আমার এখনি পিতার কাছে গিয়ে সব বুঝিয়ে বলা দরকার।
না! সাবধান শাহজাদী। আমি যদিও বহু বছর ধরে শ্রদ্ধা করে আসছি আপনার পিতাকে–এমনকি তিনি সম্রাট হবারও আগে থেকে তাঁর ক্রটি সম্পর্কে অন্ধ হতে পারব না। আপনার মায়ের মৃত্যুর পর থেকে বাইরের পৃথিবী সম্পর্কে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছে তার মনে, তা এখনো পুরোপুরি যায়নি। নিজের ভেতরে ডুবে গেছেন তিনি। আর সবসময়ে যুক্তি মেনে কাজ করেন না। সব সন্তানের মাঝে আপনাকে আর দারাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন–এটা তো সবারই জানা–কিন্তু যদি অনুভব করেন যে আপনাদের মাঝে কেউ একজন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয়জন কোনভাবে তাঁকে হেয় করেছেন তাহলে ক্রোধের মাত্রা ও সীমা ছাড়িয়ে যাবে। মনে রাখবেন অন্য বোনদের চেয়েও হীন হয়ে যাবেন আপনি।
জাহানারার হাত ধরল সাত্তি আল নিসা। মতোজের মৃত্যুর পর যখন অন্য ভাই-বোনদের মাতৃছায়া দিতে চেয়েছেন আপনি, আমি চেয়েছি আপনাকে মাতৃছায়া দিতে। আর এই ভূমিকা পালন করতে এসেছি আমি আজ রাতে। পরামর্শ দিয়ে সতর্ক করে দিতে। দুর্গে যাবার তাগাদা করে কোন লাভ হবে না। পিতার রাগ প্রশমিত হবার সময় দিন, একই সাথে নিজেও ভাবুন যে কী বলবেন।
ঠিকই বলেছে সাত্তি আল-নিসা, ভাবলো জাহানারা। সে যখন ছোট ছিল ঠিক তখনকার মত করে মাথায় আদুরে ভঙ্গিতে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল এই বয়স্কা নারী। কিন্তু হঠাৎ করেই আরেকটা চিন্তা মাথায় আসতে ভয়ঙ্করভাবে কেঁপে উঠল শাহজাদী। যদি পিতা আমার সাথেই এত রেগে গিয়ে থাকে তাহলে নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে নিয়ে কী ভাবছে? তাকে মেরে ফেলবে নিশ্চয়… নিকোলাসকে সতর্ক করে দেয়া দরকার।
হ্যাঁ। কিন্তু আর চিঠি নয়। আমাকেই আপনার বার্তাবাহক হতে দিন। আপনাকে সব বলা হয়ে গেছে যা পেরেছি এখন আমি দুর্গে ইংরেজ লোকটার গৃহে গিয়ে সব জানাব। অনেক দিন থেকেই আমাকে চেনে, তাই যা বলব শুনবে।
তাকে জানিয়ে দিও এখনি যেন আগ্রা ছেড়ে চলে যায় আর ছদ্মবেশে যতদূরে সম্ভব তত দূরে, পারলে সুরাট থেকে ইংরেজদের আবাসন থেকে জাহাজে করে নিজ মাতৃভূমে। এক মুহূর্তের জন্য চোখের সামনে ভেসে উঠল এলোমেলো সোনালি চুলে ঢাকা নিকোলাসের সহৃদয় মুখখানা। উত্তরে যাবার আগে আশ্বস্ত করেছিল যে যোগাযোগ বজায় রাখবে জাহানারার সাথে। তাদের সবার জীবনেই বিশ্বস্ততার সাথে জড়িয়ে পড়েছিল লোকটা; কিন্তু জহানারার কাণ্ডজ্ঞানহীনতার কারণে আজ তার জীবন সংশয় দেখা দিয়েছে। আর তাকে জানিয়ো যে আমি দুঃখিত… ওনার কোন দোষ নেই। যাও, সাত্তি আল-নিসা, এখনি যাও! প্রার্থনা করব যেন ইতিমধ্যে দেরি না হয়ে যায়।
