অবশ্যই। তাকে এও জানিয়ে দিও যে যা হয়েছে তার জন্য আমি অনুতপ্ত আর অতীতের সেবার জন্য কৃতজ্ঞ। আবারো যদি দরবারে ফিরে আসে সাদরে আমন্ত্রণ রইল। জাহানারার বাহুতে হাত রাখলেন শাহজাহান। গভীর স্বস্তি পেলেন এই ভেবে যে অন্তত একটা ফাটল মেরামত করা গেছে; কিন্তু ঘনিয়ে আসছে ভয়ংকর দুর্যোগ। নিঃশ্বাস ফেলে এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ করে ফেললেন চোখ।
পিতা… তুমি ঠিক আছো? হাকিমদেরকে ডেকে পাঠাবো আমি?
না। অনেক দিন ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলাম আমি। আবারো একজন ম্রাট হয়ে উঠতে হবে।
শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ালেন শাহজাহান। ভাইদের বিদ্রোহ সম্পর্কে তোমাকে কতটা বলেছে, দারা?
এতটুকুই যে তোমার অসুস্থতার অজুহাত খাড়া করে সেনাবাহিনী নিয়ে এগোচ্ছে সিংহাসন দখলের জন্য…
বিমর্ষ হয়ে গেলেন সম্রাট। এটাই পুরো সারমর্ম। এই ভেবে সারা হচ্ছি যে তোমার মা থাকলে কী ভাবতেন আর তার স্মৃতির প্রতি কতটা অন্যায় করেছি আমি। তোমার ভাইয়েরা কী করছে তার উপরে আমার আরো বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত ছিল আর নিয়ন্ত্রণ করাও। তাদের প্রদেশসমূহের নিয়মিত রাজকীয় উন্নতির দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত ছিল। অথচ এর পরিবর্তে তাদেরকে আর তাদের উচ্চাকাংখী উপদেষ্টাদেরকে সময় আর সুযোগ দিয়েছি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রচনা করার জন্য।
খানিকক্ষণ কোন উত্তর দিল না জাহানারা। ঠিকই বলেছেন পিতা। মমতাজের মৃত্যুতে ব্যথিত হয়ে এমনভাবে সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলেন যে আর বের হতে পারেননি তা থেকে। অশিষ্ট আচরণ করেছেন নিজের সব ছেলে-মেয়েদের সাথে, জাহানারার সাথেও, কেননা জাহানারার অপরাধ মেনে নিতে প্রস্তুত হয়েছিলেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। কিন্তু এসবের কিছুই কি পিতাকে বলতে পারবে সে?
বাবা, যা হয়েছে, হয়েছে। তুমি যা করেছ বা করতে ব্যর্থ হয়েছ তার কোন কিছুই ভাইদের বিদ্রোহকে বৈধ করে তুলবে না। এখন মনোর যাগ দাও তাদেরকে কীভাবে পদানত করা যায় সেদিকে।
*
চারপাশে তাকিয়ে নিজের উপদেষ্টাদের পরিচিত মুখগুলোর দিকে তাকালেন শাহজাহান। প্রত্যেকের চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল যে কয়েক ঘণ্টা আগে পুত্রদের বিদ্রোহের সংবাদে তিনি নিজে যতটা বিস্মিত হয়েছিলেন, এদের প্রত্যেকের অবস্থাও তাই। কেউ কেউ অবশ্য বিস্ময় গোপনও করতে পেরেছে। অন্তত একজনের অন্যান্য আরো অনেক সমস্যা আছে। তার ভূমি খরার কবলে পড়েছে মারাত্মকভাবে। লোকটার দিকে শক্তভাবে তাকিয়ে মনে মনে অবাক হয়ে ভাবলেন শাহজাহান যে যদি এমন হয় আওরঙ্গজেব তাকে ঘুষ দিয়েছে সহায়তার জন্য। আর ওই তো দরজার কাছে বসে আছে যে উপদেষ্টা, মূল্যবান জায়গিরের