সবার সাথে কক্ষে প্রবেশ করা নিকোলাস উত্তর দিল, ঘোড়া থেকে মাটিতে পড়ে গেছেন ভীষণভাবে। দারা নিজেও মাথা নেড়ে চাইল উঠে দাঁড়াতে, কিন্তু কাঁধে হাত রেখে নিবৃত্ত করলেন শাহজাহান।
আব্বাজান…আমাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে… যুদ্ধের মাঝখানে আমাদেরকে ছেড়ে গেছে খলিল উল্লাহ খান। আতঙ্কিত হয়ে পড়ে সৈন্যরা। আমি আমার যুদ্ধহাতি থেকে নেমে এসেছিলাম। কেননা তাদের সাথেই ঘোড়া ছুটিয়ে উৎসাহ দিতে চেয়েছিলাম যেন যুদ্ধে এগিয়ে যায়, কিন্তু ভুল হয়ে গেছে… আমার সৈন্যরা বুঝতেই পারেনি যে আমি কী করছি। যখন তারা দেখতে পেল যে আমি হাওদাতে নেই, ভাবল নিশ্চয় আমি আহত হয়েছি বা মারা গেছি… এমনকি এটাও ভাবল যে হয়ত আমি পালিয়ে গেছি। চারপাশে আতঙ্কিত চিৎকার চেঁচামেচি শুনেছি আমি। চেয়েছি দেখাতে যে আমি তখনো তাদের সাথেই আছি, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল… সবাই ইতিমধ্যে পিছু হটতে শুরু করে দিয়েছে… আর তারপর ঘোড়া থেকে পড়ে গেছি। আব্বাজান, আমি আপনাকে দেয়া কথা রাখতে পারি নি… আওরঙ্গজেব আর মুরাদ আর খুব বেশি দূরে নেই। সব শেষ হয়ে গেছে। দুহাতে মুখ ঢেকে মনে হল কেঁদে উঠতে চাইছে দারা।
আমাদেরকে একা থাকতে দাও। হাকিমকে আদেশ করলেন শাহজাহান। তোমরাও যাও। পরিচারকদের একই কথা জানালেন। দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই, পুত্রের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁধে আস্তে আস্তে চাপড় দিলেন। তুমি আমাকে নিরাশ করোনি… কখনোই না। এক মুহূর্ত দারাকে জড়িয়ে ধরে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে নিকোলাসের দিকে তাকালেন। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে যাবে না থাকবে বুঝতে না পেরে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে নিকোলাস।
সত্যিকারের কী অবস্থা? যেমনটা আমার পুত্র বিশ্বাস করে, যুদ্ধে কি সত্যিই পরাজিত আমরা?
হা জাহাপনা। সে ভয়ই পাচ্ছি আমি। শাহজাদা যেমনটা বলেছেন সেভাবেই সব ঘটেছে। যখন তাঁকে ময়দান থেকে উঠিয়ে নিচ্ছিলাম আমাদের সৈন্যদের দল যুদ্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে শত্রুদের হাতে ঘিরে পড়ে মৃত্যুবরণ করতে থাকে। বাকিদের মাঝে বেশিরভাগই মৃত অথবা বলতে কষ্ট হচ্ছে অস্ত্র ফেলে দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পিছিয়ে গেছে। পুরো দল ধরে পিছু হটা আর কিছু না… আমার ইচ্ছে ছিল আপনাকে ভালো কোন সংবাদ মোনানো কিন্তু সত্যিটা আপনার জানা প্রয়োজন। মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল নিকোলাস।
চুপ করে রইলেন শাহজাহান। সাম্রাজ্যের এবং নিজেদের সকলের জন্য অনুভব করলেন তাঁকে শান্ত মাথায় ভেবে দেখতে হবে সবকিছু, তারচেয়েও বড় কথা সকলের সামনে নিজেকে স্থির রাখতে হবে। পরিষ্কার যে আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। কয়েক মুহূর্ত পরে কথা বলে উঠলেন সম্রাট। আওরঙ্গজেব আর মুরাদ আগ্রার দিকে এগিয়ে আসার জন্য আর বেশি দেরি করবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, দারা তুমি আর তোমার পরিবার এখান থেকে দূরে কোথাও চলে যাও… কোনমতেই তোমাকে বন্দি হতে দেয়া যাবে না।
