কী ঘটেছে গিরিপথে? উপরের পাথরে লুকিয়ে থাকা বন্দুকধারীরা কি এখনো গুলি করছে প্রধান সৈন্য সারির উপর, যেমনটা তারা করেছিল অগ্রগামী দলের উপর? শাহজাদা কি আমাদেরকে সাহায্যের জন্য ডেকে পাঠাচ্ছেন? জানতে চাইল অশোক সিং। গলার স্বরে ক্রোধ আর অবিশ্বাস।
মাথা নাড়ল কর্চি। আমি যখন এসেছি ততক্ষণে, উঁচু জায়গার বেশির ভাগটাই আমাদের দখলে চলে এসেছিল।
তাহলে আমি পিছু হটব কেন? সামরিকভাবে এর কোন মানে হয় না। সঠিক কোন কারণ ছাড়া এখন পিছু হটা আমার আর এ ভূমি রক্ষার্থে আত্মদান করা আমার সৈন্যদের স্মৃতির পক্ষে সম্মানহানিকর।
আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে এগুলো শাহজাদার আদেশ আর তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যেন তৎক্ষণাৎ মান্য করা হয়।
গভীর চিন্তায় মগ্ন নিপ অশোক সিংকে দেখে অস্বস্তির সঙ্গে একে অন্যের দিকে তাকাল নিকোলাস আর কর্চি। এবারই প্রথম না যে জ্যেষ্ঠ সেনাপ্রধান না হয়ে খুশিই হয়েছে নিকোলাস, কাঁধের উপর তাই এতবড় দায়িত্বের বোঝাও নেই। কয়েক মুহূর্ত আগেও সতীর্থের মত সমানভাবে বিজয়ের আনন্দ ভাগ করে নিয়েছে দুজনে। কিন্তু এখন সে একজন অধঃস্তন মাত্র, অপেক্ষা করছে নির্দেশের।
শাহজাদা যদি আমাকে পিছু হটার নির্দেশ দিয়ে থাকে, তাহলে আমাকে অবশ্যই তা মানতে হবে। আস্তে করে কথাটা বলেই আবার গলা চড়াল অশোক সিং। বলে উঠল, কিন্তু আমার উপর শাহজাদার প্রথম আদেশ ছিল গিরিপথের বাইরের দিকটা শত্রুমুক্ত করা আর এখনো শেষ হয়নি এ কাজ। যেহেতু এই আদেশ প্রথমে পেয়েছি আমি, তাই এটাই শেষ করব আগে।
অশোক সিং কি করতে যাচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই নিকোলাস দেখতে পেল নিজের তলোয়ার হাতে নিয়ে নিজের লোকদের উদ্দেশে রণহুঙ্কার ছাড়ল রাজপুত। এরপর সাদা ঘোড়র গায়ে জুতা দিয়ে চাপড় দিয়ে ছুটে গেল যুদ্ধরত খানেদের দিকে। এমনকি নিজের দেহরক্ষীদের জন্যও অপেক্ষা করল না। তবে কী ঘটেছে বুঝতে পেরে সাথে সাথে নিজেদের ঘোড়া ছোটাল অশোক সিংয়ের দেহরক্ষীরা। নিকোলাস নিজেও ঝেরে ফেলল সব দ্বিধা। পাথুরে জমির উপর দিয়ে ছুটতে ছুটতে এক হাতে লাগাম আর অন্য হাতে তলোয়ারের হাতল ধরে চেষ্টা করল সামনে কী হচ্ছে দেখতে। কিন্তু দৃষ্টি বাধা পেল আরো কয়েকজন অশ্বারোহী থাকাতে। হঠাৎ করেই খানিকটা ফাঁক পাওয়া গেল, কেননা রাস্তার মাঝে পড়ে থাকা পাথর এড়াতে দুপাশে সরে গেল দুই রাজপুত সেনা। অশোক সিংয়ের সাদা ঘোড়া এক পলকের জন্য চোখে পড়ল। রাজপুত শাহজাদা প্রায় পৌঁছে গেছে যুদ্ধস্থলে কিন্তু দেহরক্ষী এখনো খানিকটা দূরে। এরপরই আরেকট জিনিস নজরে পড়ল : বাতাসে শিষ কেটে শাহজাদার দিকে এগিয়ে আসছে একটা বর্শা। অবচেতনেই চিৎকার করে উঠে নিকোলাস। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে হারিয়ে গেল তার সাবধানবাণী। বর্শাটা এসে বিধে গেল অশোক সিংয়ের গলায়। আঘাতের জায়গায় হাত দিয়ে আস্তে করে ঘোড়া থেকে এগিয়ে আসা দেহরক্ষীর পথে লুটিয়ে পড়ল রাজপুত শাহজাদা।
