দিলদারের নিজের কি অবস্থা? এতোগুলো বছর তাঁর মনে কি ভাবনা খেলা করেছে? সে নিদেনপক্ষে গুলবদনকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা লাভ করতে পেরেছে…কিন্তু সে যখন ভূমিষ্ঠ হয়েছিল, দিলদার কি শঙ্কিত হয়েছিল যে মাহাম মেয়েটাকেও তাঁর কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেষ্টা করবে? হুমায়ুন আপনমনে মাথা নাড়ে। সে কখনও সেটা জানতে পারবে না। দিলদার এখন মৃত। মাহাম এসব বিষয়ে কখনও কথা বলে না এবং খানজাদাকেও এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে তাঁর দারুণ অনীহা। মেয়েদের জগতটা সম্ভবত অনেক জটিল আর অন্ধকারাচ্ছন্ন একটা জায়গা। পুরুষদের পৃথিবীর যত যুদ্ধ আর সংঘাতের সাথে তুলনা করলে মনে হয়, যেখানে সব বিরোধের মীমাংসা মুষ্ঠাঘাত বা তরবারির এক আঘাতে নিস্পন্ন হতে পারে, সেটা অনেক বেশী পরিচ্ছন্ন আর সহজ।

*

একদম প্রায় সোনালী চাঁদের নীচে, দূর্গপ্রাঙ্গণ যা গুলরুখ তাঁর আয়োজিত উৎসবের জন্য মনোনীত করেছে স্থানটা তামার গোলাকার পাত্র বা দিয়ার মাঝে সঞ্চিত সুগন্ধি তেলের ভিতরে জ্বলতে থাকা অসংখ্য সলতের মৃদু আভায় আলোকিত। দূর্গপ্রাঙ্গণের একটা দেয়ালের সাথে একটা বিশাল তাবু দেখা যায়- মোগলদের মাতৃভূমিতে যেমনটা দেখা যায় অনেকটা তেমনি চোঙাকৃতি। কিন্তু শীতকালের তীব্র বাতাসের ঝাপটা সহ্য করার জন্য মজবুত লাঠি একত্রে আটকে এবং পুরু পশমে আবৃত করে তৈরী করার বদলে, হুমায়ুন দেখতে পায় যে কাঠামোটা সরু রৌপ্য দণ্ড দিয়ে নির্মিত যা ফুলের নক্সা শাভিত রেশমী কাপড় দ্বারা আবৃত। রেশমের কাপড়টাকে দুপাশ থেকে পেছনে টেনে বাঁধা হয়েছে মুক্তাখচিত ফিতা দিয়ে যাতে করে প্রবেশপথ রাতের উষ্ণ বাতাসে অর্ধেক উন্মুক্ত থাকে।

গুলরুখের দুজন পরিচারিকা তাঁকে পথ দেখিয়ে তাবুর ভিতরে নিয়ে যায় যেখানে সে অপেক্ষা করছে, পরণে গাঢ় বেগুনী রঙের আলখাল্লা এবং একই রঙের শাল সেটাতে আবার রূপার জরি দিয়ে কারুকাজ করা যা তার মাথা আর কাঁধ ঢেকে রেখেছে। কিন্তু গুলরুখের তরুণী পরিচারিকার দল অর্ধ-স্বচ্ছ মসলিনের পোষাক পরিহিত। দপদপ করতে থাকা আলোর মাঝ দিয়ে তারা এগিয়ে যাবার সময়, হুমায়ুনের দৃষ্টি তাঁদের নমনীয় কোমড়ের বাঁক, সুগঠিত স্তন আর ইন্দ্রিয়সুখাবহ গোলাকৃতি উরু আর নিতম্ব আটকে যায়। তাঁদের নাভিমূলে মূল্যবান পাথর ঝলসে উঠে এবং তাঁদের ঘন কালো চুল হিন্দুস্তানী রীতিতে সাদা জুই ফুল দিয়ে বেণী বাঁধা।

অনুগ্রহ করে… গুলরুখ একটা নীচু, মখমল মোড়া আসনের দিকে ইঙ্গিত করে। হুমায়ুন সেখানে আসন গ্রহণ করলে, তাঁর পরিচারিকাদের একজন চন্দন-সুবাসিত, শীতল পানি পূর্ণ কলাই করা সোনালী জগ হাতে তাঁর সামনে নতজানু হয় যখন আরেকজন সুতির একটা কাপড় নিয়ে আসে। হুমায়ুন তার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং প্রথম পরিচারিকা তাদের উপরে পানির ধারা বইয়ে দেয়। ধীরে, প্রণয়পূর্ণ ভঙ্গিতে অপরজন সেটা মুছে দেয়।

বিভ্রান্ত হুমায়ুন তার মা আর খানজাদা আর অন্যান্য রাজ মহিষীদের খোঁজে চারপাশে ইতিউতি তাকায়, কিন্তু গুলরুখ আর তার পরিচারিকাদের ছাড়া তারা সম্ভবত সেখানে একা।

আমি ভেবেছিলাম, স্বল্প পরিসরে, আনুষ্ঠানিকতাবর্জিত উৎসব আয়োজন হয়ত তোমার পছন্দ হবে, গুলরুখ বলে। আজ আমি তোমার একমাত্র আতিথ্যকত্রী কিন্তু আশা করি তুমি আমার অসম্পূর্ণতা মার্জনা করবে।

হুমায়ুন এবার তার আসনে একটু সোজা হয়ে বসে, চোখে সতর্ক দৃষ্টি। গুলরুখ কি করতে চায়? নিশ্চয়ই জানে তাঁর আমন্ত্রণ সে সৌজন্যের খাতিরে গ্রহণ করেছিল- তাঁর বেশী কিছু না-কিন্তু সে বোধহয় আয়োজনটাকে অন্তরঙ্গ কিছু একটায় পরিণত করতে চায়। এক মুহূর্তের জন্য সে ভয় পায় যে গুলরুখ বোধহয়। তাঁকে প্রলুব্ধ করতে চেষ্টা করবে, হয় সে নিজে বা তাঁর পরিচারিকাদের মাধ্যমে।

আমি তোমার জন্য একটা চমকের বন্দোবস্ত করেছি।

হুমায়ুন চারপাশে তাকায়, মনে ক্ষীণ আশা সে ঘন্টা আর মন্দিরার আওয়াজ শুনতে পাবে এবং সারিবদ্ধভাবে নাচিয়ে মেয়েদের এগিয়ে আসতে দেখবে নিদেনপক্ষে টলমল করে এগিয়ে আসা বাজিকর, দড়াবাজ এবং আগুন-খেকোদের দল যা দরবারের মনোরঞ্জনের বাধা উপকরণ। কিন্তু এর বদলে তার ডান পাশের ছায়ার ভিতর থেকে নমনীয় একটা অবয়ব আবির্ভূত হয়। অবয়বটা সরাসরি তার দিকে এগিয়ে আসলে, হুমায়ুন মেহমেদের ধুসর মুখাবয়ব চিনতে পারে। তুর্কী লোকটা তার সামনে নতজানু হয় এবং একটা পানপাত্র তার দিকে এগিয়ে দেয় যেটা লাল সুরার মতো দেখতে একটা পানীয় দ্বারা ভর্তি।

এটা কি? মেহমেদকে উপেক্ষা করে হুমায়ুন এবার সরাসরি গুলরুখের দিকে তাকায়।

কাবুলের দক্ষিণ থেকে সংগৃহীত উচচণ্ড আফিমের একটা বিশেষ মিশ্রণ এবং গজনীর লাল সুরা, আমি নিজের হাতে মিশ্রিত করেছি আমাদের পরিবারের ভিতরে সীমাবদ্ধ একটা প্রস্তুতপ্রণালী অনুসারে। মাঝে মাঝে তোমার আব্বাজান যখন ক্লান্ত হয়ে পড়তেন-আমি এটা তার জন্য প্রস্তুত করতাম। তিনি বলতেন পানীয়টা তাকে আত্মহারা করে তুলে…

হুমায়ুন গাঢ়, প্রায় বেগুনী তরলটার দিকে যখন তাকিয়ে থাকে, তাঁর মানসপটে বাবরের একটা ধারাবাহিক প্রতিচ্ছবি ঝলসে উঠে, যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় লাভের পরে আনন্দে অধীর হয়ে আফিম নিয়ে আসতে বলে নিজেকে আরও তুঙ্গস্পর্শী উচ্চতায় নিয়ে যাবার জন্য…সে তার আব্বাজানের মুখাবয়বে পরমানন্দের অনুভূতি লক্ষ্য করেছে, তার আনন্দদায়ক অনুভূতির চাপা গুঞ্জন শুনেছে। তাঁর নিজের কাছেও অবশ্য আফিম অপরিচিত কিছু না। তার আব্বাজানের মৃত্যুর পরে এটা তার শোককে প্রশমিত করতে সাহায্য করেছে। পরবর্তীতে সে ইন্দ্রিয়পরবশ অবসন্নতা আবিষ্কার করেছে যা গোলাপজলে দ্রবীভূত কয়েকটা বড়ি উৎপন্ন করতে পারে এবং যা রমণের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বাবরকে যেমন আত্মহারা দেখাত সে কদাচিৎ সেরকম পুরোপুরি আত্মহারা হতে পেরেছে।

তুমি কি প্রথমে তোমার ব্যক্তিগত খাদ্য আস্বাদকারীকে ডেকে পাঠাতে চাও?গুলরুখ জানতে চায়। কিন্তু হুমায়ুন কোনো উত্তর দেবার আগেই সে সামনে এগিয়ে এসে মেহমেদের হাত থেকে পানপাত্রটা তুলে নেয় এবং সেটাকে নিজের নিখুঁত ঠোঁটের কাছে তুলে আনে। সে ঢোক গেলাতে তাঁর ভরাট গলা কেঁপে উঠে এবং হুমায়ুন দেখে গুলরুখ নিজের হাত উঁচু করে চিবুক বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসা। তরলের কয়েকটা ফোঁটা ধরে এবং তারপরে কমনীয় ভঙ্গিতে চেটে নিজের আঙ্গুল পরিষ্কার করে।

সুলতান, পান করুন। আপনার জন্য এটা আমার উপহার… হুমায়ুন সামান্য ইতস্তত করে তারপরে পানপাত্রটা হাতে নেয়, তখনও সেটা তিন-চতুর্থাংশ পূর্ণ, এবং সেটাকে নিজের ঠোঁটের কাছে তুলে এনে একটা চুমুক দেয়। সুরাটার স্বাদ কেমন একটু অগ্নিগর্ভ মনে হয়- গুলরুখ নিশ্চিতভাবেই আফিমের হাল্কা তিতা স্বাদ ঢাকতে মশলা ব্যবহার করেছে। হুমায়ুন আবারও পান করে, এইবার আরও জোরালভাবে এবং অনুভব করে তার দেহের ভিতরে এক ধরনের কোমল উষ্ণত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে- গলা দিয়ে সেটা প্রথমে নামে, তারপরে তাঁর পাকস্থলীর গর্ভে গিয়ে থিতু হয়। কয়েক মুহূর্ত পরে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ভারী হয়ে উঠতে থাকে। একটা আনন্দদায়ক, দুর্নিবার একটা নিশ্চেষ্টতা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলতে থাকে এবং হুমায়ুন পরিশ্রান্ত একজন মানুষের মতো যিনি একটা নরম বিছানা তাঁর জন্য প্রস্তুত দেখতে পেয়ে সেটাতে শোয়ার জন্য অপেক্ষা করতে অপারগ এমনভাবে নিজেকে এই আলস্যের হাতে সঁপে দেয়।

পানপাত্রে থেকে যাওয়া বাকি পানীয়টুকুও গিলে নেয় সে। তার চোখ ইতিমধ্যে অর্ধেক বন্ধ হয়ে গিয়েছে সে অনুভব করে তাঁর কাছ থেকে একটা কোমল হাত পানপাত্রটা নিয়ে নেয় এবং চেয়ার থেকে তাকে তুলে নিয়ে এবং তাকে পথ দেখিয়ে একটা নরম গদির কাছে নিয়ে আসে যেখানে তাঁরা তাঁকে শুইয়ে দেয়। কেউ একজন তার মাথার নীচে একটা বালিশ রাখে এবং সুগন্ধিযুক্ত পানি দিয়ে আলতো করে তার মুখটা মুছিয়ে দেয়। ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে এবং হুমায়ুন বিলাসপ্রিয় ভঙ্গিতে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে। শীঘ্রই তাঁর দেহে এমন একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে যেন একটা শূন্যতার মাঝে দেহটা দ্রবীভূত হচ্ছে। সে নিজের দেহের কোনো অংশই অনুভব করতে পারে না কিন্তু এতে কিবা এসে যায়? তাঁর আত্মা- সে যা তাঁর মূল নির্যাস, পৃথিবীর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ, হেঁটমুখ করে থাকা একটা জমতো না সে একদা যেমন ছিল- যেন তারকা-শোভিত স্বর্গের দিকে ধাবিত হচ্ছে যা সহসা তাঁর সামনে অবারিত হয়েছে।

নিজের দেহ থেকে মুক্তি পেয়ে, হুমায়ুন ধূমকেতুর মতো ভাসমান অবস্থায় নিজেকে অনুভব করে। সে নীচে যমুনার বুক চিরে বয়ে যাওয়া পানির গাঢ় স্রোত চিনতে পারে যেমন চিনতে পারে আগ্রা দূর্গের প্রকারবেষ্টিত সমতল ছাদে গুলরুখের সুরা ভর্তি পাত্রটা। সবদিক ছাপিয়ে হিন্দুস্তানের আপাত সীমাহীন সমভূমি প্রসারিত, উষ্ণ তমিস্র বিদীর্ণ হয়, কখনও এখানে, কখনও সেখানে, তাঁর নতুন প্রজাদের গ্রামের জ্বলন্ত ঘুঁটের আগুনের দ্বারা জোনাকির মতো। তাদের মাটির তৈরী বাড়ির বাইরে বটবৃক্ষ আর বাবলা গাছের নীচে নিজেদের মামুলি বিছানায় তারা টানটান হয়ে শুয়ে আছে, তাঁরা সেইসব মানুষদের স্বপ্নে দেখছে যাদের জীবন ঋতুর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, কখন বীজ বপন করতে হবে আর কখন শস্য কাটতে হবে এবং যাঁদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা নিজেদের ষাড়ের স্বাস্থ্যসম্পর্কিত এবং তাদের দিয়ে কিভাবে জমি চাষ করবে।

তাঁর আত্মা উড়ে যখন সামনের দিকে এগিয়ে যায়, হুমায়ুন সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করে। কমলা রঙের একটা আলোর কুণ্ডু পৃথিবীর কিনারার উপর দিয়ে ক্ষরিত হয়ে উষ্ণতা আর নবায়ন বয়ে আনছে। এবং এখন ধুসর কমলা আভায় তার নীচে সে কি দেখতে পাচ্ছে?–মহান দিল্লী শহরের প্রাসাদসারি, মিনারসমূহ, এবং অতিকায় সব রাজকীয় সমাধিসৌধ, একদা যা লোদি সুলতানদের রাজধানী ছিল কিন্তু মোগলদের দ্বারা অবজ্ঞাত। হুমায়ুনের অবারিত আত্মা এখনও, হিন্দুস্তানের গরম আর ধূলো পেছনে ফেলে, ভেসে চলে। সে নীচে এখন সিন্ধুর নদের শীতল পানি দেখতে পায়। ওপারে হাড়ের মতো শক্ত আর রঙ জ্বলে যাওয়া সব পাহাড়ের সারি আর কাবুলের দিকে এগিয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা গিরিপথ এবং সেটা এরপরে হিন্দু কুশের শক্ত, হীরক উজ্জ্বল চূড়ার দিকে এগিয়ে গিয়েছে, মোগলদের পিতৃপুরুষের স্বদেশ মধ্য এশিয়ার সমভূমির প্রবেশদ্বার। তারা কতদূর ভ্রমণ করে এসেছে। কি গৌরব তারা লাভ করেছে। এবং এখনও কি বিস্ময় তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে…এই সমস্ত অন্তদৃষ্টির সাহায্যে নতুন কি উচ্চতায় তারা আরোহন করতে পারে? শূন্যে হুমায়ুনের তখনও ভাসমান আত্মার উপরে আকাশ তরল সোনার মতো দীপ্তি ছড়িয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আলিঙ্গন করে।

১.৫ ভাগ্যের পরিহাস

০৫. ভাগ্যের পরিহাস

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যেভাবে শাসন করি সেটা পাল্টে ফেলবো। আমি যেমনটা আশা করি রাজ দরবার মোটেই সেরকম নয়।

হুমায়ুনের সোনার গিল্টি শোভিত সিংহাসনের সামনে অর্ধবৃত্তাকারে আসন-পিঁড়ি হয়ে উপবিষ্ট উপদেষ্টারা, চোখে বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাই দেখে বাইসানগার আর কাশিম, তাঁর প্রতি পুনরায় মনোযোগী হবার পূর্বে, পরস্পরের দিকে বিমূঢ় ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে। যাই হোক না কেন তারা অচিরেই চমকপ্রদ ধারণাগুলো বুঝতে পারবে যা তার আফিম-ক্রিয়ায় স্বপ্নে সে লাভ করেছে যখন, শাসনকার্যের প্রাত্যহিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত, তাঁর ভাবনাগুলো তখন যেন স্ফটিক স্বচ্ছতায় প্রবাহিত হয়। সে স্বপ্নে যা কিছু দেখেছে- সবই যেন গ্রহ, নক্ষত্রের গতিপথে লিপিবদ্ধ রয়েছে…

হুমায়ুন তার ডান হাত উত্তোলিত করে এবং তাঁর ব্যক্তিগত জ্যোতিষী সারাফ, কৃশকায়, বয়স্ক আর পাখির চঞ্চুর ন্যায় নাকের অধিকারী একটা লোক যার পরনে বাদামী রঙের বাদামী বর্ণের একটা ঢাউস আলখাল্লা, চামড়া দিয়ে বাঁধাই করা একটা ভারী ঢাউস খণ্ড শিরাবহুল চওড়া হাতে ধরে সামনে এগিয়ে আসে। ঘোঁতঘোঁত শব্দে স্বস্তি প্রকাশ করে, গ্রহমণ্ডলীর প্রতিকৃতি খচিত সাদা মার্বেলের টেবিলে ঢাউস খণ্ডটা সে নামিয়ে রাখে, হুমায়ুন তাঁর সোনার গিল্টি শোভিত সিংহাসনের যা যা স্থাপন করতে বলেছে।

হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং পাতা উল্টাতে থাকে যতক্ষণ না সে যা খুঁজছিলো সেটা খুঁজে পায়। সেখানে তাঁর পূর্বপুরুষ, মহান জ্যোতিষবিদ উলুঘ বেগের হাতে তৈমূরের পৌত্র- একটা ছক যেখানে মহাকাশে গ্রহমণ্ডলী আর নক্ষত্রের গতিপথ অঙ্কিত রয়েছে। জটিল এই নক্সাটার দিকে যখন তাকিয়ে থাকে সে, তখন দিব্য অনুষঙ্গগুলো যেন নড়তে আরম্ভ করে রাষ্ট্রীয় সফরের আঙ্গিকে, প্রথমে ধীরে কিন্তু যখন গতিবেগ সঞ্চিত হয় তখন যেন একে অন্যকে ধাওয়া করতে থাকে। সে চোখের পলক ফেলে এবং ভালো করে তাকায়, দেখে পাতাটা স্থির হয়ে রয়েছে…এটা নিশ্চয়ই গতরাতে সেবন করা আফিমের প্রতিক্রিয়া। গুলরুখের দ্বারা কেবলই তাঁর জন্য বিভিন্ন উপকরণ মিশিয়ে প্রস্তুতকৃত মিশ্রণটা এখন পরিচিত হয়ে উঠেছে, যা তার আবাসকক্ষে মেহমেদ পৌঁছে দিয়েছে নিশ্চয়ই বিশেষ কোনো জোরাল উপাদান তাতে ছিল। সূর্য দিগন্তের উপরে এক বর্শা পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করবার পরেই কেবল তার ঘুম ভাঙে এবং এমন একটা দিনে যেদিন সে তার অর্ন্তদৃষ্টি প্রকাশ করবে, তাঁকে সকাল সকাল ঘুম থেকে না উঠাবার জন্য সে জওহরকে ভর্ৎসনা করে।

হুমায়ুন সহসা সচেতন হয়ে উঠে, টের পায় তার উপদেষ্টারা তাঁর দিকে আগ্রহী চোখে তাকিয়ে রয়েছে। সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল যে তারাও এখানে উপস্থিত আছে। সে নিজেকে সোজা করে দাঁড় করায়। তোমরা জান আমি গ্রহ আর নক্ষত্রের শেষ না হওয়া আবর্তন পর্যবেক্ষন করেছি, যেমনটা করেছিলেন আমার পূর্বপুরুষ। উলুঘ বেগ। অনেক ভাবনা চিন্তার পরে আমি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে তার গবেষণাকে আমরা অতিক্রম করে যেতে পারি এবং সেই তারকারাজির ছক আর সারণি এবং বহু পূর্বে সংঘঠিত ঘটনাবলীর নথী যখন বিজ্ঞ জ্যোতিষীর সহায়তায় এবং কোনো মানুষের শুদ্ধ ভাবনার আপন ক্ষমতার দ্বারা বিবক্ষিত হয়, সেটা থেকে জীবনযাপন প্রণালীর এমনকি শাসনকার্যের একটা কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব।

তার উপদেষ্টাদের অভিব্যক্তির দ্বারা হুমায়ুন বুঝতে পারে সে কি বিষয়ে কথা বলছে সে সম্বন্ধে এখনও তাদের কোনো ধারণা নেই। কিন্তু তাঁরা তাহলে কিভাবে এটা পারবে? সে যা অবলোকন করেছে তারা সেসব কিছুই দেখেনি যখন গুলরুখের উপাচারের কল্যাণে মুক্তি লাভ করে। তারা কল্পনাও করতে পারবে না সে মানসপটে এমনসব কল্পলোকে সে ভ্রমণ করে এসেছে। কিন্তু সে তার শাসনপদ্ধতিতে যে ব্যাপক উন্নতিসাধনের পরিকল্পনা করেছে তারা সে বিষয়ে অচিরেই জানতে পারবে।

আমি অনুধাবন করতে পেরেছি যে আমরা গ্রহমণ্ডলী আর নক্ষত্র থেকে অনেক কিছু শিখতে পারি। সর্বশক্তিমান আল্লাহতালার অধীনে তারা আমাদের পরিচালনা করে, কিন্তু একজন ভালো শিক্ষকের ন্যায় আমাদের অনেক কিছু শেখাতেও পারে। আগামীতে আমি কেবল সেদিনের জন্য আদিষ্ট নক্ষত্র যেসব বিষয়কে মঙ্গলময় বলে বিবেচনা করবে কেবল সুনির্দিষ্ট সেসব বিষয় আমি বিবেচনা করবো… এবং সে অনুযায়ী মানানসই পোষাক পরিধান করবো। নক্ষত্ররাজি আমাদের বলছে যে আজকের দিনটাকে, মানে রবিবারকে পরিচালনা করছে সূর্য যাঁর সোনালী রশ্মি সার্বভৌম ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। সেজন্য এখন থেকে রবিবার, উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের কাপড়ে সজ্জিত হয়ে আমি রাষ্ট্রীয় কাজকর্মের বিহিত করবো। সোমবার-চন্দ্র এবং প্রশান্তির জন্য নির্দিষ্ট দিন- সেদিন অবসর সময় কাটাব এবং সবুজ রঙের পোষাক পরিধান করবো যা প্রশান্ত অভিব্যক্তির রঙ। মঙ্গলবার এই দিনটা সৈন্যদের পৃষ্টপোষক, মঙ্গলগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট- সেদিন যুদ্ধ আর ন্যায়বিচারের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদির নিষ্পত্তিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো। সেদিন আমি মঙ্গলের জন্য নির্দিষ্ট লাল পোষাক পরিধান করবো, প্রতিশোধ আর ক্রোধের রঙ এবং বজ্রপাতের দ্রুততায় একই সাথে শাস্তি আর পুরষ্কার বন্টনে পারদর্শী। পুরস্কৃত করার জন্য কোষাগারের সম্পদ প্রস্তুত রাখা হবে এমন কারো জন্য যাকে উপযুক্ত মনে করবো, একই সাথে রক্ত লাল পাগড়ি মাথায় প্রহরীর দল কুঠার হাতে বর্ম পরিহিত অবস্থায় আমার সিংহাসনের সামনে প্রস্তুত থাকবে সাথে সাথে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করতে…

শনিবার- শনি গ্রহের জন্য আদিষ্ট দিন- এবং বৃহস্পতিবার বৃহস্পতি গ্রহের দিন-শিক্ষা আর ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি দিনটাকে উৎসর্গ করতে এবং বুধবার- বুধ গ্রহের দিনটা হবে আনন্দোচ্ছল যখন আমরা বেগুনী রঙের পোষাক পরিধানের ব্যাপারটা আসলে ঠিক কি? যেকোনো পুরুষ আর মহিলা ওয়ার্নার ব্রাদার্সের কাছে উপস্থিত হলে, তার বোনের পরণে আজকে বেগুনী বর্ণের পোক। এবং শুক্রবার নীল পোষাকে সজ্জিত হবো, অনেকটা সবকিছুকে আকর্ষণকারী নীল আকাশের মতো, এদিন আমি যেকোনো বিষয়ের বিহিত করতে পারি। যেকোনো নারী কিংবা পুরুষ- তারা কতটা দরিদ্র কিংবা বিনয়ী সেটা বিবেচ্য না আমার কাছে আসতেই পারে…তাদের যা করতে হবে সেটা হল ন্যায়বিচারের দামামাটাকে তাঁদের পরাস্ত করতে হবে আমি সেটাকে দরবার কক্ষের বাইরে স্থাপণের আদেশ দিয়েছি।

হুমায়ুন আরো একবার কথা বন্ধ রাখে। কাশিমকে, যে তাঁর খতিয়ান বইয়ে হুমায়ুনের ঘোষণা লিপিবদ্ধ করছিলো, দেখে মনে হয় সে যেন বাক্যের মাঝখানে থমকে গিয়েছে আর বাইসানগার তার বাম হাতের আঙ্গুল দিয়ে বহু বছর আগে তার কর্তিত ডান হাতের জায়গায় স্থাপিত ধাতব আকর্ষী টানছে। অবশিষ্ট উপদেষ্টারা তার ঘোষণা শুনে চোখেমুখে বিস্ময় এঁকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু তারা একটা সময় তার অন্তৰ্জনকে ঠিকই গ্রহণ করবে। নক্ষত্ররাজি আর গ্রহমণ্ডলীর যান্ত্রিক গতিবিধির মাঝে সবকিছু যথাযথভাবে তাঁদের আদিষ্ট স্থানে রয়েছে। এবং একটা বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ঠিক এমনই হওয়া উচিত। সবকিছু যথোপযুক্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে এবং যথাযথ সময়ে…

দুই কি এক মিনিট বিরতির পরে হুমায়ুন ধীরে ধীরে বলতে থাকে, তার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট আর আনুষ্ঠানিক। আমি আরও সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমার সরকারের বিভিন্ন দপ্তর আমি পুনর্গঠিত করবো চারটা প্রধান উপাদানের কোনটা- অগ্নি, বায়ু, জল এবং মৃত্তিকা- তাঁদের উপরে আধিপত্য করে। আমার সেনাবাহিনীর জন্য জবাবদিহি করবে অগ্নির আধিপত্য বিশিষ্ট দপ্তর। বায়ুর আধিপত্যযুক্ত দপ্তর জবাবদিহি করবে রন্ধনশালা, অশ্বশালা আর পোশাকভাণ্ডারের। জলের আধিপত্যবিশিষ্ট দপ্তর আমার সাম্রাজ্যের সব নদী আর জলাশয়ের সবকিছুর জন্য জবাবদিহি করবে, সেচের ব্যবস্থা আর রাজকীয় মদ্য-ভাণ্ডারের দায়িত্ব এই দপ্তরের উপরে অর্পিত হবে। আর মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যযুক্ত দপ্তর কৃষিকাজ আর ভূমি প্রদান বা মঞ্জুরির দায়িত্ব পালন করবে। আর সব সিদ্ধান্ত, কর্মোদ্যোগ রাশিফলের গণনার নির্দেশনার সাথে সঙ্গতি রেখে গৃহীত হবে কেবল একটা বিষয় নিশ্চিত করতে যে সবচেয়ে মাঙ্গলিক উপায় অনুসৃত হয়েছে…।

আর তোমরা আমার উপদেষ্টা আর অমাত্যবৃন্দ-এই নতুন কাঠামোর ভিতরে তোমাদের সবার সুনির্দিষ্ট স্থান থাকবে। রাশিফল পর্যালোচনা করলে আমরা জানতে পারি যে মানুষকে সাধারণত তিনটা শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। আমার অভিজাত ব্যক্তি, আধিকারিক আর সেনাপতি, তোমরা সবাই সরকারের মন্ত্রীবর্গ। কিন্তু সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি আর কল্যাণের জন্য অন্য শ্রেণী দুটো গুরুত্বপূর্ণ- মহানুভব মানুষের কাফেলা, যাদের ভিতরে রয়েছে আমাদের ধর্মীয় নেতা, দার্শনিক, জ্যোতিষী আর বিনোদনের কর্তাব্যক্তিরা যাদের ভিতরে আছে কবি, গায়ক, জাদুকর, চারু আর কারুশিল্পী- যারা আমাদের জীবনকে সুন্দর আর সমৃদ্ধ করে ঠিক যেমন করে তারকারাজি আকাশকে সাজিয়ে তুলে। এই তিনটা শ্রেণীর প্রতিটাকে বারোটা স্তরে বিভক্ত করা হবে আর প্রতিটা স্তরে আবার তিনটা করে পদমর্যাদা থাকবে- উচ্চ, মধ্য আর নিম্ন। আমি যথা সময়ে তোমাদের সবাইকে জানিয়ে দেব কোনো শ্ৰেণী আর পদমর্যাদা তোমাদের জন্য ধার্য করেছি…তোমরা এবার যেতে পার। আমার এখনও অনেককিছু চিন্তা করা বাকি।

শারাফ ব্যতীত নিজের দর্শনাথী কক্ষ থেকে যখন সবাই বিদায় নেয় তখন হুমায়ুন পুনরায় উলুঘ বেগের নক্ষত্রের সারণি পরীক্ষা করে, সময়ের সব বোধ তাঁর লুপ্ত হয়। প্রথম ঘন্টা শেষ হতে পরবর্তী ঘন্টা তার ক্ষণ গণনা শুরু করে। সূর্য অস্ত যেতে শুরু করলে, আগ্রা দূর্গের দিকে বেগুনী ছায়া গুটিসুটি পায়ে এগিয়ে আসতে থাকলে, তখনি কেবল হুমায়ুন সারণির পাতা থেকে মুখ তুলে তাকায়। সে যখন তার আবাসনকক্ষের দিকে ফিরে আসছে তখন আফিমের নির্যাস সিক্ত সেই ঘন সুরার জন্য তার ভিতরে একটা আকুল আকাঙ্খার জন্ম হয় যা তাঁর আত্মাকে বন্ধনমুক্ত করে তাঁর মাঝে পুনরায় উত্থিত করে এবং নিজের অজান্তেই তাঁর হাঁটার গতি দ্রুত হয়ে উঠে।

*

কাশিম, আমি বুঝতেই পারিনি এত সময় অতিবাহিত হয়েছে, হুমায়ুন নিজের চোখ কচলায় এবং যেখানে ছিল সেখান থেকে সটান উঠে দাঁড়ায় আর সেখান থেকে বেগুনী-রেশমী কাপড়ে-আবৃত ডিভানে সে তাসের ঘরের মতো ভেঙেচুরে শুয়ে পড়ে। ডিভানটায় একটা পরস্পরচ্ছেদী নক্ষত্ররাজির জটিল নক্সা সোনার জরি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং হুমায়ুন মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে এটার উপরে শুয়ে অনেক গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে। পরিষদমণ্ডলী কি এখনও সমবেত রয়েছে? বাংলায় আমার মনোনীত রাজ্যপালের কাছ থেকে আগত প্রতিনিধির কি সংবাদ?

অনেকক্ষণ আগেই পরিষদমণ্ডলীর সভা শেষ হয়েছে। আর আপনার প্রতিনিধির খবর বলতে ইতিমধ্যে বহুবার তার সাথে সাক্ষাঙ্কার বাতিল করেছেন কারণ আপনি মনে করেন এ ধরনের আলোচনার জন্য বর্তমান সময়টা ঠিক উপযুক্ত না এবং একবার- সুলতান, এটা উল্লেখ করার জন্য আমায় মার্জনা করবেন- যখন আপনার উপস্থিতিতে দর্শনার্থী কক্ষে ভুল দরজা দিয়ে প্রবেশ করায় নিজের উপস্থিতিতে দর্শনার্থী কক্ষ থেকে তাঁকে বিবাসিত করেছিলেন, সেই দিনটাও এমন প্রকৃতির আলোচনার জন্য খুব একটা মঙ্গলময় নয় বলে আপনার ধারণা। গঙ্গা আর যমুনার বুক চিরে বাংলায় যাবার সময়টা ক্রমেই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে এবং আরও অপেক্ষা করাটা তার জন্য ক্রমেই কষ্টকর হয়ে উঠছে। বাইসানগার আর আমি তাই আপনার পক্ষ অবলম্বনপূর্বক নির্দেশনা প্রদানের গুরু দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে কর আরোপের মাত্রা এবং সৈন্য সংখ্যা কতটা বৃদ্ধি করতে হবে সেটা নির্ধারন করেছি। নিজের নৌকায় আরোহন করে সে ফিরতি পথে রওয়ানা হতে দুই ঘন্টা আগে তারা নোঙর তুলেছে।

এই দুই বৃদ্ধ তাঁর কর্তৃত্বের মাঝে অন্যায়ভাবে নাক গলিয়েছে ধরে নিয়ে হুমায়ুন ক্ষনিকের জন্য ক্রুদ্ধ হয়।

সুলতান, আমরা যা বলেছি আপনি যদি তার সাথে ভিন্ন মতো পোষন করেন তাহলে অবশ্যই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য আরেকটা দ্রুতগামী নৌকা পাঠাতে পারি।

কাশিম নিশ্চিতভাবেই তাঁর বিরক্তি আঁচ করতে পেরেছে, হুমায়ুন ভাবে। তারই অন্যায় হয়েছে। বার্তাবহ কূটনীতিক লোকটা একাধারে বাঁচাল এবং সেই সাথে বিরক্তিকর। সে ইচ্ছাকৃতভাবেই লোকটার সাথে দেখা করতে দেরী করেছে, কখনও এমনসব অজুহাত দেখিয়েছে যা তার নিজের কাছেই অনেকসময় অকিঞ্চিৎকর বলে মনে হত। হুমায়ুন তাঁর কণ্ঠস্বরের তীব্রতা হ্রাস করে। কাশিম, আমি নিশ্চিত যে আগামীকাল সকালে আমি যখন শুনবো আপনি আর বাইসানগার কি উপদেশ দিয়েছেন সেটা আমার পছন্দই হবে। এখন আপনি যান, আমি আরেকটু বিশ্রাম আর নিরুদ্বিগ্নভাবে সময় কাটাতে চাই।

কাশিমকে দেখে মনে হয় সে আরও কিছু বলতে চায়, সে দাঁড়িয়ে থেকে কেবল দুই পায়ের উপরে দেহের ভার পরিবর্তন করে আর বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে নিজের আলখাল্লার একটা সোনালী টাসেল নিয়ে আপনমনে নাড়াচাড়া করে। তারপরে সে নিজের মন ঠিক করে এবং যা বলতে চেয়েছিল সেটা বলতে শুরু করে। সুলতান, আপনি বোধহয় অবগত আছেন যে আপনার মরহুম আব্বাজান আর আপনার অধীনে কত দীর্ঘ সময় আমি বিশ্বস্ততার সাথে দায়িত্বপালন করছি।

হ্যাঁ, আর আমি সেটার প্রশংসাও করি।

আমি কি তাহলে আমার এতো বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে আপনাকে সামান্য কিছু পরামর্শ দিতে পারি? সুলতান মার্জনা করবেন কিন্তু আমি না বলে পারছি না, আপনি আফিমে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। আপনার আব্বাজানও সুরা আর ভাঙ- গাঁজার মতোই আফিমটাও উপভোগ করতেন।

তবে?

আমাদের ভিতরে অনেকেই এসব নেশাজাতীয় দ্রব্যের ক্ষেত্রে অন্যদের চেয়ে বেশী সহজাত সহ্যক্ষমতার অধিকারী হয়। এমনকি আমার যখন বয়স অল্প ছিল, ভাঙের কারণে কখনও এমনও হয়েছে যে পরপর বেশ কয়েকদিন আমি সব কাজ ফেলে নির্জীবের মতো পড়ে রয়েছি তাই আপনার আব্বাজানের শত অনুরোধ সত্ত্বেও এধরনের উপাচার গ্রহণ করা থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিরত রাখি। মহামান্য সুলতান আপনি যতটা অনুমান করছেন এগুলো সম্ভবত তারচেয়েও বেশী আপনাকে প্রভাবিত করছে।

না, কাশিম। তাঁরা আমাকে চিন্তা করতে আর দেহমনকে প্রশমিত করতে সাহায্য করে। আপনি কি আমাকে এটাই বলতে চেয়েছিলেন?

হ্যাঁ, কিন্তু অনুগ্রহ করে কেবল একটা কথা মনে রাখবেন যে এমনকি আপনার আব্বাজানও প্রতিদিন এই জিনিষটাকে প্রশ্রয় দিতেন না, বিশেষ করে যখন তাঁকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। কাশিম মাথা নত করে চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ালে, হুমায়ুন তাঁর বলিরেখা পূর্ণ মুখমণ্ডলে গভীর দুশ্চিন্তার একটা অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে। তার উৎকণ্ঠায় কোনো খাদ নেই। আত্মবিলোপী, স্বল্পভাষী এই বৃদ্ধ লোকটাকে এই অল্প কয়টা কথা বলতে গিয়ে প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছে। হুমায়ুন তার উপরে রাগ করতে পারে না।

আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনার কথাগুলো আমি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবো।

*

হুমায়ুনের সিংহাসনের সামনে পরিচরেরা আকাশের মতো দেখতে রেশমী নীল রঙের একটা বিশালাকৃতি বৃত্তাকার কার্পেট বিছান শুরু করতে সে চোখেমুখে সন্তুষ্টি নিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। কার্পেটের জমিনে অনেকগুলো বৃত্তের একটা পর্যায়ক্রমের রূপরেখা- লাল, হলুদ, বেগুনী আর সবুজ রঙের শিকল ফোড়ের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এবং গ্রহমণ্ডলী উপস্থাপনকারী বৃত্তগুলো- সে যেভাবে আদেশ দিয়েছিল ঠিক সেভাবেই স্থাপন করা হয়েছে। তাঁতিদের সে পুরস্কৃত করবে তাঁদের এই অসামান্য দক্ষতা এবং যত দ্রুত তারা তার এই পরিষদমণ্ডলীর কার্পেটকে বাস্তবতা দান করেছে।

কয়েকমাস আগে বিশেষভাবে প্রাণবন্ত একটা স্বপ্নবেশের সময় সে প্রথম ধারণাটা লাভ করে- গুলরুখের আফিম আর সুরার মিশ্রণ পান করার পরে বাস্তবিকই তাঁর মাদকজনিত ঘুম প্রতিবারই যেন আরও বেশী চমকপ্রদ আর গুপ্ত তথ্যের বিস্ময়কর প্রকাশ হয়ে উঠছে। তারকাণ্ডলীর একটা যেন বিশেষভাবে তাকে কিছু বলতে চায়, এমন একটা কার্পেট তৈরী করতে বলে যার ফলে তাকে পরামর্শ দেবার কালে তার উপদেষ্টারা যে বিষয়ে সেই বিশেষ মুহূর্তে আলোচনা করছে সেই বিষয়ের সবচেয়ে নিয়ামক গ্রহের উপরে অবস্থান করতে পারে। সে কার্পেট তৈরীর বিষয়টা সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিল, দিনরাত চব্বিশ ঘন্টাই যেন তাঁতিরা কার্পেটের বয়ন অব্যাহত রাখে সেটা সে নিশ্চিত করেছিল। শারাফ ব্যতীত আর কেউ এই কার্পেট বয়নের কথা জানতো না- না বায়সানগার, না কাশিম এমনকি খানজাদাকেও সে কিছু জানায়নি। তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর সবার মতো, তাঁদের কাছেও ব্যাপারটা একটা চমক হিসাবে থাকুক, তাঁর সাথে যোগ দেবার জন্য তিনজনকেই এখন এখানে আসতে বলেছে সে।

উপদেষ্টাবৃন্দ দ্রুতই এসে উপস্থিত হয়। দিনটা আজকে বুধবার বিধায় হুমায়ুনের মতো তাঁদেরও পরণে উজ্জ্বল বেগুনী রঙের আলখাল্লা এবং কোমরে কমলা রঙের পরিকর। হুমায়ুন সামনে বিস্তৃত হাল্কা নীলের ঝকঝকে বৃত্তের দিকে সবাইকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসে। বাবা ইয়াসভালো নিজের বিভ্রান্তি লুকিয়ে রাখার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না।

এই বিস্ময়কর কার্পেটটা সম্বন্ধে আপনাদের তারিফ শোনার জন্য এখানে আসতে বলেছি। আমাদের মাথার উপরের চিরচেনা আসমানের একটা প্রতিকৃতি এখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই বৃত্তগুলো একেকটা গ্রহকে উপস্থাপন করছে এই যে এখানে রয়েছে, মঙ্গল, বুধ আর বৃহস্পতি আর ওখানে দেখছেন আমাদের সবার পরিচিত চাঁদকে। আপনাদের কারও যদি আমাকে কিছু বলার থাকে তাহলে আপনাকে অবশ্যই উপযুক্ত বৃত্তের উপরে দাঁড়িয়ে সেটা উপস্থাপন করতে হবে। কেউ যদি আমার সাথে সামরিক বিষয়ে কিছু আলাপ করতে চায় তাকে অবশ্যই সেটা মঙ্গলের উপরে দাঁড়িয়ে বলতে হবে। যার ফলে আপনারা গ্রহমণ্ডলীকে সাহায্য করবেন আপনাদের পরিচালিত…

হুমায়ুন নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে কিন্তু সহসা কোনো উপদেষ্টার মুখ আলাদা করে চিনতে পারে না- ভাবনায় কটি করা ললাট নিয়ে কে ওখানে দাঁড়িয়ে, কাশিম? …সে নিশ্চিত হতে পারে না…তার চারপাশের সবকিছুই যেন কেমন অস্পষ্ট। নিবিষ্টভাবে নক্ষত্রদের অবলোকনের জন্য রাতের বেলা আগ্রা দূর্গের প্রাকারবেষ্টিত ছাদে উঠে একাগ্র দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কিংবা দীর্ঘক্ষণ নক্ষত্রদের সারণি পর্যালোচনা করার কারণে হয়ত ক্লান্তি এসে তার চোখের দৃষ্টি এমন ঝাপসা করে তুলেছে।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যায়। হ্যাঁ, কাশিমই তার দিকে চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে এবং বাবা ইয়াসভালের চোখে মুখে, সম্ভবত কার্পেটের প্রতীকীত্বের ক্ষমতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে, অথৈ জলে পড়া সাঁতার না জানা লোকের দৃষ্টি। কিন্তু ওখানে দাঁড়িয়ে থাকা আসাফ বেগ কি ভাবছে? হুমায়ুনের কার্পেট খুটিয়ে দেখার সময় তার চেহারায় যেন একটা হাসির ভাব ফুটে উঠে- ঠোঁটের কোণে অবজ্ঞার ফণা। হুমায়ুনের দিকে সরাসরি তাকাবার জন্য সে যখন মাথা উঁচু করে তার অভিব্যক্তিতে তখন যেন ব্যঙ্গ-পরিহাসের চেয়েও ভিন্ন কিছু একটা ফুটে উঠে। হুমায়ুনের মাঝে দাবানলের মতো ক্রোধের একটা ঝাপটা বয়ে যায়। কাবুলের এই আকাঁ মূর্খ ছিঁচকে গোত্রপতির এভোবড় স্পর্ধা নিজের সম্রাটকে উপহাস করে?

এই যে আপনি! হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং ক্রোধে কাঁপতে থাকা আঙ্গুল তুলে আসাফ বেগকে নির্দেশ করে। আপনার এতখানি ধৃষ্টতা, ঠিক আছে আপনার এই অবজ্ঞার উপযুক্ত পুরষ্কারই আপনি পাবেন। প্রহরী- এই উজবুকটাকে বাইরের প্রাঙ্গণে নিয়ে গিয়ে পঞ্চাশ ঘা দোররা লাগাও। আসাফ বেগ নিজেকে ভাগ্যবান মনে করবেন এই জন্য যে মাথার বদলে আজ কেবল আপনার নিতম্বের চামড়াই খোয়ালেন।

একটা সম্মিলিত শ্বাস নেবার শব্দের সাথে সাথে দরবারের ভিতরে কবরের স্তব্ধতা নেমে আসে। তারপরে একটা কণ্ঠস্বর শোনা যায়। সুলতান…

সমালোচনা কিংবা মতানৈক্য কোনটাই সহ্য করবে না বলে স্থির প্রতিজ্ঞ হয়ে, ক্রুদ্ধ বাঘের ঝাঁপট নিয়ে হুমায়ুন ঘুরে তাকায় কিন্তু দেখে সেটা কাশিমের কণ্ঠস্বর। তার এবং আব্বাজানের অধীনে যে লোকটা দায়িত্বের সাথে কর্তব্যরত ছিল, এবং যাকে সে বিশ্বাস করে, সেই লোকটার চেহারায় সত্যিকারের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ফুটে উঠতে দেখে, তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হতে শুরু করে। একই সাথে সে অনুভব করে তার শ্বাসপ্রশ্বাস অনিয়মিত, নাড়ীর স্পন্দনে ঘোড়ার খুরের বোল আর কপালে স্বেদবিন্দুর সৃষ্টি হয়েছে।

কাশিম, আপনি কি কিছু বলবেন?

সুলতান, আমি নিশ্চিত যে আপনাকে অসম্মান করাটা আসাফ বেগের অভিপ্রায় ছিল না…পুর্নবিবেচনার জন্য আমি আপনাকে অনুরোধ করছি।

আসাফ বেগ, ভয়ে বিবর্ণ এবং তাঁর চওড়া ঠোঁটে হাসির লেশমাত্র খুঁজে পাওয়া যায় না আর সচরাচর হাস্যোজ্জ্বল, চোখে মিনতি নিয়ে হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাতের মতো অসম্মান আসাফ বেগের সাথে সাথে তার গোত্রের জন্যও ভীষণ অপমানজনক বলে বিবেচিত হবে, হুমায়ুন সেটা ভালো করেই জানে। যুদ্ধক্ষেত্রে আসাফ বেগের সাহসিকতার কথা সে বিবেচনা করে। নিজের হঠকারী সিদ্ধান্তের জন্য সে ইতিমধ্যেই অনুতপ্ত।

কাশিম- বরাবরের মতোই, আপনি যথার্থই বলেছেন। আসাফ বেগ, আমি এবারের মতো আপনাকে মার্জনা করলাম। কিন্তু ভবিষ্যতে আর কখনও আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে যাবেন না তখন হয়ত আমি এতটা দয়ালু নাও হতে পারি। হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় নিজের উপদেষ্টাদের বিদায় নেবার ইঙ্গিত করতে তারা সবাই সচরাচরের চেয়ে যেন দ্রুতই তাঁর আদেশ পালন করে। হুমায়ুন যখন আবার বসে সে নিজেকে তখন থরথর তরে কাঁপতে দেখে। কার্পেটের আবেদন পুরোপুরি লুপ্ত হয়েছে। রাতও অনেক হয়েছে। বিশ্রামের জন্য বোধহয় তাঁর এখন নিজের আবাসনকক্ষে ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু সে নিজের কক্ষে যখন প্রবেশ করতে খানজাদাকে সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করতে দেখে বিস্মিত হয়।

ফুপুজান, কি ব্যাপার?

তোমার পরিচরদের বিদায় কর। আমি তোমার সাথে একা কিছু কথা বলতে চাই।

হুমায়ুন জওহর আর অন্যান্য পরিচরদের ইঙ্গিতে বাইরে যেতে বলে। দুই পাল্লার দরজা বন্ধ হয়েছে কি হয়নি খানজাদা শুরু করেন। ঝরোকার পেছন থেকে আজ উপদেষ্টাদের সাথে আলোচনার সময়ে কি হয়েছে আমি সেটা প্রত্যক্ষ করেছি। হুমায়ুন…এমনটা ঘটা সম্ভব আমি কল্পনাও করতে পারি না…প্রথমে তুমি একজন মোহগ্রস্ত লোকের মতো আচরণ করলে এবং তারপরে বদ্ধ উন্মাদের মতো…

আমার উপদেষ্টারা সবসময়ে বুঝতে পারে না, আমি যা করছি সেটা যে মঙ্গলের জন্য কিন্তু আপনার সেটা বুঝতে পারা উচিত। একজন শাসকের কাছে নিজেকে জাহির করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা আপনার কাছেই আমি শিখেছি তুল্যমূল্য অনুষ্ঠান আয়োজনের পরামর্শ আপনিই দিয়েছিলেন এবং শাসনকার্যের সহায়ক হিসাবে কৃত্যানুষ্ঠানের ব্যবহারে আমাকে উৎসাহিত করেছেন…

কিন্তু সেজন্য যুক্তি বা মানবতাকে বিসর্জন দিতে বলিনি…

নক্ষত্রদের বরাভয় স্মরণে রেখে আমি নতুন পদ্ধতি আর রীতির পরিকল্পনা করেছি। শাসনকার্য এর ফলে সহজ হবে। আমার উপদেষ্টা আর পরামর্শদাতারা যদি আমার নির্দেশনা অনুসরণ করে তাহলে দরবার কক্ষে সময়ের বিরক্তিকর অপচয় হ্রাস পাবে, ভাগ্যেচক্রের অথৈই গভীরতায় আরও ব্যাপক অনুসন্ধানের জন্য আমাকে মুক্তি দেবে।

নক্ষত্রের নখরামি আপাতত বাদ দাও। তোমার সমস্ত মনকে তারা আচ্ছন্ন করে রেখেছে এবং তুমি বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছ। আমি তোমাকে আগেও সতর্ক করতে চেয়েছি কিন্তু তুমি আমার কথায় কর্ণপাত করেনি। এখন তোমাকে নিশ্চয়ই শুনতে হবে নতুবা যা কিছু অর্জনের জন্য তুমি বিচেষ্টিত হয়েছে সেসব কিছু তোমার হাতছাড়া হবার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে- তোমার আব্বাজানের অর্জিত সবকিছু… হুমায়ুন আমার কথা কি আদৌ তোমার কানে যাচ্ছে?

