শাহজাহানের ক্ষমতা আর দারার প্রত্যাশার আলো এত দ্রুত নিভে গেছে যে পরিষ্কার হয়ে গেছে এসব একদিনে হয়নি। আগ্রাতে থেকে আর দারাকে নিজের পাশেই রেখে প্রাদেশিক সেনাপ্রধানদের কাছ থেকে ক্রমান্বয়ে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিলেন শাহজাহান। কিন্তু অন্য পুত্রদেরকে সুযোগ দিয়েছেন বিশ্বাসঘাতকতার বীজ বপন করার। আগ্রা আসা-যাওয়ার পথে পুরষ্কারের লোভ দেখিয়ে নিজেদের মিত্র তৈরি করে রেখেছে তারা। দারার চেয়ে, যে কিনা পিতার পছন্দনীয় হওয়ায় নিজের সফলতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ছিল, তার অন্য ভাইয়েরা উপলব্ধি করেছিল যে নিজেদের উচ্চাকাঙ্খ পূরণ করতে হলে পদক্ষেপ নিতে হবে। যাই ঘটে থাকুক না কেন, হয়ত দারাকে সাহায্য করার আর কোন উপায় নেই নিকোলাসের… তাঁবুর মাঝে শাহজাদার বন্দি হবার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সৈন্যরা সব চলে যেতে শুরু করে। প্রথম প্রথম একজন দুজন করে নিঃশব্দে সরে পড়তে শুরু করে আর তারপর দলে দলে চলে যায় সবাই। শেষতক এত কম সংখ্যক সৈন্য টিকে ছিল যে দিল্লিতে একাকীই আসার সিদ্ধান্ত নেয় নিকোলাস। অন্তত এভাবে তাকে কেউ ততটা খেয়াল করবে না।
অবশেষে দিগন্তের কাছে শহরের বালি-পাথরের দেয়াল চোখে পড়তেই, ঘোড়া থেকে নেমে গেল নিকোলাস, ভাবতে চেষ্টা করল কী ঘটছে এখন সেখানে। আওরঙ্গজেব আর মুরাদ কি সত্যিই ক্ষতি করবে তাদের জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের? সত্য আবিষ্কারের আগে নিজের ছদ্মবেশ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। সচরাচর যে ধরনের পাজামা আর চামড়ার ফতুয়া পরে থাকে সেটি বদলে ইতিমধ্যেই গায়ে চাপিয়েছে পিঙ্গলবর্ণের সুতীর প্যান্টালুন আর লম্বা টিউনিক। সাথে চওড়া বেগুনি কোমরবন্ধনী, এটার মাঝে খুঁজে রেখেছে পিস্তল আর ছুরি। এবার মাথায় পরে নিল আমুলের দেয়া গোলাকার পশমী টুপি, চুলগুলো ভেতরে ঢুকিয়ে ধুলিমাখা সুতির গলার মাফলার একটু উপরে তুলে দিতেই ঢাকা পড়ে গেল মুখের নিচের অংশ।
দুই ঘণ্টা পরে, নিজের ক্লান্ত ঘোড়াটাকে শহরের ঠিক বাইরেই একটা সরাইখানায় রেখে সচরাচর চোখে পড়ে না এত বড় একটা ভিড়ের সাথে মিশে ঢুকে গেল মূল ফটকদ্বার দিয়ে। ফটকদ্বার আর পার্শ্ববর্তী দেয়াল সর্বত্র উড়ছে মোগল সবুজরঙা সিল্কের পতাকা সাধারণ সময়ে এর মানে সম্রাট বাস করছেন এ শহরে, কিন্তু আজ তারা কাকে সম্মান দেখাচ্ছে? ম্রাটের বিশ্বাসঘাতক পুত্রদ্বয়কে? ফটকের ভেতরে কয়েক শখানেক গজ গিয়ে বাঁক নিয়ে চওড়া উত্তরের প্রধান রাস্তা ধরে দিল্লির নতুন লাল দুর্গে হাঁটা ধরল নিকোলাস। সবাই মনে হচ্ছে এখন এদিকেই যাচ্ছে। একে অন্যকে ধাক্কা দিয়ে নিজেরা আগে পৌঁছাতে চাইছে, মনে হচ্ছে কিছু একটা মিস হয়ে যাবে সে চিন্তায় উদ্বিগ্ন। হতে পারে আজ কোন উৎসবের দিন। ভিড়ের সাথে মিশে নিকোলাস নিজেও হেঁটে এসে অবশেষে থামল দুর্গের সামনে চৌকোনা জায়গাটাতে, যেটির বিশাল বেলে-পাথরের তৈরি দেয়াল অপর পাশে চলে গেছে দুইশ গজ পর্যন্ত। হাজারো মাথার উপর দিয়ে নিকোলাসের চোখে পড়ল কোনমতে জড়ো করা এক্যুপ কাঠের উপর তৈরি করা হয়েছে একটি মঞ্চ। ঠিক দুর্গের দেয়াল থেকে উদগত হওয়া খোদাই করা সুদৃশ্য বারান্দার নিচে শহরে আসলে এ স্থান থেকেই জনগণের উদ্দেশে বক্তৃতা দিতেন শাহাজাহান। মঞ্চটার চারপাশ ঘিরে রেখেছে সৈন্যরা।
