কী বলেছে জাহানারা?
আপনার নিজেরই পড়া উচিত। এই যে।
চিঠি হাতে নিয়ে কাছাকাছি জ্বলতে থাকা একটা মশালের নিচে এগিয়ে গেলেন শাহজাহান। পৃষ্ঠা জুড়ে নাচতে লাগল কমলা আলোর শিখা। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না যা পড়ছেন, চোখের সামনে নাচতে লাগল অক্ষরগুলো। অর্থহীন মনে হল। গভীরভাবে শ্বাস ফেলে নিজেকে স্থির করে আবারো চোখ রাখলেন শব্দগুলোর উপরে। এইবার কন্যার অভিজাত লেখনী–সবসময়কার মত হালকা নীল কালিতে লেখা–বোঝা গেল পরিষ্কারভাবে, যদিও চিঠিটি ধরে রাখা হাতটা সমানে কাঁপছে।
কঠোর অনুশাসনের মাঝে থেকে, যেমন আমি রয়েছি, কীভাবে একজন নারী পুরোপুরি বুঝতে পারবে যে কী আছে পুরুষের হৃদয়ে তাদের ভাবনা, অনুভূতি, সত্যিকারের বাসনা…আপনার সাথে আমার দেখা করা দরকার…
মাথা নাড়লেন শাহজাহান। প্রেমিকের কাছে নারীর পাঠানো পত্র ব্যতীত আর কিছু কি হতে পারে এটা? কীভাবে নিজের আর তার বংশের মুখে এত বড় লজ্জার ছায়া ফেলতে পারল জাহানারা? চোখ বন্ধ করলেও সামনে ভেসে উঠল কন্যার চেহারা, আগুন লাগার আগে যেমন ছিল, ঠিক সেভাবেই হাসছে যেভাবে হাসত মমতাজ। পৃথিবীতে তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তম জিনিস হারিয়ে গেছে তাঁর স্ত্রী–এখন মেয়েটার ভাবনা চিন্তাহীন অপবিত্র কর্মকাণ্ডের ফলে হারাতে চলেছেন জাহানারাকে … কিছুক্ষণের জন্য আঙুল দিয়ে চেপে ধরে রাখলেন চোখ জোড়া। যেন এমন করলেই মন থেকে ভেসে যাবে ছবিগুলো।
আব্বাজান, আপনি ঠিক আছেন?
কথা বলার জন্য যুদ্ধ শুরু করলেন যেন শাহজাহান, আবেগের ভারে জড়িয়ে আছে শব্দগুলো। শোক আর সন্দেহ ঘুরে বেড়াচ্ছে মাথার মাঝে; কিন্তু চিঠির কথাগুলো ভুলে গিয়ে অনুভব করলেন ভিন্ন একটি জিনিস বহু বছর ধরে এমন উন্মত্তের মত আর রেগে যাননি, সম্ভবত জিম্মি হিসেবে মেহরুন্নিসা তার দুই পুত্রকে চাইবার পর থেকে আর নয়। সেসব দিনে কিছুই না করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আর নয়–তিনি একজন সম্রাট। যার একটা কথাই একশ মিলিয়ন লোকের কাছে জীবন আর মৃত্যুর সমান। কেউ না–এমনকি অসম্ভব ভালোবাসার পাত্রী কন্যাও নয় সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাঁর ক্রোধের হাত থেকে বাঁচতে পারবে না।
চোখ মেলতেই দেখতে পেলেন চেহারায় মুচকি হাসি নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে আছে রোশনারা। হাসির মত কিছু তো হয়নি। রোশনারার কাঁধে অসম্ভব ভাবে হাত রেখে নিজের দিকে টেনে আনলেন সম্রাট। ফলে নিজের থেকে মাত্র ইঞ্চিখানেক দূরে রইল কন্যার মুখ। এই চিঠি সম্পর্কে আর কেউ কিছু জানে?
মাথা নাড়লো রোশনারা। হাসি মুছে গেল চেহারা থেকে।
না। শুধু আমিই পড়েছি আর কাউকে জানাইওনি।
ভালো। তো এভাবেই থাকবে। আমি চাই না যে দরবারে তোমার ভগিনীকে নিয়ে রটনা ছড়াক। নিজের গৃহে ফিরে যাও আর এমন আচরণ কর যেন কিছুই ঘটেনি। বুঝতে পেরেছ?