হ্যাঁ, আমি শুনছি। কিন্তু সে মনে মনে ভাবে, খানজাদা ভুল করছে…তাকে দীর্ঘদিন ধরে একাধারে কষ্ট দিয়েছে আবার আকর্ষণ করেছে অন্য যেসব প্রশ্নগুলো তাদের উত্তর সে কেবল গ্রহ আর নক্ষত্রের বিন্যাসের মাঝে খুঁজে পেতে পারে। নিয়তির দ্বারা আসলেই কি সবকিছু কোনোভাবে পূর্ববিহিত করা? তার আব্বাজানের অকালমৃত্যু কি আসলে আরেকটা বিশাল পরিকল্পনার একটা অংশ? একটা মানুষের নিয়তির কতটুকু তার নিজের হাতে থাকে? নিয়তির কতটুকু পূর্বনির্ধারিত যেমন অবস্থান বা পরিবার যেখানে সে জন্মগ্রহণ করেছে এবং এর সাথে প্রাপ্ত সুবিধা আর দায়িত্বসমূহ? এবং সে এসব কিভাবে জানতে পারবে…? একজন বৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু হুমায়ুনের যৌবনে যার সাথে তার দেখা হয়েছিল- কাবুল থেকে প্রায় একশ মাইল পশ্চিমে বামিয়ানের উপত্যকায় পাহাড়ে খোদাই করা বিশাল এক বৌদ্ধ মূর্তির পাশে সেই ভিক্ষুর নির্জন আশ্রয়ে, তিনি তাঁকে বলেছিলেন যে তার জন্মের সময়, স্থান এবং তারিখ নির্ভুল আর ঠিক কাঁটায় কাঁটায় বলতে পারলে তিনি হুমায়ুনের জীবনের পরিণতি কেবল না সেইসাথে পরবর্তী জীবনে কোনো প্রাণী হিসাবে তাঁর পুনর্জন্ম হবে সবকিছু আগাম বলতে পারবেন। তাঁর কাছে পুনর্জন্মের ধারণাটা অবান্তর মনে হয়েছে কিন্তু সেই ভিক্ষুর বাকি কথাগুলো তাকে ভাবিত করে তুলে। সে ইতিমধ্যে একটা বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে- যে রাশিচক্র আর গ্রহ, নক্ষত্রের অবস্থান, সারণি এবং বহুকাল পূর্বের ঘটনাবলীর লিপিবদ্ধ ভাষ্য যার অধ্যয়নে সে প্রচুর সময় ব্যয় করেছে এবং তাঁর আফিম-উদ্বুদ্ধ স্বপ্নে তাঁর কাছে জীবন্ত বলে প্রতিয়মান স্বপ্নগুলো দ্বারা সে জীবন যাপন আর শাসনকার্যের একটা কাঠামো সৃষ্টি করতে পারবে এবং ইতিমধ্যে সেই কাজে অনেকদূর অগ্রসরও হয়েছে।

হুমায়ুন! তুমি কি আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে?

খানজাদার কণ্ঠস্বর মনে হয় যেন দূরে কোথায় থেকে ভেসে আসছে এবং সে যেন তার দিকে তাকিয়ে থাকায় তার আকৃতি হ্রাস পেতে শুরু করে, সে একটা খর্বকায় পুতুলে পরিণত হয় যে কিনা অনবরত নিজের হাত আন্দোলিত করছে আর মাথা নাড়ছে। পুরো ব্যাপারটাই একটা হাস্যরসাত্মক মাত্রা লাভ করে।

তুমি কি বিপদের ভিতরে আছো, আমি যখন সে বিষয়ে কথা বলছি তুমি হেসেই চলেছো… খানজাদা তার বাহু দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরলে, তার তীক্ষ্ণ নখ হুমায়ুনের বাহুর মাংসের গভীরে গেঁথে বসে, তাঁকে বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। আমার কথা তোমাকে শুনতেই হবে। কিছু বিষয় আছে যা নিয়ে কথা না বললেই চলছে না… যা কিনা সম্ভবত আমিই তোমাকে বলতে পারি… কিন্তু মনে রেখো তোমায় ভালোবাসি বলেই কথাগুলো আমি বলছি।

আপনি যা বলতে চান বলতে পারেন।

হুমায়ুন, তুমি আফিমে আসক্ত হয়ে বিভ্রান্তির মাঝে দিনযাপন করছে। একটা সময়ে যোদ্ধা হিসাবে, শাসক হিসাবে তোমার সুনাম ছিল। কিন্তু এখন একজন ভাবুক আর কল্পনাবিলাসী ছাড়া তোমাকে কি অন্য কিছু বলা যাবে? আমি কখনও চিন্তাও করিনি এই কথাগুলো আমি কখনও তোমায় বলবো…কিন্তু একজন শাসককে অবশ্যই দৃঢ়চেতা হতে হবে, তাকে অবশ্যই হতে হবে সিদ্ধান্তগ্রহণে সক্ষম। তাঁর প্রজারা সবসময়ে যেন জানে যে তার উপরে তারা নির্ভর করতে পারে। এসব তুমি জান। এসব বিষয়ে তুমি আর আমি অতীতে কতবার না আলোচনা করেছি। আজকাল কদাচিৎ তোমার সাথে আমার দেখা হয়… এবং আমি যখন দরবারের দিকে তাকাই সেখানে আমি কেবল আতঙ্কিত আর অনিশ্চিত অভিব্যক্তি দেখতে পাই, আর তোমার পিঠ পেছনে আড়ষ্ঠ হাসির শব্দে আমার কান বিদীর্ণ হয়। এমনকি যারা তোমায় একসময়ে ভালো করে চিনতো এবং দীর্ঘদিন বিশ্বস্ততার সাথে তোমায় আজ্ঞা পালন করছে- কাশিম আর বাবা ইয়াসভালো যেমন- তাঁদের কাছেও তুমি একজন আগন্তুকে পরিণত হয়েছে। তোমার বিবেচনাবোধের উপরে তারা আজকাল আর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছে না। তোমার প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাঁরা সন্দিহান তাদের আচরণে তুমি প্রসন্ন হবে না ক্রুদ্ধ হবে তাই নিয়ে তারা সবসময়ে সন্ত্রস্ত থাকে। কখনও ঘন্টার পর ঘন্টা তারা তোমার কাছ থেকে নিজেদের কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে সঙ্গতিপূর্ণ কোনো নির্দেশনা কিংবা মন্তব্য জানতে পারে না… এমনকি কখনও এমন পরিস্থিতি কয়েক দিনও বিরাজ করে…

খানজাদা পূর্বে কখনও তাঁর সাথে এভাবে কথা বলেনি এবং নিজের ভেতরে একটা বিরক্তি জমছে সে বুঝতে পারে। যদি আপনি কিংবা আমার অমাত্যরা আমার সিদ্ধান্তসমূহ এবং সাম্রাজ্য আমি যেভাবে শাসন করবে বলে মনস্থির করেছি। সেটা সম্বন্ধে বৈরী মনোভাব পোষণ করেন তাহলে বুঝতে হবে বিষয়টা আপনাদের কাছে বোধগম্য হয়নি। কিন্তু অচিরেই এমন একটা সময় আসবে যখন দেখবেন আমি আমাদের সবার মঙ্গলের জন্যই সবকিছু করেছি।

সময় এখন আর তোমার অনুকূলে নেই। তুমি যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা করতে ব্যর্থ হও, তোমার অনুগত সেনাপতি আর অভিজাতদের মনোযোগ তখন তোমার সৎ-ভাইদের দিকে আকৃষ্ট হবে। বিশেষ করে আমি কামরানের কথা বলছি। হুমায়ুন, মাথা স্থির করে একবার ভেবে দেখো। সে বয়সে তোমার চেয়ে কয়েকমাসের ছোট এবং ইতিমধ্যে নিজের শাসনাধীন প্রদেশে একজন দক্ষ যোদ্ধা আর কঠোর শাসক হিসাবে সে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। তোমার মতোই তারও ধমনীতে বাবর আর সেইসাথে তৈমূরের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। তুমি জান সে উচ্চাকাঙ্খি- এতটাই উচ্চাকাঙ্খি যে তোমার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে একবার ষড়যন্ত্র করেছে। সে আবারও একই কাজ করবে না তোমার এমনটা ভাববার কোনো সুযোগ নেই। তোমার মনে কি একবারও প্রশ্ন জাগেনি কেন গুলরুখ নিজেকে তোমার সেবাদাসীতে পরিণত করেছে, কেন সে তার সেই পানীয় দিয়ে তোমায় সিক্ত করছে? দূর আকাশের নক্ষত্রের মাঝে নিহিত অপার রহস্যের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে নিজের চারপাশের লোকদের মনের গভীরে ডুব দিয়ে দেখাটাই…তাদের অভিসন্ধি সম্বন্ধে সজাগ থাকা একজন শাসকের পক্ষে শোভনীয়। কামরান আর আসকারির হয়ে তোমার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিদ্রোহের সাহস গুলরুখের কখনও হবে না…কতখানি ধুরন্ধর আর কুশলী হলে আফিমের নেশায় আসক্ত করে সে তোমাকে অধঃখাতে নিয়ে যাবার পরিকল্পনা করতে পারে। এবং তোমার ক্ষমতা যখন দুর্বল হবে এবং শীথিল হয়ে আসবে আর তোমার প্রজারা একদা যে শাসককে শ্রদ্ধা করতো তাঁকেই অবজ্ঞা জ্ঞানে তাচ্ছিল্য করতে শুরু করবে, তার কোনো সন্তানের কাছে তখন যদি তারা শরণ প্রার্থনা করে তখন কিন্তু বিষয়টাকে মোটেই অস্বাভাবিক মনে হবে না? উলুঘ বেগের পরিণতির কথা স্মরণে রেখো। তোমার মতোই- সে যখন তারকারাজি এবং জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে তাঁরা তাঁকে কি সলুকসন্ধান দিতে পারে সেসব নিয়ে বেশী আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, তখন তারই এক ছেলে তাঁকে হত্যা করে এবং তাঁর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়।

ঈর্ষা আর ক্রোধে আচ্ছন্ন হয়ে আপনি কথা বলছেন। উৎসব বিষয়ে আমি আপনার ভাবনাগুলো গ্রহণ করে গণনার সাহায্যে আপনার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ছাপিয়ে তাদের উন্নত করেছি বলে আপনি বিষয়টা মেনে নিতে পারছেন না। আমি একদা আপনার উপর যেমন নির্ভরশীল ছিলাম তেমনটা আজ আর নই বলে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে এমন একজন মানুষে পরিণত হয়েছি বলে এবং কোনো স্ত্রীলোকের- আপনার, বা গুলরুখের কারও পরামর্শ তার প্রয়োজন নেই দেখে, আপনি বিরক্ত…আপনাদের সবারই…নিজ নিজ অবস্থান সম্বন্ধে সচেতন হওয়া উচিত।

খানজাদাকে রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বুঝতে পারে কতটা আঘাত সে তাঁকে করেছে, কিন্তু কিছু বিষয়ে তাঁকে সতর্ক করাটাও জরুরী ছিল। খানজাদাকে সে খুবই ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা করে, কিন্তু তিনি নন, সম্রাট হল সে আর তাই হুমায়ুন নিজে সিদ্ধান্ত নেবে কিভাবে সে রাজ্য পরিচালনা করবে।

তোমাকে সতর্ক করতে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। তুমি যদি মনস্থির করেই থাক যে আমার কোনো কথাই তুমি শুনবে না তাহলে আমার আর কিছু করার থাকে না… খানজাদার কণ্ঠস্বর নীচু আর সংযত কিন্তু হুমায়ুন ঠিকই লক্ষ্য করে তার কপালের পাশে একটা শিরা দপদপ করছে আর তার দেহটা থরথর করে কাঁপছে।

ফুপুজান… হুমায়ুন তাঁর বাহুমূল স্পর্শ করতে চেষ্টা করতে তিনি ঘুরে দাঁড়ান এবং দরজার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেন আর নিজেই এক ধাক্কায় পাল্লা দুটো খুলে দেন। তার জন্য অপেক্ষারত নিজের দুই খাস পরিচারিকাকে ডেকে নিয়ে মশাল আলোকিত করিডোের দিয়ে দ্রুত নিজের কামরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। হুমায়ুন তাঁর গমনপথের দিকে নিরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন। সে আগে কখনও খানজাদার সাথে কোনো কিছু নিয়ে তর্ক করেনি কিন্তু সে আজ তাঁকে যা বলেছে সেটা বলা প্রয়োজন ছিল, সে নিজেকে সেরকমই বোঝায়। তারকারাজি আর তাদের বয়ে আনা বার্তা কোনোমতেই উপেক্ষণীয় নয়। কোনো মানুষকে- এমনকি সে যদি সম্রাটের মতো ক্ষমতাধরও হয়- কোনোভাবেই অনন্ত বিশ্বের মাঝে তারকারাজির আপাতদৃষ্টিতে এই শেষ না হওয়া আবর্তনের সাথে তুলনা করা যায় না। সে যদি তাঁদের ইঙ্গিত অনুসরণ করে তবে তাঁর রাজত্ব অবশ্যই সমৃদ্ধি লাভ করবে।

আর গুলরুখের ব্যাপারে ফুপিজান যা বলেছেন…সেটাও ভুল। দরবারের আর দশজনের মতোই সেও অবশ্যই সম্রাটের নেক নজরে থাকতে চায়। তাকে তুষ্ট করে গুলরুখ হয়ত আশা করে যে সে নিজের সন্তানদের জন্য, তার সৎ-ভাই কামরান আর আসকারির জন্য সুযোগসুবিধা আর অনুগ্রহ নিশ্চিত করতে পারবে… কিন্তু এর বেশী কিছু না। গুলরুখের আফিম মিশ্রিত গাঢ় বর্ণের সুরা যা তাঁকে মননকে সমৃদ্ধকারী মার্গ দর্শনে সাহায্য করে সেটা তাঁকে দেয়া গুলরুখের উপহার এবং এই সুরা পান করা থেকে সে নিজেকে বিরত রাখতে চায় না, সে সেটা পারবেও না…বিশেষ করে এই সুরা যখন তাকে প্রতিনিয়ত অস্তিত্বের রহস্যময়তা পুরোপুরি আয়ত্ত করার কাছাকাছি নিয়ে চলেছে।

*

ঢাকের আওয়াজ করছে যে তাকে আসতে দাও। আজ শুক্রবার- আজি সেই দিন যেদিন আমি আমার সবচেয়ে দীনহীন প্রজার প্রতিও ন্যায়বিচার করতে প্রস্তুত। হুমায়ুন তাঁর উঁচু পৃষ্টদেশযুক্ত সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়ে হাসে। গত ছয়মাসের ভিতর আজই প্রথম সিংহাসনটাকে দর্শনার্থীদের সাথে সাক্ষাতের জন্য নির্ধারিত কক্ষের বাইরে এনে রাখা হয়েছে কারণ সম্রাটের কাছে সুবিচার প্রার্থনা করে অজ্ঞাত কেউ একজন মোষের চামড়া দিয়ে তৈরী অতিকায় ঢাকে বোল তুলেছে। শুরুতে শব্দটা মৃদু আর অনিয়মিত ছিল এবং এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল সেটাও বুঝি বন্ধ হয়েছে। হুমায়ুন তারপরে পুনরায় শব্দটা শুনতে পায়। ন্যায়বিচারের ঢাকে যেই বোল তুলে থাকুক মনে হচ্ছে এবার যেন সে একটু সাহসী হয়েছে। ঢাকের বোলের আওয়াজ জোরাল হয় এবং সেটা এবার দ্রুত লয়ে ধ্বনিত হয়। এই মুহূর্তটার মুখোমুখি তাকে হতে হবে সেটা সে আগেই জানতো ঠিক যেমন সে জানে- সময়ে তার অমাত্যবৃন্দ ঠিকই সে যেসব সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে সেসব মেনে নেবে। এমনকি পোড় খাওয়া কাশিমও, যে এই মুহূর্তে তার সিংহাসনের পাশে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে, স্বীকার করতে বাধ্য হবে সেই সঠিক ছিল।

নীল পাগড়ি পরিহিত তাঁর দেহরক্ষী দলের ছয়জন সদস্য দূর্গ প্রাঙ্গন থেকে বের হয়ে যেতে তাদের পায়ের শব্দে পাথুরে মেঝেতে প্রতিধ্বনি তুলে। তারা যখন ফিরে আসে তাদের সাথে লাল সিল্কের শাড়ি পরিহিত কপালে লাল তিলক দেয়া একজন অল্পবয়সী হিন্দু রমণীকে দেখা যায়। মেয়েটার মাথার লম্বা কালো চুল তার কাঁধের উপরে ঢেউয়ের মতো ভোলা পড়ে আছে এবং তার অভিব্যক্তির মধ্যে একাধারে উদ্বেগ আর দৃঢ়তা ফুটে আছে। প্রহরীর দল তাঁকে সিংহাসনের দশ ফিটের ভিতর নিয়ে আসতে সে হুমায়ুনের সামনে নিজেকে নতজানু করে।

উঠে দাঁড়ান। সম্রাট আপনার অনুরোধ শ্রবণে প্রস্তুত, কাশিম মন্দ্র কণ্ঠে বলে। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন যে আপনি অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবেন।

সিংহাসনে উপবিষ্ট হুমায়ুনের রত্নশোভিত, দীপ্তিময় অবয়বের দিকে মেয়েটা কেমন একটা অনিশ্চয়তা নিয়ে তাকিয়ে থাকে যেন তাঁর বিশ্বাসই হচ্ছে না সে সম্রাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সুলতান, আমার নাম সিতা। আমি আগ্রার এক ব্যবসায়ীর স্ত্রী। আমার স্বামী লবঙ্গ, জাফরান আর দারুচিনির মতো মশলার একজন ব্যবসায়ী। এক সপ্তাহ পূর্বে তিনি দিল্লীর বাজার থেকে মশলা কিনে সেগুলো খচ্চরের একটা ছোট বহরের পিঠে চাপিয়ে আগ্রায় ফিরে আসছিলেন। দিল্লী থেকে দুদিনের দূরত্বে আমাদের পবিত্র হিন্দু শহর মধুরার কাছে তিনি আর তাঁর সঙ্গীসাথীরা ডাকাতের কবলে পড়েন যাঁরা তাঁদের বহন করে আনা সবকিছু লুট করে নেয়- এমনকি তাদের পরনের কাপড়ও তাঁরা খুলে নেয়। ডাকাতের দল খচ্চরের বহর নিয়ে রওয়ানা দেবে এমন সময় আপনার একদল সৈন্য সেখানে এসে উপস্থিত হয়। সৈন্যরা ডাকাতদের হত্যা করে ঠিকই কিন্তু আমার স্বামীকে তার মালপত্র ফিরিয়ে দেবার বদলে তারা আমার স্বামীকে উপহাস করে। তারা বলে যে তিনি ভেড়ার মতো ভয়ে ভ্যা ভ্যা করছিলেন আর তার সাথে সেরকমই আচরণ করা উচিত। ডাকাতদের বাধা দড়ি খুলে দিয়ে তাঁকে বাধ্য করে নগ্ন অবস্থায় এবং খালি পায়ে তপ্ত বালির উপর দিয়ে দৌড়াতে, ঘোড়ার পিঠে সওয়াড় হয়ে তাঁরা তাঁকে ধাওয়া করে এবং বিদ্রূপ করে আর তাঁদের বর্শার ডগা দিয়ে তাকে নির্মমভাবে খোঁচাতে থাকে। তারা নিজেদের কর্মকাণ্ডে নিজেরাই হাঁপিয়ে উঠলে, রক্তাক্ত আর পরিশ্রান্ত অবস্থায় আমার স্বামীকে বালির উপরে ফেলে রেখে তারা চলে যায়। এবং যাবার সময় তারা মূল্যবান মশলা বোঝাই আমার স্বামীর সবগুলো খচ্চর তাদের সাথে করে নিয়ে যায়…।

এহেন অবিচারের কারণে সিতার কণ্ঠস্বর ক্রোধে কাঁপতে থাকে কিন্তু সে নির্ভয়ে সরাসরি হুমায়ুনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি আমার স্বামীর জন্য ন্যায়বিচার প্রার্থনা করছি। সে মহামান্য সুলতানের একজন বিশ্বস্ত প্রজা এবং সর্বোপরি তাঁর বয়স হয়েছে। আপনার সৈন্যদের উচিত ছিল তাঁর প্রতি নির্দয় আচরণ না করে তাঁকে রক্ষা করা। আজ তিনি মৃতবৎ নিজের বাসায় শুয়ে আছেন তাঁদের দেয়া আঘাতের ফলে তার সারা দেহে সৃষ্ট ক্ষতস্থানগুলোতে পূজ জমেছে…

মহিলাকে প্রশ্ন করতে প্রস্তুত কাশিম সামনে এগিয়ে আসে কিন্তু হুমায়ুন তাঁকে পেছনে সরে আসতে ইঙ্গিত করে। সৈন্যদের এহেন আচরণ তাঁর মর্যাদার জন্য ক্ষতিকর। নিজের প্রজাদের কাছে তাঁকে সূর্যের মহিমায় মহিয়ান হতে হবে। তাঁদের সবার উপরেই যেন তাঁর দীপ্তি আর উষ্ণতা আপতিত হয় কিন্তু এই হতভাগ্য ব্যবসায়ী অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছেন…

এই সৈন্যদের সম্পর্কে আপনি আমাকে আর কিছু কি বলতে পারবেন? আপনি কি তাদের নাম জানেন?

আমার স্বামী কেবল বলেছেন যে সৈন্যদের একজন তাদের দলপতিকে মিরাক বেগ বলে সম্বোধন করেছিল এবং সে লম্বা, চওড়া দেখতে আর তার নাক ভাঙা এবং একটা সাদা ক্ষতচিহ্ন তাঁর ঠোঁটকে বিকৃত করেছে।

হুমায়ুন ভালো করেই চেনে মিরাক বেগকে বাদখশানের এক উজ্জ্বল, ন্যায়নীতি বিবর্জিত এক গোত্রপতি যে হিন্দুস্তান অভিযানের সময় হুমায়ুন আর তাঁর আব্বাজানের সাথে সেখান থেকে এসেছিল। পানিপথে নিজের ঘোড়ার পিঠ থেকে শত্রুপক্ষের একটা রণহস্তির পেছনের পায়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং শত্রুপক্ষের তিরন্দাজদের হত্যা করতে, যারা জন্তুটার পিঠে স্থাপিত একটা হাওদায় অবস্থান করে হুমায়ুনের সৈন্যদের উদ্দেশ্যে অনবরত তীর নিক্ষেপ করছিল, সেখান থেকে একলাফে সে জন্তুটার পিঠে উঠে বসে স্বাতন্ত্রমণ্ডিত একজন যোদ্ধা হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানের অপরাধের জন্য অতীতের বীরত্ব কোনো অজুহাত হতে পারে না। মিরাক বেগকে অবশ্যই নিজের এই যথেচ্ছাচারের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।

আপনি এতোক্ষণ যা বলেছেন সেটা যদি সত্যি হয়, আমি ওয়াদা করছি আপনি ন্যায়বিচার পাবেন। আপনি এখন বাসায় ফিরে যান এবং আমার সমনের জন্য অপেক্ষা করেন। কাশিম- মিরাক বেগকে খুঁজে বের করে যত দ্রুত সম্ভব আমার সামনে এনে হাজির কর।

হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায় এবং দর্শনার্থীদের জন্য নির্ধারিত কক্ষ থেকে ছুটে বেড়িয়ে আসে। তার গা গুলিয়ে উঠে বমি পায়। তার মাথা আবার ব্যাথা করছে- তাঁর চোখের পেছনে তীক্ষাগ্র কোনো কিছু দ্বারা আঘাতের যন্ত্রণাটা আজকাল প্রায় নিয়মিতই হচ্ছে আর সেইসাথে ভুল দেখার মাত্রাও বেড়ে গিয়ে কোনো কিছুর প্রতি মনোনিবেশ করাটা তার জন্য আরও কঠিন করে তুলেছে। যন্ত্রণা উপশমের জন্য, তার মনকে প্রশান্ত করতে আর দরবারের এইসব বিরক্তিকর বাধ্যবাধকতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে, তাঁর আরও আফিম এবং সুরা প্রয়োজন।

*

সপ্তাহের মঙ্গলবার পরিচালিত হয় মঙ্গল গ্রহ দ্বারা, এদিনের জন্য যথার্থ পোষাক রক্ত লাল রঙের আলখাল্লা পরিহিত হুমায়ুন মিরাক বেগের অবাধ্য মুখাবয়বের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। শিকল দিয়ে বেঁধে তাঁকে দরবার কক্ষে আনা হয়েছে বটে, কিন্তু সে তারপরেও নিজের চিরাচরিত হামবড়াভাব ঠিকই বজায় রেখেছে। হুমায়ুনের মুখের দিকে সে তার কালো চোখ দিয়ে স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকে এবং তাঁকে দেখে মনেই হয় না সদ্য তেল দেয়া কুঠার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা জল্লাদদের বা প্রাণবধকারী পাথরের গায়ে জমে যাওয়া লাল রক্তের কালো দাগ- সে লক্ষ্য করেছে। সিংহাসনের ডান পাশে স্থাপিত প্রকাণ্ড কালো গ্রানাইট পাথরটার উপরে একটু আগেই উন্মত্তের হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে মিরাক বেগের চারজন লোক তাদের ডান হাত খুইয়েছে এবং সদ্য কর্তিত হাতের অবিশিষ্টাংশ সংক্রমন রোধে গনগনে লাল লোহার টুকরো দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। লোকগুলোকে সরিয়ে নেয়া হলেও, বাতাস এখনও তাদের মাংস পোড়র গন্ধে ভারী হয়ে আছে।

মিরাক বেগ, তোমার সৈন্যদের কপালে কি শাস্তি জুটেছে সেটা যাতে তুমি প্রত্যক্ষ করতে পার, সেজন্য আমি তোমাকে সবার শেষে আনতে বলেছি। তারা অন্যায় করেছে এবং সেজন্য উপযুক্ত শাস্তি পেলেও, তুমি, তাদের নেতা হিসাবে তাদের এই জঘন্য অপরাধের দায়দায়িত্ব তোমাকেই বহন করতে হবে। নিজের অপরাধ তুমি কোনো প্রকারের ভণিতা ছাড়াই স্বীকার করেছে কিন্তু শাস্তির হাত থেকে তুমি বাঁচতে পারবে না… তোমার কর্মকাণ্ডের কারণে আমার যে সম্মানহানি হয়েছে তোমার মৃত্যুই কেবল পারে সেই কলঙ্কমোচন করতে। আরেকটা কথা, জল্লাদের কুঠারাঘাতে তুমি মৃত্যুর অভয় লাভ করবে না। তোমার অপরাধের সম্পূরক মাত্রায় তোমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। বোন আপনি কাছে এগিয়ে আসেন।

গাঢ় নীল রঙের শাড়ি পরিহিত অবস্থায় দরবারের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা বেশর বণিকের স্ত্রী সীতাকে ইঙ্গিতে হুমায়ুন সামনে এগিয়ে আসতে বলে। হুমায়ুন আপন মনে ভাবে, চোখের সামনে অঙ্গচ্ছেদ দেখেও মেয়েটা একটুও বিচলিত হয়নি এবং এবার সে দেখবে সত্যিকারের রাজকীয় ন্যায়বিচার। মিরাক বেগের জন্য যে শাস্তির কথা সে ঘোষণা করতে যাচ্ছে সেটার ধারণা সে স্বপ্নে লাভ করেছে আর এর যথার্থতা তাঁকে প্রীত করেছে। সবার জন্যই একটা চমক অপেক্ষা করছে সিংহাসনের দুপাশে তাঁর আদেশ অনুযায়ী দরবারে উপস্থিত সব অমাত্যদের মতো লাল পোষাক পরিহিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা কাশিম বা বাইসানগারের সাথেও সে এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করেনি।

মিরাক বেগ, হাঁটু গেড়ে বসে নতজানু হও। গোত্রপতির চেহারায় এতক্ষণে বিস্ময় ফুটে উঠে যেন এর আগ মুহূর্ত পর্যন্তও সে বিশ্বাস করেনি হুমায়ুন তাঁকে সত্যিই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করবে। তার মুখ রক্ত শূন্য হয়ে পড়তে তার উপরের ঠোঁটের সাদা ক্ষতচিহ্নটা প্রায় অদৃশ্য হয়ে গিয়ে পুরো মুখে মসৃণ পাণ্ডুর পৃষ্টের মতো একটা অশুভ দীপ্তি ফুটে উঠে। সে জীহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়, তারপরে পুনরায় সাহস সঞ্চয় করে, দরবারে উপস্থিত সবাই শুনতে পাবে এমন কণ্ঠে কিছু বলতে শুরু করে।

সুলতান…প্রথমে পানিপথে এবং পরবর্তীতে গুজরাতে আমি জীবনপণ করে আপনার জন্য লড়াই করেছি…আপনার প্রতি আমি সবসময়ে অবিচল আনুগত্য প্রদর্শন করে এসেছি। পেটমোটা, ভীরু আর কাপুরুষ এক বণিকের সাথে রঙ্গরসিকতা করতে গিয়ে আমি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। সেজন্য মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য হতে পারে না। আমি আর আমার লোকেরা সবাই যোদ্ধার জাত, কিন্তু গুজরাতের পরে আপনি আমাদের আর কোনো যুদ্ধের সুযোগ দেননি…না কোনো বিজয়ের গৌরব…আফিম সেবন করে তারকারাজির দিকে তাকিয়ে থেকেই আপনি আজকাল সময় অতিবাহিত করছেন যখন আপনার উচিত ছিল নিজের সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়া। নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করে আমরা সেজন্যইতো এসেছি…সে প্রতিশ্রুতিই আপনি আমাদের দিয়েছিলেন…একটার পরে একটা বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার সময় আমাদের ঘোড়ার খুরের দাপুটে বোল পৃথিবীর বুকে প্রতিধ্বনি তুলবে…।

যথেষ্ট! দাঁড়িয়ে থাকা দুই জল্লাদকে হুমায়ুন তাঁর হাত তুলে কিছু একটা ইশারা করে। তারা তাদের হাতের কুঠার নামিয়ে রাখে এবং পাশের একটা স্তম্ভের আড়াল থেকে তাদের একজন একটা ছোট বস্তা তুলে নেয়। তারপরে, হুমায়ুনের প্রহরীরা দুপাশ থেকে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মিরাক বেগের কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরতে, জল্লাদদের একজন তার পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে, আকষ্মিকভাবে তার মাথা পেছনের দিকে টেনে ধরে এবং তাঁকে মুখ খুলতে বাধ্য করে। বস্তা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা এবার বস্তার ভেতরে হাত ঢুকায়। লোকটা এবার উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের একমুঠো গুড়ো বস্তার ভেতর থেকে বের করে এনে সেটা, মিরাক বেগের ব্যাদান হয়ে থাকা মুখের গহ্বরে ঠেসে গুঁজে দিতে গোলমরিচ আর হলুদ গুড়োর তীব্র ঝাঝালো গন্ধ হুমায়ুনের নাকে এসে ধাক্কা দেয়।

মিরাক বেগ সাথে সাথে নিঃশ্বাস নেবার জন্য খাবি খেতে শুরু করে। তাঁর হা-হয়ে থাকা চোয়ালের ভিতর দিয়ে তাঁর গলার ভেতরে দ্বিতীয়বার তারপরে তৃতীয়বার মুঠোভর্তি গুড়ো ঠেসে দিতে বেচারার দড়দড় করে পানি পড়তে থাকা চোখ দুটো যেন মাথার ভেতর থেকে ঠিকরে বেড়িয়ে আসতে চায়। তার মুখ ইতিমধ্যে বেগুনী বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছে এবং তার নির্যাতিত মুখ থেকে হলুদ নিষ্ঠীবনের ধারা গড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে নাক দিয়ে অঝোরে শ্লেষ্ম ঝরছে। নতজানু অবস্থায় তাকে ঠেসে ধরে থাকা লৌহমুষ্ঠির হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সে মরীয়া হয়ে চেষ্টা করতে থাকে এবং উঠে দাঁড়াবার জন্য ধ্বস্তাধ্বস্তির সময়ে ফাঁসিতে ঝোলান কোনো লোকের মতো পা দুটো উদ্দেশ্যহীনভাবে লাথি মারে।

হুমায়ুন তার চারপাশে আঁতকে উঠে দমবন্ধ করার শব্দ শুনতে পায়। কাশিম মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং বাইসানগারও আপ্রাণ চেষ্টা করে নিজের দৃষ্টি অন্যত্র নিবদ্ধ করতে। এমনকি সীতাকেও বিপর্যস্ত দেখায়, নিজের অজান্তে হাতের তালুতে নখ গেঁথে যাওয়া একটা হাত সে মুখের কাছে তুলে আনে এবং তাঁর চোখ দুটো আতঙ্কে গোল দেখায়। আর কয়েকটা মুহূর্ত এবং তারপরেই সবকিছু চুকেবুকে যাবে। মিরাক বেগ শেষবারের মতো দেহের সবটুকু শক্তি জড়ো করে অঝোরে পানি পড়তে থাকা চোখ দুটো খুলে এবং এক মুহূর্তের জন্য সে চোখের দৃষ্টি হুমায়ুনকে বিদ্ধ করে, আর তারপরেই তাঁর দেহ নিথর হয়ে যায়।

হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়। অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি। আমার আইন অমান্য করার ধৃষ্টতা যারা দেখাবে তাঁদের সবাইকে এই একই পরিণতি বরণ করতে হবে। হুমায়ুনের সোনালী সিংহাসন, সিংহাসনের গদি- দিনটি মঙ্গলের প্রভাবাধীন হওয়ায় লাল মখমলে আবৃত, যে মঞ্চে অবস্থিত সেখান থেকে সে নেমে দাঁড়ায় এবং দুপাশে নিজের দেহরক্ষীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে সে দরবার কক্ষ ত্যাগ করে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সেখানে নিরবতা বিরাজ করে, তারপরে তাঁর অমাত্যরা আরো একবার নিজেদের জীহ্বার উপর দখল ফিরে পেলে তার পেছনে অনেকগুলো কণ্ঠস্বরকে একসাথে হড়বড় করে কথা বলতে শোনে।

সবেমাত্র সন্ধ্যা হয়েছে। যমুনার বুকে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, ইতিমধ্যে চাঁদ উঠেছে এবং রূপালী আলোয় নদীর তীর ভাসিয়ে দিচ্ছে যেখানে উট আর গরুর পাল জলের তৃষ্ণা মেটাতে এসেছে। সে আজকে সালিমার কাছে যাবে। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকার কারণে আজকাল আর সে আগের মতো তাঁর কাছে যায় না। সালিমার তুলতুলে, সোনালী দেহটার কথা ভেবে সে মুচকি হাসে।

রূপালী কারুকার্যখচিত একটা নীচু ডিভানে সালিমা শুয়ে তার খিদমতে নিয়োজিত এক পরিচারিকা তাঁর পায়ের পেলব পাতায় মেহেদীর জটিল নক্সা আঁকছে। গুজরাত অভিযানের সময় হুমায়ুন যে ধনসম্পদ অভিহরণ করেছিল সেখান থেকে সালিমাকে সে রত্নখচিত যে পরিকরটা দিয়েছিল দুই মেয়েটা কেবল সেটাই পরিধান করে রয়েছে।

সেই অভিযানটাকে এখন কতদিন আগের কথা বলে মনে হয় যেন অন্য কোনো জীবনের স্মৃতি। অভিযোগ প্রকাশ করে মিরাক বেগের বলা কথাগুলো আপনি আমাদের কোনো বিজয় এনে দেননি…আফিম সেবন আর তারকারাজির দিকে তাকিয়ে আপনি আপনার সময় অতিবাহিত করছেন। মিরাক বেগের মৃত্যুদণ্ডই প্রাপ্য কিন্তু তাঁর অভিযোগের ভিতরে কোথায় যেন সামান্য হলেও সত্যের নিবিড়তা উঁকি দেয়। সে সাম্রাজ্যের শাসনকার্য যেভাবে পরিচালনা করছে, কিংবা তার আফিম সেবনের পরিমাণ সম্বন্ধে তার আব্বাজান কি মন্তব্য করতেন? কাশিম আর খানজাদা যেমন অনুরোধ করেছে, তার চারপাশে যারা রয়েছে তাঁদের প্রতি আরো বেশী মনোযোগী হবার স্বার্থেই হয়তো মাদক গ্রহণের মাত্রা তার হ্রাস করা উচিত। কিন্তু পরিস্থিতি বদলেছে, তাই কি মনে হয় না? মোগলদের যাযাবর, বর্বর সময় এখন কেবলই স্মৃতি। সে একটা সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা এবং সমৃদ্ধি আর অনুপ্রেরণার নতুন উৎস, শাসনকার্য পরিচালনার নতুন পদ্ধতি যে সে খুঁজে চলেছে সেটা আর কারো না একান্তই তার এক্তিয়ারভুক্ত। তারকারাজি যাদের দীপ্তি এমনকি কোহ-ই-নূরের চেয়েও প্রখর তারা তাকে হতাশ করবে না।

হতাশ করবে না সালিমাও। তাঁর পরিচারিকাটি দ্রুত কক্ষ ত্যাগ করতে, সালিমা শোয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে প্রণয়সিক্ত ভঙ্গিতে সে হুমায়ুনের লাল আলখাল্লার বাধন আলগা করতে শুরু করলে, নরম রেশমের নীচে তার কাঁধ আর বাহুর শক্ত পেশীর উপরে তার আঙ্গুলগুলো আসন্ন আনন্দের বার্তা নিয়ে দৌড়ে বেড়ায়। সে ফিসফিস করে কেবলই আউড়াতে থাকে, আমার সম্রাট। সালিমার নগ্ন স্তনে এলিয়ে থাকা লম্বা কালো চুল সে দুহাতে আকড়ে ধরে এবং সবেগে তাঁকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, সঙ্গসুখের জন্য ব্যগ্র তারা পরস্পরের সান্নিধ্য উপভোগ করে যতক্ষণ না মোনতা ঘামের ধারায় তাঁদের দুজনের দেহ সিক্ত হয়ে উঠে অবশেষে রিক্ত পরিশ্রান্ত হয়ে একে অপরের আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় তারা বিছানায় লুটিয়ে পড়ে।

কয়েক ঘন্টা পরের কথা, হুমায়ুন সালিমার পাশে শুয়ে আছে। উন্মুক্ত বাতায়ন পথে বাতাসের স্নিগ্ধ একটা স্রোত বয়ে চলে আর পূর্বদিকের আকাশে ইতিমধ্যে ধুসর আলো ফুটতে শুরু করেছে। সালিমা ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে কিছু বলে এবং তারপরে ঘুরে গিয়ে নিজের নরম, মসৃণ কটিদেশ দিয়ে হুমায়ুনকে স্পর্শ করে, নিজের স্বপ্নের মাঝে বিভোর হয়ে যায়। কিন্তু কোনো দুর্বোধ্য কারণে নিদ্রাদেবী হুমায়ুনের কাছ থেকে কেবলই পালিয়ে বেড়ায়। সে চোখ বন্ধ করে যতবার ঘুমাতে চেষ্টা করে প্রতিবারই মিরাক বেগের বিকৃত, নিঃশ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা মুখবিবরে ফেনায়িত হলুদ লালা আর করোটি থেকে অর্ধেক বেড়িয়ে আসা আতঙ্কগ্রস্থ দুটো চোখ সে দেখতে পায়। অস্থিরতা সৃষ্টিকারী এসব প্রতিকৃতিগুলোকে মন থেকে বিতাড়িত করতে অনেক আগেই তার উচিত ছিল গুলরুখের বিখ্যাত সুরা পান করা কিন্তু সুরার পাত্রটা সে নিজের আবাসন কক্ষে রেখে এসেছে। সে যাই হোক, নিজের অস্থির চিত্তকে সে এখনও প্রশান্ত করতে পারে। সে নিজের গলায় একটা সরু চেন দিয়ে ঝোলান নীলকান্তমণি খচিত সোনার লকেটের ভেতর থেকে আফিমের বেশ কয়েকটা দলা বের করে এবং একটা পাত্রে পানি নিয়ে সেগুলো গলাধঃকরণ করে। সে গলায় সেই পরিচিত তিক্ত কটু স্বাদ টের পায় কিন্তু তারপরেই সে টের পায় তন্দ্রালু, অবসন্ন একটা উষ্ণতা কোথা থেকে যেন চুঁইয়ে তার ভিতরে ছড়িয়ে পড়ছে। চোখের পাতা শেষ পর্যন্ত ভারী হয়ে আসতে থাকলে, হুমায়ুন টানটান হয়ে শুয়ে থাকে। চন্দনকাঠের তেলের মানসিক প্রসন্নতা আনয়নকারী মাধুৰ্য যা দিয়ে সালিমা নিজের দেহ সিক্ত করতে পছন্দ করে, হুমায়ুনের নাসারন্ধ্র আপুত করলে সে ধীরে ধীরে তার অতলে তলিয়ে যেতে শুরু করে।

কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরেই- অন্তত হুমায়ুনের কাছে তাই মনে হয় নির্বন্ধিতভঙ্গিতে একটা নারী কণ্ঠ তাঁকে সম্বোধন করছে সে শুনতে পায়।

সুলতান…সুলতান…একজন বার্তাবাহক এসেছে।

বিমূঢ় অবস্থায়, হুমায়ুন উঠে বসে। সে কোথায় আছে? সে ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাতে সালিমাকে দেখতে পায়, তাঁর পাশে এখন উঠে বসছে আর রেশমের একটা গোলাপী রঙের আলখাল্লা টেনে নেয় নিজের নগ্নতাকে আড়াল করতে। কিন্তু যাঁর কণ্ঠস্বরে সে ঘুম থেকে জেগেছে সেটা তাঁর না। সেটা হারেমের এক খিদমতগার, বারলাসের বেটে আর মোটা একটা মহিলা যার মুখের ত্বক আখরোটের মতো বলিরেখায় পূর্ণ।

সুলতান, আমায় মার্জনা করবেন, হুমায়ুনের নগ্ন দেহের উপর থেকে বারলাস নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। বার্তাবাহক পূর্ব দিক থেকে এসেছে, সে বলছে আপনার ভাই আসকারির কাছ থেকে জরুরী সংবাদ নিয়ে এসেছে। এখন যদিও অনেক সকাল, সে অবিলম্বে আপনার সাথে সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছে এবং কাশিম আমাকে আদেশ করেছে আপনাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে সংবাদটা জানাতে।

বারলাসের দিকে হুমায়ুন অমনোযোগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সে কি বলছে সেটা বুঝতে চেষ্টা করে কিন্তু আফিম তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতাকে অনেক শ্লথ করে ফেলেছে। ঠিক আছে। আমি এখনই আমার আবাসনকক্ষে ফিরছি। কাশেমকে বলবে বার্তাবাহককে নিয়ে সেখানে আমার সাথে দেখা করতে।

নিজের আবাসনকক্ষে ফিরে এসে, চোখে মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে এবং বেগুনী রঙের একটা সাদাসিধে জোব্বা পরিহিত অবস্থায়, আধ ঘন্টা পরে হুমায়ুন পূর্বাঞ্চল থেকে আগত লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে যার আগমনের কারণে বিশ্রামরত অবস্থা থেকে উঠে আসতে সে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘকায়, হালকা পাতলা গড়নের বার্তাবাহক লোকটার ঘামের দাগ লেগে থাকা কাপড় তখনও রাস্তার ধূলোয় ধুসরিত। হুমায়ুনের সাথে কথা বলার জন্য অতিশয় ব্যগ্র থাকায় সে অভিবাদন জ্ঞাপনের কৃত্যানুষ্ঠান প্রায় ভুলতে বসেছিল যতক্ষণ না কাশেম তীক্ষ্ণ কণ্ঠে তাকে সে কথা মনে করিয়ে দেয়। নতজানু অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতেই সে কথা শুরু করে। সুলতান, আমার নাম কামাল। জৌনপুরে আপনার ভাই আসকারির অধীনে আমি কাজ করি। সেখানে শের শাহের নেতৃত্বে একটা জোরাল বিদ্রোহের কথা আমাদের কানে এসেছে। আপনার ভাই বিষয়টা কতখানি বস্তুনিষ্ট সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন তারপরেই আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে সর্তক করতে।

হুমায়ুন কোনো কথা না বলে তাকিয়ে থাকে। শেরশাহ বাংলায় যদিও বিশাল একটা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু ঘোড়া বিক্রেতার নাতি নিশ্চয়ই তাকে হুমকি দেবার কথা স্বপ্নেও কল্পনা করবে না। মোগলদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সে নিজে বাবরের কাছে মুচলেকা দিয়েছে। উচ্চাকাঙ্খ অবশ্য অনেক সময়েই মানুষকে হঠকারী পথের দিকে নিয়ে যায়। সে শের উপাধি গ্রহণ করেছে, যার মানে ব্যাঘ, ব্যাপারটা সম্ভবত একটা অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। সম্ভবত সত্যিকারের ব্যাঘ্র রাজবংশ- মোগলদের, সরাসরি দ্বৈরথে আহবান জানাবার অভিপ্রায়ে সে এসব করছে। হুমায়ুন তার আঙ্গুলের তৈমূরীয় অঙ্গুরীয়টার দিকে তাকায়, কিন্তু আফিমের কারণে তখনও তার চোখের মণি প্রসারিত হয়ে থাকায়, সে অঙ্গুরীয়টার উপরিতলে খোদাই করা ক্রুদ্ধ গর্জনরত বাঘের খোদাই করা প্রতিকৃতির উপরে ঠিকমতো ফোকাস করতে পারে না।

হুমায়ুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বার্তাবাহকের প্রতি পুনরায় নিজের মনোযোগ নিবদ্ধ করে। আমাকে আরও খুলে বল।

শেরশাহ মোগল এলাকার একটা বিশাল অংশ নিজের বলে দাবী করছে। সে নিজেকে মোগলদের বিরুদ্ধে সমগ্র হিন্দুস্তানের প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা হিসাবে ঘোষণা করেছে এবং শপথ নিয়েছে তৈমূরের বংশে জন্ম নেয়া সব যুবরাজের কবল থেকে হিন্দুস্তানকে রক্ষা করবে। এমনকি সবচেয়ে গর্বিত গোত্রপতিরাও ক্রমশ তাঁর বশংবদে পরিণত হচ্ছে। আপনার ভাইয়ের কাছ থেকে আমি আপনার জন্য একটা চিঠি নিয়ে এসেছি যা আপনাকে সেখানে আসলে কি ঘটেছে তার সবকিছু বিশদভাবে ব্যাখ্যা করবে- শেরশাহ কতদূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছে, তার প্রতি কতজন গোত্রপতি নিজেদের সমর্থন ঘোষণা করেছে…–চিঠিটা এখানে রয়েছে, উটের চামড়া দিয়ে তৈরী একটা থলি তার দিকে এগিয়ে দেয়।

ওটা আমার উজিরকে দেবে। আমি যখন বিশ্রাম নেব তখন আমি চিঠিটা পড়ে দেখবো।

বার্তাবাহক লোকটা বিস্মত দেখায় কিন্তু এক মুহূর্তও দেরী না করে সে থলিটা কাশিমের হাতে তুলে দেয়।

কাশিম- আপনি নিজে বিষয়টা লক্ষ্য করবেন যেন দূর্গের ভেতরে বার্তাবাহকের থাকা আর খাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। কিন্তু কাশিমও তাঁর দিকে বিচিত্র ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে বলে মনে হয়। সে বুঝতে পারেনি যে তাড়াহুড়ো করে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে কোনো লাভ হবে না। হুমায়ুনের মনের ঘোর যখন কেটে যাবে- পরে কখনও- তখন সে নিজের কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে ভেবে দেখবে। এখন যাও। আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।

বার্তাবাহক আর কাশিমের পেছনে দরজার পাল্লা বন্ধ হয়ে যেতে, হুমায়ুন গবাক্ষ দিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। নির্মেঘ আকাশের বুকে একটা নিখুঁত কমলা রঙের চাকতির মতো সকালের সূর্য উঠছে। দূর্গের লাল বেলেপাথর এমন ভাবে আভা ছড়ায় যেন এক্ষুনি পুরো দূর্গটা আগুনের শিখায় ঝলসে উঠবে। হুমায়ুন চোখ কচলায় এবং তার পরিচারককে ইশারায় জানালার শুকনো ঘাসের তৈরী পর্দা টাট্টি নামিয়ে দিয়ে নির্মম উজ্জ্বলতাকে আড়াল করতে বলে যার ফলে তাঁর মাথার ভেতরটা দপদপ করছে। শেরশাহের খবরটা সত্যিই আতঙ্কিত হবার মতো এবং তাকে অবশ্যই সমুচিত জবাব দিতে হবে কিন্তু তারও আগে তাঁর ঘুম দরকার আর এমন কিছু একটা করা যার ফলে তাঁর মন প্রশান্ত হবে। সে লাল রঙের সুগন্ধিযুক্ত রোজউডের তৈরী একটা কারুকার্যখচিত আলমারির দিকে এগিয়ে যায় এবং সেটা খুলে ভেতর থেকে গুলরুখের তৈরী সুরার একটা বোতল বের করে আনে। এটা তাকে সাহায্য করবে, করার তো কথা? সে বোতলটার ছিপি খুলে কিন্তু তখন তার মনে হয় মধ্যাহ্নের আগে শেরশাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার সময় তাঁর মাথা পরিষ্কার থাকা দরকার। কিন্তু কি এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণটা মধ্যাহ্ন পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া হয়। সে আকিক পাথরের তৈরী পানপাত্রে গুলরুখের তৈরী মিশ্রণটা ঢালে। কয়েক মিনিটের ভিতরের সে ভেসে যেতে থাকে আর প্রায় সাথে সাথে তার স্বপ্নের ভেতর এক ধরনের উত্তেজনা এসে ভর করে।

টাট্টিগুলো তুলে দাও আর সুলতানের সাথে আমাকে একটু একা থাকতে দাও, একটা ক্রুদ্ধ মহিলা কণ্ঠ শোনা যায়। হুমায়ুন। কণ্ঠটা এবার তাঁর নাম ধরে চিৎকার করে ডাকছে এবং ক্রমশ মনে হয় তার দিকে এগিয়ে আসছে। হুমায়ুন! শীতল পানি একটা ঝাপটা তাঁকে সচেতন করে তুলতে সে হাঁসফাঁস করে উঠে বসে। কোনোমতে চোখ খুলে সে খানজাদাকে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, হাতে পিতলের একটা খালি পানির কলসি আর দুচোখ দিয়ে আগুন ঝরছে।

আপনি কি চান? হুমায়ুন নির্বোধের মতো খানজাদার দিকে তাকিয়ে থাকে, ঠিক বুঝতে পারে না আসলের ফুপিজান সামনে দাঁড়িয়ে আছে নাকি এটাও একটা কল্পনা।

উঠে বস। তুমি একজন যোদ্ধা- একজন সম্রাট- কিন্তু তোমার সাম্রাজ্য যখন হুমকির সম্মুখীন তখন হারেমের একজন খোঁজার মতো মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায় আমি তোমাকে অন্ধকার এক কোণে শুয়ে থাকতে দেখছি…আসকারির বার্তাবাহকের আগমন আর কি খবর সে নিয়ে এসেছে আমি এইমাত্র জানতে পেরেছি। তুমি তোমার উপদেষ্টামণ্ডলীদের তখনই কেন ডেকে পাঠাওনি?

