তার মানে প্রতিহত না করতে পারলে যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে। এবার কথা বললেন শাহজাহান। ইতিমধ্যে বার্তাবাহকের হাতে প্রতিটি প্রদেশে আমার প্রাদেশিক শাসনকর্তা আর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে পত্র লিখে জানিয়ে দিয়েছি যে আমি সুস্থ হয়েছি আর বিদ্রোহী পুত্রদেরকে যারাই সাহায্য করবে, বিশ্বাসঘাতকতার চরম শাস্তি ভোগ করবে তারা। পুত্রদের কাছেও পত্র লিখে দাবি করেছি বিদ্রোহ পরিত্যাগ করতে, মনে করিয়ে দিয়েছি পিতার প্রতি তাদের দায়িত্ব। কিন্তু জল অনেকদূর গড়িয়ে গেছে। তাই এই অকৃতজ্ঞদের উপর এসব পত্র কতটা প্রভাব ফেলবে কে জানে। এ কারণে আমার হাতে আর কোন উপায় নেই আদেশ দেয়া ছাড়া যে রাজকীয় সৈন্যবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হোক। নিজেদের অঞ্চল থেকে ও প্রজারাজ্য থেকে যত সম্ভব সৈন্য একত্রিত করা হোক। সম্ভবত চক্রান্তকারীরা যখন দেখতে পাবে তাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী বাহিনী একত্রিত হচ্ছে, যুক্তিবোধ ফিরে পেয়ে পিছু হটবে মোগলদের রক্তে মোগলরা ঢেকে যাবার পূর্বেই।
দুই ঘণ্টা পরে, সর্বশেষ উপদেষ্টা কক্ষ ছেড়ে যাবার পর খানিকটা কাঁপতে কাঁপতে রুপার সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন শাহজাহান। দারা দৌড়ে এলো সাহায্য করার জন্য; কিন্তু হাত নেড়ে তাকে ফেরত পাঠালেন সম্রাট। না, আমাকে আবারো শক্ত হতে শিখতে হবে…আর দারা, তোমাকে কিছু কথা জানাতে চাই আমি। কয়েক বছর আগেই যদি তোমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করতাম, তাহলে এসব এখন ঘটতই না। এখন তোমাকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করতে হবে যা তোমার অধিকার তার জন্য। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে অনুতপ্ত আমি; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল সংশোধন করতে চাইছি আমি। আগামীকাল ময়ুর সিংহাসনে বসে দরবারে সকলের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তোমাকে উত্তরাধিকারী আর তোমার ভাইদেরকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করব আমি।
২.১০ আগ্রা দুর্গের ছাদে
২.১০
আগ্রা দুর্গের ছাদে একাকী বেলেপাথরের তৈরি গুলি চালাবার জন্য ফোকর বিশিষ্ট প্রাচীরের কাছে দাঁড়িয়ে সূর্য তাপের মাঝে পুড়তে থাকা দিগন্তের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইলেন শাহজাহান। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে ঝুলে থাকা ধুলার মেঘ দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া গেল যে বার্তাবাহকদের বয়ে আনা দুই সেনাবাহিনীর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার খবর সত্য। যদি তিনি নিজেও থাকতে পারতেন সেখানটায় নাকের নিচে কামানের ধোঁয়ার গন্ধ আর শিরায় বয়ে চলা যুদ্ধের উদ্দামতা নিয়ে। এর পরিবর্তে বয়স আর স্বাস্থ্যের কাছে ন্যূজ হয়ে অথর্বের মত অপেক্ষা করছেন শুভ কিছু ঘটার আশায়। মনে হল তার মনের কথাই সত্যি প্রমাণিত হল, দেখতে পেলেন যমুনার শেষ তীর ধরে এগিয়ে আসছে কয়েকজন অশ্বারোহী। কাছাকাছি হতেই দেখা গেল কয়েকজনের সাথে পিছনে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে দ্বিতীয় আরোহী অথবা দেখে মনে হল অত্যন্ত অসুস্থ কাউকে বহন করে আনা হচ্ছে। নদী পার হয়ে দুর্গের কাছে এগিয়ে আসতেই পোশাক দেখে বুঝতে পারলেন এরা দারার সৈন্য। অশ্বারোহীদের ছোট্ট বিন্দু দ্রুত পরিণত হল একটা প্রবাহে। এর অর্থ কী? চিকিৎসকের প্রয়োজনে যুদ্ধ ছেড়ে আসতে হয়েছে, নাকি দারার সৈন্যরা ময়দান ছেড়ে পালিয়ে আসছে?
