এ সবকিছুই এখনো রুখে দেয়া সম্ভব। অসুস্থ হবার আগপর্যন্ত সাম্রাজ্যের প্রধান ছিলেন পিতা আর শীঘ্রিই আবারো সেইরূপ হয়ে যাবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পিতা শাসন করার পক্ষে অসুস্থ, মৃতপ্রায় বা মৃত–এ রটনাগুলোকে থামিয়ে দেয়া… যত তাড়াতাড়ি সম্ভব–যদি শক্তি ফিরে পান তাহলে সম্ভব হলে আগামীকাল সকালেই ঝরোকা বারান্দায় গিয়ে জনগণের সামনে প্রাত্যহিক দর্শন দিতে হবে; যেন তারা বুঝতে পারে তাদের সম্রাট এখনো জীবিত আছেন। আর একই সাথে জানিয়ে দিতে হবে যে কী ঘটেছিল। আল্লাহ না করুণ যে তিনি এত অসুস্থ দায়িত্ব নিতে পারবেন না। ভাইয়েরা নিশ্চয়ই এতবড় সাহস করবে না যখন জানতে পারবে যে সম্রাট এখনো সক্ষম আছেন।
সবসয়কার মতই বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলছ তুমি… সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করব না আমি। এখনি যাবো তার কাছে… তাড়াহুড়া করে দরজার কাছে এগিয়ে গেল দারা, কিন্তু কী মনে হতেই ফিরে তাকাল জাহানারার দিকে। তুমি আমার সাথে আসতে চাও?
পারব না। এখনো আমার সাথে দেখা করতে চান না পিতা। অসুস্থ হবার পরেও যখন আমি অনুমতি চেয়েছিলাম দেখা করতে, প্রত্যাখিত হয়েছি। আমার ভয় যে দেখা মাত্র বিরক্ত হয়ে উঠবেন, ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলা যাবে না।
আমি জানাবো যে তোমাকে সন্দেহ করাটা কত বড় ভুল হয়েছে। সাত্তি আল-নিসা আমাকে চিঠি লিখে জানিয়েছে যে সত্যিই কী ঘটেছিল। পিতাকে মানিয়ে নেব আমি। সবকিছু এখনো ঠিক হতে পারে প্রতিজ্ঞা করছি আমি।
কিন্তু সত্যিই কি সব ঠিক হয়ে যাবে–দারার প্রস্থানের শব্দ শুনতে শুনতে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল জাহানারা। নিশ্চিত নয়। তাকে অপরাধী করে পিতার অভিযোগ আর অনাস্থা জানতে পেরেছে যে এ কাজে হাত রয়েছে তারই আপন বোনের… পরিবারের উপর তার বিশ্বাস নাড়িয়ে দিয়েছে। ভাবত যে তারা সকলেই এক, কেউ কারো ব্যক্তিগত স্বার্থান্বেষী নয়। আর এখন ভাইদের এ ধরনের সংবাদ তার ভয়কে এত বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে যে, সবচেয়ে বাজে দুঃস্বপ্নেও যা কখনো ভাবেনি।
কে জানত যে এমন কখনো কিছু ঘটতে পারে? তাক্ত ইয়া তক্তা সিংহাসন অথবা কফিন নিজেদের সাথে করেই এশিয়ার অনুর্বর ভূমি থেকে এই শব্দগুলো নিয়ে এসেছে তার মোগল পূর্বপুরুষেরা। উৎকৃষ্ট পোশাক আর রত্ন পরিধান করে, শাহজাদাদের আনুষ্ঠানিক কায়দা কানুন মেনে চলার পরেও কী ছিল তার ভাইয়েরা?
