মোমবাতির কম্পমান শিখার আলোতে দারার চেহারায় উদ্বিগ্নতা দেখতে পেল জাহানারা। জানি তুমি নিজেও সমস্যায় আছে, কিন্তু আর
ভাবে বলার উপায় নেই। আওরঙ্গজেব, শাহ সুজা আর মুরাদ বিদ্রোহ শুরু করেছে। দাবি করছে যে পিতা শাসন করার পক্ষে বেশি অসুস্থ। নিজ নিজ সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রার দিকে এগিয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
কিন্তু এটা সত্যি হতে পারে না…
অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে দারার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল জাহানারা। তুমি নিশ্চিত?
হ্যাঁ। প্রথম শোনার পর আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। গোয়ালিওরের কাছে এসে বহুরাস্তা মিশে গেছে এক হয়ে। প্রথম যে সংবাদ আমি পেয়েছি তা হল আগ্রাতে ফিরে আসছে আওরঙ্গজেব। ভেবেছিলাম অসুস্থ পিতার পাশে থাকাটাই তার অভিপ্রায়–যেমনটা করেছিল তোমার দুর্ঘটনার পরে আর আগ্রা থেকে দূরে থাকার জন্য হয়ত পিতার সাম্প্রতিক সুস্থতার সংবাদ ও পায়নি। তাই এটা নিয়ে আমি তেমন চিন্তা করিনি। পরের দিন, একজন কসিড, গোয়ালিওরের প্রশাসকের কাছে জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিয়ে এসেছে বড় পুত্রের কাছ থেকে, যে কিনা এলাহাবাদে আমাদের প্রশাসক। আমার এক কর্চিকে কসিড লোকটা জানিয়েছে যে গুজব ছড়িয়েছে শাহ সুজা সেনাবাহিনী নিয়ে আগ্রার দিকে রওনা দিয়েছে। সচকিত হয়ে আমি তৎক্ষণাৎ বিষয়টির তদন্ত করার জন্য এলাহাবাদে বার্তাবাহক পাঠিয়ে দিয়েছি একের পর এক। ছত্রিশ ঘণ্টা পরে পরিষ্কার হয়ে গেল সত্যিকারের অবস্থা। আমার উজিরপুত্র তাঁবুতে এসে দেখা করতে চাইল। দাক্ষিণাত্যে আওরঙ্গজেবের প্রধান কার্যালয়ে কাজ করেছিল সে। পুরো একদিন আর রাত ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছে আমাকে সতর্ক করে দেবার জন্য, জানে যে গোয়ালিওরে আছি আমি। উজির পুত্র আমাকে জানিয়েছে, আওরঙ্গজেব নাকি নিজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে দাবি করেছে যে পিতা মৃত্যুশয্যায় অথবা সম্ভবত এরই মাঝে মারা গিয়েছেন আর সিংহাসনের উপর নিজের অধিকার কায়েমের জন্য এ সংবাদ এখনো গোপন রেখেছি আমি। আর তাই আমার হাত থেকে সাম্রাজ্য রক্ষায় আগ্রা অভিমুখে ছুটে আসছে সে সেনাবাহিনী নিয়ে। আরো দাবি করেছে শাহ সুজা শুধু নয় মুরাদের সাথে মিলেও কাজ করছে এখন।
জাহানারা এতটাই চমকে গেছে যে কথা বলা দূরে থাক চিন্তা করার শক্তিও যেন হারিয়ে স্থবির হয়ে গেছে। দারার সাথে এভাবে আবার সাক্ষাৎ হবে কখনো ভাবেনি। অনেকবারই ভেবে দেখছে নিজের সরলতার কথা কীভাবে জানাবে দারাকে, জানে যে তাকে বিশ্বাস করবে দারা, ফিরে গিয়ে পিতাকে সব বুঝিয়ে বলবে শাহজাদা আর তার কাছে এসে আবারো ক্ষমা চাইবেন। এখন পিতা অসুস্থ, নিজের আপন তিন ভাইই তার বিরুদ্ধে চলে গেছে আর সাম্রাজ্যে সম্ভবত গৃহযুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে।
