আর এই সাম্প্রতিক সংবাদ। খোঁড়া সমরকন্দ অভিযানের সুযোগ নিয়ে কান্দাহারের বিপক্ষে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছে পারস্যের শাহ। আর মাত্র সাতান্ন দিন অবরোধের পর মেরুদণ্ডহীন মোগল প্রহরীরা দুর্গের ফটক খুলে দিয়েছে বিজয়ী পারসীয়দের জন্য। যতই ভাবছেন ততই রেগে যাচ্ছেন আওরঙ্গজেবের উপর। এখন অপেক্ষা করছেন পিতার জরুরি আদেশে গতরাতে আগ্রাতে ফিরে আসা আওরঙ্গজেবের সাথে কথা বলার জন্য। মুরাদের ব্যর্থতার তুলনায় আওরঙ্গজেবের ব্যর্থতাকে ক্ষমা করা কঠিন হচ্ছে, কেননা সে তো আরো বেশি অভিজ্ঞ ছিল।
আসলে দারা যা বলেছে তাই-ই ঠিক… নিজের সক্ষমতা নিয়ে একটু বেশিই উচ্চ ধারণা ছিল আওরঙ্গজেবের, এখন তাই খামতিগুলো বাজেভাবে চোখে পড়ছে। শাহজাহানও তাকে একই কথাই জানাবেন।
শাহজাদা আওরঙ্গজেবকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। কর্চিকে ডেকে আদেশ দিলেন শাহজাহান।
পাঁচ মিনিট পরে নিজের সাদাসিধে পোশাকে পিতার সামনে এসে হাজির হল আওরঙ্গজেব। তার ভাবভঙ্গি, ঋজু কাঁধ, উন্নত মস্তকের উপর একনজর চোখ বুলিয়েই শাহজাহান বুঝতে পারল যে নম্র বা অনুতাপ তো নয়ই বরঞ্চ যুদ্ধের অভিপ্রায় নিয়েই এসেছে আওরঙ্গজেব, এতে আরো রেগে গেলেন তিনি।
তো, নিজের স্বপক্ষে কী বলতে চাও তুমি? একাকী হতেই ত্বরিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন শাহজাহান।
পর্বতের মরু খাদের জন্যই আমাদের পরাজয় ঘটেছে। কয়েকটা ভারী কামান টেনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হলেও, অস্ত্রবাহী গাড়িগুলোর চাকা ভেঙে গিয়েছিল আর বেশিরভাগ তো খুঁড়ো হয়ে গিয়েছে পাথুরে ভূমিতে।
তাই তুমি গাড়ি ঠিক করার ব্যবস্থা না করে কামান ছেড়ে চলে এসেছে!
হ্যাঁ, আর কোন বিকল্প দেখি নি আমি। মেরামতের জন্য সময় লাগতো আর ক্ষতিও বারবার হত। এছাড়া অস্ত্রের জন্য চলার গতিও কমে গিয়ে অর্থহীন অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কিন্তু একবার পর্বত থেকে বের হয়ে সমতল ভূমিতে যেতে পারলেই তো আর অর্থহীন থাকত না সেগুলো। সাধারণ গোত্রের মানুষেরা কীভাবে গোলা-বারুদ বহন করে? আরো শক্তভাবে চেষ্টা করা উচিত ছিল তোমার। কামানের সহযোগিতায় এতদিন অক্সাসের ওপারে পৌঁছে যেতে তুমি!
আমার বিবেচনাতে অক্সাস পর্যন্ত এগুলোকে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল, আব্বাজান।
এগুলোকে ছাড়াই এগিয়ে যাবার কথা একবারও ভেবেছিলে তুমি? না! আদেশের অবাধ্যতা করে পালিয়ে এসে কলঙ্ক লেপে দিয়েছো আমার আর মোগল সেনাবাহিনীর উপর। তাই বিস্মিত হবার কিছু নেই যে অশোক সিং–ভালো বন্ধুই শুধু নয়, আমার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আর বিশ্বস্ত জেনারেল মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করেছে।
এই আচরণকে সম্মানযোগ্য বলছেন আপনি? বেঁচে থেকে আবার যুদ্ধের চেষ্টা না করে অপ্রয়োজনে আত্মদান করাটাকে বোকামি ছাড়া আর কিছু বলব না আমি। তিনি যাই ভেবে থাকুন না কেন আমার পদক্ষেপই সঠিক ছিল। অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করতে গিয়েই বিলম্ব হয়ে গেছে আমাদের। শত্রুরা জানত যে আমরা আসছি আর তাই প্রতিদিন শয়ে শয়ে এসে জড়ো হচ্ছিল পরাজিত করার উদ্দেশ্যে। আধুনিক অস্ত্রের অভাব সংখ্যায় বেড়ে গিয়ে পূর্ণ করার চেষ্টা করছিল তারা। আমি অস্ত্র এগিয়ে নিতে পারছিলাম না। আর তাই অস্ত্র ছাড়া নিজের লোকদের ঝুঁকির মধ্যেও ফেলতে চাইনি আমি।
এমনটা তো নাও হতে পারত। কতজনকে হারিয়েছ তুমি?
