বাবার সাথে আরেকবার কথা বলবে আর এবার এমনভাবে যেন সে শুনতে বাধ্য হন। আর আমাকেও জানাবে… সবকিছু জানা প্রয়োজন যেন প্রস্তুতি নিতে পারি। এ ব্যাপারে তোমাকে কি বিশ্বাস করতে পারি? কাউকেই সহ্য করব না আমি–জাহানারাকেও না–যদি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে।
.
২.৫
অতি ধীরে আরেকবার নিকোলাস ব্যালান্টাইনের চিঠি পড়ল জাহানারা। প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বার পড়লে একটু স্বস্তি খুঁজে পাওয়া যাবে, ভেবে থাকলে নিরাশ হল সে। কীভাবে এত ভুল হয়ে গেল ব্যাপারগুলো? যতবার চেষ্টা করল, কিছুই বুঝতে পারল ন। এত তড়িঘড়ি করে আওরঙ্গজেবকে দাক্ষিণাত্যে ফেরত পাঠালেন শাহজাহান যে ভাইয়ের সাথে দেখা করার কোন সুযোগই পেল না সে। একাকী কথা বলে উত্তরের অভিযান সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের নিজস্ব মতামতও শোনা হল না। পিতার সামনে আওরঙ্গজেবের প্রসঙ্গ তোলার চেষ্টা করলেও ঠোঁট চেপে বসে এমন এক গোঁয়ারের মত আচরণ করলেন শাহজাহান যে, জাহানারা বিস্মিত আর হতাশ হয়ে গেল।
দারার ধারণা আওরঙ্গজেবকে নিয়ে চিন্তা করে ভুল করছে জাহানারা। তার ধারণা, তার মাথা গরম, কিন্তু হৃদয় শীতল। একমাত্র শক্ত কোন শাস্তি পেলেই সে বুঝতে পারবে। পিতাকে তাই বলেছি আমি। কথাগুলো বলার সময় কেমন কঠোর দেখাচ্ছিল দারাকে। হয়ত তার প্রাসাদে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে এখনো আওঙ্গজেবকে সত্যিকারভাবে ক্ষমা করতে পারেনি সে।
অন্তত নিকোলাস ব্যালান্টাইন আছে যার কাছে নিজের উদ্বিগ্নতা তুলে ধরতে পারে জাহানারা। যেমন করে নিজের কথার প্রতি সম্মান রেখে মুরাদের সম্পর্কে জানিয়েছে, তেমনি খোলামেলা আর বিশ্বস্ততার সাথে এবার আওরঙ্গজেব ও হিন্দুকুশের প্রতিবন্ধকতা নিয়েও চিঠি লিখেছে।
খুব দ্রুতই জাহানারার পাঠানো চিঠির উত্তরে আগ্রা দুর্গের মাঝে বাস করা নিকোলাস জানিয়েছে আওরঙ্গজেব ও অভিযানে ব্যর্থতার কারণ নিয়ে। শুধু যদি পত্রের মাঝে এমন কিছু খুঁজে পেতে যাতে করে নিজের ভাইকে আরো একটু ভালোভাবে বুঝতে পারত… চোখ মেলে আবারো চিঠির সবচেয়ে দুঃশ্চিন্তার অংশে চলে গেল মন–অভিযানের শুরুতেই ঘটে যাওয়া একটা খণ্ডযুদ্ধ নিয়ে নিকোলাসের বক্তব্য।
‘যদিও এই ওতপাতা যুদ্ধ অনেকগুলোর মাঝে মাত্র একটা অপ্রত্যাশিত আর সচরাচর যেগুলো হয় সেগুলোর তুলনায় শক্তিশালী ছিল, আমাদের উচ্চমানের শৃঙ্খলা আর উন্নত ধরনের অস্ত্র বিজয় করে তোলে সুনিশ্চিত, অন্তত আমার তাই মনে হয়। আপনার ভাই একজন জাত যোদ্ধা কোন কাপুরুষ নন এটা নিশ্চিত নিজের দেহরক্ষীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিলেন দুইশ গজ দূরে একটু চূড়া মতন জায়গা থেকে নিচে আমাদের উপর গুলিবর্ষণ করতে থাকা কাফিরদের দিকে। আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমার কয়েকজন সৈন্য নিয়ে চক্রাকার ব্যুহ গড়ে তুলি সাহায্য করার জন্য। চলার জন্য প্রস্তুত আমরা, তলোয়ার খাপ ছেড়ে বাইরে এসেছে, জোরে জোরে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ড, ঘোড়ার খুরে কেঁপে উঠছে মাটি। আশা করছি যে কোন মুহূর্তে ইশারা করবেন শাহজাদা; পরিবর্তে তিনি এমন একটি কাজ করলেন যে বিস্মিত না হয়ে পারলাম না আমরা।
