জাহাপনা, শাহজাদা অনুমতি দিলে আমি দিল্লি পর্যন্ত তাঁর সাথে যেতে পারি। বলে উঠল নিকোলাস।
বিবর্ণ মুখে হাসল দারা। আমি অসম্ভব খুশি হব তাহলে। আজ এমনিতেই আপনি আমার জীবন বাঁচিয়েছেন। হতে পারে সময় হয়ত আসবে যখন আমি এ পাওনা পরিশোধ করতে পারব… এখন নাদিরার সাথে গিয়ে প্রস্তুত হতে সাহায্য করতে হবে… নিশ্চয়ই বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে আছে।
তোমার সাথে আমিও যাব হারেমে। আবারো দারাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল শাহজাহান, তারপর নিয়ে গেল কক্ষের বাইরে। জাহাপনা আগমন করছেন বলে প্রথাগত নির্দেশ শুনতে পেল নিকোলাস সামনে থেকে। আস্তে আস্তে দূরে সরে গেল আওয়াজ, একের পর এক দরজা পেরিয়ে হারেমের দিকে এগিয়ে চললেন পিতা-পুত্র। কিন্তু শাহজাহান আর কতক্ষণ ম্রাট হিসেবে থাকতে পারবেন, প্রু মুছে ভাবতে লাগল নিকোলাস। এটি অচিন্ত্যনীয় একটি ব্যাপার যে মাত্র একটি যুদ্ধ এসে এরকম শক্তিশালী এক শাসককে সিংহাসনচ্যুত করে দেবে আর কেই বা ভাবতে পেরেছিল যে আওরঙ্গজেব আর মুরাদের বিদ্রোহ এতদূর গড়াবে?
নিকোলাস নিজেও কক্ষ ছেড়ে বের হতে যাবে, নিজের যা কিছু সম্বল জড়ো করে দিল্লি রওনা হবে, এমন সময় তাকে অবাক করে দিয়ে ফিরে এলো জাহানারা। কয়েক মুহূর্ত একে অন্যের দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল দুজনেই। এরপরই চিৎকার করে উঠল জাহানারা, দারা আমাকে জানিয়েছে যে আপনি তার সাথে যাবার প্রস্তাব করেছেন… এত কিছু হয়ে যাবার পরেও কেন এত দয়াশীল হচ্ছেন আমাদের প্রতি?
এটা দয়া নয়। হিন্দুস্তান আমার ভূমি। চলে যেতে মনস্থির করার আগপর্যন্ত তা উপলব্ধি করিনি আমি। আপনি যেটার উল্লেখ করেছেন সেটা ছাড়াও অনেক দয়া দেখিয়েছে আপনার পরিবার আমার প্রতি… মুহূর্তখানেকের জন্য ধরে গেল নিকোলাসের গলা, এরপর আবারো বলে উঠল, দারার জন্য সংগ্রাম করতে পেরে আমি সম্মানীত হব যেমনটা একদা করেছিলাম আপনার পিতার জন্য।
তাহলে পিতা আর দারার হয়ে আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু একই সাথে ক্ষমা প্রার্থনাও করছি। কোন রকম ভাবনা-চিন্তা না করেই আমি আপনাকে অনেক বড় বিপদের মাঝে ফেলে দিয়েছিলাম… আমি দুঃখিত … আমি শুধুমাত্র নিজের বিষয়েই চিন্তিত ছিলাম, কখনো ভাবিনি…
দুঃখিত হবার মত কোন কারণ ঘটেনি আপনার, নম্রভাবে জাহানারাকে থামিয়ে দিল নিকোলাস। আপনি সৎ উদ্দেশ্যেই এসব করেছেন।
