কী হয়েছে, মাননীয় শাহজাদা? আমরা কি তাঁবু গুটিয়ে নিচ্ছি।
না। সিপির আর দেহরক্ষীদের নিয়ে মালিক জিউয়ানের সাথে তার দুর্গে যাচ্ছি আমি। সেখানে থাকা সৈন্যদল ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা শুরু হয়ে গেছে। সৈন্যদের দক্ষতা আর প্রস্তুতি সম্পর্কে নিজের চোখে দেখতে চাই আমি। এছাড়াও মালিকের মতে, যদি আমি আর আমার পুত্র সৈন্যদের সামনে গিয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করি, তাহলে অন্যেরাও তার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসবে। তাঁবুর প্রধান হিসেবে আপনাকে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি আমি।
কিন্তু মাত্র পঞ্চাশের মত দেহরক্ষী প্রস্তুত হয়েছে আপনার সাথে যাবার জন্য। পুরো বাহিনী নিয়ে গেলেই কি ভালো হত? চারপাশে তাকিয়ে গলার স্বর নিচু করে আবারো বলে উঠল নিকোলাস, যদি মালিক জিউয়ান আপনার সাথে কোন কৌশল খেলতে চায়? আপনি নিশ্চিত যে সে পুরোপুরি বিশ্বস্ত?
গতকাল কী ঘটেছে দেখেছেন আপনি। জানি অনেক বছর ধরেই হিন্দুস্তানে বাস করছেন আপনি; কিন্তু সম্ভবত এখনো আমাদের আচার প্রথায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি। মালিক জিউয়ানকে নাদিরা যে সম্মান দিয়েছে তা সচরাচর দেখা যায় না। এখন মালিক আমার সাথে এমন এক বন্ধনে আবদ্ধ যা অবিচ্ছেদ্য। হঠাৎ করে সামনে এগিয়ে এসে নিকোলাসের বাহুতে হাত রাখল দারা। আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করছি না। বস্তুত আমি আপনাকে আরো বড় দায়িত্ব দিতে চাই। আমার স্ত্রীর শরীর ভালো নয়। বলা যায় আরো খারাপের দিকে, ক্ষণে ক্ষণে ঘামছে আর কেঁপে কেঁপে উঠছে। তাই আমি চাই সে এখানেই থেকে বিশ্রাম নিক। আমি কি আপনার ভরসায় তাকে রেখে যেতে পারি? তার নিরাপত্তা রক্ষাই এখন আপনার প্রধান দায়িত্ব। প্রতিজ্ঞা করুন যে তার এবং তার সম্মানের দিকে খেয়াল রাখবেন আপনি।
আমি কথা দিলাম।
পনের মিনিট বাদে সিপির আর মালিক জিউয়ানকে দুপাশে নিয়ে, দেহরক্ষী আর বলুচি নেতার রক্ষী বাহিনী সমভিব্যাহারে তাঁবু ছেড়ে বের হয়ে গেল দারা ঘোড়া ছুটিয়ে। গাছের ঘন ছায়ার নিচে একটু পরেই হারিয়ে গেল দৃষ্টিসীমার বাইরে।
শাহজাদীর জ্বর আরো বেড়ে গেছে। মাটির উপর উপুড় হয়ে বসে নিজের বন্দুকের ব্যারেল পরিষ্কারে ব্যস্ত নিকোলাস চোখ তুলে তাকিয়ে দেখতে পায় নাদিরার একজন পরিচারিকাকে–সেলিমা নামে বয়স্ক এক নারী, যে সিপির ধাত্রীর কাজও করেছিল–দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। সাদা সুতির ওড়না ছাপিয়েও উদ্বিগ্ন চোখ জোড়া দেখা যাচ্ছে।
কতটা খারাপ অবস্থা?
