আতঙ্কিত হয়ে উঠল নিকোলাস। অবচেতনেই চেষ্টা করল সবাইকে ধাক্কা দিয়ে বন্দিদের কাছে ছুটে যেতে; কিন্তু তার সামনে মানুষের ঘন দেয়াল আর ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা লাল পাগড়ি পরিহিত এক লোক ঘুরে তাকিয়ে গালি দিয়ে উঠল নিকোলাসকে। কিন্তু থু থু মিশ্রিত অশ্রাব্য ভাষা পাত্তা দিল না নিকোলাস। মাথা জুড়ে শুধু একটাই চিন্তা যে দিল্লির রাস্তা ধরে ভাই আর ভ্রাতুস্পুত্রকে সাধারণ অপরাধীর মত করে প্যারেড করাচ্ছে আওরঙ্গজেব আর মুরাদ। কিন্তু এরপর ভিন্ন কিছু উপলব্ধি করল নিকোলাস। বিশ্বাসঘাতকেরা যদি ভেবে থাকে যে এ ধরনের প্রদর্শনীতে তাদের জনপ্রিয়তা বাড়বে তাহলে ভুল ভেবেছে। চারপাশ থেকে অসন্তুষ্ট হয়ে চিৎকার করে উঠল সকলে আর কয়েকজন তো পাথর, গোবরের স্তূপ তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারতে লাগল সৈন্যদিগের দিকে। কাঠের মঞ্চের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে অবশেষে থামল হাতি।
ঠিক সেই মুহূর্তে থেমে গেল বাজনা আর উপরের বারান্দাতে দেখা গেল চওড়া কাঁধ আর লম্বাদেহী একজনকে। তৎক্ষণাৎ আওরঙ্গজেবকে দেখতে পেল নিকোলাস। হঠাৎ করেই চিৎকার থামিয়ে সবাই ঘুরে তাকাল তার দিকে। কী করতে যাচ্ছে সে? বক্তৃতা দেবে? দারাকে প্রকাশ্যে নিন্দা করবে? কিন্তু মনে হল এরকম কোন অভিপ্রায় নেই আওরঙ্গজেবের। হাত তুলতেই তার মাথার উপরে থাকা গুলি ছোঁড়ার ফোকর প্রাচীর থেকে তিনবার বাদ্য বেজে উঠল ত্বারস্বরে। ইশারা পেয়ে মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সৈন্য সামনে এগিয়ে এসে দারাকে টেনে-হিঁচড়ে নামালো হাওদা থেকে। দারা মাটিতে পড়ে যেতেই বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল ভিড়ের জনতা। এক মুহূর্তের জন্য নিকোলাসের সামনে থেকে মুছে গেল দারার দৃশ্য, তারপর আবারো তাকাতেই দেখতে পেল বহুকণ্ঠে হাত বাঁধা অবস্থায় উঠে দাঁড়াল দারা। সৈন্য দুজন আবারো ধরে ফেলল তাকে, এইবার ধাক্কা দিল মঞ্চে ওঠার তিন ধাপ কাঠের সিঁড়ির উপর।
মুখ ঘুরিয়ে সৈন্যদের হাতের গণ্ডি পার হবার জন্য উন্মত্ত জনতার দিকে তাকাল দারা। এত দূর থেকেও দেখা গেল শাহজাদার উস্কুখুস্কু, আলুলায়িত চুল কাঁধের উপর পড়ে আছে ইঁদুরের লেজের মত। তারপরেও দেহভঙ্গিমায় ফুটে উঠল আভিজাত্য আর আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ। ভাইয়েরা একজন শাহজাদার সমস্ত বাহ্যিক চিহ্ন কেড়ে নিলেও হরণ করতে পারেনি তার আত্মসম্মান, আপন মনে ভাবল নিকোলাস। ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে আওরঙ্গজেবের দিকে সোজাসুজি তাকাল দারা। উপরের বারান্দায় প্রস্তরবৎ মূর্তি হয়ে তাকিয়ে আছে আওরঙ্গজেব। নিকোলাস শুনতে পেল কিছু একটা বলে উঠল দারা, কিন্তু বুঝতে পারল না শব্দগুলো। যদিও আওরঙ্গজেব স্পষ্ট শুনেছে। সাথে সাথে দারার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সৈন্যকে ইশারা করতেই তারা দারাকে ধরে জনতার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বাধ্য করল হাঁটু ভেঙে বসে পড়তে।
