দারার অভিব্যক্তিতে কতটা পরিবর্তন এসেছে, ভাবল নিকোলাস, দারার পিছনে যেতে যেতে। বিপর্যস্ত, মনোবলহীন শাহজাদা, পিছনে সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই প্রাণশক্তিতে ভরপর হয়ে উঠেছে। নিজের ঘোড়ার পিঠে বসে শারীরিক আর মানসিকভাবেও হয়ে উঠেছে শক্তিশালী।
পনের মিনিট পরে, সূর্য তাপের বিরুদ্ধে চোখের উপর ছায়া দিয়ে এক মাইল দূরে দিল্লির বিশাল দক্ষিণ ফটকদ্বারের দিকে তাকাল নিকোলাস। ফটকগুলো তো মনে হচ্ছে বন্ধ, তাই না…?
মাননীয় শাহজাদা, ফটকদ্বার বন্ধ।
এরকম সমস্যার সময়ে এক বিজ্ঞ সতর্কতা। উত্তরে জানালো দারা। প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে আমাদের আগমন সংবাদ জানানোর জন্য পাঠানো গুপ্তচর একটু পরেই ফিরে আসবে। আমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি দূর এগিয়ে গেছে তারা।
ঠিক বলেছে দারা। প্রায় সাথে সাথেই ফটকের পাল্লা দুটো ঠিক ততটাই খুলে গেল যতটা হলে ছোট্ট একটা সৈন্যদল এগিয়ে আসতে পারে। কয়েক মিনিট পরে অশ্বারোহী সৈন্যরা–যেমনটা প্রত্যাশিত ছিল, দারার গুপ্তচরেরা– পিছনে সান্ধ্য বাতাসে সোনালি ধুলার মেঘ ছড়িয়ে এগিয়ে এলো সামনে।
শাসনকর্তা আমার জন্য গৃহ প্রস্তুত করে রেখেছেন? চেহারার চওড়া হাসি ছড়িয়ে জানতে চাইল দারা।
গুপ্তচরদের প্রধান লম্বা দাঁড়িঅলা পাঞ্জাবি সৈন্যের চেহারাতে কিন্তু পাল্টা হাসির প্রত্যুত্তর দেখা গেল না। তারা আপনাকে অনুমতি দিবে না, মাননীয় শাহজাদা। সহজ সুরে জানালো লোকটা।
কী বলতে চাও? পিতার চিঠি দেখাওনি শাসনকর্তাকে…।
দেখিয়েছি, মাননীয় শাহজাদা। প্রহরীদলের নেতা শাসনকর্তার কাছে নিয়ে গেছে পত্রখানা। আধা ঘণ্টা ধরেও সে ফিরে না এলে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। যখন আসল, তখন সাথে শাসনকর্তাও ছিলেন। তিনি আমাদেরকে জানিয়েছে যে, পত্রখানা একটা চক্রান্ত আর আমরা স্বধর্মত্যাগী। এছাড়াও আমরা নাকি ভাগ্যবান যে তিনি আমাদেরকে হত্যার আদেশ দেননি। তারপর আমাদের হাতে এ চিঠি তুলে দেয়া হয়েছে। সবুজ টিউনিকের ভেতর থেকে ভাঁজ করা খাম বের করে দিল পাঞ্জাবী সৈন্যটা।
দারা, চোখে-মুখে অবিশ্বাস নিয়ে ছো মেরে তুলে নিল চিঠিটা। সীলমোহর ভেঙে পড়া শুরু করতেই ক্রোধ ফুটে উঠল চেহারাতে। কতটা নিচে নামতে পারে আমার ভাইয়েরা? সত্য অথবা আমার পিতার প্রতি কি কোন শ্রদ্ধা নেই তাদের? পড়ে দেখুন, নিকোলাস।
‘শাহজাদা দারা, আমাকে পাঠানো আপনার পত্র একটা চক্রান্ত। আপনার ভাইয়েরা আমাকে আগেই সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে যে পিতার সিংহাসন হস্তগত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন যিনি কিনা মানসিকভাবে এতটা অসুস্থ যে শাসন করার অথবা আপনার বিশ্বাসঘাতকতা বুঝতে পারার মত অবস্থায় নেই। আমাকে তারা এও জানিয়েছে যে, বিশ্বস্ত পুত্র হিসেবে যেটি আপনি নন–পিতাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে তারা আর ইতিমধ্যে যুদ্ধে আপনাকে একবার পরাজিত করেছে। আমাকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, অসাধু উদ্দেশ্য সাধনের জন্য আমার রক্ষীবাহিনী নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সর্পতুল্য ষড়যন্ত্রে মেতে উঠতে পারেন আপনি। আমি তাদেরকে জানিয়েছি যে, একজন বিশ্বস্ত প্রজা হিসেবে আদেশ মান্য করব আমি। তাই চলে যান। শহরের আরেকটু কাছে এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে নিঃসন্দেহ থাকতে পারেন যে আমার সৈন্যরা গুলি ছুড়বে আপনার উপর।‘
কতটা সাহস হলে এমন মিথ্যে রটনা ছড়ানো যায় সত্যের ঠিক পুরোপুরি বিপরীত–আর এই শাসনকর্তাই বা কেমন বোকা যে তাদের কথা বিশ্বাস করল?