রাতের বেলা কাশি আরো খারাপের দিকে গিয়ে ঝাঁকুনি খেয়ে কাঁদতে শুরু করে দেন। পোশাক আর বিছানাও ভিজে গেছে ঘামে। আমি চেষ্টা করেছি শান্ত করতে কিন্তু কোন লাভ হয়নি, পরের কয়েক ঘণ্টার মাঝে বিকারগ্রস্থের মত হয়ে পড়েন। আমি কে বা কোথায় আছেন কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। ভাবতে থাকেন যে আগ্রার হারেমে ফিরে গেছেন। এমন সব জিনিসের কথা বলতে শুরু করেন যেগুলো আমি আনতে পারি নি। বুঝতে পারছি না কী করব…।
উঠে দাঁড়ালো নিকোলাস। কিন্তু সত্যি আসলে, নয়। যখন দারাকে কথা দিয়েছিল যে নাদিরাকে নিরাপত্তা দেবে, সেটা তো কোন আক্রমণের মুখে… অসুস্থতার হাত থেকে নয়। তাদের সাথে কোন হাকিম নেই। যদি শাহজাদী কোন পুরুষ হত, তাহলে অন্তত একবার চোখের দেখা যেত বিভিন্ন অভিযানে নিজের যোদ্ধাদের মাঝে অনেক ধরনের জ্বর দেখেছে সে কিন্তু যদি নাদিরার অবস্থা সত্যিই বেশি খারাপ হয়, পথিমধ্যে ফেলে আসা জন-জীবনের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইতে হবে। এতে সময় লাগবে আর ঝুঁকিও আছে। কিন্তু আর কোন উপায়ও তো নেই। এর মাঝে সাহায্য করার অন্য উপায়ও ভাবতে হবে। সোমরাজ (তিক্ত উদ্ভিদ বিশেষ) গাছের পাতা নাকি জ্বরের জন্য উপকারী বিভিন্ন অভিযানে চিকিৎসকদের দেখেছেন পাতা ছিঁড়ে গরম পানি দিয়ে চা তৈরি করতে। আরো দেখেছেন হাকিমেরা নিমের পাতার পেস্ট বানিয়ে আহতের জিহ্বায় রেখে দিতেন।
তোমার মালিকার কাছে ফিরে যাও। প্রচুর পানি পান করিয়ে বাতাস করতে থাকো। গ্রামের দিক থেকে সাহায্য নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠাচ্ছি আমি, এছাড়া কাজে লাগতে পারে এমন লতাপাতার ব্যবস্থাও করছি। ত্রস্ত পায়ে সেলিমা চলে যেতেই আপন মনে নিকোলাস ভাবল, এখন কি দারার জন্য লোক পাঠানো উচিত হবে কিনা। কিন্তু ইতিমধ্যে তিনদিন পার হয়ে গেছে শাহজাদা গিয়েছেন, নিশ্চয়ই শীঘ্রি ফিরে আসবেন। এছাড়া দারার দেয়া মালিক জিউয়ানের দুর্গের অবস্থানও স্পষ্ট নয়। অনর্থক অন্বেষণে নোক পাঠিয়ে তাঁবুর নিরাপত্তা কমিয়ে দেয়াটা বোধ হয় বোকামি হবে। না, তার চেয়ে মনোযোগ দেয়া উচিত চিকিৎসক খুঁজে বের করার কাজে। নিজের বন্দুক নামিয়ে রেখে এদিক ওদিক তাকিয়ে দুজন গুপ্তচরকে খুঁজল নিকোলাস আমুল আর রাজিক জানে এদের উপর ভরসা করতে পারবে সে।
চার ঘণ্টা পরে, আকাশের গভীরে গেছে সূর্য, তাঁবুতে ফিরে এলো নিকোলাস। নিজের চওড়া-কানাওয়ালা টুপির মাথায় করে নিয়ে এসেছে লম্বা সোমরাজ বৃক্ষের স্থূপীকৃত পাতা। সাবধানে দুই হাত দিয়ে ধরে বহন করে এনেছে এতদূর। জানে না সত্যিই এর চা কাজে দেবে কিনা; কিন্তু চেষ্টা করাটা জরুরি। হিন্দুস্তানে থাকার এত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানে যে জ্বরতপ্ত রোগীর সবচেয়ে বড় ভরসা হল তার নিজের শারীরিক শক্তি। নাদিরা এখনো বেশ তরুণী, আশা করা যায় সেরে উঠবে। নিজের শক্তিই তাকে সারিয়ে তুলবে। একইভাবে নিকোলাসের নিজের মাঝেও স্কৃর্তি ফিরে এলো যখন শিবিরের চৌহদ্দির মাঝে প্রবেশ করার পর দেখতে পেল দুজনে গুপ্তচর একজন লম্বা পাঞ্জাবী, আমুল ফিরে এসে তাঁবুর বাইরে অপেক্ষা করছে তার জন্য।
