*
ঘন আম গাছের নিচে পাতার ছায়ায় ঘোড়া থামিয়ে জটার ঘর্মাক্ত গলায় হাত বুলালো নিকোলাস। পাশেই ছুটে এসেছে দারা। দুজনেই নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। শাখা-প্রশাখার মাঝে দিয়ে চুঁইয়ে আসা আলোতে বিমর্ষ দেখালো শাহজাদার মুখমণ্ডল। দিল্লি থেকে আসার পথে রাস্তায় প্রায় তেমন কোন কথাই বলেনি দারা। নিকোলাস যেমন সন্দেহ করেছিল যুদ্ধ সভা উত্ত-পশ্চিমে লাহারে চলে যেতে যেন কোন সাহায্যের সংস্থান করা যায়। যাই হোক, আর বলার কিই বা আছে? কেই বা ভাবতে পেরেছিল যে দিল্লির শাসনকর্তা শাহজাহানের পত্র থাকা সত্ত্বেও রুদ্ধ করে দিবে শহরের প্রবেশদ্বার? সামুগড়ে দারার পরাজয়ের ফলে ভারসাম্য কতটা দ্রুত পাল্টে গেছে, এটা তারই ইশারা করেছে।
এখন না জানে কী অপেক্ষা করে আছে দারার ভাগ্যে? দিল্লির বিশাল লাল দুর্গের নিরাপত্তার মাঝে দারা হয়ত শক্তিশালী অবস্থানে চলে যেতে পারত। রাজকোষের সম্পদ ব্যবহার করে আরো সৈন্য আর সহায়তা ক্রয় করতে পারত। এর পরিবর্তে এখন কী হল পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া? আরো বেশ কয়েকবারের মত আবারো মনে পড়ে গেল সেসব দিনের কথা মমতাজ আর তাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে শাহজাহানের সাথে পালিয়েছেন নিকোলাস। কিন্তু দারার পারিপার্শ্বিক আরো বেশি ভয়ংকর। শাহজাহানের অন্তত কিছু মিত্র ছিল। কিন্তু মনে হচ্ছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে দিল্লি ছাড়ার ফলে দারার পক্ষে তেমন কেউ রইল না। যদিও কয়েকজন বার্তাবাহক পাঠানো হয়েছে যাদের বিশ্বস্ততার উপর ভেবেছিল নির্ভর করা যাবে এমন কয়েকজন অভিজাত ব্যক্তির কাছে, কিন্তু একটি কোন আশ্বাসবাণী পায়নি শাহজাদা–শুধুমাত্র বাকসর্বস্ব অজুহাত আর কয়েক ক্ষেত্রে তো সেটাও নয়। অদ্ভুত আর ভাসা ভাসা সব কারণ দেখিয়ে দিনের পর দিন কমে যেতে লাগল দারার সৈন্যসংখ্যা। কয়েকজন নিশ্চয়ই গিয়ে জুটে যাবে তার ভাইদের দলে, অন্যরা ফিরে যাবে নিজেদের গ্রামে অথবা জায়গীর অপেক্ষা করবে হিন্দুস্তানের উপর ভেঙে পড়ার জন্য এগিয়ে আসা নিশ্চিত ঝড়ের জন্য।
আমার স্ত্রীর শরীর এখনো খারাপ। পালকি থেকে নিশ্চয় তার কাশির শব্দ পেয়েছেন আপনি। ছায়ার মাঝে তার জন্য একটি তাঁবু তৈরির নির্দেশ দিয়েছি আমি। তাকে সুস্থ হতে সাহায্য করার জন্য গরম না কমা পর্যন্ত এখানেই অপেক্ষা করব আমরা সম্ভবত কাল আসা পর্যন্ত তাঁবু নির্মাণ হয়ে যাবে। এই ঘন ঝাড় আর গাছের ভিড়ে যথেষ্ট নিরাপদ আমরা। পানির বোতল খুলে লম্বা চুমুক দিল দারা। আওরঙ্গজেব আর মুরাদ নিশ্চয় জানে যে আমরা দিল্লি থেকে উত্তর-পশ্চিমে গেছি। তাহলে ছড়িয়ে থাকা আমার গুপ্তচররা পিছু ধাওয়াকারীদের হদিস পায়নি কেন? ভাইদের কি ধারণা যে আমার মত অপ্রয়োজনীকে নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই?
