নিজের বিক্ষত গালের উপর হাত বোলালো জাহানারা। আগুন লেগে গিয়ে পুড়ে যাবার পর সেই ভয়ানক দিনগুলিতে তাড়াতাড়ি করে দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরে এসেছিল আওরঙ্গজেব অসুস্থ ভগিনীর পাশে থাকার জন্য। স্নেহময়ী এই ভাই-ই কি হয়ে গেছে নিকোলাসের ধারণানুযায়ী বহুদূরের, নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত একজন মানুষ? এখন ভেবে ভেবে উপলব্ধি করল জাহানারা যে নিজের সম্পর্কে কত কম বলেছে আওরঙ্গজেব। একসাথে বহু সময় কাটানোর পরেও নিজের উচ্চাকাঙ্খ অনুভূতি নিয়ে কিছুই প্রকাশ করেনি তার ভাই। যেমনটা নিকোলাস বর্ণনা করল যদি সত্যিই আওরঙ্গজেব তেমন একজন মানুষ হয়ে থাকে, তাহলে কী এমন ঘটেছে যে এমন বদলে গেল সে? মার্বেল বা গ্রানাইটের মত কোন তিক্ততার বীজ কি বয়ে চলেছে তার শিরায়, ঠাণ্ডা আর কঠিন, একেবারে গভীরে না খোঁড়া পর্যন্ত খুঁজে পাবে না তুমি? পিতা-মাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে আর একজন বোন যে কিনা তাকে ভালোবাসে। এটা তার দায়িত্ব যে খুঁজে বের করা… মায়ের কাছে দায়ী রইবে সে, কেননা যদি মা বেঁচে থাকতেন নিশ্চয়ই পুত্রের মনের মাঝে প্রবেশ করে সত্যি উদ্ঘাটন করতে পারতেন।
নিজের ডেস্কে পা ভাঁজ করে বসে কলম তুলে নিয়ে নিকোলাসকে চিঠি লিখতে শুরু করল জাহানারা।
‘চিঠির জন্য ধন্যবাদ। যদিও বেশ বেদনাদায়ক এটি আমার জন্য। কঠোর অনুশাসনের মাঝে থেকে যেমন আমি রয়েছি, কীভাবে একজন নারী পুরোপুরি বুঝতে পারবে যে কী আছে পুরুষের হৃদয়ে তাদের ভাবনা, অনুভূতি, সত্যিকারের বাসনা। আপনি যা জানিয়েছেন তাতে উদয় হয়েছে আরো অসংখ্য প্রশ্নের আর তাই আরো বিশদ না জানা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছি না আমি। আপনার সাথে আমার দেখা করার দরকার। আগেও যেমনটা এসেছেন তেমনিভাবে আগামীকাল সন্ধ্যায় আমার প্রাসাদে আসুন।‘
মোমবাতির উপর মোমের টুকরো গলিয়ে লাল মোমের ছোট্ট একটা গলিত পুকুর দিয়ে চিঠির উপরে সিল বসিয়ে দিল জাহানারা। গলিত মোমের উপর ব্যবহার করল মায়ের আইভরি সীলমোহর। নিজের সেবাদাসীকেই চিঠিটা দিত সে, কিন্তু সেই দাসীর কন্যা প্রথম দৌহিত্রের জন্ম দিয়েছে শহরে আর সেখানে বেড়াতে গেছে জাহানারার দাসী। এইবার তাই অন্য কারো উপর ভরসা করতে হবে।
নাসরিন! সেবাদাসীকে ডেকে পাঠালো জাহানারা। জলদি এসো। তোমার জন্য একটা কাজ আছে।
*
যেমনটা প্রায়শই করে থাকে আজ সন্ধ্যাতেও বিরক্ত না করার আদেশ জারি করেছেন তার পিতা। কিন্তু হাতে মসৃণ আইভরি রঙের কাগজের টুকরোটা প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে রোশনারাকে।