সামনের দিকে যেতে চেষ্টা করল নিকোলাস, যেন স্পষ্ট দেখা যায় সবকিছু। ভিড়ের শব্দ ছাপিয়ে মনে হল বাদ্যের তালে তালে বাজনা শোনা যাচ্ছে। অন্যরাও শুনতে পেয়েছে আর তাদের টুকরো টুকরো সংলাপ কানে এলো। তারা আসছে… বলে উঠল এক বৃদ্ধ, নিজের শুকনো গলা বাড়িয়ে, আর বেশি দেরি নেই। কে আসছে? আর কেন? হতে পারে আওরঙ্গজেব আর মুরাদ বিজয়ীর বেশে দখলকৃত শহরে ঘুরে বেড়াতে চায়? এখন বোঝা গেল ফটক দ্বারে পতাকার অর্থ। বাদ্যের বাজনা আরো তীব্র হয়ে উঠল, এরপরই নিকোলাসের চোখে পড়ল পদাতিক সৈন্যদের সারি, হাতে হাত ধরে দুর্গের বাম পাশের রাস্তা থেকে প্রবেশ করল চৌকোনা জায়গায়। ভিড়ের মাঝে দিয়ে নিজেদেরকে দাঁড় করিয়ে পথ করে নিল মঞ্চ পর্যন্ত। অত্যন্ত কর্কশ আচরণ করতে লাগল, ফলে হাতাহাতি-মারামারি বেঁধে গেল কয়েক জায়গায়। কিন্তু শীঘ্রি দেখা গেল পাঁচ থেকে ছয় গজ চওড়া একটা রাস্তা তৈরি হয়ে গেল, দুপাশে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে গেল সৈন্যরা।
ভিড়ের জনতা উৎসাহী দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল যে পথ দিয়ে এইমাত্র সৈন্যরা প্রবেশ করেছে সেদিকে। সমান্তরালভাবে দুই সারি অশ্বারোহী সৈন্যের একটি দল প্রবেশ করতেই চারপাশে শুরু হয়ে গেল হট্টগোল। একেবারে প্রথমে থাকা দুজন সৈন্যের লাগামের সাথে লাগান আছে ড্রাম, একের পর এক বাজিয়ে চলেছে দুজনে : প্রথমে একজন, পরে আরেকজন, তারপর দুজন একসাথে। যাই ঘটতে চলুক না কেন ভিড়ের জনতার সহ্য শক্তির যেন বাঁধ ভেঙে পড়তে চাইছে। পেছন থেকে সবাই মিলে আবারো ধাক্কা দিল নিকোলাসকে। কেউ একজন পড়ে গেল, শব্দ পেল নিকোলাস, সাথে সাথে মাড়িয়ে দিল পেছনের লোকেরা, অবাধ্য স্রোতের মত মানুষের ঢেউ ক্রমাগত ধাক্কা দিচ্ছে সামনের দিকে।
এরপর যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়েছিল তেমনিভাবে থেমে গেল সবকিছু। হতাশাবোধক অদ্ভুত একটা শব্দ শোনা গেল, যেন সবাই মিলে একসাথে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলছে। নিকোলাস দেখতে পেল এর কারণ…. একটা মাত্র হাতি এগিয়ে আসছে চৌকোনা জায়গাটার দিকে। রাজকীয় হাতি মহলের কোন জমকালোভাবে সজ্জিত জন্তু নয়, মুক্তাখচিত শিরস্ত্রাণ অথবা স্বর্ণমণ্ডিত গজদন্তও নেই–বয়সের ভারে ন্যুজ, ক্ষত-চিহ্ন আর ঝোলানো কানওয়ালা জন্তুটাকে পথ দেখাচ্ছে সাধারণ ধূতি পরিহিত লম্বা চুলের এক লোক। কিন্তু অন্য সকলের মত নিকোলাসও তাকিয়ে আছে হাতির দিকে নয়, বরঞ্চ হাতির পিঠে অমসৃণ কাঠ দিয়ে কোনমতে তৈরি হাওদার উপর বসে থাকা কৃশকায় চেহারা দুটোর দিকে তাকিয়ে আছে দারা আর সিপির, ন্যাকড়া ধরনের ছেঁড়া কাপড় গায়ে, পচা ফুলের মালা জড়ানো গলায়। ঋজু হয়ে বসে আছে দারা, ডান বা বাম কোন পাশেই তাকাচ্ছে না, কিন্তু তার পুত্র ঝুঁকে আছে সামনে দিকে।