হঠাৎ করেই নিজের সব সমস্যা ভুলে গেল জাহানারা। আমি কিছুই শুনিনি। অবশেষে ফিসফিসিয়ে জানালো জাহানারা। যদিও আমি এ কক্ষে বন্দি, সাত্তি আল-নিসা প্রতিদিন আমাকে দেখতে আসে। আমাকে নিশ্চয় জানাত যদি এরকম কোন গুজব দরবারে ছড়াত।
আমি আদেশ দিয়েছি যে আগ্রাতে ফেরার সাথে সাথে সব কসিডদেরকে যেন আমার কাছে পাঠানো হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না পিতার পাশে যেতে পারছি, আমি চাইনি যে তিনি চিন্তায় পড়ে যান। ফিরে আসার সময়ের সপ্তাহগুলোতে আরো বেশ কিছু খবর পেয়েছি আমি। বিশেষ করে যাদেরকে পূর্ব দিকে পাঠিয়েছিলাম, তারা নিশ্চিত করেছে যে সেনাবাহিনী নিয়ে রওনা দিয়েছে শাহ সুজা। খুব বেশি দিন বাকি নেই যখন সকলে জেনে যাবে এ সংবাদ।
যত দিন সম্ভব ঠেকিয়ে রাখার জন্য এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে আমাদেরকে। অন্তত যেন ভাইদের কাছে বার্তা পাঠানো যায় যে পিতা সুস্থ হয়ে উঠছেন… আর তাই তাদের আচরণও চক্রান্তমূলক।
বিষণ্ণ ভঙ্গিতে হাসল দারা। সম্ভবত তারা এ দুটো বিষয়েই অবগত আছে–বিশেষ করে দ্বিতীয় সংবাদটি। অনেক দিন আগে থেকেই জানে যে পিতা আমাকেই উত্তরাধিকারী মনোনীত করতে চান। পিতার অসুস্থতার অজুহাত নিয়ে এমন কিছু করতে চায় তারা যেন কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না করতে পারেন সম্রাট। ফলে তাদের দাবিও বৈধতা পাবে।
কিন্তু তারা কী করতে চাইছে? তোমার আর পিতার সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করবে সিংহাসনের জন্য?
আমি জানি না। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে এরকম কিছু ঘটবে এ সম্ভাবনা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছে বহু আগেই। নিশ্চয় তারা একমত হয়েছিল যে পিতার কিছু হলেই একজোট হয়ে কাজ শুরু করবে তারা। হতে পারে নিজেদের মাঝে সাম্রাজ্যের বাটোয়া নিয়েও একমত হয়েছে। যাই হোক না কেন আমি নিশ্চিত আওরঙ্গজেবই তাদের নেতা।
আমাকে ঘৃণা করে সে।
সহজ গলায় বলল দারা। অনেকবারই তার চোখে এটা দেখেছি আমি। মুখে যতই সান্ত্বনার কথা বলুক না কেন। আমার পেছনে, অন্য ধর্মের প্রতি আমার বিশ্বাস আর আগ্রহকে ধর্মোদ্রোহিতা হিসেবে প্রচার করে আর যারা শোনে তাদের বেশির ভাগই নিজের স্বার্থে তাকে সমর্থন করে, আমার তাই ধারণা। আমি ভেবেছিলাম যে এত দূরে দাক্ষিণাত্যে বসে কোন ক্ষতি করতে পারবে না সে, কিন্তু ভুল ভেবেছিলাম। পিতার আস্থা আর দরবারে নিজের অবস্থান নিয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম; কিন্তু উচিত ছিল অন্যত্র কী হচ্ছে তাতে মনোযোগ দেয়া। নিজের পুত্রদেরও মাথা হেট করে দিয়েছি আমি। যদি এখন ব্যর্থ হই আমি, তাহলে এতে কোন সন্দেহ নেই যে সুলাইমান আর সিপিরকেও তার জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।
