তো আমুল, ভাগ্য নিশ্চয়ই তোমার সহায় হয়েছে? বলে উঠল নিকোলাস। কিন্তু কাছাকাছি হতেই পাঞ্জাবীর মুখের বিমর্ষ ভাব দেখতে পেল স্পষ্ট। কী হয়েছে? শাহজাদী কেমন আছেন? আরো অবনতি…?
মাথা নাড়ল আমুল। ঐ ব্যাপারে কিছু জানি না আমি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে কয়েকটা কথা বলতে চাই।
নিজের তাঁবুতে ঢুকে ইশারা করে আমুলকেও ভেতরে ডাকল নিকোলাস। বাইরের আলো দ্রুত নিভে আসায় জ্বালিয়ে নিল তেলের বাতি। তাঁবুর দেয়াল আর ছাদে নাচতে লাগল কালির ছায়া। এরপর বন্ধ করে দিল তাঁবুর প্রবেশদ্বার।
কী হয়েছে আমুল?
কারো চোখে যাতে না পড়ে যাই এমনভাবে গাছের ছায়ার সাথে মিশে অবশেষে এমন এক রাস্তায় পৌঁছেছি, ভেবেছি যেটি কিনা কোন বসতির দিকে নিয়ে যাবে। এখান থেকে হয়ত কয়েক ঘণ্টার পথও যাইনি, দেখতে পেয়েছি ঘোড়ার বিশাল বড় এক যাত্রীদল, সাথে খচ্চর আর উটও ছিল, আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছে পশ্চিম দিকে। এরকম যাত্রী দলের সাথে প্রায়শ হাকিম থাকে, জানা থাকায় ধীরে ধীরে তাদের দিকে এগিয়ে গেছি। তৎক্ষণাৎ কাহিনী তৈরি করে বলেছি যে শিকার অভিযানে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছে আমাদের এক সদস্য। কিন্তু আমাদের কথা পুরো শোনার আগেই বয়স্ক, কাফেলার মালিক নিজের কাহিনী শোনাতে আরম্ভ করে দেয়। আগের দিন একদল সৈন্য দুজন বন্দি নিয়ে তার কাফেলার পাশ দিয়ে দিল্লি গেছে। কাফেলা থেকে মাংস আর উটের দুধ কেনার জন্য থেমেছিল সৈন্যরা, একজন গর্ব ভরে কাফেলার মালিককে জানায় যে তাদের কাছে বন্দি দুজন কোন সাধারণ মানুষ নয়। সম্রাটের পুত্র আর দৌহিত্র, আওরঙ্গজেব আর মুরাদের কাছে উপঢৌকন হিসেবে পাঠাচ্ছে মালিক জিউয়ান। কাফেলা মালিক এও জানিয়েছে যে, সে নিজের চোখে হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পেয়েছে দুই শাহজাদাকে।
রাজিক কোথায়?
ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেছে কাফেলা মালিকের কথা সত্য কিনা যাচাই করে দেখতে। আমি ফিরে এসেছি আপনাকে জানাতে। যদি আমরা এখনি তাঁবু গুটিয়ে নেই তাহলে হয়ত গিয়ে উদ্ধার করে আনতে পারব শাহজাদারকে। কাফেলা মালিকের কথা মত মাত্র শখানেকের মত সৈন্য আছে সে দলে।
আমরা তা পারব না। শাহজাদাকে কথা দিয়েছে আমি যে তার স্ত্রীর দিকে খেয়াল রাখব। অবস্থা ভালো না হওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকতে হবে আমাদেরকে। আমাদের ছোট্ট বাহিনীকে বিভক্ত করতে পারব না। এখানেই থাকো… তাঁবু থেকে বের হয়ে গেল নিকোলাস। দারাকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিল সে… আরো বেশি জোর করা উচিত ছিল। সেলিমাকে ডেকে আনো আমার কাছে। একজন কর্চিকে আদেশ দিল নিকোলাস। অস্থির হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল বৃদ্ধার জন্য। কাছে আসতেই দেখা গেল পরিচারিকার চেহারা উদভ্রান্ত হয়ে আছে।
তোমার মালিকা কেমন আছেন?