না! বলে উঠল দারা। আমাদের সৈন্যরা নিশ্চয়ই আগ্রা ফিরে এসে ভাইদের বিরুদ্ধে দুর্গ রক্ষা করতে পারবে। পূর্ব দিক থেকে সুলাইমান আর তার বাহিনী ফিরে না আসা পর্যন্ত নিশ্চয় রুখতে পারব আমরা…
সুলাইমান কোথায় আছে এ ব্যাপারে এখনো কোন সংবাদ পাইনি আমরা আর ঝুঁকিও নিতে চাইনা। যদি তোমার ভাইয়েরা তোমাকে বন্দি করে ফেলে তাদের অবস্থানের নিষ্ঠুরতা নিয়ে আর কোন সন্দেহ রইবে না। তোমার জীবনে দ্বিতীয়বারের মত তোমাকে বন্দি হতে দিতে চাই না আমি…
কিন্তু তোমাকে ছেড়ে আমি যাবো না…
আমি আওরঙ্গজেব আর মুরাদকে ভয় পাই না আমার পুত্র তারা। যাই হোক, তোমাকে বেছে নেয়ার কোন সুযোগ দিচ্ছি না আমি। তোমার সম্রাট আর পিতা হিসেবে যাবার আদেশ করছি। জাহানারার দিকে ফিরলেন শাহজাহান, ভাইয়ের পাশে একেবারে চুপচাপ, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নাদিরা বেগমের কাছে যাও। রোশনারা আর গওহর আরার সাথে আছে। কী হয়েছে জানিয়ে এখনি আগ্রা ছাড়ার প্রস্তুতি নিতে বলল। সিপিরকে জানাও প্রস্তুত হতে। তাড়াহুড়ো করে কক্ষ ছেড়ে বের হয়ে গেল জাহানারা। পুত্রের দিকে তাকালেন শাহজাহান। আমার নির্দেশ শোন। নিজের যতজন সম্ভব সৈন্য যোগাড় করে দিল্লি চলে যাও। সুলাইমান এখনো অনুপস্থিত, যশয়ন্ত সিংয়ের বাহিনী ছড়িয়ে আছে। উজ্জয়নীতে আর এইমাত্র যে পরাজয় বরণ করলে তুমি আগ্রা অঞ্চল বাঁচাবার মত যথেষ্ঠ সৈন্য নেই আমাদের হাতে। অবশিষ্ট শক্তিটুকু–আর এটাই সংগতিপূর্ণ হবে–পড়ে আছে উত্তর আর উত্তর-পশ্চিমে। তাদেরকে দক্ষতার সাথে একত্রিত করো, জয় আমাদেরই হবে। দিল্লির শাসনকর্তাকে দেয়ার জন্য তোমাকে একটা পত্র দেব আমি, তাতে তাকে এই আদেশ করব যেন তার অধীনে থাকা রাজসৈন্যদেরকে তোমার কাছে হস্তাপণ করে। তাহলে ভাইদের বিরুদ্ধে শহরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে তুমি। আমার মনে হয় না তারা দুজন তোমাকে অনুসরণ করতে খুব বেশি দেরি করবে। এছাড়া রাজকোষ তোমার কাছে খুলে দেবার নির্দেশও দিয়ে দেব, যেন সেনাবাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্য নিয়োগ করতে পারো।
পুত্রের চোখে এখনো সন্দেহের চিহ্ন দেখে দারার মাথা নিজের দুহাতে ধরে তার চোখের দিকে তাকালেন শাহজাহান। আমার কথা শোন, দারা। এখনি তোমাকে আগা ছাড়তে হবে শুধু আমার আদেশ পালন করার জন্যই নয়, বরঞ্চ এটা নিজের আর পরিবারের প্রতি তোমার দায়িত্বও বটে। তুমি সামুগড়ে পরাজিত হয়েছ; কিন্তু এটা শুধুমাত্র এই যুদ্ধের একটি সংঘর্ষ। মনোবল হারাবে না। যুদ্ধের ময়দানে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি আমি, কিন্তু কখনো এতে নিজেকে ভেঙে পড়তে দিইনি। বস্তুত এতে করে আমার প্রতিজ্ঞা আরো দৃঢ় হয়েছে যে পরের বার বিজয়ী আমি হব-ই। মনে রাখবে, ভাইদের চেয়ে এখনো তুমি এগিয়ে আছ। তোমাকে মোগল সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছি আমি। এর ফলে তুমি এমন এক ক্ষমতা আর আধিপত্য পাচেছা যেটা তাদের নেই। এ ক্ষমতা কাজে লাগাও, এখনো ঘুরে দাঁড়াবার সময় আছে। পুত্রের উপর নেতৃত্বের ভারী একটি বোঝা চাপিয়ে দিলেন তিনি; মনে মনে ভাবলেন শাহজাহান। এতদিন পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে আড়াল দিয়েছিলেন পুত্রকে, কিন্তু এখন আর কোন উপায় রইল না।