অথবা ভণিতা করছে। বলে উঠল নিকোলাস। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে সামুগড়ে আপনার পরাজিত হবার সংবাদ জানে সে। আওরঙ্গজেব আর মুরাদের বার্তাবাহকেরা নিশ্চয়ই জানিয়েছে যে আপনি আসতে পারেন আর আমার সন্দেহ নিশ্চয়ই শাসনকর্তাকে মোটা মানের পুরস্কারের লোভ দেখানো হয়েছে যদি তাদের কথা মেনে নিয়ে আপনাকে রুখে দেয় ভাগ্য পরিবর্তনের পথে।
আমি পথে বসব না। তারই দখলকৃত দুর্গের আঙিনাতে আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে এ অভদ্রতার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে শাসনকর্তাকে। আক্রমণের পরিকল্পনা করতে এখনি একটি যুদ্ধসভার আহবান করব আমি। তীব্রস্বরে বলে উঠল দারা, জিনের উপর বসে এতজোরে কাঁপতে লাগল ক্রোধে যে পা হড়কে গেল কালো ঘোড়ার।
সম্মানীয় শাহজাদা যুদ্ধসভা ডাকার আগে ভেবে দেখুন সম্ভাবনা আর। বাস্তবতার ব্যাপারগুলো। সেনাপতিদের সামনে সফল হবার বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে আপনাদেরকে, নয়ত ইতিমধ্যে যারা আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে অতি দ্রুত আমাদেরকে ছেড়ে চলেও যাবে। আর যদি আমি খোলামেলাভাবে বলার সুযোগ পাই–পুরোপুরি সম্মুখ আক্রমণ তো দূরের কথা, দিল্লি অবরোধের পদক্ষেপও আমাদের জন্য যৌক্তিক হবে না এখন। আমাদের সৈন্যসংখ্যা পর্যাপ্ত নয় আর দ্রুত ছুটে আসার কারণে কামান নেই। এছাড়া ভালোভাবেই জানি যে আওরঙ্গজেব আর মুরাদের সৈন্যরা হয়ত আর বেশি দূরে নেই। তাদের চেয়ে যে এতটা পথ এগিয়ে আসতে পেরেছি সেটাই আমাদের ভাগ্য। শহরের উপর আমরা যখন আঘাত হানব তখন অনায়াসে পিছন দিকে আক্রমণ করে বসবে তারা। দেয়ালের বাইরে ছিন্নভিন্ন করে দিবে আমাদেরকে।
আশার আলো নিভে যেতে লাগল দারার চোখে, যেমন করে দিনের আলো বিদায় নিচ্ছে এই দিল্লি শহর ছেড়ে। কথা বলার আগে খানিকটা সময় নিল শাহজাদা। হয়ত আপনিই ঠিক বলছেন নিকোলাস… হয়ত নিজের ভাগ্য প্রবাহের গতিপথ পাল্টানোর জন্য আমি আর একটা মাত্রই সুযোগ পাব। তাই তাড়াহুড়া করে কিছু করাটা ঠিক হবে না, বিশেষ করে যখন নাদিরা আর সিপির আছে আমার সাথে। সম্ভবত উত্তর-পশ্চিমে সরে গেলেই ভালো হবে এখন যেখানে আপনার আর অন্যান্য সেনাপতিদের সাথে বসে নিরাপদে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা চিন্তা করা যাবে।
