হাঁপাতে হাঁপাতে ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়াল। হাতে রক্তমাখা ছুরি, চারপাশে তাকিয়ে দেখছে আর কোন বিপদ ওত পেতে আছে কিনা। প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই বুঝি মাংসে ঢুকে গেল বন্দুকের গুলি অথবা তলোয়ার।
মৃতলোকটার ঘোড়াটা কাছেই দাঁড়িয়ে আছে, লাগাম ধরতে এগিয়ে গেল নিকোলাস। সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে কাঁপতে থাকলেও বোঝা গেল আঘাত পায়নি জন্তুটা। শুধুমাত্র সামনের ডানদিকে খুরের চামড়ায় বর্শার আঘাতে খানিকটা রক্ত ঝরছে। ঘোড়ায় গলায় হাত বুলিয়ে পিঠে চড়ে বসল নিকোলাস; এরপর সাবধানে এগোতে লাগল সামনের দিকে, এই আশায় যে একটুখানি উঁচু জায়গা পাওয়া গেলে কী ঘটছে তা ভালোভাবে দেখা যাবে। অশোক সিং আর তার সৈন্যরা এসে গেছে, নির্ঘাৎ লেজ গুটিয়ে পালাচ্ছে তুকমানদের দল… ।
ঘোড়ার উপর উপুড় হয়ে শুয়ে ফিসফিস করে উৎসাহ দিতে দিতে সাবধানে মৃত আর মৃত্যুপথযাত্রী দেহগুলোকে পার হয়ে ছোট্ট পাহাড়টাতে নিরাপদে পৌঁছে গেল নিকোলাস। নিচে তাকাতেই দেখা গেল এক মাইলের চারভাগের এক ভাগ দূরত্বে সত্যিকারের পুরুষের ন্যায় যুদ্ধ করছে অশোক সিং। জোড়া মাথার যুদ্ধ কুঠারের আঘাতে মাথা কেটে গেল এক তুর্কমানের। এরপর ডান হাতে আঘাত করল দ্বিতীয় তুর্কমানের উপর, হাতের বর্শা ফেলে দিয়ে ঘুরে চলে গেল লোকটা, আহত হাত পাশে ঝুলতে লাগল মাংসপিণ্ডের মত করে। চারপাশ জুড়েই দেখা গেল হঠাৎ যেন যুদ্ধে আগ্রহ হারিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে বা হামাগুড়ি দিয়ে পাথুরে ভূমি ছেড়ে চলে যেতে লাগল তুকমানরা। নিকোলাসের ফরাসী আর ডেনিশ ভাড়াটে সৈন্যরা নিজেদের শত্রুদেরকে নিকেশ করে এগিয়ে গিয়ে জড়ো হল অশোক সিংয়ের সৈন্যদের সাথে। এটাই যে প্রথম তা নয়, এভাবে আরো বহুবার রাজপুত শাহজাদা আর তার যোদ্ধারা যুদ্ধের গতি ঘুরিয়ে দিল মোগলদের অনুকূলে।
উল্লসিত হয়ে অশোক সিংয়ের দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল নিকোলাস। হাসি দিয়ে দস্তানা পরা ডান হাত তুলে স্বাগত জানালো অশোক সিং।
অনেক শিক্ষা পেয়েছে–পালিয়ে যাচ্ছে তাই। বলে উঠল নিকোলাস। সত্যিই তাই। ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া নিকোলাস চারপাশে তাকিয়ে দেখতে পেল কয়েক জায়গার খণ্ডযুদ্ধও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কয়েক জায়গায় তুর্কমানদের ছোট ছোট দল এখনো মাটি আঁকড়ে প্রাণপণে লড়ে যাচ্ছে; কেননা তাদের ফেরার পথও বন্ধ হয়ে গেছে। নিকোলাসের ডান পাশেই এমন ত্রিশজন মিলে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুললেও বাঁচতে পারছে না। রাজপুত তলোয়ার আর বল্লমের হাত থেকে। কাছাকাছিই ছোট আরেকটা দল আশ্রয় নিয়েছে উল্টেপড়া রসদবাহী গাড়ির ওপাশে। কিন্তু নিকোলাসের ভাড়াটে সৈন্যরা কয়েকজন মিলে ধাওয়া করে খোলা জায়গায় বের করে আনছে এ তুকমানদের।
