সারারাত নিজের ঘরে বসে বিস্ময় নিয়ে শুধু এটাই ভেবেছি যে কী হতে পারে এই অপরাধের শাস্তি আর আমার চোখে এটি একটি জঘন্য অপরাধ। শুধুমাত্র একটা জিনিসই আমাকে থামিয়েছে কোন নিষ্ঠুর পদক্ষেপ না নিতে
জানি যে শারীরিক ক্ষতচিহ্ন বহন করছ তা ছিল আমারই অপরাধ। আমার কারণেই নিজের খানিকটা সৌন্দর্য হারিয়েছ তুমি আর এই কারণেই ভুলে গেছ সত্যিকারে তুমি কী আর কামনা করছ পুরুষের স্পর্শ, তা যতটা অমূলক আর অসম্মানেরই হোক না কেন। এটাই বারেবারে নিজেকে বলতে চাইছি, কেননা শত চেষ্টা করেও–এখনও চেষ্টা করছি– তোমার এই অধঃপতনের কোন অজুহাত খুঁজে পাচ্ছি না। পরবর্তী কোন সিদ্ধান্ত না নেয়া পর্যন্ত দুর্গের মাঝে রাজকীয় হারেমে অবরুদ্ধ থাকবে তুমি। আর নিকোলাস ব্যালান্টাইন, আজ প্রভাতেই তাকে আটক করার জন্য আদেশ দিয়েছিলাম আমি, কিন্তু আমার প্রহরীরা যেতে যেতে পালিয়ে গেছে সে…. এটা কোন সরল মানুষের মত কর্ম নয়। কিন্তু এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারো তুমি–তাকে খুঁজে আগ্রায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা হবে আর বন্য ঘোড়া দিয়ে তাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলব আমি। সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে জাহানারার কাছে গেলেন শাহজাহান। মুখে এঁটে আছে অভিব্যক্তিহীন মুখোশ। আমি যা বলার ছিল তা বলেছি, এখন তুমি কথা বলতে পারো।
মুখ খুললো জাহানারা। কিন্তু নিকোলাস আর আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলার ইচ্ছেটাই উবে গেল মন থেকে। কী লাভ তাতে? আগুনে পোড়া ক্ষতও তাকে এতটা আঘাত করেনি, যতটা গভীরভাবে আজ আহত হয়েছে পিতার আচরণে। এতটা দূর থেকে আর স্বৈরশাসকের মত তার বিচার করা হয়েছে যেন সুজনে অচেনা মানুষ টেনে আনা হয়েছে সম্রাটের সামনে আর যেখানে তাঁর নিজেরই চরিত্র এত দুর্বল সেখানে এমনটা করার মানে কিছু নেই। লজ্জিত হবার মত কিছুই করেনি সে। এর বিপরীতটাই করেছে বরঞ্চ।
নিজের স্বার্থপর বাসনা চরিতার্থের বদলে চেষ্টা করেছে পরিবারকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার। পিতার সামনে কখনোই নত হবে না সে। অথবা যতটুকু পেরেছে নিকোলাসের নিরাপদ পলায়নের ব্যবস্থা করেছে, তাই কোন অনুনয়ও করবে না সে। যদি জাহানারা সম্পর্কে এত নগণ্য বিশ্বাস থেকে থাকে তার তবে সে মতই হোক। যা কিছুই ঘটুক না কেন নিজের অহংকার আর সম্মান বজায় রাখবে সে আর কোন একদিন আবারো তার কাছে ক্ষমা চাইবে পিতা।
পিঠ সোজা করে দাঁড়াল জাহানারা। আমি আপনাকে বা আমাদের পরিবারকে আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজেকে অসম্মানিত করার মত কিছু করিনি। আমার সর্বময় বিচারক আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি। এবার আপনার যা ইচ্ছা করতে পারেন।
জাহানারার চোখে জ্বলে উঠল আত্মপ্রত্যয়ের আলা। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি অবশ্যই জানতে চাইব, কে আমার চিঠি আপনার কাছে নিয়ে এসেছে?
এমন কেউ আমাদের পরিবারের সম্মানের প্রতি যে তোমার চেয়েও বেশি শ্রদ্ধাশীল। তাদের পরিচয়ে তোমার কোন প্রয়োজন নেই। এখন যাও।
পিতা কন্যা দুজনেই একে অন্যের দিকে থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। দুজনেরই চোখে পানি–ক্রোধ, বিশ্বাসঘাতকতা আর কিছু একটা হারানোর বেদনা একাকার হয়ে মিশে গেল।
.