বুঝতে পেরেছি, আমি। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উত্তর দিল রোশনারা। ভেবেছিল যে পিতা রেগে গিয়ে চিৎকার শুরু করবেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল প্রায় বিলম্বিত ধরনের আর চোখ জোড়া পুরোপুরি শীতল। প্রথমবারের মত উপলব্ধি করল যে যুদ্ধক্ষেত্রে পিতাকে কতটা নির্দয় দেখায় অথবা দরবারে যখন কারো বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। কী করেছে ভাবতে পেরে প্রায় অনুতপ্ত হয়ে পড়ল রোশনারা। সে তো শুধু চেয়েছিল পিতার চোখে জাহানারাকে হেয় করতে যেন আওরঙ্গজেবের জন্য যে নিন্দা করেছে সে শাস্তি পেয়ে যায় তার বোন। এখন ভেবে আতংকিত হয়ে উঠছে যে কী দুর্ভোগ ডেকে এনেছে জাহানারার উপর।
*
শাহজাদী, দয়া করে, উঠুন।
বিস্মিত হয়ে চোখ খুলতেই সাত্তি আল-নিসার উদ্বিগ্ন চেহারা তার উপর ঝুঁকে আছে দেখতে পেল জাহানারা। কী হয়েছে? আব্বাজানের কিছু হয়েছে?
না, সেরকম কিছু না। এটা আপনার ব্যাপারে। কেউ একজন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আপনার সঙ্গে। আলো ফোঁটার সাথে সাথেই সম্রাট আপনাকে দুর্গে ডেকে পাঠাবেন মনস্থির করেছেন, আপনার বক্তব্য শোনার জন্য।
মানে কী? এমনভাবে কথা বলছ যেন পিতা সন্দেহ করছেন যে আমি কোন অপরাধ করেছি। উঠে বসে মুখমণ্ডল থেকে লম্বা কেশরাজি সরিয়ে দিয়ে সাত্তি আল-নিসার কথার অর্থ বুঝতে চাইল জাহানারা।
ঠিক তাই, শাহজাদী। যদি আজ রাতে হারেমে যা শুনেছি তা সত্যি হয় তাহলে ইংরেজ লোকটাকে লেখা আপনার চিঠি পেয়ে গেছেন তিনি।
নিকোলাস ব্যালান্টাইনের কাছে লেখা আমার চিঠি? পিতা কীভাবে পেয়েছে এটা?
আমার পুরোন একজন বান্ধবী জানিয়েছে যে আপনার পরিচারিকা নাসরীন দাবি করছে যে আপনি তাকে একটা চিঠি দিয়েছেন ইংরেজ লোকটার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য; কিন্তু এর পরিবর্তে সম্রাটের কাছে পৌঁছে দিয়েছে সে। নাসরিন বলছে যে লোকটা আপনার প্রেমিক আর বিনিময়ে মূল্যবান পুরস্কার পেতে যাচ্ছে সে।
আমার প্রেমিক… হতভম্ব হয়ে সাত্তি আল-নিসার হাত চেপে ধরল জাহানারা। কিন্তু এটা তো সত্যি না। কেউ কীভাবে এরকম একটি বিষয় ভাবতে পারে… চিঠিতে এ জাতীয় কিছুই ছিল না। আমি যা বলেছি তা হল আমি আওরঙ্গজেব সম্পর্কে তার সাথে কথা বলতে চাই… উত্তরের অভিযান সম্পর্কে যেন বুঝতে পরি আর কী এমন ঘটল যাতে আমার ভাই এরকমটা করল।
এখনো মাথা ঘুরছে, এই অবস্থায় উঠে দাঁড়াল জাহানারা। বেশ গরম পড়েছে বাইরে। তারপরেও প্রথমবারের মত হতাশায় মুষড়ে পড়ে চমকে গিয়ে ভাবলো যে অন্যরা কী ভাবছে তাকে নিয়ে। এত পরিণামদর্শী কীভাবে হল সে? কিন্তু এটাও কখনো আশা করেনি যে তার কোন ভৃত্য এতটা ছলনাময়ী হবে। যাই হোক, নিজেকে শান্ত করতে চাইল জাহানারা, আব্বাজান যখন বুঝতে পারবেন যে ভাইকে নিয়ে উদ্বিগ্নতার কারণেই এমনটা লিখেছে সে তাহলে নিশ্চয় তাকে ক্ষমা করে দেবেন… আর ক্ষমা করার কিই বা আছে সেখানে?
