পৃথিবী যদি তাকিয়ে না থাকত, তাহলে তোমাকে সাম্রাজ্যের একেবারে দূরতম কোণে উধাও করে দিতাম নয়ত মক্কায় পাঠিয়ে দিতাম হজ করতে যেহেতু তুমি প্রার্থনা এত ভালোবাসা। কিন্তু আমার রাগের মাত্রা বুঝে ফেলার সন্তুষ্টি দিতে চাই না শত্রুদেরকে। দাক্ষিণাত্যে তোমার পূর্ব পদে ফিরে যাবে তুমি; কিন্তু তোমার আচরণের উপর নজর রাখব আমি। অন্তত এখন সেখানে শান্তি বজায় আছে সর্বত্র। তাই তোমার সামর্থ্যের বাইরে কোন সামরিক হুমকি মোকাবেলা করতে হবে না। এক সপ্তাহের মাঝেই রওনা দেবে। এখন যাও।
*
তিনি কখনো আমাকে বা আমার উচ্চাকাঙ্খকে বুঝতে পারেননি, কেননা আসলে কখনো বুঝতেই চাননি। মাথা নাড়ল আওরঙ্গজেব।
কিন্তু অন্তত সম্রাটের প্রতিনিধি হিসেবে তোমাকে দাক্ষিণাত্যে ফেরত তো পাঠাচ্ছেন। আগ্রা দুর্গের ছাদে দাঁড়িয়ে ভাইয়ের আরেকটু কাছে সরে এসে কাঁধে হাত রাখল রোশনারা।
নিজের মুখ বাঁচাতে করেছেন–আমার জন্য নয়। কেন অভিযান ব্যর্থ হয়েছে সেদিকে কোন আগ্রহ নেই–আগ্রহ শুধুমাত্র মানুষ কী ভাববে তা নিয়ে। আমি নিশ্চিত দারা আমার বিরুদ্ধে কিছু লাগিয়েছে। আমাকে বেশি না ঘটানোর ব্যাপারে তাদের দুজনেরই উচিত সাবধান হওয়া।
তুমি হয়ত ঠিকই বলেছ, দারা নিশ্চয়ই কিছু বলেছে তোমার বিরুদ্ধে। যখন তুমি ছিলে না, একসাথে বহু সময় কাটিয়েছে তারা। জাহানারাও প্রায় তাদের সাথে থাকত, একা লাগত নিজেকে আমার।
জ্যেষ্ঠ ভগিনীর নাম নিতেই নরম হয়ে গেল আওরঙ্গজেবের চেহারা। রোশনারার মনে হল আওরঙ্গজেব সবসময় বড় বোনকে বেশি পছন্দ করে। কিন্তু সময় এসেছে তাকে জানানোর যে বড় বোনও তার চেয়ে দারার পক্ষই বেশি নেবে। কিন্তু যদি চায় তাহলে মিত্র হতে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে রোশনারা। সম্ভবত সময় এসেছে তাকে জানানোর যে আওরঙ্গজেব যতটা ভাবছে সাম্রাজ্যের সম্মানীয়া শীর্ষস্থানীয় নারী ঠিক ততটা ত্রুটিহীন নয়।
নিকোলাস ব্যালান্টাইনও তোমার সাথে আগ্রা ফিরে এসেছে, তাই না?
হ্যাঁ। ফেরার সময়ে শেষপর্যায়ে পায়ে আঘাত পেয়েছে, সেরেও গেছে। কেন জানতে চাইছ?
