এছাড়া শাহ সুজাকেও দরবারে ডেকে পাঠাবেন তিনি পুরস্কৃত করার জন্য। কেননা শান্তিময় ও সমৃদ্ধশালী বাংলার ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে দক্ষতা দেখিয়েছে সে; যদিও তার পাঠানো পত্রগুলোও আওরঙ্গজেবের ন্যায় ভাসাভাসা আর সংখ্যায় অনিয়মিত। সত্যিকারের দাবিদার হয়ত শাহ সুজার কঠোর পরিশ্রমী কর্মচারী, তার পরেও পুত্রের সাথে আবার দেখা হলে মন্দ হয় না। মুরাদকেও শীঘ্র আগ্রায় ডেকে পাঠাতে হবে। ভাইদের মত প্রশাসক হিসেবে তেমন সুবিধে করতে পারছে না সে। মাত্র গত সপ্তাহেই, গুজরাটের বিশ্বস্ত ও সৎ রাজস্বমন্ত্রী আলী নকী ব্যক্তিগত এক পত্রে সম্রাটকে জানিয়েছে যে শ্রদ্ধা বজায় রাখলেও সত্যিকারভাবে শাহজাহান নিজে মুরাদকে নির্দেশ দিয়েছেন যে সুরাটের ইংরেজ বণিকদের উপর যেন অধিক হারে কর ধার্য করা হয়। কিন্তু বিদেশীরা শাহজাদাকে মূল্যবান সব উপহার এনে দিচ্ছে আর শাহজাদাও তার প্রদেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থার কথা চিন্তা না করেই যথেচ্ছ অপচয় করছে। গঠনমূলক এই সমালোচনা কীভাবে নেবে মুরাদ? প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই যে মুরাদ এখনো অপরিপক্ক রয়ে গেছে–যদি তার লিখিত পত্রে সুরাটের ব্যবসায়ীদের প্রতি আচরণের পক্ষে সাফাইগুলোকে বাদ দেয়া যায় উত্তরের অভিযানের ব্যর্থতার পরেও তর্জন-গর্জনে ঢেকে রাখতে চায় নিজের অদক্ষতা।
চোখ বন্ধ করে ফেললেন শাহজাহান, অবসন্ন বোধ করছেন; ইদানিং যা প্রায়শই করে থাকেন। কয়েক ঘণ্টার পশু শিকার বা পাখি শিকারেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সেসব দিন বহু আগেই গত হয়েছে যখন শত শত মাইল ঘোড়া ছুটিয়েও প্রাণশক্তি নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে ছুটে যেতেন পূর্বপুরুষের তলোয়ার আলমগীর নিয়ে। হয়ত মধ্যষাটের এই বয়সে এসে এটাই স্বাভাবিক। শীঘ্রই দারার হাতে তুলে দেবেন এই তলোয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্রের হাতেই মানাবে এটি, বিশেষ করে দারা নিজেই এখন পুত্রদের জনক। সুলাইমান একজন দক্ষ ঘোড়াসওয়ার আর বন্দুকবাজ; একই সাথে পিতার মত ভাবুক আর বিদ্বানও বটে। হোট সিপির মোগল মাতা নাদিরার মতই হাসিখুশি আর বুদ্ধিমান। রাজপরিবারের রক্ত সুদৃঢ়তার সাথে বয়ে চলেছে তাদের শিরাতে।
শাহ সুজা, মুরাদ আর আওরঙ্গজেব তিনজনেই পুত্রেদের জনক; যদিও তিনি তাদের তেমন দেখেননি। যদি তারা আগামীকাল দরবারে আসে হয়ত তাদেরকে চিনতেও পারবেন না। সত্যিই পরিতাপের বিষয়। তাদের সম্পর্কে আরো ভালোভাবে জানতে চান তিনি, যেন তারাও তাঁর কাছ থেকে কিছু শিখতে পারে, যেমনটা তিনি শিখেছিলেন নিজের পিতামহ আকবরের কাছ থেকে। এ ভাবনা থেকেই মনে পড়ে গেল যে অনেক দিক থেকেই আকবরের মত হয়েছে দারা। প্রসন্ন হয়ে উঠল মন এই ভেবে যে আর বেশিদিন দূরে থাকবে না দারা।
