যাই হোক, পরিষ্কার বোঝা গেল যে দারা অন্য কিছু চিন্তা করছে। হঠাৎ করেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল চেহারা আর কাঠিটাকে একপাশে ছুঁড়ে ফেলে ঝটকা মেরে সোজা হয়ে দাঁড়াল। আমি একটা বোকা যে আগে কেন এটা মাথায় আসেনি। একজন আছে যার কাছে আমি সাহায্য চাইতে পারব আর জানি সেও আমাকে প্রত্যাখান করবে না।
কে?
মালিক জিউয়ান নামে একজন বালুচি নেতা। কয়েক বছর আগে একজন মোগল কর সংগ্রাহককে হত্যার আদেশ দিয়েছিল। প্রদেশের শাসনকর্তা তাকে শিকলে বেঁধে দিল্লি পাঠিয়ে দিলে পিতা তার শাস্তি হিসেবে নির্ধারণ করে হাতির পায়ের নিচে মৃত্যু। কিন্তু আমার কাছে আবেদন করেছিল মালিক জিউয়ান। দাবি করেছিল যে কর সংগ্রাহক নিজ জায়গীর খুন করেছিল এক কৃষককে, যে কৃষক কিনা ঘুষ দিতে অস্বীকার করে তার সম্রাটের কাছে আর্জি জানাবার হুমকি দেয়। মালিক জিউয়ানের মতে কর সংগ্রাহকের সে মৃত্যু পাওনা ছিল। তাকে বিশ্বাস করে পিতাকে জানিয়েছিলাম মৃত্যুদণ্ড মুলতবী করার জন্য। এ মামলার তদন্ত কাজে পাঠানো কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পেরেছিলাম যে তার দাবি পুরোপুরি সত্য, তাই পিতাকে অনুনয় করেছি মালিক জিউয়ানকে ক্ষমা করে দিতে, তিনি তাই করেছেন। এছাড়া মালিককে জায়গির হিসেবে সমৃদ্ধ ক্ষতিপূরণও দিয়েছেন যেটা এখান থেকে সম্ভবত পঞ্চাশ বা ষাট মাইল উত্তরদিকে। সাথে একটি দুর্গও ছিল, যেখানে আবাসস্থল তৈরি করেছে মালিক। সে নিশ্চয় আমাকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করতে পারবে। আমরা এখানেই থাকব, গুপ্তচর পাঠিয়ে আমার কাছে ডেকে পাঠাবো মালিককে।
গুপ্তচররা দ্রুত কাজ দেখিয়েছে ভালোই; দুদিন পরে ঠিক সূর্যাস্তের আগে নীল পাগড়ি পরিহিত দেহরক্ষীদের ছোট্ট দল নিয়ে মালিক জিউয়ানকে এগিয়ে আসতে দেখে ভাবলো নিকোলাস। লম্বা, সুস্বাস্থ্যের অধিকারী বছর চল্লিশের লোকটা নেমে এলো মাখনরঙা ঘোটকী থেকে দারাকে দেখতে পেয়ে অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠল আনন্দ আর আন্তরিকতা।
সুস্বাগতম মালিক জিউয়ান।
আপনার সংবাদ পেয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটে এসেছি। একদা আমার প্রতি অনেক সদয় আচরণ করেছেন আপনি আর আমি খুশি যে এখন সময় এসেছে তা পরিশোধ করার।
ঠিক তাই। কিন্তু তার আগে আমার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তোমাকে কিছু প্রদান করতে চাই আমি। হাততালি দিয়ে উঠল দারা আর ইশারা পেয়ে বাকি শিবির থেকে পর্দার মাধ্যমে আলাদা করা হারেমের তাঁবু থেকে বের হয়ে এলো অবগুণ্ঠনবিহীন দারার স্ত্রী। নাদিরা পরিষ্কারভাবেই বোঝা গেল যে অসুস্থ, হাতে করে নিয়ে আসছে ছোট্ট একটি রুপার কাপ, একজন পরিচারিকার হাতের উপর শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে হেঁটে আসছে। আরেকজন পরিচারিকার হাতে রুপার পাত্রের অর্ধেক পূর্ণ হয়ে আছে তরলে। ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে নিকোলাসও এগিয়ে এলো খানিকটা। এমনকি এখনকার মত যেনতেন একটি তাঁবুর ক্ষেত্রেও নারীরা হারেম খোপের অন্দরমহলেই থাকে। হিন্দুস্তানে এত বছর ধরে বাস করার পরেও কখনোই দেখেনি যে নাদিরার সমান সামাজিক মর্যাদার কোন নারী–একজন শাহজাদী আর শাহজাদার মাতা–পুরোপুরি অচেনা কারো সামনে এসেছে এভাবে। এমনকি আগন্তুকের জন্য কোন অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দারাও কিছু বলেনি।