মহান আর আলোচিত একটি সাম্রাজ্যের সভ্য বংশধর নয়, বরঞ্চ বন্য জন্তু, একে অন্যের লাশের দিকে তাকিয়ে গড়গড় করছে। যেটি কিনা এখনো মরে যায়নি… পিতার হাতের ভারী স্বর্ণের আংটির দিকে তাকিয়ে গড়গড় করছে যা কিনা একসময় লালিমা ছড়িয়েছিল তৈমুরের হাতে।
*
ছোট সিংহাসনটি থেকে উঠে দাঁড়ালেন শাহজাহান। ছোট ঘোট পা ফেলে আস্তে আস্তে হেঁটে গেলেন নিজের শয্যাকক্ষের দিকে। এতক্ষণ এই চেয়ারে আসনটিতে বসেই দারার কাহিনী শুনেছেন তিনি। হাত দুটো আড়াআড়ি ভাঁজ করে নিজেকে জড়িয়ে ধরে মাথা নত করে এগোতে লাগলেন সম্রাট। দারার কথাগুলো শোনার পর প্রথমে তো এতটাই মর্মাহত হয়ে গিয়েছিলেন যে বসে রইলেন স্থাণুবৎ। এখনো মনে হচ্ছে হাকিমদের দেয়া ওষুদের ফলে মস্তিস্কের এলোমেলো চিন্তা কিনা। প্রায়শই বিশেষ করে অসুস্থ হবার পর প্রথম দিনগুলিতে, বেশিরভাগ সময় নিদ্রা আর জাগরণের মাঝামাঝি থাকতেন তিনি। নিশ্চিত হতে পারতেন না যে কোনটা সত্যি আর কোনটা ক্লান্ত, বিপর্যস্ত মস্তিষ্কের ভাবনা। অদ্ভুত সব ছবি ভেসে বেড়াত মাথার মাঝে, বেশির ভাগ সময়েই মৃতপিতামহ আবার, পিতা জাহাঙ্গীর আর সবচেয়ে বেশি হাস্যরত মমতাজ ফিসফিস করে বলত মুবারক মঞ্জিল, ফিরে আসা সম্রাটের উদ্দেশে একজন সম্রাজ্ঞীর সনাতন অভিবাদন।
এখন, বুঝতে পেরেছেন যে বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন তিনি, সামনে সব কঠিন বাস্তবতা বিদ্রোহ, আর বিদ্রোহের নেতা কোন বিশ্বাসঘাতক প্রজা নয়, তারই পরিবারের সদস্য। কোন পাগলামিতে মেতেছে তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রেরা? তাদের কেউই তেমন হয়নি যেমনটা তিনি চেয়েছিলেন, কিন্তু কখনো সন্দেহ করেননি যে এত নগ্নভাবে ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়বে তারা। মনে হচ্ছে যেন ফিরে এসেছে অতীতের দিনগুলি যখন একে-অন্যে ছিল মোগলদের সবচেয়ে বড় শত্রু। তিনি নিজেও বিদ্রোহ করেছিলেন আপন পিতার বিরুদ্ধে আর সভাইদের সাথে লড়াই করেছিলেন সিংহাসনের জন্য। কিন্তু সেটা ছিল ভিন্ন হিসাব… মেহরুন্নিসার কথা মত তাকে এতে বাধ্য করেছিলেন জাহাঙ্গীর। নিজের পরিবারের সুরক্ষায় লড়েছিলেন তিনি। তাঁর নিজের পুত্রদের তো এমন কোন অজুহাত নেই আর সেই পুরোন পারিবারিক উচ্চাকাঙ্খ, রক্তপাত আর প্রতিশোধের বদলা নেবার চাকা পুনরায় ঘোরার অনুমতি দিবেন না তিনি। তাকে অবশ্যই তিনি করবেন–এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটাতে হবে, যেন পরিবারের নিশ্চিহ্ন হওয়া আর মোগলদের এতদিনের অর্জন নষ্ট হওয়া রোধ করা যায়।
পায়চারি থামিয়ে দারার দিকে তাকালেন সম্রাট। তাদের প্রদেশ সমূহে দূত পাঠিয়ে দাও। খুঁজে বের কর, কত বড় সেনাবাহিনী। কতদূর এগিয়েছে আর কেই বা তাদের ঘোষণা দিয়েছে। যতদূর সম্ভব তথ্য চাই আমি। সকালবেলা, উপদেষ্টাদের সভা ডেকে পাঠাবো আমি। তাদের সবাইকে শোনাতে হবে আমাকে যা বললে। একটা ব্যাপার পরিষ্কার আমাদেরকে দ্রুত আর নির্ভুলভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যেন বিদ্রোহীরা পরবর্তী সুযোগ না পায়।
