আর অন্য ভাইয়েরা? তাদেরকে পত্র দিয়েছ তুমি?
না, এখনো না। তাদেরকে ভয় পাইয়ে দিতে চাই না আমি। আমার ধারণা পিতার অবস্থা আরো খানিকটা পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। তাহলে পাঠানোর মত ভালো সংবাদও পাওয়া যাবে।
হাতায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাবতে লাগল রোশনারা যে কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। সাথে সাথে চিঠি লিখেছে আওরঙ্গজেবের কাছে। এছাড়াও দরবারে ঘটে যাওয়া অন্যান্য ঘটনা সম্পর্কেও তাকে জানিয়েছে রোশনারা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে আওরঙ্গজেব হারেমে স্ত্রীদের কাছে স্বামীদের শত্রুতা, গোপন উচ্চাকাঙ্খ, দুর্বলতা আর মিত্রতা সম্পর্কে যা যা জেনেছে সব জানিয়েছে আওরঙ্গজেবকে। কারো কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছে রোশনারা জীবনে আর কখনো এর স্বাদ পায়নি আগে। দারা আর পিতার মতই, অন্তত আওরঙ্গজেবও বুঝতে পারছে যে তাকে কতটা মূল্য দেয়া উচিত।
খানিকক্ষণের জন্য চুপ করে রইল দুই বোন। দুজনেই বুঁদ হয়ে রইল নিজস্ব চিন্তায়। নীরবতা ভাঙ্গলো জাহানারা, তোমাকে দেখে ভালো লাগছে রোশনারা। কেমন ছিলে তুমি? … আর গওহর আরা? সাত্তি আল নিসা জানিয়েছে যে গত সপ্তাহে দুজনে একসাথে মাহফিল করেছিলে?
আমরা দুজনেই ভালো আছি। নাদিরা গওহর আরাকে বেজী উপহার দিয়েছে। বাঁশির সুর শুনতে পেলেই পিছনের পায়ে দাঁড়িয়ে সুর শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঘুরতে থাকে। দরজার দিকে তাকাচ্ছে রোশনারা। পরিষ্কার বোঝা গেল যে চলে যেতে চাইছে।
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না জাহানারা। কেন আমরা এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা বলছি? তুমি আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছ না যে কী হয়েছিল নিকোলাস ব্যালান্টাইন আর আমাদের মাঝে। তুমি সত্যি জানতে চাও না? যদিও পিতা আমার কথা শুনতে চাননি কিন্তু এটা ভেবে কষ্ট লাগছে তুমি, গওহর আরা আর ভাইয়েরাও আমার সম্পর্কে খারাপ কিছু ভাববে। মায়ের স্মৃতির নামে শপথ করে বলছি যে এরকমটা ভাবার কোন কারণ নেই। আমি নিরপরাধ। আমার সরলতাটুকু বুঝিয়ে বলল তাদেরকে। আমার পক্ষ নাও।
কেন তোমার মিথ্যে বহন করব আমি?
রোশনারা! বোনের দিকে তাকিয়ে রইল জাহানারা। চমকে গেছে তার গলার স্বর আর চোখের কঠিন দৃষ্টি দেখে। আমি কখনো আব্বাজান বা তোমার কাছে মিথ্যে বলিনি। যেমনটা তাকে জানিয়েছি, লজ্জিত হবার মত কিছু করিনি আমি। নিকোলাস ব্যালান্টাইনের সাথে আমার সম্পর্কে কোন অপরাধ নেই।
কীভাবে একথা বল তুমি? তার কাছে লেখা তোমার নির্লজ্জ শব্দগুলো দেখেছি আর আমি …চুপ হয়ে গেল রোশনারা কিন্তু বহু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে।
কাছে এসে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল জাহানারা। স্পষ্ট দেখতে পেল একটু ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেছে হতাশা।
হঠাৎ করেই বুঝতে পারল…
তুমিই কি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ? নাসরিন আমার লেখা চিঠি নিকোলাসের পরিবর্তে তোমার কাছে নিয়ে এসেছে?
কিছুই বলল না রোশনারা। জাহানারা, ইচ্ছে হল সজোরে একটা চড় কষিয়ে দেয় বোনের মসৃণ, গোলাকার মুখখানায়। বোনের সাথে সাথে নিজের উপরেও রাগ হল তার। মনে হল কৌতূহলী নাসরিন নিশ্চয়ই চিঠিটা খুলে পড়ার লোভ সমলাতে পারেনি আর পড়ার পরেই পুরস্কারের সুযোগও পেয়ে গেছে। কিন্তু নাসরিনই প্রথম না যে রাজকীয় গৃহস্থালিতে থাকার সুযোগ নিয়ে প্ররোচনামূলক কাজে আগ্রহী হয়েছে। কিন্তু এটা কখনোই তার মাথায় আসেনি যে অন্য কারো হয়ে কাজ করছে নাসরিন… আর কেউ না, তার নিজের বোন! এই পরিকল্পনা তোমার, তাই না? এই কারণেই নাসরিনকে গৃহকর্মে নিতে তাগাদা দিয়েছিলে আমাকে… তোমার চর হিসেবে কাজ করার জন্য। কেমন করে করলে এরকম একটি কাজ? আর যদি সে আমার চিঠি তোমার কাছে এনে দিয়েও থাকে তাহলে পিতার কাছে নেয়ার আগে আমার কাছে এলে না কেন? আমাকে ব্যাখ্যা করার কোন সুযোগই দাওনি।
না, এটা আমার পরিকল্পনা নয়। দুর্গে এলে নাসরিন আমার সাথে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক আর তোমার চিঠি দেখার পরে ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজনই ছিল না। তৎক্ষণাৎ বুঝতে পেরেছি পিতার কাছে নিয়ে যাওয়াটাই ছিল আমার দায়িত্ব।
রোশনারা ঘুরে দাঁড়াল; কিন্তু দ্রুতপায়ে গিয়ে দরজা আর তার মাঝখানে দাঁড়াল জাহানারা। তার সব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বোনকে যেতে দেবে না সে।
আমি বোকা নই। অন্তত দুবছর যাবৎ আমার প্রাসাদে আছে নাসরিন। আর এই পুরো সময়ে নিশ্চয়ই তুমি আশা করেছ যে সে কিছু একটা দেবে যা আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে তুমি। যেটা আমি বুঝতে পারছি না তা হল কেন? তুমি আমার বোন। আমি সবসময় তোমার জন্য সাধ্যমত করতে চেয়েছি।
তাই? বছরের পর বছর ধরে তুমি আমাকে এমনভাবে অবহেলা করেছ বা দেখিয়েছ যে তোমার পাশে আমি কিছুই না। তুমি সাম্রাজ্যের মহান সম্মানীয়া সর্বশ্রেষ্ঠ নারী। সবসময় পিতার পাশে ছিলে তুমি, যেন নতুন সম্রাজ্ঞী আর আমরা সকলে তোমার অনুচর। মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীর পরে, রাতের বেলা পিতা যখন সমাধিস্থান ছেড়ে নদীর ওপাড়ে চন্দ্ৰআলোর উদ্যানে চলে গিয়েছিল, বলেছিলে যে একমাত্র তোমারই যাওয়া উচিত। যেন আমি কেউ না, একমাত্র তোমারই সেখানে যাবার অধিকার আছে, তুমিই তাকে শান্ত করতে পারবে।