খেপা মোষের মত ছুটে গিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল নিকোলাস। মনোযোগ দিয়ে কেটে ফেলে হত্যা করতে লাগল শত্রুদেরকে। দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে একপাশে ঠেলে দিয়ে এগিয়ে গেল দাড়িঅলা যোদ্ধার দিকে। নিজের খঙ্গ নিকোলাসের উপর দিয়ে চালিয়ে দিল খান; কিন্তু নিজের অস্ত্র দিয়ে আঘাত প্রতিহত করল নিকোলাস। প্রতিপক্ষের কুঁচকিতে ঢুকিয়ে দিল তলোয়ারের ফলা। চিৎকার করে পড়ে গেল খান। ঘোড়া ছুটতে ছুটাতেই নিকোলাসের চোখে পড়ল মাটিতে পড়ে থাকা বেশির ভাগ শত্রু, হয় মৃত নতুবা মৃত্যুপথযাত্রী। পুরো যুদ্ধের মতো এই খণ্ডযুদ্ধের ফলাফল নিয়েও কোন সন্দেহ রইল না। কিন্তু নিজের সম্মান রক্ষার্থে আত্মদানের পথ বেছে নিল অশোক সিং। ক্ষতির কথা ভেবে পরিতাপে দগ্ধ হল নিকোলাস। অসংখ্য যুদ্ধে অংশ নেয়া পোড়খাওয়া চারজন পেশীবহুল রাজপুত সেনা ডুকরে কেঁদে উঠল সবার সামনে। কাঁধে তুলে নিল দোমড়ানো মোচড়ানো আর রক্তাক্ত শাহজাদার মৃতদেহ। বহুদূরে পর্বতের মাঝে ডুবে যেতে লাগল রক্তলাল বলের মতো, সূর্য। একটু পরেই, এই ধূসর বিরান পাহাড়ে যতটুকু সম্ভব কাঠ জোগাড় করে চিতা বানানো হল। শেষকৃত্যের শিখায় আলোকিত হয়ে উঠল রাতের আকাশ। পঞ্চভূতে মিলিয়ে গেল অশোক সিংয়ের আত্মা।
ভগ্নহৃদয়ে তলোয়ার খাপে ভরে রাখল নিকোলাস। ঘোড়ার দিকে ফিরে ডেকে উঠল তার ভাড়াটে সৈন্যদের দলনেতাকে। নাভারে থেকে আগত বর্ষীয়ান ফরাসী, জড়ো কর আমাদের সৈন্যদেরকে। শাহজাদার আদেশে ফিরে যেতে হবে আমাদেরকে। এই কারণে আমরা পরাজিত হলেও এই আদেশকেই মানতে হবে।
*
প্রাসাদের ছাদে একাকী দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন শাহজাহান। যদিও দেখতে পাচ্ছেন না যমুনার উপর দিয়ে তীরের মত আকৃতি নিয়ে উড়ে যাওয়া একদল সারসের সৌন্দর্য। তিন মাস থেকে বিপর্যয়ের সংবাদ প্রথমবার এনেছিল কসিডস, ঠিক তখনকার মত করেই আরো একবার চোখের সামনে ভেসে উঠল হিন্দুকুশের গিরি অঞ্চলে তুষারপাত আর ক্ষুধার জ্বালায় মৃত আর অথর্ব হয়ে পড়ে থাকা হাজার হাজার মোগল সৈন্যদের ছবি। আরো একবার কাবুলের পথে পিছু হটে আসছিল তাঁর সৈন্যরা। অসংখ্য প্রাণহানি আর রাজকোষের বিশ মিলিয়ন রুপি খরচ হয়ে গেলেও দখল করা গেল না এক ইঞ্চি ভূমি। তাঁর পুরো রাজত্বকালের প্রথম আর স্থায়ী সামরিক পরাজয় হিসেবে প্রমাণ হয়েছে এ অভিযান…আরো একবার নিজের কাছে জানতে চাইলেন যে আওরঙ্গজেব কীভাবে তাঁকে এতটা হতাশ করতে পারল, এমনকি গত বছরে মুরাদকেও ছাড়িয়ে গেছে এ ব্যর্থতা। এইবার তো মোগল সেনাবাহিনী এমনকি অক্সাসও পার হতে পারেনি… উজবেকদের সাথে একবারও তলোয়ার হাতে যুদ্ধে নামেনি। বরঞ্চ পুরো শীতকাল ধরে তাদেরকে দেরি করিয়ে দেবার সুযোগ দিয়েছে ভাঁড়ের মত পোশাক পরিহিত, আঘাত করে পালিয়ে যাওয়া আফগান আর তুকমানদেরকে ফলে কাবুলে এসে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা আর সফল হয়নি।