কয়েক মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ করেই ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন আওরঙ্গজেব, ব্যাগ থেকে বের করলেন কিছু একটা। ভাঁজ খুলতেই দেখা গেল একটি নামাজের জায়নামাজ। দেহরক্ষীরা চারপাশে ঘিরে দাঁড়ালে পর ভূমিতে জায়নামাজ পেতে তার উপরে হাঁটু গেড়ে নামাজ পড়তে লাগলেন আওরঙ্গজেব। সামনে ঝুঁকে জায়নামাজে কপাল ঠেকিয়ে তারপর বারংবার উঠ-বোস। আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্যের অবস্থান দেখে আমি নিজে বুঝতে পারলাম যে তখন সান্ধ্য নামাজের সময়।
ততক্ষণে আমাদের চারপাশে নাচানাচি শুরু করেছে উড়ন্ত গুলি আর তীর। আমরা অপেক্ষা করতে থাকলাম মৃত আর আহতদের মধ্যে মারা গেছে শাহজাদার সৈন্য প্রধান। কিন্তু তাদের চিল্কারেও কোন প্রতিক্রিয়া হল না আপনার ভাইয়ের। তাড়াহুড়া না করে শান্তভাবে নামাজ পড়ে যেতে লাগলেন তিনি। শেষ হলে জায়নামাজ গুটিয়ে জায়গামত ব্যাগে রেখে ঘোড়ার পিঠে চড়ে আক্রমণের আদেশ দিলেন, যেন মাঝখানে কিছুই ঘটেনি। তারপরেও শত্রুকে পিছু হটতে বাধ্য করেছি আমরা। সেই সন্ধ্যায় মোল্লারা, সবসময়কার মত সেনাবাহিনীর সাথে পথ চলছে, পাশাপাশি তাঁবু বানানো হয়েছে, শাহজাদার ধর্মানুরাগ আর সাহসের প্রশংসা করে জানাল যে এই দুইয়ের কল্যাণেই বিজয়ী হবেন তিনি। যাই হোক, অন্যরা সত্যিকার অর্থে আমি আর অশোক সিংও মর্মাহত হয়েছিলাম। যুদ্ধের ময়দানে একজন সেনাপতির নামাজ পড়তে বসে যাওয়া যতটা ধর্মীয় আর সাহসী ততটাই হঠকারীতাও বটে। বেহেশতে নিজের স্থান গড়তে যতটাই আগ্রহী হোন না কেন, তাঁর কোন অধিকার নেই পৃথিবীতে মানুষের প্রাণ নিয়ে অপরিণামদর্শী হবার।
এরপর থেকে হতাশা বেড়ে যায় সবার মাঝে, বিশেষ করে আপনার স্বধর্ম নয় এমন সৈন্যদের মাঝে। আমার সন্দেহ আপনার ভাই জানতেন যে নিজের লোকদের বিশ্বাস হারিয়েছেন তিনি। ফলে দেখা গেল কর্মকর্তাদের আর কোন পরামর্শই চাইতেন না। স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিল তাঁর আদেশগুলো মাঝে মাঝে অযৌক্তিক_নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দিয়ে সৈন্যদের বিশ্বস্ততা আদায় করতে চেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর মনোবল ধরে রাখতে সম্ভব সবকিছু করেছেন অশোক সিং, কিন্তু তার মৃত্যুর পরে ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও বেশ দুঃখ পেয়েছি;; বারবার মনে হচ্ছে যদি কিছু করতে পারতাম তাকে রক্ষা করার জন্য। আমার মনে হয় আপনার ভাইয়ের মনে সন্দেহ জাগে যে দীর্ঘ আর বিপজ্জনক অভিযান জুড়ে সেনাবাহিনীকে একত্রে ধরে রাখার ক্ষমতা নেই তাঁর আর আমার বিশ্বাস এ কারণেই অভিযান পরিত্যগ করেছেন তিনি। আমি অন্যান্য যেসব সেনপ্রধানের অধীনে কাজ করেছি, তেমন নন তিনি। অত্যন্ত কঠোর আর শীতল তাঁর মনে কী আছে বলা কঠিন আর আমার ধারণা কিছু নিশ্চয় আছে।‘
