রোশনারার কথা মনে হতেই স্মরণ হল সান্ধ্য খাবারের জন্য হারেমে ফিরে যাওয়া উচিত। অবরোধের শুরু থেকেই ভগিনীদ্বয়ের সাথেই খাবার গ্রহণ করে সে। রোশনারার সাথে তার সম্পর্ক এখনো বেশ শীতল, পারতপক্ষে একে অন্যের সাথে তেমন কথা বলে না। কিন্তু জানে কামানের গর্জন ভীত করে তোলে গওহর আরাকে। যদিও এখন আর সে কোন শিশু নয়, পূর্ণবয়স্ক নারী, তার কনিষ্ঠ ভগিনী খেতে পারছে না তেমন, ঘুমাচ্ছেও অল্প। প্রতি সন্ধ্যায় জাহানারা চেষ্টা করে গওহর আরার মনোযোগ আনন্দে ভুলিয়ে রাখতে।
আব্বাজান, তোমার অনুমতি নিয়ে হারেমে ফিরে যেতে চাই আমি। মাথা নাড়লেও কিছু বললেন না শাহজাহান। শান্তিকালীন সময়ের মতই প্রাত্যহিক সান্ধ্য মশাল জ্বলে উঠল হারেমের প্রধান আঙিনায় যাবার ফটকের উভয় পার্শ্বে, পা বাড়াল জাহানারা।
তুর্কি নারী সৈন্যরা তার জন্য দরজা মেলে ধরতেই হাসির আওয়াজ শুনতে পেল জাহানারা। আঙিনার মাঝখানে ঝরনার ধারে মার্বেলের উপর বসে আছে তিন নারী। এক মুহূর্তের জন্য তাদের হাস্যরসের শব্দে ভান করল যেন কিছুই অনর্থ হচ্ছে না চারপাশে। এরপর নিজের আর বোনদের জন্য সান্ধ্য খাবার আয়োজনের নির্দেশ দিল; কিন্তু তার আগে রোশনারার কাছে গিয়ে দুর্গের প্রতিরক্ষা সম্পর্কে পিতার ভাষ্য জানাতে হবে।
কিন্তু আঙিনার দূরতম কোণে রোশনারার গৃহে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল বোন সেখানে নেই। এমনকি তার পরিচারিকারাও নেই। হতে পারে স্নানঘরে গেছে? চলে যেতে উদ্যত হতেই বোনের জমকালো কারুকাজ করা গহনার বাক্সের উপরে ভাঁজ করা একটা কাগজ পড়ে আছে দেখতে পেল জাহানারা। কৌতূহলী হয়ে তুলে নিয়ে খুলতেই দেখতে পেল রোশনারা পরিষ্কার অক্ষরে সম্বোধন করেছে পিতাকে, বোনের ময়ুরের সীলমোহরও নজরে পড়ল। কেমন বেখাপ্পা দেখাল পুরো ব্যাপারটা। পত্র লেখার কী দরকার যখন চাইলেই পিতার সাথে দেখা করতে পারে সে… জাহানারা পত্রখানা ফিরিয়ে রাখতে গিয়েই দেখতে পেল আরেকটা জিনিস–বাক্সের রুপার ঢাকনা খোলা, অথচ নিজের শ্রেষ্ঠ আর সুন্দর রুবি, খোদাই করা পান্না আর তাদের গ্রেট দাদীজান হামিদা বানুর নেকলেসও ওখানেই রাখে রোশনারা। তার পরিচারিকারা কেমন করে এতটা ভুলো মন হতে পারে? ঢাকনা তুলে ভেতরে তাকাল জাহানারা। বাক্স খালি, শুধু কয়েকটা রুপার চুড়ি পড়ে আছে। ভারী ঢাকনাটা আবার জায়গা মত রেখে পুরো কক্ষের দিকে নজর বুলালো জাহানারা। যেমনটা সবসময় থাকে তেমন পরিষ্কার নয়। ড্রয়ার থেকে ঝুলে আছে একটা কাশ্মিরি শাল, মেঝেতে গড়াচ্ছে সোনার পাড়ওয়ালা সিল্কের স্কার্ট। ডাকাতি হয়েছে নাকি? এত সুরক্ষিত হারেমে তো সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু এরপরই মনে হলো আরেকটা কথা–চমকে গিয়ে… কি করছে ভাবার আগেই পত্রের সীলমোহর খুলে পড়ে ফেলল বোনের লেখা, কার্পেটের উপর ঝরে পড়ল সবুজ মোমের গুঁড়া।