আমি যখন প্রস্তুত হব তখন তাদের ডেকে পাঠাব…

নিজের দিকে একবার চেয়ে দেখো! খানজাদা রুবি দিয়ে কারুকাজ করা একটা আরশি তুলে নিয়ে সেটা হুমায়ুনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। বার্ণিশ করা উপরিতলে সে বিষণ্ণ একটা মুখ আর বিস্ফারিত তারারন্ধ্রযুক্ত দূরাগত একজোড়া চোখ আর তাঁদের নীচে সৃষ্ট প্রায় গাঢ় বেগুনী বর্ণের থলের ছবি ফুটে উঠতে দেখে। খুবই পরিচিত মনে হওয়া মুখাবয়বের দিকে সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে কিন্তু খানজাদা এক ঝটকায় আরশীটা তার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সেটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারতে আরশীর ধাতব উপরিতল বেঁকে যায় আর অনেকগুলো রুবি স্থানচ্যুত হয়ে মেঝেতে খসে পড়ে। রক্তবিন্দুর মতো লাল পাথরগুলো মেঝেতে পড়ে থাকে।

খানজাদা হুমায়ুনের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে তার কাঁধ আকড়ে ধরে। আফিম তোমার স্মৃতি শক্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে…আরশিতে তুমি নিজেকেই নিজে চিনতে পারনি, তাই না? তুমি কে সেটা কি আমাকে তোমায় মনে করিয়ে দিতে হবে… তোমার সাহসিকতা, তোমার আব্বাজানের পক্ষে তোমার অগণিত যুদ্ধ জয়ের ইতিহাস, তোমার নিয়তি আর মোগল রাজবংশের প্রতি তোমার দায়িত্বের কথা কি আমি তোমায় বলে দিব? আমরা কে- তৈমূরের উত্তরসূরী- আমরা- তুমি আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছি সবকিছু কি তুমি ভুলে গিয়েছে? আমি তোমাকে আগেও সতর্ক করতে চেষ্টা করেছি যে বাস্তবতার সাথে তোমার সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে আসছে কিন্তু তুমি আমার কথায় গুরুত্ব দাওনি। কিন্তু আমি এবার বাধ্য হব জোর করতে। তোমার ধমনীতে যে রক্ত বইছে আমার ধমনীতেও সেই একই রক্ত বইছে। তোমার আব্বাজান আমার ভাই- যার জন্য লড়াই করেছেন এতো কষ্ট সহ্য করেছেন, সেসব কিছু খোয়াবার ভয় ছাড়া আর কোনো কিছু নিয়েই আমি ভীত নই।

ফুপিজান এসব কি বলছে? সহসা সে হুমায়ুনকে ছেড়ে দিয়ে, পেছনে হেলান দিয়ে বসে, নিজের ডান হাত দিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তিতে হুমায়ুনের একটা চড় বসিয়ে দেয়। খানজাদা পাগলের মতো তাঁকে আঘাত করতে থাকে। প্রথমে ডান গালে তারপরে তাঁর বাম গালে। তার গাল বেয়ে অঝোরে কান্নার ঢল নেমে আসে।

তুমি আবার আগের মতো হও। তোমার আব্বাজানের মনোনীত উত্তরাধিকারীর যোগ্য হয়ে উঠ, সে চিৎকার করে বলতে থাকে। আফিম আর কৃত্যানুষ্ঠানের এই জাল যা তোমার অমাত্যদের বিরূপ করে তুলছে আর শাসক হিসাবে তোমার যোগ্যতাকে আপোসপ্রবণ করে তুলেছে এসব পরিত্যাগ কর। তোমার বাবার মতোই তুমিও একজন যোদ্ধা। তারকারাজি কি বলছে সে সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা করা বন্ধ কর এবং বাবর যেমন প্রত্যাশা করতেন পারলে সেরকম হয়ে উঠ, দোহাই এই একটা কাজ কর!

ফুপিজান তাকে আঘাত করা বন্ধ করেছে কিন্তু তীব্র ব্যাথায় তার মনের কুয়াশা পরিষ্কার হতে শুরু করে। তিনি প্রথমে কথা শুরু করার পরে সেই কথাগুলো যা প্রথমে অর্থহীন মনে হয়েছিল ধীরে ধীরে অর্থবোধক হয়ে উঠতে থাকে। কথাগুলো তার মনের ভিতরে ঘুরপাক খেতে থাকে এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট অতীতের প্রতিচ্ছবি যা তারা তাঁর মানসপটে ভাসিয়ে তুলে- যুদ্ধের উন্মাদনা, অমাত্যদের সাথে মল্লযুদ্ধের সময় বা আব্বাজানের সাথে দুলকি চালে ঘোড়া ছুটিয়ে শিকারে যাবার সময়ে সে নিজের মাঝে যে আন্ত্রিক উত্তেজনা অনুভব করে। সেই প্রাণবন্ত, পরিপূর্ণ, পার্থিব জগত এক সময়ে সে নিজে যেখানে বাস করতো…

হুমায়ুন, আফিমের নেশা ত্যাগ কর…নেকাটা তোমাকে শেষ করে ফেলছে। আফিম তুমি কোথায় রাখো?।

কয়েকমাস আগে বাংলায় তার মনোনীত শাসনকর্তার প্রতিনিধিকে কাশিম আর বাইসানগার তার পরিবর্তে যখন পরামর্শ দিতে বাধ্য হয় তখন কাশিমের মৃদুকণ্ঠে, উচ্চারিত সতর্কবাণীর কথা তার মনে পড়ে যায়। সে যদি নিজে লোকটার সাথে কথা বলতো তাহলে হয়তো সে লোকটার আচরণে কোনো তারতম্য খেয়াল করতো বা কোনো নির্দেশনা দিতে পারতো যা শেরশাহকে বিদ্রোহ করা থেকে বিরত রাখতে পারতো? বা শেরশাহ সম্ভবত বাংলায় কি ঘটছে সে বিষয়ে তাঁর অনীহা সম্বন্ধে কোনভাবে জানতে পেরেছিল। হুমায়ুনের হাত ধীরে ধীরে তার গলায় মালার ঝুলতে থাকা লকেট স্পর্শ করে। সেটা খুলে নিয়ে সে লকেটটা খানজাদার হাতে তুলে দেয়। তারপরে, একইরকম মন্থরবেগে, সে তখনও আধখোলা অবস্থায় থাকা আলমারির দিকে হেঁটে যায় যেখানে সে গুলরুখের আফিম মিশ্রিত সুরার বোতল রাখে। বোতলের খোঁজে সে ভিতরে হাত দিলে ভেতরের অন্ধকারে গাঢ়, প্রায় বেগুনী বর্ণের তরল চিকচিক করে উঠে। এতো জ্ঞান, এতো আনন্দ এটা তার জন্য বয়ে নিয়ে এসেছে…চিন্তার এতো খোরাক যুগিয়েছে। কাশিম আর খানজাদার দাবী অনুযায়ী আসলেই কি এটা এতো ধ্বংসাত্মক শক্তির অধিকারী?

আমার মরহুম আব্বাজানও আমি সেবন করতেন… বোতলটা ফিরিয়ে দেবার সময় সে ধীরে ধীরে বলে।

হ্যাঁ, কিন্তু তোমার মতো না…বাবর আফিমকে কখনও তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে বা তার কোনো কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করতে দেননি। আফিমের জন্য সে কখনও তার অমাত্য, সেনাপতি বা বিশ্বস্ত সহযোদ্ধাদের অবহেলা করেননি। কিন্তু তোমার ভিতরে এটা একজন সম্রাটকে দাসে পরিণত করেছে। তুমি আসক্ত হয়ে পড়েছে…ঠিক অনেকটা সেই মানুষটার মতো যে সুরা ভর্তি পুরো মশকটা খালি করার বাসনা ছাড়া একপাত্র সুরার স্বাদও উপভোগ করতে পারে না। হুমায়ুন এই সর্বনাশা নেশা তোমায় ছাড়তেই হবে, নতুবা এটা তোমাকে ধ্বংস করে ফেলবে। তোমার মরহুম আব্বাজানের রেখে যাওয়া সাম্রাজ্য তুমি খোয়াবে। অনেক দেরী হয়ে যাবার আগে আফিমের নেশা ত্যাগ কর।

সে এখনও লুকান গোপনীয়তা আর আনন্দের উৎস বোতলজাত তরলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে তারপরে তখনও অশ্রুসিক্ত খানজাদার মুখের দিকে তাকায় এবং দেখে তাকে কতটা ভীত, কতটা উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। এবং সে ভালো করেই জানে যে এই ভয় হুমায়ুনের জন্য এবং তাঁর রাজবংশের জন্য সে যার একটা অংশ এবং যে বংশের জন্য সে নিজে অশেষ দুর্ভোগ সহ্য করেছে। তার মনের অলিন্দে জমে থাকা আফিমের বিষবাষ্প সরিয়ে ধীরে ধীরে খানজাদা ঠিক কথা বলেছে, কাশিমও ঠিকই বলেছিল এবং অন্যান্য সবাই যারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল তারাই ঠিক ছিল এই বোধটা তার মাঝে জন্ম নিতে থাকে। তাকে অবশ্যই শক্ত হতে হবে নিজের ভেতরে শক্ত। বাইরের কারো সহায়তা তার প্রয়োজন নেই। সহসা সে পুনরায় খানজাদার শ্রদ্ধা, তার সম্মতি লাভের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সে তার ঘনিষ্ঠ পরামর্শকদের সাথে আর খানজাদার সাথে কেমন আচরন করেছে সেটা চিন্তা করে নিজের কাছেই লজ্জিত হয়ে উঠে।

হুমায়ুন, বোতলটা আমাকে দাও।

না, ফুপিজান। গবাক্ষের কাছে গিয়ে সে বোতলের তরল বাইরে ঢালতে থাকে তারপরে বোতলটা খালি হলে সেটা নীচের দিকে ছুঁড়ে ফেলতে নীচ থেকে বোতল ভাঙার একটা মৃদু, ভঙ্গুর শব্দ ভেসে আসতে শুনে। গুলরুখের মাদক মিশ্রিত সুরা আমি আর গ্রহণ করবো না- এটা আমি নিজে তাকে বলে দেবো। তৈমূরের এই অঙ্গুরীয়ের নামে আমি আপনার সামনে শপথ করছি যতই কঠিন হোক আমি আর কখনও আফিম বা সুরা পান করবো না। আমি গুলরুখকে তার কোনো এক ছেলের সাথে থাকবার জন্য পাঠিয়ে দেব। আমি আমার মরহুম আব্বাজানের বিশ্বাসের যোগ্য এটা আমি আপনার কাছে এবং সেই সাথে নিজের কাছে আবারও নতুন করে প্রমাণ করবো।

খানজাদা দুহাতে হুমায়ুনের মুখটা ধরে তার কপালে চুমু খায়। এই আসক্তি জয় করতে আমি তোমাকে সাহায্য করবো। আফিমের আসক্তি এতোটাই প্রবল যে সহজে এর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া মুশকিল। হুমায়ুন তুমি একজন মহান যোদ্ধা, বিশাল মনের মানুষ আমি সেটা সবসময়েই জানতাম তুমি আরও মহীয়ান হয়ে উঠবে।

আর আমি সবসময়েই জানি আপনি আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু।

আর এখন?

বার্তাবাহককে পুনরায় ডেকে এনে আমি তাকে পুনরায় প্রশ্ন করার আগে আপনি কিছুটা সময় আমার সাথে থাকেন। আমি চাই তার বক্তব্য আপনিও শোনেন। তার কথা যদি সত্য হয় তাহলে অবিলম্বে আমাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।

সেদিন অপরাহ্নে হুমায়ুন তাঁর সিংহাসনে গিয়ে বসে। তার অমাত্য আর সেনাপতিরা তাঁর সামনে। সে যেমনটা আদেশ দিয়েছে তারা কেউই। এমনকি সে নিজেও দিনের নিয়ন্ত্রণকারী গ্রহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রঙের পোষাক পরিধান করেনি। খানজাদা ঠিকই বলেছিল। সে যে কৃত্যানুষ্ঠানের প্রচলন করেছিল তার ফলে দরবারে না এসেছিল একতা না একাগ্রতা। তাঁর অমাত্যদের শ্রদ্ধা আর বিশ্বস্ত তা তাঁকে অন্যভাবে অর্জন করতে হবে। এবং সেটা অর্জনের একটা পথ হল যুদ্ধের ময়দানে বিজয় হাসিল করা।

বার্তাবাহক কামালের বয়ে আনা সংবাদ আপনারা ইতিমধ্যে শুনেছেন। মোগলদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শেরশাহের হামলা আমাদের সম্মানের প্রতি প্রকাশ্যে অবমাননা যা আমি কখনও বরদাশত করবো না। সেনাবাহিনী প্রস্তুত হওয়া মাত্র আমরা এই ভুঁইফোড়ের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হব। এবং শেরশাহের সাথে আমার বিরোধের যখন নিষ্পত্তি হবে তখন আমি তাকে দাস ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেব, শেরশাহের পূর্ব পুরুষেরা যেমন অর্থব ঘোড়া কসাইয়ের কাছে বিক্রি করে দিত।

হুমায়ুনের বক্তব্য শেষ হতে, বিগত মাসগুলোতে প্রায় স্তব্ধ হয়ে আসা দরবার কক্ষে একটা প্রবল গর্জন শোনা যায়। হুমায়ুনের সেনাপতিরা তাদের গোত্রের বহু প্রাচীন প্রথা অনুসারে নিজেদের ঢালের সাথে নিজেদের তরবারি আঘাত করতে থাকে এবং তাঁদের মন্দ্র কণ্ঠস্বরে একটা শ্লোগান ধীরে ধীরে ধ্বনিত হতে থাকে মির্জা হুমায়ুন, মির্জা হুমায়ুন, যা তাঁর ধমনীতে বহমান তৈমূরের রক্তের কথা ঘোষণা করে। হুমায়ুন তার সিংহাসনের একপাশের দেয়ালে অনেকটা উপরে অবস্থিত নক্সাকরা জাফরির দিকে তাকায় যার পেছনে দাঁড়িয়ে সে জানে যে খানজাদা তাঁকে দেখছে এবং তাঁর কথা শুনে মিটিমিটি হাসছে। সব আবার আগের মতো হয়ে যাবে। আরো একবার মোগল সম্রাট নিজের বাহিনীকে নেতৃত্ব দেবে। শান্তির কুশীলব হিসাবে সে হয়তো নিজেকে প্রমাণ করতে পারেনি কিন্তু একজন সেনাপতি হিসাবে সে নিজের দক্ষতা কি প্রমাণ করেনি?

২.১ সংঘাতময় বিক্ষুব্ধতার কেন্দ্রে অবস্থান – দ্বিতীয় পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব – সংঘাতময় বিক্ষুব্ধতার কেন্দ্রে অবস্থান

০৬. নিজাম ভিস্তি

ভোরের আলো ফোঁটার এক ঘন্টা পরে, হুমায়ুন তাঁর ব্যক্তিগত শয়ন কক্ষ থেকে বের হয়ে এসে, লাল বেলেপাথরে তৈরী আগ্রা দূর্গের অভ্যন্তরে মার্বেল পাথরে বাধান হলাধার আর পানি ছিটাতে থাকা ঝর্ণার সারির ভিতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে সুউচ্চ তোরণদ্বার অতিক্রম করে এবং কুচকাওয়াজ ময়দানের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে তার সেনাবাহিনী সমবেত হয়েছে। রুবিখচিত একটা রূপার বক্ষাবরণের উপরে রূপার সূক্ষ শিকলের তৈরী আলখাল্লায় সে পুরোদস্তুর যুদ্ধের সাজে সজ্জিত। তার দেহের একপাশে পান্নাখচিত ময়ানের শোভা পাচ্ছে তার মরহুম আব্বাজান বাবরের ঈগলের মাথাযুক্ত বাঁটের তরবারি আলমগীর। তাঁর মাথায় শোভা পায় রুবি দিয়ে অলঙ্কৃত একটা শিরস্ত্রাণ এবং স্বর্ণখচিত একটা লম্বা ময়ূরের পালক শিরস্ত্রাণের শীর্ষে মৃদু দুলছে।

লোহার গজালশোভিত দূর্গের মূল দরজার আড়াল থেকে সে যখন বের হয়ে আসে এবং কুচকাওয়াজ ময়দানের কেন্দ্রে স্থাপিত মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে তাঁর রাজকীয় হাতি- আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রায় সম্রাট আর তাঁর সেনাপতিদের যাতায়াতের জন্য সচরাচর ব্যবহৃত অপেক্ষা করছে, সে দেখে যে তাঁর সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী দল সারিবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যাবার সময় এতোই গোলাপি-ধুসর বর্ণের ধূলো উড়িয়েছে যে সূর্য তাঁর আলোর তীব্রতা হারিয়ে একটা ধুসর, হলুদ বর্ণের চাকতিতে পরিণত হয়েছে। ধুসর বর্ণের অতিকায় হাতিটা তাঁর পিঠে গিল্টি করা লাল-দোয়ার মতো হাওদা নিয়ে হাটু ভেঙে বসে আছে এবং দুই মাহুত তার মাথার দুপাশে দাঁড়িয়ে। হাতির দুপাশে মর্যাদা অনুসারে তাঁর বয়োজ্যোষ্ঠ আধিকারিকেরা দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। তার প্রত্যেক সেনাপতির নতজানু হয়ে জানান অভিবাদন গ্রহণ করে হুমায়ুন তাদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলার জন্য দাঁড়ায়।

আমার কাছ থেকে তোমাদের লোকদের কাছে এই বার্তাটা বয়ে নিয়ে যাবে। আমরা ন্যায়ের পক্ষে রয়েছি। এই অশিক্ষিত, উঁইফোড়, জবরদখলকারীর কাছ থেকে যা আমাদের আমরা সেটাই উদ্ধার করতে চলেছি। আমাদের সেনাবাহিনী দেখার পরে এটা যে ইতিহাসের বৃহত্তম আর অজেয় সে বিষয়ে কেউ কিভাবে সন্দেহ প্রকাশ করবে? যোদ্ধাদের খুশী মনে বিদায় দাও। বিজয় আর তাঁর সঙ্গী, খ্যাতি আর পুরষ্কার আমাদের সাথী হবে।

আধিকারিকেরা আরও একবার মাথা নত করে এবং গুঁড়ি মেরে বসে থাকা হাতির হাটুতে পা রেখে হুমায়ুন এর পিঠে স্থাপিত হাওদায় সোনার গিল্টি করা ছোট যে সিংহাসনটা রয়েছে সেটায় গিয়ে বসে। জওহর আর দুজন দেহরক্ষী খুব কাছ। থেকে তাঁকে অনুসরণ করে। হুমায়ুনের কাছ থেকে ইশারা পেতে মাহুতেরাও আরোহন করে এবং হাতির ঘাড়ের উপরে একজন আরেকজনের পেছনে নিজেদের নির্ধারিত অবস্থানে বসে জন্তুটার বিশাল কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে আদেশ দিতে থাকে। অতিকায়, অনুগত জন্তুটা আলতোভঙ্গিতে ধীরে ধীরে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে হুমায়ুন তাঁর হাতি আর তাঁর অন্যান্য সেনাপতিদের বহনকারী হাতির বহরকে এগিয়ে যাবার সংকেত বিঘোষিত করতে তূর্যবাদকদের ইঙ্গিত করে। সৈন্যবহরে নিজেদের নির্ধারিত স্থান গ্রহনের জন্য অগ্রসর হবার সময় তারা গোলন্দাজ বাহিনীর চার চাকার উপরে স্থাপিত প্রায় বিশ ফুট লম্বা ব্রোঞ্জের নলযুক্ত কামানগুলো, যার কোনটা টানছে পঞ্চাশটা পর্যন্ত ষাড়ের দল আর কোনটা টানছে ছয়টা থেকে আটটা হাতি- পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। অপেক্ষাকৃত ছোট কামানগুলো ষাড়ে টানা গাড়িতে রাখা হয়েছে।

হুমায়ুন এরপরে ঘন সন্নিবেশিত অশ্বারোহী বাহিনীর পাশ দিয়ে এগিয়ে যায় প্রথমেই রয়েছে তার বাবার মাতৃভূমি থেকে আগত অশ্বারূঢ় যোদ্ধার দল, তাজিক, বাদশান, কিরঘিজ পর্বত আর ফারগানার উপত্যকা আর সেই সাথে আফগানিস্তান থেকে আগত যোদ্ধারা। সে বিশ্বাস করে, মোগল রাজবংশের প্রতি এরাই সবচেয়ে বিশ্বস্ত। মধ্য এশিয়ার তৃণাঞ্চল থেকে তাঁদের নিয়ে আসা ঘোড়ার পাল থেকে এখনও প্রজনন করার তাঁদের ঘোড়াগুলোই সবচেয়ে শক্তিশালী। এদের পরে সে তার অনুগত রাজপুত জায়গীরদারদের একটা অংশকে কমলা রঙে সজ্জিত দেখতে পায়। যুদ্ধের জন্য সব রাজপুতের মতোই উদগ্রীব বিশালদেহী, কাল-শুশ্রুমণ্ডিত এই লোকগুলো হুমায়ুন যখন পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখন নিজেদের ছোট, বৃত্তাকার আর কারুকার্যময় ঢালে নিজেদের তরবারি দিয়ে আঘাত করে সামরিক ভঙ্গিতে অভিবাদন জানায়।

হুমায়ুন পর্যায়ক্রমে যখন প্রতিটা বাহিনীকে অভিবাদন জানায়, সে মনে মনে ভাবে যে নিশ্চিতভাবেই বিজয়তিলক তার ললাটেই শোভা পাবে। তার সাথে আছে প্রায় সোয়া লক্ষ সৈন্যের একটা বাহিনী- শেরশাহের বাহিনীর চেয়ে কয়েক গুণ বড়। তাঁর সাথে অন্তত দশ গুণ বেশী কামান রয়েছে এবং গুজরাত অভিযানের সময় সে যেমন প্রমাণ করেছে- সে সৌভাগ্যের আশীর্বাদপুষ্ট একজন যোগ্য সেনাপতি। আগুয়ান সেনাবাহিনীর সাথে সঙ্গী হবার আর তার সৎ-বোন চঞ্চল প্রাণবন্ত গুলবদনকে সাথে নিয়ে আসবার জন্য সে তাই তার ফুপু খানজাদার অনুরোধ মঞ্জুর করেছে। প্রতিরক্ষার এহেন বন্দোবস্তের মাঝে তারা আগ্রার চেয়ে খুব একটা বেশী বিপদের সম্মুখীন হবে না, যার প্রতিরক্ষার ভার সে তার নানাজান বাইসানগার আর কাশিমের যোগ্য এবং বিশ্বস্ত হাতে অর্পন করে এসেছে। ফুপুজানের অভিজ্ঞতাঋদ্ধ পরামর্শের সাথে সাথে আবারও কখনও আফিমের আসক্তির মাঝে নিজেকে বিলীন করে দেবার মতো প্ররোচনা অনুভব করলে সে তার মানসিক সমর্থন লাভ করবে এটা ভেবেই সে কৃতজ্ঞ। তিনি কখনও এর অনুমতি দেবেন না।

সে অবশ্য সালিমা আর তাঁর প্রিয় আরো তিনজন উপপত্নীকে সাথে করে নিয়ে আসবার বিলাসিতা করার অনুমতি নিজেকে দিয়েছে। তাঁর সুরা আর আফিম বর্জন যেন হারেমের কোমল আর ইন্দ্রিয়পরবশ সুখের প্রতি তার আকাঙ্খকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সে তিনজন তরুণীকে পছন্দ করেছে- গুজরাত থেকে আগত খেয়ালি আর নমনীয় দেহের অধিকারিনী মেলিতা, লাহোর থেকে আগত ভারী বুক আর পুরু ওষ্ঠের অধিকারিনী পৃথুলা মেহেরুন্নিসা আর খোদ আগ্রার মেয়ে রসিক, কামকলায় পটু, কলহপ্রিয় মীরা- যারা প্রত্যেকেই, সালিমার মতো তাঁদের নমনীয় দেহ, ব্যগ্র ওষ্ঠ আর উৎসুক জীহ্বা নিয়ে, রতিক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন আসনে পারদর্শী। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির ক্লান্তিকর পরিস্থিতির মাঝে কি প্রশান্তি, তাঁর বিজয়ে কি আনন্দই না তারা তার জন্য বয়ে আনবে। অক্ষুব্ধ হাতির পিঠে পর্দা ঘেরা হাওদার অন্তরালে মেয়ের দল ভ্রমণ করছে আর তাঁদের পাহারায় নিয়োজিত আছে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের একটা দল।

*

ছয় সপ্তাহ পরে মধ্যাহ্নের আহারের ঠিক পরপরই, শত্রুর সংবাদ সংগ্রহে প্রেরিত হুমায়ুনের প্রধান গুপ্তদূত আহমেদ খানকে, চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী সেনাছাউনির ঠিক কেন্দ্রে স্থাপিত, তার লাল রঙের নেতৃত্ব দানকারী তাবুর দিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। হুমায়ুন সেখানে লালচে খয়েরী রঙের তাকিয়া যুক্ত সোনার কারুকাজ করা জাজিমে শুয়ে বিশ্রাম করছে, প্রশান্তিদায়ক শরবতের পানপাত্র হাতে সে জওহরের বাঁশির কোমল ছন্দোলয়ে বিভোর। আহমেদ খান তাবুর ভিতরে প্রবেশ করতে, হুমায়ুন ইশারায় জওহরকে বাজান বন্ধ করতে বলে।

আহমেদ খান, কি ব্যাপার?

সুলতান, আমাদের ছাউনির চারদিকে পঞ্চাশ মাইল দূর অবধি অনুসন্ধান করেও আমরা শেরশাহের সেনাবাহিনীর কোনো হদিশই খুঁজে পাইনি। অবশ্য এখান থেকে দক্ষিণপূর্ব দিকে প্রায় পয়তাল্লিশ মাইল দূরে আমরা সহসাই এক ক্ষুদ্র জায়গীরদারকে তার মাটির দূর্গে অবস্থানরত অবস্থায় আবিষ্কার করি। সে শেরশাহের অনুগত জায়গীরদার বলে দাবী করে কিন্তু এমন একজন যে ভীত যে তাঁর প্রভু নিজের অত্যধিক উচ্চাকাঙ্খর বশবর্তী হয়ে আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সবাইকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। শেরশাহের সেনাবাহিনীর সাথে যোগ দেবার জন্য তাই সে কোনো ধরনের ব্যস্ততা প্রদর্শন করেনি। সে আমাদের বলেছে যে তার জানা মতে এলাহাবাদের যেখানে গঙ্গা আর যমুনার স্রোত এসে মিলিত হয়েছে সেখান থেকে অন্তত আরও পঞ্চাশ মাইল দূরে শেরশাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে অবস্থান করছে। আমাদের বলেছে সে যা জানে আপনাকে বলার জন্য খুশী মনে সে আমাদের সাথে এখানে আসতে রাজি আছে। আমরা তার কথায় গুরুত্ব দিয়ে তাঁকে এখানে নিয়ে এসেছি অবশ্য চোখ বেঁধে, যাতে সে আমাদের ছাউনির অবস্থান বা আমাদের সেনাবাহিনীর শক্তি সম্বন্ধে কিছু আঁচ করতে না পারে। আমরা এক ঘন্টা আগেই এসে পৌঁছেছি এবং আমি তার খাবারের বন্দোবস্ত করে তার সাথে কথা বলার ব্যাপারে আপনার আগ্রহ জানতে এসেছি।

তুমি দারুন কাজ করেছে। আধ ঘন্টা পরে তাকে আমার কাছে নিয়ে আসবে।

কাঁটায় কাঁটায় ঠিক ত্রিশ মিনিট পরে, আহমেদ খান- নিয়মনিষ্ঠার ব্যাপারে বাবরের ঝোঁক সম্পর্কে ভালোমতোই ওয়াকিবহাল- ফিরে আসে। তার পেছনে, দুজন সশস্ত্র প্রহরীর মাঝে, গাঢ় সবুজ রঙের আলখাল্লা আর একই রঙের পাগড়ি পরিহিত খর্বকায়, স্থূলদেহী, কৃষ্ণ বর্ণের বছর চল্লিশের একজন মানুষকে দেখা যায়।

হুমায়ুনের সামনে স্বতঃস্ফূর্ত ভঙ্গিতে সে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানায়।

কে তুমি?

তারিক খান, ফিরোজপুরের তাকহালদার।

আর সেই সাথে তুমি শেরশাহের অনুগত।

হ্যাঁ- এবং আমার প্রতি সে সবসময়ে একজন ভালো প্রভুর মতো আচরণ করেছে…কিন্তু সবকিছুর পরেও সুলতান, আমার পরম অধিরাজ, আমি আপনার একজন বিশ্বস্ত প্রজা। বিদ্রোহ করে শেরশাহ বেকুবি করেছে।

তুমি বোধহয় বলতে চাইছে ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে উদ্ধত আর অশ্রদ্ধাপূর্ণ ভঙ্গিতে অপমান করেছে… কিন্তু তার অভিসন্ধি আর অবস্থান সম্পর্কে তুমি কি জান?

তার সেনাবাহিনী আমার এলাকার ভিতর দিয়ে সরাসরি যাতায়াত করে না কিন্তু আমার এলাকার উত্তরে বিশ মাইল দূরে আমার আত্মীয়সম্পর্কিত ভাইয়ের এলাকার ভিতর দিয়ে তারা যাতায়াত করে। সে বলেছে শেরশাহের সেনাবাহিনীর আকার ছোট- লোকবল আশি হাজারের বেশী হবে না। আমার সেই ভাই শেরশাহের সেনাছাউনিতে গিয়েছিল তাঁকে তাঁর শ্রদ্ধা জানাতে। সে আমাকে বলেছে শেরশাহকে রীতিমতো বিহ্বল মনে হয়েছে যে সে আপনাকে এতো বিশাল এক বাহিনী নিয়ে অভিযানে অগ্রসর হতে প্ররোচিত করেছে। সে আমার ভাইকে বলেছে সে যুদ্ধ করবে না যদি আরো একবার আপনার অধীনে জায়গীরদার থেকে নিজের এলাকা নিজের আয়ত্ত্বে রাখতে পারার শর্তে সে আপনার সাথে কোনো ধরনের শান্তিচুক্তির রফা করতে পারে।

তার ভবিষ্যৎ গতিবিধি সম্বন্ধে তোমার সেই ভাই কিছু জানতে পেরেছে?

শেরশাহের এক গুপ্তদূত অসাবধানতাবশত আমার সেই ভাইয়ের উজিরকে বলেছে যে তারা বাংলার নীচু জলাভূমি আর জঙ্গল অভিমুখে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে যুদ্ধ যদি তাদের করতেই হয়- আপনার পরাক্রমকে তারা হয়তো ভালোভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে।

তুমি এতক্ষণ যা বলেছে আমার উপদেষ্টামণ্ডলীর সাথে সে বিষয়ে আমি আলোচনা করবার আগে তুমি কি আর কিছু বলতে চাও?

কেবল এতোটুকুই যে মহামান্য সুলতানের যদি শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দিয়ে শেরশাহের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার কোনো অভিপ্রায় থেকে থাকে, আপনার প্রেরিত যেকোনো দূতের সঙ্গী হতে আমি প্রস্তুত এবং তাকে শেরশাহের শিবিরে তাঁর সামনে হাজির করার পরে নিরাপদে ফিরিয়ে আনবার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।

আমি প্রস্তাবটা বিবেচনা করবো। এখন, আহমেদ খান, আরেকবার তার চোখ বাঁধো এবং তোমার দপ্তরে তাঁকে বদ্ধ কিন্তু আরামদায়ক অবস্থায় অবরুদ্ধ করে রাখো। জওহর, সূর্যাস্তের এক ঘন্টা পূর্বে এখানে আমার সাথে মিলিত হবার জন্য আমার উপদেষ্টামণ্ডলীদের তলব কর। ইত্যবসরে সালিমাকে বল আমার কাছে আসতে। হুমায়ুন ভাবে, উষ্ণ আবহাওয়ায় তার কামনার পারদ দ্রুত বেড়ে যায়, এবং প্রায়শই শীতকালের তুলনায় দ্বিগুণ। মেয়েটা জানে কিভাবে এই কামনা প্রশমিত করতে আর আসন্ন আলোচনায় মনোনিবেশের জন্য তার মনকে প্রশান্ত করতে হয়।

সালিমা, বরাবরের মতোই, নিজের দায়িত্ব নিপূণভাবে পালন করে। তার উপদেষ্টামণ্ডলী যখন সমবেত হয়, হুমায়ুন শমিত বোধ করে, তার পরামর্শদাতাদের সম্বোধন করার সময় অতিকায় একটা ব্যাঘ্রের মতো হুঙ্কার দিতে প্রস্তুত। আপনার তারিক খানের কথা শুনেছেন এবং তাঁর বয়ান যে শেরশাহ আমাদের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে যাবার অভিপ্রায়ে বাংলার জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করতে চলেছে এবং সেই সাথে তার অনুমানের জন্য দুঃখবোধ করছি- সে শান্তির জন্য আমাদের আপোষ করতে বাধ্য করবে। আপনারা কি মনে করেন?

আমাদের সাথে শক্তিশালী একটা সেনাবাহিনী রয়েছে এবিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। আমরা তাকে খুঁজে বের করে স্রেফ পিষে ফেলি না কেন, বাবা ইয়াসভালো নিজের চারপাশে সাথী সেনাপতিদের দিকে তাকিয়ে কথাটা বলার সময় তার কামান মাথা থেকে ধুসর চুলের বেনীটা দুলতে থাকে।

কিন্তু একটু ধৈর্য্য ধরেন, হুমায়ুনের চাচাত ভাই সুলেমান মির্জা বলে। আমাদের সাথে যদি শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকে এবং নিজেদের লোকদের আনুগত্যের প্রতি আমাদের বিশ্বাস থাকে তাহলে একজন দূত প্রেরণ করে কিছুটা বিলম্ব করলে আমাদের কি এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে? তারা ফিরে আসবার পরেও যদি প্রয়োজন হয়- দুমাস পরে বর্ষা মরসুমের আগে অগ্রসর হবার জন্য আমাদের হাতে প্রচুর সময় থাকবে।

তাকে এখনই শেষ করে দেয়াটাই অধিক বাঞ্ছনীয়। বাবা ইয়াসভালো তবুও অনড়। তাঁকে দিয়ে একটা উদাহরণ সৃষ্টি করলে অন্য বিদ্রোহীরা সমঝে যাবে।

কিন্তু আমাদের লোক ক্ষয় হবে আর সময়ও যা আমরা আমাদের সাম্রাজ্য বর্ধিত করার জন্য নিয়োজিত করতে পারি। আমি সবসময়েই দক্ষিণে দাক্ষিণাত্যের মালভূমি অতিক্রম করে গোলকুণ্ডার হীরকখনিতে অভিযান পরিচালনায় আগ্রহী, সুলেমান মির্জা বলে।

আমি একমত, হুমায়ুনের দক্ষ সেনাপতিদের একজন, ইউসুফ পাঠান ভাবলেশহীন কণ্ঠে মন্তব্য করে। শেরশাহকে একজন দক্ষ শাসক বলা হয়ে থাকে আর বাংলা উর্বর, সমৃদ্ধ একটা প্রদেশ। আমরা যদি তাকে আর তার প্রধান অমাত্যদের হত্যা করি তাহলে নতুন কাঠামো তৈরী আর নতুন আধিকারিকদের নিয়োগ করতে গিয়ে আমাদের প্রচুর সময় নষ্ট হবে। আমাদের শক্তিমত্তার অবস্থান থেকে তার সাথে কোনো ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে আমরা তাঁকে আর তাঁর প্রশাসনকে কর আদায়ের জন্য ব্যবহার করে দ্রুত আমাদের বাহিনীর বকেয়া বেতন পরিশোধ আর তাঁদের পুরস্কৃত করতে পারি আর তারপরে গোলকুণ্ডার অভিযানের জন্য অগ্রসর হই।

হুমায়ুন সবার বক্তব্য বিবেচনা করে। ইউসুফ পাঠানের বক্তব্যের ভিতরে একটা প্রত্যয়বোধ রয়েছে। তাছাড়া, মহানুভবতা মহান শাসকদের একটা বৈশিষ্ট্য। হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়। সুলেমান মির্জা, একটা ছোট রক্ষী বাহিনী নিয়ে আপনি তারিক খানের সাথে যাবেন, শেরশাহের অবস্থান সনাক্ত করে তাঁর কাছে শান্তি চুক্তির প্রস্তাব পৌঁছে দিতে তবে শর্ত এই যে তাঁকে এখানে এসে আনুষ্ঠানিক অভিবাদন জানাতে হবে এবং আমাদের মূল্যবান সময় আর রসদ অপচয় আর সর্বোপরি আমাদের প্রতি সে যে অমার্জিত অবমাননা প্রদর্শন করেছে সেজন্য আমাদের সে উত্তমরূপে ক্ষতিপূরণ দেবে।

*

কিন্তু শেরশাহ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া প্রকাশ থেকে বিরত থাকে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয় সে কেবলই কালক্ষেপন করে চলে, বিলম্বের জন্য ভূরি ভূরি দুঃখপ্রকাশ করে আর কোনো ধরনের শর্তে চুড়ান্তভাবে সম্মতি হবার পূর্বে মিত্রদের সাথে আলোচনার করতে বার্তাবাহক প্রেরণের অনুমতির জন্য বারংবার অনুরোধ করে। ১৫৩৯ সালের গ্রীষ্মকালের মাঝামাঝি একটা সময় সেটা, হুমায়ুন নৈশভোজের পর, বাংলার চৌসা বসতির কাছেই চার বর্গমাইলের চেয়ে বেশী এলাকা জুড়ে অবস্থিত তার সেনাছাউনির ঠিক মধ্যভাগে অবস্থিত তার তাবুর পাশেই খানজাদার তাবুতে অবস্থান করছিল। নীচু পাহাড়ের উপরে হুমায়ুন তার শিবির স্থাপন করেছে যেখান থেকে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের কর্দমাক্ত প্লাবিত সমভূমি দেখা যায়। তাবুর বাইরে, রাতের আবহাওয়া বেশ উষ্ণ এবং নিথর বাতাসে তাবুর আগুনের থোয়া সরাসরি উপরের দিকে উঠে যায়। তাবুর ভিতরে, কৌতূহলী দৃষ্টি থেকে জেনানাদের রক্ষা করতে যার পার্শ্বদেশ নামিয়ে দেয়া হয়েছে, গুমোট বাতাসে শ্বাস নেয়া কষ্টকর। চিনিগোলা পানির পাত্র দিয়ে তাদের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা বা তরাসচামর দিয়ে তাঁদের পিষে ফেলার জন্য খানজাদার পরিচারকদের সর্বাত্মক প্রয়াস সত্ত্বেও মশার ঝক বিরামহীনভাবে ভনভন করতে থাকে। হুমায়ুন দরদর করে ঘামতে থাকে, মাঝে মাঝে সে নিজের উন্মুক্ত ত্বকে তাঁদের তীব্র দংশন অনুভব করে এবং বৃথাই নিজের ক্ষুদ্র আক্রমণকারীদের উদ্দেশ্যে চড় হাকায়।

হুমায়ুন কি হয়েছে? আজ খাবারের সময় তুমি প্রায় চুপচাপই ছিলে, খানজাদা জানতে চান।

আমি উদ্বিগ্ন যে আমি এত সময় বৃথা অপচয় করেছি, যে শেরশাহ আমাকে আহাম্মক মনে করে হেলাফেলা করছে। সুলেমান মির্জা আর তারিক খান আমাকে আশ্বস্ত করেছে যে প্রতিবার সাক্ষাতের সময় সে সজ্জনসুলভ আর ভদ্র আচরণ করেছে এবং তাঁকে আন্তরিকই মনে হয়েছে কিন্তু আমি এখন আর সে সম্বন্ধে নিশ্চিত নই। তারিক খানকে এতোটা বিশ্বাস করে আমি কি ভুল করেছি? নিজের জন্য সময় লাভের প্রয়াসে যদি শেরশাহই তাঁকে রোপন করে থাকে?

খানজাদা উঠে দাঁড়ায় এবং দুই এক মুহূর্তের জন্য পায়চারি করে, তশতরী আকৃতির পিতলের দিয়া ভর্তি তেলে জ্বলতে থাকা সলতের সোনালী আভায় তার মুখ গম্ভীর দেখায়।

আমার মনে হয় তোমার সন্দিগ্ধ হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত। শক্তিমানই সবসময় বিজয়ী হয় না মাঝে মাঝে ধূর্তও বিজয়ের বরাভয় লাভ করে। বিগত নয় সপ্তাহ ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে কিংবা সম্মেলনে শেরশাহের সাথে মিলিত হবার জন্য গঙ্গার তীর বরাবর নিম্নাভিমুখে তুমি বিশাল একটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে কিন্তু প্রতিবারই তুচ্ছ অজুহাত ব্যবহার করে যে সে এলাকার সব খাদ্যশস্য নিঃশেষ করে ফেলেছে বা মহামারীর আকারে জ্বরের প্রাদুর্ভাব হওয়ায় তাঁকে অবশ্যই সেটা এড়িয়ে যেতে হবে সে আরও সামনে এগিয়ে গিয়েছে।

সত্যি। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে গঙ্গার তীর থেকে ত্রিশ মাইল দূরে তাঁর মূল বাহিনী এখনও অপেক্ষা করছে।

তুমি কি করতে চাও?

আর কোনো অজুহাত গ্রহণ করবো না, শেরশাহের জন্য একটা সময়সীমা নির্ধারণ করবো এবং সে যদি সেটা অমান্য করে আমি তাকে আক্রমণ করবো। কিন্তু অন্য কারণে উদ্বিগ্ন যে বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী আর আমার কামানের সহজ যাতায়াতের জন্য এসব জঙ্গল আর জলাভূমি একেবারেই অনুপযুক্ত।

তাহলে উপযুক্ত ভূখণ্ডে পশ্চাদপসারণের জন্য সাহস সঞ্চয় কর। বা শেরশাহের বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে তাঁর শহরগুলো দখল করে নাও… একটা নিঃসঙ্গ বজ্রপাত খানজাদার কথার মাঝে বিঘ্ন ঘটায়। তাবুর ছাদে মুষলধারে বৃষ্টির আওয়াজ একে অনুসরণ করে।

এখনই বর্ষাকাল শুরু হবার কথা না- এখনও সময় হয়নি।

প্রকৃতির ছন্দ সবসময়ে মানুষের তৈরী পঞ্জিকা অনুসরণ করে না।

এটা যদি বর্ষার আগমনী বৃষ্টি হয় তাহলে আমাদের অবশ্যই উপযুক্ত ভূমি সন্ধান করা উচিত। কিন্তু এখন অনেক রাত হয়েছে, সকালে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য আমরা অনেক সময় পাব যখন আমরা জানতে পারব যে আসলেই অবিরাম বৃষ্টিপাতের সূচনা হয়েছে। আমাদের শিবির নদীর উপরিভাগ থেকে অনেক উঁচুতে অবস্থিত ইত্যবসরে তাই বন্যায় ভেসে যাবার কোনো ভয় নেই।

কয়েকঘন্টা পরের কথা, হুমায়ুন তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাঁর বাহুদ্বয় দুপাশে প্রসারিত, তার ঘর্মাক্ত পেশল দেহ পাতলা সুতির চাদরের নীচে নগ্ন। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে, যা মন্থর হবার বদলে যেন আরও জোরে শুরু হয়েছে, আজকে তাঁর ঘুমাতে অনেক রাত হয়েছে। সে এখন স্বপ্ন দেখছে সে আগ্রা দূর্গে ফিরে এসেছে, তার উপপত্নীদের কক্ষের দিকে এগিয়ে চলেছে যেখানে কোনো বিচিত্র কারণে সে জানে তারা গোলাপজলের ঝর্ণার নীচে এখন স্নান করছে। সে টের পায় তাঁর দেহ কামনায় টানটান হয়ে উঠেছে এবং সে দ্রুত পা ফেলতে শুরু করতে চাদরের নীচে তার পা ছটফট করে উঠে, তাঁর রমণীদের কাছে পৌঁছাবার ব্যগ্রতায়। সহসা একটা মেয়েলী আর্তনাদ তাঁর স্বপ্নের গভীরে অনুপ্রবেশ করে। নারী আর পুরুষ কণ্ঠের একটা সম্মিলিত যুগলবন্দি ঠিক এর পরপরই ভেসে আসে। কেউ একজন চিৎকার করে, হাতিয়ার সামলে! জলদি- বর্ম পরার সময় নেই। ছাউনির সীমানায় জনবল বৃদ্ধি কর।

প্রাণপন চেষ্টায় ঘুমের রেশ কাটিয়ে হুমায়ুন বুঝতে পারে কণ্ঠগুলো বাস্তব। হামলাকারীরা জেনানাদের তাবু পর্যন্ত সম্ভবত অনুপ্রবেশ করেছে। একটা আলখাল্লায় কোনমতে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে সে হাত বাড়িয়ে তাঁর আব্বাজানের তরবারির তুলে নিয়ে নিজের তাবু থেকে টলতে টলতে কোনোমতে বের হয়ে আসে। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে এবং তাঁর খালি পা ভেজা কাদায় পিছলে যেতে চায়। তির্যকভাবে নেমে আসা বৃষ্টির ভারী ফোঁটার মাঝ দিয়ে উঁকি দিয়ে এবং অন্ধকারে মরীয়া হয়ে নিজের চোখ সইয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে করতে, সে খানজাদার তাবুর দিকে দৌড়ে যায়।

তাবুর কাছাকাছি পৌঁছাতে, চরাচর ঝলসে দেয়া উজ্জ্বল পাতের মতো বিস্তৃত বিদ্যুচ্চমকের ধাতব ঝলকানির মাঝে সে দীর্ঘকায় এক মহিলার অবয়বকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে- খানজাদা। তাঁর মাথার উপরে উত্তোলিত ডান হাতে একটা বাঁকান তরবারি রয়েছে। হুমায়ুন তাকিয়ে থাকতে থাকতেই খানজাদা তরবারিটা এক আক্রমণকারীর মুখ বরাবর নামিয়ে আনে, যে তাঁকে পরাস্ত করার চেষ্টা করছিল। লোকটা কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ে সেখানেই ব্যাথায় কাতরাতে থাকে। বিদ্যুচ্চমকের পরবর্তী আলোর ঝলসানিতে হুমায়ুন দেখে যে তার ফুপুজানের তরবারির আঘাতে মাটিতে পড়ে থাকা লোকটার মুখের একপাশ উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ফেঁড়ে ফেলায়, লোকটার রক্তাক্ত চোয়াল আর দাঁত বের হয়ে এসেছে। সে আর দেখে যে- খানজাদার অজান্তে- আরেকজন আক্রমণকারী তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। লোকটার হাতে তরবারির বদলে একটা বিশাল গামছা সেটাকে সে তার মাথার উপর দিয়ে ছুঁড়ে দিয়ে খানজাদার গলা শক্ত করে পেচিয়ে ধরবে। হুমায়ুন হুশিয়ারি উচ্চারণ করে।

সহসাই বিপদ টের পেয়ে, খানজাদা হাতটা পেছনে নিয়ে গিয়ে কনুই দিয়ে লোকটার গলায় আঘাত করে কিন্তু লোকটা কোনোমতে আঘাতটা সামলে নিয়ে গামছাটা শক্ত করে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। হুমায়ুন ততক্ষণে তাঁদের অনেকটা কাছে চলে আসায় সে ফুপুজানের আক্রমণকারীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সবলে তাঁকে মাটিতে আছড়ে ফেলার অভিপ্রায়ে তাঁর সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি আরম্ভ করে। চকচকে, পিচ্ছিল কাদায় তারা কিছুক্ষণ ধ্বস্তাধ্বস্তি করে, দুজনেই সুবিধা আদায়ের জন্য হাঁসফাঁস করে। তারপরে হুমায়ুন তাঁর প্রতিপক্ষের বাম চোখে নিজের ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠিপ্রবিষ্ট করাতে সমর্থ হয় এবং জোরে চাপ দিতে সে টের পায়। অক্ষিগোলক বিদীর্ণ হয়ে ভেতরের তরল পদার্থ বের হয়ে আসছে। ব্যাথার তীব্রতায় অধীর হয়ে সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই লোকটার মুষ্ঠিবদ্ধ হাত শীথিল হয়, এবং সেই সুযোগে হুমায়ুন আলমগীর বের করে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেটা প্রতিপক্ষের কুঁচকির গভীরে গেঁথে দিয়ে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে লোকটা আর্তনাদ করতে থাকে এবং তাদের পায়ের চাপে সৃষ্ট কর্দমাক্ত ডোবায় রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে সে।

হুমায়ুন তখনও তার শিবিরের দূরবর্তী সীমানা থেকে যুদ্ধের হট্টগোল যদিও ভেসে আসতে শুনে, কিন্তু তাঁর দেহরক্ষীর দল ইতিমধ্যে রাজমহিষীদের তাবু আক্রমণ করতে আসা বাকি লোকদের মনে হয় কাবু করতে পেরেছে। তারা সংখ্যায় বিশজনের মতো হবে। লোকগুলোর প্রত্যেকের পরণে কালো পোষাক এবং শিবিরের সীমানায় জোরাল আক্রমণের সুযোগ নিয়ে বোধহয় তারা গোপনে সেনাছাউনির একেবারে কেন্দ্রস্থলে এসে হাজির হয়েছিল। আক্রমণকারীদের কেবল একজন জীবিত রয়েছে।

দুজন প্রহরী দুদিক থেকে লোকটার দুহাত ধরে এবং হাঁটু ভেঙে তাঁকে যেখানে বসিয়ে রেখেছে সেদিকে ক্রোধে বিকৃত হয়ে উঠা মুখ নিয়ে হুমায়ুন দৌড়ে গিয়ে তার গলা চেপে ধরে এক ঝটকায় লোকটাকে তার পায়ের উপরে দাঁড় করায় এবং তার মুখের কাছে নিজের মুখ প্রায় ঠেকিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে, তোমরা কেন এটা করেছে? ন্যূনতম মর্যাদাবোধ রয়েছে এমন শত্রুও মেয়েদের আক্রমণ করবে না। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সবাই তাদের রক্ষা করবে। আমাদের ধর্মেও একথা বলা হয়েছে, এটাই নৈতিক শিষ্টাচারের মোদ্দাকথা। তোমার মৃত্যু নিশ্চিত কিন্তু তুমি যদি কথা বল তাহলে সেটা দ্রুত হবে- যদি না বল তাহলে মৃত্যুটা হবে একটা দীর্ঘ আর বিলম্বিত প্রক্রিয়া এবং এত তীব্র যন্ত্রণাদায়ক যে তিলে তিলে সেই যন্ত্রণা ভোগ করার চাইতে তুমি মৃত্যু ভিক্ষা চাইবে।

রাজমহিষীদের হত্যা করার কোনো অভিপ্রায় আমাদের ছিল না আমরা কেবল তাঁদের অপহরণ করতে চেয়েছিলাম বিশেষ করে আপনার ফুপুজানকে। তারিক খান আমাদের বলেছে তিনি আপনার সাথে রয়েছে এবং সাইবানি খানের হাতে তার বন্দী হবার গল্পটা সবাই ভালো করেই জানে। শেরশাহ বলেছে যে আমরা যদি তাকে বন্দি করতে পারি আপনি তাকে দ্বিতীয়বারের মতো অগ্নিপরীক্ষার হাত থেকে রেহাই দিতে যেকোনো শর্তে আপোষ করতে রাজি হবেন।

তারিক খান তাহলে সত্যিই তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য ক্রুদ্ধ আর হতাশ হুমায়ুন বন্দির গলা আরও শক্ত করে চেপে ধরে এবং নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি লোকটার কণ্ঠমণির উপরে স্থাপন করে তার গলাটা মোচরাতে থাকে যতক্ষণ না ঘাড় ভাঙার আওয়াজ শুনতে পায় এবং তাঁর গলা চিরে মৃত্যুর আর্তনাদ বুদ্বুদের মতো উঠে আসে। নিথর দেহটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সে আবারও খালি পায়ে কাদায় পিছলাতে পিছলাতে খানজাদার কাছে দৌড়ে যায়। বৃষ্টির অঝোর ধারায় সিক্ত হয়ে তরবারি হাতে তিনি তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছেন অবাক করা এক শান্ত অভিব্যক্তি তার চোখে মুখে এবং ঘুমাবার জন্য খুলে রাখা তার লম্বা ধুসর চুলের গোছা বৃষ্টিতে ভিজে অগণিত ইঁদুরের লেজে পরিণত হয়েছে।

আপনাকে ভালোভাবে রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমি লজ্জিত- আপনি কি আহত হয়েছেন?