পেঁচার ডাক শুনে চোখ মেলে তাকালেন শাহজাহান। আকাশের গায়ে দেখতে পেলেন পাখিটার আবছা আকৃতি। কত উজ্জ্বল দেখাচ্ছে নক্ষত্র-খচিত স্বর্গ, যা বড় ভালোবাসতেন প্রপিতামহ হুমায়ুন। বারান্দা থেকে নেমে কয়েক কদম এগিয়ে গেলেন সেই অপূর্ব সৌন্দর্য অবলোকন করতে। কিন্তু হঠাৎ করেই দুলে উঠল চারপাশের পৃথিবী। তারার দল এসে পড়ল পায়ের কাছে আর আকাশে মনে হল ফুটে আছে ফুল আর ঝরনা। ভূমিকম্প হচ্ছে নাকি? হাত বাড়িয়ে কিছু একটা ধরতে চেষ্টা করলেও খুঁজে পেলেন না। পরিবর্তে গড়িয়ে পড়ে যেতে লাগলেন সামনের দিকে… শুনতে পাচ্ছেন বহুদূর থেকে ভেসে আসছে হালকা সব কণ্ঠস্বর। ঘন কুয়াশা এসে ঘিরে ফেলল সবকিছু।
*
হাকিমেরা কী বলেছে? দয়া করে আমাকে সব বলো রোশনারা… বোনের চেহারা দেখে দুরুদুরু করে উঠল জাহানারার বুক।
তারা নিশ্চিত নয় যে সমস্যাটা কোথায়; কিন্তু এটুকু জানিয়েছে যে, শরীর আর মনের দিক থেকে একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছেন পিতা। হাকিমেরা এর জন্য দায়ী করছে দায়িত্বের বিশাল বোঝাকে, বিচার কাজের জন্য দীর্ঘ সময় জনসাধারণের দর্শনকক্ষে বসে থাকা….ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যক্তিগত উপদেষ্টা আর সেনাপ্রধানদের সাথে কাটানো …। আর সাম্প্রতিক সময়ে আরো অন্যান্য উদ্বিগ্নতা…
ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেও কিছু বললো না জাহানারা। দুর্গের হারেমে অবরুদ্ধ হবার পর এই প্রথম তার সাথে দেখা করতে এসেছে রোশনারা। প্রথমে তো অবাক হত এই ভেবে যে শাহজাহান হয়ত বোনদেরকেও মানা করে দিয়েছেন যেন জাহানারার সাথে দেখা না করে। কিন্তু সাত্তি আল-নিসা জানিয়েছে যে এরকম কিছু ঘটেনি। তাই সন্দেহ নেই যে কনিষ্ঠ ভগিনীদ্বয় নিজেরাই তার সাথে দেখা করতে আগ্রহী নয়। অবশেষে এবার রোশনারা আসাতে এমন কিছু করতে চায় না জাহানারা যাতে চলে যায় রোশনারা, বিশেষ করে যখন পিতার কী হয়েছে পুরোপুরি জানা দরকার। কতটা খারাপ অবস্থা? সুস্থ হতে কত সময় লাগবে বলে মনে করে হাকিমেরা? সুস্থ হবেন তো, তাই না?
চিকিৎসকেরাও এটাই বিশ্বাস করে যদিও বলছে যে সময় লাগবে। তাদের একজন পুরোন আলী করিম পরামর্শ দিয়েছে যে পিতা একটু শক্ত হলেই উত্তরে লাহোরে নিয়ে যেতে, প্রশান্ত বাতাসে ভালো বোধ করবেন। যদি যাওয়া হয় তাহলে আমি সঙ্গে যাবো–দারাও। পিতার অসুস্থতা জানানো হয়েছে তাকে, যত দ্রুত সম্ভব আগ্রায় ফিরে আসছে। পোশাকের হাতায় কাজ করা ভারী অ্যামব্রয়ডারিতে হাত বুলালো রোশনারা।