আমার স্ত্রী, সম্মানীয়া নাদিরা বেগম। বালুচি প্রধানকে জানালো দারা। বিস্মিত হয়ে মাথা নত করে কুর্নিশ করল মালিক জিউয়ান।
সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কথা বললেও নাদিরার কণ্ঠস্বর এত ভাঙ্গা ভাঙ্গা শোনা গেল যে নিকোলাস বাঁকা হয়ে গেল এর মর্মোদ্ধার করতে। আমাদের তাঁবুতে আপনি একজন সম্মানিত অতিথি। একজন বালুচি হিসেবে আমার লোকদের প্রাচীন প্রথা সম্পর্কে জানেন না আপনি। দয়া করে আমাকে ব্যাখ্যা করতে দিন। এই পাত্রের পানি দিয়ে আমি আমার স্তন ধৌত করেছি। আমি আপনাকে প্রস্তাব করছি আমার স্বামীর শ্রদ্ধার চিহ্ন হিসেবে এক কাপ পান করতে। এর মাধ্যমে আমার দুধের চিহ্ন হিসেবে আপনি পরিণত হবেন মোগল রাজপরিবারের সদস্য আর আমার স্বামীর আপন ভাইতে। ধীরে ধীরে আর আভিজাত্যের সাথে নাদিরা পরিচারিকার হাতে থাকা পাত্রের মাঝে কাপ ডুবিয়ে বাড়িয়ে ধরল মালিকের দিকে। এক মুহূর্ত দ্বিধার পরে কাপটা হাতে নিয়ে, চুমুক দিয়ে আবার ভদ্রতাসূচকভাবে মাথা নেড়ে ফিরিয়ে দিল মালিক। এরপর ফিরে তাকাল দারার দিকে। আমি বেশ সম্মানিত বোধ করছি, জাহাপনা। বুঝতে পারছি না কী বলব…।
কিছু বলার দরকার নেই। প্রয়োজনের সময় আমার ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছেন আপনি, আর তাই কাউকে আমি দিতে পারি এমন শ্রেষ্ঠ উপহারটাই প্রদান করেছি–জীবনের বন্ধন তৈরি করতে পারে এমন কিছু। যখন, আপনার সাহায্য নিয়ে আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে, আমার পিতা, ম্রাট আপনাকে ভরে দেবে সোনা আর রুপার স্তূপ দিয়ে, আমার নতুন ভাই। এখন চলুন একত্রে বসা যাক।
আস্তে আস্তে নিজের তাঁবুর দিকে চলে গেল নাদিরা। গতি ধীর হয়ে গেল কাশির দমকে। মালিক জিউয়ানের কাঁধে হাত দিয়ে কার্পেট আর তাকিয়া পেতে রাখা আসনের দিকে নিয়ে গেল দারা। একটু পরেই ডুবে গেল গভীর আলোচনায়।
পরের দিন সকালবেলা ঘোড়ার হ্রেষা ধ্বনি আর বলকা লাগাম ইত্যাদি সহযোগে জন্তুগুলোকে সাজানোর শব্দে ঘুম ভেঙে গেল নিকোলাসের। মুহূর্তের মাঝে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে হাতে তুলে নিল তলোয়ার, প্রভাতের স্নান আলোয় পিটপিট করে তাকাল বাইরের দিকে। তাঁবুতে আক্রমণ হয়েছে, এরকম দুঃস্বপ্ন দেখতে দেখতে অস্থির নিদ্রাহীন রাত কেটেছে তার। এখনো আধো ঘুম আধো জাগরণে মনে হল সত্যিই তাই ঘটছে নাকি। এরপর ইতিমধ্যেই রান্নার জন্য জ্বালানো আলোতে দেখা গেল দারার দেহরক্ষীরা ঘোড়ায় লাগাম পরানো শুরু করেছে আর মাহুতদেরকে তৈরি করে দিচ্ছে সহিসেরা। অবাক হয়ে চারপাশে তাকাতেই, দারা কাঁধের উপর অশ্বারোহণের উপযোগী ঢাকা কাপড় পরিহিত হয়ে এগিয়ে গেল তার দিকে, চেহারায় দীপ্যমান হয়ে আছে আরো একবার ফিরে পাওয়া আত্মবিশ্বাসের ছাপ।