একেবারেই না। আমার মনে হয় আমি প্রমাণ করতে পেরেছি যে তোমার আর তোমার আব্বাজানের মতো আমার ধমনীতেও তৈমূরের রক্ত বইছে। আক্রমণ যখন শুরু হয়, তখন আমি ভয় পাইনি কেবল ক্রুদ্ধ হয়েছি। আমি জানতাম আমাকে অবশ্যই গুলবদন আর তোমার যুবতী উপপত্নীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাবুর খুটিগুলো আমি তাদের ভেঙে ফেলতে বলি এবং তাবুর কাপড়ের নীচে তাঁদের লুকিয়ে থাকতে বলি যতক্ষণ তাঁরা বিপদ কেটে গেছে বলে নিশ্চিত হয়। ওদিকে তাকিয়ে দেখো। তাঁরা কেবল মাত্র বাইরে বের হয়ে আসছে।

মুষলধারে হতে থাকা বৃষ্টির মাঝে হুমায়ুন নিশ্চিতভাবেই তাবুর অতিকায়, আবৃত করা ভাজের নীচ থেকে সালিমাকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হতে দেখে, তার ঠিক পেছনেই রয়েছে গুলবদন আর অন্যান্য মেয়েরা। হুমায়ুন খানজাদাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে এবং জড়িয়ে ধরেই সে বুঝতে পারে যে এখন উপস্থায়ী বিপদের রেশ কেটে যেতে এবং তার মাঝে যুদ্ধের রক্ত গরম করা উন্মাদনা থিতিয়ে আসতে ফুপুজান এতক্ষণে কাঁপতে শুরু করেছেন।

জওহর, আহমেদ খানকে আমার সাথে দেখা করতে বল, এবং খোঁজ নাও যদি আমরা এখনও গঙ্গার বুকে নৌকা ভাসাতে পারি। যদি সেটা বাস্তবসম্মত হয়, মাঝি মাল্লাদের পক্ষে যতটা দ্রুত সম্ভব কয়েকটা নৌকা প্রস্তুত করতে আদেশ দাও যাতে করে আমার ফুপুজান, ভগ্নি, আর উপপত্নীদের নৌকা করে উজানে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে আসা যায়।

জওহর নৌকার সন্ধানে যাবার প্রায় সাথে সাথে আহমেদ খান দৌড়ে আসে।

আমাদের ছাউনির সীমানা এসব আক্রমণ কিভাবে ঠেকিয়েছে? হুমায়ুন জানতে চায়।

বেশ ভালোভাবেই মোকাবেলা করেছে, সুলতান। তাঁদের প্রবল প্রারম্ভিক আক্রমণের পরে যখন তাদের আক্রমণের তীব্রতা ছিল ভয়াবহ, শত্রুসেনা কিছুক্ষণের জন্য মনে হয় আক্রমণের মাত্রা হ্রাস করে যেন কিছু একটা ঘটার জন্য তাঁরা অপেক্ষা করছে।

রাজমহিষীদের তাবুতে তাঁদের হামলার সাফল্য জানবার জন্য… হুমায়ুন আপনমনে বিড়বিড় করে। তারা খুব বেশীক্ষণ আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে না। কিন্তু এর ফলে আমরা হয়তো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুছিয়ে নেয়ার সুযোগ পাব।

সুলতান। উজানের নদীপথ নিরাপদ। আমাদের নৌকা প্রস্তুত এবং প্রতিটা নৌকার জন্য দ্বিগুণ মাঝিমাল্লার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, জওহর ফিরে এসে দম নিতে নিতে সব খুলে বলে। অশ্বারোহী বাহিনীর একটা চৌকষ দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং তারা নদীর উত্তর দিকের তীর বরাবর নৌকার সাথে সাথে যাবে।

হুমায়ুন এবার খানজাদার দিকে তাকায়। ফুপুজান, আপনার এবার যাওয়া উচিত। আপনি নিজেকে এবং অন্য মহিলাদের রক্ষা করতে পারবেন আমি বিশ্বাস করি। আমি আপনাকে নৌকা বহরের নেত্রী হিসাবে নিয়োগ করছি। জওহর, মাঝিমাল্লা আর সৈন্যদের জানিয়ে দাও যে একজন মহিলার নির্দেশ পালন করাটা তাদের কাছে যতই বিচিত্র বলে মনে হোক, তারা নির্দ্বিধায় সেটা পালন করবে নতুবা আমার রোষের মুখে পড়বে।

তাদেরকে জওহরের কিছুই বলার দরকার নেই, দৃঢ় কণ্ঠে খানজাদা বলেন। বাবরের বোনের আদেশ তারা অবশ্যই পালন করবে। তুমি বিজয়ী হবার পরে আবার আমাদের দেখা হবে। নীতি বিবর্জিত বিশ্বাসঘাতক তারিক খানের কর্তিত মস্তক আমি দেখতে চাই আর আমার পায়খানার মেথর হওয়া থেকে শেরশাহকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। কথাটা শেষ করেই তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে কাদার উপর দিয়ে দ্রুত পায়ে গুলবদন আর অন্যান্য মেয়েরা যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে সেদিকে হেঁটে যায় তারপরে তাঁদের সাথে নিয়ে নদীর তীরের দিকে এগোতে থাকে, শীঘ্রই আলোআধারি আর বৃষ্টির মাঝে হারিয়ে যায়।

হুমায়ুন ভাবে, কি সাহসী এক মহিলা। তাঁর হাল্কা পাতলা আর যৌবন অতিক্রান্ত দেহে তৈমূরের রক্ত কত প্রবলভাবে উপস্থিত। তারিক খানের উপরে আস্থা রেখে এবং শেরশাহের বিলম্বিত উত্তরের কুশলতায় বিশ্বাস করে সে বোকামী করেছে, মারাত্মক বোকামী। সে কেন তাদের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আরও জোরালভাবে প্রশ্ন করেনি? হারেমের আনন্দের মাঝে গা এলিয়ে দিতেই কি সে বেশী আগ্রহী ছিল? তার মানসিক একাগ্রতার এই ঘাটতি তাকে অবশ্যই শারীরিক বীরত্ব দিয়ে পুষিয়ে দিতে হবে এবং তার লোকদের বিজয়ী হতে অনুপ্রাণিত করতে এটাকে ব্যবহার করবে।

আহমেদ খান আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে আরও বিশদ বিবরণী সংগ্রহ কর। জওহর আমার বর্ম এনে দিয়ে আমার ঘোড়া প্রস্তুত কর।

পনের মিনিটের ভিতরে হুমায়ুন নিজেকে যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করে ফেলে, এদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। বাবা ইয়াসভালের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সেনাপতি তার সাথে এসে যোগ দেয়। সুলতান, পরিস্থিতি মারাত্মক। শেরশাহ নতুন বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শুরু করেছে। আমরা কামানগুলোকে গুলি বর্ষণের অবস্থানে নিয়ে যেতে পারছি না। ওদিকে তাকিয়ে দেখেন। তাঁর আধিকারিকের হাতের নির্দেশের দিক অনুসরণ করে তাকিয়ে হুমায়ুন দেখে, গোলন্দাজবাহিনীর বেশ কয়েকজন সৈন্য তাঁর সবচেয়ে বড় ব্রোঞ্জের কামানটার সাথে বাঁধা ষাড়ের দুটো দলকে অবিশ্রান্তভাবে চাবুকাঘাত করছে এর মুখটাকে ঘুরিয়ে শত্রুর হুমকির মুখোমুখি করার প্রয়াসে। কিন্তু বিশালদেহী ষাড়গুলোকে যত জোরেই আঘাত করা হোক বা যতই তাদের তোয়াজ করা হোক, অতিকায় জম্ভগুলো কাদায় হোঁচট খেয়ে পিছলে গিয়ে থকথকে কাদার আরো গভীরে ডুবে যায়। দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো এবার ষাড়ের সাথে নিজেরাও পুরো শক্তি দিয়ে ঠেলতে চেষ্টা করে কিন্তু পরিস্থিতির বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয় না, মসৃণ বাদামী কাদায় অনেকেই কেবল খাড়া আছাড় খায়।

সুলতান, সবগুলো কামানের একই অবস্থা, বাবা ইয়াসভালো জানায়।

আমি আপনার কথা বিশ্বাস করছি। আর তাছাড়া এই বৃষ্টির ভিতরে তবকি বা গোলন্দাজ উভয়ের পক্ষেই বারুদ শুকনো রাখা বা পলিতায় আগুন দেয়া একটা কঠিন কাজ হত। আমাদের উচিত শীতল ইস্পাতের সনাতন অস্ত্র নিয়ে সম্মুখ সমরে নিজেদের সাহসিকতার উপরে নির্ভর করা। শত্রুর চেয়ে এখনও আমাদের লোকবল বেশী। আধিকারিকদের আদেশ দাও, তাৎক্ষণিকভাবে যতটা তাঁদের পক্ষে সম্ভব সর্বোচ্চ রক্ষণাত্মক অবস্থানে পদাতিক সৈন্যদের বিন্যস্ত করা শুরু করতে। অবরোধক হিসাবে মালগাড়ি, তাবু ব্যবহার কর…হুমায়ুন কথা শেষ করে না এবং তারপরে- তার ফুপুজান আর অন্যান্য রাজমহিষীদের বিপজ্জনক অবস্থান আর এর কারণ যে তাঁর নিজের আত্মতুষ্টি এবং অর্বাচীনসুলভ সরলতা সে সম্বন্ধে পুরোপুরি সচেতন সে যা তাঁদের বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে- আদেশ দেয়, অশ্বারোহী বাহিনীর আরেকটা শক্তিশালী বাহিনী- দশ হাজার সৈন্য যার অর্ধেক আমার নিজস্ব দেহরক্ষী বাহিনীর- রাজমহিষীদের নিরাপত্তা জোরদার করতে নদীর তীর বরাবর প্রেরণ কর।

কিন্তু সুলতান, এখানে তাদের আমাদের প্রয়োজন।

আমার আদেশের বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন করবে না। তাদের রক্ষা করার সাথে সম্মানের প্রশ্ন জড়িত।

বাবা ইয়াসভালো আর তর্ক না করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে একজন বার্তাবাহক প্রেরণ করে।

বাবা ইয়াসভালো, এবার আমাকে বলেন আমার উপস্থিতি কোথায় সবচেয়ে কার্যকর প্রতিপন্ন হবে?

সুলতান, উত্তরপশ্চিম দিকে ওখানে। শক্রর অশ্বারোহী বাহিনী আমাদের সীমানা বেষ্টনী ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে আমাদের পদাতিক সৈন্যদের আক্রমণ করেছিল যখন তারা তাদের তাবু ঘুমিয়ে ছিল এবং নিজেদের রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই নির্বিচারে অনেককে হত্যা করে। অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যায়। বাদশানি আর তাজিক সৈন্যরা দ্রুত এগিয়ে এসে জনবল বৃদ্ধি করার পরেই কেবল আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছি এবং সেটাও আমাদের মূল সীমানা থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে আসবার পরেই কেবল সম্ভব হয়েছে।

বেশ উত্তরপশ্চিম দিকেই যাওয়া যাক তাহলে। হুমায়ুন তার বিশাল কালো স্ট্যালিয়নে আরোহন করে এবং দেহরক্ষী বাহিনীর অর্ধেককে সাথে নিয়ে, যাদের সে রাজমহিষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রেরণ করেনি, সে যত দ্রুত সম্ভব উত্তরপশ্চিম প্রান্তের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে যায়। থকথকে কাদার কারণে মাঝে মাঝেই তাদের ঘোড়ার পেট পর্যন্ত কাদায় ডুবে যায়। এক অশ্বারোহী তাঁর বাহনকে যখন দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে, জন্তুটা হোঁচট খায় এবং উল্টে যায়, কাদায় আটকে যাবার কারণে সামনের পায়ে চিড় ধরে।

হুমায়ুনের সেনাছাউনির রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়া এলাকাটার কাছাকাছি পৌঁছাতে, সে লক্ষ্য করে যে তার সেনাপতিরা প্রায় ডজনখানেক রণহস্তিতে হাওদাযুক্ত করেছে এবং তাঁদের সামনে নিয়ে এসেছে। হাওদার চাদোয়ার কারণে আপাতদৃষ্টিতে অবিরাম বৃষ্টির হাত থেকে তার তবকিরা সামান্য হলেও রক্ষা পেয়েছে এবং তাদের লম্বা নলের বন্দুক ইন্ধন-বারুদ দিয়ে পূর্ণ করে গুলি করতে সক্ষম হয়েছে আর শেরশাহের আক্রমণকারীদের বেশ কয়েকজনকে ধরাশায়ী করেছে। তবকিদের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে, হুমায়ুনের পদাতিক বাহিনী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে উল্টে রাখা মালবাহী গাড়ির আড়াল ব্যবহার করে সেখান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর নিক্ষেপ করছে এবং শেরশাহের লোকদের পর্যায়ক্রমে বাধ্য করছে হুমায়ুনের বিশালাকৃতি পাঁচটা কামানের পিছনে আশ্রয় নিতে যেগুলো তারা তাঁদের প্রথম আক্রমণের সময়ে বিধ্বস্ত করেছিল।

হুমায়ুন সম্মুখবর্তী অবস্থানে যখন উপস্থিত হয় সে তার লোকদের সাহস যোগাতে চিৎকার করে উঠে। আমার অসীম সাহসী যোদ্ধার দল, তোমাদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ। শত্রুর আক্রমণ তোমরা প্রতিহত করেছে। এখন সময় হয়েছে আমাদের পরাক্রান্ত কামানগুলোকে পুনরায় দখল করার। শেরশাহের উদ্ধৃঙ্খল লোকজনদের সেগুলো বয়ে নিয়ে যাবার সুযোগ দিলে সেটা আমাদের জন্য চরম অপমানের বিষয় হবে। আমি নিজে তোমাদের নেতৃত্ব দেব। মাহুতের দল নিজ নিজ হাতি নিয়ে এগিয়ে যাও। বীর তকির দল, আমার জন্য ঐসব উদ্ধত উচ্ছল দস্যুদের আরও বেশী বেশী ধরাশায়ী কর।

হুমায়ুন রণহস্তীর সম্মুখে অগ্রসর হওয়া আরম্ভের জন্য অধীর হয়ে অপেক্ষা করে। অবশেষে হাতীর দল, কাদার ভিতর দিয়ে টলমল করতে করতে অগ্রসর হতে আরম্ভ করে এবং তাঁদের পিঠে স্থাপিত হাওদাগুলো এতোবেশী আন্দোলিত হয় যে তবকিদের ভীষণ অসুবিধা হয় লক্ষভেদের জন্য নিজেদের অস্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে। হুমায়ুন হাত নেড়ে অশ্বারোহী বাহিনীকেও অগ্রসর হতে বলে। বেদখল হওয়া কামানগুলোর দিকে অগ্রসর হবার সময়ে হুমায়ুন লক্ষ্য করে ব্রোঞ্জের সবচেয়ে বড় কামানগুলোর একটার আড়াল থেকে শেরশাহের গোলন্দাজ বাহিনীর কিছু সদস্য তাঁর পদাতিক বাহিনীর বাদামি-ধুসর বর্ণের একটা তাবুর ভেতর দৌড়ে প্রবেশ করে, যা আপাতদৃষ্টিতে তাঁর সৈন্যরা পিছু হটে আসার পরেও অক্ষত রয়েছে। গোলন্দাজ বাহিনীর সেই লোকগুলো সহসা তাবুর সামনের অংশটা টেনে সরিয়ে ফেলতে দেখা যায় তাঁদের দখলকৃত ষষ্ঠ কামানটা সেখানে অবস্থান করছে যা তারাই ভালো বলতে পারবে কিভাবে তারা সেটাকে তাবুর ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়েছে এবং গোলাবর্ষণের উপযুক্ত করে ফেলেছে। কালক্ষেপন না করে, গোলন্দাজ বাহিনীর এক সৈন্য, বেজন্মাটা এতোক্ষণ তাবুর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল, কামানের পলিতায় অগ্নি সংযোগ করে।

বিকট একটা শব্দ আর বেলাভূমিতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের মতো সাদা ধোয়া উদগীরন করে কামানের মুখের ভেতর থেকে ধাতব গোলাটা ছিটকে বের হয়ে এসে, হুমায়ুনের আগুয়ান হস্তিবাহিনীর একেবারে সামনের হাতিটার গম্বুজাকৃতি কপালের ঠিক মধ্যেখানে মোক্ষমভাবে আঘাত করে। মারাত্মকভাবে আহত হাতিটা, সাথে সাথে পথের একপাশে উল্টে পড়ে, জন্তুটার পিঠের হাওদা স্থানচ্যুত হয় আর ভেতরে অবস্থানরত তবকির দল মাটিতে আছড়ে পড়ে, তাঁদের হাত-পায়ের অবস্থা সঙ্গীন। বহরের পেছনের হাতিগুলো এবার আতঙ্কিত হয়ে উঠে এবং মাটিতে আছড়ে পড়া তবকিদের একজনকে পায়ের নীচে কাদায় পিষে দিয়ে, সোজা সামনের দিকে দৌড়াতে আরম্ভ করে। হাতির সম্মুখগতির উপরে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সে যখন আপ্রাণ চেষ্টা করছে, জন্তুটা ভয়ে মাথা পেছনে হেলিয়ে রেখে, শুড় আকাশের দিকে তুলে, ভয়ে বিকট ডাক ছাড়ছে এবং হাতিটার দুইজন মাহুতের একজন জন্তুটার গলা থেকে ছিটকে যায় কিন্তু অপরজন কোনোমতে আকড়ে থাকে এবং মনে হয় যেন সে তার আরোহন করা হাতিকে সংযত করতে সক্ষম হয়েছে।

হুমায়ুনের সমস্ত মনোযোগ অবশ্য যে কামানটা থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়েছে। সেটার প্রতি নিবদ্ধ। গোলন্দাজের দল পাগলের মতো সেটাকে পুনরায় গোলাবর্ষণের জন্য প্রস্তুত করতে চেষ্টা করছে। গুড়ো পদার্থ ভর্তি একটা কাপড়ের ব্যাগ তারা লোহার সিন্দুক থেকে বের করেছে যা ব্যাগটাকে শুষ্ক রেখেছে এবং কামানের নল বরাবর তারা সাফল্যের সাথে গুড়ো পদার্থটা ঠেসে ঢুকিয়ে দেয়। গুড়ো পদার্থটা ব্যারেলে ঠেসে দেয়ার পর তাদের দুজন এবার কামানের একটা ধাতব গোলা নিয়ে সেটা ব্যারেল বরাবর গড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত হয় ঠিক এমননি সময় হুমায়ুন তাঁদের সেই জটলার কাছে পৌঁছে। তার বিশাল কালো ঘোড়ার পর্যানের পিঠে ঝুঁকে নীচু হয়ে বসে, হুমায়ুন আলমগীরের প্রথম আঘাতেই কামানের গোলা ধরে থাকা লোকটা হাত প্রায় দ্বিখণ্ডিত করে দেয়। কামানের গোলাটা নিয়ে সে মাটিতে আছাড় খেয়েছে, তার ক্ষতস্থানসমূহ থেকে পুনরায় রক্তপাত শুরু হয়েছে। হুমায়ুন অপর লোকটা মুখমণ্ডল লক্ষ্য করে তরবারি চালায় কিন্তু গোলন্দাজ বাহিনীর লোকটা নিচের মাথার উপরে হাত দিয়ে আঘাতটা প্রতিহত করে। সে যাই হোক, মারাত্মকভাবে জখম হাত নিয়ে লোকটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং দৌড়াতে শুরু করে। লোকটা কয়েক কদমও যেতে পারে না তার আগে হুমায়ুনের হাতের তরবারি তার গায়ের শেকলের তৈরী বর্মের ঠিক উপরে আর মাথার চূড়াকৃতি শিরোম্রাণের ঠিক নীচে উন্মুক্ত ঘাড়ের মাংসে কোপ বসায়, এবং সে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। ইত্যবসরে হুমায়ুনের দেহরক্ষীর দল শত্রুপক্ষের অন্য গোলন্দাজদের হয় হত্যা করেছে কিংবা পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে আর তার তবকিরা হাতির পিঠ থেকে নামতে শুরু করেছে।

দারুন দেখিয়েছে। পদাতিক বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যদের অগ্রসর হয়ে কামারগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার আদেশ দাও। আমাদের সাফল্য তাঁদের নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে। সেনাছাউনির কেন্দ্রে এবার আমাকে ফিরে যেতে হবে।

কথা শেষ করে, হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে, চিটচিটে কাদার ভিতর দিয়ে আক্রমণ করার ধকলে বেচারার নাক দিয়ে হাপরের মতো বাতাস বের হয়, তাঁর লাল নিয়ন্ত্রক তাবুর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। সে যখন কামানগুলো আক্রমণ করতে ব্যস্ত সেই ফাঁকে বৃষ্টির বেগ কখন যেন থিতিয়ে এসেছে ফলে দৃষ্টিগ্রাহ্যতা অনেক পরিষ্কার হয়েছে, এখন বৃষ্টি প্রায় নেই বললেই চলে। হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, সেনাছাউনির কেন্দ্র থেকে সে তাঁর অবস্থান আরও জোরাল করার জন্য পরবর্তী আদেশ প্রদানে সক্ষম হবে।

সে অবশ্য তার তাবুর উদ্দেশ্যে অর্ধেকটা পথও অতিক্রম করেছে কি করেনি এমন সময় জওহর দ্রুত ঘোড়া দাবড়ে এসে উপস্থিত হয়। সুলতান, সে রুদ্ধশ্বাসে বলে, বাবা ইয়াসভালো আমাকে বলে পাঠিয়েছেন যে আপনি যদি অনুগ্রহ করে দক্ষিণপশ্চিম সীমানার দূরবর্তী অংশ একবার দর্শন করেন। গঙ্গার তীর বরাবর শেরশাহের বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। তারা ইতিমধ্যে আমাদের সম্মুখের প্রতিরক্ষা ফাঁড়ি ভেদ করে ভিতরে প্রবেশ করেছে এবং সেনাপুরঃসর অগ্রদল আমাদের তড়িঘড়ি করে বিন্যস্ত দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা বুহ্যের কাছে অবস্থান করছে।

হুমায়ুন সাথে সাথে তাঁর কালো ঘোড়ার মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং উৎসুক জন্তুটা তাঁর প্রয়োজনীয়তা বুঝতে সম্ভবত পশ্চিম দিক বরাবর নিখুঁত সারিতে বিন্যস্ত তাবুর মাঝ দিয়ে দুলকি চালে ছুটতে শুরু করে, হুমায়ুনের লোকেরা অপ্রত্যাশিত আক্রমণকারীদের প্রতিহত করতে এই তাবুগুলো থেকেই ছুটে গিয়েছিল। জওহর আর তার দেহরক্ষীর দল তাকে অনুসরণ করে।

হুমায়ুন খুব শীঘ্রই যুদ্ধের শোরগোল আর আর্তনাদ বৃদ্ধি পেতে শুনে এবং তারপরে একটা নীচু ঢাল বেয়ে উঠে এসে নীচের দিকে গঙ্গার প্রশস্ত কর্দমাক্ত পাড়ে একটা বিশৃঙ্খল দৃশ্যপটের দিকে তাকায়। শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর বেশ কয়েকটা দল তাদের প্রথম প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে চলে এসেছে এবং তাঁর অশ্বারোহী বাহিনী প্রাণপনে এখন চেষ্টা করছে তাদের ঘিরে ফেলতে বা প্রতিরক্ষা ব্যুহের বাইরে তাদের তাড়িয়ে দিতে। অশ্বারূঢ় অন্যান্য আধিকারিকেরা তাদের হাতের উত্তোলিত তরবারি আন্দোলিত করে চেষ্টা করছে তার পদাতিক সৈন্যদের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে সৃষ্ট ফাঁকগুলোকে পূরণ করতে উৎসাহিত করতে কিন্তু তাঁদের প্রয়াস খুব একটা সফল হচ্ছে বলে মনে হয় না। বস্তুতপক্ষে পদাতিক সেনাদের কেউ কেউ তাদের হাতের গোলাকার ঢাল আর লম্বা বর্শা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, যা দিয়ে তারা সজ্জিত, পিছনের দিকে পালিয়ে আসতে শুরু করেছে।

এসবের চেয়েও ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, তাঁর টলমল করতে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যুহের মাইলখানেক দূরে শেরশাহের বিশাল আরেকটা অশ্বারোহী বাহিনী প্রস্তুত হচ্ছে আক্রমণ করার অভিপ্রায়ে। এই বাহিনীটার কেন্দ্রস্থলে উজ্জ্বল নিশান আর পতাকার একটা জটলা দেখা যায় এবং হুমায়ুনের কাছে এটা নিশ্চিত প্রতিয়মান হয় যে স্বয়ং শেরশাহ সেখানে রয়েছেন এবং নিজের শক্রদের শেষপর্যন্ত পরাভূত করতে নিজেই এই আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন।

জওহর, ব্যাটাদের মোকাবেলা করার জন্য আমরা নিজেদের প্রস্তুত করতে খুবই অল্প সময় পেয়েছিলাম। বাবা ইয়াসভালো আর আমার অন্যসব সেনাপতিরা কোথায়?

সুলতান আপনার খোঁজে আমি যখন এখান থেকে যাই, বাবা ইয়াসভালো তার কয়েকজন তরুণ আধিকারিকের সাথে এই ঢালের একটু সামনে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু তিনি আমাকে বলেছিলেন পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক যে তিনি আপনার আগমনের জন্য হয়ত অপেক্ষা করতে পারবেন না তার আগেই প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করা শত্রুপক্ষের অশ্বারোহী বাহিনীকে আক্রমণ করবেন। দূরে ওখানে ঐ ঘোড়সওয়ার বাহিনীর অগ্রভাগে ওটা কি তারই হলুদ নিশান, আমাদের শত্রুদের একটা দলকে দাবড়ে নিয়ে যাচ্ছে?

জওহর তোমার দৃষ্টিশক্তি অসাধারণ। তাঁকে গিয়ে বল ওখানে ঐ ধুসর তাবুর জটলার কাছে আমার সাথে যত বেশী সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সম্ভব আমার সাথে দেখা করতে। আমার অন্য সেনাপতিদের তলব করে বার্তাবাহক প্রেরণ কর যারা তাদের অধীনস্ত সৈন্য নিয়ে আপাতত আক্রমণ বন্ধ করে এখানে আমার সাথে এসে যোগ দিতে পারবে। আমরা শেরশাহের অগ্রাভিযান সরাসরি মোকাবেলা করবো। তাবুর চারপাশের মাটি এখান থেকে বেশ শক্তই মনে হচ্ছে আমাদের প্রারম্ভিক আক্রমণ জোরদার করে শত্রুর ক্ষতিসাধন করতে আমরা আমাদের ঘোড়াগুলোকে ওখান। থেকে প্রয়োজনীয় গতিতে ছোটাতে পারব।

পরবর্তী দশ মিনিটের ভিতরে হুমায়ুন নিজের চারপাশে তার বেশ কয়েকজন সেনাপতিকে সমবেত দেখে। বাবা ইয়াসভালের মতো- যিনি যুদ্ধে তার শিরোস্ত্রাণ হারিয়েছেন এবং তার মাথার ক্ষতস্থানে একটা হলুদ বর্ণের রক্তরঞ্জিত কাপড় জড়ান- আরও কতজন আহত হয়েছেন কিংবা নিখোঁজ রয়েছেন চিন্তা করে তাঁর মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। সুলেমান মির্জা কোথায়?

শত্রুর অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত অবস্থায় একটা বর্শার আঘাতে তিনি শহীদ হয়েছেন, সুলতান।

আর আহমেদ খান?

মারাত্মকভাবে আহত। শেরশাহের আক্রমণের প্রথম প্রহরে তিনি যখন শিবিরের বেষ্টনী পরিদর্শন করছিলেন তখন দুটো তীর এসে তার উরুতে বিদ্ধ হয়। রক্তক্ষরণের কারণে দুর্বল অবস্থায় তার কয়েকজন সৈন্য তাঁকে খুঁজে পায় এবং আরও অন্যান্য আহতদের সাথে তাঁকে গঙ্গার অপর পাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে আপনি যাদের মোতায়েন রেখেছেন আপাতত তারাই তাঁর যত্ন নিচ্ছে।

নিজেদের নিয়তি আর সাহসের উপর ভরসা করে, এসব সাহসী যোদ্ধাদের উপস্থিতি ছাড়াই আমাদের যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে।

হুমায়ুন নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে যে তার সেনাপতিরা শেরশাহের পরবর্তী আক্রমণ প্রতিহত করতে, হাজার পাঁচেক অশ্বারোহীর একটা মোটামুটি বাহিনী প্রস্তুত করেছে, তার প্রতিপক্ষের সৈন্যসারিতে সহসা ব্যস্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে আক্রমণ শুরু হতে বেশী দেরী নেই।

শেরশাহের বাহিনী অগ্রসর হবার সাথে সাথে আমরাও এগিয়ে যাব। আমাদের তাঁদের সমাবেশের ঠিক মাঝামাঝি আক্রমণের লক্ষ্য স্থির করবো, আমার বিশ্বাস তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন। আমরা যদি তাঁকে হত্যা বা বন্দি করতে পারি তাহলে তার লোকেরা মনোবল হারিয়ে ফেলবে। আমাদের চরম ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও দিনের শেষে তাহলে আমরাই বিজয়ী হব…

মুহূর্ত পরে, শেরশাহ তার অশ্বারোহী বাহিনীর মাঝে গতির সঞ্চার করে, দুলকি চালে গতিবেগ বৃদ্ধি করতে করতে তাঁরা হুমায়ুনের প্রতিরক্ষা ব্যুহের দিকে ধেয়ে আসে। হুমায়ুন অলঙ্কারখচিত ময়ান থেকে আলমগীর বের করে আনে এবং মাথার উপরে সেটা আন্দোলিত করে চিৎকার করে বলে, আক্রমণ কর! মনে রাখবে পশ্চাদপসারণের চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়।

শীঘ্রই কাদা আর উঁচু নীচু জমির উপর দিয়ে যতটা দ্রুত সম্ভব তার বাহিনী ছুটতে শুরু করে। হুমায়ুনকে বহনকারী লম্বা, কালো ঘোড়াটা, সমস্ত সকালের পরিশ্রমের পরেও তাঁকে তাঁর বাহিনীর একেবারে সামনে রেখে, প্রতি মুহূর্তে প্রতিপক্ষের নিকটবর্তী করে তুলে, যারা নিজেরাও উদ্যত সঙ্গীন হাতে ছুটে আসছে নিজেদের সেনাপতির মহিমা কীর্তনে শের, শের রব তুলে।

হুমায়ুনের সব ভাবনা চিন্তা এই মুহূর্তে আসন্ন যুদ্ধের নিরীখে কেন্দ্রীভূত, সে তার কালো স্ট্যালিয়নের ঘাড় বরাবর নীচু হয়ে আসে, আর তার দৃষ্টি স্থির হয়ে থাকে শেরশাহের আস্কন্দিত বেগে আগুয়ান বাহিনীর একেবারে কেন্দ্রস্থলে যেখানে ইস্পাতের উজ্জ্বল বর্ম পরিহিত একজন কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত লোক সাদা একটা ঘোড়ায় চেপে বিচরণ করছে আর চিৎকার করে সবাইকে উৎসাহিত করছে। লোকটা শেরশাহ ছাড়া আর কেউ নয়। হুমায়ুন তাঁর ঘোড়ার লাগাম আরও একবার টেনে ধরে নিজেকে শেরশাহ বরাবর ধাবিত করে। কয়েক মিনিটের ভিতরে দুটো সরলরেখা আপতিত হয়। হুমায়ুন শেরশাহকে লক্ষ্য করে আলমগীর দিয়ে কোপ বসায় কিন্তু তরবারির ধারাল ফলা শত্রুর ইস্পাতের বর্মে পানিতে উড়ন্ত চাকতির মতো পিছলে যায় আর পর মুহূর্তে তার নিজ নিজ ভরবেগের কারণে পৃথক হয়ে যায়।

সহসা, হুমায়ুনের মনে হয় একটা বাদামী ঘোড়ায় সে বোধহয় বিশ্বাসঘাতক তারিক খানকে এক ঝলকের জন্য দেখতে পেয়েছে, এখনও বর্মের নীচে তাঁর চিরাচরিত গাঢ় সবুজ বর্ণের আলখাল্লা রয়েছে। হুমায়ুন তাঁর ঘোড়া নিয়ে তারিক খানের দিকে ধেয়ে যায়। যদিও সামনে পেছনে চক্রাকারে ঘুরতে থাকা একদল বিশৃঙ্খল ঘোড়া আর তরবারির ফলায় মৃত্যু নিয়ে পরস্পরকে আঘাতরত তাদের আরোহীদের কারণে তাঁর গতি বিঘ্নিত হলেও, হুমায়ুন ঠিকই সবুজ আলখাল্লা পরিহিত লোকটার কাছে পৌঁছে। তারিক খানই বটে লোকটা।

তারিক খান, তুমি বাঁচার অধিকার হারিয়েছে। আমাকে মোকাবেলা কর এবং মানুষের মতো মৃত্যুবরণ কর, যেমন পিচ্ছিল সাপের মতো তোমার চরিত্র সেভাবে নয়। কথাটা শেষ করেই হুমায়ুন আঘাত করে কিন্তু তারিক খান একেবারে শেষ মুহূর্তে ঢালটা তুলে আঘাতটা এড়িয়ে যায় আর একই সাথে নিজের দোধারি রণকুঠার দিয়ে হুমায়ুনকে লক্ষ্য করে পাগলের মতো কোপ বসায়। হুমায়ুন চিৎ হয়ে তার পর্যানে শুয়ে পড়তে কুঠারের ফলা বাতাসে মৃত্যুর শিস তুলে তার উপর দিয়ে পার হয়ে যায় কিন্তু সেই ফাঁকে হুমায়ুন কুঠার দিয়ে বেপরোয়া আঘাত করতে গিয়ে অরক্ষিত হয়ে পড়া তারিক খানের বাহুমূলে আলমগীরের ফলা আমূল ঢুকিয়ে দেয়। ব্যাথায় চিৎকার করে উঠে তারিক খান হাত থেকে কুঠারটা ফেলে দেয় এবং বাহুমূল থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এসে তার গাঢ় সবুজ আলখাল্লাকে ভিজিয়ে দেয়, সে বোধহয় তার ঘোড়র উপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে যা তাঁকে নিয়ে ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যায়। মুহূর্ত পরেই হুমায়ুন তাঁকে তাঁর ঘোড়ার পর্যান থেকে পিছলে পেছনের দিকে পড়ে গিয়ে কাদায় অন্য ঘোড়ার খুরের নীচে পিষে যেতে দেখে। হুমায়ুন ভাবে, সব বিশ্বাসঘাতকদের এই পরিণতিই হওয়া উচিত।

নিজের চারপাশে তাকিয়ে সে টের পায় যে তার বেশীর ভাগ দেহরক্ষী তাঁর কাছ থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছে, কিন্তু মুষ্টিমেয় যে কয়জন তখনও রয়েছে কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার করে তাঁদের অনুসরণ করতে বলে সে তার কালো ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয়, বিশাল জন্তুটার সারা দেহ এখন সাদা, ফেনার মতো ঘামে চুপচুপ করছে, শেরশাহের ঘোড়া তাঁকে যেদিকে নিয়ে যেতে পারে বলে তার ধারণা সেই অভিমুখে সে এবার ঘোড়া ছোটায়। সে যখন ঘোড়া নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আরোহীবিহীন একটা ঘোড়া, পেছনের পায়ে তরবারির আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতস্থান থেকে অঝোরে রক্ত ঝরছে, তার নিজের ঘোড়ার ডানপাশে এসে ধাক্কা দিতে জন্তুটার গতিপথ বদলে যায় এবং এক মুহূর্তের জন্য হুমায়ুনের বর্ম আবৃত উরু পর্যানের সাথে চাপা খেলে সে ব্যাথায় চোখে মুখে অন্ধকার দেখে। তারপরে, আর্তস্বরে চিহি করে উঠে আরেকদিকে ঘুরে গিয়ে হুমায়ুনের অবশিষ্ট দেহরক্ষীদের একজনের দিকে এগিয়ে যায়। দেহরক্ষীর ঘোড়াটা হুমড়ি খেয়ে মাটিতে আছড়ে পরার সময়ে পিঠের আরোহীকে মাটিতে আছড়ে ফেললে বেচারা ঘাড়ের উপরে ভর দিয়ে মাটিতে পড়ে। আঘাতের ফলে তার মাথার চূড়াকৃতি শিয়োস্ত্রান খুলে গিয়ে মাটিতে দুতিন গড়ান দিয়ে একপাশে কাত হয়ে পড়ে থাকে।

হুমায়ুন তার ঘোড়র উপরে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে, সে বিশাল জটাকে লড়াই যেদিকে ভীষণ রূপ ধারণ করেছে, সেদিকে এগিয়ে যাবার জন্য পা দিয়ে গুতো দেয়। সহসা মাথার উপরের আকাশ বজ্রপাতের শব্দে বিদীর্ণ হয় এবং সেইসাথে আবারও অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়, বৃষ্টির ভারী ফোঁটা মাটির খানাখন্দে জমে থাকা পানিতে আছড়ে পড়ে এবং হুমায়ুনের শিরোস্ত্রানের কিনারা বেয়ে নেমে এসে তাঁর চোখ ভাসিয়ে দেয়। সে তার হাতের চামড়ার দস্তানা খুলে এবং ডান হাত তুলে বৃষ্টির ঝাপটা সরিয়ে দিয়ে চোখ মুছে। কিন্তু চোখ মোছায় ব্যস্ত থাকার কারণে সে তার দিকে ধেয়ে আসা কালো আলখাল্লা পরিহিত দুই অশ্বারোহীকে সময় মতো লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয় যতক্ষণ না তারা তার উপরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ার উপক্রম করে। সে আক্রমণকারীদের দেখতে পেলে দ্রুত একপাশে সরে গিয়ে প্রথমজনের আক্রমণ এড়িয়ে যায় কিন্তু তার অরক্ষিত কব্জি আর হাতের পেশীকে দ্বিতীয়জনের তরবারির আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে না, এবং তরবারিটা তার বর্মের নীচে দিয়ে পিছলে গিয়ে তার কনুইয়ে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। কালো ঘোড়াটা তাঁকে তাঁর আততায়ীদের কাছ থেকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে আসে, যাঁরা কাদামাটির কারণে তাকে খুব একটা দ্রুত অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়।

হুমায়ুনের আহত ডান হাত থেকে অঝোরে রক্ত ঝরতে থাকে এবং তাঁর আঙ্গুল বেয়ে নেমে এসে তৈমূরের আংটি ঢেকে ফেলে। সে তার বাম হাত দিয়ে গলায় জড়ান দুধ সাদা রঙের গলবস্ত্রটা খুলতে চেষ্টা করে, সেটা দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করবে বলে কিন্তু সে গলবস্ত্রটা খুলতে পারে না। তার ডান হাতের অবশ আঙ্গুলগুলো কোনমতে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে রাখে। তাঁর মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতে থাকে এবং চোখের সামনে সাদা আলোর ঝলসানি ভেসে উঠে। নিজের এই উদভ্রান্ত অবস্থার ভিতরে সে কোনোমতে নিজের চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে তার আশেপাশে কোনো দেহরক্ষী উপস্থিত নেই। পরিস্থিতি নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিন্তু এভাবে মৃত্যুবরণ করাটা অবশ্যই তার নিয়তি হতে পারে না। পরাজয় অনিবার্য নয়। নিজের লোকদের পুনরায় একত্রিত করার জন্য তাকে অবশ্যই তাদের কাছে ফিরে যেতে হবে। হুমায়ুন শরীরের শেষ শক্তিটুকু একত্রিত করে লাগামটা টেনে ধরে হাঁপাতে থাকা, পরিশ্রান্ত ঘোড়ার মুখ তার অবশিষ্ট লোকেরা যেদিকে অবস্থান করছে বলে চেতন অচেতনের মাঝে ভাসতে ভাসতে তার মনে হয় সেদিকে ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সে ঘোড়াটার পাঁজরে গুঁতো দিয়ে তাঁকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে ইঙ্গিত করে, সামনের দিকে ঝুঁকে গিয়ে জটার প্রশস্ত কালো গলার উপরে এলিয়ে পড়ে, বাম হাতে জন্তুটার পেষল গলার কেশর আকরে ধরতে তার চোখের মণি থেকে চেতনার শেষ রেশটুকুও উধাও হয়ে যায়।

*

সুলতান।

উজ্জ্বল আলোয় হুমায়ুনের চোখ খোলার চেষ্টা করতে ধবধবানি বেড়ে যায় এবং সে পুনরায় তাদের অর্ধনিমীলিত করে ফেলে। সে যখন পুনরায় চেষ্টা করে তখনও একই দীপ্তি বিরাজ করে। অবশেষে সে বুঝতে পারে যে চিৎ হয়ে শুয়ে সে মধ্যাহ্নের সূর্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

সুলতান। সেই একই কণ্ঠস্বর আবার ভেসে আসে এবং অনিশ্চিত ভঙ্গিতে একজোড়া হাত তার কাঁধ ধরে মৃদুভাবে ঝাঁকায়। তাঁর পরণে এখন আর কোনো রকমের বর্ম নেই। সেসব কোথায় গেল? সে কি তবে ধরা পড়েছে? সে ক্রমশ ধাতস্থ হয়ে উঠার মাঝেই মাথা ঘুরিয়ে কণ্ঠস্বরটার কার খুঁজে দেখতে চেষ্টা করে এবং ধীরে ধীরে একটা বাদামী রঙের মুখাবয়ব তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠে, যেখানে তার জন্য উদ্বেগের একটা অভিব্যক্তি ফুটে রয়েছে।

আপনি কে?

হুজুর আমার নাম নিজাম। আমি আপনার সেনাবাহিনীর একজন নগন্য ভিত্তি।

আমি এখন কোথায়?

সুলতান, আপনি গঙ্গার তীরে শুয়ে আছেন। চামড়ার মশকে নদী থেকে যখন পানি সংগ্রহ করছিলাম আপনার সৈন্যদের কাছে নিয়ে যাবার জন্য তখন আমি আপনার বিশাল কালো ঘোড়াটাকে এখান থেকে মাইলখানেকের দূরত্বে অবস্থিত যুদ্ধক্ষেত্রের দিক থেকে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখি, আপনি ঘোড়ার গলা জড়িয়ে অচেতন হয়ে আছেন। ঘোড়াটা যখন আরো নিকটে আসে এর হাটু নিজে থেকেই ভাঁজ হয়ে যায় আর জন্তুটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ঘোড়াটা যখন ভূপতিত হতে যাচ্ছে তখন আপনি এর পিঠ থেকে পিছলে মাটিতে পড়ে যান।

ঘোড়াটা এখন কোথায়? আমার লোকেরাই বা কোথায়?

ঘোড়াটা দূরে ওখানে পড়ে রয়েছে। মৃত অবস্থায়। সুলতান আমার মনে হয় জন্তুটা ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল যদিও বেচারার সারা গায়ে অসংখ্য ছোটখাট ক্ষত রয়েছে আর পশ্চাদভাগে একটা গভীর ক্ষতস্থান।

হুমায়ুনের নিজেকে খানিকটা সুস্থ মনে হতে সে বাম কনুইয়ের উপরে ভর দিয়ে নিজেকে একটু উঁচু করে এবং দেখে যে সত্যিই তার কালো স্ট্যালিয়নটা বিশ গজ দূরে জীহ্বা বের করা অবস্থায় গলা সামনের দিকে প্রসারিত করে মাটিতে পড়ে রয়েছে। কালচে-সবুজ রঙের ডুমো মাছির একটা ঝাক ইতিমধ্যে জন্তুটার মুখ, নাসারন্ধ্র আর অন্যান্য ক্ষতস্থানের কাছে ভীড় করতে শুরু করেছে।

আর আমার লোকেরা?

শেরশাহের বাহিনী পেছন থেকে ধাওয়া করতে যারা অনেককেই তাদের পর্যান থেকে মাটিতে আছড়ে ফেলেছে, আপনার বেশীর ভাগ লোক নদীর তীর বরাবর পূর্ব দিকে পালিয়েছে। নদী এখান থেকে সিকিমাইল দূরত্বে যেখানে অগভীর অনেকে সেখান দিয়ে নদী পার হয়ে অপর পাড়ে চলে গিয়েছে যেখানে এখনও আপনার কিছু সংখ্যক সৈন্য অবস্থান করছে।

আমাকে কি কেউ অনুসরণ করেনি?

না। আর বিশেষ করে এই স্থানটা কর্দমাক্ত আর ঢালু হবার কারণে সহজে দেখা যায় না, তাই এখন পর্যন্ত কেউ এখানে আসেনি। সুলতান, আপনি কি একটু পানি পান করবেন?

আছে, একটু দাও। সহজাত প্রবৃত্তির বশে মশকের জন্য হুমায়ুন হাত বাড়িয়ে দেয়। হাতটা আড়ষ্ট আর বোধহীন হয়ে আছে। খণ্ডযুদ্ধ আর নিজের আহত হবার ঘটনা তার মনে পড়ে। তার বামহাতের ক্ষতস্থানে পটি বাঁধা। পটির দিকে তাকিয়ে সে দেখে- যে গলবটা সে খুলতে ব্যর্থ হয়েছিল সেটা দিয়েই সাদা কাপড়টা দিয়েই পটিটা বাঁধা হয়েছে; আর ক্ষতটা যেখানে গভীর সেখানে মনে হয় যেন একটা চ্যাপ্টা পাথরজাতীয় কিছু রয়েছে।

আমাকে পান করতে সাহায্য কর।

নিজাম তাঁর সবচেয়ে বড় মশকের মুখ থেকে ছিপি খুলে, মশকটার আকার আর আকৃতি দেখে মনে হয় ছোট একটা ছাগলের পুরো চামড়া দিয়ে সেটা তৈরী করা হয়েছে। হুমায়ুনের মাথার নীচে হাত দিয়ে, নিজাম তাঁর মুখে একটু একটু করে পানি ঢালতে থাকে। হুমায়ুন দ্রুত পান করে এবং আরেকটু দিতে বলে। প্রতিটা চুমুকে যেন সে নবজীবন লাভ করে।

ক্ষতস্থানে কি তুমি পটি বেঁধেছো?