পাকস্থলীতে মোচড় দিয়ে উঠল শীতল কিছু একটা, উজ্জ্বল দেহবর্ম দেখে বুঝতে পারলেন এ সৈন্যরা রাজকীয় দেহরক্ষীর দল। একে অন্যের কাছাকাছি থেকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে প্রায় দুডজন সৈন্যর একটা দল। এদের মাঝে নিকোলাস ব্যালান্টাইনকেও দেখতে পেলেন, কিন্তু মাঝখানে দারাকে দেখে ভুলে গেলেন বাকি সবকিছু। জিনের সামনের অংশে উপুড় হয়ে পড়ে আছে দারা, লাগাম ধরে আছে পেছনেই থাকা কর্চি। আর অপেক্ষা করতে পারলেন না শাহজাহান। ঘুরে দাঁড়িয়েই ধুলি মাখা অট্টালিকার প্রাচীর ছেড়ে দ্রুত নেমে যেতে লাগলেন তেমন একটা ব্যবহৃত না হওয়া এমন এক পৌচানো সিঁড়ি বেয়ে সোজা প্রধান আঙিনাতে। সংকীর্ণ, তীক্ষ্ণ সিঁড়ির ধাপগুলো বেয়ে নামার সময় একটু পরপর মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দিতে হল মাকড়সার জাল। তিনিও আঙিনাতে পৌঁছে গেছেন আর একই সাথে লম্বা, কারুকাজ করা ফটকদ্বার দিয়ে প্রবেশ করল দারা আর তার রক্ষীবাহিনী। পিতাকে দেখে সোজা হয়ে বসে কথা বলার চেষ্টা করে উঠল দারা। কিন্তু এমনভাবে মাথা নেড়ে উঠল যেন কথা বলাটাও ভারী হয়ে যাবে। ক্ষত-বিক্ষত মুখ দেখে মনে হল মাথা ঘুরছে আর ডান কপালের উপর জমাট বেঁধে আছে। রক্ত। ব্ৰস্ত পায়ে সামনে এগিয়ে হাত বাড়িয়ে পুত্রকে ধরলেন শাহজাহান। পরিচারকেরাও এগিয়ে এলো; কিন্তু হাতের ইশারায় সবাইকে তাড়িয়ে দিলেন তিনি। নিজের পুত্রকে তিনিই সাহায্য করবেন। আঙিনাতে হাজারো চোখ চেয়ে আছে তাদের দিকে আর যুদ্ধের ফলাফল আর পুত্রকে নিয়ে উদ্বিগ্নতা যাতে প্রকাশ না হয়ে পড়ে, তাই একজন কর্চিকে আদেশ দিলেন হাকিমকে ডেকে আনতে। এরপর দারার কাঁধে হাত জড়িয়ে ধীরে ধীরে আঙিনা বেয়ে উঠে গেলেন চওড়া, প্রধান সিঁড়ি দিয়ে রাজগৃহের দিকে।
পিতা-পুত্রের প্রবেশ করতেই সংবাদের জন্য অপেক্ষারত জাহানারা দৌড়ে এগিয়ে এলো সামনে। পিতার সাথে মিলে সেও আস্তে আস্তে দারাকে নামিয়ে রাখল তেপায়ার উপর। মুহূর্তখানেকের মাঝেই এসে পড়ল হাকিম। দারার উপর ঝুঁকে পড়ে চোখের দিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখল শাহজাদার চোখ জোড়া। এরপর গরম পানির পাত্রে কাপড় ভিজিয়ে মুছে দিল জমাট বাধা রক্ত, যেন পরীক্ষা করে দেখতে পারে কপাল। অবশেষে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ক্ষতটা তেমন মারাত্মক নয়, জাহাপনা। শাহজাদার স্থায়ী কোন আঘাত লাগেনি। যদিও মনে হচ্ছে বিপর্যস্ত তিনি। কি হয়েছিল?