‘প্রিয় পিতা, আপনি এই চিঠি পড়তে পড়তে দুর্গ ছেড়ে ভাইদের কাছে বেরিয়ে পড়েছি আমি। দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। আপনি যাদেরকে ভুল বুঝেছেন তাদের প্রতি বিশ্বস্ত আমি, যাদের হৃদয়ে সাম্রাজ্যের জন্য সৎ অভিপ্রায় ছাড়া আর কিছু নেই, আমার বিবেকের কথা মান্য করতে হবে আমাকে। হয়ত আবারো আনন্দময় সময়ে আমাদের দেখা হবে।‘
কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হল যেন জমে গেল জাহানারা, হাতে ধরা পত্রখানার লাইনগুলোর অর্থই যেন বোধগম্য হল না। এরপর ধাতস্থ হতেই চিঠিটা ভাঁজ করে দরজার কাছে গিয়ে ডেকে পাঠালো পরিচারিকাকে।
এখনি খাজাসারাকে ডেকে পাঠাও। বলো যে এটা অত্যন্ত জরুরি।
দুই মিনিটেরও কম সময়ের মাঝে এসে হাজির হল হারেমের তত্ত্বাবধায়ক। সদা প্রশান্ত আর অভিজাত চেহারাতে উদ্বিগ্নতার ছাপ। মাননীয় শাহজাদী?
আমি যখন বোনের সাথে দেখা করতে এসেছি, সে এখানে ছিল না। পরিবর্তে এই চিঠিটা পেয়েছি যাতে লেখা যে দুর্গ ছেড়ে চলে গেছে সে।
কিন্তু এটা তো অসম্ভব… একেবারে, কিছুতেই সম্ভব নয়।
আমার মনে হয় ভুল বলছ তুমি, শেষবার কখন দেখেছ তাকে?
দ্বিধায় পড়ে গেল খাজাসারা। সম্ভবত আজ সকালবেলা কথা হয়েছিল… হারেমের একটা ব্যাপারে…
কোন ব্যাপারে?
আমি ভাবিনি যে এটা নিয়ে আপনাকে বিরক্ত করা উচিত। গতকাল সন্ধ্যায় হারেমের এক ভৃত্য, বয়স্ক, শৌচাগার পরিষ্কারক মারা গেছে। শহর থেকে আসা হিন্দু ছিল বৃদ্ধা আর তার শেষ ইচ্ছে ছিল শহরে চিতায় পোড়ানোনার জন্য যেন তার মৃতদেহ আত্মীয়দের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। শেষ মুহূর্তে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল বেচারা আর আমিও কথা দিয়েছি যে সাধ্যমত সব করব, যদিও বিশ্বাস করুন বুঝতে পারছিলাম না যে কীভাবে সম্ভব। কোন একভাবে শাহজাদী রোশনারা মৃতের কথা জানতে পেরে আমাকে ডেকে পাঠান। বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার কর্মচারিদের প্রতি সচরাচর কোন আগ্রহ দেখান না তিনি। সহৃদয়ভাবে আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করার পর জানান যে, মৃতা নারীর অনুরোধ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আজ সকালে প্রথম আলো ফোঁটার সাথে সাথে দুর্গের সেনাপ্রধানের কাছে বার্তা পাঠান যেন শাহজাদা মুরাদের শিবিরে বার্তাবাহক ও যুদ্ধবিরতীর পতাকা পাঠিয়ে দেয়া হয় দিনের বোমা বর্ষণ শুরুর আগেই। বার্তাবাহকের কাছে ইতিমধ্যেই স্বহস্তে লিখে রাখা পত্র ছিল। সীল করা চিঠিতে দুর্গ থেকে মৃতদেহ বের করে নেবার আকুতি লেখা ছিল… অন্তত তিনি তাই দাবি করেছেন…; গলা কেঁপে গেল খাজাসারার।