ডানদিকে দুইশ গজ দূরত্বে, দেখা গেল একদল কালো আলখাল্লাধারী অশ্বারোহী। এখনো চওড়া ফলার খড়া নেড়ে ভয়ঙ্করভাবে যুদ্ধ করছে। লোকগুলো। মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে মোগলদের সামনে থেকে পথ বের করে নিতে। অন্যান্য তুকমানদের চেয়ে ভালো ঘোড়া আর সশস্ত্র অবস্থায় আছে এরা। কালো ঘোড়ায় চেপে নেতৃত্ব দিচ্ছে ঘন দাড়িঅলা এক তুর্কমান। সম্ভবত স্থানীয় খান ও তার দেহরক্ষীরা।
উচিত শিক্ষা দিয়েছি আমরা এ বর্বরগুলোকে, হেসে ফেলল অশোক সিং। এরপর থেকে মোগল সৈন্যদের উপর আক্রমণ করার আগে দুবার ভেবে দেখবে হয়ত।
উত্তর দেবার আগেই পেছনে পাথুরে ভূমিতে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনতে পেল নিকোলাস। ঘুরে তাকাতেই চিনতে পারল ছয়জন সৈন্য নিয়ে এগিয়ে আসা আওরঙ্গজেবের তরুণ কৰ্চিকে। ঘোড়র উপর থেকে অশোক সিংকে জানালো, জনাব! শাহজাদা আওরঙ্গজেবের কাছে থেকে বার্তা নিয়ে এসেছি।
শাহজাদাকে জানাতে পারো যে গিরিপথ দিয়ে প্রধান সৈন্যসারি নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য আর কোন ভয় নেই তার–আমাদেরকে বিপদে ফেলার জন্য বসে থাকা লোকগুলোকে সমূলে উৎখাত করেছি আমরা। জানিয়ে দিল রাজপুত।
অনিশ্চিত ভঙ্গিতে একবার নিকোলাস আর আরেকবার অশোক সিংয়ের দিকে তাকাল তরুণ কৰ্চি। যেন বুঝতে পারছে না যে কী বলবে, ধুলিমাখা চেহারাতে উদ্বিগ্নতার ছাপ।
আমি নিশ্চিত এটা শুনতে পেলে খুশিই হবেন আমার প্রভু। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে একটা আদেশ নিয়ে এসেছি আমি। এখনি পিছু হটতে হবে সবাইকে।
কী? ঠিক শুনছি তো? সামনে ঝুঁকে এলো অশোক সিং।
শাহজাদা আওরঙ্গজেবের ইচ্ছে যেন সবাই পিছু হটে গিরিখাদে মিলিত হয় তাঁর সঙ্গে।
কেন? যদি এখন আমরা পিছু হটি, তাহলে এত কষ্ট করে দখল করা ভূমি আবারও কেড়ে নেবে শক্ররা। আবারো তাহলে একইভাবে যুদ্ধ করতে হবে সেনাবাহিনীর জন্য পথ নিরাপদ করতে।
নিজের যুক্তি জানাননি আমার প্রভূ।
অশোক সিংয়ের দিকে তাকাতেই কপালের উপর শিরা লাফাতে দেখল নিকোলাস।
কয়েকদিন ধরে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না অশোক সিং আর আওরঙ্গজেবের। রাজপুতের পরামর্শ প্রায়ই হেলায় সরিয়ে দিচ্ছে শাহজাদা, যা অহংকারী আর কদাচিৎ রেগে যাওয়া অশোক সিংয়ের পক্ষে মেনে নেয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আর নিজের কথা বলতে গেলে নিকোলাসের নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছে না কর্চির কথা। পর্বতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে আসায় প্রায় সফল হয়েছে আর সামনেই পড়ে আছে সহজতম রাস্তা, এমন সময় সব ছেড়েছুঁড়ে তিনি পিছু হঠার মানে নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