প্রায় বিশ হাজার যুদ্ধে পাঁচ হাজার আর ঠাণ্ডা ও রোগের প্রকোপে পনের হাজার। কয়েক বছরের তুলনায় শীত আর তুষারপাত শুরু হয়েছিল তাড়াতাড়ি…আব্বাজান, একবারের জন্য হলেও বিশ্বাস করুন আমাকে। যা যা সম্ভব আমি করেছি। সবকিছুই আমার বিরুদ্ধে ছিল আর সৈন্যরাও অধৈর্য হয়ে পড়েছিল। আত্মপ্রত্যয়ের অভাব ছিল বিশেষ করে যারা সমভূমি থেকে এসেছিল মরুভূমিরও ছিল অনেকে। আমার প্রচেষ্টা ব্যতীত ক্ষয়ক্ষতি আরো বেশি হত।
কিছুই তোমার অপরাধ নয়, অন্য কারো, তাইত? সবসময় এটাই তো তোমার অজুহাত। আমার প্রতি কোন শ্রদ্ধাই নেই তোমার, না তোমার পিতা হিসেবে, না সম্রাট হিসেবে। নিজের মন্তব্য আর দক্ষতার উপর অগাধ আস্থা। এতটা বাজেভাবে আমাকে হতাশ করেছ, যা ঘটা সম্ভব বলে কখনো ভাবিইনি। তার উপরে আবার বহু প্রাণহানি হয়েছে– অশোক সিং সহ।
বারবার অশোক সিংয়ের নামে কেন তি? রাজপুতেরা আমাদের মত নয়–তাদের বিশ্বাসে গলদ আছে আর গরিমা তো সহ্যই করা যায় না। অহেতুক ঝামেলা না করে আমার আদেশ মান্য করে, পিছু হটায় সাহায্য করলেই সাম্রাজ্যের জন্য দায়িত্ব পালনে সার্থক হত।
তোমার সাহস কত বড় যে রাজপুত গরিমা নিয়ে কথা বল! রাজপুতদের সাহস আর বিশ্বস্ততা নিয়ে কোন প্রশ্নই ওঠে না আর মোগলদের বহু কীর্তিমান অভিযানের পেছনে তাদের হাত রয়েছে। জিহ্বাতে লাগাম দিয়ে আমার কথা শোন। আমি তোমাকে একান্তে ডেকে পাঠিয়েছি কেননা যা বলতে চাই তা সর্বসমক্ষে বললে আমাদের পরিবারের সম্মান কমত বৈ বাড়ত না। দুর্বল হিসেবে তোমাকে অভিযুক্ত করতে হবে কখনো ভাবিনি আমি। কিন্তু একমাত্র তুমি আর কেউ নয়, দুর্বল হিসেবে প্রতিপন্ন করেছ আমাদের রাজবংশকে। তোমার কারণে কান্দাহারের দেয়ালের উপর থেকে হাসতে হাসতে আমাদের উপর মূত্র বিয়োগ করছে পারসীয়রা…।
বুঝতে পারছি আপনি মনস্থির করে ফেলেছেন। এটা দুর্বলতা নয়, শক্তিমত্তার বহিঃপ্রকাশ যে কখন আপনি বুঝতে পারবেন উচ্চাকাঙ্খকে স্থগিত রেখে পুনরায় কীভাবে আর কখন তার পিছু নিতে হবে। তো আপনার ইচ্ছের কাছে মাথা নত করছি। আমাকে নিয়ে কী করতে চান?