*
আর এক পাও এগোবে না।
ব্যক্তিগত দর্শনার্থীদের কক্ষে মুক্তো দিয়ে সেলাই করা সবুজ সিল্কের শামিয়ানার নিচে রুপার তৈরি সিংহাসনে বসে আসেন শাহজাহান। অ্যামব্রয়ডারী করা শক্ত আলখাল্লা, গলায় রুবি ও পান্না বসানো হার, আঙ্গুলে দ্যুতি ছড়ানো আঙটি দেখে জাহানারা বুঝতে পারল যে কতটা সাবধানে এই সাক্ষাৎকারের জন্য তৈরি হয়েছেন তিনি। পিতাকে খুব ভালো করেই চেনে জাহানারা। জানে যে রাজকীয় জাঁকজমকের পেছনেই তিনি লুকিয়ে রাখেন নিজের হতাশা অথবা আঘাতকে। পুরো কক্ষে আর কেউ নেই। সবগুলো দরজা লাগিয়ে দেয়া হয়েছে বেশ শক্তভাবেই। তারপরেও জাহানারার মনে হল যে পিতার পাশাপাশি যেন পুরো দরবার তাকিয়ে আছে তার দিকে বিচারকের দৃষ্টিতে।
আব্বাজান, আপনি বুঝতে পারেননি…
চুপ! অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত একটাও কথা বলবে না তুমি। জাহানারা এত কাছে দাঁড়িয়ে ছিল যে স্পষ্ট দেখতে পেল শাহজাহানের অপলক চোখের পাশের টানটান চামড়া, কুঞ্চিত মুখমণ্ডল, বুকের উপর হাপরের মত ওঠানামা করছে রত্নের সারি সিংহাসনের হাতলে সিংহের মাথার উপর দৃঢ় মুষ্টিবদ্ধ হাত। পিতার মুখ থেকে ছিটকে বের হওয়া শব্দ আর অভিব্যক্তির তীব্রতায় দুঃখিত হয়ে মেঝের দিকে চোখ নামিয়ে নিল জাহানারা।
তো লজ্জায় আমার সামনে মাথা নামিয়ে নিতে পারো তুমি। কিছুদিন আগে আমি শুনেছি যে নিকোলাস ব্যালান্টাইনকে নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলে তুমি। যেহেতু তোমাকে বিশ্বাস করি, ধরে নিয়ে ছিলাম যে এর কারণ অসাধু কিছু নয়। তোমার সম্পর্কে খারাপ চিন্তা করতে চাইনি আর তাই মন থেকে দূর করে দিয়েছিলাম এই চিন্তা। এখন বুঝতে পারছি যে ভুল করেছিলাম। অন্তত বছর দুয়েক ধরে তুমি ইংরেজ পরস্পরের মাঝে আর পত্র বিনিময় করছ আর এগুলো মোটেই সরল কিছু নয়!
আলখাল্লার ভেতর হাত ঢুকিয়ে জাহানারার সাম্প্রতিক চিঠিটা বের করে মেঝের উপর ছুঁড়ে ফেললেন শাহজাহান।
তুমি, একজন রাজকীয় মোগল শাহজাদী, সাম্রাজ্যের সম্মানীয়া শীর্ষস্থানীয় নারী; একজন পুরুষকে অনুভূতি আর বাসনার কথা লিখছ… পূর্বপুরুষদের দিন হলে তৎক্ষণাৎ তোমাকে হত্যা করা হত পরিবারের উপর কলঙ্ক লেপনের দায়ে। জাহানারা… কণ্ঠস্বর ভেঙে গেল খানিকটা, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, যা চেয়েছ সব দিয়েছি… এমনকি নিজের প্রাসাদও … আর এইভাবে প্রতিদান দিয়েছ তুমি।
জাহানারার ইচ্ছে হল চিৎকার করে বলে ওঠে যে, একমাত্র তুমিই অসদাচরণ করেছ সবসময়, আমি নই। কিন্তু জানে যে সে বলতে পারবে না কথাগুলো। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টায় ডান হাতের নখ ঢুকিয়ে দিল বাম হাতের তালুতে।
