জাহানারা পরামর্শ দিয়েছে জনগণের সামনে দর্শন দেবার জন্য যত শীঘ্র সম্ভব ঝরোকা বারান্দায় যেতে হবে আপনাকে। যেন এই রটনা শান্ত হয় যে আপনি মৃত।
জাহানারা? তার সাথে দেখা হয়েছে তোমার?
হ্যাঁ। দুর্গে পৌঁছবার সাথে সাথে তার কাছে গিয়েছিলাম আমি।
বক্র চোখে দারার দিকে তাকালেও কিছু বললেন না শাহজাহান। বলে চললো দারা, ওর প্রতি অন্যায় করেছেন আপনি। নিকোলাস ব্যালান্টাইন আর জাহানারার কাহিনী ততটাই কদর্য আর ভিত্তিহীন যতটা আপনার মারা যাওয়ার কাহিনী। নিকোলাসকে শুধু মাত্র ডেকে পাঠিয়েছে কারণ আওরঙ্গজেবকে নিয়ে চিন্তিত ছিল সে। চেয়েছিল নিকোলাস যেন জানায় যে উত্তরের অভিযানে সত্যিকারের কী ঘটেছিল। মায়ের স্মৃতির নামে শপথ করে বলেছে যে নিকোলাসের সাথে কোন সম্পর্ক ছিল না…আব্বাজান, আমার কর্কশ শব্দের জন্য ক্ষমা করেন; কিন্তু যা শুনেছি তাতে অবিচার করেছেন জাহানারার প্রতি। অন্তত এখন তার সাথে দেখা করেন… আমার বোনকে প্রমাণ করার সুযোগ দিন যে আপনি কত বড় ভুল করেছেন। অপেক্ষা করল দারা। জাহানারার মত সদস্যদের একান্ত প্রয়োজন এখন পিতার, যে কিনা তার প্রতি এখনো বিশ্বস্ত। আবারো চেষ্টা করল দারা। আব্বাজান… আমাকে বিশ্বাস করেন। আমি…
এবার উত্তর দিলেন শাহজাহান। যথেষ্ট, দারা। যা বলেছ শুনেছি।
জাহানারার সাথে দেখা করবে?
সম্ভবত।
তিন ঘণ্টা পরে, পূর্ব দিগন্তে ফুটে উঠেছে হালকা আলো, কর্চির হাত থেকে পানির গ্লাস নিয়ে চুমুক দিলেন শাহজাহান। কুয়ো থেকে তুলে আনায় এখনো বেশ ঠাণ্ডা, তৃষ্ণার্তের মত পানিটুকু পান করলেন ম্রাট। যদিও পাত্র ধরে রাখা হাত দুটো এখনো পুরোপুরি শক্ত আর স্থির হয়নি। এটা কি অসুস্থতার ফল হঠাৎ করে এই যে দুর্বলতা চেপে বসল তাঁর উপর আর এর কোন ব্যাখ্যা দিতে পারেনি হাকিমেরা? অথবা দারার মুখে বিদ্রোহের কথা শুনে ক্রোধ জেগেছে মনে? অথবা শীঘ্রই তার সামনে এসে দাঁড়াবে জাহানারা আর আরো একবার তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে শাহজাহানকে?
গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকা অবস্থাতেই শুনতে পেলেন বাদ্যের গুরগুর আওয়াজ তাঁর নির্দেশেই এই ইশারা দেয়া হয়েছে যেন আগ্রাবাসী ঘুম থেকে জেগে উঠে যমুনার তীরে এসে ঝরোকা বারান্দায় দেখে যায় তাদের সম্রাটকে। কর্চি আমার আলখাল্লা নিয়ে এসো। সাধারণত বারান্দাতে সংক্ষিপ্ত দর্শন দানের জন্য আটপৌরে সুতির টিউনিক পরে যান সম্রাট; কিন্তু প্রায় তিন মাস হয়ে গেল জনগণ দেখেনি তাঁকে। আর তাই সবুজ রেশম আর রত্নপাথরের সজ্জিত হয়ে শয্যাকক্ষ ছেড়ে বের হবেন তিনি যখন উদিত সূর্যের উষ্ণ আলো এসে পৌঁছবে পৃথিবীতে, খোদাই করা বালিপাথরের বারান্দাতে। হাত তুলে তাদেরকে আর আসন্ন দিনের উপর আশীর্বাদ করবেন সম্রাট, অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশি সময়ই থাকবেন; যেন সম্রাটের সুস্থ হওয়া নিয়ে কারো মনে কোন সংশয় না থাকে। তাদের সামনে দেখতে পাবে মোগল ম্রাটকে।
আধা ঘণ্টা পরেই সমাপ্ত হয়ে গেল কাজ। নিচে উল্লসিত জনতার কাছে থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিজের মহলে ফিরে এলেন শাহজাহান। যেমনটা তিনি বলেছেন, তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত ছাদে অপেক্ষা করছে জাহানারা। এক মুহূর্তের জন্য দ্বিধা করেও হাঁটা ধরলেন ছাদের দিকে। আবারো বাইরে আসায় তীব্র আলোর বিপরীতে হাত দিয়ে ছায়া দিলেন চোখের উপর। জাহানারা দাঁড়িয়ে আছে, সামনে এগিয়ে এলো না। এক মুহূর্তের জন্য একে অন্যের দিকে তাকিয়ে, শাহজাহান এগিয়ে গেলেন কন্যার দিকে।
শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না বলার মত। জাহানারার হয়ে অনেক কিছু বলেছে দারা, অনেক কিছু ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছে, বারবার জোর দিয়ে বলেছে যে জাহানারা নিরপরাধ আর নিজের হৃদয়ের গভীরে শাহজাহানও উপলব্ধি করলেন যে পুরোপুরি সঠিক দারা। কেমন করে এমন অভাবনীয়ভাবে রেগে গেলেন তিনি? আরো একবার পরাজিত হলেন জাহানারার কাছে। ক্ষমা করো আমাকে। অবশেষে বলতে পারলেন শাহজাহান। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে ত্রস্তপায়ে তোমার বিচার করেছি। কোন অজুহাত দিচ্ছি না…
এসবই এখন অতীত আব্বাজান। সম্ভবত এটা নিয়ে আর কথা বলা উচিত হবে না আমাদের। মাপা কণ্ঠস্বরে জানিয়ে দিল জাহানারা। দমিয়ে রাখতে চাইছে নিজের ভেতরে উদ্গত হয়ে ওঠা আবেগকে।
কিন্তু আমাকে বলল যে ক্ষমা করেছ, নয়ত শান্তি পাবো না আমি।
আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। কথাগুলো বলেই, জানে যে রাজপরিবারের স্বার্থে বলতে হবে, দৃশ্যত পিতাকে স্বস্তির শ্বাস ফেলতে দেখলো জাহানারা। কিন্তু আপন মনে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল কথাগুলি কি সত্যি? সম্ভবত অনেক দিন লেগে যাবে এটা ভুলতে যে অযৌক্তিকভাবে রেগে গিয়ে তাকে অপরাধী হিসেবে বিশ্বাস করে বসেছিলেন পিতা। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ দূরে থাকার পর নতুন চোখে পিতার দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল জাহানারা, কতটা বৃদ্ধ দেখাচ্ছে তাকে। চওড়া কাঁধ অবনত আর এক সময়কার পেশীবহুল শরীর–এক যোদ্ধার শরীর দেখাচ্ছে পাতলা আর ভঙ্গুর। এখনো সুদর্শন চেহারাতে আঁচড় কেটেছে গভীর রেখা। অসুস্থতা এসে এত বড় মূল্য চুকিয়ে গেল নাকি এখন যা দেখছে সম্রাট সবসময় তাই ছিলেন?
নিজের ভেতরেই অনুতপ্ত হল জাহানারা, হাসতে চাইল; কিন্তু আরেকটা কথা মনে হতেই মুছে গেল হাসি। শুধু আমার সাথেই যে অবিচার করা হয়েছে তা নয়। তুমি নিকোলাস ব্যালান্টাইনের সাথেও অন্যায় করেছ। যা ঘটেছে তাতে ওনার কোন অপরাধ নেই। আমি ওনার দ্বারস্থ হয়েছি কেননা ভাইদেরকে নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, বিশেষ করে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে। একটু বেশিই অবাধ্য হয়েছিলাম, আমি জানি। ভাবা উচিত ছিল যে এতে অন্যরা কী ভাববে। কিন্তু নিকোলাসের একমাত্র অপরাধ হলো আমাকে সাহায্য করতে চাওয়া। ইংল্যান্ডের জন্য জাহাজ ধরার কথা এখন। আমি তাকে পত্র লিখে জানিয়ে দেব। হয়ত সময় মত পৌঁছাবে না চিঠি। কিন্তু এটুকু জানিয়ে দিতে চাই যে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে… আমাদের পরিবার জানে যে তার কাছে কতটা ঋণী আমরা।