দিকে লোভ ছিল তার সবাই জানে; অসুস্থ হবার আগপর্যন্ত কাউকে এর অনুমতি দেননি শাহজাহান। হয়ত এ লোকটাও বিক্রি হয়ে বসে আছে। কে বলতে পারে? বেশির ভাগেরই কোন না কোন বাসনা আছে। কিন্তু অন্তত তার রাজপুত মিত্রেরা, আম্বারের রাজা জয় সিং আর মারওয়ারের রাজা যশয়ন্ত সিং পুরোপুরি বিশ্বস্ত। এ ব্যাপারে নিশ্চিত শাহজাহান। আকবরের সময় থেকেই পারিবারিক আর সম্মান উভয় দিক থেকেই আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে উঠেছে তাদের সাথে মোগলদের। হাত তুলে আবারো কথা বলে উঠলেন শাহজাহান। আমার কনিষ্ঠ তিনপুত্রের ষড়যন্ত্রের প্রধান। অংশটুকুই কেবল বলেছি আমি। এখন শাহজাদা দারা তাদের অগ্রগতি আর সেনাবাহিনী সম্পর্কে এ পর্যন্ত যতটুকু জানতে পেরেছে তা জানিয়ে দেবে সবার সামনে।
দাক্ষিণাত্য থেকে ইতিমধ্যে রওনা দিয়েছে আওরঙ্গজেবের বাহিনী। বলে উঠল দারা। যদিও সে দাবি করছে যে এটা কোন বিদ্রোহ নয় অনেক রটনা থাকলেও তার ইচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে আগ্রায় এসে সম্রাটের বেঁচে থাকা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। শাহ সুজার সেনাবাহিনীও মাঠে নেমেছে, পশ্চিম দিকে গঙ্গা ধরে এগোচ্ছে। আসামের জঙ্গলে বেড়ে উঠা বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হাতিসহ বিপুল সংখ্যক অশ্বারোহী আর পদাতিক সৈন্য আছে এ বাহিনীতে।
দক্ষিণের শাসকদের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্য সবসময় সৈন্য বাহিনী প্রস্তুত রাখে আওরঙ্গজেব; কিন্তু শাহ সুজা কেমন করে এত দ্রুত সৈন্য একত্রিত করল? জানতে চাইলেন জয় সিং।
উত্তর দিলেন শাহজাহান। বাংলার অর্থভাণ্ডার এত গভীর যে এর দুই গুণ বড় সেনাবাহিনীও চাইলে কিনতে পারবে সে আর এছাড়া বিহারের করের অর্থও আছে; সবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বোকার মত তাকে যেটা দিয়েছি আমি। বলে যাও, দারা।
আমার ভাই মুরাদও অন্যদের মত প্রস্তুতি নিয়েই এগোচ্ছে। সেনাবাহিনী জড়ো করে রসদ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করছে–অথবা করার চেষ্টা করছে। কেননা, ভাইদের রাজকোষের তুলনায় তার রাজকোষের অবস্থা প্রায় কপর্দকশূন্য। এক্ষেত্রে ধন্যবাদ দিতে হবে তার অযোগ্যতা আর অমিতব্যয়িতাকে। গুজরাটের ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ ঋণের চেষ্টা চালাচ্ছে আর খানিকটা বিলম্ব হতে পারে, কিন্তু ভয় হচ্ছে হয়ত বেশি দেরি আর নেই…
আপনি নিশ্চিত যে তারা সকলে সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রায় আসতে চায়? এবারে জিজ্ঞেস করলেন যশয়ন্ত সিং।
তাই মনে হচ্ছে। আমার বিশ্বাস যে একে অন্যের সাথে আঁতাত গড়েছে তারা। কিন্তু এটা কি যে কোন একজনকে সিংহাসনের জন্য সাহায্য করা নাকি নিজেদের মাঝে সাম্রাজ্য ভাগ করে নেয়া, সেটা পরিষ্কার নয়। উত্তরে জানালো দারা।