পিতার জন্য এমন তথ্য পেয়েছি যা অপেক্ষা করার মত নয়। রাজকীয় হারেম থেকে সম্রাটের গৃহে যাবার প্রধান প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে থাকা তুর্কী নারী প্রহরীকে জানালো রোশনারা। তুর্কী প্রহরী আঁটসাট চামড়ার ফতুয়া পরনে চওড়া কাঠ আর পেশীবহুল প্রহরীকে দেখাচ্ছে ঠিক একটা পুরুষের মত। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে তারপর মাথা নত করে কুর্নিশ করল। ইশারা পেতেই রুপালি পালিশ করা জোড়া দরজা খুলে মেলে ধরা হল রোশনারার জন্য। লম্বা একটা করিডোরে মশালের আলোয় দেখা গেল শেষ মাথায় দ্বিতীয় জোড়া দরজা ও একইভাবে পাহারা দিচ্ছে তুর্কি হারেম প্রহরীরা।
প্রহরীদের নেতাকে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢোকার আগে খানিকটা সময় নিল রোশনারা। টারকোয়েজ সিল্কের আলখল্লার প্রান্তদেশ গড়াতে লাগল মেঝের উপর। যাই হোক, এমনিতেই অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছে সে… বস্তুত এ চিন্তাও মাথায় এসেছিল যে হয়ত নাসরিন কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আনতে পারবে না। কিন্তু শেষপর্যন্ত পুরস্কৃত হল ধৈর্য। অবশেষে এমন কিছু পেয়েছে সে যাতে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে জাহানারাকে আর পিতার কাছেও প্রমাণ হয়ে যাবে যে রোশনারার সন্দেহ অমূলক ছিল না।
প্রহরীদের নেতা দ্বিতীয় দরজার গায়ে কি কি করে খোঁজা হারেম প্রহরীকে জানালো যে পিতার কাছে জরুরি প্রয়োজনে এসেছেন শাহজাদী রোশনারা। অপেক্ষা করছে রোশনারা।
কয়েক মুহূর্ত পরেই যমুনার দিকে তাকিয়ে থাকা পিতার পরিচিত কামরাতে পা রাখল শাহজাদী। প্রায়ই রাতের মত আজ রাতেও ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন শাহজাহান। প্রায় পূর্ণচন্দ্রের আলোতে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন যমুনার ওপারে মমতাজের সমাধিসৌধের দিকে।
কী হয়েছে রোশনারা? ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে, কিন্তু এত রাতে বিরক্ত করার জন্য কোন ভর্ৎসনা নেই কণ্ঠে।
আমার মনে হয়েছে যে এটা আপনার দেখা দরকার পিতা। কাগজের টুকরাটা বাড়িয়ে ধরল রোশনারা।
কী-এটা?
নিকোলাস ব্যালান্টাইনের কাছে জাহানারার পত্র। গতকাল জাহানারা তার পরিচারিকা নাসরিনের কথা আগেও আপনাকে বলেছি আমি–ওকে জানিয়েছে গোপনে এটি নিকোলাসের কাছে পৌঁছে দিতে। এই পুরুষের সাথে তার মনিবানি গোপন কোন যোগাযোগ করছে আর সাহায্য করার দায়ে সেও অভিযুক্ত হবে, এই ভয়ে পত্রখানা এনে আমার হাতে তুলে দিয়েছে নাসরিন। প্রথমে আমি বুঝতে পারছিলাম না যে কী করব। তারপরেই মনে পড়ে গেল যখন আপনাকে বলেছিলাম যে নিকোলাস জাহানারার প্রাসাদে তার সাথে দেখা করেছে আপনি বলেছিলেন আমি সঠিক কাজটিই করেছি। আমি তাই পত্রখানা খুলে ফেললাম। আশা আর বিশ্বাস ছিল যে কিছুই খুঁজে পাব না। কিন্তু স্বীকার করছি এর ভাষ্যে শোকাভিভূত হয়ে গেছি আমি। বুঝতে পেরেছি তৎক্ষণাৎ আপনার কাছে এটি নিয়ে আসা আমার দায়িত্ব।
