এর অর্থ এরকম কিছু ছিল না… আমি সত্যিই দুঃখিত যদি ব্যাপারটা এমন দেখায়। হঠাৎ করেই রোশনারার চোখে পানি দেখে তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল জাহানারা, কিন্তু ঝাঁকুনি দিয়ে দূরে সরে গেল রোশনারা। ডান হাত দিয়ে চোখ মুছে, লেপ্টে ফেলল চোখের কাজল।
একদম না!
হাত ছেড়ে দিল জাহানারা। আম্মাজান মারা যাবার পর থেকে আমি চেষ্টা করেছি তোমাদের দিকে লক্ষ্য রাখার … তোমাদের ভালোর জন্য কাজ করার…
যদি তুমি এরকমই ভাবো, তাহলে বলব আমাদের মত করে সমস্যাগুলোকে কষ্ট করোনি কখনো। তুমি নিজের জ্ঞান নিয়ে এত নিশ্চিত ছিলে কখনো জানতেই চাওনি যে আমরা কী ভাবি বা কী চাই। এখন তুমি প্রাপ্য অবস্থার মাঝে পড়েছ, মহান নারী হওয়া সত্ত্বেও একজন বিদেশীর সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছ… এখন বুঝতে পারবে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলে কেমন লাগে।
কখনো কোন সম্পর্ক ছিল না। কখনোই না। আমি নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে দেখা করতে ডেকে পাঠিয়েছিলাম, কেননা আওরঙ্গজেবকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম। জানতাম যে উত্তরের অভিযান নিয়ে পিতার সাথে খারাপভাবে কলহ হয়েছে তার। নিকোলাসও সেই অভিযানে ছিল। আশা করেছিলাম জানাতে পারবে যে কী ঘটেছিল আর সাহায্য করবে আওরঙ্গজেব ও পিতার মাঝে সবকিছু ঠিক করে দিতে।
তোমাকে বিশ্বাস করি না আমি। নিজেকে বাঁচানোর জন্য কাহিনী তৈরি করেছ।
তুমি বুঝতে পারছ না…নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে বিশ্বাস করেছি কারণ সে আগেও সাহায্য করেছিল। যখন পিতা মুরাদকে উত্তরের অভিযানে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেছিলেন, আমি নিকোলাসকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম যেন মুরাদকে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করে আর আমাকে অভিযান সম্পর্কে সব সময় জানায়। আমাকে নিরাশ করেনি সে আর এই কারণেই আওরঙ্গজেবের ব্যাপারেও তাকে বিশ্বাস করেছি আমি।
যদি এটাই সত্যি হয়, তাহলে আগ্রা থেকে পালিয়ে গেল কেন অবিশ্বাসীটা?
কারণ, যদি সে থেকে যেত তাহলে পিতা তাকে হত্যা করত। কেননা, পিতা কখনোই আমার কথা বিশ্বাস করত না, যেমন এখন তুমি করছ না। গলা ক্রমশই চড়ে গেল জাহানারার, বহু কষ্টে নিজেকে শান্ত করে রাখল সে। নিকোলাসকে অবিশ্বাসী বললে তুমি অপরাধী হিসেবে ডাকলে। এসবই সহজ, বোঝার চেষ্টা না করে কিছু একটা ডেকে বসা। মনে নেই তোমার বাল্যকালে আমাদের প্রতি কতটা সদয় ছিলেন তিনি… তাঁর সাহস আর বিশ্বস্ততা যখন আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম? আমাদের পরিবার তাঁকে এত ঘৃণ্যভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছে যে লজ্জিত হয়েছি আমি, আর তোমারও তাই হওয়া উচিত।
জাহানারার গাল বেয়ে গড়িয়ে নামল অশ্রু বিন্দু। যা ঘটে গেছে তার ভার বহন করা মাঝে মাঝে দুঃসহ হয়ে পড়ে। অন্তত নিকোলাস নিরাপদে আছে। সাত্তি আল-নিসা গুজরাট থেকে একটা চিঠি এনে দিয়েছে যেখানে নিকোলাস জানিয়েছে যে সুরাট থেকে ইংল্যান্ডের জাহাজ ধরার চিন্তা করছে নিকোলাস।
শুধুমাত্র এই কারণে নিকোলাস ব্যালান্টাইন পালিয়ে যায়নি। বোনের রাগ অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ায় আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল রোশনারা। আমি দেখেছি তুমি কীভাবে তাকিয়ে ছিলে, তার সম্পর্কে বলতে গেলে কতটা নরম হয়ে যায় তোমার স্বর, যেমন এখন হয়েছে। প্রথমে বলেছ তোমাকে বোকা না ভাবতে, তো, আমি ও তোমাকে একই কথাই বলতে পারি!