হতে পারে তারা প্রথমে দিল্লি আর আগ্রাতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে চেয়েছে প্রথমে… যুক্তি নিশ্চয়ই আছে।
আমিও সেরকমই আশা করছি। আমার আরো সময় প্রয়োজন। গত রাতে আমার পাশে শুয়ে কাশির দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছিল নাদিরা, জেগে থেকে আমি ভাবছিলাম সুলাইমান আর তার সেনাবাহিনীর কথা– সে কি ফিরে আসার জন্য পিতার আদেশ পায়নি নাকি এখনো শাহ সুজার পিছু ধাওয়া করে চলেছে? রাজকীয় বাহিনীর শ্রেষ্ঠ সৈন্যরা গেছে তার সঙ্গে আর তারা থাকলে একটা সুযোগ নিতে পারতাম আমি…আরো চিন্তা হচ্ছে না জানি কি ঘটছে আগ্রাতে আব্বাজান আর বোনের সাথে।
এত সহজে ধরা দেবার পাত্র নন ম্রাট। আমি নিশ্চিত যতক্ষণ সম্ভব দুর্গ আঁকড়ে ধরে রাখবেন তিনি।
মাটির উপর উবু হয়ে বসে একটা কাঠি খুঁজে নিয়ে আঁকিবুকি কাটতে লাগল দারা লাল ভূমির উপর। যদি তাঁর সাথে যোগাযোগ করার কোন পথ খুঁজে পেতাম–জানতে পারতাম এখন আমাকে কী করতে বলতেন তিনি এরকম উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরতে হত না।
মাননীয় শাহজাদা, আমার দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে: যদি ইচ্ছেগুলো ঘোড়া হত, ভিক্ষুকেরাও ছুটে বেড়াত। আমরা সবাই চাই যে ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে ঘটতো যদি; কিন্তু সত্যটাকেই মেনে নিতে হবে। ভুলে যাবেন না বাবরের বিরুদ্ধে তাঁর পরিবারও ফারগানার গুহায় থেকে জীবন ধারণ করেছে, তাদের সৈন্যসংখ্যা আপনার চেয়ে কম ছিল। নিজের উপর বিশ্বাস ধরে রাখতে হবে আপনাকে।
আমার দুর্বলতার জন্য ক্ষমা করুন। হঠাৎ করে আমার ভাগ্য পরিবর্তিত হয়ে গেছে। পুনরায় উদ্দীপিত হয়ে ওঠার পরিকল্পনাকে প্রথম ধাপ হিসেবে শেষ বার গণনার সময় কত জন সৈন্য ছিল আমাদের হাতে?
পনেরশ বা এর কাছাকাছি।
এটা কোন সেনাবাহিনীই নয়…আমাকে কেন এত কম সংখ্যক সৈন্য অনুসরণ করেছে? আমি তো পিতার পছন্দের নির্বাচিত উত্তরাধিকারী।
এখনকার মত অনিশ্চিত সময়ে বেশিরভাগই চিন্তা করেছে এড়িয়ে যেতে পারলে আপনার পক্ষ না-ই নিতে। ফলাফল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মিত্ৰতা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
কিন্তু আমার প্রতি তাদের দায়িত্ব আছে। তাদের সম্মান এর দাবিদার।
জীবন আর সম্পত্তি বিপন্ন হতে বসলে মানুষ প্রায়শই সম্মানের চিন্তা বাদ দেয়। দারাকে বিমর্ষ হয়ে পড়তে দেখল নিকোলাস। মনে মনে ভাবল এতটা কঠোরভাবে না বলতে পারলেই ভালো হত। নিজের সমস্ত বুদ্ধিমত্তা আর পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও দরবারের বাইরের মানুষের উদ্দেশ্য আর সত্যিকারের পৃথিবী সম্পর্কে শাহজাদাকে মাঝে মাঝে অজ্ঞই মনে হয়। কিন্তু তাহলে কতটা যোগসূত্র স্থাপন করতে সক্ষম হবে এর সাথে?