২.৬
যমুনার তীরে মমতাজের সমাধির ঠিক বিপরীত পাশে নিজের চন্দ্র আলোর উদ্যান মাহতাব বাগের বারান্দায় অনেকগুলো পিলারের একটির গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছেন শাহজাহান। অল্প কয়েকটা জায়গার মাঝে এটি একটি, যেখানে মোম-সাদা চম্পা ফুল আর কমলা গাছগুলোর মাঝে শান্তি খুঁজে পান তিনি। এরকম রাতে প্রায় মনে হয় যেন ঠিক মমতাজ নিজে তার পাশে বসে আছে। ছেলেমেয়েদের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে কী বলত মমতাজ? কিন্তু নির্বোধের মত হয়ে গেল প্রশ্নটা যদি মমতাজ বেঁচে থাকত তাহলে পিতার কাছ থেকে এত দূরে চলে যেত না তারা অথবা একে অন্যের কাছ থেকে আর হয়ত অন্য রকম হয়ে উঠত তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
গত বেশ কয়েকদিনের মত মন চলে গেল আবারো জাহানারার দিকে। রাজকীয় হারেমে জাহানারাকে সপ্তাহখানেকের মত অবরুদ্ধ করে রাখার পর প্রাথমিক উম্মাটুকু অনেকটা কমে গেছে শাহজাহানের মন থেকে। কিন্তু নিকোলাস ব্যালান্টাইনের সাথে তার আচরণকে কখনোই ক্ষমা করতে পারবেন না তিনি। নিজের সব ছেলেমেয়েদের মাঝে একমাত্র জাহানারার সম্পর্কেই ভাবতেন যে কন্যাকে বুঝতে পারেন তিনি। বিশ্বাস করতেন আগুন লেগে যাবার পূর্বে তাদের মাঝে যে বন্ধন ছিল সেটির পুনর্জন্ম হয়েছিল আবার। এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে যে ভ্রমের মাঝে বাস করেছেন তিনি। সত্যি দেখতে পাননি। তাই দেখেছেন যা দেখতে চেয়েছিলেন। বয়স এসে দেহে বাসা বাঁধলেই কি মানুষ এমন করে? রোশনারা বা গওহর আরা এমনটা করলেও এতটা কষ্ট পেতেন না তিনি, যতটা পেয়েছেন জাহানারার বেলাতে। যদিও কনিষ্ঠ কন্যাদেরও একইভাবে স্নেহ করেন তারপরেও একই নয় তারা। জাহানারার অভাব বোধ করছেন তিনি… তার প্রতিদিনের দেখতে আসা, সাহচর্য আর বুদ্ধিমত্তা।
যাক, অন্তত আর কিছুদিনের মাঝেই গোয়ালিওরের কাছে গ্রেট ট্রাঙ্ক রোডে নতুন দুর্গ নির্মাণের কাজ পরিদর্শন শেষে ফিরে আসছে দারা। কেমনভাবে বোনকে নিয়ে এই রটনা মেনে নেবে সে? অন্য তিন পুত্রের বেলাতে বলতে গেলে কাউকেই গত কয়েক মাসের মাঝে দেখেননি তিনি। আওরঙ্গজেব এখনো দাক্ষিণাত্যে। একগুয়েমী অহংকার আর পৃথিবী সম্পর্কে কঠোর মনোভাবের আত্মবিশ্বাস নিয়েও নিজেকে একজন পরিশ্রমী ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে প্রমাণ করেছে সে। যদিও তার পাঠানো প্রতিবেদনগুলো বেশ সংক্ষিপ্ত আর তথ্যবিহীন। সমৃদ্ধশালী দক্ষিণাঞ্চল থেকে মসৃণ গতিতে কর এসে পৌঁছাচ্ছে মোগল রাজকোষে আর এই মুহূর্তে সাম্রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্ত বেশ শান্তই আছে বলা চলে। ম্রাট এই ভেবে খুশি যে তৃতীয় পুত্র অবশেষে উত্তরের অভিযানের ব্যর্থতা পিছনে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। এখন পিতারও উচিত তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোন সম্মানের ব্যবস্থা করে দরবারে ডেকে পাঠানো তা গ্রহণ করার জন্য। আওরঙ্গজেব এখনো দাবি করে যে পিতা তাকে ভালোবাসে না…এটা তো সত্যি হয় আর একরোখা পুত্রের কাছে তাই এর প্রমাণও করে দেবেন তিনি…