ভুল ভাবছো তুমি, যদি ভাবো যে আমার কোন অনুভূতি আছে– তার প্রতি অন্য কোন অনুভূতি…
কিন্তু রাঙা হয়ে গেল জাহানারা।
তাই? যাই হোক, আমার রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াও দয়া করে, সময় হয়েছে পিতার শয্যাপাশে ফিরে যেতে হবে আমাকে।
*
নিজের মহলের বাইরের দরজায় হঠাৎ করাঘাতের শব্দ শুনে চমকে গেল জাহানারা। হাত থেকে রেখে দিল তার অন্যতম পছন্দের লেখক, বিংশ শতাব্দীর রহস্যপুরুষ আবদুল কাদির আল জিলানীর বই। এত রাতে দর্শনার্থী প্রায় মধ্যরাতের কাছাকাছি এখন। আব্বাজানের কিছু হয়নি তো? প্রথমবার অসুস্থ হবার পর থেকে প্রায় দুইমাস হয়ে গেছে, সুস্থ হওয়ার হারও অতি ধীর। মাত্র নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে, উদ্বিগ্ন বক্ষে দরজার কাছে এগিয়ে গেল কয়েক কদম, এমন সময় দরজা হাট করে খুলে ঢুকে পড়ল লম্বা ঋজু দেহ, মাথার কাপড় সরিয়ে দিতেই জাহানারার হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল।
দারা! দৌড়ে ভাইয়ের কাছে গেল। আমি অনেক খুশি হয়েছি যে তুমি ফিরে এসেছ। এই মুহূর্তের জন্য আমি কত যে অপেক্ষা করেছি।
আমি সোজা তোমার কাছে এসেছি। জাহানারাকে ছেড়ে দিয়ে জানালো দারা। পিতা এখনো জানে না যে আমি এসেছি। কেমন আছেন তিনি? গত কয়েক দিনে তার স্বাস্থ্যের কোন খবর পাইনি আমি।
খবর ভালো। সাত্তি আল-নিসা জানিয়েছে উন্নতি ঘটছে। এ কয়দিনে এতটাই সুস্থ হয়েছেন যে দিনে তিন-চার ঘণ্টার জন্য হলেও উঠে বসতে পারেন–আর খাওয়া-দাওয়ারও উন্নতি হয়েছে। প্রথমে তো শুধু তেতো আর ঔষধি মধুর সুরুয়া খেতেন। যদিও এখনো বেশ দুর্বল। হাকিমেরা বার বার মানা করে দিয়েছে যেন রাষ্ট্রের কোন ব্যাপার নিয়ে বিরক্ত না করা হয়।
তাহলে তো তিনি জানেন না…
কী জানেন না?
আলো ফোঁটার সাথে সাথে তাঁর কাছে যাবো আমি। আমার কাছে যে সংবাদ আছে তা শীঘ্রি জানাতে হবে, যত দুর্বলই হোন না কেন।
কী হয়েছে দারা? কী সংবাদ?
দ্বিধায় পড়ে গেল দারা।