জ্বী, সুলতান। যুদ্ধের শেষে আমি হেকিমদের কাজ করতে দেখেছি এবং একজন আমাকে বলেছিল যে গভীর ক্ষতস্থান চেপে রেখে রক্তপাত বন্ধ করার জন্য চ্যাপ্টা পাথর বেশ কাজে দেয়।

পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে বুদ্ধিটা কাজে দিয়েছে। তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছে।

তুমি কিভাবে জানো যে আমিই তোমাদের সম্রাট?

আপনার আঙ্গুলের ব্যাঘখচিত অঙ্গুরীয় আর আপনার কোমরের রত্নখচিত তরবারি দেখে। সেনাছাউনিতে ঐ দুটো জিনিষের গল্প আমি প্রচুর শুনেছি।

হুমায়ুনের মাথা এখন পুরোদমে কাজ করছে এবং উঠে বসতে গিয়ে সে টের পায় সে অঙ্গুরীয় কিংবা তার আব্বাজানের তরবারি আলমগীর, যা সে অথবা নিজাম অবশ্যই পুনরায় কোষবদ্ধ করেছে, দুটোই তাঁর সাথে আছে।

আকাশে মধ্যাহ্নের সূর্য দোর্দণ্ডপ্রতাপে বিরাজমান হবার কারণে ভেজা মাটি থেকে নির্গত বাষ্পের সাথে সকালের কুয়াশার একটা অদ্ভুত মিল রয়েছে। নিজের ত্রাণকর্তার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখতে হুমায়ুন লক্ষ্য করে যে নিজাম লোকটা আসলে, যার পরণে কেবল একটা কালো জোব্বা রয়েছে, কৃশকায় আর ছোটখাট এবং সারা গায়ে শুকিয়ে যাওয়া কাদা লেগে রয়েছে, তের কি চৌদ্দ বছরের একটা কিশোর। সে ইচ্ছা করলেই হুমায়ুনের সর্বস্ব হরণ করে পালিয়ে যেতে পারতো কিন্তু সেটা না করে সে নিছক আনুগত্যের খাতিরে তার সাথে রয়েছে। হুমায়ুন পরিষ্কার বুঝতে পারে যে- যদিও যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে যে বিষয়ে সে মোটামুটি নিশ্চিত- তাঁর আব্বাজানের দেয়া সৌভাগ্যবান নামের মহিমা সে এখনও ধারণ করছে। একটা পরাজয়ে কিছুই নির্ধারিত হবে না। বাবর অনেক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর মনে আছে বাবর প্রায়ই বলতেন বিপর্যয়ের সাথে তোমাকে এভাবেই মানিয়ে নিতে হবে। হুমায়ুনের মাথাটা আবার হঠাৎ করে ঝিমঝিম করে উঠে। নিজেকে সে বর্তমানে ফিরিয়ে আনে, সে খুব ভালো করেই জানে যে তার প্রথম কাজ এখন নিজের সেনাবাহিনীর সাথে পুনরায় মিলিত হওয়া।

নিজাম, সবচেয়ে কাছে কোথায় আমার সৈন্যরা আছে?

আপনাকে আগেই আমি বলেছি, নদীর এই পাড়ে যারা ছিল তাঁরা সবাই পালিয়েছে। কিন্তু অপর তীরে এখনও বিপুল সংখ্যায় তারা অবস্থান করছে- ঐ যে দেখেন। ধোয়া উঠতে থাকা কর্দমাক্ত তীর আর নদীর মাঝে বিদ্যমান চরের অপর পাশে নিজাম আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। হুমায়ুন সেখানে অশ্বারোহী লোকদের বিশাল একটা দলকে দেখতে পায়।

তুমি নিশ্চিত তারা আমার লোক?

জ্বী, সুলতান। এপাড় থেকে অনেকেই সাতরে ওপাড়ের ঐ দলটার সাথে যোগ দিয়েছে।

হুমায়ুন ভাবে, নিজাম নিশ্চয় ঠিকই বলছে। শেরশাহ তাঁর সৈন্যদের পাশ কাটিয়ে গিয়ে, নদী অতিক্রম করে পেছন থেকে যাতে তাঁকে অতর্কিতে আক্রমণ করতে না পারে সেজন্য অপর পাড়ে একদল সৈন্য মোতায়েন করে সে বুদ্ধিমানের মতো কাজ করেছে।

আমাকে অবশ্যই তাদের সাথে মিলিত হতে হবে। হুমায়ুন কথার মাঝে টলমল করতে করতে উঠে দাঁড়ায় কিন্তু তার পা দেহের ভার নিতে গিয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে এবং আবার তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠে।

সুলতান, আমার উপরে ভর দিয়ে দাঁড়ান।

নিজামের হাড়সর্বস্ব কাঁধে হুমায়ুন খুশী মনে নিজের বাম হাত রাখে। আমাকে নীচে পানির কাছে যেতে সাহায্য কর যাতে আমি সাঁতরে নদী পার হতে পারি।

কিন্তু আপনি ভীষণ দুর্বল। আপনি ডুবে যেতে পারেন।

আমার চেষ্টাটা করতেই হবে। শত্রুর হাতে ধরা পড়াটা আমার জন্য দারুণ অসম্মানের একটা ব্যাপার হবে।

নিজাম চারপাশে তাকায় এবং নিজের সবচেয়ে বড় দুটো ছাগলের চামড়ার মশকের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষিত হয় আর সে হুমায়ুনের দিকে তাকায়। সুলতান আপনি কি কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন? মনে হয় আমি একটা বুদ্ধি পেয়েছি।

হুমায়ুনের কাছ থেকে সম্মতি লাভ করতে, সে দৌড়ে মশকের কাছে যায় এবং ছিপি খুলে মশক দুটো খালি করে। তারপরে, হুমায়ুনকে বিস্মিত করে, সে বড় মশকটা তুলে নিয়ে সেটার মুখে নিজের ঠোঁট রাখে এবং ফুঁ দিতে শুরু করতে, তার চোখ দুটো ঠিকরে কপাল থেকে বের হয়ে আসতে চায় এবং গালের চামড়া ফুলে উঠে। কিছুক্ষণ পরে হুমায়ুন দেখে যে মশকটা ফুলতে শুরু করেছে এবং অচিরেই মশকটার চামড়া বাতাসে টানটান হয়ে উঠে। নিজাম ছিপি দিয়ে মুখটা বন্ধ করে এবং মশকটা হুমায়ুনের কাছে নিয়ে এসে, দ্রুত অপর মশকটাকেও একইভাবে ফুলিয়ে তোলে এবং খেলাচ্ছলে সেটার গায়ে একটা টোকা দিয়ে আপন মনেই হেসে উঠে। এটা দিয়েই কাজ হবে। সুলতান যা করার আমাদের দ্রুত করতে হবে। শেরশাহের লোকেরা খুব শীঘই লুটপাট করতে তাদের শত্রুদের মৃতদেহের খোঁজে চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে। আমি আপনার বর্ম লুকিয়ে রেখেছি ফলে আলো পড়ে সেটা চকচক করবে না কিন্তু তারা নদীর পাড় তন্নতন্ন করে খুঁজবে।

আমি জানি কিন্তু আমাকে প্রথমে তুমি আমার সাহসী ঘোড়াটার কাছে নিয়ে চল। আমি নিশ্চিত হতে চাই যে সে মারা গেছে নতুবা তার দুর্দশা থেকে আমি তাকে মুক্তি দিতে চাই। সে আমার অনেক যুদ্ধের সাথী আর নিজের দায়িত্ব সে দারুনভাবে পালন করেছে। ঘোড়াটার কাছে গিয়ে এক ঝলক তাকিয়েই হুমায়ুন বুঝতে পারে যে কালো স্ট্যালিয়নটা আসলেই মারা গেছে। তারপরে নিজামের কাঁধে ভর দিয়ে সে নদীর উঁচু নীচু পাড়ের ভিতর দিয়ে নদী অববাহিকার দিকে এগিয়ে যায়। সে ক্লান্তিতে দুবার বসে পড়ে কিন্তু প্রতিবারই নিজাম- বাতাস ভর্তি মশক দুটো নিয়েই বেচারা হিমশিম খাচ্ছে- তাঁকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে। দশ মিনিট প্রাণান্তকর পরিশ্রমের পরে এই অসম জুড়ি গঙ্গার তীরে এসে পৌঁছে। নিজাম বাতাস ভর্তি মশক দুটো হুমায়ুনের দিকে এগিয়ে দেয়।

নিজাম, তোমাকে ধন্যবাদ। এবার দ্রুত পালাও আর নিজের প্রাণ বাঁচাও।

না, সুলতান, আমি আপনার সাথে থাকবো নতুবা আপনি পানিতে ডুবে যাবেন।

বেশ মরার যখন এতোই শখ, তাহলে আগে আমার পায়ের নাগরা দুটো খুলে দাও, হুমায়ুন নদীর তীরে শোয়া আর বসার মাঝামাঝি বিচিত্র এক ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে। নিজাম দ্রুত মোটা চামড়ার তৈরী ভারী নাগরা জোড়া টেনে খুলে দেয়, তার নিজের জন্য চিন্তা নেই কারণ সে আজীবনই খালি পায়ে হেঁটেই অভ্যস্ত এবং হুমায়ুনকে ধরে হাঁটুপানিতে নিয়ে আসে।

সুলতান, আপনার ভালো হাত আর পা দিয়ে সাঁতার কাঁতে চেষ্টা করবেন। আপনার ডান হাতের নীচে বাতাস ভর্তি একটা মশক রাখতে চেষ্টা করবেন আর দ্বিতীয়টা রাখবেন আপনার থুতনির নীচে। আমি আপনাকে সাতারের দিক ঠিক রাখতে সাহায্য করবো।

তারা ধীরে ধীরে সাঁতার কাঁতে থাকে, একটা সময়ে হুমায়ুনের মনে হয় তারা বোধহয় মাঝ নদীতে এসে পৌঁছেছে। পানিতে ভিজে যাওয়াও তাঁর আহত ডান হাতে আবারও তীব্র যন্ত্রণা শুরু হয় কিন্তু ব্যাথার ঝাপটায় তার মাথা পরিষ্কার কাজ করতে শুরু করে। সে কোনোভাবেই মারা যাবে না- এটা তার নিয়তি না- আর সে। আরও দ্রুত নিজের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে প্রাণপনে পা ঝাপটাতে শুরু করে। পানিতে নামার পরে খুব ভালো করেই নিজামের গুরুত্ব টের পাওয়া যায় এবং হুমায়ুনকে টেনে কখনও ধাক্কা দিয়ে অপর তীড়ের দিকে তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। কয়েক মিনিট পরে, নদীর দক্ষিণ তীর থেকে তাঁরা যখন মাত্র পাঁচ গজ দূরে নিজাম হঠাৎ করে আতঙ্কিত হয়ে উঠে পা দিয়ে পাগলের মতো পানিতে আঘাত করে আর হাত দিয়ে হুমায়ুনকে টানতে থাকে। সুলতান, একটা কুমীর- ব্যাটা নির্ঘাত আপনার ক্ষতস্থান থেকে বের হওয়া রক্তের গন্ধ পেয়েছে। বদমাশটার সুচালো মাথা আমাদের ঠিক পেছনেই রয়েছে। জলদি!

হুমায়ুন দ্রুত দুবার হাত ঝাপটায় এবং সে পায়ের নীচে মাটি খুঁজে পায়, নরম কাদা তার পায়ের পাতার নীচে পিছলে যেতে থাকে। নিজামকে পাশে নিয়ে নিজের শেষটুকু একত্রিত করে সে পানিতে জবজবে হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে টলমল করে পানি থেকে উঠে আসে।

সুলতান, আমাদের পাড়ের আরেকটু ভিতরে যেতে হবে।

নিজামের সাহায্যে হোঁচট খেতে খেতে হুমায়ুন আরও দশ গজ হেঁটে যায়। আপাত নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে, সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে কুমীরটার হলুদাভ চোখ আর তীরে একেবারে নিকটে সুচালো মাথাটা পানিতে ভেসে রয়েছে দেখতে পায়। তার চোখের সামনেই সরীসৃপটা মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং একটা মোচড় খেয়ে গভীর পানিতে তলিয়ে যায়। কুমীরটা বেশ ছোট তাঁকে হয়তো ধরাশায়ী করতে পারতো না কিন্তু ব্যাপারটা সে পর্যন্ত গড়ায়নি বলে সে ভাগ্যকে ধন্যবাদ জানায়।

সুলতান, আমি গিয়ে আপনার সেনাপতিদের খুঁজে বের করি এবং আপনার আহত হবার সংবাদ তাদের জানাই আর আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য তাদের লোক পাঠাতে বলি। আমি আমার বাবাকে খুঁজতে- তারপরে আবার সাঁতরে নদী পার হব। সেনাছাউনির অস্থায়ী রন্ধনশালায় সে রাঁধুনির কাজ করে এবং শেরশাহের প্রথম আক্রমণের পর থেকে আমি আর তাকে দেখিনি।

কিন্তু এতোক্ষণ তুমি আমাকে এসব কিছুই বলনি।

আমি জানি প্রথমে আপনাকে সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।

তোমার সাহসিকতা আর আনুগত্যের উপযুক্ত পুরষ্কার আমি যেন তোমাকে দিতে পারি সেজন্য আমার সাথে তোমাকে যেতে হবে।

না, সুলতান- আমার বাবাকে আমায় খুঁজে পেতেই হবে। নিজাম উত্তর দেয়, তাঁর কচি মুখে একটা অটল সংকল্প ফুটে আছে।

হুমায়ুনের মাথায় একটা অদ্ভুত চিন্তা খেলে যায়। আবেগতাড়িত হয়ে সে নিজের অজান্তে ভাবনাটা বলে যায়। ভিস্তিদের মাঝে প্রতিপালিত হলেও তুমি স্বভাবে একজন যুবরাজ। আমি আমার রাজধানীতে যখন ফিরে যাব, আমার সাথে দেখা করবে এবং সেখানে আমার সিংহাসনে উপবেশন করে সত্যিকারের সম্রাটের মতো এক কি দুই ঘন্টার জন্য রাজত্ব পরিচালনা করবে। তুমি যে আদেশ দেবে সেটাই পালন করা হবে।

নিজামকে বিভ্রান্ত দেখায় এবং তারপরে সে ফিক করে হেসে উঠে আর খুশীতে তোতলাতে তোতলাতে, জ্বী সুলতান, বলে সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে গঙ্গার তীরের কর্দমাক্ত আর উঁচুনীচু পাড়ের উপর দিয়ে হুমায়ুনের অবশিষ্ট সেনাবাহিনীর খোঁজে দৌড়ে যায়।

২.২ একটি প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন

০৭. একটি প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন

চৌসার দুই দিন আগের রণক্ষেত্র থেকে গঙ্গার বিশ মাইল উজানে হুমায়ুন নিজের অস্থায়ী সেনাশিবিরে তাঁর সেনাপতিদের ভিতরে যারা তার চারপাশে উপস্থিত রয়েছে তাদের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে থাকে। সুলেমান মির্জার মৃত্যুর খবর সে আগেই শুনেছে এবং সেদিন তার সাথে আরও যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের সবার রুহের মাগফেরাত কামনায় গভীর শ্রদ্ধাভরে সে মোনাজাতে অংশ নেয়। বাবা ইয়াসভালো এখানে উপস্থিত রয়েছে যদিও হুমায়ুনের চেয়েও মারাত্মকভাবে তিনি আহত। তার চেয়েও বিস্ময়কর, ফ্যাকাশে মুখ আর দড়িরমতো বাদামী শ্মশ্রুমণ্ডিত আহমেদ খানের উপস্থিতি। তার আহত উরুতে ভারী পটি বাঁধা এবং কাঠের শক্তপোক্ত দেখতে একটা ক্রাচে ভর দিয়ে তিনি ভীড়ের ভিতরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

নিজাম গঙ্গার তীরে হুমায়ুনকে রেখে যাবার কয়েক মিনিটের ভিতরেই তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর একটা দল তাঁর কাছে উপস্থিত হয়। হাকিমেরা তাঁর হাতের ফাঁক হয়ে থাকা লম্বা আর গভীর ক্ষতস্থানের মুখ ধুয়ে সেলাই করে তারপরে ঔষধি লাগিয়ে সেটার উপরে স্বচ্ছ মসলিনের পটি বেঁধে দিয়েছে কিন্তু ব্যাথানাশক হিসাবে সে আফিম গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। এই মুহূর্তে পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা তার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সে নিজের আঙ্গুল নাড়াতে পারছে দেখে ভাগ্যের কাছে কৃতজ্ঞবোধ করে কিন্তু ক্ষতস্থানটা প্রায়ই আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠে, কখনও সেখানে কোনো বোধ থাকে না আর যতবারই আহত হাতটা কোনো কিছু স্পর্শ করে ততবারই অবর্ণনীয় একটা ব্যাথায় তার সারা শরীর আপ্লুত হয়ে উঠে। কিন্তু এসব সত্ত্বে এযাত্রায় প্রাণে বেঁচে যাবার জন্য সে মনে মনে সুষ্ঠাকে ধন্যবাদ জানায়। যুদ্ধে সে ভীষণভাবে পরাজিত হয়েছে কিন্তু নিজের হারান ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে সে বদ্ধ প্রতিজ্ঞ ঠিক যেমন তাঁর আব্বাজান বাবর বিরুদ্ধতার মুখোমুখি হয়ে যেভাবে তা মোকাবেলা করতেন।

আহমেদ খান, শেরশাহের সর্বশেষ গতিবিধির কি খবর? সে জানতে চায়।

সে চৌসার পরে আর অগ্রসর হয়নি। সে আর তার লোকেরা এই মুহূর্তে আমাদের ফেলে আসা সিন্দুকের ধনসম্পদ ভাগাভাগি আর গঙ্গার কর্দমাক্ত তীরে কাদায় ডুবে থাকা কামানগুলো পানির আরো গভীরে তলিয়ে যাবার আগে সেগুলো উদ্ধার করতেই ব্যস্ত। তারও আমাদের মতে, প্রচুর সৈন্য নিহত হয়েছে। অন্যেরা লুটের মালের বখরা বুঝে নিয়েই হয়ত দেশের দিকে সটকে পড়বে।

আহমেদ খান, তুমি এসব বিষয়ে একদম নিশ্চিত? গতবার শেরশাহের হতবাক করে দেয়া আক্রমণ সম্বন্ধে তুমি আমাদের আগাম অবহিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলে।

জ্বী, সুলতান, আহমেদ খান মাথা নীচু করে এবং পুনরায় কথা বলার পূর্বে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শেরশাহ শান্তি চায়, আমাদের অনেকের মতো, আমাকেও এই ধারণাটা বিভ্রান্ত করেছিল। আমি তারপরেও গুপ্তদূত প্রেরণ করেছিলাম কিন্তু যতটা তৎপর হওয়া উচিত ছিল আমি সেটা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছি। আর আমি যাদের প্রেরণ করেছিলাম সম্ভবত তারাও খুব একটা সতর্ক ছিল না…আর তারপরে আবহাওয়ার এই অবস্থায়…এবং শেরশাহের বাহিনীর দ্রুতগতি

হুমায়ুন হাত তুলে আহমেদ খানের আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়াস থামিয়ে দেয়। হুমায়ুন, যা ঘটে গিয়েছে তার দায়দায়িত্ব বিচার বিবেচনা না করেই খানিকটা হলেও অনুগত আর মারাত্মকভাবে আহত আহমেদ খানের উপরে চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সেটা করা অনুচিত হবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার অধিকারী, প্রধান সেনাপতি আর সম্রাট সে নিজে। ব্যাথা আর ক্ষতস্থান শুকাতে শুরু করায় আরম্ভ হওয়া চুলকানির কারণে ঘুমাতে না পেরে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে নিজেকে অনবরত প্রশ্ন করতে থাকে, কেন তাকে এভাবে পরাজয় বরণ করতে হল। মানুষের উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে খানজাদা তাঁকে যেমন বারবার অনুরোধ করেছে সে কি সেসবের তোয়াক্কা না করে বড় বেশী অহঙ্কারী হয়ে পড়েছিল, সে যা শুনতে চায় কেবল সেটাই শোনার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল। সে জানে যে সে আত্মতুষ্টিতে আপ্লুত হয়ে পড়েছিল কিন্তু তাঁর রণনীতিতেও কি কোনো খুঁত ছিল? অবশ্য, অতীত রোমন্থন করে সে নিজেকে বিষণ্ণ করে তুলতে চায় না বরং পরাজয়ের এই তিক্ততা কাটিয়ে এহেন পরিস্থিতির যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেটাই নিশ্চিত করতে চায়। এই বিষয়ে সে স্থিরপ্রতিজ্ঞ। বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে রাজ্য শাসনের অভিপ্রায় তার মাঝে আরও তীব্র হয়ে উঠে।

আহমেদ খান, আমি তোমাকে দোষারোপ করছি না কিন্তু ভবিষ্যতে নদীর উভয় তীরে যেন আমাদের যতবেশী সম্ভব গুপ্তদূত মোতায়েন থাকে। আমার ফুপুজান এবং অন্যান্য রাজমহিষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের সঙ্গে অবস্থানকারী সেনাবাহিনীর কি খবর?

এতে বিপর্যয়ের ভিতরে একমাত্র সুসংবাদ কেবল তাদের কাছ থেকেই এসেছে। অবিশ্রান্ত বৃষ্টিপাতের ভিতরেও তারা বেশ দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলেছে এবং আশা করছে সাত কি আট সপ্তাহের ভিতরে তাঁরা আগ্রা পৌঁছে যাবে।

বেশ। বাবা ইয়াসভালের দিকে ঘুরে এবার হুমায়ুন জিজ্ঞেস করে, আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে আমাকে বলেন।

সুলতান, আমাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছে। আমাদের পঞ্চাশ হাজারেরও বেশী সৈন্য হয় মৃত নতুবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে বা পালিয়ে গেছে, এবং আমরা সেইসাথে নিদেনপক্ষে প্রায় সমসংখ্যক ঘোড়া, হাতি আর বারবাহী পশুও হারিয়েছি। আমরা আমাদের কয়েকটা মাত্র কামান নিয়ে আসতে পেরেছি এবং সেগুলোর বেশীরভাগই আবার ছোট। যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য গচ্ছিত অর্থ আর অন্যান্য যুদ্ধ উপকরণের সিংহভাগও আমরা খুইয়েছি।

আমি এমনটাই আশঙ্কা করছিলাম। নিজেদের সংগঠিত আর সুসজ্জিত করতে আমাদের সময় দরকার। আমাদের মিত্রদের মনে বিদ্রোহ বা স্বপক্ষ ত্যাগের মতো কোনো প্রকার হঠকারী ভাবনা সৃষ্টি হবার আগেই তাদের আশ্বস্ত করতে আমাদের দূত প্রেরণ করা উচিত। শেরশাহের মতো, আমরাও ঠিক এই মুহূর্তে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার মতো অবস্থায় নেই। আমাদের উচিত হবে, গঙ্গার তীর বরাবর আমাদের অগ্রযাত্রা বজায় রাখা। এই ধরনের পশ্চাদপসারণে কোনো লজ্জা নেই যদি সেটা বিজয়ের পূর্বাভাস ঘোষণা করে, আর আমাদের কর্তব্য হবে সেটাই নিশ্চিত করা।

*

বৃষ্টিপাত যদিও থেমে গেছে এবং সূর্য এখন আকাশে স্বমহিমায় বিরাজমান থাকায়, হুমায়ুনের দরবার কক্ষের সামনের প্রাঙ্গণের ফোয়ারাগুলোর বুদ্বুদে রঙধনুর মাত্রা সৃষ্টি হয়েছে, আগ্রা দূর্গে তাঁর দর্শনার্থী কক্ষ এখনও জলীয় বাষ্পের কারণে ভেজা আর চিকচিক করছে। চৌসার সেই ভাগ্যবিড়ম্বিত যুদ্ধের পরে প্রায় চারমাস অতিক্রান্ত হয়েছে। হুমায়ুন আগ্রার দক্ষিণে প্রায় একশ বিশ মাইল দূরে শেরশাহের যেকোনো অপ্রত্যাশিত অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করতে নিজের মূল বাহিনীকে মোতায়েন রেখে, সে নিজে রাজধানী আগ্রায় ফিরে এসেছে আরও সৈন্য সংগ্রহ করতে।

আগ্রা পৌঁছাবার পরে সেখানে তার জন্য আরও দুঃসংবাদ অপেক্ষা করেছিল। বাংলায় শেরশাহজনিত কারণে তার ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ আর তার মিত্র লোদীদের রাজ্যাভিযোগী পাহাড়ের গোপন আশ্রয় ছেড়ে নেমে এসে গুজরাতের শক্তঘাঁটি থেকে সেখানে হুমায়ুনের রেখে আসা শাসক আর তাদের সামান্য সংখ্যক সৈন্যদের বিতাড়িত করেছে। হুমায়ুন বুঝতে পারে যে তাঁর পক্ষে দুটো রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করা অসম্ভব, সে তাঁর উজির এবং তাঁর মরহুম আব্বাজানের সময়ে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ দৌত্য অভিযানে অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ কাশিমকে গুজরাতে প্রেরণ করে একটা শান্তি চুক্তির ব্যাপারে আলোচনা করতে। গুজরাত যদি তাকে তাদের নামেমাত্র অধিরাজ হিসাবে স্বীকার করে নেয় তাহলে সে গুজরাতের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার ফিরিয়ে দিতে রাজি আছে।

এক সপ্তাহ পূর্বে ক্লান্ত, ধূলায় ধুসরিত কিন্তু কান পর্যন্ত বিস্তৃত হাসি নিয়ে কাশিম তাঁর ঘোড়া থেকে নেমে হুমায়ুনকে বলে যে গুজরাতের সুলতান তার প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি হয়েছেন। দরবারে অপেক্ষমান অমাত্য আর সেনাপতিদের সাথে মিলিত হতে দূর্গ প্রাঙ্গন অতিক্রম করার সময় হুমায়ুন অন্যান্য আরও উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির কথা বিবেচনা করে। তাঁর সৎ-ভাইয়েরা তাদের নিজ নিজ প্রদেশ থেকে আপাতত অল্প সংখ্যক সৈন্যের দল প্রেরণ করেছে ভবিষ্যতে আরও বেশী সংখ্যক সৈন্য প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কামরান আর তাঁর অন্যান্য সৎ-ভাইদের ভিতরে অন্তত এখনও পর্যন্ত তার দুর্ভাগ্যকে তারই বিরুদ্ধে বিদ্রোহের উসিলা হিসাবে ব্যবহারের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বরং শেরশাহের বিদ্রোহ যেন তাদের ভাইদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। হুমায়ুন নিজেকে আশ্বস্ত করতে চায়, সবকিছু আবার আগের মতো হবে এবং তার মুখে হাল্কা হাসির একটা আভাস ফুটে উঠে।

হঠ যাও। মহামান্য সুলতানের কাছাকাছি যাবার কথা কল্পনাও করতে যেও না।

হুমায়ুন ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পেছনে যেখান থেকে চিৎকারটা এসেছে সেদিকে তাকায়। দীর্ঘকায়, কালো পাগড়ি পরিহিত এক প্রহরী তার সাথে ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকা একটা ছোটখাট অবয়বের কব্জি শক্ত করে ধরে রেখেছে।

তিনি আমাকে আসতে বলেছেন- দুই এক ঘন্টার জন্য তাঁর সিংহাসনে আমাকে বসতে দেবেন।

বাছা রোদে কি তোমার মাথা ঘুরে গিয়েছে? তাঁকে অসম্মান করলে- কপাল যদি ভালো হয় তাহলে তোমাকে কেবল চাবকে ছেড়ে দেয়া হবে আর খারাপ হলে হাত আর পা বেঁধে হাতির পায়ের নীচে ফেলে দেয়া হবে।

হুমায়ুন প্রহরীর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করতে মোচড়াতে থাকা দৃঢ় কণ্ঠের অধিকারী অবয়বের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। অবয়বটা আর কারও না, তার প্রাণ রক্ষাকারী ভিস্তি নিজামের।

ওকে আসতে দাও। প্রহরী সাথে সাথে আদেশ পালন করে এবং নিজাম হুমায়ুনের সামনে মাথা নত করে হাটু ভেঙে বসে পড়ে।

নিজাম, তুমি উঠে দাঁড়াতে পার। গঙ্গা অতিক্রম করতে আর চৌসার রণক্ষেত্রে তুমি আমাকে কিভাবে সাহায্য করেছিলে আমার সেটা ভালোই মনে আছে। আমার এটাও মনে আছে কোনো পুরষ্কারের জন্য তুমি কিভাবে নিষেধ করেছিলে এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আমি বলেছিলাম যে সামান্য সময়ের জন্য তুমি আমার সিংহাসনে উপবেশন করতে পারবে আর সে সময়ে তোমার যেকোনো আদেশ পালন করা হবে। হুমায়ুনের দেহরক্ষী আর সেখানে উপস্থিত অমাত্যবৃন্দ যাদের ভিতরে কাশিম আর বাইসানগারও রয়েছেন যারা দরবার কক্ষে যাবার তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন সবাই নিজেদের ভিতরে বিস্মিত দৃষ্টি বিনিময় করে কিন্তু হুমায়ুন তাঁদের সবার বিস্মিত দৃষ্টি উপেক্ষা করে। আমাদের অস্থায়ী সম্রাটের পক্ষে মানানসই একটা আলখাল্লা নিয়ে এসো, হুমায়ুন জওহরকে আদেশ দিতে, কয়েক মিনিটের ভিতরে সে লাল মখমলের তৈরী একটা আলখাল্লা এবং একই উপকরণ দিয়ে তৈরী সোনার জরি দিয়ে কারুকাজ করা পরিকর এনে হাজির করে।

নিজাম তার চারপাশে গোলাপজলের বুদ্বুদ উঠতে থাকা ঝর্ণা আর দূর্গ প্রাঙ্গণের ফুলের বাগানের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। তাকে এখন আর আগের মতো আত্মবিশ্বাসী দেখায় না এবং জওহর আলখাল্লা হাতে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে সে গুটিয়ে যায়।

নিজাম, ভয় পেয়ো না। হুমায়ুন কিশোর ছেলেটার কাঁধ চাপড়ে দেয়। অনায়াসে নিজের সবচেয়ে প্রিয় অভিপ্রায় সবসময়ে সিদ্ধ হয় না। জওহরের হাত থেকে আলখাল্লাটা নিয়ে সে নিজে সেটা নিজামকে পরিয়ে দেয় এবং কোমর আর ডান কাঁধের রূপার বকলেস এঁটে দিয়ে পরিকরটা নিজামের ছোটখাট দেখতে অবয়বের চারপাশে জড়িয়ে দেয়। মখমলের আলখাল্লায় ঝাঁকড়া মাথার কিশোর ভিস্তিকে হয়ত খানিকটা হাস্যকর দেখায় কিন্তু নিজাম সোজাভাবে উঠে দাঁড়ালে তাঁর মস্তকবাহী দেহখাঁচায় উপযুক্ত মর্যাদা ফুটে উঠে।

চল, এবার এগোন যাক। হুমায়ুন দরবার হলের বাইরে অবস্থানরত ঢাকির দিকে তাকিয়ে ঈষৎ মাথা নোয়াতে, সম্রাটের আগমন বার্তা ঘোষণা করে, তারা সাথে সাথে সোনার উপরে নীলকান্তমণির কারুকাজ করা কাঠামোতে রক্ষিত মোষের চামড়া দিয়ে মোড়ান লম্বা ঢাকে হাতের তালু দিয়ে বোল তুলতে আরম্ভ করে।

নিজাম এসো, আমরা দুজন একসাথে যাই- তুমি এক ঘন্টার সম্রাট, আমি কবর পর্যন্ত নেতৃত্বের বোঝা বহনের জন্য জন্ম নেয়া সম্রাট।

হুমায়ুনের অমাত্য আর সেনাপতিরা যেখানে অপেক্ষা করছে সেই দরবার হলের দিকে হুমায়ুন আর নিজাম শোভাযাত্রা সহকারে এগিয়ে যায়। সিংহাসনের দিকে তারা এগিয়ে যাবার সময়, হুমায়ুন থমকে থেমে নিজামকে আলতো করে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়। বিস্ময়ের একটা তুমুল শব্দের ভিতরে, নিজাম ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সিংহাসনে আরোহন করে, ঘুরে দাঁড়ায় এবং সবশেষে উপবেশন করে।

হুমায়ুন হাত তুলে নিরবতা বজায় রাখতে বলে। চৌসার বিপর্যয়ের পরে আমার জীবন বাঁচাবার জন্য, এই কিশোর নিজাম ভিস্তির আনুগত্য আর সাহসিকতার কথা আমি পুরো দরবারের সামনে কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার করছি। আমি নিজামকে সেদিন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে আমার সিংহাসনে কিছুক্ষণের জন্য আরোহন করে সে তার ইচ্ছামতো যেকোনো ঘোষণা করতে পারবে। সে ইতিমধ্যে নিজেকে এর যোগ্য হিসাবে প্রতিপন্ন করেছে এবং আমি জানি, তাঁর হাতে আমি যে ক্ষমতা তুলে দিয়েছি সেই ক্ষমতার সে অপব্যবহার করবে না। নিজাম- কি তোমার অভিপ্রায়?

হুমায়ুন কৌতূহলী হয়ে উঠে। নিজাম নিজের জন্য কি চাইবে? অর্থসম্পদ, জমিদারী নাকি ধনরত্ন? সে অবশ্যই জানে যে তাঁর জীবন এবং তার পরিবারের সবার জীবন আর কখনও আগের মতো থাকবে না। নিজামের অভিপ্রায় মঞ্জুর করতে পেরে তাঁর ভালো লাগে।

সুলতান… সিংহাসনের উপর থেকে নিজামের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ আর কীচকী শোনায়। নিজামও বোধহয় সেটা বুঝতে পারে, সে আবার চেষ্টা করে। সুলতান। তার কিশোর কণ্ঠ এইবার স্পষ্ট আর যথার্থভাবে ধ্বনিত হয়। আমি কেবল দুটো আদেশ করতে চাই। গঙ্গার তীরে আমি যেন অনুদান হিসাবে একখণ্ড জমি লাভ করি যেখানে আমি শস্য উৎপাদন করতে পারবো এবং এক বছরের জন্য সব ভিস্তিদের কর মুওকুফ করা হোক।

হুমায়ুন চাপা হাসির একটা গুঞ্জন শুনতে পায়। এমনকি কাশিমের সচরাচর গম্ভীর, আত্মনিরোধী মুখেও যেন একটা ক্ষীণ হাসির রেশ ফুটে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, কিন্তু নিজামের অনুদ্ধত অনুরোধ হুমায়ুনকে আবেগপ্রবন করে তুলে। দরবারের অনেকের মতো সে নিজেকে মাত্রাতিরিক্ত রকমের সম্পদশালী করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেনি।

আপনার আদেশ যথাযথভাবে পালিত হবে।

আমিও তাহলে সিংহাসন থেকে নেমে আসতে প্রস্তুত। নিজাম লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, তাঁর ক্ষুদ্র অবয়বে স্বস্তির একটা রেশ ফুটে উঠে, এবং হোঁচট খাওয়া থেকে বিরত থাকতে দুহাতে আলখাল্লাটা গোড়ালীর উপরে তুলে ধরে আলতো পায়ে নেমে আসে। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন অনুধাবন করে সত্যিকারের সাহস কাকে বলে সে এই প্রত্যক্ষ করেছে। দরবারে এসে হুমায়ুনকে নিজের প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার কথা বলার জন্য নিজামকে কি বিশাল একটা ঝুঁকি নিতে হয়েছিল? সে ভালো করেই জানতো, তাঁর কথা হয়ত হুমায়ুন ভুলেই গেছেন বা তার ঔদ্ধত্যের কারণে তিনি কুদ্ধও হতে পারেন। ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকা ছেলেটার প্রতি সেই প্রহরী যদি চিৎকার না করতো তাহলে চেঁচিয়ে সম্রাটকে জবাবদিহি করতে বলার ধৃষ্টতা চাবুকের মূল্যে পরিশোধ করার কিংবা নিজের হঠকারীতার জন্য তাঁর মৃত্যুদণ্ড হবারও একটা সমূহ সম্ভাবনা ছিল।

হুমায়ুন এবার সিংহাসনে আরোহন করে। পুনরায় সম্রাটের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আমিও এবার কিছু আদেশ করতে চাই। আদেশগুলো হল নিজাম ভিস্তিকে এমনভাবে জমির অনুদান দেয়া হোক যাতে সে নিজে এবং তার পুরো পরিবার স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপন করতে পারে এবং সেই সাথে তাকে পাঁচশ স্বর্ণমুদ্রাও যেন প্রদান করা হয়। হুমায়ুন দেখে প্রহরীবেষ্টিত অবস্থায় দরবার হল থেকে যাবার আগে ক্ষুদে অবয়বটা, তার দিকে মাত্র একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়।

সেদিন অপরাহ্নে, সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন শেষে, ফ্যাকাশে চাঁদ আকাশে যখন মাত্র উঠতে শুরু করেছে এবং রাতের রান্নার জন্য নতুন করে আগুন জ্বালাবার পরে, হুমায়ুন আগ্রা দূর্গের প্রাকারবেষ্টিত ছাদে উঠে আসে। কিছুক্ষণের জন্য নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকবার অভিপ্রায়ে সে তার সব প্রহরীদের চলে যাবার অনুমতি দিয়েছে। তার নির্জনতা প্রীতি বাবর একজন শাসকের জন্য যা মারাত্মক দোষ হিসাবে বিবেচনা করতেন কখনই হুমায়ুনকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করেনি। নক্ষত্রের আবর্তনের প্রতি তাঁর এখনও আগের মতোই কৌতূহল রয়েছে। যদিও এসব অনুভূতি সে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে জানে যে তাঁর সেটাই করা উচিত, অনুভূতিগুলো এখনও আগের মতোই প্রবল- যার আসক্তি গুলরুখের তৈরী আফিম আর সুরার মিশ্রণের চেয়ে অনেকবেশী শক্তিশালী।

রাজত্বের নিপীড়ন নিয়ে তার আব্বাজান একবার তার সাথে আলোচনা করেছিলেন এবং তিনি ঠিকই বলেছিলেন। একজন শাসকের চেয়ে একজন দরিদ্র মানুষ হওয়াটা অনেক দিক দিয়েই উত্তম প্রস্তাবনা। নিজাম অন্তত, একজন স্বাধীন মানুষের মতো, গঙ্গার পানিতে তাঁর মশক ডুবিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। একটা সাম্রাজ্যের ভবিষ্যতের বোঝা বহন করা মোটেই সহজ নয়, যদিও সে ভালো করেই জানে তাঁর কখনও এই পবিত্র দায়িত্ব পরিত্যাগ করার অভিপ্রায় হবে না।

সে যখন নিজের ভাবনা নিয়ে তন্ময় চারপাশ অন্ধকার করে তখন রাত নামছে। নিজের আবাসন কক্ষে ফিরে যাবার সময় হয়েছে যেখানে জওহর আর তাঁর অন্যান্য পরিচারকেরা রাতের খাবার পরিবেশন শুরু করবে- পাত্র ভর্তি ভেড়ার মাংস, মাখন দেয়া ভাত আর মোগলদের স্বদেশের কন্দজাতীয় সজি এবং জাফরান ও হলুদ দিয়ে রান্না করা হিন্দুস্তানের মশলাযুক্ত নানা পদ, তাঁর নতুন সাম্রাজ্যের সমভূমি দিনে যে সূর্যের প্রতাপে দগ্ধ হয় স্বাদে গন্ধে ঠিক সেরকমই প্রখর। দেয়ালের কুলুঙ্গিতে রাখা জ্বলন্ত মশালের আলোয় নিজের আবাসন কক্ষে ফিরে যাবার জন্য হুমায়ুন তিন অংশে বিভক্ত ঢালু পাথুরে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। নিজের ভাবনায় বিভোর হয়ে সে সিঁড়ির প্রথম অংশ অতিক্রম করে তারপরে বাঁক ঘুরে সিঁড়ির দ্বিতীয় অংশ অতিক্রম করার ঠিক আগ মুহূর্তে সে কয়েকটা কণ্ঠস্বর শুনে দাঁড়িয়ে যায়।

আমি ভেবেছিলাম সম্রাট নিজের পাগলামি থেকে পুরোপুরি আরোগ্য লাভ করেছেন। মাসের পর মাস বিনা প্রতিবাদে আমরা তাঁর পাগলামি সহ্য করেছি…গ্রহের প্রভাবযুক্ত দিন সম্বন্ধে আর সৌরমণ্ডল অঙ্কিত সেই আহাম্মকের সতরঞ্জি যতসব ফালতু ধারণা। আমাদের নিজের ইচ্ছামতো মূত্র বিসর্জনের অনুমতি ছিল বলে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম…।

সেই ঘামের গন্ধঅলা ক্ষুদে চাষার ব্যাটার দরবার হলের কাছাকাছি কখনও পৌঁছাতে পারারই কথা না, রাজকীয় সিংহাসনে উপবেশনের কথা না হয় বাদই দিলাম, কিছুক্ষণ বিরতির পরে আরেকটা কণ্ঠস্বর মন্তব্য করে। সম্রাট যদি তাঁকে একান্তই পুরস্কৃত করতে চাইতেন, একটা তামার মুদ্রা দিয়ে পাছায় কষে একটা লাথি দিয়ে বিদায় দিলেও চলতো। আমি আশা করি এটা কোনো নতুন পাগলামি সূচনা নয়। ঘাড়ের উপরে শেরশাহের যোদ্ধারা যখন নিঃশ্বাস ফেলছে তখন স্বপ্নদর্শীর চেয়ে আমাদের একজন যোদ্ধার বেশী প্রয়োজন।

আমাদের সম্রাট একজন দুর্দান্ত যোদ্ধা- যুদ্ধক্ষেত্রে তারমতো সাহসী আর কেউ নেই… তৃতীয় একজন মন্তব্য করে। তাঁর কণ্ঠস্বর মন্দ্র এবং বয়সের ছাপ স্পষ্ট কিন্তু কিন্তু অন্যদের মতো- হুমায়ুন একেও চিনতে পারে না।

আমরা অবশ্য আশা করতে পারি যে তিনি মনে রাখবেন যে কি জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। বাবর ছিলেন একজন সত্যিকারের পুরুষ- সেজন্যই কাবুল থেকে তাঁর অভিযাত্রী দলের সাথে আমি এখানে এসেছিলাম। আমি বিশ্বাস করতে পারিনা কল্পনাপ্রবণ এক জ্যোতিষীর জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করিনি…

কিন্তু তিনি কি ইতিমধ্যে অসাধারণ বিজয় অর্জন করেননি… গুজরাতের কথা একবার স্মরণ কর এবং কিভাবে আমরা… মন্দ্র কণ্ঠের অধিকারী বলতে থাকে, কিন্তু লোকগুলো হাঁটতে আরম্ভ করায় হুমায়ুন তাঁদের আলোচনার অবশিষ্টাংশ শুনতে পায় না।

তাদের কথাবার্তা তাঁকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। ছুটে গিয়ে তাঁদের মুখোমুখি হবার অভিপ্রায় তাঁকে বেশ প্রলুব্ধ করতে থাকে কিন্তু তারা যা বলেছে সেগুলো খানিকটা হলেও সত্যি। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে গোধূলির আলোয় দিনের সূচনা করে সে তাঁর সেনাপতি আর অমাত্যদের সাথে নিজের সম্পর্ক নষ্ট করেছে আর তার প্রজাদের হতাশ করেছে। কিন্তু নিজামের ব্যাপারে তাঁদের ধারণা ভুল। নিজামকে সে কথা দিয়েছিল এবং সে কথা রেখেছে। যা একজন সম্মানিত ব্যক্তির উপযুক্ত আচরণ। অন্য কিছু করলে, ইহকালে না হোক পরকালে তাকে অবশ্যই সেজন্য শাস্তি পেতে হতো…

*

আহমেদ খান, প্রথমে আমাকে বল, আমাদের শত্রু সম্বন্ধে আমরা কি জানি?

হুমায়ুন নিজের চারপাশে তার সামরিক উপদেষ্টাদের সাথে সম্রাটের লাল নিয়ন্ত্রিত তাবুতে আবারও একবার বৈঠকে বসেছে। শেরশাহের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে গত সন্ধ্যায় আগ্রা থেকে একশ বিশ মাইল দক্ষিণে সে তার সেনাবাহিনীর শিবিরে এসে হাজির হয়েছে।

সুলতান, সংবাদ খুব একটা ভালো না। শেরশাহ যুদ্ধে নিহত যোদ্ধাদের সমাধিস্থ করে খুব মন্থর গতিতে কাকরি ফিরে গেছে, এই শহরটাকে সে তার নেতৃত্বের অগ্রবর্তী কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। দশ সপ্তাহ আগে, সেখানেই তার বিজয় উদযাপন উপলক্ষ্যে একটা বিশাল কুচকাওয়াজের আয়োজন করেছিল। ঢাকের তালে তালে তাঁর সবচেয়ে চৌকষ অশ্বারোহীদের একটা দল নিজেদের বেগুনী নিশান বহন করে কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেয়। তারা উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে হাত নাড়তে তাঁরা গলার স্বর সপ্তমে তুলে তাঁদের উৎসাহিত করে। শেরশাহ আমাদের কাছ থেকে ব্রোঞ্জের যে কামানগুলো জব্দ করেছিল গঙ্গার তীরের কাদা থেকে তাঁদের বেশীর ভাগই টেনে তুলতে সফল হয়েছে এবং পুনরায় তাদের কার্যক্ষম করে তুলেছে। কুচকাওয়াজে এর পরেই ছিল কামানগুলো, রাস্তা দিয়ে সেগুলোকে টেনে নিয়ে যায় আমাদেরই কিছু হাতি যা সে তাড়া করে ধরেছে। কামানের ঠিক পেছনেই ছিল আমাদের যুদ্ধবন্দিদের সারি, শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় তাদের হাঁটতে বাধ্য করা হয়েছিল। আমাদের এক গুপ্তচরের বয়ান অনুসারে, মিষ্টি বিক্রেতার ছদ্মবেশে সে খুব কাছ থেকে তাঁদের দেখেছে, বন্দিদের অনেকেই খুঁড়িয়ে হাঁটছিলো বা তাদের ক্ষতস্থানসমূহে নোংরা কাপড় দিয়ে পটি বাঁধা ছিল। বাকিদের দেহের যেখানে শেকল দংশন করেছে সেখানেই রয়েছে দগদগে যন্ত্রণাদায়ক ক্ষত। বন্দিদের সবাইকে ক্ষুধার্ত আর রোগা দেখাচ্ছিল আর তাদের চোখ মাটির দিকে নিবদ্ধ ছিল। গুপ্তচর আরও বলেছে যে দর্শকরা তাদের অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করে, ধাক্কা দেয় আর তাঁদের দিকে পচা আবর্জনা ছুঁড়ে মারে এমনকি কেউ কেউ তাদের লাঠি দিয়েও আঘাত করে।

শেরশাহের উল্লসিত বাহিনীর আরও অনেকগুলো দল পর্যায়ক্রমে তাদের অনুসরণ করে এবং সবশেষে শেরশাহ নিজে লম্বা একটা হাতির পিঠে স্থাপিত গিল্টি করা হাওদায় আরোহন করে এগিয়ে আসে, হাতিটার লম্বা দাঁতগুলো সোনার পাতা দিয়ে মোড়ান এবং এর পর্যানের ঢাউস কাপড়টায়, যা মাটি পর্যন্ত বিস্তৃত, মুক্তা আর মূল্যবান পাথর দিয়ে কারুকাজ করা। শোভাযাত্রাটা যখন শহরের মূল চত্বরে পৌঁছায় শেরশাহ হাতির পিঠ থেকে নেমে আসে বেগুনী কাপড় দিয়ে আবৃত একটা অতিকায় মঞ্চে নিজের নির্ধারিত স্থান গ্রহণ করতে।

সে এখানে আমাদের কাছ থেকে অধিকৃত সম্পদ তাঁর প্রধান সমর্থকদের মাঝে উপহার হিসাবে বিলিয়ে দেয় এবং আমাদের কাছ থেকে দখল করা জমি তাদের ভিতরে বিলিবণ্টন করে, এবং তাদের মাঠে আর খনিতে কৃতদাস হিসাবে কাজ করার জন্য আমাদের ভাগ্যপ্রপীড়িত বন্দিদের কয়েকটা দলকে দান করে। তারপরে, যা বলা আরো লজ্জাজনক, আমাদের অনেক প্রাক্তন মিত্র এবং অনুগত জায়গীরদার নিজেদের আনুষ্ঠানিক পোষাকে সজ্জিত হয়ে সামনে এগিয়ে আসে। শেরশাহের সামনে নোংরায় তারা খুশীমনে নিজেদের অধধামুখে প্রণত হয়ে মার্জনা ভিক্ষা করে এবং সে তার সেনাবাহিনীতে তাদের বিভিন্ন পদ দিয়ে পুরস্কৃত করে এবং আপনি যখন পরাজিত হবেন তখন আরও পরিমাণে দান করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তাদের অনুসরণ করে দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলোর শাসকদের প্রেরিত রাজদূতেরা যেমন হীরক-সমৃদ্ধ গোলকুণ্ডা, যিনি আমাদের দুর্বলতা থেকে নিজেদের আরও শক্তিশালী করার সুযোগ দেখতে পেয়ে, শেরশাহকে সবধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বিনিময়ে তাদের খুশী করতে আমাদের ভূখণ্ডের কিয়দংশ তাঁদের অধিকারে ছেড়ে দেবার সাড়ম্বর প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়।

সবশেষে, উচ্চনাদের আরেকদফা তূর্যবাদনের মাধ্যমে, আপনার প্রাক্তন অনুগত রাজাদের ভিতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যাঁরা তাঁদের একজন- গোলপুরের রাজা- এগিয়ে আসে এবং শেরশাহের সেনাপতিদের অনেককে সাথে নিয়ে সে শেরশাহের সামনে হাঁটু ভেঙে বসে। শেরশাহকে সম্রাটের পদবী- পাদিশাহ গ্রহণের জন্য তারা একসাথে তাকে অনুরোধ করে, তাকে বশংবদ আর বিশ্বাসঘাতকের মতো আশ্বাস দেয় যে এই পদবীর জন্য সে সবসময়েই আপনার চেয়ে অনেকবেশী যোগ্য। শেরশাহ দুইবার নিজের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন পূর্বক বক্তব্য প্রদান করে বলেন যে তিনি কেবল আপনার দ্বারা অত্যাচারিতদের সাহায্য করতে চান। নিজের জন্য পুরষ্কার কিংবা ক্ষমতা কিছুই চান না। অবশ্য তৃতীয়দফা দর্পোদ্ধত আর আরো বেশী চাটুকারী বিশেষণ প্রয়োগ করে সনির্বন্ধ প্রার্থনা করা হলে তাঁদের অতিরঞ্জিত বাক্য ব্যবহার ততক্ষণে মাত্রা ছাড়িয়েছে। তিনি রাজি হয়ে বলেন, যদি এটাই তোমাদের অনড় আকাঙ্খ হয়, আমি কেবল সম্মতি জানাতে পারি। বিচক্ষণতার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা আর সবাইকে ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি আমি দিলাম। তারপরে সোনার উপরে রুবি দিয়ে কারুকাজ করা একটা মুকুট- সবসময়ে যা প্রস্তুত ছিল; পুরো ব্যাপারটাই মঞ্চে অভিনীত একটা প্রহসন, তাঁর প্রাথমিক প্রত্যাখ্যান কেবলই লোক দেখান- শেরশাহের তিনজন উচ্চপদস্থ আধিকারিক আর গোলপুরের রাজা তাঁর মাথায় স্থাপন করে। উপস্থিত সবাই নিজেদের তার সামনে প্রণত করে, মাটিতে নিজেদের বিশ্বাসঘাতক নাক চেপে ধরে।

পরে সেই রাতে, শেরশাহ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাপূর্ণ এক গণউৎসব মঞ্চস্থ করে। মশালের ধকধক করে জ্বলতে থাকা আলোতে প্রতিটা রাজ্য এবং গোত্রের একজন তরুণ যোদ্ধা যারা এখন তার সাথে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ শেরশাহের সামনে সামরিক কসরত প্রদর্শন করে, এসময়ে সে সোনার কারুকাজ করা চাঁদোয়ার নীচে একটা লম্বা, খাড়া পৃষ্ঠদেশযুক্ত সোনার গিল্টি করা একটা সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিল। সিংহাসনে শেরশাহের মাথার ঠিক উপরে গর্জনরত একটা ক্রুদ্ধ ব্যাঘ খোদাই করা রয়েছে। বাঘটার চোখের স্থানে দুটো প্রকাণ্ড রুবি শোভা পাচ্ছে যেগুলো আমাকে বলা হয়েছে- আধারেও তীব্রভাবে জ্বলজ্বল করে। প্রদর্শনী শেষ হবার পরে সবাই তথাকথিত সম্রাটের সামনে পর্যায়ক্রমে মাথা নত করে এবং তিনি তাদের ঘামে ভেজা কামান মাথায় তাদের আর তারা যে অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে সবাইকে তিনি যে সাফল্য আর সমৃদ্ধির অংশীদার করবেন তার লক্ষণস্বরূপ জাফরান, মুক্তা চূর্ণ, কস্তরীমৃগ আর তিমি মাছের অন্ত্রে প্রাপ্ত মোমসদৃশ গন্ধদ্রব্য ছিটিয়ে দেন।

পরের দিনটা ছিল শুক্রবার, শহরের প্রধান মসজিদে- শেরশাহের সেনাপতিদের উপস্থিতির কারণে জনাকীর্ণ- ইমাম সাহেবও শেরশাহের নামে খোতবা পাঠ করে শেরশাহকে সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করে এবং বিশ্বাসঘাতকসুলভ আর তীব্র কটাক্ষপূর্ণ ভঙ্গিতে আপনার সমুদয় ভূখণ্ড হোক সেটা বাংলায় তার দ্বারা ইতিমধ্যে জবরদখলকৃত বা তার নাগালের বাইরে পাঞ্জাব আর আফগানিস্তান, শেরশাহকে বরাদ্দ দেয়া হয়। পরের দিন, শেরশাহ আমাদের বিরুদ্ধে নতুন করে তার অগ্রাভিযান শুরুর অভিপ্রায়ে কুচকাওয়াজের সাথে রওয়ানা দেয়। তার নতুন মিত্রদের কল্যাণে, এখন তার বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখের কাছাকাছি।

সে এই মুহূর্তে কোথায় অবস্থান করছে?