খুব খারাপ। ওড়না সরিয়ে নিল সেলিমা। বলিরেখাময় চেহারা বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রুজল। এখনো আমাকে চিনতে পারছেন না, কাশির দমকে কেঁপে উঠছে শরীর, আগুনের মত গরম চামড়া আর নাড়ীর গতিও হালকা, দপদপ করছে।
সোমরাজ পাতার কথা মনে পড়ে গেল নিকোলাসের, নিচু হয়ে টুপি থেকে তুলে নিল এক মুঠ। তাঁবুর বাইরে পড়েছিল এতক্ষণ।
এগুলো দিয়ে চা বানিয়ে দাও শাহজাদীকে। কাজে লাগতে পারে। মোলায়েম স্বরে জানালো নিকোলাস। কিন্তু সেলিমার মুখে ভেসে উঠল অসম্ভষ্টি।
কোন হাকিম পাওয়া যায়নি।
না। যদি অবস্থার আরো অবনতি হয়, আমাকে জানাবে।
এমনভাবে তাকাল সেলিমা যে স্পষ্ট পড়া গেল তার ভাষা। কেন জানাবো? কোন সাহায্য করেছেন আপনি? প্রাচীন পা দুটো টেনে শক্ত হয়ে চলে গেল সেলিমা। মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে ইতিমধ্যেই নরম হতে থাকা সোমরাজ পাতা। নাদিরার যাই ঘটুক না কেন, মৃত্যু অথবা সুস্থতা তাড়াতাড়ি হয়ে যাক, প্রার্থনা করতে লাগল নিকোলাস। এছাড়া আর কিইবা আশা আছে দারাকে মুক্ত করে আনার?
*
কঠিন নীলরঙা মেঘহীন আকাশের নিচে একাকী ঘোড়া ছুটিয়ে গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড ধরে দিল্লির দিকে চলেছে নিকোলাস। এড়িয়ে চলেছে পথের উপর চড়ে বেড়ানো গরু, নগ্ন ধুলাবালিতে খেলায় ব্যস্ত ছেলে-মেয়ে, কাঁধে কাস্তে নিয়ে মাঠের দিকে যেতে উদ্যত কৃষক আর মাঝে মাঝে ব্যবসায়ীদের গরুর গাড়ি অথবা উট। এই গ্রাম্য ভারতই তার পছন্দ; কিন্তু এখন হাতে সময় নেই এ আনন্দ উপভোগ করার। ছয় দিন আগে ঘোড়ায় চড়ে বসার আগেই নাদিরার সাধারণ সমাধিতে ফেলা হয়ে গেছে শেষ মুঠো মাটি, শেষ বারের মত পড়া হয়েছে প্রার্থনা দরুদ। যদিও তৃতীয় আরেকজন গুপ্তচর গিয়ে জোগাড় করে এনেছিল এক হাকিমকে নাদিরার জন্য কিছুই করতে পারেনি লোকটা। শাহজাদীর বিকারগ্রস্থ আচরণ শেষ কয়েক ঘণ্টায় আরো বেড়ে গিয়েছিল। হারেমের তাঁবুর চারপাশে ঘিরে থাকা পর্দার বাইরে অসহায়ের মত শুনতে হয়েছে ফুসফুস ফেটে যাবার মত দমকা কাশির শব্দ আর দারার জন্য শাহজাদীর উন্মাদের মত চিৎকার। অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না নিকোলাসের। এখন শান্তি পেয়েছে নাদিরা। দারা আর সিপিরের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা দেখার জন্য মুক্তি পেয়েছে নিকোলাস।
একজন ইউরোপীয়ানের কাছে যতই অদ্ভুত দেখাক না কেন স্তন ধোয়া জলের মত মহৎ আর সম্মানজনক উপহার পেয়েও কেন বিশ্বাসঘাতকতা করল মালিক জিউয়ান? মরিয়া এই উপহার পেয়ে মালিক কি ইশারা পেয়েছে যে তার জয়ীদের দলেই যোগ দেয়া উচিত? সম্ভবত দারাকে অনুসরণ করে আসা কম সংখ্যক সৈন্যও এতে ভূমিকা রেখেছে। নাকি ইতিমধ্যেই আওরঙ্গজেব আর মুরাদের সাগরেদ হয়ে গেছে সে?