এরপর মঞ্চের ডানপাশে দুর্গের দেয়ালে থাকা ফটক দিয়ে বের হয়ে এলো শক্তিশালী এক লোক। প্রায় মাটিতে লুটাচ্ছে এরকম এক চামড়ার অ্যাপ্রন পরিহিত লোকটার হাতে চমকাচ্ছে চওড়া ফলার ভোজালি। চিৎকরে করে উঠল নিকোলাস, না!…না! লোকটা মঞ্চে উঠে আসতেই উন্মাদের মত ছাড়া পেতে চেষ্টা শুরু করল দারা। মুক্তি পেতেই লাফ দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে হাতির দিকে দৌড়ে সিপিরের পাশে গেল। পুত্রকে ছোঁয়ার চেষ্টা করল; কিন্তু আওরঙ্গজেবের সৈন্যরা তাকে আবারো ধরে ফেলে ছুঁড়ে দিল মঞ্চের দিকে। সেখানে আগের সৈন্য দুজন আবারো ধরে ফেলল দারাকে। আবারো হাঁটু ভেঙে বসতে বাধ্য হল দারা; প্রত্যেকে শাহজাদার একটি করে বাহু পেছনে টেনে ধরতেই দারার মাথা চলে এলো সামনের দিকে। আওরঙ্গজেবের দিকে তাকাল জল্লাদ, মাথা নাড়ল বিশ্বাসঘাতক ভাই। ভয়ংকর শব্দে আর্তচিৎকার করে উঠল ভিড়ের জনতা, জল্লাদ মাথার উপরে ভোজালি তুলেই নামিয়ে আনল নিচে। একটা মাত্র কোপে সাঙ্গ হল হত্যা। রক্তাক্ত হয়ে দারার শরীর ছিটকে পড়ল সামনের দিকে। কিন্তু মাথা গড়িয়ে গেল মঞ্চের সামনের দিকে, পড়ে গেল মাটিতে। একজন সৈন্য তাড়াতাড়ি কুড়িয়ে নিল সেটা।
আরো ভালোভাবে দেখার জন্য পেছন থেকে সকলে ধাক্কা দিতে আরম্ভ করায় মুখ তুলে বারান্দার দিকে তাকাল নিকোলাস। চলে গেছে আওরঙ্গজেব। হাঁটুতে মাথা গুঁজে কাঁদতে লাগল সিপির। হাতি আবার চলতে শুরু করল দুর্গের দিকে, তাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে খুনী চাচার বরাদ্দ করে রাখা ভবিষ্যতের দিকে।
.
২.১১
এখনো কি কোন খারাপ সংবাদ পাওয়া গেছে, আব্বাজান? কথা বলতে বলতেই বহুদূরে বুম করে আওয়াজ শুনতে পেল জাহানারা। এতক্ষণে তো দুর্গের প্রাত্যহিক বোমাবাজি বন্ধ হয়ে যাবার কথা। রাত নেমে এসেছে আর গাছের ফাঁক দিয়ে আধা মাইল দূরে যমুনার তীরে বিদ্রোহীদের তাঁবুতে রান্নার চুলার আগুনের আভা দেখা যাচ্ছে। অবরোধ শুরু হবার পর থেকে শাহজাহানের অভ্যাস হয়ে গেছে সন্ধ্যা বেলা দুর্গের গুলি করার ফোকর বিশিষ্ট প্রাচীরের উপর দাঁড়িয়ে বিদ্রোহী আর তার নিজের দলের পাল্টাপাল্টি বোমা বিনিময়ের দৃশ্য দেখা। পিতাকে এখানেই পাওয়া যাবে অনুমান করতে পেরে হারেম থেকে মাত্রই এসে যোগ দিয়েছে জাহানারা।
মাথা নাড়লেন শাহাজাহান, না। তারা এখনো ছোট কামান ব্যবহার করে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়ছে, আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহের উপর। শুধুমাত্র তাদের সবচেয়ে বড় কামান দিয়ে একটানা গুলিবর্ষণ করলেই সম্ভব হবে জোড়া দেয়ালে ফাটল ধরানো। আমার মনে আছে দুর্গ পুনর্নির্মাণের সময় এর নকশা আমাকে দেখিয়েছিলেন দাদাজান। দেয়ালের মজবুত নির্মাণ আর উচ্চতা নিয়ে গর্বিত ছিলেন তিনি। আমার মনে হয় না কখনো স্বপ্নেও ভেবেছিলেন যে একদিন তাঁরই পরিবারের এক সদস্য এদের উপর হামলা চালাবে। একইভাবে আমিও কখনো ভাবিনি যে নিজ পুত্ৰই আক্রমণ করে বসবে….