এখান থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে, আগ্রা অভিমুখে ধীর গতিতে অগ্রসর হচ্ছে।

বাবা ইয়াসভালো, আমাদের নিজেদের সেনাবাহিনীর কি অবস্থা? নতুন করে সমর-সজ্জার অগ্রগতি কি ভালোমতো চলছে?

হ্যাঁ, অস্ত্র আর বর্ম নির্মাতারা দারুণ কাজ দেখিয়েছে। আমাদের লোকেরা সবাই নতুন অস্ত্র পেয়েছে। আরো বেশী সংখ্যক কামান উৎপাদনের লক্ষ্যে আমাদের ঢালাইখানার চুল্লী দিনরাত জ্বলছে। আমাদের অশ্বারোহী বাহিনীকে পুনরায় সচল করতে ঘোড়ার দালালেরা আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে ঘোড়া সরবরাহ করেছে। যদিও অনেকগুলোই আমাদের পিতৃপুরুষের স্বদেশের তৃণভূমিতে জন্ম নেয়া ঘোড়ার মতো বিশাল আর শক্তিশালী না।

আর আমাদের মিত্র এবং আমার সৎ-ভাইদের দ্বারা আরও সৈন্য প্রেরণের প্রতিশ্রুতির কি খবর?

এই বিষয়ে খবর খুব একটা ভালো না। আমাদের অনেক মিত্রই গড়িমসি করছে, সৈন্য প্রেরণে বিলম্বের কারণ হিসাবে তারা বর্ষাকাল বা স্থানীয় বিদ্রোহের অজুহাত দিচ্ছে বা পাঠালেও খুব ছোট বাহিনী প্রেরণ করছে। হিন্দাল আর আসকারি অবশ্য প্রতিশ্রুতি পালন করেছে বিশেষ করে হিন্দাল প্রতিশ্রুত সংখ্যার চেয়েও বেশী সংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করেছে কিন্তু আপনার সৎ-ভাইদের ভিতরে সবচেয়ে বড় যে কামরান সে পাঞ্জাব থেকে মাত্র আড়াইশ অশ্বারোহীর একটা নিতান্ত ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করেছে যাদের ঘোড়াগুলো দারুণ। আমরা অধিকতর সহযোগিতার কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে সে প্রত্যুত্তরে স্পষ্ট করে কোনো সময়সীমা উল্লেখ করেনি এবং আপনি আরও ব্যাপক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারেন এমন ইঙ্গিত দিয়ে কিছু সৈন্য সে নিজের কাছে রাখতে চেয়েছে।

কিন্তু আমরা যাতে আরও পরাজয়ের সম্মুখীন হই, সেটা নিশ্চিত করার জন্য এটা একটা অনিবার্য পন্থা, হুমায়ুন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে গর্জে উঠে কিন্তু তারপরে বেশী কিছু বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। প্রকাশ্যে নিজের সৎ-ভাইদের সমালোচনা করাটা মোটেই সমীচিন হবে না। কামরানের সাথে তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত চিঠিপত্র আদানপ্রদানের সাথে তার সেনাপতির বক্তব্য প্রতিধ্বনিত হয়। তার সৎ-ভাই চিঠির উত্তর দিতে দেরী করে এবং যখন সে উত্তর পাঠায় শেরশাহের প্রতি নিজের বৈরিতা যদিও সে যথার্থ মারমুখো ভঙ্গিতে প্রকাশ করে, কিন্তু হুমায়ুনের নেতৃত্বের অধীনে যুদ্ধের জন্য সৈন্য প্রেরণের ক্ষেত্রে সে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয় না। কামরান তার সব সৈন্য নিয়ে বরং নিজে যুদ্ধে যোগদানের প্রস্তাব দিয়েছে। সে খুব ভালো করেই জানে হুমায়ুন ইহা প্রত্যাখ্যান করবে, কারণ তার প্রস্তাবে রাজি হওয়া মানে পাঞ্জাবকে শাসকহীন করা এবং সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সৈন্যহীন করা। কামরান মনে হয় প্রতীক্ষা করার খেলা শুরু করেছে, সে নিজের ব্যক্তিগত অবস্থান সংরক্ষণের বিষয়ে বেশী উদগ্রীব তাঁদের আব্বাজানের সাম্রাজ্যের হাতছাড়া হওয়া প্রদেশগুলো পুনরুদ্ধারের চেয়ে যদি এর মানে হয় তাঁর নিজস্ব গৌরব বৃদ্ধির চেয়ে হুমায়ুনের গৌরব বৃদ্ধি করা।

আমি আমার সৎ-ভাইদের সাথে যোগাযোগ করবো। কিন্তু আমাদের সেনাপতিরা এই মুহূর্তে ঠিক কতজন সৈন্য মোতায়েন করতে সক্ষম?

সুলতান, এক লক্ষ সত্তর হাজার।

তার মানে বর্তমান পরিস্থিতিতে শেরশাহের সৈন্য সংখ্যা আমাদের চেয়ে বেশী।

জ্বী, সুলতান। আপনার ভাই কামরান আর অন্যান্যদের কাছ থেকে যতক্ষণ না বাড়তি লোকবল এসে পৌঁছায়।

*

হুমায়ুন নিজের গালে সন্ধ্যার উষ্ণ, কোমল বাতাসের স্পর্শ অনুভব করে যখন, স্থানটা গঙ্গার তীরে কনৌজের বসতি থেকে খুব একটা দূরে অবস্থিত না, সে বিক্ষিপ্তভাবে জন্মান ঝোপঝাড় আর ইতস্ততভাবে বেড়ে উঠা বামনাকৃতি গাছপালা শোভিত বেলেপাথরের একটা সরু চূড়ায় নিজের আদেশপ্রদানকারী অবস্থান থেকে বিপরীতপার্শ্বের শৈলচূড়া অভিমুখে তাকায় যেখানে, যদি তার গুপ্তচরদের বিবরণী নির্ভুল হয়, আগামীকাল সকালে শেরশাহের বাহিনী এসে উপস্থিত হবে। মৃদুমন্দ এই বায়ু প্রবাহটা কিছুক্ষণের জন্য হুমায়ুনকে তাঁর জন্মস্থান, আফগানিস্তানে গ্রীষ্মকালে প্রবাহিত শীতল বাতাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। অতীতের স্মৃতি মনে পড়তে তার মুখে ফুটে উঠা আধো হাসির আভাস তার মাথার পেছনে সতত বর্তমান জ্ঞানের কারণে নিমেষে বিতাড়িত হয়, যে গত দুইমাস কাল ধরে তার সামরিক পরিষদমণ্ডলী দুঃসংবাদব্যাতীত আর কিছুই বয়ে আনেনি।

শেরশাহের ধীর কিন্তু অবিশ্রান্ত অগ্রগতি বজায় আছে। যা সম্ভবত একেবারে অপ্রত্যাশিত না কিন্তু হুমায়ুন যেটা একেবারেই আঁচ করতে পারেনি সেটা হল মুরাদাবাদের রাজা, হানিফ খানের স্বপক্ষত্যাগ করে শেরশাহের সাথে যোগ দেবার বিষয়টা, সুলেমান মির্জা মৃত্যুবরণ করার পরে যিনি এখন হুমায়ুনের অশ্বারোহী বাহিনীর সবচেয়ে বয়োজ্যোষ্ঠ অধিনায়ক, তার সাথে রয়েছে পনের হাজার অশ্বারোহীর একটা বিশাল বাহিনী, দিল্লীর পূর্বে হানিফ খানের জমিদারী এলাকা থেকে যাদের নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁর কাপুরুষোচিত পলায়নের ঠিক পরপরই, শেরশাহ নিশ্চিতভাবেই পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসারে- গঙ্গার তীরবর্তী সুরক্ষিত একটা শহরে আক্রমণ চালায় যা ইতিপূর্বে হানিফ খানের অধীনস্ত ছিল। হানিফ খানের স্বপক্ষত্যাগের কারণ হতোদ্যম হয়ে পড়ায়, হুমায়ুনের কয়েক হাজার সৈন্য যাঁরা তখনও তাঁর প্রতি অনুগত ছিল সামান্যই প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং অচিরেই শহরটা আত্মসমর্পন করলে শেরশাহের অগ্রযাত্রার পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। হুমায়ুন কোনোভাবেই সেইসব সৈন্যদের কোনো দোষ দিতে পারে না। সে বরং নিজেকেই ভৎর্সনা করে যে যাঁরা তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে তাঁদের উচ্চাকাঙ্খ আর চরিত্র অনুধাবনে সে মোটেই সময় দেয়নি ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল সে পরিহার করতে চেষ্টা করবে।

হুমায়ুনের পেছনে যা ঘটছে সে সবের বিবরণও তাঁকে সমানভাবে বিব্রত করে। হিন্দালের শাসনাধীন প্রদেশ আলওয়ারে শেরশাহের সমর্থনে একটা সশস্ত্র বিদ্রোহ দানা বেঁধেছিল যা হিন্দাল চিঠিতে জানায়, বহু কষ্টে সে এই বিদ্রোহ দমন করেছে। দিল্লীর কাছে অবস্থিত পার্বত্য এলাকায় হানিফ খানের অনুগত জায়গীরদারদের ভিতরেও বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়েছে এবং হুমায়ুন বাধ্য হয় একদল সৈন্য প্রেরণ করে বিদ্রোহীদের দমন করতে, যাদের তার সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেবার প্রস্তুতি স্বরূপ প্রশিক্ষিত করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

কামরানের কাছ থেকে প্রেরণ করা চিঠিটা সবকিছুর ভিতরে নিকৃষ্টতম। হুমায়ুনের প্রতি এবং রাজবংশের প্রতি আর শেরশাহের সাথে তার বিরোধিতার প্রতি সে নিজের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়ে একই সাথে তাঁর ভাইয়ের আগ্রা ছাড়িয়ে আরও দুইশ মাইল পূর্বে গিয়ে শেরশাহকে মোকাবেলা করার সামরিক কৌশলকে সে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সে এর পরিবর্তে প্রস্তাব দিয়েছে হয় দিল্লী নতুবা আগ্রাকে অবরোধের জন্য প্রস্তুত করতে আর তাঁদের উঁচু দেয়ালে ফাটল সৃষ্টির অভিপ্রায়ে বৃথা উদযোগ গ্রহণ করে শেরশাহকে নিজ শক্তি ক্ষয়ের একটা সুযোগ দেয়া। কামরান আরও সৈন্য প্রেরণের বিষয়টা প্রত্যাখ্যান করতে অজুহাত হিসাবে নিজের উদ্বেগকে ব্যবহার করে সেই সাথে দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা করেছে যে হুমায়ুনের ক্রুটিযুক্ত কৌশল যদি ব্যর্থ হয়, কামরান মনে করে যে পরিকল্পনাটার ব্যর্থ হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে, তখন তাঁর নেতৃত্বে প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় ব্যুহ কার্যকর করতে সে প্রতিশ্রুত বাহিনীকে না পাঠিয়ে আটকে রাখছে।

সুলতান, বাবা ইয়াসভালো আপনার সেনাবাহিনী পরিদর্শনের সময় আপনাকে সঙ্গ দেবার জন্য অপেক্ষা করছেন। জওহর হুমায়ুনের স্বপ্ন-কল্পনায় বিঘ্ন ঘটায়। সে হুমায়ুনের খয়েরী রঙের উঁচু ঘোড়াটার লাগাম ধরে রয়েছে।

উত্তম প্রস্তাব। হুমায়ুন ঘুরে দাঁড়ায় এবং ঘোড়ায় চড়ে সরু চূড়া বরাবর খানিকটা এগিয়ে যায় বাবা ইয়াসভালের সাথে মিলিত হতে। দুজনে সামনে এগোন শুরু করতে, হুমায়ুন জানতে চায়, আমাদের গুপ্তদূতদের সর্বশেষ বিবরণীর কি বক্তব্য? কোনো পরিবর্তন কি হয়েছে?

না, সুলতান। বিপরীত পার্শ্বের চূড়া থেকে প্রায় দুই মাইল ভিতরে শেরশাহ তার তাবু ফেলেছে এবং আজরাতে তাঁর শিবির থেকে প্রস্তুতির যে দৃশ্য আর শব্দ শোনা গেছে, তাতে মনে হয় আগামীকাল সকালে সে সত্যিই আক্রমণ শুরু করবে।

আমি এই সরু চূড়ার মাঝামাঝি মাটি দিয়ে যে রক্ষণাত্মক বাঁধ নির্মাণ করতে বলেছিলাম সেটা কি শেষ হয়েছে?

হ্যাঁ, সুলতান- আমরা যখন আমাদের প্রস্তুতি পরিদর্শন করবো তখন আপনি দেখতে পাবেন।

ভালো। বাঁধের আড়ালে সুরক্ষিত থেকে আমরা শেরশাহের হামলা অথধামুখে ছুটে গিয়ে আক্রমণ করে লোকবলক্ষয়কারী হাতাহাতি যুদ্ধে লিপ্ত হবার বদলে, কামান আর তবকিদের গুলিবর্ষণ আর সেই সাথে আমাদের তীরন্দাজদের নিক্ষিপ্ত তীরের সাহায্যে প্রতিহত করতে পারবো।

কিন্তু সুলতান কেবল পরাস্ত হওয়া এড়িয়ে যাবার চেয়ে আমরা যদি তাদের পরাভূত করতে চাই তাহলে তাদের কাছাকাছি আমাদের পৌঁছাতে হবে।

অবশ্যই। আমরা যখন শেরশাহের সংখ্যাধিক্যের সুবিধা নাকচ করতে পারবো এবং তাঁর লোকেরা যখন পরিশ্রান্ত হয়ে উঠবে আমরা তখন আকষ্মিক বেগে আক্রমণ করে তাদের ধবংস করবো। আমি সেই সাথে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে কোনো অপর্যাপ্ত উপায় গ্রহণ করতে চাই না। আমাদের আক্রমণ শুরুর সময়টা কেবল আমি সতর্কতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই।

তারা ততক্ষণে ঘোড়ায় চড়ে বাঁধের লাল মাটি বরাবর এগিয়ে চলেছে। তারা এখানে, গঙ্গা আর কনৌজের রাস্তায় আড়াআড়িভাবে, অস্থায়ী শিবির স্থাপনের পর তাঁর লোকেরা এই গরমের ভিতরে গাঁইতি আর শাবল দিয়ে চারদিনে দারুণ কাজ করেছে। মাটি আর পাথরের স্তূপটা সব জায়গায় ছয় ফিট উঁচু এবং বেশীর ভাগ স্থানে এর উচ্চতা দশ ফিট। সরু চূড়ার মধ্যবর্তী অংশের, যা মোটামুটিভাবে উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত, পুরো এলাকাটা জুড়ে বাঁধটা বিস্তৃত।

বাবা ইয়াসভালো, এই পর্যবেক্ষণের সময়ে আমি কাকে পুরস্কৃত বা পদোন্নতি প্রদান করবো?

সুলতান, আমরা তিনজনকে বাছাই করেছি। ওয়াজিম পাঠান নামে কাবুলের দক্ষিণ থেকে আগত এক আহত আফগানি শেরশাহের অগ্রাভিযানের সময়ে সংগঠিত এক খণ্ডযুদ্ধে সে দারুণ লড়াই করেছে। সে তাঁর আধিকারিকদের একজনকে নিজের ডান হাত আর তাঁর কনুইয়ের নীচের অংশ বিসর্জন দিয়ে রক্ষা করেছে। তাঁর জন্য আমরা এক ব্যাগ রৌপ্য মুদ্রা নিয়ে এসেছি, সে নিজের গ্রামে ফিরে যাবার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ যাত্রা শুরু করার সময় ব্যাগটা সাথে করে নিয়ে যাবে। দ্বিতীয়জন লাহোর থেকে আগত বয়ঃকনিষ্ঠ এক আধিকারিক, যে আমাদের যুদ্ধের উপকরণ বহনকারী সরবরাহ যানবাহনের একটা বহরে শেরশাহের লোকেরা অতর্কিতে আক্রমণ করলে সে দারুন সাহসিকতা প্রদর্শন পূর্বক তাঁদের যুদ্ধ করে তাড়িয়ে দেয়। আপনার পক্ষ থেকে তাঁকে পুরষ্কার হিসাবে দেবার জন্য আমাদের সাথে একটা রত্নখচিত তরবারি আছে। আমাদের মনোনীত তৃতীয়জনকে আপনি ভালোমতো চেনেন- গজনীর তরুণ হাসান বাট্ট। আপনার অনুরোধ অনুযায়ী, অশ্বারোহী বাহিনীতে তাঁকে উচ্চতর অবস্থান প্রদান করা হবে।

হুমায়ুনের পরিদর্শনের জন্য সৈন্যদের যে দলটাকে পছন্দ করা হয়েছিল তারা বাঁধ থেকে খানিকটা দূরে ষাড় আর হাতির দল যার কাছে তাঁর কামানগুলোকে নির্ধারিত স্থানে স্থাপনের জন্য পরিশ্রম করছে সেখানে শ্ৰেণীবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান রয়েছে। হুমায়ুন অশ্বারোহী সৈন্যদের সারির এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে দেখে, যাদের কারো কারো ঘোড়া গরমে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে উঠে, নিজেদের মাথা ঝাঁকাচ্ছে বা মাটিতে পা ঠুকছে, এবং তারপরে গোলন্দাজ, পদাতিক সৈন্য আর তীরন্দাজদের অপেক্ষাকৃত সোজা সারি অতিক্রম করে কেন্দ্রে যেখানে একটা মঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে সেইদিকে এগিয়ে যায়। যাদের পুরস্কৃত বা পদোন্নতি দেয়া হবে তাদের সামনে এগিয়ে আসতে বলা হয়। ধুসর চুলের আহত ওয়াজিম খানের চোখ অশ্রুসজল হয়ে উঠে, যাকে হুমায়ুনের অনেক সৈন্যদের চেয়ে বয়স্ক দেখায়। রৌপ্যমুদ্রা ভর্তি লাল মখমলের ব্যাগটা সে যখন নিজের ভালো হাতটা দিয়ে গ্রহণ করে, সে থেমে থেমে কোনোমতে কেবল বলে, পাদিশাহ, আপনাকে ধন্যবাদ। আমার গ্রামে আমি নিজের মাথা উঁচু করে রাখতে পারবো আর সেই সাথে আমার মেয়েদের বিয়েতে যৌতুকও দিতে পারবো।

তোমার অর্জিত সম্মানের পুরোটাই তোমার প্রাপ্য, হুমায়ুন বলে। লাহোর থেকে আগত আধিকারিকের হাতে কারুকাজ করা তরবারিটা হুমায়ুন যখন তুলে দেয় গর্বে তার সারা মুখ হেসে উঠে। বয়ঃকনিষ্ঠ হাসান বাউ, বরাবরের মতোই ধুসর নীল রঙের পাগড়ি পরিহিত রয়েছে, হুমায়ুন যখন পুরো সেনাবাহিনীর সামনে অশ্বারোহী বাহিনীর একটা চৌকষ দলের অধিনায়ক হিসাবে তার নিয়োগ ঘোষণা করে তার মুখেও একই অভিব্যক্তি ফুটে উঠে।

পুরস্কৃত তিনজন নিজ নিজ কাতারে ফিরে যাবার পরে, হুমায়ুন তার সামনে সমবেত সৈন্যদের উদ্দেশ্যে একটা ভাষণ দেয়। আগামীকাল শেরশাহ আর তার বাহিনীর সাথে আমরা যুদ্ধ করার প্রত্যাশা রাখি। তার সেনাবাহিনী যদিও শক্তিশালী কিন্তু তার যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার উদ্দেশ্য দুর্বল। তৈমূরের বংশধর আর বাবরের সন্তান হিসাবে হিন্দুস্তানের সিংহাসন সত্যিকার অর্থে আমার। শেরশাহ একজন অশ্ববিক্রেতার সন্তান এবং নামগোত্রহীন অজ্ঞাত জারজের বংশধর। এসো আমরা এমন একটা লড়াই করি যে আগামীকাল সন্ধ্যে নাগাদ বিশ্বাসঘাতকের কবরে তাঁর ঠাঁই হয় এবং তখনও তার যতটুকু প্রাপ্য তারচেয়ে বেশী ভূখণ্ড দখল করে রাখবে। আমাদের উদ্দেশ্যে ন্যায্যতা সম্পর্কে কখনও বিস্মৃত হয়ো না। মনে রাখবে যে আমি এই মাত্র যে লোকগুলো পুরস্কৃত করলাম তাঁদের মতো নির্ভীকভাবে তোমরা লড়াই করবে, তোমাদের কাছে আমি এটুকুই কেবল বলতে চাই। আমি তোমাদের হলফ করে বলছি, আমি নিজে তাঁদের চেয়েও নির্ভীকতা প্রদর্শনের প্রয়াস নেব।

২.৩ রক্ত আর ঘামের গন্ধ

০৮. রক্ত আর ঘামের গন্ধ

রাতের বেলা আক্রমণের দ্বারা তাঁকে পুনরায় চমকে দেবার ব্যাপারে, যেমনটা সে চৌসায় করেছিল, হুমায়ুন কোনো প্রকার ঝুঁকি নেয় না। সে তাদের জাগিয়ে রাখে এবং সূর্য উঠার তিনঘন্টা আগে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখে। কিন্তু কোনো আক্রমণ হয় না এবং অনেক আগেই সকালের নাস্তার পর্ব শেষ হয়েছে আর রাধুনি আগুন নিভিয়ে দিয়েছে। আজকের সকালটা বেশ পরিষ্কার এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে সরু চূড়া বরাবর আরো একবার হেঁটে আসবার সময় হুমায়ুন এমনকি নয়টার সময়েও টের পায় এরই মধ্যে বেশ গরম পড়েছে। তাঁর গুপ্তদূতেরা খবর দিয়েছে যে প্রায় এক ঘন্টা আগেই শেরশাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে শুরু করেছে এবং শীঘ্রই বিপরীতপার্শ্বের চূড়ায় তাঁর পৌঁছে যাবার কথা।

তাঁরা ঠিকই অনুমান করেছিল। কয়েক মিনিট পরেই হুমায়ুন চূড়ায় প্রথম বেগুনী নিশান দেখতে পায়। তারপরে সে বর্ম পরিহিত একজন অশ্বারোহীকে দেখতে পায়, তারপরে আরেকজনকে, তারপরে শতশত। দীর্ঘদেহী এক অবয়বের, যার বর্মের সম্মুখভাগ আর শিয়োস্ত্রাণে সকালের সূর্য ঝিলিক তোলে, আদেশ অনুযায়ী শেরশাহের সবচেয়ে চৌকষ অশ্বারোহী বাহিনীর একটা অগ্রবর্তী দল হুমায়ুনের প্রত্যাশিত স্থানেই অবস্থান গ্রহণ করতে আরম্ভ করে। দুই চূড়ার মধ্যবর্তী দূরত্ব অনেক বেশী হবার কারণে ঠিকমতো চেনা যায় না ওখানে কে রয়েছে কিন্তু হুমায়ুন ধারণা করে কিছুটা আশাও- যে ওটা স্বয়ং শেরশাহ। শেরশাহের সাথে ব্যক্তিগত দ্বৈরথে সে আরো একবার অবতীর্ণ হয়ে নিজেকে দুজনের ভিতরে সেরা যোদ্ধা হিসাবে প্রমাণ করতে এবং তার শত্রু রক্তাক্ত অবস্থায় ধূলোয় লুটিয়ে রয়েছে দেখতে চায়। কিন্তু সে এটাও ভালো করে জানে যে তার লোকদের মতো তাকেও অবশ্যই সহসা সর্বশক্তি নিয়ে এক বেপরোয়া আক্রমণের ঝুঁকি নেয়ার প্ররোচনা জয় করতে হবে।

প্রায় সোয়া ঘন্টা পরে, হুমায়ুন দীর্ঘদেহী সেই অবয়বকে নিজের তরবারি আন্দোলিত করে তার অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম সারির মাঝে চলৎশক্তি সঞ্চারিত করতে দেখে। অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম সারিটা চূড়া থেকে সম্মিলিত কণ্ঠে রণহুঙ্কার দিয়ে পুতগতিতে নেমে আসতে শুরু করতে হুমায়ুনের কাছে মনে হয় তারা সংখ্যায় প্রায় হাজার পাঁচেক হবে, তাদের বেগুনী নিশানগুলো তাদের পেছনে বিরতিহীনভাবে আন্দোলিত হয়। তাঁদের ভঙ্গি দেখে মনে হয়, হুমায়ুন যেমন প্রত্যাশা করেছিল, তারা সরু চূড়ার মাঝামাঝি বরাবর তার তৈরী অস্থায়ী বাঁধের, যেটার উপরে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে, উপরে হামলা করতে এগিয়ে আসছে।

বাবা ইয়াসভালো ইতিমধ্যে হুমায়ুনের গোলন্দাজদের গোলা বর্ষণ আরম্ভ করার আদেশ দিয়েছেন এবং আক্রমণ শুরু করা শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর প্রথম দলটা গোলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। নীচের উপত্যকায় ঘুরপাক খেতে থাকা কামানের সাদা ধোয়ার মাঝে হুমায়ুন দেখে গাদাবন্দুকের ছররা বা তীরের আঘাতে পেছনের যোদ্ধারা তাদের ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়েছে। মাটিতে ধরাশায়ী হওয়া লোকগুলোর ভিতরে একজন নিশান-বাহক ছিল, যে মাটিতে আছড়ে পরার সময় যার হাত থেকে নিশানের দণ্ডটা ছুটে যায়। তাঁর বেগুনী নিশানটা উড়ে গিয়ে আরেক আগুয়ান অশ্বারোহীর সামনে পড়ে তার ঘোড়ার পায়ের সাথে পেচিয়ে যায় এবং ঘোড়াটা তার আরোহীসহ মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কয়েক মুহূর্ত পরে হুমায়ুন চোখেমুখে রুদ্ধশ্বাস বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে দেখে তার অবস্থানের দিকে আক্রমণ অভিপ্রায়ে সর্বোচ্চ বেগে ধাতি হবার বদলে অশ্বারোহী যোদ্ধারা ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একদল তর মাটির বাধের দূরবর্তী প্রান্তের দিকে ছুটতে শুরু করেছে এবং আরেকদল বিপরীত প্রান্তের দিকে। তাঁরা বৃত্তাবদ্ধ করার এক তৎপরতায় প্রবৃত্ত হয়েছে, হুমায়ুনের মূল প্রতিরক্ষা ব্যুহের সামনে দিয়ে হঠাৎ গতি পরিবর্তন করে একপাশে সরে যাবার সময় তাঁর তবকি আর তীরন্দাজদের কারণে জানমালের অবশ্যম্ভাবী ক্ষয়ক্ষতি আপাতদৃষ্টিতে তারা মেনে নিয়েছে।

নিমেষ পরে, হুমায়ুন তাঁর চোখের কোণ দিয়ে শেরশাহের বিশাল আরেকটা অশ্বারোহী বাহিনীকে দুলকিচালে ঢালু শৈলশিরার নীচু অংশ দিয়ে উঠে এসে দুটো চূড়ার উত্তরপ্রান্তের সংযোগকারী অংশের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে এবং তার প্রতিরক্ষা ব্যুহের অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত প্রান্তে তারা স্পষ্টতই হামলা করতে চলেছে।

জওহর, একজন বার্তাবাহককে পাঠিয়ে বাবা ইয়াসভালোকে এখনই বল উত্তরদিক থেকে শৈলশিরায় হতে যাওয়া আক্রমণ প্রতিহত করতে, এখনই আমাদের অশ্বারোহীদের কয়েকটা দলকে সেখানে সরিয়ে নেয়। তাদের নেতৃত্ব দিতে আমি নিজে সেখানে যাচ্ছি। জওহর আদেশটা ঠিকমতো শুনেছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য অপেক্ষা না করেই, হুমায়ুন তার কব্জি পর্যন্ত ঢাকা চামড়ার শক্ত দস্তানাযুক্ত হাত নেড়ে তাঁর দেহরক্ষীদের তাঁকে অনুসরণ করতে বলে এবং তার বাদামী ঘোড়ার পাজরে গুতো দিয়ে পর্বতশীর্ষের সংকীর্ণ ভূমিরেখা বরাবর জন্তুটাকে পুতগতিতে ধাবিত করে। কয়েক গজ যাবার পরেই শৈলশিরার দিকে মাটি ঢালু হয়ে নামতে শুরু করে এবং হুমায়ুন দূর থেকেই লক্ষ্য করে যে শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর একটা ভালো অংশ ইতিমধ্যে তাঁর অস্থায়ী বাঁধের উত্তরের প্রান্তসীমার পেছনে পৌঁছাতে সফল হয়েছে। তাঁর তবকি আর তীরন্দাজেরা পাথরের আড়াল থেকে তাদের দিকে গুলিবর্ষণ করছে। তারপরে সে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তীরন্দাজদের একটা দল ঘুরে দাঁড়ায় এবং ধনুক ফেলে দিয়ে পেছনের দিকে দৌড়াতে শুরু করে, নিজেদের শেরশাহের অশ্বারোহীদের সহজ নিশানায় পরিণত করে। নিজেদের পর্যানে উঠে দাঁড়িয়ে তারা তীরন্দাজদের পিঠ বরাবর তরবারি দিয়ে আঘাত করে, তাদের অধিকাংশকেই আক্ষরিক অর্থে কচুকাটা করে।

হুমায়ুন ভাবে, পদাতিক সৈন্যরা অভিজ্ঞতা থেকে কেবল যদি শিক্ষা নিত যে অশ্বারোহী যোদ্ধাদের কবল থেকে দৌড়ে পালানটা অসম্ভব। পাথরের আড়ালে অবস্থান করা এবং সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করাটা কেবল অনেকবেশী সম্মানজনকই না, সেই সাথে নিরাপদও। তার পেছন থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে আসতে, সে পর্যানে বসা অবস্থায় পেছনে তাকিয়ে তার অনুরোধে বাবা ইয়াসভালের কাছ থেকে আগত অশ্বারোহী যোদ্ধার দলটাকে দেখতে পায়। দলটা তাঁর নিজের সাথে একটা সমকেন্দ্রিক পথে রয়েছে এবং মিনিটখানেকের মধ্যে আর নিজেদের অগ্রসর হবার গতি লক্ষণীয়ভাবে না কমিয়ে, দলটা হুমায়ুনের দেহরক্ষীদের সাথে এসে যোগ দেয় এবং একটা সঘবদ্ধ দলের মতো তারা সবাই সামনের দিকে পুতবেগে এগিয়ে যায়।

আক্রমণ কর! আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহের পার্শ্বদেশে নিজের পদাতিক বাহিনীকে নিয়ে এসে সে তার অবস্থান মজবুত করার আগেই শত্রুকে আমাদের অবশ্যই তাড়িয়ে দিতে হবে। আক্রমণকারীদের ছোট ছোট দলে পৃথক করতে চেষ্টা কর। তাঁদের তাহলে সহজে ঘিরে ফেলে হত্যা করা যাবে।

হুমায়ুনের অশ্বারোহী দলটা যখন ঢাল বেয়ে নীচের রণক্ষেত্রের দিকে দুলকি চালে এগোচ্ছে, শেরশাহের অশ্বারোহীদের ভেতর থেকে অশ্বারূঢ় একদল তীরন্দাজ বের হয়ে আসে। হুমায়ুনের অশ্বারোহীদের লক্ষ্য করে তারা এক পশলা তীর নিক্ষেপ করেই দ্রুত পিছু হটে তাঁদের সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভিতরে ফিরে যায়। সকালের বাতাসে মৃত্যুর শীষ তুলে তীরগুলো ছুটে আসে এবং হুমায়ুনের অশ্বারোহীদের কেউ কেউ তাদের সঙ্গে থাকা ঢাল তুলে নিজেদের রক্ষা করতে ঘোড়ার গতি হ্রাস করে। অনেকগুলো ঘোড়া তাদের আরোহীদের ছিটকে ফেলে দিয়ে ভূপাতিত হয় প্রকারান্তরে যা আরো অন্যদের পতনের কারণ হয়ে পুরো আক্রমণের প্রণোদনা ভঙ্গ করে বা ছন্দপতন ঘটায়। হুমায়ুন অবশ্য তার লোকদের এগিয়ে যাওয়া বজায় রাখতে অনুরোধ করে, তার চারপাশে যারা রয়েছে তাদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠে, এসব বিরক্তিকর উৎপাত অগ্রাহ্য কর, তারা আবারও তীর ছোঁড়ার আগেই আমরা তাঁদের কাছে পৌঁছে যাব। সে তখন তাঁর বামদিক থেকে আরেকটা শব্দ ভেসে আসতে শুনে- শিলা আর প্রস্তরখণ্ডের একটা স্তূপের পেছন থেকে গাদাবন্দুকের গুলিবর্ষনের পটপট শব্দ। শেরশাহ তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে কিছু তবকিদেরও যে পাঠিয়েছিলেন বোঝা যায়।

হাসসান বাট্ট, তরুণ সেনাপতি হুমায়ুন আগের দিনই যাকে পদোন্নতি দিয়েছে, আক্রমণের একেবারে পুরোভাগের যোদ্ধাদের ভিতরে সে তার সাদা ঘোড়া আর ধুসর নীল পাগড়ির কারণে সহজেই চোখে পড়ে। গাদাবন্দুক থেকে নিক্ষিপ্ত একটা ধাতব বল তার ঘোড়ার মাথায় এসে আঘাত করতে ঘোড়াটা ভিত নড়ে যাওয়া ইমারতের ন্যায় হুড়মুড় করে আছড়ে পড়ে এবং হাস্সান বাট্ট পর্যান থেকে বিকট শব্দে মাটিতে পতিত হয়, হাতগুলো কস্তনীরমতো দুলছে, এবং শক্ত পাথুরে মাটিতে বেশ কয়েকবার গড়িয়ে যায়। সে প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে এরপরেও টলমল করে উঠে দাঁড়ায়। আক্রমণের জন্য ধেয়ে আসা তার অশ্বারোহী বাহিনীর মূল দলটার মাঝে হারিয়ে যাবার আগে হুমায়ুন শেষবারের মতো তাকে, উত্তোলিত তরবারি দুলিয়ে তাঁর সহযোদ্ধাদের এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে দেখে।

হুমায়ুন তাঁর সাহসিকতা নিয়ে খুব বেশী কিছু চিন্তা করার সুযোগ পায় না কারণ সে নিজে ততক্ষণে শেরশাহের অশ্বারোহীদের মাঝে পৌঁছে গেছে। কালো ঘোড়ায় উপবিষ্ট এক যোদ্ধার আন্দোলিত কস্তনীর ছোবল এড়াতে একপাশে সরে গিয়ে, সে লালচে হলুদ ঘোড়ায় আরূঢ় এবং ইস্পাতের বর্ম পরিহিত এক লম্বা লোকের দিকে এগিয়ে যায় নিশ্চিতভাবেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিক। লোকটাকে ঘিরে থাকা দুজন অশ্বারোহী সাথে সাথে নিজেদের বাহনের মুখ হুমায়ুনের দিকে ঘোরায়, সে তখন তাদের তরবারির আঘাত এড়াতে নীচু হয়ে রয়েছে এবং সেই অবস্থায় দুজনের একজনের মুখে বসন্তের দাগ ভর্তি শ্মশ্রুমণ্ডিত, খর্বকায় দেখতে- কাঁধে চোখের পলকে তরবারির কোপ বসিয়ে দিলে সে বাধ্য হয় হাত থেকে অস্ত্র ফেলে দিতে।

হুমায়ুন দ্রুত আধিকারিকের পাশে যাবার জন্য নিজের ঘোড়াকে তাড়া দেয়। লোকটা হুমায়ুনকে আঘাত করার নিমিত্তে তার হাতের লম্বা বাঁকান তরবারি তাক করে কিন্তু খুব কাছাকাছি অবস্থান করার ফলে হুমায়ুনের বর্ম ভেদ করার মতো। পর্যাপ্ত শক্তিতে সে তার তরবারি ঘোরাতে পারে না। আঘাতে প্রচণ্ডতা সত্ত্বেও হুমায়ুনকে একপাশে কাত করে ফেলে আর তার ঘোড়াও তাঁকে নিয়ে দূরে সরে আসে। দ্রুত টাল সামলে নিয়ে হুমায়ুন তাঁর বাহনের মুখ ঘোরাবার জন্য লাগাম টেনে ধরে এবং আক্রমণ করতে আধিকারিকের মুখোমুখি হয়। হুমায়ুনের তরবারির প্রথম আঘাত লোকটা তার সাথের ধাতব ঢাল তুলে ঠেকায় কিন্তু ভারী ঢালটা নামিয়ে হুমায়ুনের দ্বিতীয় আঘাত প্রতিহত করতে বড্ড দেরী করে ফেলে, আঘাতটা পাশ থেকে তাকে স্পর্শ করে, বক্ষস্থল আবৃতকারী বর্মটার কারণে সেই জায়গাটা অরক্ষিত ছিল। লোকটার গায়ে শেকলের তৈরী সূক্ষ বর্ম না থাকায় তরবারিটা মাংসপেশী এবং পাঁজরের উপস্থির গভীরে প্রবেশ করে। আধিকারিক লোকটা সহজাত প্রবৃত্তির কারণে হাত থেকে ঢাল ফেলে দেয় এবং নিজের দেহের ক্ষতস্থানের দিকে তাকিয়ে আতকে উঠে। হুমায়ুন পুররায় তরবারি চালায় এইদফা লোকটার গলা লক্ষ্য করে আড়াআড়িভাবে, আরেকটু হলেই লোকটাকে সে কবন্ধ করে ফেলেছিল এবং আধিকারিক লোকটা তার ঘোড়ার পর্যান থেকে পিছলে পড়ে যায়।

প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে, আধিকারিকের আরেকজন দেহরক্ষী এরপরে দুই মাথাযুক্ত রণকুঠার নিয়ে হুমায়ুনকে আক্রমণ করে। তার সাথে শীঘ্রই আরেকজন এসে যোগ দেয় এবং তারপরে আরেকজন তৃতীয়জন, দুজনের কাছেই লম্বা তরবারি, যার ফলার দুদিকই ধারাল। আক্রমণকারীদের হুমায়ুন কাছে আসতে দেয় না, তাঁর বাদামী রঙের ক্ষিপ্রগামী ঘোড়াটা চক্রাকারে ঘোরাতে থাকে এবং তাদের আঘাত ঠেকাতে থাকে, যদিও কারও একটা ধারাল তরবারি তার গালে হাল্কা আচড় দিয়েছে, যতক্ষণ না তার নিজস্ব দেহরক্ষীদের কয়েকজন দ্রুত তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। তার দুই আক্রমণকারীকে অচিরেই পাথুরে মাটিতে, বুকে মাথায় হুমায়ুনের তরবারির মৃত্যু স্মারক নিয়ে টানটান হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তৃতীয়জন হাত থেকে তরবারি ফেলে দিয়ে এবং পালাতে থাকে, হুমায়ুনের দেহরক্ষীদের একজন তার উরুতে বর্শা দিয়ে বেমক্কা আঘাত করায় রক্ত সেখানের ক্ষতস্থান থেকে তার পর্যাণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে এবং তাঁর হাল্কা রঙের ঘোড়াকে রক্তরঞ্জিত করে তুলেছে।

আমরা শেরশাহের অশ্বারোহী বাহিনীর একটা বিশাল অংশকে তাড়িয়ে দিয়েছি। তার তবকি আর তীরন্দাজেরাও পিছু হটেছে, রুদ্ধশ্বাসে একজন আধিকারিক তাঁকে জানায়।

দারুণ। আমাদের তবকি আর তীরন্দাজদের শেরশাহের লোকেরা পাথরের। আড়ালে যেখানে অবস্থান করছিল সেখানে মোতায়েন কর। ওখানে যেসব মালবাহী শকট রয়েছে তাঁদের কয়েকটাকে উল্টে দিয়ে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কর এবং শেরশাহ যদি আবারও আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহের পার্শ্বদেশে আক্রমণ করতে চেষ্টা করে তাঁদের হুশিয়ার করতে কয়েকটা কামানকে গোলাবর্ষণের জন্য প্রস্তুত রাখা।

তার লোকেরা কাজে লেগে পড়ে, কাঠের অতিকায় মালবাহী শকটগুলোকে ধাক্কা দিয়ে এবং টেনে নিয়ে এসে সেগুলোকে উল্টে দেয় এবং কামান স্থানান্তরের জন্য ষাড়ের পাল নিয়ে আসলে, হুমায়ুন ঘোড়ায় চড়ে কয়েকশ গজ দূরে চূড়ার উপরে একটা নির্দিষ্ট স্থানের দিকে এগিয়ে যায়, যেখান থেকে পুরো রণক্ষেত্রটা ভালো করে অবলোকন করতে এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবার অবকাশ পাবে। সেখানে পৌঁছাতে, সে দেখে তাঁর সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষে গৃহীত হয়ে গিয়েছে। শেরশাহের অশ্বারোহী যোদ্ধারা প্রায় পৌনে এক মাইল দূরে তাঁর তৈরী মাটির অস্থায়ী বাঁধের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করেছে এবং তাঁদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে তার লোকেরা পিছু হটছে।

কি ব্যাপার? হুমায়ুন খয়েরী আর সাদার মিশেল দেয়া একটা ঘোড়ায় উপবিষ্ট শ্যাম বর্ণের খর্বকায় এক আধিকারিকের কাছে জানতে চায়, যে প্রায় পঞ্চাশজন পোড় খাওয়া চেহারার বাদশানি তীরন্দাজের একটা দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

সুলতান, আমি নিশ্চিত বলতে পারছি না, কিন্তু আমাকে বলা হয়েছে শেরশাহের প্রথম আক্রমণ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ উভয় প্রান্ত দিয়ে বৃত্তাকারে ঘিরে ফেলার মাধ্যমে আমাদের অপ্রস্তুত করার পরে, সে অশ্বারোহী যোদ্ধার দ্বিতীয় একটা দলকে চূড়া থেকে আস্কন্দিত বেগে ধেয়ে এসে আমাদের প্রতিরক্ষা বাঁধের ঠিক মাঝ বরাবর নিচ্ছিদ্র বিন্যাসে আক্রমণের আদেশ দেয়, প্রতিরক্ষা ব্যুহের প্রান্তদেশের সুরক্ষায় আমরা সেখান থেকে সৈন্য সরিয়ে নিয়েছি বলে- এমনটা যে ঘটবে, আমি নিশ্চিত, সে আগেই জানতো। এই স্থানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে তারা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত আমাদের অবশিষ্ট সৈন্যদের প্রতিরোধ একেবারে গুঁড়িয়ে দেয় এবং আমাদের সেনাছাউনির একেবারে কেন্দ্রস্থলে এসে হাজির হয়। বাবা ইয়াসভালো শিলাস্তরের পাদদেশে ওখানে একটা প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তুলে আমাদের সবাইকে আদেশ করেছেন, সেই অবস্থানের দিকে অগ্রসর হয়ে সেখানকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

আধিকারিকের বাহুর নির্দেশিত দিকে তাকিয়ে, হুমায়ুন বিশৃঙ্খল অশ্বারোহী যোদ্ধাদের একটা বিশাল ভীড় দেখতে পায় এবং কোননামতে বাবা ইয়াসভালের হলুদ নিশান খুঁজে পায়। তুমি আর তোমার লোকদের সাহসিকতার প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা আছে। আমরা নিশ্চয়ই শেরশাহকে তাড়িয়ে দেব। আমি আমার অশ্বারূঢ় দেহরক্ষীদের ডেকে পাঠিয়েছি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের পুরোভাগে অবস্থান করবো।

সুলতান।

হুমায়ুন ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নেয় এবং তাঁর দেহরক্ষীদের ইশারায় অনুসরণ করতে বলে, শিলাস্তর অভিমুখে পুতবেগে চূড়ার ঢাল বরাবর ফিরতি পথে এগিয়ে যায় যেখানে মূল লড়াই কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সে ঘোড়া দাবড়ে এগিয়ে যেতে যেতে, শেরশাহের আরো বেশী বেশী সংখ্যক যোদ্ধাদের তার তৈরী অস্থায়ী মাটির বাঁধের প্রতিরক্ষাহীন ফাটল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে, শিলাস্তরের চারপাশে চলমান যুদ্ধে যোগ দিতে দেখে। সে শিলাস্তরের কাছাকাছি পৌঁছে তারপক্ষের পদাতিক সৈন্যের একটা ছোট দলের মুখোমুখি হয়, যারা নিজেদের অবস্থান ত্যাগ করে পালিয়ে আসছে যা এখনও সরাসরি আক্রমণের সম্মুখীন হয়নি। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে সে চিৎকার করে তাদের ফিরে আসতে বলে যে, এখনও সব আশা শেষ হয়ে যায়নি। কিন্তু পলকহীন আর আতঙ্কিত চোখে, তাঁরা কনৌজের এবং নিকটবর্তী গঙ্গায় সেখানের পারাপারের স্থানের উদ্দেশ্যে দৌড়াতে থাকে।