পাতলা বেগুনি ওড়নার উপর দিয়েই দেখা গেল জাহানারার চোখ ভর্তি জল। আপনি ছাড়া সত্যিকারের আর কোন বন্ধু নেই আমার আর আমি জানি যেভাবে সম্ভব দারাকে সাহায্য করবেন আপনি। আমাদের মহান প্রপিতামহ আকবরের যোগ্য উত্তসূরী সে ধর্মবিশ্বাস যাই হোক না কেন, সবার প্রতি ন্যায়বিচারক। আওরঙ্গজেব শুধু আমাদের জনগণের মাঝে বিভেদই সৃষ্টি করবে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদেরকে দাঁড় করিয়ে দেবে। যদি সে কখনো সম্রাট হয়ে যায় অসহিষ্ণুতা এ ভূমিকে ঠিক সেভাবেই ক্ষত-বিক্ষত করে তুলবে, একদা যেভাবে আগুন করেছিল আমার সাথে। ডান হাত দিয়ে আস্তে করে নিজের ওড়না সরিয়ে গালের উপরে পোড়া চিহ্ন দেখাল জাহানারা। এক মুহূর্তের জন্য দাগটার দিকে তাকিয়ে রইল নিকোলাস, আলতো করে হাত এগিয়ে দিল ছুঁয়ে দেখার জন্য, নীল চোখ মেলে তাকিয়ে রইল জাহানারার অন্তরের গভীরে। কিন্তু ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো বাদ্যের ধ্বনি, নির্ঘাৎ দারার সৈন্যরা প্রস্থানের জন্য জড়ো হয়েছে।
হাত সরিয়ে নিল নিকোলাস। আমাকে যেতে হবে… কিন্তু আমি যা পারি করব, প্রতিজ্ঞা করছি আপনার কাছে। একবারও পিছনে না তাকিয়ে চলে গেল নিকোলাস।
আধা ঘণ্টা পরে, জালি পর্দার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দুর্গ থেকে ছোট্ট একটা দলকে বের হয়ে যেতে দেখল জাহানারা। অশ্বারোহীদের মাঝেই কোথাও আছে তার ভাই আর নিকোলাস। গোধূলী আলোয় সৈন্য সারি অদৃশ্য হয়ে যেতেই মনে হল দারাকে বিদায় জানানো হল না।
*
তিন দিন পরে, নিকোলাসকে পাশে নিয়ে নিজের ঘর্মাক্ত কালো ঘোড়া ছুটিয়ে নিচু একটা পর্বতের কাছে পৌঁছালো দারা। চূড়ায় পৌঁছতেই দেখতে পেল সামনে ছড়িয়ে আছে দিল্লি শহর। মসজিদের দেয়ালের উপর সাদা মার্বেলের গম্বুজ চমকাচ্ছে সূর্যের আলো পড়ে, বেশিরভাগেরই আবৃত হয়ে আছে বেগুনি ছাড়া দিয়ে।
অবশেষে দিল্লি। বলে উঠল দারা। পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে থাকা কোন বিদ্রোহী দলকেও দেখা যাচ্ছে না।
ভাগ্য আবারও আমাদের সহায় হল মাননীয় শাহজাদা, যেমনটা হয়েছিল মথুরাতে।
এছাড়া যত মানুষ আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে, খোলা ময়দানে আমাদের বিরুদ্ধে লাগার জন্য বেশ শক্তিশালী বাহিনী প্রয়োজন হবে এখন।
মাথা নাড়ল নিকোলাস। তাদের পিছনে বিস্তীর্ণ হয়ে আছে প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি এক বহর, গত বাহাত্তর ঘণ্টা ধরে যারা দারার পতাকাতলে যাত্রা করেছে। এদের মাঝে কেউ আছে সামুগড়ে পরাজিত হওয়া রাজসৈন্য, অন্যরা পথিমধ্যে থাকা ছোট ছোট দুর্গের সৈন্যরা আর বাকিরা শাহজাহানের জরুরি আদেশ পেয়ে ছুটে আসা স্থানীয় শাসকদের নিয়োগকৃত সৈন্য।
শহরে প্রবেশ করার জন্য অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত কি আমরা অপেক্ষা করব?
প্রতিপক্ষের কোন দেখা যেহেতু নেই, তাই এরও প্রয়োজন নেই। তাড়াতাড়ি করা যাক, চলুন। শীঘিই হয়ত শাসনকর্তার প্রাসাদে আরাম করার পাশাপাশি ভাইদেরকে পরাজিত করার জন্য যৌথ বাহিনীর পরিকল্পনা করতে পারব। জানিয়ে দিল দারা। হাতের ইশারায় দেহরক্ষীদেরকে অনুসরণ করার নির্দেশ দিয়ে কালো ঘোড়া ছুটিয়ে দিল পাঁচ মাইল দূরে শহরের উদ্দেশে।