কেননা মুরাদ অভিযানে বের হবার ঠিক আগমুহূর্তে একটা ঘটনা ঘটেছে। নিকোলাস ব্যালান্টাইন জাহানারার সাথে তার প্রাসাদে দেখা করেছে। তারপর থেকেই পরস্পরের কাছে চিঠি লিখছে তারা, এমনকি যখন তোমার হয়ে যুদ্ধ করছিল তখনো…
এটা হতেই পারে না… কে বলেছে তোমাকে? কীভাবে জানো তুমি? বিস্মিত হয়ে গেল আওরঙ্গজেব।
আমার প্রাক্তন এক সেবাদাসী এখন তার কাজ করে। সেই-ই আমাকে জানিয়েছে যে কী ঘটছে। পিতার সাথে কথা বলতে চেষ্টা করেছি এটা নিয়ে। কিন্তু তুমি জানো জাহানারাকে নিয়ে কী ভাবেন তিনি, বিশেষ করে আগুনের ঘটনার পর থেকে। কিন্তু কেই বা জানে তাদের পত্র বিনিময়ের আসল উদ্দেশ্য কী? আমি বলছি না যে সত্যিই কোন অনর্থ । ঘটছে কিন্তু এমনটা কি হতে পারে না যে নিকোলাস আমাদের পদ্ধতি বুঝতে না পারলেও জাহানারাকে অভিযানের সময়ে তোমার আচরণ সম্পর্কে তথ্য দিয়েছে আর এ তথ্য কাজে লাগিয়ে দারাকে সাহায্য করেছে পিতার কাছে তোমার বিরুদ্ধে লাগাতে।
জাহানারা কখনো এমন কিছু করবে না।
তুমি নিশ্চিত? পিতার বয়স বাড়ছে। হতে পারে ইতিমধ্যেই তিনি ঠিক করে ফেলেছেন যে সময় আসছে, তাকে ভাইদের মধ্য থেকে একজন কাউকে বেছে নিতে হবে। যদি তিনি চান যে দারাই হবে পরবর্তী সম্রাট, তাহলে সাধ্যমত সব কিছু করবে দারাকে সাহায্য করতে। এটার মানে এই না যে জাহানারা তোমার শত্রু হয়ে গেছে–আমি জানি তুমি তাকে কতটা পছন্দ কর, আমিও। কিন্তু ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির মোহ মানুষকে বদলে দেয় আর আমার বিশ্বাস তাকেও বদলে দিয়েছে। তাকে তো আমার আর গওহর আরার মত হারেমে থাকতে হচ্ছে না, নিজের গৃহস্থালি আর প্রাসাদ পেয়েছে। আনন্দ আয়োজনের ব্যবস্থাও করতে পারছে। আর তার ঔদ্ধত্বের আরেকটা প্রমাণ হল ইংরেজটার সাথে সম্পর্ক। সে ভাবছে আমাদের সবাইকে আটকে রাখা নিয়ম না মানলেও চলবে তার।
শুধুমাত্র প্রথা নয়, ধর্মীয় নীতিও এতটা অভদ্রতার অনুমতি দেয় ন। আস্তে করে জানালো আওরঙ্গজেব।
এতটা রাগ করো না। আমি নিশ্চিত যে ভাই হিসেবে তোমাকে ভালোভাসে সে। কিন্তু সিংহাসনের জন্য দারাকে পছন্দ করে। হেসে ফেলল রোশনারা, কিন্তু উত্তর পেল না আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে। মাটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আওরঙ্গজেব। জাহানারার কাছে তার অবস্থান দারার নিচে ভাবনাটা বেদনাদায়ক। যদি সে কখনো এটা নিয়ে ভাবতেও, তাহলে ধারণা করত যে জাহানারা নিশ্চয়ই সকলকে সমানভাবে ভালোবাসে। তারপরেও যত গভীরভাবে ভাবছে ততই বুঝতে পারছে যে রোশনারার কথাই সঠিক। যতবার তাদের মাঝে কথা কাটাকাটি হয়েছে ততবার জাহানারা দারার পক্ষ নেয়নি? দারার দর্শন সম্পর্কে আগ্রহকে বাহবা দেয়নি? যদি সময় আসে তাহলে আওরঙ্গজেবের কঠোর আর কট্টর শাসনামলের চেয়ে দারার দুর্বল আর ঢিলেঢালা শাসনই বেশি পছন্দ করবে না? চিন্তার মাঝে রোশনারার নরম স্বর অনুপ্রবেশ করে আরো তিক্ত আর সন্দেহগ্রস্ত করে তুলল আওরঙ্গজেবকে। যদি আমি ইংরেজটার সাথে জাহানারার সম্পর্কের আর কোন প্রমাণ পাই তাহলে কী করব?