এক কি দুই মিনিট পরেই, শিলাস্তরের চারপাশে মানুষ আর ঘোড়ার একটা জীবন্ত জটলার প্রান্তদেশে হুমায়ুন নিজেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। সে আরোহীবিহীন একটা ঘোড়াকে পাশ দিয়ে দৌড়ে যেতে দেখে জন্তুটার পেটে একটা বিশাল কাটা স্থান থেকে অবলা প্রাণীটার পরিপাকতন্ত্রের একটা কিংদয়শ বের হয়ে আছে। মাটিতে অনেকগুলো দেহ হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে, মৃত্যুর কারণে আক্রমণকারী আর প্রতিরোধকারীদের এখন আর পৃথক করা যায় না। বাবা ইয়াসভালের সৈন্যরা মনে হয় যেন ধীরে ধীরে জমির অধিকার ত্যাগ করছে এবং তাঁদের শিলাস্তরের পার্শ্বদেশে দুরারোহভাবে খাড়া জমিতে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয় কিন্তু হুমায়ুন এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে মাঝে বাবা ইয়াসভালের হলুদ নিশান উডডীন অবস্থায় দেখতে পায়। তাঁর দেহরক্ষী দলের পক্ষে যতটা সম্ভব অনুসরণের দায়িত্ব দিয়ে, সে কালবিলম্ব না করে সেদিকে আক্রমণ করতে ছুটে যায়।

হুমায়ুনের বাদামী ঘোড়াটা মাথায় মুখব্যাদান করা এক রক্তাক্ত ফাটল নিয়ে পড়ে থাকা অশ্বারোহীর ক্ষতবিক্ষত দেহে হোঁচট খায় কিন্তু হুমায়ুন নিজে একজন দক্ষ ঘোড়সওয়ার হবার কারণে আর তাঁর ঘোড়াটাও ক্ষিপ্রগামী বলে তারা দ্রুত ভারসাম্য ফিরে পায় এবং হুমায়ুনকে নিয়ে জন্তুটা আক্রমণের উদ্দেশ্যে হুমায়ুনকে শত্রুর আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। সে পর্যানে বসেই শেরশাহের এক অশ্বারোহীকে তার তরবারি আলমগীর দিয়ে একবার আঘাত করে, তার দ্বিতীয় আঘাতে ঘোড়াটার গলায় একটা ক্ষতচিহ্নের জন্ম দেয়, জন্তুটা দ্বিখণ্ডিত শ্বাসনালী নিয়ে মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ার আগে তার আরোহীকে শূন্যে ছুঁড়ে দেয়, জন্তুটা পেছন থেকে হুমায়ুনকে আক্রমণের পায়তারা করতে থাকা আরেক অশ্বারোহীকেও ধরাশায়ী করে। বাবা ইয়াসভালের কাছ থেকে হুমায়ুন এখন কেবল বিশ গজের মতো দূরে রয়েছে। রণক্ষেত্রের জটলার মাঝে একটা ফাঁক দেখতে পেয়ে, হুমায়ুন পরস্পরের সাথে ভীষণভাবে যুদ্ধমান অশ্বারোহীদের ভিতর দিয়ে তাকে লক্ষ্য করার আগেই তার সেনাপতির দিকে এগিয়ে যায়।

সে এগিয়ে যাবার ফাঁকে লক্ষ্য করে যে বস্তুত পক্ষে বাবা ইয়াসভালের চারপাশে কেবল ডজনখানেকের মতো তাঁর যোদ্ধারা রয়েছে। তাঁদের ভিতরে তিন কি চারজন আবার নিজেদের ঘোড়া খুইয়েছে এবং বাবা ইয়াসভালো আর তার সহযোদ্ধারা শেরশাহের অসংখ্য আক্রমণকারীকে আটকে রেখে তাদের রক্ষা করতে চেষ্টা করছে। তার চোখের সামনে অবশ্য ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁদের আক্রমণকারীদের একজন- লম্বা একটা বর্শা নিয়ে বেগুনী পাগড়ি পরিহিত বিশালদেহী এক যোদ্ধা, যার মুখ ভর্তি কালো চাপ দাড়ি- মাটিতে বাহনহীন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর একজনকে দলছুট হতে দেখে নিজের ঘোড়ার পাজরে গুতো দিয়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। মাটিতে দাঁড়ান লোকটা তার ঢাল নিজের সামনে এনে বর্শার সূচাল অগ্রভাগ প্রতিহত করলেও আঘাতের প্রচণ্ডতায় সে মাটিতে ছিটকে যায়। লোকটা তার আক্রমণকারীর ঘোড়ার খুরের নীচে থেকে মরীয়া হয়ে গড়িয়ে সরে গিয়ে নিজের সহযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে কিন্তু সে যখন এসবে ব্যস্ত তখন বেগুনী পাগড়ি পরিহিত অশ্বারোহী পুনরায় নিজের বর্শা তুলে নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে নিশানা স্থির করে, লোকটার পেট বর্শা দিয়ে এফেঁড়ওফোঁড় করে দেয় বাবা ইয়াসভালের অন্যান্য যোদ্ধারা তাকে বাধা দেয়ার সময়ই পায় না। বেগুনী পাগড়ি পরিহিত মৃত্যুদূত রক্ত রঞ্জিত বর্শার অগ্রভাগ আহত লোকটার দেহ থেকে দ্রুত মোচড় দিয়ে বের করে নিশ্চিতভাবেই সে একজন আধিকারিক পিছিয়ে গিয়ে নিজের লোকদের ভীড়ের ভিতরে হারিয়ে যায়। হুমায়ুন যখন বাবা ইয়াসভালের কাছে যাবার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে তখনই এক মিনিটেরও কম সময়ে মর্মান্তিক ঘটনাটা ঘটে যায়।

সুলতান, আপনার দেহরক্ষীরা সব কোথায়? বাবা ইয়াসভালো হাত নেড়ে তার নিজের লোকদের পুনরায় নিচ্ছিদ্র ব্যুহে বিন্যস্ত করার অবসরে জিজ্ঞেস করেন। হুমায়ুন সহসা বুঝতে পারে যে তাঁদের একজনও শত্রুর আক্রমণ মোকাবেলা করে তাকে অনুসরণ করতে সফল হয়নি এবং যে পথ দিয়ে সে এখানে এসেছে সেই করিডোরটা এখন শেরশাহের যোদ্ধারা পুরোপুরি দখল করে নিয়েছে। তাঁরা তাঁকে এবং বাবা ইয়াসভালো আর তার সঙ্গীদের প্রায় ঘিরে ফেলেছে এবং পশ্চাদপসারণ বা সাহায্য আসবার যেকোনো সম্ভাবনা থেকে তাঁদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে।

বাবা ইয়াসভালো, যতক্ষণ আমাদের আরও যোদ্ধারা এসে পৌঁছে বা এখান থেকে পালাবার কোনো রাস্তা আমরা খুঁজে পাই ততক্ষণ নিজেদের আর পরস্পরকে রক্ষা করার জন্য আমাদের উচিত হবে ঘনবদ্ধ হয়ে অবস্থান করা। আমরা যদি শৈলশিরার দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অবস্থান করি তাহলে অন্তত আমাদের পিঠ সুরক্ষিত থাকবে।

হুমায়ুন আর বাবা ইয়াসভালো একত্রে তাঁদের অন্য সৈন্যদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে, কিন্তু তারা যখন তাঁদের আদেশ পালন করার প্রয়াস নেয়, সেই মুহূর্তে শেরশাহের তিনজন অশ্বারোহী এক ঘোড়সওয়ারকে ঘিরে ফেলে এবং তাঁদের একজন লোকটাকে তার বাহন থেকে কস্তনীর এক বেকায়দা আঘাতে মাটিতে ফেলে দেয়। মাটিতে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা লোকটার এক সঙ্গী তাঁকে বাঁচাবার উদ্দেশ্যে নিজের ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতে গেলে, দুই মাথাবিশিষ্ট রণকুঠারের মোক্ষম আঘাতে সাথে সাথে মারা যায়, কুঠারটা তার কণ্ঠমণিতে আঘাত করে তাকে কবন্ধ করে দেয়। শেরশাহের অন্য আরেকজন যোদ্ধা মাটিতে পরে যাওয়া লোকটার ভবলীলা কস্তনীর এক ঘায়ে নিভিয়ে দেয়। সেই সময়েই বেগুনী পাগড়ি পরিহিত সেই আধিকারিক বাবা ইয়াসভালের ঘোড়া খোয়ান লোকদের একজনকে তার রক্ষাকারীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং বর্শা দিয়ে তার কুচকিতে আঘাত করে। আহত সৈন্যটার পা আর গোড়ালি জবাই করা পশুর মতো কয়েক মিনিট মাটিতে আছড়াতে থাকে এবং তারপরে সে নিথর হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে।

বাবা ইয়াসভালো আর হুমায়ুনের সাথের মাত্র নয়জন তোক এখন বেঁচে আছে এবং তাঁদের মধ্যে দুইজনের আবার কোনো ঘোড়া নেই এবং আরেকজন মাথায় মারাত্মক আঘাত পেয়েছে। হুমায়ুন আর তাঁর সৈন্যরা যখন শৈলশিরার পার্শ্বদেশ থেকে মাত্র কয়েকগজ দূরে অবস্থান করছে, বেগুনী পাগড়ি পরিহিত আধিকারিক তখন শেরশাহের অশ্বারোহী যোদ্ধাদের চূড়ান্ত আক্রমণ শুরু করার জন্য ইশারা করে। শৈলশিরার এই স্থানটা প্রায় বিশ ফিট উঁচু এবং প্রায় খাড়াভাবে উপরের দিকে উঠে গিয়েছে, স্পষ্টতই ঘোড়া নিয়ে সেখানে আরোহন করাটা অসম্ভব এবং খালি হাতে দেয়াল বেয়ে উঠার মতো কোনো রাস্তা চোখে পড়ে না।

বাবা ইয়াসভালের সঙ্গের নয়জন লোকের মধ্যে সদ্য কৈশোর অতিক্রম করা একজন তূর্যবাদক রয়েছে, যার মসৃণ গালে এখনও নাপিতের ক্ষুর পড়েনি। তাঁর বাদ্যযন্ত্র এখনও তার পিঠের সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। বাবা ইয়াসভালো তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে তোমার সঙ্গে থাকা তূর্য এবার বাজাও যাতে আমরা বাইরে থেকে সাহায্য পেতে পারি। সে যখন তূর্যধ্বনি করবে তোমরা বাকিরা তখন তাঁকে আগলে রাখবে। তূর্যবাদক ছেলেটা তাঁর পিঠ থেকে তিন ফিট লম্বা তূর্যটা খুলে হাতে নেয় এবং সেটা তার ঠোঁটের কাছে ধরে। প্রথমে অবশ্য কোনো শব্দ হয় না সদ্য যুবা ছেলেটা তখন চোখে মুখে উদ্বেগ আর আতঙ্ক নিয়ে বাবা ইয়াসভালের দিকে তাকায়।

বাছা, শান্ত হও, বাবা ইয়াসভালো অভয় দেয়ার সুরে বলে। যুদ্ধের উত্তেজনা আর ভয়ে তোমার মুখ শুকিয়ে গেছে। কেশে গলাটা একটু খাকরে নিয়ে জীহ্বা দিয়ে ঠোঁটটা একটু ভিজিয়ে নাও।

যুবক ছেলেটা অনুগত ভঙ্গিতে কাশে এবং পুনরায় চেষ্টা করার আগে জীহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়। এইবার ভূর্যের পিতলের তৈরী মুখ থেকে উচ্চনাদে শব্দ ধ্বনিত হয়- হুমায়ুনের যোদ্ধাদের পুনরায় একত্রিত হবার আহ্বান।

আবার বাজাও বাছা, এবং তারপরে আবার।

তরুণ তূর্যবাদককে রক্ষা করতে গিয়ে হুমায়ুনের তিনজন অশ্বারোহী বীরের মতো মৃত্যুবরণ করার পরে, বেগুনী পাগড়ি পরিহিত মূর্তিমান ব্রাস হয়ে উঠা সেই আধিকারিক সবাইকে পাস কাটিয়ে সহসা নিজের কালো ঘোড়াটা নিয়ে তূর্যবাদকের দিকে এগিয়ে আসে এবং তার হাতের লম্বা বর্শাটা দিয়ে ছেলেটার ডান বাহুমূলে, ঠোঁটের কাছে পিতলের তৈরী ভারী তূর্যটা ধরে থাকার কারণে অরক্ষিত, আঘাত করে তাকে ঘোড়ার পিঠ থেকে ফেলে দেয়। সে মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় তার হন্তারকের বর্শার আরেকটা আঘাতে মারা যায়।

হুমায়ুন, শেরশাহের আরেকজন অশ্বারোহী যোদ্ধাকে অবশিষ্ট দুজন লোকের একজনের দিকে, যারা মাটিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে, এগিয়ে যেতে দেখে তার নিজের ঘোড়া নিয়ে হন্তারকের আক্রমণ প্রতিহত করতে এগিয়ে যায়, শত্রুর নিশানা লক্ষ্য করে এগিয়ে যাওয়া আটকে দেয়। শত্রুপক্ষের লোকটা তার ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে টেনে ধরে হুমায়ুনকে পাশ কাটিয়ে যাবার জন্য নিজের বাহনকে পরিচালিত করতে চেষ্টা করতে, হুমায়ুন তাঁর কব্জিতে এক কোপ দিয়ে একটা হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে লোকটা ঘোড়ার উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং বিশৃঙ্খলার ভিতরে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। হুমায়ুন হাত বাড়িয়ে দিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে নিজের ঘোড়ার উপরে টেনে তুলে নিজের পিছনে বসিয়ে দেয়। কিন্তু সে যখন লোকটাকে টেনে তুলতে ব্যস্ত তখন অজ্ঞাতনামা হন্তারকের নিক্ষিপ্ত বর্শা হতভাগ্য সেই সৈনিকের বুক ভেদ করে যায় এবং আরেকটা বর্শা এসে হুমায়ুনের ঘোড়ার গলায় বিদ্ধ হয়। বিশাল ঘোড়াটা একবার টলমল করে উঠে তারপরে হুড়মুড় করে মাটিতে আছড়ে পড়ে, ক্ষতস্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছে।

হুমায়ুন তার পর্যান থেক পিছলে নেমে আসে এবং বেগুনী পাগড়ি তাকে আক্রমণ করার জন্য পাগলের মতো ঘোড়ার পাজরে গুতো দেয়া শুরু করলে সে শৈলশিলার খাড়া দেয়ালের দিকে দৌড়াতে শুরু করে এবং অশ্বারোহীর মারাত্মক নিশানা ব্যর্থ করতে ডানে-বামে আকস্মিক বাকা-চোরা পথে দৌড়াতে থাকে। শৈলশিরার পাথুরে দেয়ালের কাছাকাছি পৌঁছাবার পরে, হুমায়ুন বুঝতে পারে আসলেই দেয়ালটা বেয়ে উপরে উঠা সম্ভব না, বিশেষ করে পেছনে খুব কাছে থেকে যদি লম্বা একটা বর্শা নিয়ে কোনো হন্তারক ধাওয়া করতে থাকে। উপায়ন্তর না দেখে হুমায়ুন এবার আক্রমণকারীর মুখোমুখি হয়, তাঁর ডানহাতে আলমগীর আর বামহাতে কোমরের পরিকর থেকে বের করে আনা প্রায় ফুটখানেক লম্বা করাতের মতো খাজকাটা ফলাবিশিষ্ট একটা খঞ্জর। সে তার পায়ের গোড়ালীর উপরে ভর দিয়ে আবর্তিত হতে থাকে যাতে করে সে এই পথ দিয়ে দ্রুতগতিতে সামনের দিকে দৌড়াতে পারে, এবং হুমায়ুন তাঁকে ধাওয়া করা আধিকারিক কখন আক্রমণ করবে সেজন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

আধিকারিক লোকটা কয়েক সেকেণ্ড পরেই আক্রমণ করে, তার হাতের বর্শার সূচালো অগ্রভাগ হুমায়ুনের দিকে তাক করা সে একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপরে লাফ দিয়ে একপাশে সরে এসে বর্শার ফলাটা এড়িয়ে যায়। আক্রমণ ব্যর্থ হতে লোকটা একপাশে সরে গিয়ে তারপর পুনরায় আক্রমণ করার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। আক্রমণকারী যখন প্রস্তুত হচ্ছে, বাবা ইয়াসভালো- এখন তারও ঘোড়া নেই এবং মুখে তরবারির আঘাতে সৃষ্ট একটা গভীর ক্ষত থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে- দৌড়ে হুমায়ুনের সামনে আসে এবং আধিকারিক আক্রমণ করতে ছুটে আসতে তার ঘোড়াকে আঘাত করে। সে অতিকায় জন্তুটাকে ভূপাতিত করতে সফল হয় বটে কিন্তু তলপেটে অশ্বারোহীর বর্শার পুরো ফলাটা গ্রহণ করে তাঁকে এর মূল্য পরিশোধ করতে হয়। হুমায়ুন বেগুনী পাগড়ি পরিহিত লোকটার উদ্দেশ্যে সামনের দিকে দৌড়ে যায় সে, ঘোড়ার পিঠ থেকে আছড়ে পরার কারণে যদিও তাঁর বুকের সব বাতাস বের হয়ে গিয়েছে, অবশ্য দ্রুতই তরবারি বের করে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায় আলমগীর দিয়ে হুমায়ুনের প্রথম আঘাত মোকাবেলা করতে। সে তার দ্বিতীয় আঘাত কোনোমতে প্রতিহত করে কিন্তু লোকটা যখন সেটা ঠেকাতে যায় হুমায়ুন তাঁর বাম হাতের খঞ্জর দিয়ে লোকটার গলায় আঘাত করে এবং খঞ্জরের খাঁজকাটা ফলাটা গলায় ঢুকিয়ে দেবার সময়ে মোচড় দেয় যাতে প্রাণসংহারক ক্ষতি হয়। আধিকারিকের উষ্ণ রক্ত ছিটকে উঠে হুমায়ুনের হাত ভিজিয়ে দেয়।

সুলতান, আমরা তূর্যবাদন শুনেছি, শিলাস্তরের উল্লম্ব উপরিতল থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। হুমায়ুন উপরের দিকে তাকায়। তার লোকদের কয়েকজন তাঁদের মুখাবয়বের বৈশিষ্ট্য, এবং তাদের পরণের কমলা রঙের পোষাকের রঙ আর ছাট দেখে বোঝা যায় তাঁরা তাঁর অনুগত রাজপুত রাজার সৈন্য- শিলাস্তরের উপরিভাগে পৌঁছাতে সফল হয়েছে এবং কিনারা দিয়ে এখন নীচের দিকে উঁকি দিচ্ছে। হুমায়ুন যখন পুনরায় তাঁর আক্রমণকারীর মুখোমুখি হবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। তার মনে হয় শিলাস্তরের নিম্নভাগে যারা আটকা পড়েছিল তাঁদের ভিতরে কেবল সে একাই বেঁচে আছে- রাজপুত বাহিনীর একজন সৈন্য কালো শরযষ্টিযুক্ত একটা বাণ ছুঁড়ে মারতে শেরশাহের একজন্য অশ্বারোহীর ঘোড়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরবর্তী তীরটা আরেকজন যোদ্ধার পায়ে বিদ্ধ হয়। হুমায়ুনকে আক্রমণকারী লোকগুলো এবার নিজেদের গুটিয়ে নেয় যেন তারা তাদের পরবর্তী করণীয় সম্বন্ধে নিজেদের ভিতরে আলোচনা করবে। তারা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত সেই কয়েক সেকেণ্ডের ভিতরে রাজপূত তীরন্দাজ নিজের মাথার কমলা রঙের পাগড়ি খুলে ফেলে। সে কাপড়ের টুকরোটার একটা প্রান্ত কাপড়টা প্রায় দশফিট লম্বা হবে শিলাস্তরের কিনারা থেকে নীচের দিকে ছুঁড়ে দেয়, কাপড়টা হুমায়ুনের মাথার ফিট খানেক উপরে এসে শেষ হয়, যেখানে এটা বাতাসে মৃদুমন্দ দুলতে থাক।

সুলতান আমার পাগড়ির কাপড়টা শক্ত করে আকড়ে ধরেন। আমি আপনাকে নিরাপদ স্থানে টেনে তুলে আনব।

হুমায়ুন নিজের চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখে এবং ইতস্তত করে। বাবা ইয়াসভালো এখনও খাড়া শিলাস্তরের যেখানে আহত হয়েছিলেন সেখানেই শুয়ে আছেন। খোঁচা খোঁচা ধুসর চুলযুক্ত তার শিরোস্ত্রাণবিহীন মাথা এই মুহূর্তে বুকের উপরে ঝুঁকে আছে এবং এখনও তার নাক আর ঠোঁটের কিনারা দিয়ে টপটপ করে রক্ত তার বুকের কাছে বর্মে চুঁইয়ে পড়ছে। তাঁর হাত দুটো দেহের দুপাশে পড়ে আছে কিন্তু তার দুই পা দুদিকে ছড়ান এবং তলপেট থেকে এখনও বর্শার ফলাটা বের হয়ে আসে। তিনি নিশ্চিতভাবেই মারা গেছেন এবং হুমায়ুন তার অন্য কোনো লোকদের ভিতরে প্রাণের স্পন্দন দেখতে পায় না।

হুমায়ুন বুঝতে পারে, তার আক্রমণকারীরা যেকোনো মুহূর্তে আবার কাছে এগিয়ে আসতে চেষ্টা করবে তাকে শেষ করে দেবার জন্য। রাজবংশ এবং নিয়তি উভয়ের প্রতি তাঁর দায়িত্ব হল যেকোনো মূল্যে নিজেকে রক্ষা করা। হাতবদল করে সে আলমগীর বামহাতে ধরে এবং ডানহাত উপরে তুলে কমলা রঙের পাগড়ির কাপড়টা শক্ত করে আকড়ে ধরে। সে সাথে সাথে টের পায় যে কাপড়টা টানটান হয়ে উঠেছে এবং সে যখন পাহাড়ী শিলার খাড়া উপরিভাগ বেয়ে আরোহন থাকে তখন বাড়তি প্রণোদনা আনয়নের জন্য সে নিজেও উঠতে আরম্ভ করে। তাঁর আক্রমণকারীরা, এতোক্ষণে বুঝতে পারে যে সে এখনই পালিয়ে যাবে, তাঁর দিকে হুড়মুড় করে ছুটে আসে।

হুমায়ুন বেকায়দা ভঙ্গিতে তাঁদের একেবারে সামনের জনকে দেখে এবং পুনরায় উঠে বসার জন্য পায়তারা শুরু করে। তাকে বিস্মিত হতে দেখে সে চমকে উঠে।

আলমগীরের বা বামহাতে ধরে হুমায়ুন বেকায়দা ভঙ্গিকে তাদের একেবারে সামনে আঘাত করে কিন্তু আঘাতটা করার উদ্দেশ্যে সফল হয়। সে উপরে দিকে তাকিয়ে থাকার সময় সে আরেকটু হলেই তাঁদের সৈন্যরা দুদলে ভাগ হয়ে গিয়েছে এবং নিজের বাসায় ধারাল অস্ত্র দিয়ে কিছু করার আগে সবকিছু ভালো করে ধুয়ে নেয়া উচিত। সহসা তার আক্রমণকারীরা বুঝতে পারে সে একটু পরেই পালিয়ে যাবে, তারা তাঁর দিকে মরিয়া হয়ে ছুটে আসে।

হুমায়ুন বামহাতে ধরা আলমগীর দিয়ে বেকায়দা ভঙ্গিতে আন্দোলিত করতে থাকে এবং ধারাল ফলা দিয়ে মানুষটার কপালে হয়ত কিছু আঁকা যাবে এবং হুমায়ুন উপরের দিকে তাকালে সে নির্বিকার ভাবে ত্বকের প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটা অংশ দেখতে পায়, যেখান থেকে তার চোখে রক্ত গড়িয়ে পড়েছে। একই সাথে রাজপূত লোকটা নিজের রণকুঠার পরবর্তী আক্রমণকারীকে ছুঁড়ে মারলে হুমায়ুন টের পায় তার আশেপাশের বাতাস নড়ে উঠেছে এবং কুঠারটা লোকটার বাহুর উপরিভাড়ে গেঁথে যায় এবং সেও পিছনের দিকে উল্টে পড়ে যায়। তৃতীয় আক্রমণকারী মুহূর্তের জন্য ইতস্তত করে এবং ইতস্তত করার কারণে হুমায়ুন সুযোগ পেয়ে দ্রুত দেয়াল বেয়ে উঠতে থাকে এবং কিনারা থেকে নিজেকে টেনে উপরে তুলে এবং শিলাস্তরে উপরে উঠে আসে। সে উত্তেজনার কারণে খেয়ালই করে না তার ডানহাতের উপরিভাগ আর কব্জির ক্ষতস্থানের মুখ খুলে গেছে যখন সে নিজেকে টেনে টেনে উপরে তুলে এনেছে এবং এখন তুমূল বৃষ্টি হচ্ছে।

সুলতান। রাজপুত যে লোকটা পাগড়ির কাপড় নীচে ছুঁড়ে দিয়েছিল সে হুমায়ুনকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করার ফাঁকে সনির্বন্ধ কণ্ঠে কথা বলতে থাকে। আমরা আপনার জন্য একটা নতুন ঘোড়া নিয়ে এসেছি। আপনার সৈন্যরা সবজায়গা থেকে পিছু হটছে। আপনি যদি এখনই এখান থেকে চলে না যান তাহলে শক্রর হাতে ধরা পড়বেন বা মারা যাবেন।

চারপাশে তাকিয়ে হুমায়ুন বুঝতে পারে যে তার সামনে আসলেই দুটো পথ খোলা আছে- আরেকদিন লড়াই করার জন্য এখন পশ্চাদপসারণ করা বা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করা। তার যোদ্ধার মানসিকতার কাছে শেষের পথটা যতই আবেদনপূর্ণ মনে হয়, সে অনুভব করে যে আকাঙ্খ আর বেঁচে থাকার অভিলাষ এখনও তার ভিতরে তীব্রভাবে প্রজ্জ্বলিত রয়েছে এবং নিয়তি তাঁর সৌভাগ্যবান সন্তানের জন্য ভবিষ্যতের গর্ভে ভালো কিছু জমিয়ে রেখেছেন সাহসী কিন্তু নিষ্ফল মৃত্যুর বদলে। তাঁকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে।

আমরা তাহলে ঘোড়া নিয়ে বের হই এবং আমাদের পক্ষে আমাদের সৈন্যবাহিনীর যতবেশী জনকে সম্ভব পুনরায় নতুন করে দলভুক্ত করি।

২.৪ ভাইয়ে ভাইয়ে রেষারেষি

০৯. ভাইয়ে ভাইয়ে রেষারেষি

উষ্ণ, নিথর হয়ে থাকা বাতাস, ইতিমধ্যে আর্দ্রতায় ভারী হয়ে উঠেছে যা সপ্তাহখানেকের ভিতরেই আকাশ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়বে, অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তার পরনের ইস্পাতের শিকল দিয়ে তৈরী বর্ম আর মিহি সুতির কাপড় দিয়ে তৈরী জোব্বার নীচে, হুমায়ুনের পিঠ বেয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। তাঁর মুখাবয়বেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। অসহিষ্ণুভাবে সে একটা রুমাল দিয়ে মুখটা মুছতে গিয়ে টের পায়ে নোনতা বিন্দুগুলো প্রায় সাথে সাথে আবার পূর্বের আকৃতি লাভ করেছে। সে পুতবেগে যখন, সামনে দেহরক্ষী আর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের একটা দল তাঁর অনুগত কমলা রঙের আলখাল্লা পরিহিত রাজপুতরা সেখানে রয়েছে তাঁর পেছনে পেছনে আসছে, আগ্রা অভিমুখে ফিরে চলেছে তাঁর তাম্রবর্ণের ঘোড়াটার খুরের ছন্দোবদ্ধ বোলে, মনে হয় যেন তিক্ত একটা বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। পরাজয় আর ব্যর্থতা। পরাজয় আর ব্যর্থতা। শব্দ দুটো তার মাথার ভিতরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে কিন্তু তারপরেও যা ঘটে গিয়েছে সেই পুরো। বিষয়টা তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

সে সৈন্যদের যে দলকে পুনরায় সমবেত করার আশা করেছিল তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে বাতাসে মিলিয়ে গিয়েছে। কেউ কেউ তাদের নিজ নিজ প্রদেশে ফিরে গিয়েছে কিন্তু বেশীরভাগই শেরশাহের অগ্রগামী বাহিনীর সামনে থেকে পালিয়ে গিয়েছে। তারা বিশ্বাস করে যে এক অন্ত্যজ ঘোড়ার কারবারীর ছেলে মোগলদের ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম… যে কোনো দৈহিক ক্ষতের চেয়েও এর বিশালতা অনেকবেশী যন্ত্রণাদায়ক, কিন্তু তারচেয়েও মারাত্মক এই ভাবনাটা যে যুদ্ধক্ষেত্রে সে অমিত সাহসের সাথে লড়াই করা সত্ত্বেও সে এমন একটা ব্যাপার মেনে নিয়েছে।

তার সৌভাগ্য এখন কোথায় গেল? পানিপথে, টসটসে পাকা একটা ডালিমের মতো হিন্দুস্তান মোগলদের হাতে এসে ধরা দিয়েছিল। বাহাদুর শাহ আর লোদি রাজ্যাভিযোগীকে হেলাফেলা করে মাত দেবার পরে তাঁর বুঝি ধারণা হয়েছিল মোগল সাম্রাজ্য অজেয়। সে সম্ভবত তাঁর নতুন সাম্রাজ্যের প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারেনি- বিদ্রোহ এই অঞ্চলের সহজাত বৈশিষ্ট্য। সে যত অভ্যুত্থানই দমন করুক, যত বিদ্রোহীকেই কবন্ধ করুক, তারপরেও আবারও বিদ্রোহের সম্ভাবনা ঠিকই রয়ে যাবে। শেরশাহের সাফল্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে, শক্ররা এখন দক্ষিণ আর পশ্চিমদিক থেকে আর সেই সাথে পূর্বদিক থেকেও হুমকি দিতে আরম্ভ করেছে।

হুমায়ুন নিজের হতাশায় বিমূঢ় হয়ে তার দস্তানা পরিহিত হাত দিয়ে এতোই জোরে তার ঘোড়ার পর্যানের সামনের দিকে উঁচু হয়ে থাকা বাঁকানো অংশে আঘাত করে যে, ঘোড়াটা ভড়কে গিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে আর চিহি শব্দ করে বেমক্কা একদিকে দৌড়াতে শুরু করে যে আরেকটু হলে সে নিজেই ঘোড়া থেকে পড়ে যেত। হাঁটু দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে সে জন্তুটাকে বশে আনে, তারপরে লাগামে ঢিল দিয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে এবং জন্তুটার ঘামে ভেজা গলায় আলতো চাপড় দিয়ে তাঁকে আশ্বস্ত করে। সে মনে মনে ভাবে, যাই হোক, ভাগ্য সহায় থাকলে রাতের আগেই সে আর তার সাথের অগ্রবর্তী দলটা আগ্রা পৌঁছে যাবে। তাঁর অবশিষ্ট সৈন্যসামন্তের যদিও কামানবাহী শকট, মালবাহী গাড়ি, আর হাজারের উপরে ভারবাহী পশুর দল- আরো এক সপ্তাহ বা হয়তো আরো বেশী দিন লাগবে শহরে পৌঁছাতে, পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করার জন্য তাঁর হাতে খুব একটা বেশী সময় নেই। তার গুপ্তদূতদের ভাষ্য অনুযায়ী, শেরশাহ তাঁর অগ্রযাত্রা স্থগিত রেখেছেন, অন্তত সাময়িকভাবে হলেও, কনৌজেই তিনি অবস্থান করছেন। তিনিও সম্ভবত রসদপত্রের মজুদ মিলিয়ে দেখছেন…

বস্ততপক্ষে মধ্যরাতের অনেক পরে, যমুনার পাড় বরাবর আগ্রার অন্ধকারাচ্ছন্ন সড়কের উপর দিয়ে হুমায়ুনের পরিশ্রান্ত ঘোড়াটা তাঁকে নিয়ে আগ্রা দূর্গের দিকে উঠে আসে। দূর্গের মূল তোরণদ্বারের উপরে রক্ষিত নাকাড়াগুলো রাতের আবহে গমগম করে উঠতে, দূর্গপ্রাকারের উপরে মশালদানিতে রাখা জ্বলন্ত মশালের দপদপ করতে থাকা কমলা আলোর মাঝে অশ্বারূঢ় হয়ে সে খাড়াভাবে দূর্গ অভিমুখে উঠে যাওয়া পথটা দিয়ে সোজা ভিতরের প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হয়। হুমায়ুন পরিশ্রান্ত অবস্থায় ঘোড়ার পর্যান থেকে নীচে নেমে আসতে একজন সহিস দৌড়ে এসে তার হাত থেকে ঘোড়ার লাগামটা নিয়ে নেয়।

সুলতান। কালো আলখাল্লায় মোড়া একটা অবয়ব সামনের দিকে এগিয়ে আসে। অবয়বটা আরো কাছে আসতে, সে তার নানাজান বাইসানগারকে চিনতে পারে। স্বাভাবিকভাবে বেশ সবল, এমনকি বলিষ্ঠ, তাঁর চোখেমুখে দুশ্চিন্তার বলিরেখা দেখা যায়, তাঁর বাহাত্তর বছর বয়সে এই প্রথম সবাই তার এই চেহারা দেখছে এবং তাঁর দিকে এক পলক তাকিয়েই হুমায়ুন সাথে সতর্ক হয়ে উঠে যে অপরিজ্ঞেয় আর অনাকাঙ্খিত কিছু একটা ঘটে গেছে।

কি ব্যাপার? কি হয়েছে?

আপনার আম্মিজান অসুস্থ। গত ছয় সপ্তাহ ধরে তিনি তাঁর বুকে একটা ব্যাথা অনুভব করছিলেন, এতোটাই তীব্র তাঁর মাত্রা যে কেবলমাত্র আফিম দিয়েই তাঁর কষ্টের খানিকটা উপশম ঘটতো। হাকিমেরা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল তার ব্যাপারে তাঁদের কিছুই করার নেই। আমি আপনার কাছে বার্তাবাহক প্রেরণ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু তিনিই আমাকে নিষেধ করেছেন সামরিক অভিযানের সময় আপনার মনোযোগ ভিন্নমুখী করা আমার উচিত হবে না…কিন্তু আমি এটাই জানতাম আপনাকে এক পলক দেখার জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে আছেন। এই একটা আকাঙ্খাই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল…

আমি তাঁর সাথে দেখা করবো। বর্গাকার প্রস্তরফলকের মেঝের উপর দিয়ে দ্রুত পায়ে মায়ের আবাসন কক্ষের দিকে হেঁটে যাবার সময়, হুমায়ুনের চারপাশের লাল বেলেপাথরের দূর্গটা যেন শূন্যে মিলিয়ে যায়। সে আবারও কাবুলের একটা বালকে পরিণত হয়- তৃণভূমির উপর দিয়ে তাঁর টাটু ঘোড়াটা দুলকি চালে ছুটিয়ে, বাইসানগারের স্থাপিত খড়ের লক্ষ্যবস্তুর দিকে পর্যানে উপবিষ্ট অবস্থায় ক্রমাগত তীর নিক্ষেপ করছে এবং মাহামকে মুগ্ধ করার জন্য নিজের দক্ষতা আর সাহসিকতার অতিরঞ্জিত গল্পগুলো ইতিমধ্যে মনে মনে আউড়াতে শুরু করেছে।

সে যখন তার আম্মিজানের অসুস্থতার জন্য সংরক্ষিত কক্ষে প্রবেশ করতে, তাঁর নাসারন্ধ্র প্রশান্তিদায়ক সুগন্ধিতে ভরে যায়। গন্ধটা তাঁর আম্মিজানের খাটের চারপাশে স্থাপিত চারটা লম্বা ধূপাধার থেকে আসছে যেখানে রেজিনের সোনালী রঙের স্ফটিক ধিকিধিকি জ্বলছে। সবুজ শুজনির নীচে মাহামকে খুবই ছোট দেখায়, তাঁর মুখের ত্বক কাগজের মতো পাতলা কিন্তু তাঁর বিশাল কালো চোখ আজও তাদের সৌন্দর্য ধরে রেখেছে এবং চোখের তারায় নিজের ছেলেকে দেখতে পেয়ে সেখানে আন্তরিকতা, আবেগ এসে ভীড় করে। হুমায়ুন ঝুঁকে মায়ের কপালে চুমু খায়। আমাকে মার্জনা করবেন- আমি যাত্রাপথের ঘাম আর ধূলো নিয়েই আপনার সাথে দেখা করতে এসেছি।

আমার সুদর্শন যোদ্ধা…তোমার আব্বাজান ভীষণ গর্ব করতেন তোমাকে নিয়ে…তিনি সবসময়েই বলতেন তার সব সন্তানের ভিতরে তুমিই সবচেয়ে যোগ্য, শাসক হবার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত…আমাকে তিনি শেষ যে কথাগুলো বলেছিলেন, মাহাম, আমার যদিও আরও সন্তান আছে, আমি তাদের কাউকে হুমায়ুনের মতো ভালোবাসি না। সে তার হৃদয়ের অভিলাস হাসিল করবে। তাঁর সমকক্ষ কেউ হবে না। তিনি তাঁর শুষ্ক হাত দিয়ে হুমায়ুনের গাল স্পর্শ করেন। আমার সম্রাট, আমার বাছা, তুমি কেমন আছো? আমাদের শত্রুকে তুমি কি পরাস্ত করেছে?

হুমায়ুন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবে, যাক তাঁর দুর্ভাগ্যের খবর তাহলে আম্মিজানকে কেউ জানায়নি। জ্বী আম্মিজান, সবকিছু ঠিক আছে। এখন আপনি ঘুমান। সকালে আমি আবার আসবো এবং তখন আমরা প্রাণ খুলে কথা বলবো। কিন্তু মাহাম ইতিমধ্যে চোখ বন্ধ করে ফেলেছেন এবং হুমায়ুন সন্দিহান যে তিনি তার কথা শুনতে পেয়েছেন।

খানজাদা পাশের উপকক্ষে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁকে বিধ্বস্ত দেখায়- হুমায়ুন ধারণা করে মাহামের শয্যাপার্শ্বে অসংখ্য প্রহর তিনি নিন্দ্রাবিহীন কাটিয়েছেন কিন্তু হুমায়ুনকে দেখতে পেয়ে তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। আগ্রায় নিরাপদে তোমার পৌঁছাবার সংবাদ জানতে পেরে আমি আল্লাহতালার কাছে শুকরিয়া প্রকাশ করেছি, তিনি তাঁর গালে চুমু দিতে দিতে কথাগুলো বলেন।

আমাকে হেকিমদের সাথে কথা বলতে হবে…

তাদের সাধ্যমতো তারা করেছে। আমরা এমনকি আব্দুল-মালিকের সাথে আলোচনা করার জন্যও তোক পাঠিয়েছিলাম, তোমার আব্বাজানকে যখন বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল তখন কিভাবে তার হাতযশ তাকে সুস্থ করে তুলেছিল সেটা সম্বন্ধে অবগত থাকায়। যদিও এখন তাঁর বয়স হয়েছে এবং চোখে ভালোমতো দেখতে পান না, কিন্তু তার মস্তিষ্ক এখনও পরিষ্কার কাজ করে। কিন্তু তাকে যখন রোগের উপসর্গগুলো বলা হয় তিনি সাফ জানিয়ে দেন মাহামের যন্ত্রণা উপশম করা ব্যাতীত আমাদের আর কিছুই করার নেই। খানজাদা চুপ করে থেকে কিছু একটা ভাবেন। মাহাম কেবল একটা বিষয়ের জন্য প্রতীক্ষা করেছিল- হুমায়ুন, তোমাকে আরেকবার চোখে দেখবে। এখন সে শান্তিতে মরতে পারবে…

হুমায়ুন চোখ নামিয়ে যুদ্ধের ক্ষতযুক্ত হাতে তৈমূরের অঙ্গুরীয়ের দিকে তাকায়। আমি এইমাত্র তাকে মিথ্যা কথা বলেছি…আমি তাকে বলে এসেছি আমাদের শত্রুদের আমি পরাস্ত করেছি। কিন্তু তিনি যখন বেহেশত থেকে আমাকে দেখবেন আমার জন্য তখন তিনি গর্ববোধ করবেন- আমি দিব্য করে বলছি… কিছু বুঝে উঠবার আগেই সে টের পায় তার গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছে।

দুইদিন পরে, আরও তিনজন লোকের সাথে হুমায়ুনকে তাঁর মায়ের চন্দনকাঠের শবাধারে, কর্পূর পানিতে গোসল করিয়ে সাদা কাফনে জড়ান অবস্থায়, বহন করতে দেখা যায়, যমুনাতে অপেক্ষমান একটা নৌকা তাদের গন্তব্য। একটা দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান- নদীর অপর পাড় থেকে বেশ খানিকটা ভেতরে তাঁর মরহুম আব্বাজান বাবরের তৈরী অনেকগুলো বাগানের একটা, যেখানে মাত্র ফুল ফুটতে আরম্ভ করেছে তার সমাধির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। হুমায়ুন আড়চোখে একবার তার পাশে পাশে হাঁটতে থাকা বাইসানগারের দিকে তাকায়। তাঁর নিজেরই অনেক বয়স হওয়া সত্ত্বেও তিনি খানিকটা পীড়াপীড়ি করেই নিজের মেয়ের অন্তিমযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। সামনের দিকে ঝুঁকে পড়া লোকটাকে এখন কি ভীষণ রোগা লাগছে- বাবরকে সমরকন্দ দখলে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করে তোলা সেই যোদ্ধার ছায়া মাত্র এখন তাঁকে দেখে মনে হয়।

হুমায়ুনকে আরও গভীর এক বিষণ্ণতা আচ্ছন্ন করে তোলে- মাহামের মৃত্যুই কেবল না বরং যৌবনের অনেক নিশ্চয়তার নিরাপত্তা শেষ হয়ে আসছে এই বোধটা তাকে আরও বেশী ব্যাকুল করে। সারা জীবন সে ছিল অত্যধিক প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠা এক যুবরাজ, পৃথিবীর বুকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত, জীবনে যা কিছু পরম কাম্য সবকিছুতেই তার ন্যায্য অধিকার এমন একটা ধারণা নিয়ে সে বড় হয়েছে। অন্যদের কাজের কারণে বিড়ম্বনার শিকার হয়ে নিজেকে তার কখনও এতো নগন্য আর অরক্ষিত মনে হয়নি। তার আগে কখনও মনে হয়নি নিজের নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করা এতো কঠিন।

হুমায়ুন বাকি সবার সাথে শবাধার বয়ে নিয়ে নদীর তীরে পৌঁছাবার পরে, সে মুখ তুলে আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকায়। কোনো আগাম সতর্কতা না জানিয়েই হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়, প্রথমে বড়, ভারী ফোঁটা শীঘ্রই সেটা মুষলধারে নামতে শুরু করে হুমায়ুনের পরণের শোকের কালো আলখাল্লাটা ভিজিয়ে চুপচুপে করে তুলে। বৃষ্টিটা সম্ভবত একটা ইঙ্গিত, তাঁর মনে জমে উঠা সন্দেহ দূর করতে পাঠান হয়েছে, তাঁকে বলার জন্য যে যদিও কিছু বিষয়ের অবশ্যই সমাপ্তি ঘটবে, একজন নেতার জন্য সবসময়ে নতুন সূচনা অপেক্ষা করছে যে কখনও শোক কিংবা বিরুদ্ধতার মুখোমুখি হয়ে মুষড়ে পড়বে না বরং নিজের ক্ষমতা আর তার চূড়ান্ত বিজয়ের উপরে সে বিশ্বাস রাখবে।

*

হুমায়ুন তার চারপাশে উপস্থিত উপদেষ্টাদের দিকে তাকায়, সবার পরণে তার মতোই শোকের পোষাক, রীতি অনুযায়ী যা তাঁদের চল্লিশ দিন পরিধান করতে হবে। মাহামের মৃত্যুর পরে মাত্র চৌদ্দ দিন অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু ভয়ঙ্কর বিপদাশঙ্কাপূর্ণ যে খবর সে পেয়েছে সেটা যদি সত্যি হয় তাহলে মৃতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের জন্য তাঁদের হাতে খুব অল্প সময়ই রয়েছে।

আহমেদ খান, আপনি নিশ্চিত…?

জ্বী, সুলতান, সারা দেহে সদ্য ভ্রমণ থেকে আসবার লক্ষণ স্পষ্ট ফুটে থাকা তার গুপ্তদূতদের প্রধান উত্তর দেয়। শেরশাহ প্রায় তিন লক্ষাধিক সৈন্যের একটা শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে। আমি নিজের চোখে এখান থেকে ঘোড়ায় মাত্র পাঁচ দিনের দূরত্বে তাদের অগ্রগামী বাহিনীকে দেখে আসছে।

সুলতান, তাঁর কথার সাথে আমরা যেসব খবর শুনেছি তার যথেষ্ট মিল আছে, কাশিম মন্তব্য করে। বৃষ্টি আরম্ভ হওয়া সত্ত্বেও শেরশাহ যথেষ্ট দ্রুতই এগিয়ে আসছে।

হুমায়ুন মনে মনে ভাবে, শেরশাহ অন্তত তাঁর পশ্চাদপসারনকারী বাহিনীর নাগাল পায়নি। এক সপ্তাহ আগে মূল বাহিনীটা নিরাপদে আগ্রা এসেছে যদিও আসবার পথে অনেকেই দলত্যাগ করেছে। তার মানে সে আগ্রা এসে আমাদের এখানেই আক্রমণ করতে চায়…আমাদের এই মুহূর্তে কত সৈন্য অবশিষ্ট রয়েছে? বাবা ইয়াসভালের স্থানে অশ্বারোহী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক যাকে মনোনীত করেছে সেই হাল্কা পাতলা আর লম্বা আধিকারিক জাহিদ বেগের দিকে হুমায়ুন তাকায়।

সুলতান, কনৌজ থেকে যারা ফিরে এসেছে তাদের নিয়ে প্রায় আশি হাজার হবে, কিন্তু এই সংখ্যাটা প্রতিদিনই আশঙ্কাজনক হারে কমছে…

মাথা উঁচু করে হুমায়ুন তাঁর দরবার হলের অন্যপ্রান্তে অবস্থিত দূর্গচত্বরের দিকে তাকায়। বৃষ্টিপাত আপাতত বন্ধ রয়েছে এবং মেঘের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা সূর্যরশ্মিতে লাল বেলেপাথর থেকে এক ধরনের আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তারা ঝড়ের বেগে হিন্দুস্তান অধিকার করার পরে এই দূর্গটা এখন পর্যন্ত মোগলদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। গতরাতে হারেমের বিলাসিতা ঘুমাতে যাবার আগে প্রাকারবেষ্টিত দূর্গের ছাদে সে তাঁর ব্যক্তিগত জ্যোতিষী শারাফের সাথে দাঁড়িয়ে ছিল, অনেকদিন পরে তাঁরা দুজনে একসাথে রাতের আকাশ দেখেছে। কিন্তু শারাফ সেখানে কিংবা রাশিচক্রে বা গণনায়- নিয়তির কোনো বাণী খুঁজে পায়নি। নক্ষত্ররাজির এই মৌনতার মাধ্যমে কি আল্লাহতালা তাঁকে বলতে চায় যে তাঁকে নিজে এবং একাকী তাকেই নিজের রাজত্ব রক্ষার পথ খুঁজে বের করতে হবে…?

আমি যে ভয়টা করছিলাম আহমেদ খানের সংবাদ সেটাই কেবল নিশ্চিত করেছে। আমাদের সামনে আগ্রা পরিত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই, হুমায়ুন অবশেষে বাক্যটা উচ্চারণ করে। সবাই চমকে গিয়ে সশব্দে শ্বাস টানে।

সুলতান, আগ্রা পরিত্যাগ করবো? কাশিমকে স্পষ্টতই বিহ্বল দেখায়।

হ্যাঁ। সেটাই একমাত্র পথ।

কিন্তু আমরা কোথায় যাব?

উত্তরপশ্চিম দিকে, লাহোরে। আমরা এরফলে কিছুটা সময় পাব আর আমি কাবুল থেকে আরো সৈন্য নিয়ে আসতে পারবো- সেখানের গোত্রগুলো লুটপাটের সুযোগকে খুশী মনে স্বাগত জানাবে…

অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলে না অবশেষে বাইসানগার কথা শুরু করেন। বহু বছর আগের কথা আমি তখনও একজন যুবক আর সম্রাট বাবরের সাথে সমরকন্দে অবস্থান করার সময়, আমরা এক শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলাম- সাইবানি খান আর তার অগণিত উজবেক সাথী, আমরা খুব ভালো করেই জানতাম যাদের পরাস্ত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমাদের হাজার হাজার সহযোদ্ধাদের মৃত্যুই ছিল পশ্চাদপসারণের একমাত্র বিকল্প। বাবর, তাঁর সাহস আর দূরদৃষ্টি দিয়ে, যা তাকে একজন মহান শাসকে পরিণত করেছিল, বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। বর্বর উজবেকদের হাতে তৈমূরের শহর তুলে দিতে যদিও তার ভেতরের যোদ্ধার সত্ত্বা বিষাদ ভারাক্রান্ত হয়েছিল, তিনি জানতেন তাঁকে এটা করতেই হবে…ঠিক যেমন আমাদের আগা ছেড়ে যেতে হবে…

হুমায়ুন দৃষ্টি নামিয়ে নেয়। বাইসানগার ঠিকই বলেছেন। কিন্তু তিনি যেটা উহ্য রেখেছেন সেটা হল এই যে সমঝোতার শর্ত হিসাবে সাইবানি খান নিজের স্ত্রী হিসাবে খানজাদাকে দাবী করেছিল আর বাবর বাধ্য হয়েছিলেন নিজের বোনকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে। দশ বছর তৈমূরের বংশধরদের রক্তপিপাসু এক লোকের হারেমে খানজাদা জীবনযাপন করেছিলেন, যে খানজাদার মনোবল ভাঙতে খুশীমনে চেষ্টা করতো। তাঁর সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সে, হুমায়ুন, যাই ঘটুক না কেন, খানজাদাকে এমন নির্মম নিয়তি আর বরণ করতে দেবে না।

আমরা পশ্চাদপসারণ করছি, পালিয়ে যাচ্ছি না। যদিও আগামীকাল ভোরের প্রথম প্রহরে আমরা যাত্রা শুরু করবো, সবকিছু যেন শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে করা হয়…কাশিম, রাজকীয় বাজার সরকার আর তার কর্মচারীদের সমবেত হতে বলেন এবং আমার আদেশ দ্রুত আর কোনো প্রশ্ন না করে তাঁরা যেন পালন করে সেটা আপনি নিশ্চিত করবেন। আগ্রায় রক্ষিত রাজকীয় কোষাগারে যা কিছু রয়েছে সবকিছু অবশ্যই সিন্দুকে স্থানান্তরিত করতে হবে। মূল্যবান বাকি অন্য জিনিষ আমাদের সাথে করে নিয়ে যাবার জন্য মোড়ক করতে আদেশ দেন- শেরশাহের কাজে লাগতে পারে এমন কিছুই রেখে যেতে চাই না আমি। জাহিদ বেগ, আমাদের সৈন্যদের যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। তাঁদের বলবেন কাবুল থেকে আমাদের যে সৈন্যবাহিনী আসছে তাদের সাথে যোগ দেবার জন্য আমরা লাহোর যাচ্ছি। আর আমাদের সব গাদাবন্দুক আর বারুদ যেন নিরাপদে গোশকটে ভোলা হয় সেটা নিশ্চিত করবেন আর কামানগুলোকে যাত্রার জন্য প্রস্তুত করেন। এমনকিছু করবেন না বা বলবেন না যার ফলে কারো মনে পরাজয় বা পলায়ন বা আমরা শেরশাহের ভয়ে ভীত এমন ভাবনার জন্ম হয়।

হুমায়ুন কথা বন্ধ করে এবং চারপাশে তাকায়। আর আহমেদ খান আপনি, আমার সৎ-ভাইয়েরা নিজ নিজ প্রদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ঠ পরিমাণ সৈন্য মোতায়েন করে, বাকি সৈন্য নিয়ে লাহোরে আমার সাথে তাদের যোগ দেবার আদেশ সম্বলিত চিঠি বয়ে নিয়ে যাবার জন্য আপনার সবচেয়ে দ্রুতগামী আর সেরা তরুণ অশ্বারোহীদের নির্বাচিত করেন। আমি নিজে চিঠিগুলো লিখব আর তাতে রাজকীয় মোহরের ছাপ দিয়ে দেব যাতে সম্রাট তাঁদের আদেশ দিয়েছেন- সে বিষয়ে আমার ভাইদের মনে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ না থাকে। এখন দ্রুত যা বললাম করেন, আমাদের হাতে সময় খুব অল্প…

সেই রাতে হুমায়ুন এক মুহূর্তের জন্য চোখের পাতা বন্ধ করে না বা হারেমো যায় না তাকে অনেককিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। রাতের অন্ধকার ছিন্ন করে অবশ্য নিয়মিত বিরতিতে শেরশাহের অগ্রগামী সৈন্যের অগ্রসর হবার তাজা আর প্রতিবার আরো বেশী মাত্রায় উদ্বেগজনক হয়ে উঠা খবর নিয়ে গুপ্তদূতের আগমন অব্যাহত থাকে। হুমায়ুন হিসাব করে দেখে, শেরশাহ যদি তাঁর অগ্রসর হবার বর্তমান গতি বজায় রাখে তাহলে তার অগ্রবর্তী সৈন্যরা তিন কি চারদিনের ভিতরে আগ্রার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হবে।

পূর্বাকাশে ভোরের আলো ফোঁটার অনেক আগেই, উষ্ণ বাতাসে পতপত করে উড়তে থাকা নিশান নিয়ে হুমায়ুনের সেনাবাহিনীর প্রথম দলটা সামনের রাস্তা নিরাপদ করার দায়িত্ব নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সে আগ্রা ত্যাগ করছে এই খবরটা একবার চাউর হলে, জনগণ উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে আর ডাকাতের দল সেই সুযোগে হয়ত কোনো অপকর্ম ঘটাবে। হুমায়ুনের অগ্রবর্তী সেনাদলের দায়িত্ব হল ইস্পাতের চকচকে বর্ম আর রাজকীয় অশ্বশালা থেকে সরবরাহ করা তাজা ঘোড়ায় চেপে- শক্তির প্রদর্শন করে দুবৃত্তদের কোনো ধরনের অপকর্ম ঘটান থেকে বিরত রাখা। হুমায়ুন নিজের মনে বলে, আর সেই সাথে আমি এখনও শক্তিশালী। তার অধীনে এখনও আশি হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী রয়েছে। পানিপথের সময় তাঁর আর তাঁর আব্বাজানের সাথে যা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশী।

হুমায়ুন তাঁর আবাসন কক্ষের জানালা দিয়ে নীচের আঙ্গিনার দিকে তাকিয়ে দেখে, রাজঅন্তঃপুরের মহিলা এবং তাঁদের পরিচারিকার দল তাদের জন্য প্রস্তুত করা পালকি আর গোশকটে অবস্থান গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেনাসারির একেবারে মধ্যে তাঁরা ভ্রমণ করবেন, তাদের চারপাশে অবস্থানরত প্রহরীরা একটা নিরাপত্তা বেষ্টনী বজায় রাখবে, এবং সামনে আর পেছনে থাকবে আরও কয়েকসারি বিশেষভাবে তাদের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত অশ্বারোহী বাহিনী। হুমায়ুন অবশ্য খানজাদা আর তার সৎ-বোন গুলবদনকে তাঁর কাছাকাছি আরেকটা রাজকীয় হাতিতে ভ্রমণের বন্দোবস্ত করতে আদেশ দিয়েছেন। সালিমা, এখনও তার প্রিয়তম উপপত্নী, পেছনে আরেকটা হাতিতে অবস্থান করবে।

মহিলাদের দলটার পেছনে থাকবে রাজকীয় শিবির স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি বহনকারী শকট- তাবু এবং ভ্রাম্যমান হাম্মামখানা, রান্নার উপকরণ এবং উত্তরপশ্চিমে চারশো মাইল যাত্রার জন্য দরকারী অন্যান্য সামগ্রী। এবং সেই সাথে অবশ্যই ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত লোহার অতিকায় সিন্দুক যার জটিল তালা খুলতে চারটা আলাদা আলাদা রূপার চাবি- প্রতিটা চাবি আলাদা আলাদা আধিকারিকের কাছে রক্ষিত এবং একটা সোনার চাবি প্রয়োজন যা এই মুহূর্তে হুমায়ুনের গলায় ঝুলছে। হুমায়ুন নিজের ভিতরে শেরশাহের সাথে প্রথমবার মুখোমুখি হতে যাবার দিল্লীতে রক্ষিত ধনসম্পদ নিরাপত্তার খাতিরে আগ্রায় পাঠাবার আদেশ দেয়ার মতো দূরদৃষ্টি দেখিয়েছিল বলে নিজের কাছেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। তাঁর নিজের যা অর্থ আর রত্নপাথর রয়েছে আর সেই সাথে বাহাদুর শাহের কাছ থেকে সে যা দখল করেছে সেটা যোগ করলে, শেরশাহের সাথে টক্কর দেবার মতো একটা নতুন বাহিনী তৈরীর জন্য যথেষ্ট তহবিল তার কাছে রয়েছে।

বহরের একেবারে শেষে থাকবে অশ্বারোহী আর পদাতিক সৈন্যদের আরো কয়েকটা দল, যাদের ভিতরে তাঁর শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজেরাও রয়েছে, তাঁরা মিনিটে চল্লিশটা তীর নিক্ষেপের মতো দক্ষ। আর পুরো সেনাসারির ভিতরে ছড়িয়ে থেকে এবং বেশীরভাগ সময় দৃশ্যপটের আড়ালে আহমেদ খানের গুপ্তদূতেরা অবস্থান করবে, যেকোনো ঝামেলার জন্য তারা সর্তক দৃষ্টি রাখবে।

দুই ঘন্টা পরে, পিঙ্গল বর্ণের লম্বা পায়ের অধিকারী পেষল স্ট্যালিয়নটায়, যা তাঁকে কনৌজের বিপর্যয়ের পরে খুব দ্রুত আগ্ৰায় ফিরিয়ে এনেছিল, উপবিষ্ট অবস্থায় আগ্রা দূর্গের মূল তোরণদ্বারের নীচে ঢালু পথের উপরে দিয়ে হুমায়ুনকে মন্থর গতিতে ঘোড়া চড়ে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। মাথার রত্নখচিত শিরোস্ত্রাণের নীচে, তাঁর চোখের দৃষ্টি সোজা সামনের দিকে নিবদ্ধ। এটা পেছন দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখা বা কোনো ধরনের স্মৃতি রোমন্থনের সময় না। এটা একটা সাময়িক বিপর্যয় আর শীঘ্রই খুব শীঘ্রই, যদি আল্লাহতালা সহায় থাকেন- নিজের ন্যায়সঙ্গত অধিকার বুঝে নেবার জন্য সে ফিরে আসবে। আপাতত বিদায় নেয়ার আগে সে শেষ একটা কাজ করতে চায়। ঘোড়ায় করে নদীর তীরে পৌঁছে সে সেখানে ঘোড়া ছেড়ে দিয়ে তাঁকে যমুনার অপর তীরে মাহামের কবরের কাছে নিয়ে যাবে বলে যে ছোট নৌকাটা অপেক্ষা করছিল সেটায় আরোহন করে। সাদা মার্বেলের আয়তাকার চ্যাপ্টা খণ্ডটার কাছে পৌঁছে সে হাটু ভেঙে বসে এবং পাথরটায় চুমু খায়। শেরশাহ আমাদের ধর্মের অনুসারী লোক, সে ফিসফিস করে বলে। সে আপনার কবরের কোনো ক্ষতি করবে না এবং একদিন আমি আপনার কাছে ফিরে আসবো। আম্মিজান আমাকে মার্জনা করবেন যে আমি চল্লিশ দিনের শোক পালন করতে পারছি না, কারণ আমাদের রাজবংশের ভাগ্য অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে এবং আমাকে দেহের প্রতিটা স্নায়ু আর পেশীকে সহ্যের শেষ প্রান্তে নিয়ে গিয়ে একে রক্ষা করার জন্য আমাকে চেষ্টা…

*

তারা আগ্রা ছেড়ে আসবার পরে প্রতিদিনই নিয়মিত বৃষ্টিপাতের প্রকোপ মনে হয় যেন অনেকটা কমে এসেছে এবং হুমায়ুন ঠিক যেমনটা আশা করেছিল- শেরশাহ যদিও আগ্রা দখল করেছে কিন্তু সে তাকে আর অনুসরণ করেনি। হুমায়ুনের গুপ্তচরদের ভাষ্য অনুসারে শেরশাহকে হিন্দুস্তানের পাদিশাহ ঘোষণা করে আরো একবার তাঁর নামে আগ্রা দূর্গের মসজিদে খুতবা পাঠ করা হয়েছে এবং সে এখন নিয়মিত খিলানযুক্ত দর্শনার্থী হলে দরবার করছে। বেশ, ভুইফোড়টা তার গৌরবোজ্জ্বল মূহূর্ত উপভোগ করুক- যদিও সময়টা খুবই সংক্ষিপ্ত হবে।

হুমায়ুন মনে মনে ভাবে তাঁর সেনাসারি বেশ দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। প্রতিদিন সম্ভবত বারো কি তের মাইল, সম্ভবত আরো বেশী, যেহেতু তারা উত্তরপশ্চিম দিক অভিমুখে বৈচিত্রহীন ভূখণ্ডের উপর দিয়ে ভ্রমণ করছে। তারা যদি তাদের সামরিক বহরের এই গতি বজায় রাখতে পারে তাহলে আশা করা যায় একমাসের ভিতরে তারা লাহোরে পৌঁছে যাবে। এখনও পর্যন্ত কোনো ভয়াবহ আক্রমণের সম্মুখীন তাদের হতে হয়নি। মোগলদের সৈন্যসারি যখন কোনো গ্রামের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে তখন সেখানে বসবাসকারী লোকেরা মনে হয় যেন কাছে আসতে ভয় পায় তাঁরা বৃষ্টির পানি জমে থাকা ফসলের মাঠের নিরাপদ আশ্রয়ে কিংবা তাঁদের মাটির দেয়াল আর খড় দিয়ে ছাওয়া বাড়ি থেকে অগ্রসরমান সৈন্যদের কাতার আর মালবাহী শকটের দিকে তাকিয়ে থাকে। হাড়ের মাংসে চামড়া ঢুকে যাওয়া কুকুরের পাল আর হাড্ডিসার হলুদ পালকযুক্ত মুরগীর ঝাকই কেবল চারপাশে হেঁটে বেড়াতে দেখা যায়।

তাঁর সেনাসারির উপর এখন পর্যন্ত একবার মাত্র হামলা হয়েছে। ঝিরঝির বৃষ্টির পর্দায় চারপাশ জড়িয়ে নিয়ে একদিন সন্ধ্যাবেলা যখন দ্রুত আঁধার নামছিলো, কাদায় আটকে গিয়ে অতিরিক্ত তাবু আর রান্নার সরঞ্জামাদি বহনকারী একটা শকট মূলবহর থেকে আলাদা হয়ে গেলে, ডাকাতের দল সেটাকে আক্রমণ করে। বেশ কয়েক ঘন্টা পরে মালবাহী শকটটার অনুপস্থিতি সবার নজরে পড়ে এবং আহমেদ খান দ্রুত গুপ্তদূত পাঠায় ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে। তারা পিঠে তীরবিদ্ধ অবস্থায় মালবাহী শকটের চালকদের বৃষ্টিতে ভেজা মৃতদেহ খুঁজে পায় এবং আশেপাশে কোথায় মালবাহী শকট নেই। কিন্তু অন্ধকার হয়ে গেলেও চোর আর চুরি করা শকটটি খুঁজে বের করতে খুব একটা দেরী হয়না। রাতের প্রথম আগুন জ্বালাবার প্রায় সাথে সাথে, আহমেদ খানের প্রেরিত লোকেরা, বাজারে যেভাবে মুরগী বিক্রি করতে নিয়ে যাওয়া হয় ঠিক সেভাবে সেরাতের অস্থায়ী শিবিরে ডাকাতদের বেঁধে আনে। হুমায়ুন কালবিলম্ব না করে তাদের শিরোচ্ছেদের আদেশ দেয় এবং পাথরের একটা পিরামিডে ছিন্ন মুণ্ডুগুলো দেখা যায়, এমনভাবে গেঁথে দিতে বলে একটা হুশিয়ারি হিসাবে যে প্রজাদের ভিতরে আইন অমান্য করার কোনো ধরনের প্রবণতা সে বরদাশত করবে না।

সে এমনকি নিজের সৈন্যদের ভিতরেও এসব বরদাশত করতে রাজি না। রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও হিন্দুস্তানের এইসব লোকগুলো তাঁর আপন তাঁর প্রজা- এবং সে কখনও তার লোকদের বলেনি যে হিন্দুস্তানীদের উপরে তাঁরা ইচ্ছামতো লুটপাট চালাতে পারবে। সে কঠোরভাবে আদেশ দিয়ে রেখেছে যে কোনো ধরনের লুটপাট করা চলবে না এবং ইতিমধ্যে ছয়জন সৈন্যকে কাঠের কাঠামোতে হাতপা ছড়ান পক্ষবিস্তারকারী ঈগলের মতো আটকে তাদের সহযোদ্ধাদের সামনে তাদের ভালোকরে চাবকানো হয়েছে, একটা ভেড়া চুরি করার অপরাধে এবং সপ্তম আরেকজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে গ্রামের এক কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করার দায়ে।

সে যাই হোক, গাদাফুল দিয়ে তারা যখন তাদের মন্দিরের সামনে খোদাই করা মোষের মূর্তির পাশ দিয়ে যায়, এবং তাদের উদ্ভটসব দেবতার মূর্তিসমূহ অনেকেরই একাধিক হাত রয়েছে, কেউ দেখতে অর্ধেক মানুষ আর অর্ধেক হাতির মতো- সে না ভেবে থাকতে পারে না যে রাজত্ব লাভের আকাঙ্খ আর নিয়তি মোগলদের যে স্থানে নিয়ে এসেছে সেখানের গতিপ্রকৃতি কি সে কখনও পুরোপুরি বুঝতে পারবে। তার আপন ঈশ্বর হলেন একটি নিঃসঙ্গ সত্ত্বা, অদৃশ্য এবং নিজে নিজে শেভ করার জন্য এবং সর্বময়ক্ষমতায় স্পর্ধিত হয়ে উঠে, তার আদলে কিছু একটা তৈরী করাটা ধর্মদ্রোহীতার সামিল। হিন্দুদের দেবতাদের দেখলে মনে হবে তারা কোনো বাহিনীর অংশ এবং তাঁদের ইন্দ্রিয়পরায়ন দেহ আর পেষল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখলে চিরন্তত পরিত্রাণের চেয়ে পার্থিব ভোগবিলাসের কথাই মনে পড়ে।

তাঁরা যখন হাতির পিঠে চেপে ভ্রমণ করে, হুমায়ুন তখন নিজের ভাবনাগুলো নিয়ে, তার সেরা হাতিগুলোর একটার পিঠে সোনার শেকল দিয়ে বাঁধা খানজাদা আর গুলবদনের দুলতে থাকা হাওদায়, তাদের সাথে ধুসর গোলাপী রেশমের কাপড়ের মাঝে দিয়ে যা তাদের পুরো হাওদা আবৃত করে রেখেছে, আলোচনা করে। প্রখর ব্যবহারিক জ্ঞানের অধিকারী খানজাদা তাঁর হিন্দু প্রজাদের ধর্মীয় আচরণের বিষয়ে তাঁর মতো আগ্রহ পোষন করেন না- পাথরের তৈরী যোনি আর লিঙ্গম- পুরুষ আর নারীর যৌনাঙ্গের প্রতীক- কেন তাদের কাছে এতো পবিত্র তাদের পুরোহিতেরা কেন কপালে ছাই লেপন করেন এবং কেন তাঁরা তাঁদের ডান কাঁধের উপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে দেহের সাথে একটা সুতির লম্বা সুতা ঝোলে।

গুলবদন অবশ্য অবিশ্বাসীদের এসব ধর্মাচরণ দ্বারা মনে হয় কেবল অভিভূতই না সে এসব বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখে। হুমায়ুন অবশ্য নিজেকে এটাও স্মরণ করিয়ে দেয় যে কাবুল থেকে বাবরের রাজধানী আগ্রায় তাঁকে যখন নিয়ে আসা হয়েছিল তখন তার বয়স একেবারেই অল্প ছিল। সে হিন্দুস্তানেই বড় হয়েছে এবং খাইবার পাসের ওপাশে মোগলদের পাহাড়ী স্বদেশ সম্বন্ধে তাঁর স্মৃতি খুবই সামান্য প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁকে লালনপালনের দায়িত্বে হিন্দুস্তানী মহিলারা ছিল তারা তাদের আয়া বলে- যারা নিশ্চয়ই তাদের ধর্মীয় কৃত্যানুষ্ঠানের আঙ্গিক তাঁকে ব্যাখ্যা করেছে। সময় যখন আবারও শান্ত হবে, সে তখন অবশ্যই গুলবদনের সাথে আরো বেশী সময় অতিবাহিত করবে, তার নতুন প্রজাদের আরো ভালো করে বুঝতে।

*

হুমায়ুনের সৈন্যসারি আপাতভাবে শান্ত ভূপ্রকৃতির উপর দিয়ে নিরূপদ্রবভাবে এগিয়ে যায়, যতক্ষণ না তাদের সামনে লাহোর ভেসে উঠে। শহরটার চারপাশে যদিও কোনো প্রতিরক্ষা বেষ্টনী নেই, শহরের কেন্দ্রস্থলে কয়েক শতাব্দি পূর্বে হিন্দু শাসকদের দ্বারা নির্মিত প্রাচীন রাজপ্রাসাদের সামনে হুমায়ুন যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে তখন লক্ষ্য করে যে প্রাসাদটার কাঠামো বেশ শক্তিশালী এবং মজবুত। এসবের চেয়েও ভালো খবর হল তার সৎ-ভাইয়েরা ইতিমধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছে এবং প্রাসাদের অভ্যন্তরে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে কখনও কোনো অলুক্ষণে মুহূর্ত অনেকবারই ভেবেছে তাঁরা তাঁর আদেশ পালন করবে কি না কিন্তু তারা আদেশ পালন করেছে… এমনকি কামরানও।

তাঁদের সাথে মিলিত হবার জন্য নিজের ভেতরের ব্যাকুলতা দেখে সে বিস্মিত হয়। তারা এখন দেখতে কেমন হয়েছে? বাবরের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই যখন তারা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের পরে সে আর তাঁদের দেখেনি। সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশী কৃতজ্ঞ, তাদের অপরাধ সে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনা করেছিল- কারণ কেবল যে বাবর তাঁর মৃত্যুশয্যায় তাঁর কাছ থেকে কথা আদায় করেছিল তাদের সে সহানুভূতিপূর্ণ আচরন করবে আর তারচেয়েও বড় কথা এবং তাদেরও নিশ্চিতভাবেই তাকে প্রয়োজন রয়েছে। মোগল যুবরাজ হবার কারণে শেরশাহ তাঁদের সব ভাইদের জন্যই হুমকি স্বরূপ। বাবরের সন্তানেরা যদিও একত্রিত হতে পারে, তাহলে তারা বাংলার জলাজঙ্গল ভর্তি যে এলাকা থেকে শেরশাহ এসেছে, তাকে পুনরায় সেখানে পাঠিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা এই যে এই বিপর্যয়টা হয়তো তাদের সবকিছু নতুন করে শুরু করার একটা সুযোগ দেবে, কেবল রক্তের সম্পর্কই না ভ্রাতৃত্বের স্নেহশীল মনোভাব যা কখনও ছিন্ন হয়নি, সবকিছু পুনরায় মুসাকিদা করতে পারবে। তারাও অতীতের ক্ষত নিরাময় করতে আগ্রহী এমন আশা করাটা কি বোকামী হবে?

পরের দিন সকালের আলো ফোঁটার সাথে সাথে, হুমায়ুন তার সৎ-ভাইদের নিজেন আবাসন কক্ষে ডেকে পাঠায়। কাশিম, জাহিদ বেগ আর ক্লান্ত দেখতে বাইসানগারের উপস্থিতিতে কামরান, হিন্দাল আর আসকারি কক্ষে প্রবেশ করতে হুমায়ুন একে একে তাঁদের আলিঙ্গন করে, স্বতস্ফূর্ত আন্তরিকতায় প্রত্যেকের সম্বন্ধে মন্তব্য করে যা তাদের নিজেদের কৌতূহলের সাথে মিলে যায় যখন তারা অবাক দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রায় ছয় বছর আগে শেষবারের মতো সে যখন তাঁদের দেখেছিল, আসকারি আর হিন্দাল তখন সদ্য যৌবন প্রাপ্ত হয়েছে আর কামরান তার চেয়ে মাত্র পাঁচ মাসের ছোট, একটু পরিণত। এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ।

কামরানের চোখ- যা ঠিক তাঁদের আব্বাজানের মতো উজ্জ্বল সবুজ- নাকের উপরে পিট পিট করে তাকিয়ে থাকে যা এখনও দেখতে বাজপাখির মতো, বস্তুত পক্ষে এখন সাদৃশ্য আরও বেশী মাত্রায় লক্ষণীয়। নাকটা ভাঙা পরিষ্কার বোঝা যায়- খুব সম্ভবত ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে বা সংক্ষিপ্ত কোনো লড়াইয়ের ফল- এবং হেকিমেরা ভাঙা জায়গাটা ঠিকমতো বসাতে পারেনি। সেটাই একমাত্র পরিবর্তন– কামরান বেশ লম্বা চওড়া হয়েছে। তার পরণের হলুদ জোব্বার নীচে কাঁধের পেশল মাংসপেশী আর বাহুর উধ্বভাগ ফুলে রয়েছে। আসকারির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। তাঁর যে চেহারা হুমায়ুনের মনে ছিল তার চেয়ে আসকারির মুখ অনেকবেশী সরু আর লম্বা দেখায় এবং তার মুখে এখন সুন্দর করে ছাটা দাড়ি শোভা পাচ্ছে, সে আগের মতোই হাল্কা পাতলা রয়ে গেছে। হুমায়ুন বা কামরানের চেয়ে সে লম্বায় কম করে একমাথা খাট। হুমায়ুন হিন্দালকে একেবারেই চিনতে পারেনা। দিলদারের ছেলে- গুলবদনের ভাই- চোখে পড়ার মতো লম্বা চওড়া হয়ে উঠেছে। তার যেকোনো ভাইয়ের চেয়ে কম করে হলেও চার ইঞ্চি লম্বা আর চওড়া পেশল দেহ, মাথাভর্তি ঝাকড়া লালচে চুলের নীচে ডান ভ্রুর উপরে একটা আড়াআড়ি কাটা দাগ এবং হুমায়ুনকে স্বাগত জানাবার সময় তাঁর মন্দ্র, গমগমে কণ্ঠস্বরের কারণে তাঁকে আঠার বছরের চেয়ে অনেক বড় মনে হয়।

পারস্পরিক কুশল বিনিময় শেষ হতে, হুমায়ুন কাশিম, বাইসানগার আর জাহিদ বেগের সাথে তাঁর সৎ-ভাইদেরও নিজের চারপাশে অর্ধ-বৃত্তাকারে উপবেশনের ইঙ্গিত করে এবং কোনো প্রকার ভণিতা না করে কাজের কথায় আসে। আমি তোমাদের এখানে দেখে খুব খুশী হয়েছি। বহুদিন পরে আমরা সবাই আবার একসাথে হলাম। তোমরা ভালো করেই জান- কেন আমি তোমাদের এখানে ডেকে পাঠিয়েছি। আমরা যুদ্ধের পরামর্শসভায় মিলিত হয়েছি এবং আমাদের প্রত্যেকের ভাগ্য- আমাদের পুরো রাজবংশের- আজকের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে। অতীতে আমাদের নিজেদের ভিতরে অনেক মতানৈক্য ছিল কিন্তু আমরা চারজনই বাবরের সন্তান। আমাদের প্রত্যেকের ধমনীতে তৈমূরের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে এবং চারপাশে ঘনিয়ে আসা বিপদের সম্মুখীন হয়ে আমাদের অবশ্যই একত্রিত হতে হবে। তোমরা অবহিত আহো যে শেরশাহ তিন লক্ষ সৈন্যের একটা বিশাল বাহিনী নিয়ে আমাদের সাম্রাজ্যের রাজধানী, আগ্রা দখল করে নিয়েছে…

এটা দুঃখজনক যে শেরশাহের বিরুদ্ধে আপনার অভিযান সফল হয়নি, কামরান মৃদু কণ্ঠে বলে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় অন্তত একবারের জন্য হলেও নক্ষত্ররাজির গণনা আপনাকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করেছে।

হুমায়ুনের চোখমুখ লাল হয়ে উঠে, কামরান কথা বলার সাথে সাথে মৈত্রীর জন্য তার আকাঙ্খ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। শেরশাহের সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করে আমার দেহ থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে এবং অনেক ভালো মানুষ- বাবা ইয়াসভালের মতো মানুষ- শহীদ হয়েছে। আমার অনুরোধে সাড়া দিয়ে তুমি যদি সাহায্য পাঠাতে, শেরশাহকে আমি পরাস্ত করতে পারতাম, এবং আমার চারপাশে যেসব বীর যোদ্ধারা শহীদ হয়েছে তারা হয়ত আজও বেঁচে থাকতো…

আমি আমার নিজের বাহিনীর প্রধান হিসাবে আসবার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, আপনি সেটা মানতে অস্বীকার করেছেন…

কারণ আমি চাইনি তোমার নিজের প্রদেশ অরক্ষিত অবস্থায় থাকুক।

কিন্তু আমি আপনাকে এতো পূর্বদিকে গিয়ে শেরশাহকে মোকাবেলা করার ব্যাপারে হুশিয়ার করেছিলাম- আমি আপনাকে দিল্লী অথবা আগ্রায় দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের জন্য প্রস্তুতি নেবার পরামর্শ দিয়েছিলাম। শহরের দেয়ালের ভিতরে সুরক্ষিত অবস্থায় এবং পর্যাপ্ত রসদের বন্দোবস্ত করে আপনি শেরশাহের বাহিনীকে উদ্যমহীন করতে পারতেন এবং আপনার অন্যান্য বাহিনী তাঁকে পেছন থেকে আক্রমণ করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতো। কিন্তু বরাবরের মতোই আপনি আমার পরামর্শের প্রতি কোনো গুরুত্বই দেননি… হুমায়ুনের মনে হয় কামরান নিজের চোখে মুখে হাল্কা বিদ্রুপের একটা হাসি ফুটিয়ে তুলে নিজের যুক্তির পক্ষে নাছোড়বান্দার মতো সাফাই দিচ্ছে।

এবং আমার প্রতি তোমার আনুগত্য বরাবরের মতোই সন্দেহজনক… বালিঘড়ির বালুর মতোই ইতিমধ্যে এর অবত শুরু হয়েছে…তোমার প্রতারক চোখের মণিতে আমি সেটা দেখতে পাচ্ছি… হুমায়ুন কথাটা বলে উঠে দাঁড়ায়। তাঁদের ছেলেবেলায় সে ছিল সবসময়ে সেরা যোদ্ধা আর কুস্তিগীর। সে কামরানকে বহুবার আড়ং ধোলাই করেছে এবং প্রয়োজন হলে আবার করবে… কামরানও মার্জারের দ্রুততায় উঠে দাঁড়ায়, তাঁর হাত কোমরের গাঢ় বেগুনী পরিকরে গোঁজা রত্নখচিত খঞ্জরের বাটের দিকে এগিয়ে যায়।

সুলতান আপনারা… বাইসানগারের শান্ত সমাহিত কণ্ঠস্বর তাঁদের দুজনের মাঝে সম্বিত ফিরিয়ে আনে। হুমায়ুন নিজেই লজ্জিত বোধ করে যে তাকে প্ররোচিত করতে সে কামরানকে সুযোগ দিয়েছে। তারা এখন আর কাবুলের সেই লড়াকু বালক নয় বরং মোগল যুবরাজ সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য মারাত্মক এক বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কামরানকে দেখেও মনে হয় সে নিজের আচরণের জন্য অনুতপ্ত। সে পরিকরের কাছ থেকে হাত সরিয়ে নেয় এবং চোখ নীচের দিকে নামিয়ে নিয়ে বিনা বাক্য ব্যয়ে পুনরায় আলোচনার উদ্দেশ্যে মাটিতে বসে। আসকারি আর হিন্দালও অধোমুখে তাকিয়ে রয়েছে, যেন তারা একটা বিষয় পরিষ্কার বুঝিয়ে দিতে চায় যে বাবরের বড় দুই ছেলের ঝগড়ার মাঝে তারা কোনো পক্ষ অবলম্বন করতে পারবে না।

বরাবরের মতোই বাইসানগার, তুমি হলে বিবেকের কণ্ঠস্বর। হুমায়ুন নিজেও এবার মাটিতে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে। অতীতের ঘটনা অতীতের গর্ভে বিলীন হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ হল ভবিষ্যতের খেয়াল রাখা। আমাদের মরহুম আব্বাজান তাঁর জীবনের প্রায় অর্ধেক সময়কাল যুদ্ধ করেই অতিবাহিত করেছেন- তাঁর যখন মাত্র বারো বছর বয়স তখন থেকেই একটা সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন করতে। আল্লাহতালা তাকে আমাদের পৈতৃক জন্মভূমি থেকে অনেক দূরে নতুন দেশে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছেন, এবং এটা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব, যে জন্য তিনি লড়াই করেছিলেন সেটা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি। আমি এজন্যই তোমাদের এখানে ডেকে এনেছি- যাতে আমরা চারজন মিলে সিদ্ধান্ত নিতে পারি কিভাবে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখা যায়… এবং আমাদের চূড়ান্ত শক্তি, আর পরম নিরাপত্তা আমাদের ঐক্যের ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে।

তার সৎ-ভাইয়েরা একসাথে মাথা নাড়ে এবং সেটা দেখে হুমায়ুনেরও শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে আসে। জাহিদ বেগ আমাদের সামরিক পরিকল্পনার একটা রূপরেখা আমার ভাইদের সামনে উপস্থাপন করেন। আমি তাদের যেকোনো মতামতকে স্বাগত জানাব।

হুমায়ুন একটা রূপার কারুকাজ করা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসলে, তার অশ্বশালার প্রধান সিপাহসালার সামরিক কৌশলের সারাংশ ব্যাখ্যা করে, যা হুমায়ুন তার এবং বাইসানগারের সাহায্যে তৈরী করেছে।

মহামান্য যুবরাজবৃন্দ, জাহিদ বেগ বক্তব্য শুরু করে, তার প্রশস্ত মুখাবয়ব গম্ভীর, আমরা শেরশাহের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুই জানি না কিন্তু বর্তমানে তার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে সে নিজের অবস্থান সংহত করতে বেশী আগ্রহী- সে তার সেনাবাহিনীকে বাংলা থেকে পশ্চিমে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে তাই তাঁর আরো রসদের আশ্বাস প্রয়োজন। সে সেইসাথে গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের জলাভূমি অঞ্চলে বসবাসকারী বর্বর উপজাতিগুলি তার পেছনে বিদ্রোহ করে বসতে পারে সেই ঝুঁকির ভেতরেও রয়েছে। তাঁর তাই নিজেকে যথেষ্ট পরিমাণে নিরাপদ মনে না হওয়া পর্যন্ত সে আগ্রা থেকে আমাদের ধাওয়া করে এখানে আসবে না, তার মানে এই দাঁড়ায় যে আমাদের হাতে সামান্য হলেও খানিকটা সময় রয়েছে…যদি সত্যি সত্যি এটাই তার ইচ্ছা হয়ে থাকে এবং এটা নিশ্চিতভাবে বলা মুশকিল। এই সময়টায় আমাদের অবশ্যই নিজেদের বাহিনীর জন্য নতুন সৈন্য সংগ্রহ করতে হবে। আমরা ইতিমধ্যে কাবুলের প্রশাসকের কাছে বাড়তি লোকবল প্রেরণের জন্য দূত পাঠিয়েছি। তারা একবার পৌঁছে গেলে, আমাদের অবস্থান তখন অনেকবেশী শক্তিশালী হবে আর আমাদের তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনেক বেশী স্বাধীনতা থাকবে।

আমরা কি এইসব নতুন সৈন্যদের বেতন দিতে পারবো? আসকারি জিজ্ঞেস করে তার ছোট ছোট কালো চোখের মনিতে একাগ্রতা স্পষ্ট। নাকি আমরা আশা করি যে তাঁরা আমাদের পক্ষে লড়াই করবে কেবল লুটের মালের প্রতিশ্রুতির কারণে?

আমাদের কাছে যথেষ্ট তহবিল আছে- আগ্রা এবং সেই সাথে দিল্লীর রাজকোষ থেকে প্রাপ্ত, কাশিম উত্তর দেয়।

এবং তাঁরা এসে পৌঁছাবার আগে…? কামরান জানতে চায়।

আমরা সেই সময়ে লাহোরকে শক্তিশালী আর রসদের পর্যাপ্ত মজুদ নিশ্চিত করবো, হুমায়ুন বলে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে শহরটায় কোনো প্রতিরক্ষা দেয়াল নেই কিন্তু উত্তরে রাভি নদী আমাদের নিরাপত্তা দেবে এবং আমরা পশ্চিম, দক্ষিণ আর পূর্বদিকে প্রতিরক্ষা পরিখা খনন করে সেখানে আমাদের কামান এবং তবকিদের মোতায়েন করতে পারি। রাজপ্রাসাদটা বেশ মজবুত করে নির্মাণ করা হয়েছে। নতুন সৈন্যের আগমনের জন্য অপেক্ষা করার সময়ে আমরা কিছু সময়ের জন্য শহরটাকে রক্ষা করতে পারবো।

কামরানের সবুজ চোখ পিট পিট করে কিন্তু সে কিছু বলা থেকে বিরত থাকে।

মহামান্য যুবরাজবৃন্দ, আপনারা প্রত্যেকে নিজেদের সাথে কতজন সৈন্যের বাহিনী নিয়ে এসেছেন? কাশিম তাঁর উঁত কাঠের প্রচ্ছদযুক্ত খেরো খাতাটা খুলে যেখানে হুমায়ুনের যতদূর মনে পড়ে তার উজির গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যাপার লিখে রাখে। কাশিম নিজের গলায় একটা মালা থেকে ঝুলতে থাকা ছোট জেড পাথরের দোয়াতদানির মুখটা খুলে এবং সেটায় নিজের ব্যবহৃত লেখনী ডুবিয়ে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে।

আমার সাথে পাঁচ হাজার অশ্বারোহীর একটা বাহিনী আছে, যাদের ভিতরে এক হাজার হল অশ্বারোহী তীরন্দাজ, আসকারি বলে, এবং সেই সাথে অতিরিক্ত পাঁচশ ঘোড়ার পাল।

আমার বাহিনীতে তিন হাজার অশ্বারোহী আর পাঁচশ পদাতিক সৈন্য রয়েছে, হিন্দাল বলে। সবাই দক্ষ যোদ্ধা।

তারা সবাই কামরানের দিকে একসাথে তাকায়। আমার সাথে কেবল দুই হাজার অশ্বারোহীর একটা বাহিনী রয়েছে। আর তাছাড়া, তুমিইতো আমাকে কয়েক সপ্তাহ পূর্বে কখনও আক্রমণের সম্মুখীন হলে আমার প্রদেশকে প্রতিরক্ষাহীন অবস্থায় ফেরে রাখার বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছিলে… তার কণ্ঠস্বর সহ্য করাটাই হুমায়ুনের জন্য জুলুম হয়ে দাঁড়ায়-কামরানের প্রদেশ সবচেয়ে বড় আর সবার চেয়ে সমৃদ্ধ এবং শেরশাহের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত আর নিজের প্রদেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে না ফেলে সে অনায়াসে দুই হাজারের অনেক বেশী সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারতো, কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের ক্রোধ দমন করেন। কিছুক্ষণের জন্য কেবল কাশিমের লেখনীর খসখস আওয়াজ শোনা যায়, তারপরে উজির লেখা শেষ করে মুখ তুলে তাকান। বেশ, মহামান্য যুবরাজবৃন্দ, এইসব অতিরিক্ত লোক এসে যোগ দেয়ায় আমাদের সেনাবাহিনীর সংখ্যা নব্বই হাজারে উন্নীত হয়েছে।

তাদের এখানে আটকে রাখার জন্য আমাদের সব রকমের চেষ্টা করতে হবে আমি চাই না তারা বাসায় যাবার জন্য গায়েব হতে শুরু করুক…হুমায়ুন বলে।

সেটা এড়াবার একমাত্র পথ হল তাঁদের শীঘ্রই যুদ্ধ আর লুটের মাল লাভের প্রশ্রুিতি দেয়া। লাহোরে রাজকোষ আর রাজঅন্তঃপুরের মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরে আমাদের এখন উচিত পুনরায় শেরশাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করা তাঁকে চমকে দিয়ে…কামরান উত্তর দেয়।

হ্যাঁ, আসকারিও ব্যথভাবে সায় দেয়। কামরান ঠিকই বলেছে। সেটাই কি শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত হবে না?

সেটা হবে একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত, হুমায়ুন উত্তর দেয়। তোমরা ভুলে গেছো আমাদের বাহিনীর চেয়ে কত বিশাল তার সৈন্যসংখ্যা। চূড়ান্ত বিজয়ের সামান্যতম সম্ভাবনার জন্য আমাদের গোলন্দাজ বাহিনীর সাথে একটা যুগলবন্দি দরকার হবে। সেটা করতে গেলে আমাদের অগ্রসর হবার গতি হ্রাস পাবে আর সেই সাথে আমাদের অগ্রসর হবার খবর তার কাছে পৌঁছাবার জন্য সময়ের একটা ব্যাপার আছে। কামরান, আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। দিল্লী কিংবা আগ্রায় শেরশাহের হাতে নিজেকে অবরুদ্ধ হতে না দিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করায় তুমি আমার সমালোচনা করেছে কিন্তু এখন আমি যখন তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য লাহোরকে সুরক্ষিত করতে চাইছি, তুমি আমাকে অনুরোধ করছে তার বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধযাত্রা করতে…

পরিস্থিতিগুলো ভিন্ন। কিন্তু মোদ্দা কথা একটাই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তোমার প্রয়োজন নেই। তুমি সেটা চাও না। তুমি কেবল তোমার নিজেরটা আমাদের বলতে চাও, কামরান নিজের চোখে মুখে একটা মনখারাপ করা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে বলে। আমি আর বেশী কিছু বলতে চাই না।

হুমায়ুন তাঁর নানাজানের চোখে হুশিয়ারী দৃষ্টি খেয়াল করে, এই দফা সে কামরানের দ্বারা তাকে প্ররোচিত করার প্রলোভন বহুকষ্টে দমন করে। সে বরং হিন্দাল আর আসকারির দিকে ঘুরে তাকায়। কামরান ভুল করছে। আমি সত্যিই তোমাদের ভাবনা জানতে আগ্রহী। তাঁরা চুপ করে থাকে, তাদের বড়ভাইদের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা সম্ভবত তাঁদের সংযত করে তুলেছে। হুমায়ুনের ভিতরে হতাশার সাথে অনুশোচনার ক্ষরণ শুরু হয়। এই ধরনের কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। অতীতের সবকিছু ভুলে যাবার জন্য সে প্রস্তুত কিন্তু তার নিকট স্বজন, তার সৎ-ভাইয়েরা মনে হয় না সেরকম কিছু করতে ইচ্ছুক।

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পরে অবশ্য হিন্দা কথা বলে। কাবুল থেকে বাড়তি লোকবল একবার এসে পৌঁছাবার পরে জাহিদ বেগ কি সব পছন্দের কথা বলছিলো। সেগুলো কি?

হুমায়ুন তার প্রশ্নের উত্তর দেয়। কম করে হলেও আমি পঞ্চাশ হাজার লোকের একটা বাহিনী প্রত্যাশা করছি। আমি তাঁদের কাছে আদেশ পাঠিয়েছি যে আমরা যদি ইতিমধ্যে এখানে অবরোধে সম্মুখীন হই তাহলে তারা অবরোধকারী বাহিনীকে পেছন থেকে এসে আক্রমণ করবে। আর তারা যদি শেরশাহ আগ্রা থেকে অগ্রসর হবার আগেই আমাদের সাথে এসে যোগ দেয়- আমি যেমন আশা করছি তখন শেরশাহের আগুয়ান বাহিনীর পার্শ্বদেশে আক্রমণের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক লোক আমাদের সঙ্গে থাকবে। অধিক লোকবলের সুবিধা তাঁর থাকবে কিন্তু আমাদের পক্ষে থাকবে গতি আর ঘোড়সওয়ারীর কুশলতা যা আমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে সবসময়ে আমাদের দারুণ সহায়তা করেছে। কামরান তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, শেরশাহের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করার ঝুঁকি নিতে আমি প্রস্তুত- কেবল এই মুহূর্তে সেটা আমরা করতে পারছি না…।

কামরান কথা না বলে কেবল কাঁধ ঝাঁকায় এবং পুনরায় নিরবতা এসে বিরাজমান হয়। হুমায়ুন উঠে দাঁড়ায়। শেরশাহের অভিপ্রায় সম্বন্ধে আর কাবুল থেকে আমাদের অতিরিক্ত বাহিনীর অগ্রসর হবার সংবাদ যখন আমাদের কাছে আরও বিশদভাবে থাকবে তখন আবার আমরা আলোচনার জন্য মিলিত হতে পারি। কিন্তু তার আগে আজ রাতে একটা ভোজসভার আয়োজন করলে কেমন হয় বহুদিন পরে আমরা আবার সবাই একত্রিত হয়েছি। বর্তমান বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও বাবরের ছেলেরা একতাবদ্ধ রয়েছে এসো দুনিয়াকে সেটা আমরা দেখিয়ে দেই।

হুমায়ুন করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে নিজের আবাসন কক্ষের দিকে হেঁটে যাবার সময় মহিলাদের কক্ষে যাবার দরজা সে পার হয়ে আসে। সেখানে ভেতরে কোথাও গুলরুখের থাকার কথা তাঁকে বলা হয়েছে কামরানের সাথে সে লাহোরে এসেছে। হুমায়ুন তাঁকে তাঁর দরবারে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার পরে সঙ্গত কারণেই তিনি তাঁর বড় ছেলে, উচ্চাকাঙ্খি কামরানের সাথে থাকাটাই বেছে নিয়েছেন। মহিলা কি কোনোভাবে তাঁর ছেলেদের প্রভাবিত করতে চেষ্টা করছে এবং সেটা যদি হয়ে থাকে, কিভাবে? এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। হুমায়ুন মুহূর্তের জন্য চিন্তা করে তার সৎ-ভাইদের পুনরায় একত্রিত করাটা তার ঠিক হয়েছে কিনা। তাঁদের চারজনের ভিতরে সত্যিকারের বিশ্বাস, সত্যিকারের একতাবোধ কখনও জন্ম নেবে এমন চিন্তা করাটা হয়ত বোকামী হবে- আকাঙ্খ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময়ে মাথা চাড়া দেবে। আর এজন্য কি সে তাঁদের দোষ দিতে পারে? তাঁদের অবস্থানে থাকলে যে ভাই উত্তরাধিকার সূত্রে সবকিছু পেয়েছে তাঁর প্রতি কি সে ক্ষোভ অনুভব করতো না? তাঁকে তাঁদের সবাইকে বিশেষ করে কামরানকে-চোখে চোখে রাখতে হবে এবং অবাধ্যতার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র তাকে ব্যবস্থা নিতে হবে। ঘরের বাইরে যখন শত্রু কড়া নাড়ছে তখন ঘরের ভেতরের শত্রুকে সে কোনমতেই বরদাশত করবে না।

হুমায়ুনের হঠাৎ সালিমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছা হয়। তাঁর উষ্ণ, ঐকান্তিক আলিঙ্গনে দৈহিক সুখে উদ্বেলিত হয়ে সে অস্বস্তিকর ভাবনাগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখতে পাবে। তার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠে এবং তাঁর হাটার গতি সহসা বেড়ে যায়।

*

সুলতান, শেরশাহের অগ্রবর্তী বাহিনী আগ্রা থেকে লাহোরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছে। হুমায়ুনের বিশৃঙ্খল স্বপ্নের রেশ জওহরের কণ্ঠস্বরে ভেঙে যায়। সে কষ্ট করে ঘুমের রেশ কাটিয়ে সজাগ হবার মাঝে জওহরের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখটা তার ডানহাতে ধরা মোমের দপদপ করতে থাকা আলোক রশ্মির মাঝে উদ্ভাসিত দেখতে পায়। আহমেদ খান, এখনই আপনার সাথে দেখা করতে চায়। সে এমনকি ভোরের আলো ফোঁটা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি হয়নি। তাঁর গুপ্তদূতদের একজন তার সাথেই রয়েছে। গত ছয় দিন লোকটা পথেই ছিল এবং এখনই ফিরে এসেছে।

হুমায়ুন উঠে বসে, তার বিছানার পাশে একটা কাঠের পাদানির উপরে রাখা পিতলের পাত্রে রক্ষিত পানি দিয়ে মুখে ঝাপটা দেয় এবং একটা সবুজ আলখাল্লা গায়ে জড়িয়ে নেয়। কয়েক মিনিট পরে, আহমেদ খান আর পথের ধকলের ফলে ক্লান্তিতে টলতে থাকা গুপ্তদূতকে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

তুমি নিশ্চিত শেরশাহ পুনরায় সামনের দিকে এগিয়ে আসছে?

জ্বি,সুলতান। আমার গুপ্তদূতের বক্তব্য আপনি নিজের কানেই শোনেন।

গুপ্তদূত কয়েক পা সামনের দিকে এগিয়ে আসে। আমি এর উপরে আমার জীবন বাজি রাখতে পারি। আমি নিজের চোখে যা দেখেছি আর নিজের কানে যা শুনেছি সে বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করেছি এবং কেবল তারপরেই আমি লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি, পথে ঘোড়া পরিবর্তন করার জন্য আমি কেবল দেরী হয়েছে।

কতজন সৈন্যের বাহিনী?

সেটা গণনা করাটা একটু কঠিন কিন্তু চলার পথে তারা যে পরিমাণ ধূলো উড়াচ্ছে, বেশ কয়েক হাজার অশ্বারোহী হবে, সুলতান।

আর শেরশাহর নিজের কি খবর?

আমি যা শুনেছি সে অনুযায়ী তিনি এখনও আগ্রায় অবস্থান করছেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি নিজেও যাত্রা করবেন, আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত। আমি রওয়ানা হবার ঠিক আগ মুহূর্তে, আগ্রা দূর্গের নীচে নদীর তীরে মালবাহী একটা বিরাট বহরকে সেখানে অবস্থান করতে দেখেছি- ভারবাহী খচ্চর, ষাড় আর উটের কোনো সীমা সংখ্যা নেই আর সেই সাথে রয়েছে কয়েকশ হাতি। মালবাহী শকটে বেগুনী রঙের আচ্ছাদনযুক্ত শেরশাহের নিজস্ব তাবু ভাঁজ করা অবস্থায় তুলতে দেখেছি। গুপ্তদূত নিজের দায়িত্ব সাফল্যের সাথে পালন করায় এখন তাঁর নোংরা, টানটান মুখটা দৃশ্যত স্বাভাবিক হয়ে উঠে।

সে বিদায় নেয়া মাত্র, হুমায়ুন তাঁর নীচু টেবিলের সামনে আসনপিড়ি হয়ে বসে। তার ভাইদের সাথে আরো আলোচনা করে কোনো লাভ হবে না। গত কয়েক দিন ধরে, আসকারি আর হিন্দাল তাদের বড় ভাইদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুনতেই বেশী পছন্দ করেছে, নিজেরা গঠনমূলক কোনো পরামর্শ না দিয়ে। শেরশাহের সাথে যুদ্ধযাত্রার পক্ষে কামরান এখনও তর্ক চালিয়ে যাচ্ছে এবং হুমায়ুন দৃঢ়তার সাথে সেটা নাকচ ক